বেগবতীর জল
খায়রুল আলম সবুজ
বেগবতীর জলে চাঁদ ভাঙে না
একটু নড়ে উঠে দু’পাশে ছলকে পড়া— তাও নয়
আকাশে যেমন একা— ধ্রুব, স্থির
তেমনি এ জলে
স্বচ্ছ স্তব্ধ শান্ত নীর-বেগবতীর
উঁকি দিলে মুখ দেখা যায় আরশীতে যেমন
এ জলে এখন আর ভাঙে না চাঁদ
তোমাতেও একদিন অবিরাম
ভাঙতে দেখেছি চাঁদ
ঢেউয়ের মেলা ছিল অপূর্ব ফাঁদ
কারণে অকারণে কেবলই চাঁদ ভাঙার খেলা
তুমিও কি বেগবতী নদী এখন— ধ্রুব স্থির
উঁকি দিলে মুখ দেখা যায় সে জলে যেমন
তুমিও এখন সেই বেগবতী জল
ঢেউ নেই বেগ নেই জল আর জল
কখন হারায় আহা বেগবতী ঢেউ
কখন হারালে তুমি জানলো না কেউ
১১. ২. ২০০৪
হিমঘর
বিমল গুহ
(দার্শনিক-বন্ধু ড. প্রদীপ রায়ের মৃত্যুতে)
ভূকম্পনে ভেঙে পড়ে দূরের আকাশ সুখস্মৃতি
চোখের সম্মুখে; নিতি নিতি
মানুষও এভাবে রপ্ত করে নেয় ক্ষণিকের শোক
দেখে নেয় মুগ্ধচোখে নবীন আলোক|
প্রকৃতির এত শোভা দেখেছে মানুষ নিরন্তর—
জানি, এই শবদেহ ক্ষণকাল বুকে নেয় ব্যস্ত হিমঘর!
আবার জাগবে রোদ ভোরবেলা নবতর সাজে
দুই চোখে; আলো ঝলমল শোভা এনে দেবে নবীন সমাজে!
জানি— এই পৃথিবীতে ধ্রুবসত্য চন্দ্র-সূর্য-তারা
ধ্রুবসত্য মানুষের মোহ-মায়ারূপ, ধ্রুবসত্য মৃত্যুর ইশারা
জন্ম-আকাঙ্ক্ষা-রূপ-জ্ঞান! তবুও এ মৃত্যুই সুন্দর—
মৃত্যুতেই বস্তুর মৌল রূপান্তর|
কোথায় কী হলো আজ— তির্যক রোদ এসে পড়েছে ˆসকতে
আগুনের মতো দাউ দাউ, লেলিহান শিখা মাঝপথে
পুড়ছে আয়ুধ— আহা! পুড়ছে প্রকৃতি রূপ-মোহ
পুড়ছে জীবনবোধ, পুড়ছে মহাদর্শনের মহা সমারোহ!
শয্যা তো নিদ্রাতুর সুখ, দেহের অনন্ত পাটাতন
শয্যা মানে কাল-শোভা পূর্ণ স্বস্তি গভীর গোপন;
মৃত্যুর এ আকাঙ্ক্ষা কি মানুষের থাকে?
মানুষ তো চায় কালান্তর, চায় পৃথিবীকে স্বপ্নবাঁকে
ফিরে পেতে আরবার— নবীন ভুবন
মায়ারূপ মগ্ন মন|
মৃত্যু তো প্রকৃতির রূপ নবসৃষ্টির ভিত
নবজীবনের মহা-গান, পৃথিবীর সমবেত প্রার্থনাসংগীত|
জানি, এই মহারূপ মায়ার বন্ধন
বেঁচে-থাকা মানে অন্য আনন্দ যাপন
মহা কৌতূহল নিয়ে বিগব্যাং রহস্যের দ্বার খুঁজে ফেরা;
জন্ম ও মৃত্যুর পথ নিরন্তর খোঁজে মানুষেরা!
মনের জগৎ-কথা যতটা না বিজ্ঞানের ব্যবহৃত রীতি
তাহার অধিক কথা চিরকাল বলেছে দর্শন, বলেছে প্রকৃতি|
চেতনার এই স্তরে মহাবোধ লিখেছে লিখন
অসম্পূর্ণ চিরচেনা রূপ— যেন তা-ও সমাধানরহিত বর্ণন!
তবুও জীবন আছে; তবুও মৃত্যু অনন্তর
মহাশয্যা পেতে রাখে ক্ষণিকের তরে, চিরচেনা সেই হিমঘর|
পথ কিংবা যুদ্ধের গল্প
কাজলেন্দু দে
পর্যটনের অসমাপ্ত পথ ও সেতুর ওপারে
ছোটগল্প অথবা কবিতা
এখনো প্রতিক্ষারত মনে হয়|
সকালের দিবাকর অভয় মিত্রের ঘাটে পরপর
তিনবার ডুব দিয়ে টের পায়|
নদীজলে দ্রবীভূত টন টন ˆজব কার্বন|
আর, নারীদের চোখে পৃথিবীর প্রথম প্লাবন
আমাদের রক্তাক্ত প্যান্টের পকেটে আরব্য রজনীর গল্প
লাল কমল আর নীল কমলের মাঠে
হঠাৎ নৈঃশব্দ্য মুছে বর্ষণ নামলে
আন্তঃআনবিক টান ধনাত্মক হবে কি না জানার আশায়
বিলে ও হাওরে ঘুরি, গেরস্তি পুরানের ভরাক্ষেতে
বিষাদের রবিশস্য, ইটভাটা, কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া
এক হাতে মুদ্রাস্ফীতি, অন্য হাতে রেমিট্যান্স প্রবাহ
হ্রেষাধ্বনি, টোটেম-ট্যাবুর কাছে গাছেরা জেনেছে
জানে নদী, কাগজি লেবুর গন্ধ, বুদ্বুদ দুপুর
তারপরও টেরাকোটা দেহের মন্দিরে খুঁজি হারানেরা নূপুর|
রোবটের কাশি শুনে মুখ তোলে ইজেলে চড়ানো ক্যানভাস;
যুদ্ধশেষে আবার নতুন যুদ্ধ—
রক্ত-কান্না-ধ্বস-হাঁসফাস!
অভিলাষ
আদিত্য নজরুল
যখন তোমাকে খুব
দেখতে ইচ্ছে হয়, ধরো মরে যাই যাই লগে
অন্যসব কিছু বাদ দিয়ে
শুধু চোখ বন্ধ করে থাকি!
দুই চোখ বন্ধ হলে
তোমার সৌন্দর্য
ময়ুরের পাখনার মতোই পেখম মেলে ওঠে..
শেয়ালিপনা নিয়ে
বিবিধ রকমে, বিবিধ ছলায়
উঁকি ঝুঁকি দিয়ে তোমাকেই দেখি..
আমার কেবল মনে হয়
মৃতরা কাউকে
সারাজীবন দেখার লোভেই চোখ বন্ধ করে রাখে!
আমার সবচেয়ে বড় পাপ
মিরাজুল আলম
শূন্যকে পড়তে গেলে যে লেন্স লাগে
তোমাকে পড়ার জন্য তারও বেশি লেন্স লাগে|
তোমাকে পড়তে যাওয়া ছিল আমার সবচেয়ে বড় পাপ|
তোমাকে সাতার শিখাতে গিয়ে
নদীর স্তন ও নাভীমূলের দৃশ্য দেখেছিলাম,
এটা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় পাপ |
আমার বাড়ির ঠিকানা তোমাকে মুখস্থ করতে বলেছিলাম,
এটা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় পাপ|
তোমার মাথার ওপর থেকে রৌদ্রের গন্ধ মুছে
দেবার জন্য একটা ছাতা কিনতে যাওয়া ছিল
আমার সবচেয়ে বড় পাপ|
তোমার ঘাটে স্নান করতে গিয়ে
জীবনের সব পবিত্রতা নষ্ট করেছি
এটা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় পাপ|
তোমার পায়ের নিচে ঘাস হয়ে জন্মেছিলাম
এটা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় পাপ|

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬
বেগবতীর জল
খায়রুল আলম সবুজ
বেগবতীর জলে চাঁদ ভাঙে না
একটু নড়ে উঠে দু’পাশে ছলকে পড়া— তাও নয়
আকাশে যেমন একা— ধ্রুব, স্থির
তেমনি এ জলে
স্বচ্ছ স্তব্ধ শান্ত নীর-বেগবতীর
উঁকি দিলে মুখ দেখা যায় আরশীতে যেমন
এ জলে এখন আর ভাঙে না চাঁদ
তোমাতেও একদিন অবিরাম
ভাঙতে দেখেছি চাঁদ
ঢেউয়ের মেলা ছিল অপূর্ব ফাঁদ
কারণে অকারণে কেবলই চাঁদ ভাঙার খেলা
তুমিও কি বেগবতী নদী এখন— ধ্রুব স্থির
উঁকি দিলে মুখ দেখা যায় সে জলে যেমন
তুমিও এখন সেই বেগবতী জল
ঢেউ নেই বেগ নেই জল আর জল
কখন হারায় আহা বেগবতী ঢেউ
কখন হারালে তুমি জানলো না কেউ
১১. ২. ২০০৪
হিমঘর
বিমল গুহ
(দার্শনিক-বন্ধু ড. প্রদীপ রায়ের মৃত্যুতে)
ভূকম্পনে ভেঙে পড়ে দূরের আকাশ সুখস্মৃতি
চোখের সম্মুখে; নিতি নিতি
মানুষও এভাবে রপ্ত করে নেয় ক্ষণিকের শোক
দেখে নেয় মুগ্ধচোখে নবীন আলোক|
প্রকৃতির এত শোভা দেখেছে মানুষ নিরন্তর—
জানি, এই শবদেহ ক্ষণকাল বুকে নেয় ব্যস্ত হিমঘর!
আবার জাগবে রোদ ভোরবেলা নবতর সাজে
দুই চোখে; আলো ঝলমল শোভা এনে দেবে নবীন সমাজে!
জানি— এই পৃথিবীতে ধ্রুবসত্য চন্দ্র-সূর্য-তারা
ধ্রুবসত্য মানুষের মোহ-মায়ারূপ, ধ্রুবসত্য মৃত্যুর ইশারা
জন্ম-আকাঙ্ক্ষা-রূপ-জ্ঞান! তবুও এ মৃত্যুই সুন্দর—
মৃত্যুতেই বস্তুর মৌল রূপান্তর|
কোথায় কী হলো আজ— তির্যক রোদ এসে পড়েছে ˆসকতে
আগুনের মতো দাউ দাউ, লেলিহান শিখা মাঝপথে
পুড়ছে আয়ুধ— আহা! পুড়ছে প্রকৃতি রূপ-মোহ
পুড়ছে জীবনবোধ, পুড়ছে মহাদর্শনের মহা সমারোহ!
শয্যা তো নিদ্রাতুর সুখ, দেহের অনন্ত পাটাতন
শয্যা মানে কাল-শোভা পূর্ণ স্বস্তি গভীর গোপন;
মৃত্যুর এ আকাঙ্ক্ষা কি মানুষের থাকে?
মানুষ তো চায় কালান্তর, চায় পৃথিবীকে স্বপ্নবাঁকে
ফিরে পেতে আরবার— নবীন ভুবন
মায়ারূপ মগ্ন মন|
মৃত্যু তো প্রকৃতির রূপ নবসৃষ্টির ভিত
নবজীবনের মহা-গান, পৃথিবীর সমবেত প্রার্থনাসংগীত|
জানি, এই মহারূপ মায়ার বন্ধন
বেঁচে-থাকা মানে অন্য আনন্দ যাপন
মহা কৌতূহল নিয়ে বিগব্যাং রহস্যের দ্বার খুঁজে ফেরা;
জন্ম ও মৃত্যুর পথ নিরন্তর খোঁজে মানুষেরা!
মনের জগৎ-কথা যতটা না বিজ্ঞানের ব্যবহৃত রীতি
তাহার অধিক কথা চিরকাল বলেছে দর্শন, বলেছে প্রকৃতি|
চেতনার এই স্তরে মহাবোধ লিখেছে লিখন
অসম্পূর্ণ চিরচেনা রূপ— যেন তা-ও সমাধানরহিত বর্ণন!
তবুও জীবন আছে; তবুও মৃত্যু অনন্তর
মহাশয্যা পেতে রাখে ক্ষণিকের তরে, চিরচেনা সেই হিমঘর|
পথ কিংবা যুদ্ধের গল্প
কাজলেন্দু দে
পর্যটনের অসমাপ্ত পথ ও সেতুর ওপারে
ছোটগল্প অথবা কবিতা
এখনো প্রতিক্ষারত মনে হয়|
সকালের দিবাকর অভয় মিত্রের ঘাটে পরপর
তিনবার ডুব দিয়ে টের পায়|
নদীজলে দ্রবীভূত টন টন ˆজব কার্বন|
আর, নারীদের চোখে পৃথিবীর প্রথম প্লাবন
আমাদের রক্তাক্ত প্যান্টের পকেটে আরব্য রজনীর গল্প
লাল কমল আর নীল কমলের মাঠে
হঠাৎ নৈঃশব্দ্য মুছে বর্ষণ নামলে
আন্তঃআনবিক টান ধনাত্মক হবে কি না জানার আশায়
বিলে ও হাওরে ঘুরি, গেরস্তি পুরানের ভরাক্ষেতে
বিষাদের রবিশস্য, ইটভাটা, কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া
এক হাতে মুদ্রাস্ফীতি, অন্য হাতে রেমিট্যান্স প্রবাহ
হ্রেষাধ্বনি, টোটেম-ট্যাবুর কাছে গাছেরা জেনেছে
জানে নদী, কাগজি লেবুর গন্ধ, বুদ্বুদ দুপুর
তারপরও টেরাকোটা দেহের মন্দিরে খুঁজি হারানেরা নূপুর|
রোবটের কাশি শুনে মুখ তোলে ইজেলে চড়ানো ক্যানভাস;
যুদ্ধশেষে আবার নতুন যুদ্ধ—
রক্ত-কান্না-ধ্বস-হাঁসফাস!
অভিলাষ
আদিত্য নজরুল
যখন তোমাকে খুব
দেখতে ইচ্ছে হয়, ধরো মরে যাই যাই লগে
অন্যসব কিছু বাদ দিয়ে
শুধু চোখ বন্ধ করে থাকি!
দুই চোখ বন্ধ হলে
তোমার সৌন্দর্য
ময়ুরের পাখনার মতোই পেখম মেলে ওঠে..
শেয়ালিপনা নিয়ে
বিবিধ রকমে, বিবিধ ছলায়
উঁকি ঝুঁকি দিয়ে তোমাকেই দেখি..
আমার কেবল মনে হয়
মৃতরা কাউকে
সারাজীবন দেখার লোভেই চোখ বন্ধ করে রাখে!
আমার সবচেয়ে বড় পাপ
মিরাজুল আলম
শূন্যকে পড়তে গেলে যে লেন্স লাগে
তোমাকে পড়ার জন্য তারও বেশি লেন্স লাগে|
তোমাকে পড়তে যাওয়া ছিল আমার সবচেয়ে বড় পাপ|
তোমাকে সাতার শিখাতে গিয়ে
নদীর স্তন ও নাভীমূলের দৃশ্য দেখেছিলাম,
এটা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় পাপ |
আমার বাড়ির ঠিকানা তোমাকে মুখস্থ করতে বলেছিলাম,
এটা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় পাপ|
তোমার মাথার ওপর থেকে রৌদ্রের গন্ধ মুছে
দেবার জন্য একটা ছাতা কিনতে যাওয়া ছিল
আমার সবচেয়ে বড় পাপ|
তোমার ঘাটে স্নান করতে গিয়ে
জীবনের সব পবিত্রতা নষ্ট করেছি
এটা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় পাপ|
তোমার পায়ের নিচে ঘাস হয়ে জন্মেছিলাম
এটা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় পাপ|

আপনার মতামত লিখুন