আজ পহেলা মে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। ১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে মার্কেটের রক্তাক্ত স্মৃতি থেকে জন্ম নেওয়া এই দিনটি বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর এই দিনটিতে আমরা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কর্মঘণ্টা ও নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলি। সভা-সমাবেশ হয়, শোভাযাত্রা হয়, বিবৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো আজকের বাস্তবতায় একজন শ্রমিকের সামনে সবচেয়ে বড় সংকটটি কি আমরা আদৌ চিনতে পারছি?
সেই সংকটের নাম জলবায়ু পরিবর্তন। এটি মজুরির চেয়েও বড়, কর্মঘণ্টার চেয়েও গুরুতর। কারণ এটি শ্রমিকের শরীর ও জীবিকা দুটোকেই একসঙ্গে আক্রমণ করছে। অথচ এই সংকট নীতি-আলোচনায় সবচেয়ে কম জায়গা পায়। শ্রমিক দিবসের মঞ্চে জলবায়ু পরিবর্তনের কথা প্রায় উঠেই না।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। জার্মান ওয়াচ প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২১ অনুযায়ী, গত দুই দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দশটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে রয়েছে। এই ক্ষতির সরাসরি শিকার সেই কোটি কোটি শ্রমিক যাদের জীবিকা রোদ-বৃষ্টি-তাপের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যারা এয়ারকন্ডিশন্ড অফিসে বসে কাজ করেন না, বরং খোলা মাঠে, ইটভাটায়, রাস্তায়, নদীতে প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি লড়াই করে বেঁচে থাকেন।
শ্রমের নতুন শত্রু: বাড়তি তাপমাত্রা
বাংলাদেশে শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ কাজ করে খোলা আকাশের নিচে। কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক, ইটভাটা শ্রমিক, পরিবহন কর্মী- এরা সবাই সরাসরি প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমশক্তি অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, যাদের অধিকাংশই আবহাওয়ার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। এই মানুষগুলোর কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভবিষ্যতের হুমকি নয় বরং এটি আজকের বাস্তবতা।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫০ বছরে দেশের গড় তাপমাত্রা প্রায় ০.৫ থেকে ০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি ছোট সংখ্যা মনে হলেও বাস্তবে এর প্রভাব ভয়াবহ। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসএপি) ২০০৯ অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে দেশের গড় তাপমাত্রা আরও ২ থেকে ৪ ডিগ্রি বাড়তে পারে। আর সেটি হলে বাংলাদেশের বহু এলাকা মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।
২০২৩ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশে একাধিক তীব্র তাপপ্রবাহ (হিটওয়েব) আঘাত হেনেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলে রাজশাহীসহ দেশের বেশ কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪২–৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। যা গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। এই অবস্থায় বাইরে কাজ করা একজন নির্মাণ শ্রমিক বা ভ্যানচালকের জন্য রীতিমতো জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
৩৩ ডিগ্রিতে কর্মক্ষমতা কমে ৫০ শতাংশ
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ২০১৯-এর “ওয়ার্কিং অন এ ওয়ার্মার প্ল্যানেট (২০১৯)” শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে ভারী কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একজন নির্মাণ শ্রমিক যখন ৩৮-৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় কাজ করেন, তখন একই কাজে তাকে দ্বিগুণ কষ্ট করতে হয়। কিন্তু মজুরি একই থাকে। অর্থাৎ কার্যত তার শ্রমের মূল্য কমে যাচ্ছে। কারণ সে কম উৎপাদন করতে পারছে। অথচ এই ক্ষতির কোনো ক্ষতিপূরণ নেই।
আগুনের নিচে পানি সংকট
রাজশাহীর বারিন্দ অঞ্চল বাংলাদেশের অন্যতম খরা-প্রবণ এলাকা এবং দেশের শ্রম-জলবায়ু সম্পর্কের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, এই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর ১-২ মিটার পর্যন্ত নিচে নামছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত অনিয়মিত হয়ে পড়ায় খাল, বিল ও জলাশয় শুকিয়ে যাচ্ছে। ১৯৮০-এর দশকে যেখানে ২০-৩০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে ১০০-১৫০ ফুটেরও বেশি গভীরে যেতে হচ্ছে।
এই সংকটের মাঝেও কৃষকরা বোরো ধান চাষ চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ এটিই তাদের প্রধান নগদ ফসল। অথচ বোরো ধান সবচেয়ে বেশি পানিনির্ভর। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, এক কেজি ধান উৎপাদনে প্রয়োজন হয় প্রায় ৩০০০-৫০০০ লিটার পানি। এই পানি এখন তুলতে হচ্ছে আরও গভীর থেকে। অর্থাৎ বাড়ছে বিদ্যুৎ খরচ, বাড়ছে শ্রম, কমছে মুনাফা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে, গত দশ বছরে বারিন্দ অঞ্চলে গভীর নলকূপের সংখ্যা বেড়েছে কিন্তু জলের উপলব্ধতা কমেছে। একই সময়ে সেচের খরচ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এই বাড়তি খরচের বোঝা পড়ছে প্রান্তিক কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের ওপর। ফলে একজন কৃষি শ্রমিক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় মাঠে কাটাচ্ছেন তীব্র রোদের মধ্যে। তবুও তার আয় স্থির বা কমছে।
সংকটের আরেকটি মারাত্মক দিক হলো খাওয়ার পানির অভাব। গরমের দিনে মাঠে কাজ করা একজন শ্রমিকের দৈনিক ৩-৫ লিটার নিরাপদ পানির প্রয়োজন হয়। অথচ বারিন্দ অঞ্চলের অনেক গ্রামে পানীয় জলের সংকট প্রকট। শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে অনিরাপদ উৎসের পানি পান করছেন। যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।
অর্থনীতির নীরব ক্ষতি
জলবায়ু পরিবর্তনের একটি কম আলোচিত কিন্তু মারাত্মক প্রভাব হলো হিডেন কস্ট বা নীরব অর্থনৈতিক ক্ষতি। আইএলও-এর ২০১৯ সালের প্রতিবেদন বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে তাপজনিত কারণে মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৫–৬ শতাংশ হারিয়ে যেতে পারে। অর্থমূল্যে হিসাব করলে এটি দাঁড়ায় বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৪-৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ক্ষতিতে।
বিশ্বব্যাংকের গ্রাউন্ডসওয়েল সাউথ এশিয়া (২০২১) প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশজুড়ে ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে। এই মানুষদের বেশিরভাগই শ্রমিক শ্রেণির।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: নীরব বিপর্যয়
অতিরিক্ত তাপমাত্রায় কাজ করার ফলে শ্রমিকদের মধ্যে হিট স্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন, কিডনি রোগ ও হৃদরোগের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৪ লাখ ৮৯ হাজার মানুষ অতিরিক্ত তাপজনিত কারণে মারা যায়। এই মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।
ল্যান্সেট কাউন্টডাউন ২০২৩ প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ১৯৯১-২০০০ সালের তুলনায় ২০১৩-২০২২ সালে বৈশ্বিক তাপ-সম্পর্কিত মৃত্যু ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান সীমিত হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে গরমের মৌসুমে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ (সিকেডিইউএ)। গবেষণায় দেখা গেছে, গরম আবহাওয়ায় ভারী পরিশ্রম করা শ্রমিকদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ অনেক বেশি। কেন্দ্রীয় আমেরিকার আখ ক্ষেতের শ্রমিকদের মধ্যে এই রোগে মৃত্যুর হার মহামারি পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশের মতো দেশে একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই শ্রমিকদের বেশিরভাগেরই কোনো স্বাস্থ্য বীমা বা প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা সুবিধা নেই। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী নিয়োগকর্তার চিকিৎসা সুবিধা দেওয়ার বিধান থাকলেও অনানুষ্ঠানিক খাতে এটি কার্যত অনুপস্থিত। একজন শ্রমিক হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসার খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে জমি বিক্রি করে বা ঋণ নিয়ে।
নারী শ্রমিক: দ্বিগুণ চাপ, অর্ধেক স্বীকৃতি
বাংলাদেশে নারী শ্রমিকরা একটি বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। তারা একই সময়ে বাইরের কাজ করেন এবং ঘরের কাজও সামলান এই দ্বৈত শ্রমবোঝা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে আরও ভারী হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, নারী শ্রমিকরা একই কাজে পুরুষের তুলনায় গড়ে ২০–৩০% কম মজুরি পান।
বন্যার পর কাজ হারালে পরিবারের আয় সংকুচিত হয়- আর সেই সংকোচনের চাপ সবার আগে পড়ে নারী ও শিশুদের খাবারের থালায়। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জলবায়ু দুর্যোগের পর পরিবারের খাদ্য সংকটের সময় নারীরাই প্রথমে নিজের খাবার ছেড়ে দেন। এই ত্যাগ কোনো পরিসংখ্যানে নেই, কোনো নীতিতে নেই কিন্তু এটি প্রতিদিন ঘটছে, লক্ষ পরিবারে।
পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকরাও ঝুঁকির বাইরে নন। ঢাকার কারখানাগুলোতে এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা সীমিত। গ্রীষ্মকালীন তীব্র গরমে কারখানার ভেতরের তাপমাত্রা অসহনীয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গরমে অসুস্থ হয়ে পড়া শ্রমিকদের একটি বড় অংশই নারী। অথচ এই সংকট নীতি-আলোচনায় সবচেয়ে কম জায়গা পায়।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া বনাম বাংলাদেশ
বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে তাপজনিত শ্রম-ঝুঁকি মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে। ভারতে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশা রাজ্যে ‘হিট অ্যাকশন প্ল্যান’ চালু রয়েছে। যেখানে তীব্র গরমে বাইরের কাজের সময় সীমিত করা এবং শীতলকেন্দ্র স্থাপনের বিধান আছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম কৃষি শ্রমিকদের জন্য তাপ-সংবেদনশীল কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রায় বাইরে কাজের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বিশ্রাম ও পানির ব্যবস্থার আইন রয়েছে।
নতুন বাস্তবতায় নতুন নীতি
যদি আমরা সত্যিই শ্রমিকদের মর্যাদা দিতে চাই, তাহলে কিছু বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। প্রথমত, জাতীয় হিট অ্যাকশন প্ল্যা ফর লেবার চালু করা, তীব্র গরমে কাজের সময় পুনর্নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক বিশ্রাম এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষিতে পানি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করতে হবে। ড্রিপ ইরিগেশন ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। কম পানিনির্ভর ফসলে (যেমন সূর্যমুখী, ভুট্টা) চাষিদের উৎসাহিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, শ্রমিকদের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা চালু করতে হবে। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্যও স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। চতুর্থত, নারী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ নীতি প্রণয়ন করতে হবে। জলবায়ু-সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে নারীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। পঞ্চমত, শ্রম পরিদর্শন জোরদার করতে হবে। বিশেষত গরমকালে নির্মাণ ও কৃষি খাতে শ্রম পরিদর্শন বাড়াতে হবে। ষষ্ঠত, তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে তাপজনিত শ্রমিক মৃত্যু ও অসুস্থতার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান রাখতে হবে, যা নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে।
শ্রমের মর্যাদা ও বাঁচার পরিবেশ
শ্রমিকরা শুধু অর্থনীতির চাকা ঘোরায় না তারা আমাদের প্রতিদিনের জীবনকে সচল রাখে। তারা ভোরবেলা উঠে আমাদের জন্য ফসল ফলায়, আমাদের বাড়ি তৈরি করে, আমাদের পোশাক বানায়, আমাদের পণ্য পৌঁছে দেয়। অথচ আজ তারা এমন এক লড়াইয়ের মুখোমুখি, যেখানে প্রতিপক্ষ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি পরিবর্তিত জলবায়ু যা তৈরি হয়েছে মূলত ধনী দেশগুলোর শিল্পায়নের কারণে। কিন্তু ভোগ করতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো দেশের দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষকে।
পহেলা মে আমাদের শেখায় শ্রমের মর্যাদা দিতে হবে। কিন্তু এখন সময় এসেছে আরেকটি কথা যোগ করার- শ্রমিককে শুধু মর্যাদা নয়, তাকে বাঁচার পরিবেশও দিতে হবে। নাহলে হয়তো একদিন আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবো যেখানে কাজ থাকবে, কিন্তু কাজ করার মতো সুস্থ শ্রমিক থাকবে না।
মূলত, ‘জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশের সমস্যা নয় এটি শ্রমের সমস্যা, মানবাধিকারের সমস্যা।’ তাই, শ্রমিক দিবসে আমাদের প্রতিশ্রুতি হোক শুধু মঞ্চের বক্তৃতা নয়, বরং এমন নীতি ও বাজেট বরাদ্দ, যা এই নীরব সংকট থেকে কোটি কোটি শ্রমিককে সুরক্ষা দেবে। কারণ একজন সুস্থ, নিরাপদ শ্রমিকই পারে একটি সুস্থ অর্থনীতি গড়ে তুলতে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গবেষক।

শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ মে ২০২৬
আজ পহেলা মে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। ১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে মার্কেটের রক্তাক্ত স্মৃতি থেকে জন্ম নেওয়া এই দিনটি বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর এই দিনটিতে আমরা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কর্মঘণ্টা ও নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলি। সভা-সমাবেশ হয়, শোভাযাত্রা হয়, বিবৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো আজকের বাস্তবতায় একজন শ্রমিকের সামনে সবচেয়ে বড় সংকটটি কি আমরা আদৌ চিনতে পারছি?
সেই সংকটের নাম জলবায়ু পরিবর্তন। এটি মজুরির চেয়েও বড়, কর্মঘণ্টার চেয়েও গুরুতর। কারণ এটি শ্রমিকের শরীর ও জীবিকা দুটোকেই একসঙ্গে আক্রমণ করছে। অথচ এই সংকট নীতি-আলোচনায় সবচেয়ে কম জায়গা পায়। শ্রমিক দিবসের মঞ্চে জলবায়ু পরিবর্তনের কথা প্রায় উঠেই না।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। জার্মান ওয়াচ প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২১ অনুযায়ী, গত দুই দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দশটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে রয়েছে। এই ক্ষতির সরাসরি শিকার সেই কোটি কোটি শ্রমিক যাদের জীবিকা রোদ-বৃষ্টি-তাপের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যারা এয়ারকন্ডিশন্ড অফিসে বসে কাজ করেন না, বরং খোলা মাঠে, ইটভাটায়, রাস্তায়, নদীতে প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি লড়াই করে বেঁচে থাকেন।
শ্রমের নতুন শত্রু: বাড়তি তাপমাত্রা
বাংলাদেশে শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ কাজ করে খোলা আকাশের নিচে। কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক, ইটভাটা শ্রমিক, পরিবহন কর্মী- এরা সবাই সরাসরি প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমশক্তি অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, যাদের অধিকাংশই আবহাওয়ার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। এই মানুষগুলোর কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভবিষ্যতের হুমকি নয় বরং এটি আজকের বাস্তবতা।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫০ বছরে দেশের গড় তাপমাত্রা প্রায় ০.৫ থেকে ০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি ছোট সংখ্যা মনে হলেও বাস্তবে এর প্রভাব ভয়াবহ। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসএপি) ২০০৯ অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে দেশের গড় তাপমাত্রা আরও ২ থেকে ৪ ডিগ্রি বাড়তে পারে। আর সেটি হলে বাংলাদেশের বহু এলাকা মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।
২০২৩ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশে একাধিক তীব্র তাপপ্রবাহ (হিটওয়েব) আঘাত হেনেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলে রাজশাহীসহ দেশের বেশ কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪২–৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। যা গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। এই অবস্থায় বাইরে কাজ করা একজন নির্মাণ শ্রমিক বা ভ্যানচালকের জন্য রীতিমতো জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
৩৩ ডিগ্রিতে কর্মক্ষমতা কমে ৫০ শতাংশ
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ২০১৯-এর “ওয়ার্কিং অন এ ওয়ার্মার প্ল্যানেট (২০১৯)” শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ালে ভারী কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একজন নির্মাণ শ্রমিক যখন ৩৮-৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় কাজ করেন, তখন একই কাজে তাকে দ্বিগুণ কষ্ট করতে হয়। কিন্তু মজুরি একই থাকে। অর্থাৎ কার্যত তার শ্রমের মূল্য কমে যাচ্ছে। কারণ সে কম উৎপাদন করতে পারছে। অথচ এই ক্ষতির কোনো ক্ষতিপূরণ নেই।
আগুনের নিচে পানি সংকট
রাজশাহীর বারিন্দ অঞ্চল বাংলাদেশের অন্যতম খরা-প্রবণ এলাকা এবং দেশের শ্রম-জলবায়ু সম্পর্কের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, এই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর ১-২ মিটার পর্যন্ত নিচে নামছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত অনিয়মিত হয়ে পড়ায় খাল, বিল ও জলাশয় শুকিয়ে যাচ্ছে। ১৯৮০-এর দশকে যেখানে ২০-৩০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে ১০০-১৫০ ফুটেরও বেশি গভীরে যেতে হচ্ছে।
এই সংকটের মাঝেও কৃষকরা বোরো ধান চাষ চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ এটিই তাদের প্রধান নগদ ফসল। অথচ বোরো ধান সবচেয়ে বেশি পানিনির্ভর। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, এক কেজি ধান উৎপাদনে প্রয়োজন হয় প্রায় ৩০০০-৫০০০ লিটার পানি। এই পানি এখন তুলতে হচ্ছে আরও গভীর থেকে। অর্থাৎ বাড়ছে বিদ্যুৎ খরচ, বাড়ছে শ্রম, কমছে মুনাফা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে, গত দশ বছরে বারিন্দ অঞ্চলে গভীর নলকূপের সংখ্যা বেড়েছে কিন্তু জলের উপলব্ধতা কমেছে। একই সময়ে সেচের খরচ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এই বাড়তি খরচের বোঝা পড়ছে প্রান্তিক কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের ওপর। ফলে একজন কৃষি শ্রমিক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় মাঠে কাটাচ্ছেন তীব্র রোদের মধ্যে। তবুও তার আয় স্থির বা কমছে।
সংকটের আরেকটি মারাত্মক দিক হলো খাওয়ার পানির অভাব। গরমের দিনে মাঠে কাজ করা একজন শ্রমিকের দৈনিক ৩-৫ লিটার নিরাপদ পানির প্রয়োজন হয়। অথচ বারিন্দ অঞ্চলের অনেক গ্রামে পানীয় জলের সংকট প্রকট। শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে অনিরাপদ উৎসের পানি পান করছেন। যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।
অর্থনীতির নীরব ক্ষতি
জলবায়ু পরিবর্তনের একটি কম আলোচিত কিন্তু মারাত্মক প্রভাব হলো হিডেন কস্ট বা নীরব অর্থনৈতিক ক্ষতি। আইএলও-এর ২০১৯ সালের প্রতিবেদন বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে তাপজনিত কারণে মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৫–৬ শতাংশ হারিয়ে যেতে পারে। অর্থমূল্যে হিসাব করলে এটি দাঁড়ায় বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৪-৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ক্ষতিতে।
বিশ্বব্যাংকের গ্রাউন্ডসওয়েল সাউথ এশিয়া (২০২১) প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশজুড়ে ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে। এই মানুষদের বেশিরভাগই শ্রমিক শ্রেণির।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: নীরব বিপর্যয়
অতিরিক্ত তাপমাত্রায় কাজ করার ফলে শ্রমিকদের মধ্যে হিট স্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন, কিডনি রোগ ও হৃদরোগের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৪ লাখ ৮৯ হাজার মানুষ অতিরিক্ত তাপজনিত কারণে মারা যায়। এই মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।
ল্যান্সেট কাউন্টডাউন ২০২৩ প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ১৯৯১-২০০০ সালের তুলনায় ২০১৩-২০২২ সালে বৈশ্বিক তাপ-সম্পর্কিত মৃত্যু ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান সীমিত হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে গরমের মৌসুমে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ (সিকেডিইউএ)। গবেষণায় দেখা গেছে, গরম আবহাওয়ায় ভারী পরিশ্রম করা শ্রমিকদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ অনেক বেশি। কেন্দ্রীয় আমেরিকার আখ ক্ষেতের শ্রমিকদের মধ্যে এই রোগে মৃত্যুর হার মহামারি পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশের মতো দেশে একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই শ্রমিকদের বেশিরভাগেরই কোনো স্বাস্থ্য বীমা বা প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা সুবিধা নেই। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী নিয়োগকর্তার চিকিৎসা সুবিধা দেওয়ার বিধান থাকলেও অনানুষ্ঠানিক খাতে এটি কার্যত অনুপস্থিত। একজন শ্রমিক হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসার খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে জমি বিক্রি করে বা ঋণ নিয়ে।
নারী শ্রমিক: দ্বিগুণ চাপ, অর্ধেক স্বীকৃতি
বাংলাদেশে নারী শ্রমিকরা একটি বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। তারা একই সময়ে বাইরের কাজ করেন এবং ঘরের কাজও সামলান এই দ্বৈত শ্রমবোঝা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে আরও ভারী হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, নারী শ্রমিকরা একই কাজে পুরুষের তুলনায় গড়ে ২০–৩০% কম মজুরি পান।
বন্যার পর কাজ হারালে পরিবারের আয় সংকুচিত হয়- আর সেই সংকোচনের চাপ সবার আগে পড়ে নারী ও শিশুদের খাবারের থালায়। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জলবায়ু দুর্যোগের পর পরিবারের খাদ্য সংকটের সময় নারীরাই প্রথমে নিজের খাবার ছেড়ে দেন। এই ত্যাগ কোনো পরিসংখ্যানে নেই, কোনো নীতিতে নেই কিন্তু এটি প্রতিদিন ঘটছে, লক্ষ পরিবারে।
পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকরাও ঝুঁকির বাইরে নন। ঢাকার কারখানাগুলোতে এয়ার কন্ডিশনিং ব্যবস্থা সীমিত। গ্রীষ্মকালীন তীব্র গরমে কারখানার ভেতরের তাপমাত্রা অসহনীয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গরমে অসুস্থ হয়ে পড়া শ্রমিকদের একটি বড় অংশই নারী। অথচ এই সংকট নীতি-আলোচনায় সবচেয়ে কম জায়গা পায়।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া বনাম বাংলাদেশ
বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে তাপজনিত শ্রম-ঝুঁকি মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে। ভারতে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশা রাজ্যে ‘হিট অ্যাকশন প্ল্যান’ চালু রয়েছে। যেখানে তীব্র গরমে বাইরের কাজের সময় সীমিত করা এবং শীতলকেন্দ্র স্থাপনের বিধান আছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম কৃষি শ্রমিকদের জন্য তাপ-সংবেদনশীল কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রায় বাইরে কাজের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বিশ্রাম ও পানির ব্যবস্থার আইন রয়েছে।
নতুন বাস্তবতায় নতুন নীতি
যদি আমরা সত্যিই শ্রমিকদের মর্যাদা দিতে চাই, তাহলে কিছু বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। প্রথমত, জাতীয় হিট অ্যাকশন প্ল্যা ফর লেবার চালু করা, তীব্র গরমে কাজের সময় পুনর্নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক বিশ্রাম এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষিতে পানি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করতে হবে। ড্রিপ ইরিগেশন ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। কম পানিনির্ভর ফসলে (যেমন সূর্যমুখী, ভুট্টা) চাষিদের উৎসাহিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, শ্রমিকদের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা চালু করতে হবে। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্যও স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। চতুর্থত, নারী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ নীতি প্রণয়ন করতে হবে। জলবায়ু-সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে নারীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। পঞ্চমত, শ্রম পরিদর্শন জোরদার করতে হবে। বিশেষত গরমকালে নির্মাণ ও কৃষি খাতে শ্রম পরিদর্শন বাড়াতে হবে। ষষ্ঠত, তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে তাপজনিত শ্রমিক মৃত্যু ও অসুস্থতার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান রাখতে হবে, যা নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে।
শ্রমের মর্যাদা ও বাঁচার পরিবেশ
শ্রমিকরা শুধু অর্থনীতির চাকা ঘোরায় না তারা আমাদের প্রতিদিনের জীবনকে সচল রাখে। তারা ভোরবেলা উঠে আমাদের জন্য ফসল ফলায়, আমাদের বাড়ি তৈরি করে, আমাদের পোশাক বানায়, আমাদের পণ্য পৌঁছে দেয়। অথচ আজ তারা এমন এক লড়াইয়ের মুখোমুখি, যেখানে প্রতিপক্ষ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি পরিবর্তিত জলবায়ু যা তৈরি হয়েছে মূলত ধনী দেশগুলোর শিল্পায়নের কারণে। কিন্তু ভোগ করতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো দেশের দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষকে।
পহেলা মে আমাদের শেখায় শ্রমের মর্যাদা দিতে হবে। কিন্তু এখন সময় এসেছে আরেকটি কথা যোগ করার- শ্রমিককে শুধু মর্যাদা নয়, তাকে বাঁচার পরিবেশও দিতে হবে। নাহলে হয়তো একদিন আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবো যেখানে কাজ থাকবে, কিন্তু কাজ করার মতো সুস্থ শ্রমিক থাকবে না।
মূলত, ‘জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশের সমস্যা নয় এটি শ্রমের সমস্যা, মানবাধিকারের সমস্যা।’ তাই, শ্রমিক দিবসে আমাদের প্রতিশ্রুতি হোক শুধু মঞ্চের বক্তৃতা নয়, বরং এমন নীতি ও বাজেট বরাদ্দ, যা এই নীরব সংকট থেকে কোটি কোটি শ্রমিককে সুরক্ষা দেবে। কারণ একজন সুস্থ, নিরাপদ শ্রমিকই পারে একটি সুস্থ অর্থনীতি গড়ে তুলতে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গবেষক।

আপনার মতামত লিখুন