প্রকৃতি ও মানুষের নিবিড় সম্পর্কের আদি সূত্র হলো গাছ| একটি দেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীবনধারণের জন্য গাছের কোনো বিকল্প নেই| সভ্যতার ক্রমবিকাশ থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও বেঁচে থাকার প্রতিটি নিশ্বাসে আমরা গাছের ওপর নির্ভরশীল| গতকাল ছিল জাতীয় বৃক্ষরোপণ দিবস| দিবসটির তাৎপর্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী| ক্রমবর্ধমান ˆবশ্বিক উষ্ণতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা থেকে প্রিয় মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য এবারের দিবসটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে|
এবার জাতীয় বৃক্ষরোপণ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সময়ের চাহিদাকে সামনে রেখে| এবারের মূল সুর হলো টেকসই পরিবেশ এবং আগামীর সবুজ সম্ভাবনা| প্রতিপাদ্যটির মূল লক্ষ্য হলো কেবল গাছ লাগানোই নয়, বরং রোপণকৃত চারাগাছটির সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা| এর মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিককে প্রকৃতি রক্ষায় ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যা একটি সমৃদ্ধ ও পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক হবে|
বৃক্ষ নিধনের ফলে বাস্তুসংস্থানের যে ক্ষতি হয় তা জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অপূরণীয়| বনভূমি উজাড় করার ফলে বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, যার ফলে অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে| এটি খাদ্যশৃঙ্খলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হানে| উদ্ভিদের অভাবে পরাগায়ন ব্যাহত হয়, যা কৃষিজ উৎপাদনকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে|
বৃক্ষ নিধন বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের ভারসাম্য নষ্ট করে| গাছ যখন কাটা হয়, তখন তারা সঞ্চিত কার্বন পরিবেশে ছেড়ে দেয়, যা গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে| এতে বায়ুর গুণমান হ্রাস পায় এবং বিষাক্ত গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মানুষের শ্বাসতন্ত্রের জটিলতাসহ নানা রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে|
বৃক্ষহীন পরিবেশ তাপমাত্রার শোষণে ব্যর্থ হয়| গাছপালা না থাকলে সূর্যের তাপ সরাসরি ভূপৃষ্ঠে আঘাত করে এবং মাটি তা শোষণ করে ধরে রাখে, যা ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব ˆতরি করে| এর ফলে স্থানীয় তাপমাত্রা অ¯^াভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং জলবায়ুর চরম ভাবাপন্নতা লক্ষ্য করা যায়, যা মানবদেহের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে|
বৃক্ষ নিধন মাটির গঠন কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়| গাছের মূল মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে, যা ভূমিধস এবং মৃত্তিকা ক্ষয় রোধ করে| বন উজাড় করার ফলে বৃষ্টির পানি সরাসরি মাটির ওপর আছড়ে পড়ে ওপরের উর্বর স্তর ধুয়ে নিয়ে যায়, যার ফলে জমির উর্বরতা হ্রাস পায় এবং মরুকরণ প্রক্রিয়ার সূচনা হয়|
পরিবেশ বিজ্ঞানের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বৃক্ষ নিধন পানিচক্রকে বিঘ্নিত করে| গাছ প্র¯ে^দন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প ত্যাগ করে যা মেঘ ˆতরিতে সাহায্য করে| বৃক্ষ না থাকলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায় এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়| এতে খরা ও দীর্ঘমেয়াদী পানির সংকট ˆতরি হয়, যা একটি দেশের সামগ্রিক পরিবেশগত নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলে দেয়|
সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৃক্ষ আমাদের জীবনদায়ী অক্সিজেন সরবরাহ করে, যা ˆবজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এক অনন্য প্রক্রিয়া| বাতাস থেকে ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে বৃক্ষ বায়ুমণ্ডলকে নির্মল রাখে| এই প্রাকৃতিক ফিল্টারেশন ব্যবস্থা আমাদের সুস্থ ফুসফুস এবং দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করার প্রধান কারিগর|
উদ্ভিদ জগত প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে একটি জীবন্ত ঢাল হিসেবে কাজ করে| উপকূলীয় অঞ্চলে বনায়ন জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ কমিয়ে দেয়, যা জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে হ্রাস করে| ˆবজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ঝড়ের তাণ্ডব তুলনামূলক কম হয়, কারণ গাছ বাতাসের গতিপথকে বাধাগ্রস্ত ও বিচ্ছুরিত করে|
বৃক্ষরোপণ মাটির ˆজব গুণাগুণ বৃদ্ধি করে কৃষিতে ˆবপ্লবিক পরিবর্তন আনে| গাছের ঝরা পাতা মাটিতে মিশে প্রাকৃতিকভাবে হিউমাস ˆতরি করে, যা মাটির অণুজীবগুলোর কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়| এটি কৃত্রিম সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মাটির টেকসই উর্বরতা নিশ্চিত করে এবং সুস্থ সবল ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে|
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বৃক্ষের ভূমিকা অন¯^ীকার্য কারণ এটি প্রাকৃতিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র হিসেবে কাজ করে| বাষ্পীভবন ও ছায়া প্রদানের মাধ্যমে গাছ আশপাশের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত কমিয়ে রাখতে পারে| এটি কেবল বিদ্যুৎ সাশ্রয়ই করে না, বরং শহরাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান অসহনীয় গরম থেকে সাধারণ মানুষকে ¯^স্তি প্রদান করে|
জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বৃক্ষ এক অপ্রতিম আধারের ভূমিকা পালন করে| একটি গাছ অসংখ্য কীটপতঙ্গ, পাখি এবং অণুজীবের নিরাপদ আশ্রয়স্থল| পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই ক্ষুদ্র জীবগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আমরা প্রকৃতপক্ষে একটি ¯^য়ংসম্পূর্ণ জীবনচক্রকে লালন করি যা পৃথিবীর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে|
আমাদের সবার গাছ রোপণ করা ˆনতিক ও নাগরিক দায়িত্ব| এই একটি চারা রোপণের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাই একদিন বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়ে আমাদের অক্সিজেন ও ছায়া দেবে| আমরা যদি ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে এই উদ্যোগ গ্রহণ করি, তবে কোটি মানুষের অংশগ্রহণে দেশ এক নিমিষেই সবুজে ভরে উঠবে|
আমাদের বাড়ির আঙিনায়, সড়কের পাশে বা পরিত্যক্ত স্থানে একটি চারা লাগানো মানে হলো আগামীর নিরাপদ পৃথিবীর জন্য বিনিয়োগ করা| এই গাছটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মানসিক প্রশান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও বৃদ্ধি পাবে| একটি গাছ রোপণের মাধ্যমে আমরা দেশাত্মবোধের অনন্য নজির স্থাপন করতে পারি| দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম উপায় হলো এই প্রকৃতিকে রক্ষা করা|
গাছ আমাদের পরম বন্ধু, কারণ সে নিঃ¯^ার্থভাবে আমাদের অক্সিজেন দেয়| ফল, ফুল, কাঠ ও ওষুধ দিয়ে গাছ মানুষের জীবনকে করে তুলে সমৃদ্ধ ও ˆবচিত্র্যময়| তপ্ত দুপুরে শীতল ছায়া দিয়ে গাছ ক্লান্ত পথিককে পরম শান্তি ও আশ্রয় দান করে| প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আমাদের রক্ষা করে গাছ অতন্দ্র প্রহরীর মতো লড়াই চালিয়ে যায়| পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে গাছের গুরুত্ব অপরিসীম, তাই গাছই আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ|
সবুজ বাংলাদেশ গড়তে সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ| বনাঞ্চল রক্ষা এবং নতুন নতুন বন সৃজনে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন| প্রশাসনের কঠোর নজরদারি বনখেকো ও অবৈধ গাছ কাটা রোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে| এছাড়া সরকারি উদ্যোগে দেশব্যাপী চারা বিতরণ কর্মসূচি প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া জরুরি|
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে গড়ে তোলার প্রধান কেন্দ্র| প্রতিটি বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ পালন এবং শিক্ষার্থীদের হাতে একটি করে চারা তুলে দিয়ে তাদের পরিচর্যার দায়িত্ব দেয়া উচিত| পরিবেশ বিষয়ক পাঠ্যক্রমে বৃক্ষের গুরুত্ব হাতেকলমে শিক্ষা দিলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ˆশশব থেকেই প্রকৃতি রক্ষার চেতনা জাগ্রত হবে|
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং বন বিভাগকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বনায়ন কার্যক্রম তদারকি করতে হবে| চরাঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকায় বিশেষ বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে মাটির ক্ষয়রোধে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার| এছাড়া নার্সারি মালিকদের প্রশিক্ষণ ও ¯^ল্পমূল্যে উন্নত জাতের চারা সরবরাহ নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান কাজ হওয়া উচিত|
সর্বস্তরের জনসাধারণের অংশগ্রহণ ছাড়া সবুজ বাংলাদেশ গড়া অসম্ভব| পাড়া-মহল্লায় ক্লাব ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনা করতে হবে| মিডিয়া ও প্রচারমাধ্যমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে গাছের বহুমুখী উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে| আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি ধূসর ভূখণ্ডকে সবুজের সমারোহে রূপান্তর করতে| আমাদের জীবন, জীবিকা এবং সুস্থ পরিবেশের জন্য বৃক্ষ অপরিহার্য| সবুজ প্রকৃতিই আমাদের শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার, আর এই উত্তরাধিকার রক্ষা করাই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার|
[লেখক: প্রেসিডেন্ট, ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল]

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকৃতি ও মানুষের নিবিড় সম্পর্কের আদি সূত্র হলো গাছ| একটি দেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীবনধারণের জন্য গাছের কোনো বিকল্প নেই| সভ্যতার ক্রমবিকাশ থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও বেঁচে থাকার প্রতিটি নিশ্বাসে আমরা গাছের ওপর নির্ভরশীল| গতকাল ছিল জাতীয় বৃক্ষরোপণ দিবস| দিবসটির তাৎপর্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী| ক্রমবর্ধমান ˆবশ্বিক উষ্ণতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা থেকে প্রিয় মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য এবারের দিবসটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে|
এবার জাতীয় বৃক্ষরোপণ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সময়ের চাহিদাকে সামনে রেখে| এবারের মূল সুর হলো টেকসই পরিবেশ এবং আগামীর সবুজ সম্ভাবনা| প্রতিপাদ্যটির মূল লক্ষ্য হলো কেবল গাছ লাগানোই নয়, বরং রোপণকৃত চারাগাছটির সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা| এর মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিককে প্রকৃতি রক্ষায় ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যা একটি সমৃদ্ধ ও পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক হবে|
বৃক্ষ নিধনের ফলে বাস্তুসংস্থানের যে ক্ষতি হয় তা জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অপূরণীয়| বনভূমি উজাড় করার ফলে বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, যার ফলে অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে| এটি খাদ্যশৃঙ্খলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হানে| উদ্ভিদের অভাবে পরাগায়ন ব্যাহত হয়, যা কৃষিজ উৎপাদনকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে|
বৃক্ষ নিধন বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের ভারসাম্য নষ্ট করে| গাছ যখন কাটা হয়, তখন তারা সঞ্চিত কার্বন পরিবেশে ছেড়ে দেয়, যা গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে| এতে বায়ুর গুণমান হ্রাস পায় এবং বিষাক্ত গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মানুষের শ্বাসতন্ত্রের জটিলতাসহ নানা রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে|
বৃক্ষহীন পরিবেশ তাপমাত্রার শোষণে ব্যর্থ হয়| গাছপালা না থাকলে সূর্যের তাপ সরাসরি ভূপৃষ্ঠে আঘাত করে এবং মাটি তা শোষণ করে ধরে রাখে, যা ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব ˆতরি করে| এর ফলে স্থানীয় তাপমাত্রা অ¯^াভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং জলবায়ুর চরম ভাবাপন্নতা লক্ষ্য করা যায়, যা মানবদেহের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে|
বৃক্ষ নিধন মাটির গঠন কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়| গাছের মূল মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে, যা ভূমিধস এবং মৃত্তিকা ক্ষয় রোধ করে| বন উজাড় করার ফলে বৃষ্টির পানি সরাসরি মাটির ওপর আছড়ে পড়ে ওপরের উর্বর স্তর ধুয়ে নিয়ে যায়, যার ফলে জমির উর্বরতা হ্রাস পায় এবং মরুকরণ প্রক্রিয়ার সূচনা হয়|
পরিবেশ বিজ্ঞানের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বৃক্ষ নিধন পানিচক্রকে বিঘ্নিত করে| গাছ প্র¯ে^দন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প ত্যাগ করে যা মেঘ ˆতরিতে সাহায্য করে| বৃক্ষ না থাকলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায় এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়| এতে খরা ও দীর্ঘমেয়াদী পানির সংকট ˆতরি হয়, যা একটি দেশের সামগ্রিক পরিবেশগত নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলে দেয়|
সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৃক্ষ আমাদের জীবনদায়ী অক্সিজেন সরবরাহ করে, যা ˆবজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এক অনন্য প্রক্রিয়া| বাতাস থেকে ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে বৃক্ষ বায়ুমণ্ডলকে নির্মল রাখে| এই প্রাকৃতিক ফিল্টারেশন ব্যবস্থা আমাদের সুস্থ ফুসফুস এবং দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করার প্রধান কারিগর|
উদ্ভিদ জগত প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে একটি জীবন্ত ঢাল হিসেবে কাজ করে| উপকূলীয় অঞ্চলে বনায়ন জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ কমিয়ে দেয়, যা জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে হ্রাস করে| ˆবজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ঝড়ের তাণ্ডব তুলনামূলক কম হয়, কারণ গাছ বাতাসের গতিপথকে বাধাগ্রস্ত ও বিচ্ছুরিত করে|
বৃক্ষরোপণ মাটির ˆজব গুণাগুণ বৃদ্ধি করে কৃষিতে ˆবপ্লবিক পরিবর্তন আনে| গাছের ঝরা পাতা মাটিতে মিশে প্রাকৃতিকভাবে হিউমাস ˆতরি করে, যা মাটির অণুজীবগুলোর কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়| এটি কৃত্রিম সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মাটির টেকসই উর্বরতা নিশ্চিত করে এবং সুস্থ সবল ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে|
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বৃক্ষের ভূমিকা অন¯^ীকার্য কারণ এটি প্রাকৃতিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র হিসেবে কাজ করে| বাষ্পীভবন ও ছায়া প্রদানের মাধ্যমে গাছ আশপাশের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত কমিয়ে রাখতে পারে| এটি কেবল বিদ্যুৎ সাশ্রয়ই করে না, বরং শহরাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান অসহনীয় গরম থেকে সাধারণ মানুষকে ¯^স্তি প্রদান করে|
জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বৃক্ষ এক অপ্রতিম আধারের ভূমিকা পালন করে| একটি গাছ অসংখ্য কীটপতঙ্গ, পাখি এবং অণুজীবের নিরাপদ আশ্রয়স্থল| পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই ক্ষুদ্র জীবগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে আমরা প্রকৃতপক্ষে একটি ¯^য়ংসম্পূর্ণ জীবনচক্রকে লালন করি যা পৃথিবীর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে|
আমাদের সবার গাছ রোপণ করা ˆনতিক ও নাগরিক দায়িত্ব| এই একটি চারা রোপণের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাই একদিন বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়ে আমাদের অক্সিজেন ও ছায়া দেবে| আমরা যদি ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে এই উদ্যোগ গ্রহণ করি, তবে কোটি মানুষের অংশগ্রহণে দেশ এক নিমিষেই সবুজে ভরে উঠবে|
আমাদের বাড়ির আঙিনায়, সড়কের পাশে বা পরিত্যক্ত স্থানে একটি চারা লাগানো মানে হলো আগামীর নিরাপদ পৃথিবীর জন্য বিনিয়োগ করা| এই গাছটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মানসিক প্রশান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও বৃদ্ধি পাবে| একটি গাছ রোপণের মাধ্যমে আমরা দেশাত্মবোধের অনন্য নজির স্থাপন করতে পারি| দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম উপায় হলো এই প্রকৃতিকে রক্ষা করা|
গাছ আমাদের পরম বন্ধু, কারণ সে নিঃ¯^ার্থভাবে আমাদের অক্সিজেন দেয়| ফল, ফুল, কাঠ ও ওষুধ দিয়ে গাছ মানুষের জীবনকে করে তুলে সমৃদ্ধ ও ˆবচিত্র্যময়| তপ্ত দুপুরে শীতল ছায়া দিয়ে গাছ ক্লান্ত পথিককে পরম শান্তি ও আশ্রয় দান করে| প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আমাদের রক্ষা করে গাছ অতন্দ্র প্রহরীর মতো লড়াই চালিয়ে যায়| পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে গাছের গুরুত্ব অপরিসীম, তাই গাছই আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ|
সবুজ বাংলাদেশ গড়তে সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ| বনাঞ্চল রক্ষা এবং নতুন নতুন বন সৃজনে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন| প্রশাসনের কঠোর নজরদারি বনখেকো ও অবৈধ গাছ কাটা রোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে| এছাড়া সরকারি উদ্যোগে দেশব্যাপী চারা বিতরণ কর্মসূচি প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া জরুরি|
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে গড়ে তোলার প্রধান কেন্দ্র| প্রতিটি বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ পালন এবং শিক্ষার্থীদের হাতে একটি করে চারা তুলে দিয়ে তাদের পরিচর্যার দায়িত্ব দেয়া উচিত| পরিবেশ বিষয়ক পাঠ্যক্রমে বৃক্ষের গুরুত্ব হাতেকলমে শিক্ষা দিলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ˆশশব থেকেই প্রকৃতি রক্ষার চেতনা জাগ্রত হবে|
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং বন বিভাগকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বনায়ন কার্যক্রম তদারকি করতে হবে| চরাঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকায় বিশেষ বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে মাটির ক্ষয়রোধে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার| এছাড়া নার্সারি মালিকদের প্রশিক্ষণ ও ¯^ল্পমূল্যে উন্নত জাতের চারা সরবরাহ নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান কাজ হওয়া উচিত|
সর্বস্তরের জনসাধারণের অংশগ্রহণ ছাড়া সবুজ বাংলাদেশ গড়া অসম্ভব| পাড়া-মহল্লায় ক্লাব ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনা করতে হবে| মিডিয়া ও প্রচারমাধ্যমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে গাছের বহুমুখী উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে| আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি ধূসর ভূখণ্ডকে সবুজের সমারোহে রূপান্তর করতে| আমাদের জীবন, জীবিকা এবং সুস্থ পরিবেশের জন্য বৃক্ষ অপরিহার্য| সবুজ প্রকৃতিই আমাদের শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার, আর এই উত্তরাধিকার রক্ষা করাই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার|
[লেখক: প্রেসিডেন্ট, ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল]

আপনার মতামত লিখুন