(পূর্ব প্রকাশের পর)
ক্যাফে থরথনি নামটি শুনে আসছি বুয়েনোস আইরেসে আসার আগে থেকেই| কারণ কিছুটা এর ঐতিহ্য ও আভিজাত্য, আর কিছুটা লোরকার স্মৃতি| সকালের নাস্তা এখানে করব ভেবে তাড়াতাড়িই চলে আসলাম| সাথে ছিল তাগাদা— গাইডেড ট্যুরটি পাওয়ার, কারণ সারাদিন একটি মাত্র ট্যুর, সকাল ৯টা থেকে ১০টা| তবে এতটা ভিড় হবে আশা করিনি| একটা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম| বোঝা গেল এটি বেশ জনপ্রিয় এক ক্যাফে|
ভেতরে যাবার যখন ডাক পড়ল তখন ট্যুর শুরু হবার সময় হয়ে গেছে| জাকজমকের চেয়ে এর ঐতিহ্যই চোখে পড়ল বেশি| খুব একটা বড় নয়, কিন্তু খুব শৈল্পিকভাবে সাজানো এক ক্যাফে| ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সসম্মানে ধরে রাখা হয়েছে সবখানে— সিলিং, দেয়াল, আয়না, চেয়ার-টেবিল, পর্দা, এমনকি মেঝে পর্যন্ত| ক্যাফের চেয়ে একে মনে হচ্ছে এক আর্ট মিউজিয়ম— সবদিকে ছবি, পেইন্টিং ও ভাস্কর্য| বিখ্যাত যারা এখানে এসেছেন তাঁদের অনেকের ছবি আছে| লোরকার হোটেল ছিল একই সড়ক এভিনিদা দে মাইয়োর ওপর, উনি প্রায়ই চলে আসতেন এ ক্যাফেতে, কারণ এটি ছিল শিল্পী-সাহিত্যিকদের মিলন স্থল| দেখে খুব ভালো লাগল যে এখানকার দেয়ালে রাখা সবচেয়ে সুন্দর ও বড় ছবিটি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার| তার পাশেই রাখা আছে পাবলো নেরুদার ছবি, যিনি লোরকার হত্যায় হাহাকার করে উঠেছিলেন: ‘স্পেনের সেরা ফুল ঝরে গেল|’ লোরকা ও নেরুদা খুব ভালো বন্ধু ছিলেন, এখানেও পাশাপাশি— তাদের সাথে ছবি তুলতেই দেখি, কোট টাই হ্যাট পরা এক সুদর্শন যুবক এসে পরিচয় দিয়ে জানতে চাইল কারা কারা ট্যুরে যাবে| এ ক্যাফের সবদিকে আভিজাত্য, তার ছাপ ওয়েটারদের পোশাক পরিচ্ছেদেও| যুবকটির নাম গেবেরো নোয়াহ, এখানকার ট্যুর ম্যানেজার| গেবেরো আমাদের স্বাগত জানিয়ে শুরু করল, ‘বুয়েনোস আইরেসের প্রাচীনতম রেস্তোরাঁ হলো ১৬৭ বছরের পুরোনো এই ক্যাফে থরথনি| ১৮৫৮ সালে জাঁ থুয়ান নামের এক ফরাসি অভিবাসী এ রেস্তোরাঁ চালু করেন প্যারিসের বুলভার্দ দে হেলিয়েনস এর ক্যাফে থরথনি-র অনুকরণে, যা ছিল থরথনি পরিবারের এক প্রতিষ্ঠান| জাঁ থুয়ানের উদ্দেশ্য ছিল প্যারিসের বিশ্ববিখ্যাত ক্যাফের স্টাইল ও স্ট্যান্ডার্ডকে বুয়েনোস আইরেসে নিয়ে আসা| শত বৎসরের অধিক সময়ে এখানকার ক্যাফেটি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়, আর ১৮৯৩ সালে প্যারিসের আদি ক্যাফে থরথনি বন্ধ হয়ে যায়| আমাদের এখানে বড় ক্যাফে হলো ছাড়াও আরো কয়েকটি কক্ষ আছে| আমরা একে একে সবগুলিতে যাব|’
মিউজিয়ম দিয়ে শুরু করল জাঁ থুয়ান, তারপর চলল বর্ণনা, ‘এ ছোট মিউজিয়মে ক্যাফে থরথনির বিভিন্ন সময়ের ছবি আছে, সাথে আছে সে সময়ের শহরের বিশিষ্ট স্থাপনার ছবি| এটি শুধু এ ক্যাফের ইতিহাস নয়, এ শহরেরও ইতিহাস|’ এরপর জাঁ থুয়ান যোগ করল, ‘এ ক্যাফেতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এসেছেন, খেয়েছেন| তাঁর মধ্যে আছেন— আলবার্ট আইস্টাইন, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, পাবলো নেরুদা, ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা, কেটি পেরি, হিলারি ক্লিনটন, রবার্ট ডুবাল, হুয়ান কার্লোস| এ মিউজিয়ামে এঁদের অনেকের ছবি আছে, হাতে লেখা প্রশংসা বাণী আছে, তাঁদের দেয়া স্মরণিকা আছে|’ আমরা ঘুরে ঘুরে সে সব দেখলাম| পাশেই লাইব্রেরি, আছে বিভিন্ন লেখকের বইয়ের এক সংগ্রহ| গেলাম পেছনের এক গেম রুমে— বিলিয়ার্ড, ডোমিনোস ও ডাইস খেলার সুন্দর আয়োজন এখানে| জাঁ থুয়ান এরপর আমাদের নিয়ে গেল নিচের বেসমেন্টে| বলল, ‘সে সময়ের আর্জেন্টিনার বিশিষ্ট শিল্পী সাহিত্যিকরা এ ক্যাফের বেসমেন্টে ১৯২৬ সালে এক সমিতি গড়ে তোলেন, তা লা পেনিয়া দে থরথিনি নামে পরিচিত| এর সাথে যুক্ত ছিলেন হোর্হে লুইস বোর্হেস, আলফনসিনা স্টরনি, কার্লোস গার্ডেল এবং আরো অনেকে| এ সমিতি ১৯৪৩ পর্যন্ত সক্রিয় ছিল| এ বেসমেন্টে এখন নিয়মিত জ্যাজ ও ট্যাঙ্গো সঙ্গীতের অনুষ্ঠান হয়| মাঝে মধ্যে হয় কবিতা পাঠের আয়োজন|’ ওপরে উঠে কোনাতে চোখে পড়ল এদুয়ার মানের আঁকা এক চিত্র— সে থরথিনি| জাঁ থুয়ান বলল, ‘এটি প্যারিসের মূল ক্যাফে থরথিনি নিয়ে আঁকা| তবে এটি প্রিন্ট, মূল ছবি নয়| এর এক দুঃখজনক কাহিনি আছে| মূল ছবিটি ছিল বোস্টনের ইসাবেলা স্টুয়ার্ট গার্ডনার মিউজিয়ামে১| ১৮ মার্চ ১৯৯০ সালে সেখান থেকে পুলিশের ছদ্মবেশে এসে দুজন দুর্বৃত্ত রাতের দুজন গার্ডকে পরাস্ত করে ছবিটি নিয়ে পালিয়ে যায়| ছবিটি এরপর আর খুঁজে পাওয়া যায়নি|’ এক সুন্দর রেস্তোরাঁ দেখা শেষ হলো এক ছবি চুরির গল্প দিয়ে| যা হোক, ক্যাফে থরথনি দেখা ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা|
বুয়েনোস আইরেসে সবসময় মনে হয় একই রকম উঞ্চতা— সকাল, দুপর, রাত— প্রায়ই একই রকম| এখন নভেম্বরের মাঝামাঝি, এখানে গ্রীষ্মকাল, তারপরও তাপমাত্রা বেশ সহনীয়— ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস— রোদ ঝলমলে স্নিগ্ধ আবহাওয়া| এ ক’দিন ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে মেতে থাকায় নিসর্গের দিকে থাকানো হয়নি| ভাবলাম নিজেকে খুঁজে পেতে আজ প্রকৃতির মাঝে একটু আশ্রয় নিই|
এল পার্কে থ্রেস দে ফেবরেরো— উবারে এ নামটি দেয়ার পর ট্যাক্সি এসে থামল| তবে ড্রাইভার হোর্হে বলল যে এটি সরকারি নাম, পার্কটিকে তারা এ নামে ডাকে না| তাহলে এর কি আবার ডাকনাম আছে? সে বলল, সবাই একে বলে পেলেরমো পার্ক| আমি কারণ জিজ্ঞেস করতে বলল, এর এক ইতিহাস আছে| আর রক্ষা নেই, এই সবুজের মাঝেও ইতিহাস| আমি কিছু বলার আগেই হোর্হে ইতিহাসে চলে গেল, ‘আর্জেন্টিনার ডিক্টেটর হুয়ান মানুয়াল দে রোসাস ১৮৫২ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন সারমিয়েনথোর হাতে| এরপর শহরের এ এলাকায় হুয়ানের জমিতে পার্কটি করা হয়| সরকার এর নাম দেয় এল পার্কে থ্রেস দে ফেবরেরো, জানো তো থ্রেস দে ফেবরেরো মানে ৩ ফেব্রুয়ারি, এ দিনটিতে হুয়ানকে উৎখাত করা হয়েছিল| তাই সরকার একে স্মরণ করতে এ নাম দিয়েছে| তবে আমরা বলি লস বসকেস দে পেলেরমো, সংক্ষেপে পার্কে পেলেরমো| আরো কিছু মজার কাহিনি আছে, বলব|’ এর মধ্যে চলে আসলাম পার্কে, যাক বাঁচা গেল| বুয়েনোস আইরেসের সমৃদ্ধ স্থাপত্য ও ইতিহাসের মাঝে যে এত বিশাল, সুন্দর পার্কটি আছে, এতদিন তা দেখিনি| আজ ঘুরে ঘুরে সে শূন্যতা পূরণ করে নিলাম| তবে এ পার্কে যে এক চমক আমার জন্য অপেক্ষা করছে, তা কল্পনাও করিনি| এখন সে চমকটি দেখা যাক|
এল পার্কে থ্রেস দে ফেবরেরোর সবচেয়ে সুন্দর অংশটি হলো এর ১৪০০০ গোলাপের এক অনিন্দ্য সুন্দর বাগান— পাসেও দেল রোসেদাল, অর্থাৎ, গোলাপের পথ| এ বাগানে গোলাপের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে চলে এলাম এর এক অংশে— হার্দিন দে লস পয়েতাস, অর্থাৎ কবিদের বাগানে| এখানে শুধু আর্জেন্টিনার নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বহু ভাষার ২৭ জন কবি-শিল্পীর আবক্ষ মূর্তি বাগানের ফাঁকে ফাঁকে রাখা আছে| কী মহান এক উদ্যোগ! সাহিত্যিকদের যখন এখানে সম্মান করা হয়েছে, দেখি আমাদের প্রিয় কেউ আছেন কিনা| একে একে দেখতে থাকলাম| উইলিয়াম শেক্সপিয়র, দান্তে আলিগিয়েরি, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, হোর্হে লুইস বোর্হেস... এ রকম অনেকে আসলেন| আকাশে যেন রবির উদয় হলো, দেখি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর... একটু পরে দেখি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা... এলেন আরো অনেকে| কী এক গভীর আনন্দে গর্বে মনটা ভরে গেল! পৃথিবীর আর কোথাও কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে এ রকম কেনো বাগান আছে কিনা জানি না|
সবাই বলছিল বুয়েনোস আইরেস হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার প্যারিস| আজ মনে হলো শহরটি দক্ষিণ আমেরিকার মিলান| এর কারণ গ্যালেরিয়া প্যাসিফিকো| ঢুকেই মনে হলো মিলানের সেই বিখ্যাত গ্যালেরিয়া-ই সামনে দাঁড়িয়ে আছে| দুটি স্থাপনায় এত মিল! ওপরে সেই গম্বুজ, তার সিলিংয়ে ফ্রেসকোর অনন্য সব শিল্প-কর্ম| একে শপিং মল না বলে আর্ট গ্যালারিই বলা উচিত| অনেকক্ষণ দেখলাম এর পুরো ম্যুরাল| পৃথিবীর নাম করা সব ব্র্যান্ডের পণ্য দেখে মনে পড়ল নিউ ইয়র্কের ফিফথ এ্যাভিনিউয়ের কথা| ঘুরে ঘুরে শুধু দেখলাম, কিছু কেনা হলো না|
এরপর চললাম শহরের এক ঐতিহাসিক বাজার মেরকাদো দে সান থেলমো দেখতে, আর কিছু স্মরণিকা কিনতে| ইউরোপ থেকে আসা অভিবাসীদের প্রয়োজনে ১৮৯৭ সালে এ বাজারটি চালু করা হয়| ইতালীয় স্থাপত্যের সম্মুখভাগ, সাথে লোহার থাম ও কড়িকাঠের কাঠামো এর ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়| এটি মূলত এক অভ্যন্তরীণ বাজার| শুধু রোববার বাইরে বসে বিশাল এক পথ মেলা|
এবার ইতিহাসে একটু ফেরা যাক| ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে স্প্যানিশ কনকিসতাদরস২, অর্থাৎ, স্পেনীয় বিজেতারা, লা প্লাতা নদীর তীরে বর্তমানের সান থেলমো এলাকায় বুয়েনোস আইরেস শহরের প্রতিষ্ঠা করে| শহর সম্প্রসারণের সাথে সাথে এলাকাটি জাহাজ কর্মী ও শ্রমিকদের আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে| তবে ১৯ শতাব্দীতে শহরের অভিজাতরা এ এলাকায় আসতে শুরু করে, আর নির্মাণ করতে থাকে বেশ সুন্দর ও বড় কলোনিয়াল বাড়িঘর| ধীরে ধীরে সান থেলমো পরিণত হয় এক অভিজাত এলাকায়| তবে হঠাৎ করে এ অবস্থার পরিবর্তন হয় ১৮৭১ সালে, যখন সে বছর সান থেলমো এলাকায় পীতজ্বর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে— এতে সে বছরই ১০,০০০ জনের মৃত্যু ঘটে| ফলে অভিজাতরা এ এলাকা ছেড়ে নদী থেকে দূরে অন্য এলাকায় চলে যায়| কারণ পীতজ্বরের প্রধান উৎস জল থেকে আসা এডিস মশা| অভিজাতদের ছেড়ে যাওয়া বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করে ইউরোপ থেকে আসা অভিবাসীরা| ১৯৯২ সালে নগর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়া শুরু করলে চিত্রকর, কারুশিল্পী ও পেশাজীবীরা এ এলাকায় আসতে শুরু করে| ধীরে ধীরে এটি বুটিক শিল্প, কারুপণ্য ও পর্যটনের এক বড় কেন্দ্র হয়ে ওঠে|
সান থেলমোর বিশাল বাজারে ঢুকে দেখি রকমারি পণ্যের সমাহার| চোখে পড়ে হস্তশিল্প ও কারুশিল্পের এক বিচিত্র সংগ্রহ| আর আছে সারি সারি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ— বিভিন্ন দেশের বিচিত্র খাবারের আয়োজন| এটি পর্যটকদের এক বড় আকর্ষণ| এর সবদিকে এক প্রাণ চঞ্চল পরিবেশ| এক ক্যাফেতে খেলাম আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু চোরিপান স্যান্ডউইচ ও আঁখের রস| পাশের কারুপণ্যের দোকান থেকে সাজসজ্জার কয়েকটি ক্যানভাস কিনলাম| কিছু সুন্দর সময় কাটিয়ে বের হয়ে আসলাম ঐতিহ্যবাহী সান থেলমো থেকে|
এরপর পৌঁছলাম লা বোকা এলাকায় ম্যারাডোনার জগতে| সেই ছাত্রবেলা থেকে এ ফুটবল প্রতিভার খেলা দেখে তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছি| স্বপ্ন ছিল তাঁর প্রিয় বোকা জুনিয়রস ফুটবল টিমের স্টেডিয়াম দেখব| আজ আসলাম সেই স্বপ্নের স্টেডিয়ামে, কিন্তু প্রিয় খেলোয়াড়টি চলে গেছেন পরপারে| আসলাম তাঁর প্রিয় স্টেডিয়াম লা বমবনেরা দেখতে, আর দেখতে প্রিয় দল বোকা জুনিয়রের জার্সি— নীল হলুদ রঙের খেলা— নীল রঙের জার্সির বুকের কাছে হলুদের স্ট্রাইপ| আশে পাশে সবদিকে দেখি নীল হলুদ— আছুল ই অরো| এ রঙের উৎপত্তি নিয়ে এক কাহিনি শুনলাম| পাশেই বন্দর লা রোকা— এখানে ১৯০৬ সালে এক সুইডিস জাহাজ আসে যার পতাকা ছিল নীল, তার ওপর ছিল হলুদের স্ট্রাইপ| সে রঙ থেকেই এ ক্লাবের রঙ বেছে নেয়া হয় নীল-হলুদ| আজ প্রথম মনে হলো ল্যাটিন আমেরিকার কোনো দেশে আছি| এতদিন মনে হতো ইউরোপেই ঘুরছি| কিছুক্ষণ লা বমবনেরা স্টেডিয়ামে ঘোরাঘুরি করে চললাম পাশের আরেক হোলি উৎসবে|
কামিনিতো— এখানে এসে দেখলাম এটি শুধু রঙের নয়, গানেরও জগত| মনে পড়ে গেল ১৯২৬ সালে রচিত ট্যাঙ্গো গান কামিনিতো, যা লোরকাকে শুনিয়েছিলেন ট্যাঙ্গো গানের কিংবদন্তি শিল্পী কার্লোস গারদেল| সেদিন এ গানটির এক সিডি কিনলাম| কামিনিতো শব্দটির অর্থ পায়ে-চলা পথ| কামিনিতো সত্যিই পায়ে হেঁটে চলার এলাকা— এক স্ট্রিট মিউজিয়ম— ১৫০ মিটারের ছোট গলি, দু’পাশে রঙিন সব ঘরবাড়ি, যাদের বলা হয় কনভেনথিয়ুস| ইতালির জেনোয়া থেকে আসা অভিবাসীরা তৈরি করেছিল বাড়িগুলি— কাঠ ও শিট মেটালের সস্তা বাড়ি| পাশেই লা রোকা বন্দর| সেখানে জাহাজের পরিত্যক্ত রঙ নিয়ে এসে এখানকার মানুষ তাদের ঘরবাড়ি রঙিন করে ফেলে| তার সাথে এক শিল্পীর হাতের ছোঁয়া লেগে তা হয়ে ওঠে শৈল্পিক| ১৯৫০ সালের দিকে স্থানীয় শিল্পী বেনিতো কিনকোয়েলা মার্থিন এসব জরাজীর্ণ বাড়িগুলির দেয়ালকে তাঁর ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করেন— পুরো এলাকার ঘরবাড়ি তাঁর ব্রাশে-রঙে হয়ে যায় রঙিন, প্রাণবন্ত, শৈল্পিক| এর মর্ম তুলে ধরছে কবিগুরুর এক বাণী ‘রঙ যেন মোর মর্মে লাগে, আমার সকল কর্মে লাগে’|
এখানকার জগত যে শুধু রঙের নয়, গানেরও, তাই রাস্তায় রাস্তায় চলছে ট্যাঙ্গো গান, ট্যাঙ্গো নাচ| আর্জেন্টিনার সংস্কৃতির সাথে ট্যাঙ্গো এমনভাবে মিশে আছে, তা না দেখলে এ দেশ দেখা অসম্পূর্ণ থাকতো| আর এখন আছি ট্যাঙ্গোর জন্মস্থান লা রোকা এলাকায়| আবার একটু ফিরে যেতে হয় ভূগোল ও ইতিহাসে|
এখানকার প্রধান নদী রিও দে লা প্লাথা— যা বয়ে গেছে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের মাঝে| এর দু’পারের দু’টি শহর— আর্জেন্টিনার বুয়েনোস আইরেস ও উরুগুয়ের মন্টেভিডিও— দু’পাশেই ট্যাঙ্গোর বিকাশ| বুয়েনোস আইরেস বন্দরের পাশের এই এল বোকা এলাকাটি উনিশ শতকের শেষ দিকে অভিবাসী ও শ্রমজীবী মানুষের জনপদ হয়ে ওঠে| পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে আসার সময় তারা সাথে নিয়ে আসে তাদের সংস্কৃতি| এভাবে জন্ম নেয় ট্যাঙ্গো— আফ্রিকার কেনদমবে, কিউবার আবানেরা ও আর্জেন্টিনার মিলনগা— এদের সংস্কৃতির মিলিত রূপ|
ট্যাঙ্গোর জন্মস্থানে ট্যাঙ্গো দেখার চেয়ে আনন্দের ব্যাপার আর কী হতে পারে! তাই কাছের এক ট্যাঙ্গো শো দেখার স্টুডিও এস্তাসিঁও কামিনেতো কাফেতে টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম| এখানে ডিনারও খাওয়া হবে| শো শুরু হতে আরো আধা ঘণ্টা বাকি| এর মধ্যে স্পেনীয় পানীয় টাকিলা ও স্ন্যাক তাপাস পরিবেশন করা হলো| যথাসময়ে শুরু হলো ট্যাঙ্গো নাচ-গান| জোড়ায় জোড়ায় নাচ, বেশ উদ্দাম, সাবলীল, প্রাণোচ্ছল| হাত-পা-নিতম্ব-চোখ-মাথা সবকিছুর কী নিখুঁত সমন্বয়, কী শৈল্পিক চালনা— মুগ্ধ হয়ে গেলাম| চারপাশের রঙ ও গান মনে করিয়ে দিল লোরকার একটি কবিতা:৩
তুমি চাও আকাশস্পর্শী বাগানে একটি গোলাপ ফুটে উঠুক|
চাকার ঘূর্ণনে চাও ইস্পাতের শব্দবিন্যাস|
ইম্প্রেশনিস্ট কুয়াশার চাদর সরিয়ে ফেলে পাহাড়ও নগ্ন অতঃপর|
শেষ রেলিং থেকে ঝুঁকে পড়ে এসব দেখছে নানা শেডের ধূসর|
আধুনিক শিল্পীর আধুনিক সাদা স্টুডিওতে
জীবাণুমুক্ত ফুল বর্গমূলের মাপে ক্লিপ দিয়ে সাঁটা|
সেন নদীতে এক মর্মর হিমবাহ থেকে শীতবাষ্প উঠে এলে
আইভিলতারা ঝরে পড়ে, জানালায় তুষার ঘনায়|
প্রস্তরসরণিতে জুতোর আওয়াজ কঠিন ও দৃঢ়, চলেছে মানুষ
প্রতিফলনের জাদু থেকে আড়াল খুঁজছে সব সন্ত্রস্ত স্ফটিক|
সরকারি সনদে সুগন্ধী বিপণিতে ঝাঁপ পড়ে গেছে
যন্ত্রগণক লাগাতার এক ও শূন্য জুড়ে সংখ্যা বানায়|
বনের হরিৎ নেই, আচ্ছাদন নেই, জ্যামুক্ত তীর নেই
পুরোনো বাড়ির ছাদে এইসব না থাকাগুলোই ইদানীং|
হাওয়া পালিশ করে সমুদ্র-প্রিজম আর দিকচক্রবাল
অতিকায় জলধারা উঠে এল সেখানে কোথাও|
Ref:
1. Chez Tortini: 10 x 13 inch, painting on canvas by Edouard Manet, was kept in the Boston’s Isabella Stewart Gardner Museum
২. কনকিসতাদরস: Conquistadors (Conquerors): বিজেতা
৩. Oda a Salvador Dali: অনুবাদ: স্বপন ভট্টাচার্য|

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬
(পূর্ব প্রকাশের পর)
ক্যাফে থরথনি নামটি শুনে আসছি বুয়েনোস আইরেসে আসার আগে থেকেই| কারণ কিছুটা এর ঐতিহ্য ও আভিজাত্য, আর কিছুটা লোরকার স্মৃতি| সকালের নাস্তা এখানে করব ভেবে তাড়াতাড়িই চলে আসলাম| সাথে ছিল তাগাদা— গাইডেড ট্যুরটি পাওয়ার, কারণ সারাদিন একটি মাত্র ট্যুর, সকাল ৯টা থেকে ১০টা| তবে এতটা ভিড় হবে আশা করিনি| একটা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম| বোঝা গেল এটি বেশ জনপ্রিয় এক ক্যাফে|
ভেতরে যাবার যখন ডাক পড়ল তখন ট্যুর শুরু হবার সময় হয়ে গেছে| জাকজমকের চেয়ে এর ঐতিহ্যই চোখে পড়ল বেশি| খুব একটা বড় নয়, কিন্তু খুব শৈল্পিকভাবে সাজানো এক ক্যাফে| ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সসম্মানে ধরে রাখা হয়েছে সবখানে— সিলিং, দেয়াল, আয়না, চেয়ার-টেবিল, পর্দা, এমনকি মেঝে পর্যন্ত| ক্যাফের চেয়ে একে মনে হচ্ছে এক আর্ট মিউজিয়ম— সবদিকে ছবি, পেইন্টিং ও ভাস্কর্য| বিখ্যাত যারা এখানে এসেছেন তাঁদের অনেকের ছবি আছে| লোরকার হোটেল ছিল একই সড়ক এভিনিদা দে মাইয়োর ওপর, উনি প্রায়ই চলে আসতেন এ ক্যাফেতে, কারণ এটি ছিল শিল্পী-সাহিত্যিকদের মিলন স্থল| দেখে খুব ভালো লাগল যে এখানকার দেয়ালে রাখা সবচেয়ে সুন্দর ও বড় ছবিটি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার| তার পাশেই রাখা আছে পাবলো নেরুদার ছবি, যিনি লোরকার হত্যায় হাহাকার করে উঠেছিলেন: ‘স্পেনের সেরা ফুল ঝরে গেল|’ লোরকা ও নেরুদা খুব ভালো বন্ধু ছিলেন, এখানেও পাশাপাশি— তাদের সাথে ছবি তুলতেই দেখি, কোট টাই হ্যাট পরা এক সুদর্শন যুবক এসে পরিচয় দিয়ে জানতে চাইল কারা কারা ট্যুরে যাবে| এ ক্যাফের সবদিকে আভিজাত্য, তার ছাপ ওয়েটারদের পোশাক পরিচ্ছেদেও| যুবকটির নাম গেবেরো নোয়াহ, এখানকার ট্যুর ম্যানেজার| গেবেরো আমাদের স্বাগত জানিয়ে শুরু করল, ‘বুয়েনোস আইরেসের প্রাচীনতম রেস্তোরাঁ হলো ১৬৭ বছরের পুরোনো এই ক্যাফে থরথনি| ১৮৫৮ সালে জাঁ থুয়ান নামের এক ফরাসি অভিবাসী এ রেস্তোরাঁ চালু করেন প্যারিসের বুলভার্দ দে হেলিয়েনস এর ক্যাফে থরথনি-র অনুকরণে, যা ছিল থরথনি পরিবারের এক প্রতিষ্ঠান| জাঁ থুয়ানের উদ্দেশ্য ছিল প্যারিসের বিশ্ববিখ্যাত ক্যাফের স্টাইল ও স্ট্যান্ডার্ডকে বুয়েনোস আইরেসে নিয়ে আসা| শত বৎসরের অধিক সময়ে এখানকার ক্যাফেটি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়, আর ১৮৯৩ সালে প্যারিসের আদি ক্যাফে থরথনি বন্ধ হয়ে যায়| আমাদের এখানে বড় ক্যাফে হলো ছাড়াও আরো কয়েকটি কক্ষ আছে| আমরা একে একে সবগুলিতে যাব|’
মিউজিয়ম দিয়ে শুরু করল জাঁ থুয়ান, তারপর চলল বর্ণনা, ‘এ ছোট মিউজিয়মে ক্যাফে থরথনির বিভিন্ন সময়ের ছবি আছে, সাথে আছে সে সময়ের শহরের বিশিষ্ট স্থাপনার ছবি| এটি শুধু এ ক্যাফের ইতিহাস নয়, এ শহরেরও ইতিহাস|’ এরপর জাঁ থুয়ান যোগ করল, ‘এ ক্যাফেতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এসেছেন, খেয়েছেন| তাঁর মধ্যে আছেন— আলবার্ট আইস্টাইন, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, পাবলো নেরুদা, ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা, কেটি পেরি, হিলারি ক্লিনটন, রবার্ট ডুবাল, হুয়ান কার্লোস| এ মিউজিয়ামে এঁদের অনেকের ছবি আছে, হাতে লেখা প্রশংসা বাণী আছে, তাঁদের দেয়া স্মরণিকা আছে|’ আমরা ঘুরে ঘুরে সে সব দেখলাম| পাশেই লাইব্রেরি, আছে বিভিন্ন লেখকের বইয়ের এক সংগ্রহ| গেলাম পেছনের এক গেম রুমে— বিলিয়ার্ড, ডোমিনোস ও ডাইস খেলার সুন্দর আয়োজন এখানে| জাঁ থুয়ান এরপর আমাদের নিয়ে গেল নিচের বেসমেন্টে| বলল, ‘সে সময়ের আর্জেন্টিনার বিশিষ্ট শিল্পী সাহিত্যিকরা এ ক্যাফের বেসমেন্টে ১৯২৬ সালে এক সমিতি গড়ে তোলেন, তা লা পেনিয়া দে থরথিনি নামে পরিচিত| এর সাথে যুক্ত ছিলেন হোর্হে লুইস বোর্হেস, আলফনসিনা স্টরনি, কার্লোস গার্ডেল এবং আরো অনেকে| এ সমিতি ১৯৪৩ পর্যন্ত সক্রিয় ছিল| এ বেসমেন্টে এখন নিয়মিত জ্যাজ ও ট্যাঙ্গো সঙ্গীতের অনুষ্ঠান হয়| মাঝে মধ্যে হয় কবিতা পাঠের আয়োজন|’ ওপরে উঠে কোনাতে চোখে পড়ল এদুয়ার মানের আঁকা এক চিত্র— সে থরথিনি| জাঁ থুয়ান বলল, ‘এটি প্যারিসের মূল ক্যাফে থরথিনি নিয়ে আঁকা| তবে এটি প্রিন্ট, মূল ছবি নয়| এর এক দুঃখজনক কাহিনি আছে| মূল ছবিটি ছিল বোস্টনের ইসাবেলা স্টুয়ার্ট গার্ডনার মিউজিয়ামে১| ১৮ মার্চ ১৯৯০ সালে সেখান থেকে পুলিশের ছদ্মবেশে এসে দুজন দুর্বৃত্ত রাতের দুজন গার্ডকে পরাস্ত করে ছবিটি নিয়ে পালিয়ে যায়| ছবিটি এরপর আর খুঁজে পাওয়া যায়নি|’ এক সুন্দর রেস্তোরাঁ দেখা শেষ হলো এক ছবি চুরির গল্প দিয়ে| যা হোক, ক্যাফে থরথনি দেখা ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা|
বুয়েনোস আইরেসে সবসময় মনে হয় একই রকম উঞ্চতা— সকাল, দুপর, রাত— প্রায়ই একই রকম| এখন নভেম্বরের মাঝামাঝি, এখানে গ্রীষ্মকাল, তারপরও তাপমাত্রা বেশ সহনীয়— ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস— রোদ ঝলমলে স্নিগ্ধ আবহাওয়া| এ ক’দিন ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে মেতে থাকায় নিসর্গের দিকে থাকানো হয়নি| ভাবলাম নিজেকে খুঁজে পেতে আজ প্রকৃতির মাঝে একটু আশ্রয় নিই|
এল পার্কে থ্রেস দে ফেবরেরো— উবারে এ নামটি দেয়ার পর ট্যাক্সি এসে থামল| তবে ড্রাইভার হোর্হে বলল যে এটি সরকারি নাম, পার্কটিকে তারা এ নামে ডাকে না| তাহলে এর কি আবার ডাকনাম আছে? সে বলল, সবাই একে বলে পেলেরমো পার্ক| আমি কারণ জিজ্ঞেস করতে বলল, এর এক ইতিহাস আছে| আর রক্ষা নেই, এই সবুজের মাঝেও ইতিহাস| আমি কিছু বলার আগেই হোর্হে ইতিহাসে চলে গেল, ‘আর্জেন্টিনার ডিক্টেটর হুয়ান মানুয়াল দে রোসাস ১৮৫২ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন সারমিয়েনথোর হাতে| এরপর শহরের এ এলাকায় হুয়ানের জমিতে পার্কটি করা হয়| সরকার এর নাম দেয় এল পার্কে থ্রেস দে ফেবরেরো, জানো তো থ্রেস দে ফেবরেরো মানে ৩ ফেব্রুয়ারি, এ দিনটিতে হুয়ানকে উৎখাত করা হয়েছিল| তাই সরকার একে স্মরণ করতে এ নাম দিয়েছে| তবে আমরা বলি লস বসকেস দে পেলেরমো, সংক্ষেপে পার্কে পেলেরমো| আরো কিছু মজার কাহিনি আছে, বলব|’ এর মধ্যে চলে আসলাম পার্কে, যাক বাঁচা গেল| বুয়েনোস আইরেসের সমৃদ্ধ স্থাপত্য ও ইতিহাসের মাঝে যে এত বিশাল, সুন্দর পার্কটি আছে, এতদিন তা দেখিনি| আজ ঘুরে ঘুরে সে শূন্যতা পূরণ করে নিলাম| তবে এ পার্কে যে এক চমক আমার জন্য অপেক্ষা করছে, তা কল্পনাও করিনি| এখন সে চমকটি দেখা যাক|
এল পার্কে থ্রেস দে ফেবরেরোর সবচেয়ে সুন্দর অংশটি হলো এর ১৪০০০ গোলাপের এক অনিন্দ্য সুন্দর বাগান— পাসেও দেল রোসেদাল, অর্থাৎ, গোলাপের পথ| এ বাগানে গোলাপের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে চলে এলাম এর এক অংশে— হার্দিন দে লস পয়েতাস, অর্থাৎ কবিদের বাগানে| এখানে শুধু আর্জেন্টিনার নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বহু ভাষার ২৭ জন কবি-শিল্পীর আবক্ষ মূর্তি বাগানের ফাঁকে ফাঁকে রাখা আছে| কী মহান এক উদ্যোগ! সাহিত্যিকদের যখন এখানে সম্মান করা হয়েছে, দেখি আমাদের প্রিয় কেউ আছেন কিনা| একে একে দেখতে থাকলাম| উইলিয়াম শেক্সপিয়র, দান্তে আলিগিয়েরি, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, হোর্হে লুইস বোর্হেস... এ রকম অনেকে আসলেন| আকাশে যেন রবির উদয় হলো, দেখি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর... একটু পরে দেখি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা... এলেন আরো অনেকে| কী এক গভীর আনন্দে গর্বে মনটা ভরে গেল! পৃথিবীর আর কোথাও কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে এ রকম কেনো বাগান আছে কিনা জানি না|
সবাই বলছিল বুয়েনোস আইরেস হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার প্যারিস| আজ মনে হলো শহরটি দক্ষিণ আমেরিকার মিলান| এর কারণ গ্যালেরিয়া প্যাসিফিকো| ঢুকেই মনে হলো মিলানের সেই বিখ্যাত গ্যালেরিয়া-ই সামনে দাঁড়িয়ে আছে| দুটি স্থাপনায় এত মিল! ওপরে সেই গম্বুজ, তার সিলিংয়ে ফ্রেসকোর অনন্য সব শিল্প-কর্ম| একে শপিং মল না বলে আর্ট গ্যালারিই বলা উচিত| অনেকক্ষণ দেখলাম এর পুরো ম্যুরাল| পৃথিবীর নাম করা সব ব্র্যান্ডের পণ্য দেখে মনে পড়ল নিউ ইয়র্কের ফিফথ এ্যাভিনিউয়ের কথা| ঘুরে ঘুরে শুধু দেখলাম, কিছু কেনা হলো না|
এরপর চললাম শহরের এক ঐতিহাসিক বাজার মেরকাদো দে সান থেলমো দেখতে, আর কিছু স্মরণিকা কিনতে| ইউরোপ থেকে আসা অভিবাসীদের প্রয়োজনে ১৮৯৭ সালে এ বাজারটি চালু করা হয়| ইতালীয় স্থাপত্যের সম্মুখভাগ, সাথে লোহার থাম ও কড়িকাঠের কাঠামো এর ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়| এটি মূলত এক অভ্যন্তরীণ বাজার| শুধু রোববার বাইরে বসে বিশাল এক পথ মেলা|
এবার ইতিহাসে একটু ফেরা যাক| ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে স্প্যানিশ কনকিসতাদরস২, অর্থাৎ, স্পেনীয় বিজেতারা, লা প্লাতা নদীর তীরে বর্তমানের সান থেলমো এলাকায় বুয়েনোস আইরেস শহরের প্রতিষ্ঠা করে| শহর সম্প্রসারণের সাথে সাথে এলাকাটি জাহাজ কর্মী ও শ্রমিকদের আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে| তবে ১৯ শতাব্দীতে শহরের অভিজাতরা এ এলাকায় আসতে শুরু করে, আর নির্মাণ করতে থাকে বেশ সুন্দর ও বড় কলোনিয়াল বাড়িঘর| ধীরে ধীরে সান থেলমো পরিণত হয় এক অভিজাত এলাকায়| তবে হঠাৎ করে এ অবস্থার পরিবর্তন হয় ১৮৭১ সালে, যখন সে বছর সান থেলমো এলাকায় পীতজ্বর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে— এতে সে বছরই ১০,০০০ জনের মৃত্যু ঘটে| ফলে অভিজাতরা এ এলাকা ছেড়ে নদী থেকে দূরে অন্য এলাকায় চলে যায়| কারণ পীতজ্বরের প্রধান উৎস জল থেকে আসা এডিস মশা| অভিজাতদের ছেড়ে যাওয়া বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করে ইউরোপ থেকে আসা অভিবাসীরা| ১৯৯২ সালে নগর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়া শুরু করলে চিত্রকর, কারুশিল্পী ও পেশাজীবীরা এ এলাকায় আসতে শুরু করে| ধীরে ধীরে এটি বুটিক শিল্প, কারুপণ্য ও পর্যটনের এক বড় কেন্দ্র হয়ে ওঠে|
সান থেলমোর বিশাল বাজারে ঢুকে দেখি রকমারি পণ্যের সমাহার| চোখে পড়ে হস্তশিল্প ও কারুশিল্পের এক বিচিত্র সংগ্রহ| আর আছে সারি সারি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ— বিভিন্ন দেশের বিচিত্র খাবারের আয়োজন| এটি পর্যটকদের এক বড় আকর্ষণ| এর সবদিকে এক প্রাণ চঞ্চল পরিবেশ| এক ক্যাফেতে খেলাম আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু চোরিপান স্যান্ডউইচ ও আঁখের রস| পাশের কারুপণ্যের দোকান থেকে সাজসজ্জার কয়েকটি ক্যানভাস কিনলাম| কিছু সুন্দর সময় কাটিয়ে বের হয়ে আসলাম ঐতিহ্যবাহী সান থেলমো থেকে|
এরপর পৌঁছলাম লা বোকা এলাকায় ম্যারাডোনার জগতে| সেই ছাত্রবেলা থেকে এ ফুটবল প্রতিভার খেলা দেখে তাঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছি| স্বপ্ন ছিল তাঁর প্রিয় বোকা জুনিয়রস ফুটবল টিমের স্টেডিয়াম দেখব| আজ আসলাম সেই স্বপ্নের স্টেডিয়ামে, কিন্তু প্রিয় খেলোয়াড়টি চলে গেছেন পরপারে| আসলাম তাঁর প্রিয় স্টেডিয়াম লা বমবনেরা দেখতে, আর দেখতে প্রিয় দল বোকা জুনিয়রের জার্সি— নীল হলুদ রঙের খেলা— নীল রঙের জার্সির বুকের কাছে হলুদের স্ট্রাইপ| আশে পাশে সবদিকে দেখি নীল হলুদ— আছুল ই অরো| এ রঙের উৎপত্তি নিয়ে এক কাহিনি শুনলাম| পাশেই বন্দর লা রোকা— এখানে ১৯০৬ সালে এক সুইডিস জাহাজ আসে যার পতাকা ছিল নীল, তার ওপর ছিল হলুদের স্ট্রাইপ| সে রঙ থেকেই এ ক্লাবের রঙ বেছে নেয়া হয় নীল-হলুদ| আজ প্রথম মনে হলো ল্যাটিন আমেরিকার কোনো দেশে আছি| এতদিন মনে হতো ইউরোপেই ঘুরছি| কিছুক্ষণ লা বমবনেরা স্টেডিয়ামে ঘোরাঘুরি করে চললাম পাশের আরেক হোলি উৎসবে|
কামিনিতো— এখানে এসে দেখলাম এটি শুধু রঙের নয়, গানেরও জগত| মনে পড়ে গেল ১৯২৬ সালে রচিত ট্যাঙ্গো গান কামিনিতো, যা লোরকাকে শুনিয়েছিলেন ট্যাঙ্গো গানের কিংবদন্তি শিল্পী কার্লোস গারদেল| সেদিন এ গানটির এক সিডি কিনলাম| কামিনিতো শব্দটির অর্থ পায়ে-চলা পথ| কামিনিতো সত্যিই পায়ে হেঁটে চলার এলাকা— এক স্ট্রিট মিউজিয়ম— ১৫০ মিটারের ছোট গলি, দু’পাশে রঙিন সব ঘরবাড়ি, যাদের বলা হয় কনভেনথিয়ুস| ইতালির জেনোয়া থেকে আসা অভিবাসীরা তৈরি করেছিল বাড়িগুলি— কাঠ ও শিট মেটালের সস্তা বাড়ি| পাশেই লা রোকা বন্দর| সেখানে জাহাজের পরিত্যক্ত রঙ নিয়ে এসে এখানকার মানুষ তাদের ঘরবাড়ি রঙিন করে ফেলে| তার সাথে এক শিল্পীর হাতের ছোঁয়া লেগে তা হয়ে ওঠে শৈল্পিক| ১৯৫০ সালের দিকে স্থানীয় শিল্পী বেনিতো কিনকোয়েলা মার্থিন এসব জরাজীর্ণ বাড়িগুলির দেয়ালকে তাঁর ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করেন— পুরো এলাকার ঘরবাড়ি তাঁর ব্রাশে-রঙে হয়ে যায় রঙিন, প্রাণবন্ত, শৈল্পিক| এর মর্ম তুলে ধরছে কবিগুরুর এক বাণী ‘রঙ যেন মোর মর্মে লাগে, আমার সকল কর্মে লাগে’|
এখানকার জগত যে শুধু রঙের নয়, গানেরও, তাই রাস্তায় রাস্তায় চলছে ট্যাঙ্গো গান, ট্যাঙ্গো নাচ| আর্জেন্টিনার সংস্কৃতির সাথে ট্যাঙ্গো এমনভাবে মিশে আছে, তা না দেখলে এ দেশ দেখা অসম্পূর্ণ থাকতো| আর এখন আছি ট্যাঙ্গোর জন্মস্থান লা রোকা এলাকায়| আবার একটু ফিরে যেতে হয় ভূগোল ও ইতিহাসে|
এখানকার প্রধান নদী রিও দে লা প্লাথা— যা বয়ে গেছে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের মাঝে| এর দু’পারের দু’টি শহর— আর্জেন্টিনার বুয়েনোস আইরেস ও উরুগুয়ের মন্টেভিডিও— দু’পাশেই ট্যাঙ্গোর বিকাশ| বুয়েনোস আইরেস বন্দরের পাশের এই এল বোকা এলাকাটি উনিশ শতকের শেষ দিকে অভিবাসী ও শ্রমজীবী মানুষের জনপদ হয়ে ওঠে| পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে আসার সময় তারা সাথে নিয়ে আসে তাদের সংস্কৃতি| এভাবে জন্ম নেয় ট্যাঙ্গো— আফ্রিকার কেনদমবে, কিউবার আবানেরা ও আর্জেন্টিনার মিলনগা— এদের সংস্কৃতির মিলিত রূপ|
ট্যাঙ্গোর জন্মস্থানে ট্যাঙ্গো দেখার চেয়ে আনন্দের ব্যাপার আর কী হতে পারে! তাই কাছের এক ট্যাঙ্গো শো দেখার স্টুডিও এস্তাসিঁও কামিনেতো কাফেতে টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম| এখানে ডিনারও খাওয়া হবে| শো শুরু হতে আরো আধা ঘণ্টা বাকি| এর মধ্যে স্পেনীয় পানীয় টাকিলা ও স্ন্যাক তাপাস পরিবেশন করা হলো| যথাসময়ে শুরু হলো ট্যাঙ্গো নাচ-গান| জোড়ায় জোড়ায় নাচ, বেশ উদ্দাম, সাবলীল, প্রাণোচ্ছল| হাত-পা-নিতম্ব-চোখ-মাথা সবকিছুর কী নিখুঁত সমন্বয়, কী শৈল্পিক চালনা— মুগ্ধ হয়ে গেলাম| চারপাশের রঙ ও গান মনে করিয়ে দিল লোরকার একটি কবিতা:৩
তুমি চাও আকাশস্পর্শী বাগানে একটি গোলাপ ফুটে উঠুক|
চাকার ঘূর্ণনে চাও ইস্পাতের শব্দবিন্যাস|
ইম্প্রেশনিস্ট কুয়াশার চাদর সরিয়ে ফেলে পাহাড়ও নগ্ন অতঃপর|
শেষ রেলিং থেকে ঝুঁকে পড়ে এসব দেখছে নানা শেডের ধূসর|
আধুনিক শিল্পীর আধুনিক সাদা স্টুডিওতে
জীবাণুমুক্ত ফুল বর্গমূলের মাপে ক্লিপ দিয়ে সাঁটা|
সেন নদীতে এক মর্মর হিমবাহ থেকে শীতবাষ্প উঠে এলে
আইভিলতারা ঝরে পড়ে, জানালায় তুষার ঘনায়|
প্রস্তরসরণিতে জুতোর আওয়াজ কঠিন ও দৃঢ়, চলেছে মানুষ
প্রতিফলনের জাদু থেকে আড়াল খুঁজছে সব সন্ত্রস্ত স্ফটিক|
সরকারি সনদে সুগন্ধী বিপণিতে ঝাঁপ পড়ে গেছে
যন্ত্রগণক লাগাতার এক ও শূন্য জুড়ে সংখ্যা বানায়|
বনের হরিৎ নেই, আচ্ছাদন নেই, জ্যামুক্ত তীর নেই
পুরোনো বাড়ির ছাদে এইসব না থাকাগুলোই ইদানীং|
হাওয়া পালিশ করে সমুদ্র-প্রিজম আর দিকচক্রবাল
অতিকায় জলধারা উঠে এল সেখানে কোথাও|
Ref:
1. Chez Tortini: 10 x 13 inch, painting on canvas by Edouard Manet, was kept in the Boston’s Isabella Stewart Gardner Museum
২. কনকিসতাদরস: Conquistadors (Conquerors): বিজেতা
৩. Oda a Salvador Dali: অনুবাদ: স্বপন ভট্টাচার্য|

আপনার মতামত লিখুন