বোধ ব্যক্তিকে নান্দনিক চর্চায় নিমজ্জিত করে এবং পরিপার্শ^ ও সুশিক্ষা সেটাকে পরিপূর্ণ করে তোলে। কবিতা বোধের সূক্ষ¥তম প্রকাশ-- কখনো কখনো কবিতা হয়ে উঠে বোধের প্রতিরূপ কিংবা মানবচেতনার গভীরতম স্তরে বোধের অনুরণন ব্যক্তিকে শৈল্পিকচেতনায় জারিত করে। ব্যক্তি যখন তার অস্তিত্বের সংকট, সময়ের ভাঙন এবং আত্মসন্ধানের প্রশ্নে নিমজ্জিত হয়, তখন কবিতা হয়ে ওঠে সেই বোধের ভাষা। বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য কবি জীবনানন্দ দাশ এবং পাশ্চাত্য আধুনিকতাবাদের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর কবি টিএস এলিয়ট-- উভয়ের কবিতায় এ বোধিদীপ্ততার এক গভীর সাযুজ্য লক্ষ্য করা যায়। ভিন্ন ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও তাঁদের কবিতায় সময়চেতনা, নিঃসঙ্গতা এবং আধুনিকতার সংকট এক আন্তঃসম্পর্ক গড়ে তোলে।
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) ও টিএস এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫) বিশ শতকের অগ্রগণ্য কবি। তাঁদের শিল্পবোধ ও নান্দনিক চর্চা শিল্পকে করে তুলেছে শৈল্পিক ও বহুমাত্রিক। জীবনানন্দ দাশ কবিতার বোধকে এনেছেন নান্দনিত চিত্রায়ণে এবং টিএস এলিয়ট এলিয়ট এনেছেন শিল্পের অনুষঙ্গ হিসেবে। তুলনায় কিংবা সাদৃশ্যে-বৈসাদৃশ্যে এ দুই কবির বোধের যে মাত্রা নির্মিত হয়েছে তা পাঠককে আদৃত করে। ত্রিশের দশক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মেষ। ত্রিশের দশকের কবিবৃন্দ রবীন্দ্রবলয়কে অতিক্রম করে যুগচেতনা ও যুগযন্ত্রণাকে লালন করে স্বতন্ত্র কাব্যভাষা ও কাব্যচরিত্র নির্মাণ করেছেন। তাঁরা সাহিত্যসাধনায় প্রযুক্ত করেছেন সংশয়ী মানবাত্মার আর্তি, হতাশা, নেতিবাচকতা, অবক্ষয়। ত্রিশের দশকের অন্যতম কবি-- জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে প্রমুখ আধুনিক বাংলা কবিতার শরীরকে নতুন অনুধ্যায়ে নির্মাণ করেছেন। তাঁরা পঞ্চপাণ্ডব নামে পরিচিত এবং প্রত্যেকে স্বকীয় কাব্যভাবনা ও চিন্তার বহুরৈখিকতার স্থান থেকে স্বতন্ত্র। তবে জীবনানন্দ দাশ তাঁর চিন্তার-মৌলিকত্বের পথ ধরে হেঁটেছেন শেষ পর্যন্ত। তাঁর কাব্য চেতনায় জীবনবোধ ও মানব অস্তিত্বের বহুমুখী টানাপোড়েন তাঁকে প্রাতিস্বিক করেছে। “এক বিমূঢ় যুগের বিভ্রান্ত কবি জীবনানন্দ দাশ। পৌষের চন্দ্রালোকিত মধ্যরাত্রির প্রকৃতির মত তাঁর কাব্য কুহেলীকুহকে আচ্ছন্ন। আধুনিক কবিদের মধ্যে একমাত্র তাঁর কাব্যেই এ যুগের সংশয়ী মানবাত্মার ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত পরিচয়টি ফুটে উঠেছে।” (দ্বিপ্তি মিত্র, আধুনিক বাংলা কব্যে পরিচয়)। জীবনানন্দ দাশের ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ ও টিএস এলিয়টের ‘পোড়ো জমি’ (The Waste Land) জগন্নাথ চক্রবর্তী অনুবাদিত কাব্যে বোধিদ্রুমের সংযোগসূত্রানুসন্ধানের মাধ্যমে দ্বিখণ্ডিত মানব সত্তার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি কিংবা সংগ্রাম-সংরাগের চিত্রকে শৈল্পিক অভিঘাতে মূর্ত করা তোলা হয়েছে।
‘পোড়ো জমি’ কাব্যের প্রথম কবিতা ‘অন্ত্যেষ্টি’। খ্রিস্টান ধর্মালম্বীরা মৃতের পুনরুত্থানকে বিশ্বাস করে কিন্তু কবি এখানে হতাশ হয়েছেন বিশেষত, এপ্রিল মাস ইউরোপের সবচেয়ে প্রিয় মাস। যে এপ্রিল মাস ঊর্বরতার আগমনী বার্তা নিয়ে আসে সেখানেও কবি নিষ্ঠুরতা ও অপ্রাপ্তির হাতাশায় মগ্ন। সেখানে লাইলাক ছাড়া কিছুই জন্মায় না এবং কবির জীবনে গাণিতিক বিপ্রতীপ হয়ে জ¦লে উঠেছে আশাবাদের বাকপ্রতিমা। “এপ্রিল নিষ্ঠুর মাস, তখন জন্মায়/ লাইলাক মরা মাঠে, একসাথে মেশে/ স্মৃতি ও বাসনারাজি, নড়ে উঠে/ নির্জীব বৃক্ষের মূল বসন্তবর্ষণে।” জীবনানন্দ দাশ পড়ো জমির চিত্রকল্পে বর্তমান বন্ধ্যা যুগকে চিত্রায়িত করেছেন। হেমন্তের রিক্ত, অনুর্বর রূপ যেন যাপিত জীবনের নিহিত সংকট কিংবা অপ্রাপ্তির নিকেশ এবং তাঁর কবিতার শরীরী মুদ্রা তাঁর কাব্য প্রকরণকে করেছে ধ্রুপদ। তিনি চেতনার স্পন্দনে অবক্ষয়িত মানবাত্মার আত্মিক নির্বাসনের চিত্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দৃশ্যকল্পে ব্রাকেটবন্দী করেছেন। ‘‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে/অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের খেতে;/ মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার-- চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,/ তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান,/ দেহের স্বাদে কথা কয়;/ বিকেলের আলো এসে (হয়তো বা) নষ্ট করে দেবে তার সাধের সময়।” (অবসরের গান)। কার্তিকের রোদে ধান পেকেছে, সে মুহূূর্তের অবিসংবাদিত সৌন্দর্যের বর্ণনা কবিতার চরণে প্রতিফলিত। দিনের শেষ সূর্য এসে এ মুহূর্তের প্রশান্তিকে নষ্ট করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। কিন্তু এ কবিতা ব্যক্তিবোধে এ ভিন্নার্থক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। যা ব্যক্তির বোধিদ্রুমে সৃষ্টি করে এক সংবেদনশীল আবেদন। রোদে ব্যক্তিত্ব আরোপ গ্রামীণ মাহাত্ম্যকে বর্ণনা করে আকস্মিক-বিপরীতে ‘অলস গেঁয়োর মতো’ এবং ‘শুয়েছে মাথা পেতে’, ‘মাঠের ঘাসের গন্ধ’, ‘চোখে তার শিশিরে ঘ্রাণ’, ‘অবসাদে পেকে ওঠে’, ‘দেহের স্বাদের কথা কয়’-- অবশেষে সূর্যের অদ্ব্যর্থপ্রতিম ভোরের আলোর পাশেই অন্য কোনো স্বভাবের ‘বিকেলের আলো’। প্রকৃতির সাদৃশ্যে ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনের অভিক্ষেপ শব্দের ব্যঞ্জনায় যেন জেগে ওঠে তারই আকল্প ধ্বনি। টিএস এলিয়টে কাব্যশরীর কখনো প্রেম কখনো অপ্রেমের সংশয় ক্ষত বিক্ষত। তাঁর ব্যক্তির আত্মিক মৃত্যুর ভয়াবহতা প্রবাহমান। যে মৃত্যু একটি যুগের বন্ধ্যত্বকে ইঙ্গিত করে। “জলদি করুন হয়েছে সময়/ ভালো যদি নাও লাগে, তবুও চালিয়ে যেতে পারো/ বললাম আমি,/ তুমি না পারলে জেনো অন্য কেউ বেছে নেবে/ তোমার কি লজ্জা নেই, আমি বলি, এমন বুড়িয়ে গেছ তুমি।” বিশ শতক ভাঙনের শতক-- যুদ্ধ, নগরায়ন, যান্ত্রিকতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় মানুষের মনে এক গভীর শূন্যতার জন্ম দেয় এবং এ প্রেক্ষাপটে এলিয়টের The Waste Land যেমন সভ্যতার অবক্ষয়ের প্রতীক, তেমনি জীবনানন্দের কবিতায়ও ‘অন্ধকার’, ‘নিঃসঙ্গতা’ ও ‘অবসাদ’-এর চিত্রকল্প যুগ যন্ত্রণার সংকট হয়ে উঠে আসে। এলিয়ট আধুনিক মানুষকে এক বিচ্ছিন্ন, ভগ্ন আত্মা হিসেবে উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে জীবনানন্দের কবিতায় এ বিচ্ছিন্নতা অধিকতর অন্তর্মুখী-- তিনি প্রকৃতির ভেতরে আশ্রয় খুঁজে নেন, কিন্তু সেই আশ্রয়ও চূড়ান্ত নয়; বরং তা এক অনির্দিষ্ট অনুসন্ধানের পথ। সময়! সময় বলতে বোঝানো হয়েছে, ঐতিহাসিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক সম্পর্ক, মানুষের যন্ত্রণা, স্বপ্ন ও সংগ্রামকে। অর্থ্যাৎ একটি নির্দিষ্ট সময়ে মানুষের জীবনে যে সংকট, সম্ভাবনা ও পরিবর্তন ঘটে, সেটি সময়ের অর্থ কিংবা বিনির্মাণ। শিল্প মূলত ব্যক্তির সৃজনশীল প্রতিক্রিয়া। কবিতা, গল্প, গান, চিত্রকলাসহ সবই শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। তবে শিল্প কখনো শূন্যে জন্ম নেয় না; বরং এটি সময়ের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠে। এটি বাস্তবতার অনুকরণ নয়; বরং বাস্তবতার রূপান্তর। দুই কবির কবিতায় সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও শৈল্পিক উপাদান। টি এস এলিয়টের কবিতায় সময় ভাঙা, চক্রাকার এবং প্রায়শই অস্থির; অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। ‘আর কালের ক্ষয়িত মুড়া হতশ্রী স্বভাবে / পড়ে আছে দেয়ালের গায়ে; আকৃতিরা পলকবিহীন।’ অন্যদিকে জীবনানন্দ দাশ সময়কে দেখেছেন এক ধরনের স্মৃতির ভিতর দিয়ে-- তার ‘রূপসী বাংলা’ কিংবা ‘বনলতা সেন’-এ অতীতের প্রতি এক নস্টালজিক টান রয়েছে। তবে এ নস্টালজিয়া নিছক রোমান্টিক নয়; বরং এটি বর্তমানের শূন্যতা থেকে মুক্তির একটি নান্দনিক প্রয়াস। টি এস এলিয়টের নগর-- বিশেষত লন্ডন-- একটি মৃত, যান্ত্রিক ও আত্মাহীন শহর এবং মানুষ সেখানে চলমান, কিন্তু জীবন্ত নয়। ‘এ পৃথিবী বিস্মরণপ্রবণ তুষারে, মুখে দিয়ে/ শুকনো কন্দের সঙ্গে সামান্য জীবন।’ জীবনানন্দের শহরও কম নিঃসঙ্গ নয়; তবে তার কবিতায় গ্রাম ও প্রকৃতির বিপরীতে শহর একটি বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হয়ে ওঠে এবং এ দুই কবির নগরচিত্রে এক ধরনের অস্তিত্ববাদী সংকটের প্রতিফলন দেখা যায়, যেখানে মানুষ নিজেকেই হারিয়ে ফেলে। “প্রথম ফসল ঘরে/ হেমন্তের মাঠে-মাঠে ঝরে/ বাঁশ পাতা মার ঘাসÑ আকাশের তারা/ বরফের মত চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা।” টি এস এলিয়টের কবিতায় প্রতীকবাদ ও ইঙ্গিতময়তা প্রবল; বিভিন্ন পুরাণ, ধর্মীয় আখ্যান এবং পাশ্চাত্য সাহিত্য থেকে উদ্ধৃতি এনে তিনি একটি জটিল অর্থস্তর নির্মাণ করেন। জীবনানন্দের কবিতাও প্রতীকসমৃদ্ধ, তবে তা অনেক বেশি সংবেদনশীল ও চিত্রধর্মী। তার কবিতায় ‘পাখি’, ‘নদী’, ‘অরণ্য’, ‘অন্ধকার’-- এসব প্রতীক মানুষের অন্তর্জগতের প্রতিফলন। দুই কবির ভাষা পৃথক হলেও তাদের উদ্দেশ্য একÑ মানবজীবনের গভীরতম সত্যকে প্রকাশ করা-- বোধিদীপ্ততার সংযোগ: জীবনানন্দ দাশ ও টি এস এলিয়ট উভয়ের কবিতায় যে বোধিদীপ্ততা লক্ষ্য করা যায়, তা মূলত তিনটি স্তরে সংযুক্ত--
১. অস্তিত্বের সংকট: উভয় কবিই আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা ও শূন্যতার কথা বলেছেন।
২. সময় ও স্মৃতির ভাঙন: অতীত ও বর্তমানের দ্বন্দ্ব তাদের কবিতায় এক জটিল বোধ তৈরি করে।
৩. নিঃসঙ্গতার নন্দন: নিঃসঙ্গতাকে তাঁরা কেবল দুঃখ হিসেবে নয়, বরং একটি শৈল্পিক অভীপ্সা হিসেবে দেখেছেন।
‘বোধিদ্রুম’ এখানে এমন এক রূপক, যা উভয় কবির চেতনাজগতকে যুক্ত করে। টি এস এলিয়ট যেখানে খ্রিস্টীয় আধ্যাত্মিকতা ও দার্শনিক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে মুক্তির পথ খোঁজেন, জীবনানন্দ সেখানে প্রকৃতি ও স্মৃতির ভেতর দিয়ে এক নীরব আত্মউপলব্ধির দিকে এগিয়ে যান। কিন্তু উভয়ের লক্ষ্য-- অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করে এক ধরনের জাগরণ বা অর্জন এবং এ সংযোগ তাঁদের কবিতাকে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যেও এক অভিন্ন বোধের ধারায় যুক্ত করে। জীবনানন্দ দাশ ও টি. এস. এলিয়ট-- দুই ভিন্ন জগতের কবি, কিন্তু তাঁদের কবিতায় আধুনিকতার সংকট, সময়ের ভাঙন এবং মানবিক নিঃসঙ্গতার যে বোধিদীপ্ততা প্রকাশ পেয়েছে, তা এক গভীর আন্তঃসম্পর্ক নির্মাণ করে।
তাঁদের কবিতা শেখায়-- অস্তিত্বের অন্ধকারেও এক ধরনের নান্দনিক আলো থাকে, যা ব্যক্তিকে তার নিজস্ব সত্তার দিকে ফিরে যেতে প্রাণিত করে এবং এ আলোই কবিতার প্রকৃত শক্তি, যা সময় ও স্থানকে অতিক্রম করে মানুষের চিরন্তন বোধকে স্পর্শ করে।

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬
বোধ ব্যক্তিকে নান্দনিক চর্চায় নিমজ্জিত করে এবং পরিপার্শ^ ও সুশিক্ষা সেটাকে পরিপূর্ণ করে তোলে। কবিতা বোধের সূক্ষ¥তম প্রকাশ-- কখনো কখনো কবিতা হয়ে উঠে বোধের প্রতিরূপ কিংবা মানবচেতনার গভীরতম স্তরে বোধের অনুরণন ব্যক্তিকে শৈল্পিকচেতনায় জারিত করে। ব্যক্তি যখন তার অস্তিত্বের সংকট, সময়ের ভাঙন এবং আত্মসন্ধানের প্রশ্নে নিমজ্জিত হয়, তখন কবিতা হয়ে ওঠে সেই বোধের ভাষা। বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য কবি জীবনানন্দ দাশ এবং পাশ্চাত্য আধুনিকতাবাদের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর কবি টিএস এলিয়ট-- উভয়ের কবিতায় এ বোধিদীপ্ততার এক গভীর সাযুজ্য লক্ষ্য করা যায়। ভিন্ন ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও তাঁদের কবিতায় সময়চেতনা, নিঃসঙ্গতা এবং আধুনিকতার সংকট এক আন্তঃসম্পর্ক গড়ে তোলে।
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) ও টিএস এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫) বিশ শতকের অগ্রগণ্য কবি। তাঁদের শিল্পবোধ ও নান্দনিক চর্চা শিল্পকে করে তুলেছে শৈল্পিক ও বহুমাত্রিক। জীবনানন্দ দাশ কবিতার বোধকে এনেছেন নান্দনিত চিত্রায়ণে এবং টিএস এলিয়ট এলিয়ট এনেছেন শিল্পের অনুষঙ্গ হিসেবে। তুলনায় কিংবা সাদৃশ্যে-বৈসাদৃশ্যে এ দুই কবির বোধের যে মাত্রা নির্মিত হয়েছে তা পাঠককে আদৃত করে। ত্রিশের দশক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মেষ। ত্রিশের দশকের কবিবৃন্দ রবীন্দ্রবলয়কে অতিক্রম করে যুগচেতনা ও যুগযন্ত্রণাকে লালন করে স্বতন্ত্র কাব্যভাষা ও কাব্যচরিত্র নির্মাণ করেছেন। তাঁরা সাহিত্যসাধনায় প্রযুক্ত করেছেন সংশয়ী মানবাত্মার আর্তি, হতাশা, নেতিবাচকতা, অবক্ষয়। ত্রিশের দশকের অন্যতম কবি-- জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে প্রমুখ আধুনিক বাংলা কবিতার শরীরকে নতুন অনুধ্যায়ে নির্মাণ করেছেন। তাঁরা পঞ্চপাণ্ডব নামে পরিচিত এবং প্রত্যেকে স্বকীয় কাব্যভাবনা ও চিন্তার বহুরৈখিকতার স্থান থেকে স্বতন্ত্র। তবে জীবনানন্দ দাশ তাঁর চিন্তার-মৌলিকত্বের পথ ধরে হেঁটেছেন শেষ পর্যন্ত। তাঁর কাব্য চেতনায় জীবনবোধ ও মানব অস্তিত্বের বহুমুখী টানাপোড়েন তাঁকে প্রাতিস্বিক করেছে। “এক বিমূঢ় যুগের বিভ্রান্ত কবি জীবনানন্দ দাশ। পৌষের চন্দ্রালোকিত মধ্যরাত্রির প্রকৃতির মত তাঁর কাব্য কুহেলীকুহকে আচ্ছন্ন। আধুনিক কবিদের মধ্যে একমাত্র তাঁর কাব্যেই এ যুগের সংশয়ী মানবাত্মার ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত পরিচয়টি ফুটে উঠেছে।” (দ্বিপ্তি মিত্র, আধুনিক বাংলা কব্যে পরিচয়)। জীবনানন্দ দাশের ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ ও টিএস এলিয়টের ‘পোড়ো জমি’ (The Waste Land) জগন্নাথ চক্রবর্তী অনুবাদিত কাব্যে বোধিদ্রুমের সংযোগসূত্রানুসন্ধানের মাধ্যমে দ্বিখণ্ডিত মানব সত্তার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি কিংবা সংগ্রাম-সংরাগের চিত্রকে শৈল্পিক অভিঘাতে মূর্ত করা তোলা হয়েছে।
‘পোড়ো জমি’ কাব্যের প্রথম কবিতা ‘অন্ত্যেষ্টি’। খ্রিস্টান ধর্মালম্বীরা মৃতের পুনরুত্থানকে বিশ্বাস করে কিন্তু কবি এখানে হতাশ হয়েছেন বিশেষত, এপ্রিল মাস ইউরোপের সবচেয়ে প্রিয় মাস। যে এপ্রিল মাস ঊর্বরতার আগমনী বার্তা নিয়ে আসে সেখানেও কবি নিষ্ঠুরতা ও অপ্রাপ্তির হাতাশায় মগ্ন। সেখানে লাইলাক ছাড়া কিছুই জন্মায় না এবং কবির জীবনে গাণিতিক বিপ্রতীপ হয়ে জ¦লে উঠেছে আশাবাদের বাকপ্রতিমা। “এপ্রিল নিষ্ঠুর মাস, তখন জন্মায়/ লাইলাক মরা মাঠে, একসাথে মেশে/ স্মৃতি ও বাসনারাজি, নড়ে উঠে/ নির্জীব বৃক্ষের মূল বসন্তবর্ষণে।” জীবনানন্দ দাশ পড়ো জমির চিত্রকল্পে বর্তমান বন্ধ্যা যুগকে চিত্রায়িত করেছেন। হেমন্তের রিক্ত, অনুর্বর রূপ যেন যাপিত জীবনের নিহিত সংকট কিংবা অপ্রাপ্তির নিকেশ এবং তাঁর কবিতার শরীরী মুদ্রা তাঁর কাব্য প্রকরণকে করেছে ধ্রুপদ। তিনি চেতনার স্পন্দনে অবক্ষয়িত মানবাত্মার আত্মিক নির্বাসনের চিত্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দৃশ্যকল্পে ব্রাকেটবন্দী করেছেন। ‘‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে/অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের খেতে;/ মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার-- চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,/ তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান,/ দেহের স্বাদে কথা কয়;/ বিকেলের আলো এসে (হয়তো বা) নষ্ট করে দেবে তার সাধের সময়।” (অবসরের গান)। কার্তিকের রোদে ধান পেকেছে, সে মুহূূর্তের অবিসংবাদিত সৌন্দর্যের বর্ণনা কবিতার চরণে প্রতিফলিত। দিনের শেষ সূর্য এসে এ মুহূর্তের প্রশান্তিকে নষ্ট করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। কিন্তু এ কবিতা ব্যক্তিবোধে এ ভিন্নার্থক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। যা ব্যক্তির বোধিদ্রুমে সৃষ্টি করে এক সংবেদনশীল আবেদন। রোদে ব্যক্তিত্ব আরোপ গ্রামীণ মাহাত্ম্যকে বর্ণনা করে আকস্মিক-বিপরীতে ‘অলস গেঁয়োর মতো’ এবং ‘শুয়েছে মাথা পেতে’, ‘মাঠের ঘাসের গন্ধ’, ‘চোখে তার শিশিরে ঘ্রাণ’, ‘অবসাদে পেকে ওঠে’, ‘দেহের স্বাদের কথা কয়’-- অবশেষে সূর্যের অদ্ব্যর্থপ্রতিম ভোরের আলোর পাশেই অন্য কোনো স্বভাবের ‘বিকেলের আলো’। প্রকৃতির সাদৃশ্যে ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনের অভিক্ষেপ শব্দের ব্যঞ্জনায় যেন জেগে ওঠে তারই আকল্প ধ্বনি। টিএস এলিয়টে কাব্যশরীর কখনো প্রেম কখনো অপ্রেমের সংশয় ক্ষত বিক্ষত। তাঁর ব্যক্তির আত্মিক মৃত্যুর ভয়াবহতা প্রবাহমান। যে মৃত্যু একটি যুগের বন্ধ্যত্বকে ইঙ্গিত করে। “জলদি করুন হয়েছে সময়/ ভালো যদি নাও লাগে, তবুও চালিয়ে যেতে পারো/ বললাম আমি,/ তুমি না পারলে জেনো অন্য কেউ বেছে নেবে/ তোমার কি লজ্জা নেই, আমি বলি, এমন বুড়িয়ে গেছ তুমি।” বিশ শতক ভাঙনের শতক-- যুদ্ধ, নগরায়ন, যান্ত্রিকতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় মানুষের মনে এক গভীর শূন্যতার জন্ম দেয় এবং এ প্রেক্ষাপটে এলিয়টের The Waste Land যেমন সভ্যতার অবক্ষয়ের প্রতীক, তেমনি জীবনানন্দের কবিতায়ও ‘অন্ধকার’, ‘নিঃসঙ্গতা’ ও ‘অবসাদ’-এর চিত্রকল্প যুগ যন্ত্রণার সংকট হয়ে উঠে আসে। এলিয়ট আধুনিক মানুষকে এক বিচ্ছিন্ন, ভগ্ন আত্মা হিসেবে উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে জীবনানন্দের কবিতায় এ বিচ্ছিন্নতা অধিকতর অন্তর্মুখী-- তিনি প্রকৃতির ভেতরে আশ্রয় খুঁজে নেন, কিন্তু সেই আশ্রয়ও চূড়ান্ত নয়; বরং তা এক অনির্দিষ্ট অনুসন্ধানের পথ। সময়! সময় বলতে বোঝানো হয়েছে, ঐতিহাসিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক সম্পর্ক, মানুষের যন্ত্রণা, স্বপ্ন ও সংগ্রামকে। অর্থ্যাৎ একটি নির্দিষ্ট সময়ে মানুষের জীবনে যে সংকট, সম্ভাবনা ও পরিবর্তন ঘটে, সেটি সময়ের অর্থ কিংবা বিনির্মাণ। শিল্প মূলত ব্যক্তির সৃজনশীল প্রতিক্রিয়া। কবিতা, গল্প, গান, চিত্রকলাসহ সবই শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। তবে শিল্প কখনো শূন্যে জন্ম নেয় না; বরং এটি সময়ের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠে। এটি বাস্তবতার অনুকরণ নয়; বরং বাস্তবতার রূপান্তর। দুই কবির কবিতায় সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও শৈল্পিক উপাদান। টি এস এলিয়টের কবিতায় সময় ভাঙা, চক্রাকার এবং প্রায়শই অস্থির; অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। ‘আর কালের ক্ষয়িত মুড়া হতশ্রী স্বভাবে / পড়ে আছে দেয়ালের গায়ে; আকৃতিরা পলকবিহীন।’ অন্যদিকে জীবনানন্দ দাশ সময়কে দেখেছেন এক ধরনের স্মৃতির ভিতর দিয়ে-- তার ‘রূপসী বাংলা’ কিংবা ‘বনলতা সেন’-এ অতীতের প্রতি এক নস্টালজিক টান রয়েছে। তবে এ নস্টালজিয়া নিছক রোমান্টিক নয়; বরং এটি বর্তমানের শূন্যতা থেকে মুক্তির একটি নান্দনিক প্রয়াস। টি এস এলিয়টের নগর-- বিশেষত লন্ডন-- একটি মৃত, যান্ত্রিক ও আত্মাহীন শহর এবং মানুষ সেখানে চলমান, কিন্তু জীবন্ত নয়। ‘এ পৃথিবী বিস্মরণপ্রবণ তুষারে, মুখে দিয়ে/ শুকনো কন্দের সঙ্গে সামান্য জীবন।’ জীবনানন্দের শহরও কম নিঃসঙ্গ নয়; তবে তার কবিতায় গ্রাম ও প্রকৃতির বিপরীতে শহর একটি বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হয়ে ওঠে এবং এ দুই কবির নগরচিত্রে এক ধরনের অস্তিত্ববাদী সংকটের প্রতিফলন দেখা যায়, যেখানে মানুষ নিজেকেই হারিয়ে ফেলে। “প্রথম ফসল ঘরে/ হেমন্তের মাঠে-মাঠে ঝরে/ বাঁশ পাতা মার ঘাসÑ আকাশের তারা/ বরফের মত চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা।” টি এস এলিয়টের কবিতায় প্রতীকবাদ ও ইঙ্গিতময়তা প্রবল; বিভিন্ন পুরাণ, ধর্মীয় আখ্যান এবং পাশ্চাত্য সাহিত্য থেকে উদ্ধৃতি এনে তিনি একটি জটিল অর্থস্তর নির্মাণ করেন। জীবনানন্দের কবিতাও প্রতীকসমৃদ্ধ, তবে তা অনেক বেশি সংবেদনশীল ও চিত্রধর্মী। তার কবিতায় ‘পাখি’, ‘নদী’, ‘অরণ্য’, ‘অন্ধকার’-- এসব প্রতীক মানুষের অন্তর্জগতের প্রতিফলন। দুই কবির ভাষা পৃথক হলেও তাদের উদ্দেশ্য একÑ মানবজীবনের গভীরতম সত্যকে প্রকাশ করা-- বোধিদীপ্ততার সংযোগ: জীবনানন্দ দাশ ও টি এস এলিয়ট উভয়ের কবিতায় যে বোধিদীপ্ততা লক্ষ্য করা যায়, তা মূলত তিনটি স্তরে সংযুক্ত--
১. অস্তিত্বের সংকট: উভয় কবিই আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা ও শূন্যতার কথা বলেছেন।
২. সময় ও স্মৃতির ভাঙন: অতীত ও বর্তমানের দ্বন্দ্ব তাদের কবিতায় এক জটিল বোধ তৈরি করে।
৩. নিঃসঙ্গতার নন্দন: নিঃসঙ্গতাকে তাঁরা কেবল দুঃখ হিসেবে নয়, বরং একটি শৈল্পিক অভীপ্সা হিসেবে দেখেছেন।
‘বোধিদ্রুম’ এখানে এমন এক রূপক, যা উভয় কবির চেতনাজগতকে যুক্ত করে। টি এস এলিয়ট যেখানে খ্রিস্টীয় আধ্যাত্মিকতা ও দার্শনিক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে মুক্তির পথ খোঁজেন, জীবনানন্দ সেখানে প্রকৃতি ও স্মৃতির ভেতর দিয়ে এক নীরব আত্মউপলব্ধির দিকে এগিয়ে যান। কিন্তু উভয়ের লক্ষ্য-- অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করে এক ধরনের জাগরণ বা অর্জন এবং এ সংযোগ তাঁদের কবিতাকে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যেও এক অভিন্ন বোধের ধারায় যুক্ত করে। জীবনানন্দ দাশ ও টি. এস. এলিয়ট-- দুই ভিন্ন জগতের কবি, কিন্তু তাঁদের কবিতায় আধুনিকতার সংকট, সময়ের ভাঙন এবং মানবিক নিঃসঙ্গতার যে বোধিদীপ্ততা প্রকাশ পেয়েছে, তা এক গভীর আন্তঃসম্পর্ক নির্মাণ করে।
তাঁদের কবিতা শেখায়-- অস্তিত্বের অন্ধকারেও এক ধরনের নান্দনিক আলো থাকে, যা ব্যক্তিকে তার নিজস্ব সত্তার দিকে ফিরে যেতে প্রাণিত করে এবং এ আলোই কবিতার প্রকৃত শক্তি, যা সময় ও স্থানকে অতিক্রম করে মানুষের চিরন্তন বোধকে স্পর্শ করে।

আপনার মতামত লিখুন