রাজধানীর কদমতলী থানাধীন পূর্ব জুরাইন এলাকায় দিহান ফার্মাসিউটিক্যালস (আয়ু) নামক একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, র্যাব ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা। গতকাল বুধবার পরিচালিত এই যৌথ অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির চরম অব্যবস্থাপনা ও ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র উঠে আসে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ওষুধ উৎপাদন এবং বিপুল পরিমাণ ভেজাল ও অনুমোদনহীন পণ্য মজুদের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অভিযান
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দিহান
ফার্মাসিউটিক্যালসে কোনো রকম নিয়মনীতির
তোয়াক্কা না করেই উৎপাদন
কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল। সেখানে অনুমোদনহীন ও লেবেলবিহীন এক্সিপিয়েন্ট
সংরক্ষণ, লেবেল ছাড়া ফিনিশড প্রোডাক্ট
মজুদ এবং খোলা ও
অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে ওষুধ তৈরির প্রমাণ
পান ভ্রাম্যমাণ আদালত। এমনকি খোলা অবস্থায় জ্বাল
দেওয়া লিকুইড সংরক্ষণের মতো মারাত্মক অনিয়মও
ধরা পড়ে। এসব অপরাধে
ওষুধ ও কসমেটিকস আইনে
প্রতিষ্ঠানটিকে নগদ আড়াই লাখ
টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযান
প্রসঙ্গে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের
ঢাকা বিভাগীয় সহকারী পরিচালক আব্দুর রশীদ বলেন, “র্যাব
সদর দপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেট শাহ মোঃ জুবায়ের,
র্যাব-১০ এর কোম্পানি
কমান্ডার হাসান সিদ্দিকী এবং এসআইএ-এর
অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর বিল্লাল হোসেনসহ অভিযানে আমাদের ৪০ থেকে ৫০
জনের একটি চৌকস দল
অংশ নেয়। জনস্বাস্থ্যের হুমকিস্বরূপ
এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে আমাদের এই কঠোর অবস্থান।”
মাতুয়াইলে
হোমিও কারখানায় অভিযান ও জরিমানা
জুরাইনের
এই অভিযানের রেশ কাটতে না
কাটতেই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকায় আরও একটি ওষুধের
কারখানায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে ‘জে
বক্স এন্ড কোং লিমিটেড’
নামক একটি হোমিও প্রতিষ্ঠানে
মেয়াদোত্তীর্ণ কাঁচামাল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। গোপন সংবাদের
ভিত্তিতে গতকাল সকাল পৌনে ১১টা
থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত
পরিচালিত এই অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির
মালিককে ৭০ হাজার টাকা
জরিমানা করা হয়েছে।
ওষুধ
প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুর রশীদ জানান, “মাতুয়াইলের
পূর্ব কেরানীপাড়া আদর্শবাগ রোডের ওই কারখানায় কাঁচামাল
সংরক্ষণ রুমে মেয়াদোত্তীর্ণ কেমিক্যাল
ও ব্লক লিস্ট বহির্ভূত
কাঁচামাল পাওয়া গেছে। এছাড়া উৎপাদিত ওষুধের স্ট্রিপ ও প্যাকেটে ভিন্ন
ভিন্ন মেয়াদ এবং ব্যাচ নম্বর
ব্যবহার করা হচ্ছিল, যা
সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি
খেলা এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে
আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
কেরানীগঞ্জে
৩ ট্রাক নকল ওষুধ জব্দ: নেপথ্যে ভয়ঙ্কর চক্র
এর আগে গত পহেলা
এপ্রিল কেরানীগঞ্জের আর্টিবাজার এলাকায় একটি বাড়িতে গড়ে
তোলা বিশাল নকল ওষুধ কারখানার
সন্ধান পায় র্যাব ও
ওষুধ প্রশাসন। সেখান থেকে প্রায় ৩
ট্রাক ভর্তি নকল ও অরেজিস্ট্রিকৃত
ওষুধ এবং সরঞ্জাম জব্দ
করা হয়। এই ঘটনায়
মূল হোতা মজিব হোসেনকে
এক বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ
টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া
নকল কারখানা ভাড়া দেওয়ার অপরাধে
বাড়ির মালিককেও এক লাখ টাকা
জরিমানা করা হয়েছে।
জব্দকৃত
ওষুধের মধ্যে শিশুদের নকল জুস এবং
জীবনরক্ষাকারী দামী বিদেশি ইনজেকশন
‘হিউম্যান অ্যালবুমিন’ এর নকল কপিও
ছিল। চক্রটি দীর্ঘ ৪ মাস ধরে
অত্যন্ত গোপনে দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশে এসব বিষাক্ত ওষুধ
তৈরি করে আসছিল। সংশ্লিষ্ট
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেনজিরা, আর্টিবাজার, বন্দরছাঁটগাঁও এবং কলাতিয়াসহ বিভিন্ন
এলাকায় ছোট ছোট ঘর
ভাড়া নিয়ে এই চক্রটি
কাজ করছে। পরবর্তীতে নদীপথে এসব ভেজাল ওষুধ
মিটফোর্ড হয়ে সারা দেশের
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে
ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ
ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
জীবনরক্ষাকারী
ওষুধ নিয়ে এমন অমানবিক
জালিয়াতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র শিক্ষক
এই প্রতিবেদককে বলেন, “সাধারণত এই ভেজাল ওষুধ
রোগীর কোনো কাজে আসে
না। উল্টো নকল ওষুধ সেবনে
লিভার, কিডনি, মস্তিষ্ক এবং ত্বকের মারাত্মক
ক্ষতি হতে পারে। ক্ষতিকর
রাসায়নিকের প্রভাবে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।”
ওষুধ
ব্যবসায়ী জিয়াউর রহমান বলেন, “যারা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ
নকল করে, তাদের সরাসরি
মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত। বর্তমানে ওষুধের বাজারে কোনটা আসল আর কোনটা
নকল, তা চেনা সাধারণ
মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব
হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের সর্বোচ্চ শাস্তি
না হলে সাধারণ মানুষের
জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।”
একজন
গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, নকল ওষুধ নির্মূল
করতে হলে বিশেষ ক্ষমতা
আইনের আওতায় সর্বোচ্চ সাজার ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যদিকে,
বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন,
“নকলবাজ যেই হোক, তার
কোনো ছাড় নেই। কোনো
বিক্রেতা যদি জেনে শুনে
নকল ওষুধ বিক্রি করে,
তবে আমরা ওষুধ প্রশাসনকে
সাথে নিয়ে তার বিরুদ্ধে
কঠোর ব্যবস্থা নেব।”
জনস্বার্থ
রক্ষায় এবং ভেজাল ওষুধের
ভয়াবহতা রোধে সারাদেশে এ
ধরনের চিরুনি অভিযান আগামীতেও অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর।

বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
রাজধানীর কদমতলী থানাধীন পূর্ব জুরাইন এলাকায় দিহান ফার্মাসিউটিক্যালস (আয়ু) নামক একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, র্যাব ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা। গতকাল বুধবার পরিচালিত এই যৌথ অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির চরম অব্যবস্থাপনা ও ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র উঠে আসে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ওষুধ উৎপাদন এবং বিপুল পরিমাণ ভেজাল ও অনুমোদনহীন পণ্য মজুদের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অভিযান
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দিহান
ফার্মাসিউটিক্যালসে কোনো রকম নিয়মনীতির
তোয়াক্কা না করেই উৎপাদন
কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল। সেখানে অনুমোদনহীন ও লেবেলবিহীন এক্সিপিয়েন্ট
সংরক্ষণ, লেবেল ছাড়া ফিনিশড প্রোডাক্ট
মজুদ এবং খোলা ও
অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে ওষুধ তৈরির প্রমাণ
পান ভ্রাম্যমাণ আদালত। এমনকি খোলা অবস্থায় জ্বাল
দেওয়া লিকুইড সংরক্ষণের মতো মারাত্মক অনিয়মও
ধরা পড়ে। এসব অপরাধে
ওষুধ ও কসমেটিকস আইনে
প্রতিষ্ঠানটিকে নগদ আড়াই লাখ
টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযান
প্রসঙ্গে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের
ঢাকা বিভাগীয় সহকারী পরিচালক আব্দুর রশীদ বলেন, “র্যাব
সদর দপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেট শাহ মোঃ জুবায়ের,
র্যাব-১০ এর কোম্পানি
কমান্ডার হাসান সিদ্দিকী এবং এসআইএ-এর
অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর বিল্লাল হোসেনসহ অভিযানে আমাদের ৪০ থেকে ৫০
জনের একটি চৌকস দল
অংশ নেয়। জনস্বাস্থ্যের হুমকিস্বরূপ
এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে আমাদের এই কঠোর অবস্থান।”
মাতুয়াইলে
হোমিও কারখানায় অভিযান ও জরিমানা
জুরাইনের
এই অভিযানের রেশ কাটতে না
কাটতেই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকায় আরও একটি ওষুধের
কারখানায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে ‘জে
বক্স এন্ড কোং লিমিটেড’
নামক একটি হোমিও প্রতিষ্ঠানে
মেয়াদোত্তীর্ণ কাঁচামাল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। গোপন সংবাদের
ভিত্তিতে গতকাল সকাল পৌনে ১১টা
থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত
পরিচালিত এই অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির
মালিককে ৭০ হাজার টাকা
জরিমানা করা হয়েছে।
ওষুধ
প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুর রশীদ জানান, “মাতুয়াইলের
পূর্ব কেরানীপাড়া আদর্শবাগ রোডের ওই কারখানায় কাঁচামাল
সংরক্ষণ রুমে মেয়াদোত্তীর্ণ কেমিক্যাল
ও ব্লক লিস্ট বহির্ভূত
কাঁচামাল পাওয়া গেছে। এছাড়া উৎপাদিত ওষুধের স্ট্রিপ ও প্যাকেটে ভিন্ন
ভিন্ন মেয়াদ এবং ব্যাচ নম্বর
ব্যবহার করা হচ্ছিল, যা
সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি
খেলা এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে
আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
কেরানীগঞ্জে
৩ ট্রাক নকল ওষুধ জব্দ: নেপথ্যে ভয়ঙ্কর চক্র
এর আগে গত পহেলা
এপ্রিল কেরানীগঞ্জের আর্টিবাজার এলাকায় একটি বাড়িতে গড়ে
তোলা বিশাল নকল ওষুধ কারখানার
সন্ধান পায় র্যাব ও
ওষুধ প্রশাসন। সেখান থেকে প্রায় ৩
ট্রাক ভর্তি নকল ও অরেজিস্ট্রিকৃত
ওষুধ এবং সরঞ্জাম জব্দ
করা হয়। এই ঘটনায়
মূল হোতা মজিব হোসেনকে
এক বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ
টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া
নকল কারখানা ভাড়া দেওয়ার অপরাধে
বাড়ির মালিককেও এক লাখ টাকা
জরিমানা করা হয়েছে।
জব্দকৃত
ওষুধের মধ্যে শিশুদের নকল জুস এবং
জীবনরক্ষাকারী দামী বিদেশি ইনজেকশন
‘হিউম্যান অ্যালবুমিন’ এর নকল কপিও
ছিল। চক্রটি দীর্ঘ ৪ মাস ধরে
অত্যন্ত গোপনে দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশে এসব বিষাক্ত ওষুধ
তৈরি করে আসছিল। সংশ্লিষ্ট
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেনজিরা, আর্টিবাজার, বন্দরছাঁটগাঁও এবং কলাতিয়াসহ বিভিন্ন
এলাকায় ছোট ছোট ঘর
ভাড়া নিয়ে এই চক্রটি
কাজ করছে। পরবর্তীতে নদীপথে এসব ভেজাল ওষুধ
মিটফোর্ড হয়ে সারা দেশের
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে
ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ
ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
জীবনরক্ষাকারী
ওষুধ নিয়ে এমন অমানবিক
জালিয়াতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র শিক্ষক
এই প্রতিবেদককে বলেন, “সাধারণত এই ভেজাল ওষুধ
রোগীর কোনো কাজে আসে
না। উল্টো নকল ওষুধ সেবনে
লিভার, কিডনি, মস্তিষ্ক এবং ত্বকের মারাত্মক
ক্ষতি হতে পারে। ক্ষতিকর
রাসায়নিকের প্রভাবে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।”
ওষুধ
ব্যবসায়ী জিয়াউর রহমান বলেন, “যারা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ
নকল করে, তাদের সরাসরি
মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত। বর্তমানে ওষুধের বাজারে কোনটা আসল আর কোনটা
নকল, তা চেনা সাধারণ
মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব
হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের সর্বোচ্চ শাস্তি
না হলে সাধারণ মানুষের
জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।”
একজন
গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, নকল ওষুধ নির্মূল
করতে হলে বিশেষ ক্ষমতা
আইনের আওতায় সর্বোচ্চ সাজার ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যদিকে,
বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন,
“নকলবাজ যেই হোক, তার
কোনো ছাড় নেই। কোনো
বিক্রেতা যদি জেনে শুনে
নকল ওষুধ বিক্রি করে,
তবে আমরা ওষুধ প্রশাসনকে
সাথে নিয়ে তার বিরুদ্ধে
কঠোর ব্যবস্থা নেব।”
জনস্বার্থ
রক্ষায় এবং ভেজাল ওষুধের
ভয়াবহতা রোধে সারাদেশে এ
ধরনের চিরুনি অভিযান আগামীতেও অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর।

আপনার মতামত লিখুন