সংবাদ

টেকনাফে এলো কাঠ

আরাকান আর্মির চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্তবাণিজ্য শুরু


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, কক্সবাজার
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, কক্সবাজার
প্রকাশ: ১ মে ২০২৬, ০৭:৩০ পিএম

আরাকান আর্মির চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্তবাণিজ্য শুরু
কাঠবোঝাই নৌযানটির আগমনে স্বস্তি ফিরেছে ব্যবসায়ী ও বন্দরশ্রমিকদের মধ্যে।

দীর্ঘ এক বছর পর কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় শুরু হয়েছে। শুক্রবার (১ মে) দুপুরে একটি কাঠবোঝাই নৌযান বন্দরে এসে পৌঁছেছে। রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত ও আরাকান আর্মির বাধায় প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ থাকার পর কাঠবোঝাই এই নৌযানটির আগমনে স্বস্তি ফিরেছে ব্যবসায়ী ও বন্দরশ্রমিকদের মধ্যে।

টেকনাফ স্থলবন্দরের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী জানান, দুপুর দেড়টার দিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে একটি কাঠবোঝাই নৌযান বন্দরে পৌঁছায়। প্রায় এক বছর বন্ধ থাকার পর এই বন্দর দিয়ে আবারও সীমান্ত বাণিজ্য চালু হলো। তিনি আরও জানান, ধীরে ধীরে আরও পণ্যবাহী নৌযান বন্দরে আসবে বলে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন। শিগগিরই আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পূর্ণমাত্রায় শুরু হতে পারে।

সূত্রমতে, নৌযানটি সকালে মিয়ানমারের মংডু এলাকা থেকে রওনা হয়ে বিকেল নাগাদ টেকনাফের ঘাটে পৌঁছায়। বন্দরটির পরিচালনা কম্পানি ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের পক্ষ থেকে নৌযানটির আগমন নিশ্চিত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে আরাকান আর্মি সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তাদের বাধার কারণে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। গত বছরের এপ্রিল মাসে কার্যত বাণিজ্য বন্ধ হয়ে পড়ে, যা টানা এক বছর ধরে চলে।

এদিকে, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করলে নাফ নদীতে কার্গো চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আরাকান আর্মি নাফ নদীতে টহল জোরদার করে এবং কার্গো জাহাজগুলোতে ‘কর’ দাবি করতে শুরু করে, যা বাণিজ্য বন্ধের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বন্দর চালু রাখার সব ব্যবস্থা থাকলেও মিয়ানমার অংশে অস্থিতিশীলতার কারণে পণ্য আসা বন্ধ ছিল। বন্ধের সময়টিতে সরকার প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে বলে জানান বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, বন্দরনির্ভর প্রায় ১৫০০ শ্রমিক ও ব্যবসায়ী চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়েন।

বাণিজ্য পুনরায় চালুর উদ্যোগ গত মাসেই নেওয়া হয়। গত ১৪ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বন্দরটি পরিদর্শন করে কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এছাড়া, গত ৬ এপ্রিল জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

তবে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। নাফ নদীর নাব্যতা সংকট ও মিয়ানমার অংশে আরাকান আর্মির উপস্থিতি এখনো বাণিজ্যের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রেখেছে। মিয়ানমার থেকে পণ্য আনার পথে আরাকান আর্মির হাত ধরেই এগোতে হবে- যা নতুন করে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা রাখে।

টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মূলত মিয়ানমার থেকে কাঠ, শুটকি, শুকনা বোঁজা, পিয়াজ, আদা, নারকেল, তালমিস্ত্রির সামগ্রী আমদানি হয়। অপরদিকে বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট, আলু, প্লাস্টিক পণ্য, পোশাক ও বিস্কুট রপ্তানি করা হতো। এই বন্দরটির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে ১৯৯৫ সাল থেকে নিয়মিত বাণিজ্য চলছিল।

২০২২-২৩ অর্থবছরে বন্দরটির রাজস্ব আয় ছিল ৬৪০ কোটি টাকা, যা পরবর্তী অর্থবছর কমে ৪০৪ কোটি টাকায় নেমে আসে। বাণিজ্য বন্ধ থাকায় এই রাজস্ব প্রায় শূন্যে নেমে আসে।

১৯৯৫ সালে সীমান্ত পাড়ি দেওয়া চোরাচালান রোধে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে নিয়মিত বাণিজ্য চালু হয়। ২০০৩ সালের ৫ নভেম্বর বন্দরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। তবে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায়ই এ বাণিজ্য বন্ধ থাকতে দেখা গেছে।

টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে আবারও পণ্য চলাচল শুরু হওয়ায় আশার আলো দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তবে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রুটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের ওপর। 

বর্তমানে বন্দর ঘাটে আনুষঙ্গিক সেবা দেওয়ার জন্য বিপুল সংখ্যক শ্রমিক, সিএন্ডএফ এজেন্ট ও পরিবহন শ্রমিক প্রস্তুত আছেন। এবার প্রশাসনকে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬


আরাকান আর্মির চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্তবাণিজ্য শুরু

প্রকাশের তারিখ : ০১ মে ২০২৬

featured Image

দীর্ঘ এক বছর পর কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় শুরু হয়েছে। শুক্রবার (১ মে) দুপুরে একটি কাঠবোঝাই নৌযান বন্দরে এসে পৌঁছেছে। রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত ও আরাকান আর্মির বাধায় প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ থাকার পর কাঠবোঝাই এই নৌযানটির আগমনে স্বস্তি ফিরেছে ব্যবসায়ী ও বন্দরশ্রমিকদের মধ্যে।

টেকনাফ স্থলবন্দরের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী জানান, দুপুর দেড়টার দিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে একটি কাঠবোঝাই নৌযান বন্দরে পৌঁছায়। প্রায় এক বছর বন্ধ থাকার পর এই বন্দর দিয়ে আবারও সীমান্ত বাণিজ্য চালু হলো। তিনি আরও জানান, ধীরে ধীরে আরও পণ্যবাহী নৌযান বন্দরে আসবে বলে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন। শিগগিরই আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পূর্ণমাত্রায় শুরু হতে পারে।

সূত্রমতে, নৌযানটি সকালে মিয়ানমারের মংডু এলাকা থেকে রওনা হয়ে বিকেল নাগাদ টেকনাফের ঘাটে পৌঁছায়। বন্দরটির পরিচালনা কম্পানি ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের পক্ষ থেকে নৌযানটির আগমন নিশ্চিত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে আরাকান আর্মি সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তাদের বাধার কারণে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। গত বছরের এপ্রিল মাসে কার্যত বাণিজ্য বন্ধ হয়ে পড়ে, যা টানা এক বছর ধরে চলে।

এদিকে, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করলে নাফ নদীতে কার্গো চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আরাকান আর্মি নাফ নদীতে টহল জোরদার করে এবং কার্গো জাহাজগুলোতে ‘কর’ দাবি করতে শুরু করে, যা বাণিজ্য বন্ধের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বন্দর চালু রাখার সব ব্যবস্থা থাকলেও মিয়ানমার অংশে অস্থিতিশীলতার কারণে পণ্য আসা বন্ধ ছিল। বন্ধের সময়টিতে সরকার প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে বলে জানান বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, বন্দরনির্ভর প্রায় ১৫০০ শ্রমিক ও ব্যবসায়ী চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়েন।

বাণিজ্য পুনরায় চালুর উদ্যোগ গত মাসেই নেওয়া হয়। গত ১৪ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বন্দরটি পরিদর্শন করে কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এছাড়া, গত ৬ এপ্রিল জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

তবে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। নাফ নদীর নাব্যতা সংকট ও মিয়ানমার অংশে আরাকান আর্মির উপস্থিতি এখনো বাণিজ্যের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রেখেছে। মিয়ানমার থেকে পণ্য আনার পথে আরাকান আর্মির হাত ধরেই এগোতে হবে- যা নতুন করে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা রাখে।

টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মূলত মিয়ানমার থেকে কাঠ, শুটকি, শুকনা বোঁজা, পিয়াজ, আদা, নারকেল, তালমিস্ত্রির সামগ্রী আমদানি হয়। অপরদিকে বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট, আলু, প্লাস্টিক পণ্য, পোশাক ও বিস্কুট রপ্তানি করা হতো। এই বন্দরটির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে ১৯৯৫ সাল থেকে নিয়মিত বাণিজ্য চলছিল।

২০২২-২৩ অর্থবছরে বন্দরটির রাজস্ব আয় ছিল ৬৪০ কোটি টাকা, যা পরবর্তী অর্থবছর কমে ৪০৪ কোটি টাকায় নেমে আসে। বাণিজ্য বন্ধ থাকায় এই রাজস্ব প্রায় শূন্যে নেমে আসে।

১৯৯৫ সালে সীমান্ত পাড়ি দেওয়া চোরাচালান রোধে টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে নিয়মিত বাণিজ্য চালু হয়। ২০০৩ সালের ৫ নভেম্বর বন্দরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। তবে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায়ই এ বাণিজ্য বন্ধ থাকতে দেখা গেছে।

টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে আবারও পণ্য চলাচল শুরু হওয়ায় আশার আলো দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তবে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রুটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের ওপর। 

বর্তমানে বন্দর ঘাটে আনুষঙ্গিক সেবা দেওয়ার জন্য বিপুল সংখ্যক শ্রমিক, সিএন্ডএফ এজেন্ট ও পরিবহন শ্রমিক প্রস্তুত আছেন। এবার প্রশাসনকে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত