সংবাদ

ফেনীর ‘মেঘ বিস্ফোরণ’ কোন বিপদের বার্তা


সৈয়দা বদরুন নেসা
সৈয়দা বদরুন নেসা
প্রকাশ: ৪ মে ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম

ফেনীর ‘মেঘ বিস্ফোরণ’ কোন বিপদের বার্তা

ঊনিশে বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের উৎসবের রেশ পুরোপুরি মেলায়নি। অথচ বাড়ির আলমারি থেকে বের হয়ে এসেছে পুরনো কাঁথা। মে মাসে কাঁথা গায়ে দেওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশে আগে কল্পনাও করা যেত না। এই সময়টা হওয়ার কথা তীব্র দাবদাহের। ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় পোড়া রোদ, ঘামে ভেজা শরীর, লু হাওয়ায় ঘর থেকে বের না হওয়ার দিন। অথচ আকাশ মেঘলা, বাতাসে কনকনে ঠান্ডার পরশ।

মাত্র দিন কয়েক আগেও কিন্তু ছিল উল্টো চিত্র। তীব্র তাপদাহে পুড়ছিল দেশ। মানুষ হাঁসফাঁস করছিল রাস্তায়, মাঠে, কলকারখানায়। আর এখন? হঠাৎ ঠান্ডা, ঝড়ো হাওয়া, ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস। এত দ্রুত, এত তীব্র এই পরিবর্তন এটি কি শুধু আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা? না। এটি একটি গভীর সংকটের বার্তা।

গত ২৮ এপ্রিল ফেনী জেলায় ঘটে যাওয়া ঘটনা বাংলাদেশের আবহাওয়ার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি আছড়ে পড়ে। হঠাৎ ফ্ল্যাশ ফ্লাড দেখা দেয়। নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যায়। স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর বলেছে, এই বৃষ্টিপাত সময় ও তীব্রতার বিচারে ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক’।

আবহাওয়াবিদরা এই ঘটনাকে চিহ্নিত করেছেন বিশেষ নামে ‘ক্লাউডবার্স্ট’ বা ‘মেঘ-বিস্ফোরণ’। এটি হলো অত্যন্ত স্বল্প সময়ে অত্যধিক বৃষ্টিপাত। প্রায় এক ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি একটি সীমিত এলাকায়, যা তাৎক্ষণিক ও তীব্র বন্যার সৃষ্টি করে। এই বিস্ফোরণ ঘটে যখন গরম জলীয়বাষ্প হঠাৎ ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে আসে। মুহূর্তের মধ্যে তা ঘনীভূত হয়ে প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। এটি কোনো সাধারণ বৃষ্টি নয়। এটি আক্ষরিক অর্থেই আকাশ ফেটে পড়া।

বচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ক্লাউডবার্স্ট ঐতিহ্যগতভাবে পাহাড়ি অঞ্চলের ঘটনা। ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড- এসব জায়গায় এটি পরিচিত দুর্যোগ। কিন্তু বাংলাদেশের মতো সমতল বদ্বীপে এটি নতুন এবং ভয়ঙ্কর ঘটনা। আমাদের অনেকেই জানেন না এটা কী। আমাদের অবকাঠামো প্রস্তুত নয় এর মোকাবেলায়। এমনকি আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাঠ্যবইয়েও এটির কথা নেই।

ক্লাউডবার্স্টের পাশাপাশি আরেকটি বিপজ্জনক ঘটনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। যা হচ্ছে ‘ক্লাউড স্টলিং’। দুর্বল বায়ুপ্রবাহ বা বায়ুমণ্ডলীয় চাপের ভারসাম্যহীনতার কারণে ঝড়ের মেঘ একটি নির্দিষ্ট এলাকার উপর থেমে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে একই স্থানে প্রবল বৃষ্টি ঢেলে দেয়। এমনকি পূর্ণাঙ্গ ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও। মেঘ যখন হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, তখন তার নিচের মানুষের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।

তীব্র গরমের পর হঠাৎ এই কনকনে ঠান্ডার পেছনে রয়েছে একটি বৈশ্বিক সমুদ্রীয় ঘটনা লা নিনা। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয় তাকে বিজ্ঞানীরা বলেন লা নিনা। এর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরে সীমাবদ্ধ থাকে না। লা নিনা সক্রিয় থাকলে বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত, শক্তিশালী মৌসুমি বায়ু এবং বড় ধরনের বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু লা নিনা একা এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়। দায়ী হলো দশকের পর দশক ধরে জমে ওঠা কার্বন নিঃসরণ, উষ্ণ হয়ে ওঠা বঙ্গোপসাগর, আর বায়ুমণ্ডলের ভেতরে জমা হওয়া অতিরিক্ত তাপশক্তি যা এখন হঠাৎ হঠাৎ বিভিন্ন রূপে বিস্ফোরিত হচ্ছে।

ফেনীর ক্লাউডবার্স্ট একটি সতর্কসংকেত। আগামী দিনে বাংলাদেশ এমন আরও কিছু অপরিচিত দুর্যোগের মুখোমুখি হতে পারে। যার সঙ্গে আমাদের এখনো পরিচয় নেই।

তাপ গম্বুজ: উচ্চচাপের একটি বিশাল বায়ুস্তম্ভ যখন কোনো এলাকার উপর আটকে যায়, তখন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০-১৫ ডিগ্রি বেশি উঠে যেতে পারে। কানাডায় ২০২১ সালে এটি ঘটেছিল। মানুষ মরেছিল রাস্তায়। বাংলাদেশে এই ঘটনার আশঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে।

আকস্মিক খরা: একদিন প্রবল বৃষ্টি, তার তিনদিন পরেই মাঠ ফেটে চৌচির- এই দ্রুত ও অপ্রত্যাশিত খরার ধরনটি জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন উপহার। কৃষকের পক্ষে এর সঙ্গে খাপ খাওয়ানো প্রায় অসম্ভব।

অফ-সিজন সাইক্লোন: ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম এখন আর নির্দিষ্ট নেই। বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ পানি এখন শীতকালেও ঘূর্ণিঝড় তৈরিতে সক্ষম। এমন ঘূর্ণিঝড় আসবে যখন আমরা আদৌ প্রস্তুত থাকব না।

লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ: সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপকূলীয় নদী ও মাটিতে লবণ ঢুকছে। এটি ধীর গতির দুর্যোগ। হঠাৎ ঘূর্ণিঝড়ের মতো দৃশ্যমান নয়। কিন্তু ধীরে ধীরে কৃষিজমি, পানীয় জল আর জনজীবনকে বিষিয়ে দিচ্ছে।

এখনই যা করতে হবে

শুধু বিপদের কথা বললে ভয় আর আতঙ্ক হয়, নীতি হয় না। তাই প্রশ্ন করতে হবে- এই অচেনা দুর্যোগগুলোর সামনে বাংলাদেশ আসলে কী করতে পারে? প্রথমত জানতে হবে, জানাতে হবে। ক্লাউডবার্স্ট, হিট ডোম, ফ্ল্যাশ ড্রট- এই শব্দগুলো এখনো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত। অথচ এই বিপদগুলো এখন দোরগোড়ায়। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের অধ্যায় নতুন করে লিখতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মোবাইলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস স্থানীয় ভাষায় আরও দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত খাল বাঁচাও, শহর বাঁচাও। ঢাকায় গত পঞ্চাশ বছরে যত খাল ভরাট হয়েছে, যত জলাভূমি দখল হয়েছে সেগুলো ছিল শহরের প্রাকৃতিক স্পঞ্জ। ক্লাউডবার্স্টের মতো আকস্মিক ভারী বৃষ্টিতে সেই স্পঞ্জ না থাকলে পানি যাবে কোথায়? রাস্তায়, ঘরে, মানুষের জীবনে। যেসব খাল এখনো আছে সেগুলো দখলমুক্ত করা রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন, প্রযুক্তির নয়।

তৃতীয়ত, কৃষিকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে হবে। লবণসহিষ্ণু ধানের জাত, খরা-প্রতিরোধী সবজি, ভাসমান কৃষি- এই প্রযুক্তিগুলো বাংলাদেশে আছে, কিন্তু সারাদেশে ছড়ায়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে শুধু ফলন বাড়ানোর দপ্তর না রেখে জলবায়ু অভিযোজনের দপ্তরে পরিণত করতে হবে।

চতুর্থত বিশ্বের কাছে ক্ষতিপূরণ চাই। বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে যুক্ত করে মাত্র শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ। অথচ মূল্য চোকাচ্ছি সবচেয়ে বেশি। ধনী দেশগুলোর শতাব্দীর শিল্পায়নের পাপের ফল ভোগ করছে ফেনীর বন্যাকবলিত মানুষ, সুন্দরবনের লবণাক্ত মাটি, বৈশাখের কাঁথা-মোড়ানো কৃষক। ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিলের যে দাবি বাংলাদেশ করে আসছে, সেটি ভিক্ষা নয় এটি ন্যায্য ক্ষতিপূরণ।

পঞ্চমত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আপডেট করতে হবে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিশ্বে প্রশংসিত। কিন্তু ক্লাউডবার্স্ট, হিট ডোম বা ফ্ল্যাশ ড্রটের জন্য কোনো প্রোটোকল নেই। নেই প্রশিক্ষিত জনবল, নেই আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম। এই শূন্যতা এখনই পূরণ করতে হবে পরে নয়। কারণ পরে আর সময় নাও থাকতে পারে।

বৈশাখের এই কাঁথা-মোড়ানো রাত, ফেনীর মেঘ-বিস্ফোরণ, কয়েকদিন আগের দাহানো তাপ- এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটাই বার্তার ভিন্ন ভিন্ন ভাষা। প্রকৃতি বলছে ,‘আমি বদলে গেছি। তোমরাও বদলাও।’

বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, এই জাতি বিপদে ভাঙে না। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, ফণী- প্রতিটিতে আমরা উঠে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু সেই বিপদগুলো আমরা চিনতাম। আগামীর বিপদগুলো অচেনা। তাই এবার শুধু সাহস যথেষ্ট নয় দরকার জ্ঞান, প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

প্রশ্ন একটাই- ঘুম ভাঙার আগে আর কতটা ক্ষতি হতে দিব আমরা?

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০৪ মে ২০২৬


ফেনীর ‘মেঘ বিস্ফোরণ’ কোন বিপদের বার্তা

প্রকাশের তারিখ : ০৪ মে ২০২৬

featured Image

ঊনিশে বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের উৎসবের রেশ পুরোপুরি মেলায়নি। অথচ বাড়ির আলমারি থেকে বের হয়ে এসেছে পুরনো কাঁথা। মে মাসে কাঁথা গায়ে দেওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশে আগে কল্পনাও করা যেত না। এই সময়টা হওয়ার কথা তীব্র দাবদাহের। ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় পোড়া রোদ, ঘামে ভেজা শরীর, লু হাওয়ায় ঘর থেকে বের না হওয়ার দিন। অথচ আকাশ মেঘলা, বাতাসে কনকনে ঠান্ডার পরশ।

মাত্র দিন কয়েক আগেও কিন্তু ছিল উল্টো চিত্র। তীব্র তাপদাহে পুড়ছিল দেশ। মানুষ হাঁসফাঁস করছিল রাস্তায়, মাঠে, কলকারখানায়। আর এখন? হঠাৎ ঠান্ডা, ঝড়ো হাওয়া, ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস। এত দ্রুত, এত তীব্র এই পরিবর্তন এটি কি শুধু আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা? না। এটি একটি গভীর সংকটের বার্তা।

গত ২৮ এপ্রিল ফেনী জেলায় ঘটে যাওয়া ঘটনা বাংলাদেশের আবহাওয়ার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি আছড়ে পড়ে। হঠাৎ ফ্ল্যাশ ফ্লাড দেখা দেয়। নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যায়। স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর বলেছে, এই বৃষ্টিপাত সময় ও তীব্রতার বিচারে ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক’।

আবহাওয়াবিদরা এই ঘটনাকে চিহ্নিত করেছেন বিশেষ নামে ‘ক্লাউডবার্স্ট’ বা ‘মেঘ-বিস্ফোরণ’। এটি হলো অত্যন্ত স্বল্প সময়ে অত্যধিক বৃষ্টিপাত। প্রায় এক ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি একটি সীমিত এলাকায়, যা তাৎক্ষণিক ও তীব্র বন্যার সৃষ্টি করে। এই বিস্ফোরণ ঘটে যখন গরম জলীয়বাষ্প হঠাৎ ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে আসে। মুহূর্তের মধ্যে তা ঘনীভূত হয়ে প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। এটি কোনো সাধারণ বৃষ্টি নয়। এটি আক্ষরিক অর্থেই আকাশ ফেটে পড়া।

বচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ক্লাউডবার্স্ট ঐতিহ্যগতভাবে পাহাড়ি অঞ্চলের ঘটনা। ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড- এসব জায়গায় এটি পরিচিত দুর্যোগ। কিন্তু বাংলাদেশের মতো সমতল বদ্বীপে এটি নতুন এবং ভয়ঙ্কর ঘটনা। আমাদের অনেকেই জানেন না এটা কী। আমাদের অবকাঠামো প্রস্তুত নয় এর মোকাবেলায়। এমনকি আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাঠ্যবইয়েও এটির কথা নেই।

ক্লাউডবার্স্টের পাশাপাশি আরেকটি বিপজ্জনক ঘটনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। যা হচ্ছে ‘ক্লাউড স্টলিং’। দুর্বল বায়ুপ্রবাহ বা বায়ুমণ্ডলীয় চাপের ভারসাম্যহীনতার কারণে ঝড়ের মেঘ একটি নির্দিষ্ট এলাকার উপর থেমে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে একই স্থানে প্রবল বৃষ্টি ঢেলে দেয়। এমনকি পূর্ণাঙ্গ ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও। মেঘ যখন হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, তখন তার নিচের মানুষের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।

তীব্র গরমের পর হঠাৎ এই কনকনে ঠান্ডার পেছনে রয়েছে একটি বৈশ্বিক সমুদ্রীয় ঘটনা লা নিনা। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয় তাকে বিজ্ঞানীরা বলেন লা নিনা। এর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরে সীমাবদ্ধ থাকে না। লা নিনা সক্রিয় থাকলে বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত, শক্তিশালী মৌসুমি বায়ু এবং বড় ধরনের বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু লা নিনা একা এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়। দায়ী হলো দশকের পর দশক ধরে জমে ওঠা কার্বন নিঃসরণ, উষ্ণ হয়ে ওঠা বঙ্গোপসাগর, আর বায়ুমণ্ডলের ভেতরে জমা হওয়া অতিরিক্ত তাপশক্তি যা এখন হঠাৎ হঠাৎ বিভিন্ন রূপে বিস্ফোরিত হচ্ছে।

ফেনীর ক্লাউডবার্স্ট একটি সতর্কসংকেত। আগামী দিনে বাংলাদেশ এমন আরও কিছু অপরিচিত দুর্যোগের মুখোমুখি হতে পারে। যার সঙ্গে আমাদের এখনো পরিচয় নেই।

তাপ গম্বুজ: উচ্চচাপের একটি বিশাল বায়ুস্তম্ভ যখন কোনো এলাকার উপর আটকে যায়, তখন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১০-১৫ ডিগ্রি বেশি উঠে যেতে পারে। কানাডায় ২০২১ সালে এটি ঘটেছিল। মানুষ মরেছিল রাস্তায়। বাংলাদেশে এই ঘটনার আশঙ্কা ক্রমশ বাড়ছে।

আকস্মিক খরা: একদিন প্রবল বৃষ্টি, তার তিনদিন পরেই মাঠ ফেটে চৌচির- এই দ্রুত ও অপ্রত্যাশিত খরার ধরনটি জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন উপহার। কৃষকের পক্ষে এর সঙ্গে খাপ খাওয়ানো প্রায় অসম্ভব।

অফ-সিজন সাইক্লোন: ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম এখন আর নির্দিষ্ট নেই। বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ পানি এখন শীতকালেও ঘূর্ণিঝড় তৈরিতে সক্ষম। এমন ঘূর্ণিঝড় আসবে যখন আমরা আদৌ প্রস্তুত থাকব না।

লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ: সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপকূলীয় নদী ও মাটিতে লবণ ঢুকছে। এটি ধীর গতির দুর্যোগ। হঠাৎ ঘূর্ণিঝড়ের মতো দৃশ্যমান নয়। কিন্তু ধীরে ধীরে কৃষিজমি, পানীয় জল আর জনজীবনকে বিষিয়ে দিচ্ছে।

এখনই যা করতে হবে

শুধু বিপদের কথা বললে ভয় আর আতঙ্ক হয়, নীতি হয় না। তাই প্রশ্ন করতে হবে- এই অচেনা দুর্যোগগুলোর সামনে বাংলাদেশ আসলে কী করতে পারে? প্রথমত জানতে হবে, জানাতে হবে। ক্লাউডবার্স্ট, হিট ডোম, ফ্ল্যাশ ড্রট- এই শব্দগুলো এখনো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত। অথচ এই বিপদগুলো এখন দোরগোড়ায়। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের অধ্যায় নতুন করে লিখতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মোবাইলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস স্থানীয় ভাষায় আরও দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত খাল বাঁচাও, শহর বাঁচাও। ঢাকায় গত পঞ্চাশ বছরে যত খাল ভরাট হয়েছে, যত জলাভূমি দখল হয়েছে সেগুলো ছিল শহরের প্রাকৃতিক স্পঞ্জ। ক্লাউডবার্স্টের মতো আকস্মিক ভারী বৃষ্টিতে সেই স্পঞ্জ না থাকলে পানি যাবে কোথায়? রাস্তায়, ঘরে, মানুষের জীবনে। যেসব খাল এখনো আছে সেগুলো দখলমুক্ত করা রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন, প্রযুক্তির নয়।

তৃতীয়ত, কৃষিকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে হবে। লবণসহিষ্ণু ধানের জাত, খরা-প্রতিরোধী সবজি, ভাসমান কৃষি- এই প্রযুক্তিগুলো বাংলাদেশে আছে, কিন্তু সারাদেশে ছড়ায়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে শুধু ফলন বাড়ানোর দপ্তর না রেখে জলবায়ু অভিযোজনের দপ্তরে পরিণত করতে হবে।

চতুর্থত বিশ্বের কাছে ক্ষতিপূরণ চাই। বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে যুক্ত করে মাত্র শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ। অথচ মূল্য চোকাচ্ছি সবচেয়ে বেশি। ধনী দেশগুলোর শতাব্দীর শিল্পায়নের পাপের ফল ভোগ করছে ফেনীর বন্যাকবলিত মানুষ, সুন্দরবনের লবণাক্ত মাটি, বৈশাখের কাঁথা-মোড়ানো কৃষক। ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিলের যে দাবি বাংলাদেশ করে আসছে, সেটি ভিক্ষা নয় এটি ন্যায্য ক্ষতিপূরণ।

পঞ্চমত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আপডেট করতে হবে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিশ্বে প্রশংসিত। কিন্তু ক্লাউডবার্স্ট, হিট ডোম বা ফ্ল্যাশ ড্রটের জন্য কোনো প্রোটোকল নেই। নেই প্রশিক্ষিত জনবল, নেই আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম। এই শূন্যতা এখনই পূরণ করতে হবে পরে নয়। কারণ পরে আর সময় নাও থাকতে পারে।

বৈশাখের এই কাঁথা-মোড়ানো রাত, ফেনীর মেঘ-বিস্ফোরণ, কয়েকদিন আগের দাহানো তাপ- এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটাই বার্তার ভিন্ন ভিন্ন ভাষা। প্রকৃতি বলছে ,‘আমি বদলে গেছি। তোমরাও বদলাও।’

বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, এই জাতি বিপদে ভাঙে না। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, ফণী- প্রতিটিতে আমরা উঠে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু সেই বিপদগুলো আমরা চিনতাম। আগামীর বিপদগুলো অচেনা। তাই এবার শুধু সাহস যথেষ্ট নয় দরকার জ্ঞান, প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

প্রশ্ন একটাই- ঘুম ভাঙার আগে আর কতটা ক্ষতি হতে দিব আমরা?

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত