সংবাদ

রুদাকির ২০টি রুবাই


অনুবাদ: কামাল রাহমান
অনুবাদ: কামাল রাহমান
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:২৫ এএম

রুদাকির ২০টি রুবাই
আবু আব্দাল্লাহ জাফর ইবনে মুহাম্মদ আল রুদাকি

আবু আব্দাল্লাহ জাফর ইবনে মুহাম্মদ আল রুদাকি (৮৫৮-৯৪১ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন একজন পারস্য-দেশীয় কবি| রুদাকি নামে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন তিনি| তাঁকে ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম বিশেষজ্ঞ কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়| আধুনিক ফার্সি কবিতার জনক বলেও সম্বোধন করা হয় তাঁকে| 

রুদাকি প্রথম আধুনিক ফারসি বর্ণমালায় কবিতা রচনা করেছিলেন এবং একারণেই শাস্ত্রীয় ফারসি সাহিত্যের জনক বলা হয়| তার কবিতায় কোয়ারেনসহ পার্সিয়ান কবিতার প্রাচীনতম ঘরানার অনেকগুলি উপস্থিত রয়েছে| তার কাব্য সম্ভারের খুব অল্প অংশই এখন পাওয়া যায়| তবে ধারণা করা হয়, নবম শতাব্দিতে রুদাকির মধ্যে কবিতা, গান, আবৃত্তি এবং কবি লেখক সত্তার যে সংমিশ্রণ ঘটেছিলো সেটা তার পূর্বে আর কারো মধ্যে এভাবে পাওয়া যায়নি| রাজসভায় তাই তিনি ছিলেন বিশেষ মর্যাদার অধিকারী|

রুবাই ১

জীবনের জন্য যা অতিক্রম করছ তুমি তাতে খুব বেশি জড়িয়ে পড়ো না,

পৃথিবীর এক হেলাখেলা মাত্র এটা, কোনো ছলনায় এখানে পড়ে যেও না|

কোনো দুর্বিপাক এলে তোমাকেই শক্ত করে বাঁধতে হয় তোমার কোমরকষি

দয়া, যা দেখানো হয়, তা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ভাবনা নয়: নীরব নির্মাণ এটা|

রুবাই ২

বিরহের এমন দুঃখদহনে যদিও রক্তাক্ত হয় হৃদয়, আমার এ আনন্দ-উল্লাস

তবু বিষাদের চেয়ে অনেক বেশি কিছু: ‘আগামীকাল’ বিরহের এক প্রতিভাস; 

ভাবি প্রতি পল, কল্পনা করি আমি, অবাক হই কেমন হতে পারে: মিলনমুহূর্ত, 

যদি হয় ওটার মতো এ বিরহের ‘এখন’, তবে তা কেবলই এক হতাশ্বাস!

রুবাই ৩

কোনো কান নেই এটার, শুনতে পায় না, তবে কথা বলে; পঙ্গু এটা, 

কিন্তু হাঁটে; বোবা, কিন্তু বাকপটু; চোখ ছাড়াই দেখে সে এ পৃথিবীটা|

নড়েচড়ে সে এক সরীসৃপের মতো, ধারালো তরবারির মতো কালো 

এক মুখ আছে এটার; বাঁকে, যাপন করে এক প্রেমিক-শরীর এটা|

রুবাই ৪

যা কিছু আছে তোমার, সন্তুষ্ট থেকো সেসব নিয়ে, বেঁচে থেকো তোমার স্বাধীনতায়:

বেঁধে ফেলো না নিজেকে কোনো আনুষ্ঠানিকতায়... বাঁচো তোমার স্বাধীনতায়!

নিজেকে বিষাদিত কোরো না কখনো... অন্যজনের কোনো ভালো থাকা দেখে:

সৌভাগ্যের জন্য চেষ্টা করার অনেক পথ রয়েছে তোমার, বাঁচো, অবাধ স্বাধীনতায়!

রুবাই ৫

এ পৃথিবীর কোনো সূর্য জ্বলে থাকে না তোমার মুখের চেয়েও বেশি উজ্জ্বলতা নিয়ে!

এ পৃথিবীর কোনো আলোই সুচারু নয় তোমার মুখের চেয়েও বেশি উজ্জ্বলাভা পেয়ে!

আমার মতো বিলীন হয়ে যেতে দিও না অন্য কাউকে, যেমন এখন আছি আমি...

এমনকি, তোমার চিহ্ন খুঁজে কোনো একটা মুখও যেন আর না যেতে পারে হারিয়ে!

রুবাই ৬

মনে হয় না যে কখনো ক্লান্ত হয় তোমার এ হৃদয় অমন নিদারুণ নিষ্ঠুরতা হতে,

এবং চোখ দুটো ভরে ওঠে না অশ্রুতে তোমার যখন তাকাও আমার দিকে:

তোমার জুরি হতে পারে এমন কেউ নেই শত সহস্র শত্রুর মাঝেও, তবুও...

এটা এক পরিতৃপ্তি নিশ্চয় যে আত্মার চেয়েও বেশি ভালোবাসি আমি তোমাকে!

রুবাই ৭

তুমি... যে হরণ করেছে বাগানের সব গোলাপের সুগন্ধি ও রং... এবং

ওই তুমিই অপহরণ করেছ ওখান হতে তোমার চুলের সুগন্ধি ও মুখের রং!

যখন তুমি ধোও তোমার মুখ, স্রোত বয়ে যায় অনন্য এক গোলাপি বর্ণচ্ছটায়:

গলিপথ ভরে ওঠে কস্তুরীমৃগ সুবাসে যখন এলিয়ে ধরো তোমার চুলের ওই ঢং!

রুবাই ৮

দুর্ভাগ্য ছাড়া অন্য কেউ আর এখন চায় না আমাকে... কখনো না;

জ্বরবিকার ছাড়া আমার শরীরে দেয় না কেউ আর কোনো উষ্ণতা|

ঠোঁটে যদি উঠে আসে আত্মা আমার তবু কোনো জল পাইনে আমি,

কখনো ভেবে দেখে না কেউ আমাকে, আমার বিগলিত অশ্রু ছাড়া!

রুবাই ৯

এমন এক আশ্চর্য এ স্বর্গসুরা যে পানপাত্র হতে মুহূর্তের জন্যও যদি নীলনদের জলে

এর একটা ফোঁটা পড়ে তবে এক সুশীল কুমিরও চিরদিনের জন্য মাতাল হয়ে পড়ে

এর সুগন্ধি হতে... তৃণাঞ্চলের একটা হরিণীও যদি পান করে ওটার একটা ফোঁটা

তবে এক হিংস্র সিংহ হয়ে ওঠে সে তখনি, বাঘের ভয় হয়ে ওঠে অতি তুচ্ছ ওর কাছে!

রুবাই ১০

এসো পান করি এখন ওই স্বর্গসুধা, নেশাবিহ্বল হই আমরা:

অপ্সরাদের অনুপম হাত হতে অমৃতপানে বিলোল হই আমরা|

মানুষেরা হয়তো বলে আমরা অনুভূতিহীন, কেউ বলে উন্মাদ:

আসলে এটা, বা ওটাও নই, এক স্বর্গঘোরে রয়েছি আমরা!

রুবাই ১১

দুঃখজর্জর চোখের সকল বিষাদ-ছায়া শুষে নিয়েছ তুমি আমার, 

গণ্ডদেশ ছিন্ন করে দিয়েছে প্রাণিত করা ওই গোপন গোলাপ,

আমার আত্মার নিভৃত গোপন, যা লুকিয়ে রেখেছিল আমার হৃদয়:

এক সত্য উচ্চারণ করেছিল স্বর্গসুখ ও অশ্রুভাষাগুলো আমার|

রুবাই ১২

জড়িয়ে রয়েছে আমার এ হৃদয় তোমার দীর্ঘ কালো চুলের অরণ্যে,

তীব্র এক আকুলতা মিশে রয়েছে ওখানে, এর শিরা-উপশিরাজুড়ে

রয়েছে শুধু এক পরিত্রাণ... আমার ওই প্রত্যাশার| কাঁদছিল? আহা

না, ওখানে ছিল মিলনরাতের এক ব্যাকুলতা আমার গলায় জড়িয়ে|

রুবাই ১৩

হাসির উল্লাসে মেতে রয়েছে বিদ্যুচ্চমক, বজ্র কখনো আবার গর্জন করে চলেছে

এক মায়ের মতো, তেরো বছর বয়েসী এক কনে যেভাবে বিলাপ করে, বিচ্ছেদে|

প্রাচীন দেবদারু গাছের চিরসবুজ পাতাগুলো এখন কোমল মখমলের মতো মসৃণ:

লালা ফুলের ওপর জমে থাকা শিশির প্রেমিকের অশ্রুবিন্দুর মতো ঝরে বিরহে|

রুবাই ১৪

ওই প্রতিকূলতার জন্য, অসূয়াপ্রবণ এক প্রণয়ী খুঁজেছিলেম আমি:

বিষণ্ন এক হৃদয় নিয়ে পুরোটা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছিলাম আমি|

পাথরের আঘাতে অসংখ্যবার থেমে পড়েছিল আমার পা দুটো:

ভাবনা থামাতে, কপালে শত শত কঠিন করাঘাত করেছিলাম আমি|

রুবাই ১৫

যে-জন বিনিময় করেছিল একটা মধুখন আমাদের ওই হৃদয়ের জন্য: প্রাণবন্ত ছিল ওটা!

যে-জন বিনিময় করেছিল আমাদের আত্মার জন্য একটা চুমু, তুলনারহিত ছিল ওটা| 

আত্মার জন্য যখন এমন সৌন্দর্য হয়ে ওঠে চুমুর বিনিময়, যথেষ্ট ছিল নিশ্চয় ওটা|

যে-কোনো জায়গায় উন্মুখ এক হৃদয়ের জন্য মুখোমুখি হওয়া... যথেষ্ট নয় কি ওটা!

রুবাই ১৬

আর কখনো রাঙাব না আমি আমার চুলগুলো ওই কালো রঙে... 

আবার তরুণ হতে এবং ফিরে যেতে নতুন করে পাপের নিমজ্জনে;

শোক প্রকাশের জন্য কালো রঙে যেমন পোশাক রাঙায় মানুষগুলো:

ওভাবে শোক জানাতে রাঙাব আমার বুড়ো বয়সটাকে, কালো রঙে!

রুবাই ১৭

তোমার নাম শুনি যখন আমি... উৎফুল্ল হয়ে ওঠে আমার এ হৃদয়,

এদিকে ফেরাও যখন তোমার মুখ, উল্লাসে ফেটে পড়ে আমার হৃদয়...

তুমি ছাড়া অন্য কেউ যদি উল্লেখ করে কোনো কিছু, যে-কোনোখানে

হাজারটা দুঃখের আগুনে শিখায় অহম-ক্রোধে জ্বলে ওঠে আমার হৃদয়|

রুবাই ১৮

প্রত্যাশিত ওই জন কখনো খুঁজবে না আর কোনো ফল এ বাগানে:

সিক্ত হয় না কখনো চোখদুটো তোমার যখন তাকাও আমার দিকে,

থেকো না আর এখানে, আশাহীন... মালাকার এখন তোমার পেছনে:

বইছে বাতাস, ওই ধুলোর মতো বোঝে ওটা সে, যা থিতু হয়েছে|

রুবাই ১৯

এ চোখ দুটো হলো এক মহাসমুদ্র, এবং হৃদয়ের ভেতর গর্জে চলেছে আগুন, তবে কীকরে

ওই মহাসমুদ্র ও আগুনের মাঝে আমার চোখের মণিদুটো... না গলে থেকে যেতে পারে?

হিংস্র কুমিরের দংশন সয়েছে যে, হৃদয়ের ভেতরটা ছিঁড়ে গেছে তার... সে ছিল এতটাই

ক্রুদ্ধ যে যদি ওকে দিতেম আমার ছিন্ন হৃদয় তবে ভোগ করতে হতো এক যাতনা আমাকে!

রুবাই ২০

আমার সামনে এখন তোমার চিঠিটি, প্রবল এক উৎকণ্ঠা নিয়ে বসেছি ওটা পড়তে... 

ঠিক যেন এক কৃত্তিকা নক্ষত্রপুঞ্জ এখন আমার আস্তিনে, অশ্রু ঝরে আমার চোখ হতে|

তারপর... যখন আমার কান্নাভেজা কলম তুলে নিই ওটার একটা জবাব লিখার জন্য,

তখন তীব্র ইচ্ছে হয় এ হৃদয়টাকে ভাঁজ করে দিতে ওখানে... তোমাকে দেখাতে!

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬


রুদাকির ২০টি রুবাই

প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

আবু আব্দাল্লাহ জাফর ইবনে মুহাম্মদ আল রুদাকি (৮৫৮-৯৪১ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন একজন পারস্য-দেশীয় কবি| রুদাকি নামে বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন তিনি| তাঁকে ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম বিশেষজ্ঞ কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়| আধুনিক ফার্সি কবিতার জনক বলেও সম্বোধন করা হয় তাঁকে| 

রুদাকি প্রথম আধুনিক ফারসি বর্ণমালায় কবিতা রচনা করেছিলেন এবং একারণেই শাস্ত্রীয় ফারসি সাহিত্যের জনক বলা হয়| তার কবিতায় কোয়ারেনসহ পার্সিয়ান কবিতার প্রাচীনতম ঘরানার অনেকগুলি উপস্থিত রয়েছে| তার কাব্য সম্ভারের খুব অল্প অংশই এখন পাওয়া যায়| তবে ধারণা করা হয়, নবম শতাব্দিতে রুদাকির মধ্যে কবিতা, গান, আবৃত্তি এবং কবি লেখক সত্তার যে সংমিশ্রণ ঘটেছিলো সেটা তার পূর্বে আর কারো মধ্যে এভাবে পাওয়া যায়নি| রাজসভায় তাই তিনি ছিলেন বিশেষ মর্যাদার অধিকারী|


রুবাই ১

জীবনের জন্য যা অতিক্রম করছ তুমি তাতে খুব বেশি জড়িয়ে পড়ো না,

পৃথিবীর এক হেলাখেলা মাত্র এটা, কোনো ছলনায় এখানে পড়ে যেও না|

কোনো দুর্বিপাক এলে তোমাকেই শক্ত করে বাঁধতে হয় তোমার কোমরকষি

দয়া, যা দেখানো হয়, তা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ভাবনা নয়: নীরব নির্মাণ এটা|


রুবাই ২

বিরহের এমন দুঃখদহনে যদিও রক্তাক্ত হয় হৃদয়, আমার এ আনন্দ-উল্লাস

তবু বিষাদের চেয়ে অনেক বেশি কিছু: ‘আগামীকাল’ বিরহের এক প্রতিভাস; 

ভাবি প্রতি পল, কল্পনা করি আমি, অবাক হই কেমন হতে পারে: মিলনমুহূর্ত, 

যদি হয় ওটার মতো এ বিরহের ‘এখন’, তবে তা কেবলই এক হতাশ্বাস!


রুবাই ৩

কোনো কান নেই এটার, শুনতে পায় না, তবে কথা বলে; পঙ্গু এটা, 

কিন্তু হাঁটে; বোবা, কিন্তু বাকপটু; চোখ ছাড়াই দেখে সে এ পৃথিবীটা|

নড়েচড়ে সে এক সরীসৃপের মতো, ধারালো তরবারির মতো কালো 

এক মুখ আছে এটার; বাঁকে, যাপন করে এক প্রেমিক-শরীর এটা|


রুবাই ৪

যা কিছু আছে তোমার, সন্তুষ্ট থেকো সেসব নিয়ে, বেঁচে থেকো তোমার স্বাধীনতায়:

বেঁধে ফেলো না নিজেকে কোনো আনুষ্ঠানিকতায়... বাঁচো তোমার স্বাধীনতায়!

নিজেকে বিষাদিত কোরো না কখনো... অন্যজনের কোনো ভালো থাকা দেখে:

সৌভাগ্যের জন্য চেষ্টা করার অনেক পথ রয়েছে তোমার, বাঁচো, অবাধ স্বাধীনতায়!


রুবাই ৫

এ পৃথিবীর কোনো সূর্য জ্বলে থাকে না তোমার মুখের চেয়েও বেশি উজ্জ্বলতা নিয়ে!

এ পৃথিবীর কোনো আলোই সুচারু নয় তোমার মুখের চেয়েও বেশি উজ্জ্বলাভা পেয়ে!

আমার মতো বিলীন হয়ে যেতে দিও না অন্য কাউকে, যেমন এখন আছি আমি...

এমনকি, তোমার চিহ্ন খুঁজে কোনো একটা মুখও যেন আর না যেতে পারে হারিয়ে!



রুবাই ৬

মনে হয় না যে কখনো ক্লান্ত হয় তোমার এ হৃদয় অমন নিদারুণ নিষ্ঠুরতা হতে,

এবং চোখ দুটো ভরে ওঠে না অশ্রুতে তোমার যখন তাকাও আমার দিকে:

তোমার জুরি হতে পারে এমন কেউ নেই শত সহস্র শত্রুর মাঝেও, তবুও...

এটা এক পরিতৃপ্তি নিশ্চয় যে আত্মার চেয়েও বেশি ভালোবাসি আমি তোমাকে!


রুবাই ৭

তুমি... যে হরণ করেছে বাগানের সব গোলাপের সুগন্ধি ও রং... এবং

ওই তুমিই অপহরণ করেছ ওখান হতে তোমার চুলের সুগন্ধি ও মুখের রং!

যখন তুমি ধোও তোমার মুখ, স্রোত বয়ে যায় অনন্য এক গোলাপি বর্ণচ্ছটায়:

গলিপথ ভরে ওঠে কস্তুরীমৃগ সুবাসে যখন এলিয়ে ধরো তোমার চুলের ওই ঢং!


রুবাই ৮

দুর্ভাগ্য ছাড়া অন্য কেউ আর এখন চায় না আমাকে... কখনো না;

জ্বরবিকার ছাড়া আমার শরীরে দেয় না কেউ আর কোনো উষ্ণতা|

ঠোঁটে যদি উঠে আসে আত্মা আমার তবু কোনো জল পাইনে আমি,

কখনো ভেবে দেখে না কেউ আমাকে, আমার বিগলিত অশ্রু ছাড়া!


রুবাই ৯

এমন এক আশ্চর্য এ স্বর্গসুরা যে পানপাত্র হতে মুহূর্তের জন্যও যদি নীলনদের জলে

এর একটা ফোঁটা পড়ে তবে এক সুশীল কুমিরও চিরদিনের জন্য মাতাল হয়ে পড়ে

এর সুগন্ধি হতে... তৃণাঞ্চলের একটা হরিণীও যদি পান করে ওটার একটা ফোঁটা

তবে এক হিংস্র সিংহ হয়ে ওঠে সে তখনি, বাঘের ভয় হয়ে ওঠে অতি তুচ্ছ ওর কাছে!


রুবাই ১০

এসো পান করি এখন ওই স্বর্গসুধা, নেশাবিহ্বল হই আমরা:

অপ্সরাদের অনুপম হাত হতে অমৃতপানে বিলোল হই আমরা|

মানুষেরা হয়তো বলে আমরা অনুভূতিহীন, কেউ বলে উন্মাদ:

আসলে এটা, বা ওটাও নই, এক স্বর্গঘোরে রয়েছি আমরা!


রুবাই ১১

দুঃখজর্জর চোখের সকল বিষাদ-ছায়া শুষে নিয়েছ তুমি আমার, 

গণ্ডদেশ ছিন্ন করে দিয়েছে প্রাণিত করা ওই গোপন গোলাপ,

আমার আত্মার নিভৃত গোপন, যা লুকিয়ে রেখেছিল আমার হৃদয়:

এক সত্য উচ্চারণ করেছিল স্বর্গসুখ ও অশ্রুভাষাগুলো আমার|


রুবাই ১২

জড়িয়ে রয়েছে আমার এ হৃদয় তোমার দীর্ঘ কালো চুলের অরণ্যে,

তীব্র এক আকুলতা মিশে রয়েছে ওখানে, এর শিরা-উপশিরাজুড়ে

রয়েছে শুধু এক পরিত্রাণ... আমার ওই প্রত্যাশার| কাঁদছিল? আহা

না, ওখানে ছিল মিলনরাতের এক ব্যাকুলতা আমার গলায় জড়িয়ে|


রুবাই ১৩

হাসির উল্লাসে মেতে রয়েছে বিদ্যুচ্চমক, বজ্র কখনো আবার গর্জন করে চলেছে

এক মায়ের মতো, তেরো বছর বয়েসী এক কনে যেভাবে বিলাপ করে, বিচ্ছেদে|

প্রাচীন দেবদারু গাছের চিরসবুজ পাতাগুলো এখন কোমল মখমলের মতো মসৃণ:

লালা ফুলের ওপর জমে থাকা শিশির প্রেমিকের অশ্রুবিন্দুর মতো ঝরে বিরহে|


রুবাই ১৪

ওই প্রতিকূলতার জন্য, অসূয়াপ্রবণ এক প্রণয়ী খুঁজেছিলেম আমি:

বিষণ্ন এক হৃদয় নিয়ে পুরোটা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছিলাম আমি|

পাথরের আঘাতে অসংখ্যবার থেমে পড়েছিল আমার পা দুটো:

ভাবনা থামাতে, কপালে শত শত কঠিন করাঘাত করেছিলাম আমি|


রুবাই ১৫

যে-জন বিনিময় করেছিল একটা মধুখন আমাদের ওই হৃদয়ের জন্য: প্রাণবন্ত ছিল ওটা!

যে-জন বিনিময় করেছিল আমাদের আত্মার জন্য একটা চুমু, তুলনারহিত ছিল ওটা| 

আত্মার জন্য যখন এমন সৌন্দর্য হয়ে ওঠে চুমুর বিনিময়, যথেষ্ট ছিল নিশ্চয় ওটা|

যে-কোনো জায়গায় উন্মুখ এক হৃদয়ের জন্য মুখোমুখি হওয়া... যথেষ্ট নয় কি ওটা!


রুবাই ১৬

আর কখনো রাঙাব না আমি আমার চুলগুলো ওই কালো রঙে... 

আবার তরুণ হতে এবং ফিরে যেতে নতুন করে পাপের নিমজ্জনে;

শোক প্রকাশের জন্য কালো রঙে যেমন পোশাক রাঙায় মানুষগুলো:

ওভাবে শোক জানাতে রাঙাব আমার বুড়ো বয়সটাকে, কালো রঙে!


রুবাই ১৭

তোমার নাম শুনি যখন আমি... উৎফুল্ল হয়ে ওঠে আমার এ হৃদয়,

এদিকে ফেরাও যখন তোমার মুখ, উল্লাসে ফেটে পড়ে আমার হৃদয়...

তুমি ছাড়া অন্য কেউ যদি উল্লেখ করে কোনো কিছু, যে-কোনোখানে

হাজারটা দুঃখের আগুনে শিখায় অহম-ক্রোধে জ্বলে ওঠে আমার হৃদয়|


রুবাই ১৮

প্রত্যাশিত ওই জন কখনো খুঁজবে না আর কোনো ফল এ বাগানে:

সিক্ত হয় না কখনো চোখদুটো তোমার যখন তাকাও আমার দিকে,

থেকো না আর এখানে, আশাহীন... মালাকার এখন তোমার পেছনে:

বইছে বাতাস, ওই ধুলোর মতো বোঝে ওটা সে, যা থিতু হয়েছে|


রুবাই ১৯

এ চোখ দুটো হলো এক মহাসমুদ্র, এবং হৃদয়ের ভেতর গর্জে চলেছে আগুন, তবে কীকরে

ওই মহাসমুদ্র ও আগুনের মাঝে আমার চোখের মণিদুটো... না গলে থেকে যেতে পারে?

হিংস্র কুমিরের দংশন সয়েছে যে, হৃদয়ের ভেতরটা ছিঁড়ে গেছে তার... সে ছিল এতটাই

ক্রুদ্ধ যে যদি ওকে দিতেম আমার ছিন্ন হৃদয় তবে ভোগ করতে হতো এক যাতনা আমাকে!


রুবাই ২০

আমার সামনে এখন তোমার চিঠিটি, প্রবল এক উৎকণ্ঠা নিয়ে বসেছি ওটা পড়তে... 

ঠিক যেন এক কৃত্তিকা নক্ষত্রপুঞ্জ এখন আমার আস্তিনে, অশ্রু ঝরে আমার চোখ হতে|

তারপর... যখন আমার কান্নাভেজা কলম তুলে নিই ওটার একটা জবাব লিখার জন্য,

তখন তীব্র ইচ্ছে হয় এ হৃদয়টাকে ভাঁজ করে দিতে ওখানে... তোমাকে দেখাতে!


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত