পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন যত চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে, ততই জয়ের দাবি ও পাল্টা বয়ানের লড়াই আরও তীব্র হচ্ছে। এই আবহেই তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জীর ‘২৩০ আসন’ জয়ের দাবি নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি বড় বার্তা ছুঁড়ে দিয়েছে।
এই দাবি কি আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ, নাকি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল, যার লক্ষ্য একদিকে দলীয় কর্মীদের উজ্জীবিত রাখা, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরকে মানসিকভাবে চাপে রাখা।
এর আগে ২৩ এপ্রিলের প্রথম দফা ভোটের পর বিজেপির অমিত শাহ ১১০ আসনে জয়ের দাবী করেছিলেন। সেই দফায় ১৫২ আসনে ভোট হয়েছিলো। অর্থাৎ প্রথম দফার মোট আসনের ৭৩ শতাংশ জয়ের দাবী ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর। দ্বিতীয় দফা ভোটের পরও নিশ্চয়ই অমিত শাহ বড় জয়ের দাবী করবেন। নির্বাচনের প্রায় শুরু থেকেই বিজেপি প্রায় ২০০ আসনে জয়ের কথা বলে আসছে।
এবার ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় তথা শেষ দফার নির্বাচনে ১৪২ আসনে ভোট হবে। নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হবে ৪ মে।
অভিষেক ব্যানার্জীর ‘২৩০ আসন’ জয়ের দাবির অর্থ হচ্ছে পশ্চিম বঙ্গ বিধানসভার ২৯৪ আসনের ৭৮ শতাংশই যাবে তৃণমূল কংগ্রেসের ঝুলিতে।
দাবী ও মাঠের বাস্তবতা
তৃণমূলের এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে রয়েছে কয়েকটি বাস্তব কারণ। প্রথমত, মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে চালু হওয়া একাধিক ‘জনমুখী’ প্রকল্প, যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, দুয়ারে সরকার। এগুলো অনেকেই বলেন গ্রামবাংলা থেকে শহরতলি পর্যন্ত বিস্তৃত প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে মহিলা ভোটারদের মধ্যে এই প্রকল্পগুলির গ্রহণযোগ্যতা তৃণমূলের বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয়ত, সংগঠনের স্তরে তৃণমূল এখনও অত্যন্ত সক্রিয় এবং বুথভিত্তিক প্রস্তুতিতে তারা অনেকটাই এগিয়ে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তৃতীয়ত, বিজেপি-বিরোধী একটি সুস্পষ্ট মনোভাব এখনও রাজ্যের একটি বড় অংশের ভোটারের মধ্যে কাজ করছে, যা তৃণমূলের পক্ষে যেতে পারে।
অন্যদিকে, নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহর নেতৃত্বে বিজেপিও এই নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে লড়ছে। তাদের প্রচারের মূল ভরকেন্দ্র ‘অনুপ্রবেশ’, জাতীয় নিরাপত্তা, দুর্নীতি এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পের প্রসার। বিজেপির কৌশল স্পষ্ট, রাজ্যে একটি শক্তিশালী মেরুকরণ বা বিভাজন তৈরি করা এবং তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে ভোটে রূপান্তর করা।
শহরাঞ্চল ও কিছু সীমান্তবর্তী এলাকায় এই ইস্যুগুলির প্রভাব দেখা গেলেও, গ্রামীণ বাংলায় স্থানীয় উন্নয়ন ও সরকারি সুবিধা এখনও ভোটের বড় নির্ধারক হিসেবে রয়ে গেছে।
মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, ভোটারদের মনোভাব একমুখী নয়। গ্রামাঞ্চলে অনেকেই সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে বর্তমান সরকারের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। আবার শহরাঞ্চলে বেকারত্ব, শিক্ষা ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অসন্তোষও স্পষ্ট।
প্রথমবারের ভোটারদের মধ্যেও একটি বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে —এক অংশ উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার পক্ষে, অন্য অংশ পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করছে। ফলে একটি ‘নীরব সমীকরণ’ এই নির্বাচনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।
আগের ভোট কী বলছে
২০১১ সালের বিধানসভার নির্বাচন জিতে প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসেছিলো তৃণমূল কংগ্রেস। সেবার তারা কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেছিলো। সেই জোট ৪৮ শতাংশ ভোটে পেয়েছিলো ২২৮ আসন। আর তৃণমূলের ঝুলিতে গিয়েছিলো ১৮৪ আসন। তৃণমূলের ভোটের হার ছিলো ৩৯ শতাংশ। তখনকার ক্ষমতাসীন বামজোট ৪১ শতাংশ ভোটে পেয়েছিলো ৬২ আসন।
আর বিজেপি পেয়েছিলো ৪ শতাংশ ভোট। তবে তাতে তাদের ভাগে একটি আসনও জোটেনি। তবে বিজেপির এনডিএ জোটসঙ্গী গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা ৩টি আসন পেয়েছিলো। আর সেই জোটের সঙ্গী হয়ে একজন স্বতন্ত্র জিতেছিলেন।
এরপর ২০১৬ সালে তৃণমূলের ভোট এবং আসন দুটোই বেড়েছে। সেবার তৃণমূল ৪৫ শতাংশ ভোটে ২১১ আসন পেয়েছিলো।
সেবার বিজেপির ভোট বেড়ে দাঁড়িয়েছিলো ১০ শতাংশের বেশী, জুটেছিলো ৩টি আসন। আর বামফ্রন্ট, কংগ্রেস এবং আরও কিছু দল মিলে মহাজোট করে পেয়েছিলো ৩৯ শতাংশের বেশী ভোট। তারা পেয়েছিলেন ৭৭ আসন।
২০২১ এর নির্বাচনে তৃণমূলের আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছিলো প্রায় ৪৯ শতাংশ, আসনও বেড়ে হয়েছিলো ২১৫। সেবার বিজেপিরও আসন ও ভোট অনেক বেড়েছিলো। বিজেপি ৩৮ শতাংশ ভোটে পেয়েছিলো ৭৭ আসন। এই দুই দলের আসন ও ভোট বাড়ার প্রভাব পড়েছিলো সিপিএম, বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের ওপর। তাদের ভোট ও আসন — দুটোই অনেক কমে গিয়েছিলো।
ভোটের হার ও এসআইআর
এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বড় বিতর্ক স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন — যার উদ্দেশ্য ছিল ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণ, অর্থাৎ যারা রাজ্য ছেড়ে গেছেন বা মারা গেছেন তাদের বাদ দেয়া। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়াই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জায়গা, কারণ প্রায় ৯২ ভোটার বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ।
আরেকটি আলোচিত বিষয় প্রথম দফায় ৯২ শতাংশের বেশী ভোট পড়া। এই ভোটের হারে কোনো পরিবর্তন হবে? এর আগের তিন নির্বাচনে ৮৪, ৮২ ও ৮৫ শতাংশ ভোট পড়েছিলো। এবার কি একটা বড় অংকের ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যাওয়ায় ভোটের হার বেড়ে গেলো নাকি অন্য কিছু।
ভোটের অঙ্ক ও অন্য সমীকরণ
এই নির্বাচনের আসল লড়াই লুকিয়ে ভোটের অঙ্কে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ৬০ লাখ, কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সেই ব্যবধান কমে প্রায় ৪২ লাখে নেমে আসে (আনুমানিক)। অর্থাৎ লড়াই ক্রমশ কাছাকাছি আসছে। এই পরিবর্তনই পুরো নির্বাচনী কৌশলকে প্রভাবিত করছে।
২০২১ সালে বহু আসনে জয়ের ব্যবধান ছিল খুবই কম, ফলে সামান্য ভোটের হেরফেরেই ফল বদলে যেতে পারে। বিগত (২০২১ সাল) বিধানসভা নির্বাচনে ৪২টি আসনে তৃণমূল ১৫ হাজার ভোট বা তার কম ব্যবধানে জিতেছিল। বিজেপির ক্ষেত্রে এ রকম কম ব্যবধানে জেতা আসনের সংখ্যা ১৯।
এই কারণেই এখন ভোটার তালিকা, বাদ পড়া ভোটার এবং উপস্থিতি সবকিছুই হয়ে উঠেছে নির্ণায়ক ফ্যাক্টর। কোন আসনে কী পরিমাণ ভোটার বাদ পড়েছে এবং তারা কারা সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো মিলিয়ে দিতে পারে জটিল সমীকরণ।
ভোটারের মনস্তত্ত্ব, ভবিষ্যতের রাজনীতি
এই প্রেক্ষাপটে ২৩০ বা ২০০ আসনের দাবি বাস্তবের নিরিখে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই সংখ্যা মূলত একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক বার্তা’ যার উদ্দেশ্য জয়ের আভাস তৈরি করা এবং ভোটের আগে জনমনে একটি প্রবল ধারা তৈরি করা। বাস্তবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, এত বড় ব্যবধানে জয় পেতে গেলে বিরোধীদের প্রায় সম্পূর্ণভাবে কোণঠাসা করে দিতে হয়, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে সহজ নয়।
তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর শেষ মুহূর্তে ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। সংখ্যালঘু ভোট কতটা একত্রীভূত হয়, মহিলা ভোটারদের অংশগ্রহণ কতটা বাড়ে, ভোটার তালিকা ও তার এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় সংশোধণ সংক্রান্ত বিতর্ক কতটা প্রভাব ফেলে। এবং সবচেয়ে বড় কথা স্থানীয় প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা কতটা এসবই নির্ধারণ করবে চূড়ান্ত ফলাফল। এছাড়া ভোটের দিন নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বুথ ম্যানেজমেন্ট এবং ভোটার উপস্থিতির হারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের লড়াই নয় এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দিকনির্দেশ ও জাতীয় রাজনীতিতে তার ভবিষ্যৎ ভূমিকারও নির্ধারক। একদিকে তৃণমূলের আত্মবিশ্বাস, অন্যদিকে বিজেপির আক্রমণাত্মক প্রচার এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে শেষ কথা বলবেন সাধারণ ভোটাররাই। তবে তা জানা যাবে ৪ মে যেদিন প্রকাশ হবে ভোটের ফল।

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন যত চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে, ততই জয়ের দাবি ও পাল্টা বয়ানের লড়াই আরও তীব্র হচ্ছে। এই আবহেই তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জীর ‘২৩০ আসন’ জয়ের দাবি নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি বড় বার্তা ছুঁড়ে দিয়েছে।
এই দাবি কি আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ, নাকি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল, যার লক্ষ্য একদিকে দলীয় কর্মীদের উজ্জীবিত রাখা, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরকে মানসিকভাবে চাপে রাখা।
এর আগে ২৩ এপ্রিলের প্রথম দফা ভোটের পর বিজেপির অমিত শাহ ১১০ আসনে জয়ের দাবী করেছিলেন। সেই দফায় ১৫২ আসনে ভোট হয়েছিলো। অর্থাৎ প্রথম দফার মোট আসনের ৭৩ শতাংশ জয়ের দাবী ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর। দ্বিতীয় দফা ভোটের পরও নিশ্চয়ই অমিত শাহ বড় জয়ের দাবী করবেন। নির্বাচনের প্রায় শুরু থেকেই বিজেপি প্রায় ২০০ আসনে জয়ের কথা বলে আসছে।
এবার ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় তথা শেষ দফার নির্বাচনে ১৪২ আসনে ভোট হবে। নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হবে ৪ মে।
অভিষেক ব্যানার্জীর ‘২৩০ আসন’ জয়ের দাবির অর্থ হচ্ছে পশ্চিম বঙ্গ বিধানসভার ২৯৪ আসনের ৭৮ শতাংশই যাবে তৃণমূল কংগ্রেসের ঝুলিতে।
দাবী ও মাঠের বাস্তবতা
তৃণমূলের এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে রয়েছে কয়েকটি বাস্তব কারণ। প্রথমত, মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে চালু হওয়া একাধিক ‘জনমুখী’ প্রকল্প, যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, দুয়ারে সরকার। এগুলো অনেকেই বলেন গ্রামবাংলা থেকে শহরতলি পর্যন্ত বিস্তৃত প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে মহিলা ভোটারদের মধ্যে এই প্রকল্পগুলির গ্রহণযোগ্যতা তৃণমূলের বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয়ত, সংগঠনের স্তরে তৃণমূল এখনও অত্যন্ত সক্রিয় এবং বুথভিত্তিক প্রস্তুতিতে তারা অনেকটাই এগিয়ে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তৃতীয়ত, বিজেপি-বিরোধী একটি সুস্পষ্ট মনোভাব এখনও রাজ্যের একটি বড় অংশের ভোটারের মধ্যে কাজ করছে, যা তৃণমূলের পক্ষে যেতে পারে।
অন্যদিকে, নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহর নেতৃত্বে বিজেপিও এই নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে লড়ছে। তাদের প্রচারের মূল ভরকেন্দ্র ‘অনুপ্রবেশ’, জাতীয় নিরাপত্তা, দুর্নীতি এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পের প্রসার। বিজেপির কৌশল স্পষ্ট, রাজ্যে একটি শক্তিশালী মেরুকরণ বা বিভাজন তৈরি করা এবং তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে ভোটে রূপান্তর করা।
শহরাঞ্চল ও কিছু সীমান্তবর্তী এলাকায় এই ইস্যুগুলির প্রভাব দেখা গেলেও, গ্রামীণ বাংলায় স্থানীয় উন্নয়ন ও সরকারি সুবিধা এখনও ভোটের বড় নির্ধারক হিসেবে রয়ে গেছে।
মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, ভোটারদের মনোভাব একমুখী নয়। গ্রামাঞ্চলে অনেকেই সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে বর্তমান সরকারের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। আবার শহরাঞ্চলে বেকারত্ব, শিক্ষা ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অসন্তোষও স্পষ্ট।
প্রথমবারের ভোটারদের মধ্যেও একটি বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে —এক অংশ উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার পক্ষে, অন্য অংশ পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করছে। ফলে একটি ‘নীরব সমীকরণ’ এই নির্বাচনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।
আগের ভোট কী বলছে
২০১১ সালের বিধানসভার নির্বাচন জিতে প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসেছিলো তৃণমূল কংগ্রেস। সেবার তারা কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেছিলো। সেই জোট ৪৮ শতাংশ ভোটে পেয়েছিলো ২২৮ আসন। আর তৃণমূলের ঝুলিতে গিয়েছিলো ১৮৪ আসন। তৃণমূলের ভোটের হার ছিলো ৩৯ শতাংশ। তখনকার ক্ষমতাসীন বামজোট ৪১ শতাংশ ভোটে পেয়েছিলো ৬২ আসন।
আর বিজেপি পেয়েছিলো ৪ শতাংশ ভোট। তবে তাতে তাদের ভাগে একটি আসনও জোটেনি। তবে বিজেপির এনডিএ জোটসঙ্গী গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা ৩টি আসন পেয়েছিলো। আর সেই জোটের সঙ্গী হয়ে একজন স্বতন্ত্র জিতেছিলেন।
এরপর ২০১৬ সালে তৃণমূলের ভোট এবং আসন দুটোই বেড়েছে। সেবার তৃণমূল ৪৫ শতাংশ ভোটে ২১১ আসন পেয়েছিলো।
সেবার বিজেপির ভোট বেড়ে দাঁড়িয়েছিলো ১০ শতাংশের বেশী, জুটেছিলো ৩টি আসন। আর বামফ্রন্ট, কংগ্রেস এবং আরও কিছু দল মিলে মহাজোট করে পেয়েছিলো ৩৯ শতাংশের বেশী ভোট। তারা পেয়েছিলেন ৭৭ আসন।
২০২১ এর নির্বাচনে তৃণমূলের আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছিলো প্রায় ৪৯ শতাংশ, আসনও বেড়ে হয়েছিলো ২১৫। সেবার বিজেপিরও আসন ও ভোট অনেক বেড়েছিলো। বিজেপি ৩৮ শতাংশ ভোটে পেয়েছিলো ৭৭ আসন। এই দুই দলের আসন ও ভোট বাড়ার প্রভাব পড়েছিলো সিপিএম, বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের ওপর। তাদের ভোট ও আসন — দুটোই অনেক কমে গিয়েছিলো।
ভোটের হার ও এসআইআর
এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বড় বিতর্ক স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন — যার উদ্দেশ্য ছিল ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণ, অর্থাৎ যারা রাজ্য ছেড়ে গেছেন বা মারা গেছেন তাদের বাদ দেয়া। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়াই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জায়গা, কারণ প্রায় ৯২ ভোটার বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ।
আরেকটি আলোচিত বিষয় প্রথম দফায় ৯২ শতাংশের বেশী ভোট পড়া। এই ভোটের হারে কোনো পরিবর্তন হবে? এর আগের তিন নির্বাচনে ৮৪, ৮২ ও ৮৫ শতাংশ ভোট পড়েছিলো। এবার কি একটা বড় অংকের ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যাওয়ায় ভোটের হার বেড়ে গেলো নাকি অন্য কিছু।
ভোটের অঙ্ক ও অন্য সমীকরণ
এই নির্বাচনের আসল লড়াই লুকিয়ে ভোটের অঙ্কে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ৬০ লাখ, কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সেই ব্যবধান কমে প্রায় ৪২ লাখে নেমে আসে (আনুমানিক)। অর্থাৎ লড়াই ক্রমশ কাছাকাছি আসছে। এই পরিবর্তনই পুরো নির্বাচনী কৌশলকে প্রভাবিত করছে।
২০২১ সালে বহু আসনে জয়ের ব্যবধান ছিল খুবই কম, ফলে সামান্য ভোটের হেরফেরেই ফল বদলে যেতে পারে। বিগত (২০২১ সাল) বিধানসভা নির্বাচনে ৪২টি আসনে তৃণমূল ১৫ হাজার ভোট বা তার কম ব্যবধানে জিতেছিল। বিজেপির ক্ষেত্রে এ রকম কম ব্যবধানে জেতা আসনের সংখ্যা ১৯।
এই কারণেই এখন ভোটার তালিকা, বাদ পড়া ভোটার এবং উপস্থিতি সবকিছুই হয়ে উঠেছে নির্ণায়ক ফ্যাক্টর। কোন আসনে কী পরিমাণ ভোটার বাদ পড়েছে এবং তারা কারা সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো মিলিয়ে দিতে পারে জটিল সমীকরণ।
ভোটারের মনস্তত্ত্ব, ভবিষ্যতের রাজনীতি
এই প্রেক্ষাপটে ২৩০ বা ২০০ আসনের দাবি বাস্তবের নিরিখে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই সংখ্যা মূলত একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক বার্তা’ যার উদ্দেশ্য জয়ের আভাস তৈরি করা এবং ভোটের আগে জনমনে একটি প্রবল ধারা তৈরি করা। বাস্তবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, এত বড় ব্যবধানে জয় পেতে গেলে বিরোধীদের প্রায় সম্পূর্ণভাবে কোণঠাসা করে দিতে হয়, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে সহজ নয়।
তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর শেষ মুহূর্তে ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। সংখ্যালঘু ভোট কতটা একত্রীভূত হয়, মহিলা ভোটারদের অংশগ্রহণ কতটা বাড়ে, ভোটার তালিকা ও তার এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় সংশোধণ সংক্রান্ত বিতর্ক কতটা প্রভাব ফেলে। এবং সবচেয়ে বড় কথা স্থানীয় প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা কতটা এসবই নির্ধারণ করবে চূড়ান্ত ফলাফল। এছাড়া ভোটের দিন নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বুথ ম্যানেজমেন্ট এবং ভোটার উপস্থিতির হারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের লড়াই নয় এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দিকনির্দেশ ও জাতীয় রাজনীতিতে তার ভবিষ্যৎ ভূমিকারও নির্ধারক। একদিকে তৃণমূলের আত্মবিশ্বাস, অন্যদিকে বিজেপির আক্রমণাত্মক প্রচার এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে শেষ কথা বলবেন সাধারণ ভোটাররাই। তবে তা জানা যাবে ৪ মে যেদিন প্রকাশ হবে ভোটের ফল।

আপনার মতামত লিখুন