সংবাদ

কথা দিয়ে কথা না রাখা মানুষের আদি ‘পাপ’


ওয়াসিম খান রানা
ওয়াসিম খান রানা
প্রকাশ: ৩ মে ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম

কথা দিয়ে কথা না রাখা মানুষের আদি ‘পাপ’
কথা দিয়ে কথা না রাখা মানুষের আদি ‘পাপ’

জনপ্রিয় শিল্পী সুবীর নন্দীর কণ্ঠের সেই নীরব হতাশার গানটি কে না শুনেছেন। দিন যায়, কথা থাকে/সে যে কথা দিয়ে রাখল না/ ভুলে যাবার আগে ভাবল না/সে কথা লেখা আছে বুকে...। অথবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত কবিতা, ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো কেউ কথা রাখেনি... কে না পড়েছেন।

পৃথিবীতে সম্ভবত এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল, যে জীবনে কখনো কাউকে কথা দেয় নি। আবার এমন কোনো মানুষও নেই, যে কখনো অন্যের কাছ থেকে কথা ভাঙার বেদনা পায়নি। প্রতিশ্রুতি দেওয়া আর ভাঙা- এই দুটি অভিজ্ঞতা মানবজীবনের সবচেয়ে পুরনো, সবচেয়ে সার্বজনীন অধ্যায়ের একটি।

ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, আদিম মানুষ যখন গুহার দেয়ালে চিত্র আঁকত, তখনও সে অন্য গোত্রের সঙ্গে চুক্তি করত। শিকার ভাগ করে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি, রক্তের শপথ, জমির সীমানার চুক্-তি এসব কিছুর মূলেই ছিলো প্রতিশ্রুতি বা কথা দেওয়ার আদিম সূত্র। আর সেই আদিম সমাজ থেকে আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি দেয়া ও ভাঙার ইতিহাস একটি অবিচ্ছিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়ে চলেছে।

এই লেখাটি কেবল নৈতিক বিচারের জায়গা নয়। এটি মানবমনের গভীরে লুকানো সেই প্রবৃত্তিকে বোঝার একটি প্রচেষ্টা। যে কারণে মানুষ কথা দেয় আর যে কারণে সে তা রাখতে পারে না।

প্রতিশ্রুতি ভাঙা মানে হৃদয় খান খান হওয়া

আদিম যুগের প্রতিশ্রুতি: যখন কথা ছিল জীবনের সমান

আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে, মানুষ যখন দলবদ্ধ হয়ে শিকার করতো, তখন দলের প্রতিটি সদস্যের পরস্পরের প্রতি একটা অলিখিত কিন্তু অটল প্রতিশ্রুতি ছিল- ‘আমরা একসঙ্গে থাকব। একসঙ্গে লড়ব। একসঙ্গে ভাগ করব।’ সেই প্রতিশ্রুতি ভাঙা মানে শুধু বিশ্বাসঘাতকতা নয় সেটা ছিল গোটা দলের বেঁচে থাকার হুমকি।

গবেষণায় দেখা গেছে, আদিম সমাজে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীকে গোত্র থেকে বিতাড়িত করা হতো। সেই যুগে একা বনে-জঙ্গলে থাকা মানে নিশ্চিত মৃত্যু। তাই কথা রাখার সামাজিক চাপ ছিল অস্তিত্বের চাপ। প্রতিশ্রুতি তখন শুধু নৈতিক বিষয় ছিল না এটি ছিল সরাসরি টিকে থাকার হাতিয়ার।

আদিম মানুষের কাছে শপথ ছিল অত্যন্ত পবিত্র। আগুনের সামনে শপথ নেওয়া, রক্ত মেশানো, দেবতার নামে শপথ- এই আচারগুলো কেবল সাংস্কৃতিক নয়, এগুলো ছিল প্রতিশ্রুতিকে অতিপ্রাকৃতিক শক্তির সঙ্গে বেঁধে দেওয়ার কৌশল। মানুষ ভাবতো, শপথ ভাঙলে দেবতারা রাগ করবেন, প্রকৃতি প্রতিশোধ নেবে।এই ভয় প্রতিশ্রুতি রক্ষায় একটা বাহ্যিক শক্তি হিসেবে কাজ করতো।

কিন্তু মানব স্বভাব তখনও একই ছিল।ক্ষুধা, ভয়, লোভ আর ক্ষমতার লালসার মুখে এই আচারিক বাধাও অনেক সময় টিকতো না। ইতিহাসের প্রথম লিখিত দলিলগুলির প্রতিটিতেই আমরা দেখি, রাজা ও প্রজার মধ্যে চুক্তিভঙ্গের বিবরণ।

“মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় সভ্যতায় পাওয়া মাটির ফলকে লেখা আছে চুক্তিভঙ্গের শাস্তির বিবরণ। এটাই প্রমাণ করে যে মানুষ সেই আদিকাল থেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে,  রেখেছে ও ভেঙেছে।”

প্রতিশ্রুতি দিয়ে একসঙ্গে শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা

আদিম সমাজে প্রতিশ্রুতির একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল সেটা ব্যক্তির নয়, গোটা পরিবার বা গোত্রের সম্মানের সঙ্গে জড়িত। কেউ যদি কথা না রাখে, তাহলে শুধু সে নয়, তার পুরো পরিবার সমাজে লাঞ্ছিত হতো। এই সামষ্টিক দায়িত্ববোধ প্রতিশ্রুতিকে আরও ভারী করে তুলতো।

কিন্তু এই সামষ্টিক চাপের মধ্যেও মানুষ প্রতারণা করেছে। গোত্রনেতারা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্রকে ধ্বংস করেছে। প্রেমিক-প্রেমিকাকে মিথ্যা আশা দিয়েছে। ব্যবসায়ী পণ্যের মান নিয়ে মিথ্যা বলেছে। সভ্যতার শুরু থেকেই মিথ্যা ছিল মানুষের ছায়াসঙ্গী।

পৃথিবীর প্রায় সকল প্রধান ধর্মেই প্রতিশ্রুতি ভাঙাকে পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।ইসলামে ‘ওয়াদা পালন করা’ ঈমানের অংশ। হিন্দু দর্শনে ‘সত্যবাদিতা’ ধর্মের মূলনীতি। বৌদ্ধ নীতিতে মিথ্যা বলা পঞ্চশীলের লঙ্ঘন। খ্রিষ্টান নৈতিকতায় শপথ ভাঙা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপ।

ধর্ম মূলত সমাজকে একটা বার্তা দিয়েছে কথা না রাখলে শুধু মানুষ নয়, সৃষ্টিকর্তাও বিচার করবেন। এই পারলৌকিক ভয় অনেকের জীবনে কথা রাখার প্রেরণা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী ধর্মীয় পুরুষেরাও কথা ভেঙেছেন। রাজারাও চুক্তি লঙ্ঘন করেছেন। ধর্মের নামেও মিথ্যা বলা হয়েছে।

আধুনিক যুগেও একসঙ্গে শত্রুর মোকাবিলা

আধুনিক যুগের মিথ্যা : নতুন রূপ, পুরনো পাপ

আদিম যুগে মিথ্যা ছড়াতো ধীরে, সীমিত পরিসরে। কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে একটি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। একজন রাজনীতিবিদ নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দেন, তা ডিজিটাল বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত হয়। লক্ষাধিক মানুষ দেখেন। নির্বাচনের পরে সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে গেলে, সেই ফুটেজও থাকে কিন্তু জবাবদিহিতা থাকে না।

প্রতিশ্রুতির মুদ্রাস্ফীতি

আধুনিক যুগে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে প্রতিশ্রুতির মুদ্রাস্ফীতি। এত বেশি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে যে সেগুলোর কোনো মূল্য নেই। বিজ্ঞাপনে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, কোম্পানির মিশন স্টেটমেন্টে সুন্দর কথা, কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারা। “কাস্টমার স্যাটিসফ্যাকশন গ্যারান্টেড”— কথাটা এখন কেউ আর বিশ্বাস করে না। কারণ এটা এত বেশি ব্যবহার করা হয়েছে যে এর কোনো অর্থ নেই। এই প্রতিশ্রুতির মুদ্রাস্ফীতি আসলে পুরো সমাজের বিশ্বাসের ভিত্তিকে ক্ষয় করে দিচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়া ও ভার্চুয়াল প্রতিশ্রুতির জাল

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকের যুগে একটা নতুন ধরনের প্রতিশ্রুতি জন্ম নিয়েছে,  ‘পারফরমেন্স প্রমিস’। মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভালো মানুষ’ সাজতে প্রতিশ্রুতি দেয়। ‘আমি কখনো অমুককে ছাড়ব না’, ‘আমি সবসময় সত্য বলব’ এই ধরনের পোস্ট লাইক পায়। কিন্তু বাস্তবে রূপান্তরিত হয় না।

এই ভার্চুয়াল পরিচয় আর বাস্তব জীবনের মধ্যে ব্যবধান এত বড় হয়ে উঠেছে যে, মানুষ নিজেও বিভ্রান্ত। সে জানে না কোনটা তার আসল সত্তা- সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিশ্রুতিময় মানুষটা, নাকি বাস্তব জীবনের প্রতিশ্রুতি-ভঙ্গকারী মানুষটা।

আধুনিক বিশ্বে কথা না রাখায় সংঘাত

আদিম ও আধুনিক মিথ্যার তারতম্য

আদিম যুগ ও আধুনিক যুগের প্রতিশ্রুতি আর তা ভাঙার মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। নিচের তুলনামূলক চিত্রটি সেটা স্পষ্ট করে তোলে-

প্রতিশ্রুতির পরিসংখ্যান

আদিম যুগে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো মুখোমুখি, সাক্ষীর সামনে। সমাজ সেই সাক্ষী ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় একান্তে, ব্যক্তিগত কথোপকথনে, হোয়াটসঅ্যাপে। সেই কথার কোনো সামাজিক সাক্ষী নেই, কোনো জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নেই।

এই নিঃসাক্ষী পরিবেশ প্রতিশ্রুতিকে আরও হালকা করে দিয়েছে। আদিম মানুষ হয়তো ভেতরে ভেতরে কথা রাখতে না চাইলেও সমাজের ভয়ে রাখতো। আধুনিক মানুষের কাছে সেই বাহ্যিক শক্তি অনেক দুর্বল হয়ে গেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক আদিম সমাজে ‘মিষ্টি মিথ্যা’ বলার সংস্কৃতি ছিল না। সেখানে সরাসরি ‘না’ বলার রীতি ছিল। কারণ সম্পদ সীমিত, বেঁচে থাকা কঠিন- এই পরিবেশে মিথ্যা আশা দেওয়াটা কাউকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার সমান হতে পারতো।

আধুনিক সমাজে আমরা উলটোটা দেখি। সামাজিক ভদ্রতার নামে ‘মিষ্টি মিথ্যা’ দেওয়াটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ‘হ্যাঁ, অবশ্যই আসব’ বলে না আসা এখন অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য সামাজিক আচরণ। এই বিবর্তনটা আসলে মানবিক সম্পর্কের একটা অবক্ষয়ের চিহ্ন।

প্রতিনিয়ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন রাজনীতিকরা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আসলে প্রতিশ্রুতি ও তা ভাঙার এক দীর্ঘ মহাকাব্য। প্রতিটি নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে বিদ্যুৎ, সড়ক, কর্মসংস্থান, দুর্নীতিমুক্ত সমাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ভোটের পরে অনেক প্রতিশ্রুতি স্মৃতি থেকে মুছে যায়।

এই চক্রটা এতটাই পরিচিত হয়ে গেছে যে সাধারণ মানুষ এখন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি শুনে হাসে। এটা শুধু রাজনীতির সংকট নয় সেটা পুরো সামাজিক বিশ্বাসের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের দেশের পারিবারিক সংস্কৃতিতে একটা বিশেষ ভদ্র সমস্যা আছে। এখানে ‘না’ বলাটা প্রায় অভদ্রতার সমান। বিয়েতে আসবে কিনা জিজ্ঞেস করলে ‘হ্যাঁ’ বলা সামাজিক নিয়ম, যদিও আসার সম্ভাবনা কম। টাকা ধার চাইলে ‘না’ বলতে পারা যায় না তাই ‘অমুকের কিছু টাকা আসার কথা ছিলো, গতকাল বললেই দিতে পারতাম দু-একদিন অপেক্ষা করো দেখছি’ এইসব বলে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়, যদিও দেওয়ার সামর্থ্য বা ইচ্ছা নেই।

এই ‘না বলতে না পারার’ সংস্কৃতি আসলে মানুষকে অনেক মিথ্যা প্রতিশ্রুতির দিকে ঠেলে দেয়। মানুষ মনে করে, ‘এখন হ্যাঁ বললেই সম্পর্ক ভালো থাকবে।’ কিন্তু পরে কথা না রাখলে সম্পর্ক আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই স্বল্পমেয়াদি চিন্তাই কথা ভাঙার একটা বড় কারণ।

কথা দিয়ে কথা না রাখা আদি প্রবণতা

ব্যবসায়িক প্রতিশ্রুতি ও ভোক্তা অধিকার

ব্যবসায়িক পরিবেশে প্রতিশ্রুতি ভাঙার সংস্কৃতি বেশ ব্যাপক। ‘এক সপ্তাহে ডেলিভারি’ বলে তিন সপ্তাহ পরে পণ্য আসে। ‘পণ্যের মান নিশ্চিত’ বলে নকল পণ্য বিক্রি হয়। ‘সার্ভিস চার্জ নেই’ বলে রসিদে অন্যান্য চার্জ বাড়িয়ে রাখা হয়।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন থাকলেও প্রয়োগের অভাবে এই সংস্কৃতি পরিবর্তন হচ্ছে না। বরং ই-কমার্সের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইনে প্রতারণামূলক প্রতিশ্রুতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ছবিতে যা দেখানো হয়, পাঠানো হয় তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা পণ্য।

শিক্ষাঙ্গনে প্রতিশ্রুতির ব্যর্থতা

শিক্ষাখাতে প্রতিশ্রুতি ভাঙার প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কোচিং সেন্টারগুলো ‘গোল্ডেন A+’ গ্যারান্টি দেয়। এটা একটা অসম্ভব প্রতিশ্রুতি, যা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতি সরাসরি প্রতারণা। সরকার শিক্ষাখাতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখনো প্রয়োজনীয় শিক্ষকের অভাব। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো শিক্ষার্থীরা এই পরিবেশে বড় হয়ে শিখে যায় যে প্রতিশ্রুতি মানে বাস্তবতা নয়। তারা দেখে তাদের শিক্ষকেরা, তাদের নেতারা, তাদের সমাজ সবাই কথা ভাঙে। এই পর্যবেক্ষণই তাদের ভবিষ্যৎ মূল্যবোধ গঠন করে।

ঢাকার যানজটে আটকে থাকা মোহাম্মাদ নিজাম উদ্দিন নামে একজন আইটি অফিসার ফোনে বলছেন, ‘পাঁচ মিনিটে পৌঁছাচ্ছি’ যদিও তিনি জানেন আধা ঘণ্টার আগে পৌঁছানো সম্ভব নয়। মিস্ত্রি বলছেন, ‘কাল বিকেলে কাজ শেষ করব’ অথচ এক সপ্তাহ পরেও শেষ করা সম্ভব হয়নি। বন্ধু বলছে, ‘তোকে টাকা পাঠিয়ে দেব’ মাসের পর মাস কেটে গেছে।

এই ছোট ছোট কথা ভাঙাগুলো সমাজের কাছে তুচ্ছ মনে হলেও, এগুলো একসঙ্গে মিলে একটা বিশাল সামাজিক সমস্যা তৈরি করে।  মানুষ আর কারো কথায় বিশ্বাস করে না, সবকিছু লিখিত চায়, সব ক্ষেত্রে সন্দেহ করে। এই অবিশ্বাসের সংস্কৃতি সমাজের উন্নতির পথে একটা অদৃশ্য দেয়াল।

কথা না রাখলে প্রেম ভেঙে যায়

কেন মানুষ কথা রাখতে পারে না

মনোবিজ্ঞানীরা একটি প্রবণতার কথা বলেন যার নাম ‘প্রেজেন্ট বায়াস’। মানুষ ভবিষ্যতের সুফলের চেয়ে বর্তমানের স্বস্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। রাত ১১টায় সংকল্প করা সহজ, কিন্তু সকাল ৬টায় উঠা কঠিন। পূর্বঘোষিত ‘বিকেল ৫টার’ জনসভায় কাঁটায় কাঁটায় হাজির হওয়া প্রধান অতিথির দেখা পাওয়া মুশকিল হয়। আবার প্রেমিক-প্রেমিকার প্রতিশ্রুতি বড্ড গোলমেলে। সম্পর্কের উষ্ণ মুহূর্তে ‘সবসময় পাশে থাকব’, ‘তোমাকে ছাড়া বাঁচব না’, ‘জীবন মরণে তুমি আমার’, তুমি ছাড়া আমি একা, পৃথিবীটা মেঘে ঢাকা’ বলা সহজ। কিন্তু কঠিন সময়ে সেই প্রতিশ্রুতি পালন করা কঠিন।

এটি কোনো নৈতিক দুর্বলতার চিহ্ন নয় শুধু এটি মানব মস্তিষ্কের একটি বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য। আদিম মানুষকে বেঁচে থাকতে হতো আজকের জন্য, তাই মস্তিষ্ক বর্তমান পুরস্কারকে বেশি গুরুত্ব দিতে শিখেছে। কিন্তু সামাজিক প্রতিশ্রুতি মানে ভবিষ্যতের জন্য। এখানেই তৈরি হয় আসল সংঘাত।

অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস (ওভার কনফিডেন্স বায়াস)

মানুষ সাধারণত নিজের সামর্থ্য ও সদিচ্ছা সম্পর্কে বেশি আশাবাদী। ‘আমি পারব’ এই বিশ্বাসে কথা দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে পারা যায় না। এটা প্রতারণা নয়, এটা আত্মপ্রতারণা।  গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করে তাদের থেকে কেউ ভালো জানে না বা করতে পারে না। বাস্তবে এটা গাণিতিকভাবে অসম্ভব।

একইভাবে, কথা দেওয়ার মুহূর্তে মানুষ মনে করে সে সত্যিই পারবে।কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেই মুহূর্তে কথাটা হয়তো মিথ্যা নয়। নিজের দুর্বলতা, পরিস্থিতির জটিলতা, সময়ের সীমাবদ্ধতা- এগুলো সে হিসাব করে না। ফলে আন্তরিক প্রতিশ্রুতিও কখনো কখনো ভেঙে যায়।

 ‘না’ বলতে না পারা

আমাদের সমাজে ‘না’ বলাটা প্রায় একটা সামাজিক অপরাধ। বিশেষত যখন সিনিয়র, বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রিয়জন কিছু চান তখন ‘না’ বলা আক্ষরিক অর্থেই কঠিন। এই পরিস্থিতিতে মানুষ ‘হ্যাঁ’ বলে রাখে জেনেবুঝে যে, এটা পালন করা সম্ভব হবে না।

এই সামাজিক ‘হ্যাঁ’ আসলে সাময়িক শান্তির জন্য ভবিষ্যতের বিশ্বাসকে বলিদান দেওয়া। কিন্তু মানুষ তখন সেই ভবিষ্যতটা দেখতে পায় না। সে দেখে শুধু এই মুহূর্তের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি।

সামাজিক মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি

ভয় ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি

প্রতিশ্রুতি ভেঙে ফেললে অনেকে মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে চলেন। ফোন ধরেন না, মেসেজের রিপ্লাই দেন না, পথ পাল্টে যান। এই ‘ঘোস্টিং বা ভূত’ সংস্কৃতি আধুনিক যুগে মহামারীর মতো ছড়িয়ে গেছে। একজন মানুষকে সরাসরি বলতে পারছেন না ‘পারিনি, ক্ষমা করো’ এটা নৈতিক সাহসের অভাব। এর পেছনে আছে একটা মনোবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। মানুষ নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে দেখতে চায়। ভুল স্বীকার করলে সেই আত্মপ্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই মানুষ এড়িয়ে যায়, অস্বীকার করে বা উলটো দোষ অন্যের ওপর চাপায়।

আস্থার ক্ষয় : সামাজিক মূলধনের নীরব বিনাশ

অর্থনীতিবিদরা ‘সামাজিক মূলধন’ বলে একটি ধারণার কথা বলেন, সমাজের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, যা ব্যবসা, সহযোগিতা ও উন্নয়নকে সম্ভব করে। যেসব সমাজে মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করে, সেখানে লেনদেন সহজ, উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে পারে, সহযোগিতা স্বাভাবিক। কিন্তু যেখানে প্রতিশ্রুতি ভাঙা সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়, সেখানে সামাজিক মূলধন ক্ষয় পায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটা বড় বাধা। যখন কেউ কাউকে বিশ্বাস না করে, তখন সব লেনদেনে আইনি কাগজ লাগে, সাক্ষী লাগে, জামানত লাগে।  এই অদক্ষতার খরচ গোটা সমাজ বহন করে।

প্রিয়জনের কাছ থেকে কথা না পাওয়া মানুষের মনে যে আঘাত করে, তা অনেক সময় শারীরিক আঘাতের চেয়েও গভীর। মনোবিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বিশ্বাসভঙ্গের আঘাত ব্রেনের একই অংশকে সক্রিয় করে যা শারীরিক ব্যথায় সক্রিয় হয়। বারবার কথা বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা মানুষ একদিন আবিষ্কার করেন, তার পাশে কেউ নেই।সে হয়তো বোঝেও নি, কেন তাকে ছেড়ে সবাই চলে গেছে। কিন্তু যারা তার কাছ থেকে দূরে গেছে, তারা সবাই একটা কারণে গেছে। আর তা হলো কথার মূল্য না থাকা। এই একাকীত্ব কখনো আচমকা আসে নি। এটা তৈরি হয় ছোট ছোট বিশ্বাসভঙ্গের দীর্ঘশ্বাস থেকে।

বাবা-মা প্রতিশ্রুতি না রাখলে সন্তানেরাও তাতে প্রভাবিত হয়

শিশুদের ওপর প্রভাব

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টা অনেকে অনুধাবন করেন না শিশুরা যখন বড়দের কথা ভাঙতে দেখে, তারা শিখে যায় যে এটাই স্বাভাবিক। ‘বাবা বলেছিলেন আসবেন, আসেননি’- এই অভিজ্ঞতা শুধু একটা হতাশার ঘটনা নয়, এটা শিশুর মূল্যবোধ গঠনের একটা মাইলফলক।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু বড় হওয়ার সময় বারবার প্রাপ্তবয়স্কদের কথা ভাঙতে দেখে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে নিজেরাও প্রতিশ্রুতিকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। এই প্রজন্মান্তরী সংক্রমণই আসলে সমাজে কথা-না-রাখার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে।

কীভাবে ভাঙা যায় এই চক্র

‘না’ বলাটা সামাজিকভাবে কঠিন। কিন্তু এটাই সবচেয়ে সম্মানজনক। উত্তর যখন আপনি জানেন কেন দিতে পারবেন না। তবে বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি তৈরি করা কঠিন। তবে অসম্ভব নয়। পরিবারে, বন্ধুদের মধ্যে, কর্মক্ষেত্রে  যেখানে ‘না’ বলাকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়, সেখানে প্রতিশ্রুতির মান বাড়ে।

ক্ষমা চাওয়ার সাহস

কথা রাখা না গেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা হলো স্বীকার করা এবং ক্ষমা চাওয়া। এটা দুর্বলতার চিহ্ন নয়। এটা পরিণত মানুষের লক্ষণ। যে মানুষটা বলতে পারে ‘আমি কথা রাখতে পারিনি, আমি দুঃখিত’ সে আসলে সম্পর্কটাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।

ছোট ছোট প্রতিশ্রুতি

ছোট প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু

প্রতিশ্রুতি রাখার সংস্কৃতি তৈরি হয় ছোট ছোট কথা রাখা থেকে। বললেন ‘কাল ফোন করব’ তাহলে করুন। বললেন ‘এক ঘণ্টায় আসব’ তাহলে আসুন। এই ছোট ছোট সততাগুলোই মানুষের চরিত্রের ভিত্তি তৈরি করে। যে মানুষটা ছোট কথাগুলো রাখে, সে বড় কথাও রাখে। আর যে ছোট কথাতেই ফাঁকি দেয়, তাকে বড় কোনো কিছুতে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। আর এটাই চরম বাস্তবতা।

পুরনো পাপ, নতুন সমাধান

‘সে যে কথা দিয়ে রাখলো না/ভুলে যাবার আগে ভাবলো না...এই সত্যটা আদিম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত পরিবর্তন হয়নি। হয়তো হবেও না কখনো। কারণ এই প্রবণতা মানব প্রকৃতির গভীরে মিশে গেছে। বর্তমান পক্ষপাত, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, সামাজিক চাপ  এগুলো মানবিক সত্তার অংশ। 

কিন্তু আদিম মানুষ থেকে আধুনিক মানুষের পার্থক্য হলো আমরা এই প্রবণতা সম্পর্কে সচেতন হতে পারি। আমরা নিজেদের প্রশ্ন করতে পারি, ‘আমি কি সত্যিই এটা পারব?’

মহাকাশ জয়ের চেয়েও জরুরি কথা রাখা

বাংলাদেশের মতো দেশে এই পরিবর্তনটা অত্যন্ত জরুরি। যে দেশ উন্নতির স্বপ্ন দেখছে, সেই দেশের নাগরিকদের পারস্পরিক আস্থার ওপর সেই উন্নতি নির্ভর করে। আস্থা তৈরি হয় একে অপরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি থেকে তা ছোট হোক কিংবা বড়।

“মহাকাশ জয় বা প্রযুক্তির উদ্ভাবন সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা নয়। সভ্যতার আসল পরীক্ষা হলো মানুষ তার দেওয়া কথাটুকু রাখার কতটা সামর্থ রাখে।”


লেখক: চিফ, ভিডিও এডিটিং বিভাগ, সংবাদ ডিজিটাল

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৩ মে ২০২৬


কথা দিয়ে কথা না রাখা মানুষের আদি ‘পাপ’

প্রকাশের তারিখ : ০৩ মে ২০২৬

featured Image

জনপ্রিয় শিল্পী সুবীর নন্দীর কণ্ঠের সেই নীরব হতাশার গানটি কে না শুনেছেন। দিন যায়, কথা থাকে/সে যে কথা দিয়ে রাখল না/ ভুলে যাবার আগে ভাবল না/সে কথা লেখা আছে বুকে...। অথবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত কবিতা, ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো কেউ কথা রাখেনি... কে না পড়েছেন।

পৃথিবীতে সম্ভবত এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল, যে জীবনে কখনো কাউকে কথা দেয় নি। আবার এমন কোনো মানুষও নেই, যে কখনো অন্যের কাছ থেকে কথা ভাঙার বেদনা পায়নি। প্রতিশ্রুতি দেওয়া আর ভাঙা- এই দুটি অভিজ্ঞতা মানবজীবনের সবচেয়ে পুরনো, সবচেয়ে সার্বজনীন অধ্যায়ের একটি।

ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, আদিম মানুষ যখন গুহার দেয়ালে চিত্র আঁকত, তখনও সে অন্য গোত্রের সঙ্গে চুক্তি করত। শিকার ভাগ করে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি, রক্তের শপথ, জমির সীমানার চুক্-তি এসব কিছুর মূলেই ছিলো প্রতিশ্রুতি বা কথা দেওয়ার আদিম সূত্র। আর সেই আদিম সমাজ থেকে আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি দেয়া ও ভাঙার ইতিহাস একটি অবিচ্ছিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়ে চলেছে।

এই লেখাটি কেবল নৈতিক বিচারের জায়গা নয়। এটি মানবমনের গভীরে লুকানো সেই প্রবৃত্তিকে বোঝার একটি প্রচেষ্টা। যে কারণে মানুষ কথা দেয় আর যে কারণে সে তা রাখতে পারে না।

প্রতিশ্রুতি ভাঙা মানে হৃদয় খান খান হওয়া

আদিম যুগের প্রতিশ্রুতি: যখন কথা ছিল জীবনের সমান

আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে, মানুষ যখন দলবদ্ধ হয়ে শিকার করতো, তখন দলের প্রতিটি সদস্যের পরস্পরের প্রতি একটা অলিখিত কিন্তু অটল প্রতিশ্রুতি ছিল- ‘আমরা একসঙ্গে থাকব। একসঙ্গে লড়ব। একসঙ্গে ভাগ করব।’ সেই প্রতিশ্রুতি ভাঙা মানে শুধু বিশ্বাসঘাতকতা নয় সেটা ছিল গোটা দলের বেঁচে থাকার হুমকি।

গবেষণায় দেখা গেছে, আদিম সমাজে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীকে গোত্র থেকে বিতাড়িত করা হতো। সেই যুগে একা বনে-জঙ্গলে থাকা মানে নিশ্চিত মৃত্যু। তাই কথা রাখার সামাজিক চাপ ছিল অস্তিত্বের চাপ। প্রতিশ্রুতি তখন শুধু নৈতিক বিষয় ছিল না এটি ছিল সরাসরি টিকে থাকার হাতিয়ার।

আদিম মানুষের কাছে শপথ ছিল অত্যন্ত পবিত্র। আগুনের সামনে শপথ নেওয়া, রক্ত মেশানো, দেবতার নামে শপথ- এই আচারগুলো কেবল সাংস্কৃতিক নয়, এগুলো ছিল প্রতিশ্রুতিকে অতিপ্রাকৃতিক শক্তির সঙ্গে বেঁধে দেওয়ার কৌশল। মানুষ ভাবতো, শপথ ভাঙলে দেবতারা রাগ করবেন, প্রকৃতি প্রতিশোধ নেবে।এই ভয় প্রতিশ্রুতি রক্ষায় একটা বাহ্যিক শক্তি হিসেবে কাজ করতো।

কিন্তু মানব স্বভাব তখনও একই ছিল।ক্ষুধা, ভয়, লোভ আর ক্ষমতার লালসার মুখে এই আচারিক বাধাও অনেক সময় টিকতো না। ইতিহাসের প্রথম লিখিত দলিলগুলির প্রতিটিতেই আমরা দেখি, রাজা ও প্রজার মধ্যে চুক্তিভঙ্গের বিবরণ।

“মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় সভ্যতায় পাওয়া মাটির ফলকে লেখা আছে চুক্তিভঙ্গের শাস্তির বিবরণ। এটাই প্রমাণ করে যে মানুষ সেই আদিকাল থেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে,  রেখেছে ও ভেঙেছে।”

প্রতিশ্রুতি দিয়ে একসঙ্গে শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা

আদিম সমাজে প্রতিশ্রুতির একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল সেটা ব্যক্তির নয়, গোটা পরিবার বা গোত্রের সম্মানের সঙ্গে জড়িত। কেউ যদি কথা না রাখে, তাহলে শুধু সে নয়, তার পুরো পরিবার সমাজে লাঞ্ছিত হতো। এই সামষ্টিক দায়িত্ববোধ প্রতিশ্রুতিকে আরও ভারী করে তুলতো।

কিন্তু এই সামষ্টিক চাপের মধ্যেও মানুষ প্রতারণা করেছে। গোত্রনেতারা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্রকে ধ্বংস করেছে। প্রেমিক-প্রেমিকাকে মিথ্যা আশা দিয়েছে। ব্যবসায়ী পণ্যের মান নিয়ে মিথ্যা বলেছে। সভ্যতার শুরু থেকেই মিথ্যা ছিল মানুষের ছায়াসঙ্গী।

পৃথিবীর প্রায় সকল প্রধান ধর্মেই প্রতিশ্রুতি ভাঙাকে পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।ইসলামে ‘ওয়াদা পালন করা’ ঈমানের অংশ। হিন্দু দর্শনে ‘সত্যবাদিতা’ ধর্মের মূলনীতি। বৌদ্ধ নীতিতে মিথ্যা বলা পঞ্চশীলের লঙ্ঘন। খ্রিষ্টান নৈতিকতায় শপথ ভাঙা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপ।

ধর্ম মূলত সমাজকে একটা বার্তা দিয়েছে কথা না রাখলে শুধু মানুষ নয়, সৃষ্টিকর্তাও বিচার করবেন। এই পারলৌকিক ভয় অনেকের জীবনে কথা রাখার প্রেরণা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী ধর্মীয় পুরুষেরাও কথা ভেঙেছেন। রাজারাও চুক্তি লঙ্ঘন করেছেন। ধর্মের নামেও মিথ্যা বলা হয়েছে।

আধুনিক যুগেও একসঙ্গে শত্রুর মোকাবিলা

আধুনিক যুগের মিথ্যা : নতুন রূপ, পুরনো পাপ

আদিম যুগে মিথ্যা ছড়াতো ধীরে, সীমিত পরিসরে। কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে একটি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। একজন রাজনীতিবিদ নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দেন, তা ডিজিটাল বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত হয়। লক্ষাধিক মানুষ দেখেন। নির্বাচনের পরে সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে গেলে, সেই ফুটেজও থাকে কিন্তু জবাবদিহিতা থাকে না।

প্রতিশ্রুতির মুদ্রাস্ফীতি

আধুনিক যুগে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে প্রতিশ্রুতির মুদ্রাস্ফীতি। এত বেশি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে যে সেগুলোর কোনো মূল্য নেই। বিজ্ঞাপনে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, কোম্পানির মিশন স্টেটমেন্টে সুন্দর কথা, কিন্তু বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারা। “কাস্টমার স্যাটিসফ্যাকশন গ্যারান্টেড”— কথাটা এখন কেউ আর বিশ্বাস করে না। কারণ এটা এত বেশি ব্যবহার করা হয়েছে যে এর কোনো অর্থ নেই। এই প্রতিশ্রুতির মুদ্রাস্ফীতি আসলে পুরো সমাজের বিশ্বাসের ভিত্তিকে ক্ষয় করে দিচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়া ও ভার্চুয়াল প্রতিশ্রুতির জাল

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকের যুগে একটা নতুন ধরনের প্রতিশ্রুতি জন্ম নিয়েছে,  ‘পারফরমেন্স প্রমিস’। মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভালো মানুষ’ সাজতে প্রতিশ্রুতি দেয়। ‘আমি কখনো অমুককে ছাড়ব না’, ‘আমি সবসময় সত্য বলব’ এই ধরনের পোস্ট লাইক পায়। কিন্তু বাস্তবে রূপান্তরিত হয় না।

এই ভার্চুয়াল পরিচয় আর বাস্তব জীবনের মধ্যে ব্যবধান এত বড় হয়ে উঠেছে যে, মানুষ নিজেও বিভ্রান্ত। সে জানে না কোনটা তার আসল সত্তা- সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিশ্রুতিময় মানুষটা, নাকি বাস্তব জীবনের প্রতিশ্রুতি-ভঙ্গকারী মানুষটা।

আধুনিক বিশ্বে কথা না রাখায় সংঘাত

আদিম ও আধুনিক মিথ্যার তারতম্য

আদিম যুগ ও আধুনিক যুগের প্রতিশ্রুতি আর তা ভাঙার মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। নিচের তুলনামূলক চিত্রটি সেটা স্পষ্ট করে তোলে-


প্রতিশ্রুতির পরিসংখ্যান

আদিম যুগে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো মুখোমুখি, সাক্ষীর সামনে। সমাজ সেই সাক্ষী ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় একান্তে, ব্যক্তিগত কথোপকথনে, হোয়াটসঅ্যাপে। সেই কথার কোনো সামাজিক সাক্ষী নেই, কোনো জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নেই।

এই নিঃসাক্ষী পরিবেশ প্রতিশ্রুতিকে আরও হালকা করে দিয়েছে। আদিম মানুষ হয়তো ভেতরে ভেতরে কথা রাখতে না চাইলেও সমাজের ভয়ে রাখতো। আধুনিক মানুষের কাছে সেই বাহ্যিক শক্তি অনেক দুর্বল হয়ে গেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক আদিম সমাজে ‘মিষ্টি মিথ্যা’ বলার সংস্কৃতি ছিল না। সেখানে সরাসরি ‘না’ বলার রীতি ছিল। কারণ সম্পদ সীমিত, বেঁচে থাকা কঠিন- এই পরিবেশে মিথ্যা আশা দেওয়াটা কাউকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার সমান হতে পারতো।

আধুনিক সমাজে আমরা উলটোটা দেখি। সামাজিক ভদ্রতার নামে ‘মিষ্টি মিথ্যা’ দেওয়াটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ‘হ্যাঁ, অবশ্যই আসব’ বলে না আসা এখন অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য সামাজিক আচরণ। এই বিবর্তনটা আসলে মানবিক সম্পর্কের একটা অবক্ষয়ের চিহ্ন।

প্রতিনিয়ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন রাজনীতিকরা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আসলে প্রতিশ্রুতি ও তা ভাঙার এক দীর্ঘ মহাকাব্য। প্রতিটি নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে বিদ্যুৎ, সড়ক, কর্মসংস্থান, দুর্নীতিমুক্ত সমাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ভোটের পরে অনেক প্রতিশ্রুতি স্মৃতি থেকে মুছে যায়।

এই চক্রটা এতটাই পরিচিত হয়ে গেছে যে সাধারণ মানুষ এখন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি শুনে হাসে। এটা শুধু রাজনীতির সংকট নয় সেটা পুরো সামাজিক বিশ্বাসের সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের দেশের পারিবারিক সংস্কৃতিতে একটা বিশেষ ভদ্র সমস্যা আছে। এখানে ‘না’ বলাটা প্রায় অভদ্রতার সমান। বিয়েতে আসবে কিনা জিজ্ঞেস করলে ‘হ্যাঁ’ বলা সামাজিক নিয়ম, যদিও আসার সম্ভাবনা কম। টাকা ধার চাইলে ‘না’ বলতে পারা যায় না তাই ‘অমুকের কিছু টাকা আসার কথা ছিলো, গতকাল বললেই দিতে পারতাম দু-একদিন অপেক্ষা করো দেখছি’ এইসব বলে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়, যদিও দেওয়ার সামর্থ্য বা ইচ্ছা নেই।

এই ‘না বলতে না পারার’ সংস্কৃতি আসলে মানুষকে অনেক মিথ্যা প্রতিশ্রুতির দিকে ঠেলে দেয়। মানুষ মনে করে, ‘এখন হ্যাঁ বললেই সম্পর্ক ভালো থাকবে।’ কিন্তু পরে কথা না রাখলে সম্পর্ক আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই স্বল্পমেয়াদি চিন্তাই কথা ভাঙার একটা বড় কারণ।

কথা দিয়ে কথা না রাখা আদি প্রবণতা

ব্যবসায়িক প্রতিশ্রুতি ও ভোক্তা অধিকার

ব্যবসায়িক পরিবেশে প্রতিশ্রুতি ভাঙার সংস্কৃতি বেশ ব্যাপক। ‘এক সপ্তাহে ডেলিভারি’ বলে তিন সপ্তাহ পরে পণ্য আসে। ‘পণ্যের মান নিশ্চিত’ বলে নকল পণ্য বিক্রি হয়। ‘সার্ভিস চার্জ নেই’ বলে রসিদে অন্যান্য চার্জ বাড়িয়ে রাখা হয়।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন থাকলেও প্রয়োগের অভাবে এই সংস্কৃতি পরিবর্তন হচ্ছে না। বরং ই-কমার্সের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইনে প্রতারণামূলক প্রতিশ্রুতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ছবিতে যা দেখানো হয়, পাঠানো হয় তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা পণ্য।

শিক্ষাঙ্গনে প্রতিশ্রুতির ব্যর্থতা

শিক্ষাখাতে প্রতিশ্রুতি ভাঙার প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কোচিং সেন্টারগুলো ‘গোল্ডেন A+’ গ্যারান্টি দেয়। এটা একটা অসম্ভব প্রতিশ্রুতি, যা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতি সরাসরি প্রতারণা। সরকার শিক্ষাখাতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখনো প্রয়োজনীয় শিক্ষকের অভাব। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো শিক্ষার্থীরা এই পরিবেশে বড় হয়ে শিখে যায় যে প্রতিশ্রুতি মানে বাস্তবতা নয়। তারা দেখে তাদের শিক্ষকেরা, তাদের নেতারা, তাদের সমাজ সবাই কথা ভাঙে। এই পর্যবেক্ষণই তাদের ভবিষ্যৎ মূল্যবোধ গঠন করে।

ঢাকার যানজটে আটকে থাকা মোহাম্মাদ নিজাম উদ্দিন নামে একজন আইটি অফিসার ফোনে বলছেন, ‘পাঁচ মিনিটে পৌঁছাচ্ছি’ যদিও তিনি জানেন আধা ঘণ্টার আগে পৌঁছানো সম্ভব নয়। মিস্ত্রি বলছেন, ‘কাল বিকেলে কাজ শেষ করব’ অথচ এক সপ্তাহ পরেও শেষ করা সম্ভব হয়নি। বন্ধু বলছে, ‘তোকে টাকা পাঠিয়ে দেব’ মাসের পর মাস কেটে গেছে।

এই ছোট ছোট কথা ভাঙাগুলো সমাজের কাছে তুচ্ছ মনে হলেও, এগুলো একসঙ্গে মিলে একটা বিশাল সামাজিক সমস্যা তৈরি করে।  মানুষ আর কারো কথায় বিশ্বাস করে না, সবকিছু লিখিত চায়, সব ক্ষেত্রে সন্দেহ করে। এই অবিশ্বাসের সংস্কৃতি সমাজের উন্নতির পথে একটা অদৃশ্য দেয়াল।

কথা না রাখলে প্রেম ভেঙে যায়

কেন মানুষ কথা রাখতে পারে না

মনোবিজ্ঞানীরা একটি প্রবণতার কথা বলেন যার নাম ‘প্রেজেন্ট বায়াস’। মানুষ ভবিষ্যতের সুফলের চেয়ে বর্তমানের স্বস্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। রাত ১১টায় সংকল্প করা সহজ, কিন্তু সকাল ৬টায় উঠা কঠিন। পূর্বঘোষিত ‘বিকেল ৫টার’ জনসভায় কাঁটায় কাঁটায় হাজির হওয়া প্রধান অতিথির দেখা পাওয়া মুশকিল হয়। আবার প্রেমিক-প্রেমিকার প্রতিশ্রুতি বড্ড গোলমেলে। সম্পর্কের উষ্ণ মুহূর্তে ‘সবসময় পাশে থাকব’, ‘তোমাকে ছাড়া বাঁচব না’, ‘জীবন মরণে তুমি আমার’, তুমি ছাড়া আমি একা, পৃথিবীটা মেঘে ঢাকা’ বলা সহজ। কিন্তু কঠিন সময়ে সেই প্রতিশ্রুতি পালন করা কঠিন।

এটি কোনো নৈতিক দুর্বলতার চিহ্ন নয় শুধু এটি মানব মস্তিষ্কের একটি বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য। আদিম মানুষকে বেঁচে থাকতে হতো আজকের জন্য, তাই মস্তিষ্ক বর্তমান পুরস্কারকে বেশি গুরুত্ব দিতে শিখেছে। কিন্তু সামাজিক প্রতিশ্রুতি মানে ভবিষ্যতের জন্য। এখানেই তৈরি হয় আসল সংঘাত।

অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস (ওভার কনফিডেন্স বায়াস)

মানুষ সাধারণত নিজের সামর্থ্য ও সদিচ্ছা সম্পর্কে বেশি আশাবাদী। ‘আমি পারব’ এই বিশ্বাসে কথা দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে পারা যায় না। এটা প্রতারণা নয়, এটা আত্মপ্রতারণা।  গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করে তাদের থেকে কেউ ভালো জানে না বা করতে পারে না। বাস্তবে এটা গাণিতিকভাবে অসম্ভব।

একইভাবে, কথা দেওয়ার মুহূর্তে মানুষ মনে করে সে সত্যিই পারবে।কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেই মুহূর্তে কথাটা হয়তো মিথ্যা নয়। নিজের দুর্বলতা, পরিস্থিতির জটিলতা, সময়ের সীমাবদ্ধতা- এগুলো সে হিসাব করে না। ফলে আন্তরিক প্রতিশ্রুতিও কখনো কখনো ভেঙে যায়।

 ‘না’ বলতে না পারা

আমাদের সমাজে ‘না’ বলাটা প্রায় একটা সামাজিক অপরাধ। বিশেষত যখন সিনিয়র, বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রিয়জন কিছু চান তখন ‘না’ বলা আক্ষরিক অর্থেই কঠিন। এই পরিস্থিতিতে মানুষ ‘হ্যাঁ’ বলে রাখে জেনেবুঝে যে, এটা পালন করা সম্ভব হবে না।

এই সামাজিক ‘হ্যাঁ’ আসলে সাময়িক শান্তির জন্য ভবিষ্যতের বিশ্বাসকে বলিদান দেওয়া। কিন্তু মানুষ তখন সেই ভবিষ্যতটা দেখতে পায় না। সে দেখে শুধু এই মুহূর্তের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি।

সামাজিক মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি

ভয় ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি

প্রতিশ্রুতি ভেঙে ফেললে অনেকে মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে চলেন। ফোন ধরেন না, মেসেজের রিপ্লাই দেন না, পথ পাল্টে যান। এই ‘ঘোস্টিং বা ভূত’ সংস্কৃতি আধুনিক যুগে মহামারীর মতো ছড়িয়ে গেছে। একজন মানুষকে সরাসরি বলতে পারছেন না ‘পারিনি, ক্ষমা করো’ এটা নৈতিক সাহসের অভাব। এর পেছনে আছে একটা মনোবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। মানুষ নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে দেখতে চায়। ভুল স্বীকার করলে সেই আত্মপ্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই মানুষ এড়িয়ে যায়, অস্বীকার করে বা উলটো দোষ অন্যের ওপর চাপায়।

আস্থার ক্ষয় : সামাজিক মূলধনের নীরব বিনাশ

অর্থনীতিবিদরা ‘সামাজিক মূলধন’ বলে একটি ধারণার কথা বলেন, সমাজের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, যা ব্যবসা, সহযোগিতা ও উন্নয়নকে সম্ভব করে। যেসব সমাজে মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করে, সেখানে লেনদেন সহজ, উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে পারে, সহযোগিতা স্বাভাবিক। কিন্তু যেখানে প্রতিশ্রুতি ভাঙা সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়, সেখানে সামাজিক মূলধন ক্ষয় পায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটা বড় বাধা। যখন কেউ কাউকে বিশ্বাস না করে, তখন সব লেনদেনে আইনি কাগজ লাগে, সাক্ষী লাগে, জামানত লাগে।  এই অদক্ষতার খরচ গোটা সমাজ বহন করে।

প্রিয়জনের কাছ থেকে কথা না পাওয়া মানুষের মনে যে আঘাত করে, তা অনেক সময় শারীরিক আঘাতের চেয়েও গভীর। মনোবিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বিশ্বাসভঙ্গের আঘাত ব্রেনের একই অংশকে সক্রিয় করে যা শারীরিক ব্যথায় সক্রিয় হয়। বারবার কথা বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা মানুষ একদিন আবিষ্কার করেন, তার পাশে কেউ নেই।সে হয়তো বোঝেও নি, কেন তাকে ছেড়ে সবাই চলে গেছে। কিন্তু যারা তার কাছ থেকে দূরে গেছে, তারা সবাই একটা কারণে গেছে। আর তা হলো কথার মূল্য না থাকা। এই একাকীত্ব কখনো আচমকা আসে নি। এটা তৈরি হয় ছোট ছোট বিশ্বাসভঙ্গের দীর্ঘশ্বাস থেকে।

বাবা-মা প্রতিশ্রুতি না রাখলে সন্তানেরাও তাতে প্রভাবিত হয়

শিশুদের ওপর প্রভাব

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টা অনেকে অনুধাবন করেন না শিশুরা যখন বড়দের কথা ভাঙতে দেখে, তারা শিখে যায় যে এটাই স্বাভাবিক। ‘বাবা বলেছিলেন আসবেন, আসেননি’- এই অভিজ্ঞতা শুধু একটা হতাশার ঘটনা নয়, এটা শিশুর মূল্যবোধ গঠনের একটা মাইলফলক।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু বড় হওয়ার সময় বারবার প্রাপ্তবয়স্কদের কথা ভাঙতে দেখে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে নিজেরাও প্রতিশ্রুতিকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। এই প্রজন্মান্তরী সংক্রমণই আসলে সমাজে কথা-না-রাখার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে।

কীভাবে ভাঙা যায় এই চক্র

‘না’ বলাটা সামাজিকভাবে কঠিন। কিন্তু এটাই সবচেয়ে সম্মানজনক। উত্তর যখন আপনি জানেন কেন দিতে পারবেন না। তবে বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি তৈরি করা কঠিন। তবে অসম্ভব নয়। পরিবারে, বন্ধুদের মধ্যে, কর্মক্ষেত্রে  যেখানে ‘না’ বলাকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়, সেখানে প্রতিশ্রুতির মান বাড়ে।

ক্ষমা চাওয়ার সাহস

কথা রাখা না গেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা হলো স্বীকার করা এবং ক্ষমা চাওয়া। এটা দুর্বলতার চিহ্ন নয়। এটা পরিণত মানুষের লক্ষণ। যে মানুষটা বলতে পারে ‘আমি কথা রাখতে পারিনি, আমি দুঃখিত’ সে আসলে সম্পর্কটাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।

ছোট ছোট প্রতিশ্রুতি

ছোট প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু

প্রতিশ্রুতি রাখার সংস্কৃতি তৈরি হয় ছোট ছোট কথা রাখা থেকে। বললেন ‘কাল ফোন করব’ তাহলে করুন। বললেন ‘এক ঘণ্টায় আসব’ তাহলে আসুন। এই ছোট ছোট সততাগুলোই মানুষের চরিত্রের ভিত্তি তৈরি করে। যে মানুষটা ছোট কথাগুলো রাখে, সে বড় কথাও রাখে। আর যে ছোট কথাতেই ফাঁকি দেয়, তাকে বড় কোনো কিছুতে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। আর এটাই চরম বাস্তবতা।

পুরনো পাপ, নতুন সমাধান

‘সে যে কথা দিয়ে রাখলো না/ভুলে যাবার আগে ভাবলো না...এই সত্যটা আদিম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত পরিবর্তন হয়নি। হয়তো হবেও না কখনো। কারণ এই প্রবণতা মানব প্রকৃতির গভীরে মিশে গেছে। বর্তমান পক্ষপাত, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, সামাজিক চাপ  এগুলো মানবিক সত্তার অংশ। 

কিন্তু আদিম মানুষ থেকে আধুনিক মানুষের পার্থক্য হলো আমরা এই প্রবণতা সম্পর্কে সচেতন হতে পারি। আমরা নিজেদের প্রশ্ন করতে পারি, ‘আমি কি সত্যিই এটা পারব?’

মহাকাশ জয়ের চেয়েও জরুরি কথা রাখা

বাংলাদেশের মতো দেশে এই পরিবর্তনটা অত্যন্ত জরুরি। যে দেশ উন্নতির স্বপ্ন দেখছে, সেই দেশের নাগরিকদের পারস্পরিক আস্থার ওপর সেই উন্নতি নির্ভর করে। আস্থা তৈরি হয় একে অপরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি থেকে তা ছোট হোক কিংবা বড়।

“মহাকাশ জয় বা প্রযুক্তির উদ্ভাবন সভ্যতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা নয়। সভ্যতার আসল পরীক্ষা হলো মানুষ তার দেওয়া কথাটুকু রাখার কতটা সামর্থ রাখে।”


লেখক: চিফ, ভিডিও এডিটিং বিভাগ, সংবাদ ডিজিটাল


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত