“পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দুই যোদ্ধা হলো ধৈর্য এবং সময়” —সাড়া জাগানো রুশ ঔপন্যাসিক লিও টলস্টয়ের এই উক্তি দিয়ে গত শতকের পঞ্চাশের দশকের এক মহীরূপ শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ, ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে আবিষ্কার করা যায়| তাঁর চেহারার দিকে তাকালেই বোঝা যেত তিনি কতটা ধৈর্যশীল ও স্থির-প্রাজ্ঞ একজন মানুষ| অন্যদিকে তিনি তাঁর সময়কে যেমন চিনতে পেরেছিলেন, একইভাবে সময়ের প্রতিটি ক্ষণকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়— ব্যক্তি জীবনে তিনি তার প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন| এজন্য তিনি শুধু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠির শিক্ষক ছিলেন না; ছিলেন সমগ্র বাঙালির চেতনার জাগরণের শিক্ষক| তাঁর জ্ঞাত অতীত থেকে মৃত্যুর সময়টা পর্যন্ত আমাদের সাংস্কৃতিক নির্মাণ-বিনির্মাণের যে শুদ্ধতম পথ, সেই পথের ইতিহাস শুনিয়েছেন, বুঝিয়েছেন|
অকস্মাৎ ঝড়ের মতো কিছু সংবাদ আমাদের দুমড়েমুচড়ে দিয়ে যায়| সম্ভাবনাময় স্বপ্নটি যদি মুহূর্তে এলোমেলো হয়ে বিপরীতার্থ বহন করে, কেবল তখনই আমরা নড়েচড়ে বসি| বিশ্ব মহামারি করোনাকালের চরম সংকটময় মুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের প্রস্থান তেমন একটি ঝড়োহাওয়া— যা আমাদের চেতনাভূমি ও সমাজবাস্তবতাকে টলটলায়মান করে দিয়ে যায়| হৃদযন্ত্রের যে স্বাভাবিক অসুস্থতা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, তার পরিণতি যে এতটা মূল্য দিয়ে গুনতে হবে, তা কেউ ভাবেনি!
যে কোনো সময়ে-অসময়ে আমরা যখন তাঁকে নির্ভর করেছি, আশ্রয় করেছি, সম্ভাবনার স্ফুরণ দেখবো বলে তাঁর দিকে তাকিয়ে থেকেছি; সেই তিনিই আর কোনোদিন কথা না বলার ব্রতে হয়ে গেলেন চিরঅভিমানী| যার কোনো বিকল্প হয় না, যার কোনো দ্বিতীয় হয় না, তেমন একজন অকৃত্রিম বাঙালি আমাদের ছিলেন, তেমন একজন অহংকার আমাদের ছিলেন, তেমন একজন আলোর প্রদর্শক বাঙালি জাতির ইতিহাস, রাজনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, আন্দোলন-সংগ্রামকে দীর্ঘ চুরাশিটি বছর ধরে শাণিত করেছেন, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি সচরাচর ঘটে না! আর তাই তাঁর শূন্যতায় শোকাকুল সমগ্র বাঙালি জাতি, বাংলার আকাশ-বাতাস-অরণ্য-সমুদ্র-নদী|
কোনো কোনো দিনে আকাশজুড়ে প্রচণ্ড মেঘ করে এলে দিনের আলো তার উজ্জ্বলতা হারায়| ধারণ করে অনেকটা সান্ধ্যমূর্তি| সূর্যের অস্তিত্ব বলতে কোথাও কিছু থাকে বলে মনে হয় না| কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য যে, সেই মেঘলাদিন কিন্তু কখনো রাত্রিতে রূপান্তরিত হয় না| কোথাও না কোথাও থেকে দিনের সূর্যের আলোকরশ্মি এই পৃথিবীতে এসে একটু হলেও দিনের সম্মান বাঁচিয়ে রাখে| তাই আকাশে যতই মেঘ ঘনিয়ে আসুক না কেন, তা কখনো দিনকে রাত্রিতে রূপান্তরিত করতে পারে না| ঠিক এমনিভাবে এমন কিছু কিছু সত্যিকারের জ্ঞানী ও দেশপ্রেমিক মানুষ থাকেনই, যারা জাতীয় জীবনে চরমতম অন্ধকার ঘনিয়ে আসার মুহূর্তেও কোথাও না কোথাও বসে তাঁদের জ্ঞান ও প্রেমের আলো দিয়ে অন্ধকারকে আলোকিত করতে সদা তৎপর থাকেন| বাঙালি জাতির জীবনে তেমন একটি জ্ঞানাগার ছিলেন আনিসুজ্জামান| তেমন একজন সংবেদনশীল দেশপ্রেমিক-ঐতিহ্যপ্রেমিক নাগরিকের নাম আনিসুজ্জামান| আজ তাঁর দৈহিক অনুপস্থিতিতেও তার লেখালেখি ও জীবনাদর্শ আমাদের যথার্থ জ্ঞানান্বেষায় উদ্বুদ্ধ করে|
আনিসুজ্জামান শুধু একজন ব্যক্তিমাত্র তো ননই, নন একক কোনো উচ্চমাত্র অভিধার কেউ| একটি দুটি বা ততোধিক বিশেষণে সম্বোধিত করেও তাঁকে সত্যিকারের মূল্যায়ন করা যায় না| হ্যাঁ, প্রতিটি জাতিতে বিরল কিছু মানুষ তাঁদের স্বতন্ত্র মনুষ্যত্ব নিয়ে উপস্থিত থাকেন, যারা এমনভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে যান যে, তাঁদেরকে আর বিশেষ কিছুতে আটকে রাখা যায় না| তাঁদের মনের অজান্তেই হয়ে ওঠেন সর্বত্রের| তখন তাঁদেরকে ভাবা যায় অন্ত্যজের, সাধারণের, পেশাজীবীর, খেলোয়াড়ের, ভিক্ষুকের, ছাত্র-শিক্ষকের, সৃষ্টিশীলের, বুদ্ধিজীবীর, রাজনীতিবিদের কিংবা সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার কিংবা আরো অনেক কিছুর|
আনিসুজ্জামান নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া একজন মানুষ| একজন মানুষ যতটুকু উঠতে চায়, কিংবা উঠতে পারে, সে জায়গাটুকু তো সসীমই| কিন্তু মানুষ যখন তার লক্ষ্যকে ছাড়িয়ে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে ওঠে, তখন আর তাকে সসীমে আটকে রাখা যায় না| তিনি নিজেই তখন হয়ে ওঠেন অসীমের| সেই অসীমের যে সুখ তাকে সুখী করতে প্রস্তুত; তারও কয়েক গুণ বেশি দুঃখ ও অপ্রাপ্তি তাকে নিভৃতে ব্যথিত ও ভারাক্রান্ত করে রাখে| তখন তার দিকে তাকিয়ে থাকে পত্রহীন শাখা, চেতনাহীন শিক্ষা, অন্নহীন মানুষ, পথহারা পথিক, দিশাহীন জাতি এবং আরো কত কিছু| তখন মনের অজান্তে তার মধ্যে এই কর্তব্যবোধ জেগে ওঠে যে, এদের প্রত্যেকের মুখে হাসি না ফুটিয়ে তিনি সুখনিদ্রায় রাত্রি কাটাতে পারেন না| প্রতিটি জাতির মধ্যে এমন কিছু আলোকালয় ব্যক্তিত্ব থাকেন; যারা কেউ চাপিয়ে না দিলেও এই কর্তব্যবোধ অনুভব করেন এবং সুদূরে দৃষ্টি দিয়ে এটা দেখতে পান যে, ঐ অনালোকিত স্থানগুলোতে শেষ আলো ফেলবার ভরসা শুধু তাদের জন্যই অবশিষ্ট আছে| সেখানে নেতা, রাজনীতিক, শাসক, বুদ্ধিজীবী, বিপ্লবী কিংবা অন্য নির্ভরতার মুখগুলো যখন তাদের দায়িত্ব ফেলে চলে গেছেন, তখন একমাত্র সত্যিকারের দেশপ্রেমিক আলোকিত মানুষটিকে ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না| তখন তাঁর বুকে চেপে বসা অনিশ্চয়তা আর দুর্লঙ্ঘ্য পথের অসহযোগিতা তাঁকে ব্যথিত করে, তাঁকে ভারাক্রান্ত করে| কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর আলোতেই উৎস রচনা করে বিজয়ের হাসি|
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যে স্তরে দাঁড়িয়ে মানুষ গড়ার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন, তা একদিনে তৈরি হয়নি| সেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়, যখন তার বয়স মাত্র ১৫ বছর, তখনই তিনি তার স্বতন্ত্র আবির্ভাব জানান দিয়েছিলেন| তার পর থেকে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ ঘোষণাকালে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বাঙালির যে কোনো আন্দোলন সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা এ স্বাক্ষর রেখেছে| দেশে সামরিক স্বৈরশাসকের আমলে, মৌলবাদ, জঙ্গীবাদের উত্থানের কালে তাঁর প্রত্যয়দীপ্ত অনমনীয় ভূমিকা জাতিকে অন্ধকার ডিঙিয়ে আলোর দিকে টানতে উৎসাহিত করেছে|
সত্যি বলতে কি আজকের দিনের কোনো কোনো তারুণ্যের মধ্যে, বিপ্লবীদের মধ্যে যে সাহসের অভাব পরিলক্ষিত হয়; যে দৈন্য ও আলস্য ভর করেছে; তখন অশীতিপর আনিসুজ্জামানের ভূমিকা যেন তাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের স্তরে এসে ঠেকেছিল| দেশব্যাপী যখন মৌলবাদ-জঙ্গীবাদের ভয়াল বিস্তার মানুষের বেঁচে থাকাকে অনিশ্চিত করে তুলেছিল; ৬৪ জেলায় একত্রে বোমা হামলা করে প্রকম্পিত করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাকে; উদীচী-রমনার মতো যত্রতত্র বোমা হামলা করে হত্যা করা হয়েছিল অগণিত মানুষকে; তখন আনিসুজ্জামানের মতো মানুষকে দেখা গেছে অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে সে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে কী করে জাতিকে রক্ষা করা যায়, স্বাধীনতার মর্মার্থ খুঁজে পাওয়া যায়, সেদিকে আমাদের নির্দেশনা দিতে|
আমাদের অসামান্য অভিভাবক আনিসুজ্জামান শুধুমাত্র সময়ান্তরে আমাদের কাছে এক মহীরুহ হয়ে ওঠেননি; আশৈশব তাঁর বেড়ে ওঠার ইতিহাস, পারিবারিক আবহ এক্ষেত্রে যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি তাঁর লেখাপড়া ও জানার প্রতি আগ্রহ তাঁকে লক্ষ্য অর্জনে অনেক বেশি অগ্রসর করে দিয়েছে| তিনি শুধু দেশ-বিদেশে লেখাপড়া শেখা একজন সাধারণ মেধাবী শিক্ষকমাত্র হয়ে থাকতে চাননি| নিরন্তর সৃষ্টিশীলতা ও শিক্ষার মধ্যে তিনি নিজেকে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন| এ প্রমাণ আমরা তাঁর লেখালেখিতে যেমন লক্ষ্য করি, তেমনি তা স্পষ্ট হয় তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থের বিষয়গুলোর দিকে লক্ষ্য করলে| বাংলা ইংরেজি মিলিয়ে তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের গ্রন্থগুলো সম্পাদনা করেছেন— আনিসুজ্জামানের মেধাজাত সেইসব বিষয়ের ওপর আলো ফেলার মতো মানুষ বিরল| বরং বিস্মিত হতে হয় তিনি সত্যি সত্যি কী বিচিত্র বিষয়কে ধারণ করে বড় হয়েছেন! কী বর্ণাঢ্য তার জীবন! জ্ঞানের জন্য, নিজেকে রাঙিয়ে তুলতে তিনি কী অমানুষিক পরিশ্রমই না করে গেছেন!
তাঁর কিছু একক ও যৌথ সম্পাদিত বইয়ের কথা বলি— যা আমাদের চিরকালের সম্পদ হয়ে আছে : রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর-রচনা সংগ্রহ, অজিত গুহ স্মারকগ্রন্থ, নারীর কথা, মধুদা, আবু হেনা মোস্তফা কামাল রচনাবলী, মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, স্বরূপের সন্ধানে, পুরোনো বাংলা গদ্য, আমার একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর, বিপুলা পৃথিবী, কাল নিরবধি, Factory correspondence and other Bengali Documents in the India office Library and Records; Creativity, Identity and Reality; Cultural Pluralism; Identity, Religion and Recent history; SAARC : A People's Perspective প্রভৃতি|
আনিসুজ্জামান সাহিত্য ও সংস্কৃতিসাধক ব্যক্তিত্বদের গভীর মনোনিবেশের সঙ্গে অধ্যয়নের মাধ্যমে নিজেকে এমন স্থিতধী করে গড়ে তুলতে পেরেছেন| অসংখ্য গুণী সংস্কৃতিবান ব্যক্তিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখার মাধ্যমে তাঁদের মূল্যায়নের প্রমাণ বিভিন্ন গ্রন্থে রেখেছেন| শুধু ব্যক্তিত্ব নয়; ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে বিষয়ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠেছে| যেমন কিছু কিছু বিষয় আছে, যা ব্যক্তিকে ছাপিয়ে ইতিহাসে স্থান করে নেয়| ব্যক্তি সেখানে স্বভূমিকায় তার স্থানে অধিষ্ঠিত থাকেন| যেমন আমাদের বায়ান্নার ভাষা সংগ্রাম, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী ও ছিয়ানব্বইয়ের অসহযোগ আন্দোলনের কথা উল্লেখ করা যায়| এছাড়া আছে পৃথিবীব্যাপী কিংবা আমাদের বিভিন্ন নিজস্ব সাংস্কৃতিক আন্দোলন| এ জাতীয় বিষয় যেমন তাঁর নিবিড় পর্যবেক্ষণে বিশ্লেষিত হয়েছে; তেমনি নতুন নতুন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোকে পর্যবেক্ষণ করেছেন গণমানুষের পক্ষ হয়ে; তাদের অবস্থানে দাঁড়িয়ে|
লেখক ও অভিভাবক আনিসুজ্জামানের যে বিষয়টি সবার সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে সামনে উঠে এসেছে; তা হলো— তাঁর বক্তৃতা, লেখা, আড্ডা-অন্তরঙ্গতা| আজ তাই সমাজের সুস্থ বোধসম্পন্ন মানুষের কাছে কখনো কখনো হয়ে পড়েছিলেন একক নির্ভরতা| আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভিভাবকত্ব খুঁজতে গেলে তাঁর বিকল্প মেলাই দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে|
একইভাবে তিনি তাঁর লেখনিকে চালনা করেছিলেন সম্পূর্ণ নিজস্ব ভঙ্গিমা ও যুক্তিনিষ্ঠতায়| অতিকথন ও বাহুল্যহীনতা তাঁর লেখার অন্যতম বিশিষ্টতা| খুব স্বল্প পরিসর ও অল্প কথায় তিনি ব্যাপক বিষয়কে ধারণ করতে পারঙ্গম| তাঁর জীবন ও বিচরণ এতটাই ঘটনাবহুল ও সামগ্রিক যে, যে কোনো বিষয় লিখতে গেলেই তিনি সেখান থেকে রসদ নিতে পারতেন, সেই অভিজ্ঞতার আলোকে অব্যর্থ যুক্তিতে লেখার পরিণতি টানতেন| তাঁর রচনার আর একটি বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে: বিষয়ভিত্তিক রচনাগুলোতে তিনি তাঁর জীবন কিংবা ইতিহাস থেকে এমন একটি উদারহণ খুঁজে বের করেন যেন ঐ লেখাটি সম্পূর্ণ করতে এই উদাহরণটির কোনো বিকল্প নেই| এবং তেমন একটি উদাহরণের মাধ্যমে তিনি খুব অল্প কথায় একটি বিস্ময়কর রচনা দাঁড় করান| এক্ষেত্রে তাঁকে একটি জীবন্ত এনসাইক্লোপেডিয়া বললে অত্যুক্তি হয় না|
আনিসুজ্জামান জীবনে কখনো নিজেকে ফাঁকি দেননি; একটি মুহূর্তও অপব্যয়িত হতে দেননি; একটি ক্ষণও জ্ঞানের আলোহীন পথ হাঁটেননি| ৮৪ বছরের জীবনে যে বিশাল সৃষ্টিসম্ভার, উপদেশ-নির্দেশনা ও সত্য প্রকাশের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন; তাকে অতিক্রম করা যে কারোমাত্র কাজ নয়|

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬
“পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দুই যোদ্ধা হলো ধৈর্য এবং সময়” —সাড়া জাগানো রুশ ঔপন্যাসিক লিও টলস্টয়ের এই উক্তি দিয়ে গত শতকের পঞ্চাশের দশকের এক মহীরূপ শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ, ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে আবিষ্কার করা যায়| তাঁর চেহারার দিকে তাকালেই বোঝা যেত তিনি কতটা ধৈর্যশীল ও স্থির-প্রাজ্ঞ একজন মানুষ| অন্যদিকে তিনি তাঁর সময়কে যেমন চিনতে পেরেছিলেন, একইভাবে সময়ের প্রতিটি ক্ষণকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়— ব্যক্তি জীবনে তিনি তার প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন| এজন্য তিনি শুধু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠির শিক্ষক ছিলেন না; ছিলেন সমগ্র বাঙালির চেতনার জাগরণের শিক্ষক| তাঁর জ্ঞাত অতীত থেকে মৃত্যুর সময়টা পর্যন্ত আমাদের সাংস্কৃতিক নির্মাণ-বিনির্মাণের যে শুদ্ধতম পথ, সেই পথের ইতিহাস শুনিয়েছেন, বুঝিয়েছেন|
অকস্মাৎ ঝড়ের মতো কিছু সংবাদ আমাদের দুমড়েমুচড়ে দিয়ে যায়| সম্ভাবনাময় স্বপ্নটি যদি মুহূর্তে এলোমেলো হয়ে বিপরীতার্থ বহন করে, কেবল তখনই আমরা নড়েচড়ে বসি| বিশ্ব মহামারি করোনাকালের চরম সংকটময় মুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের প্রস্থান তেমন একটি ঝড়োহাওয়া— যা আমাদের চেতনাভূমি ও সমাজবাস্তবতাকে টলটলায়মান করে দিয়ে যায়| হৃদযন্ত্রের যে স্বাভাবিক অসুস্থতা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, তার পরিণতি যে এতটা মূল্য দিয়ে গুনতে হবে, তা কেউ ভাবেনি!
যে কোনো সময়ে-অসময়ে আমরা যখন তাঁকে নির্ভর করেছি, আশ্রয় করেছি, সম্ভাবনার স্ফুরণ দেখবো বলে তাঁর দিকে তাকিয়ে থেকেছি; সেই তিনিই আর কোনোদিন কথা না বলার ব্রতে হয়ে গেলেন চিরঅভিমানী| যার কোনো বিকল্প হয় না, যার কোনো দ্বিতীয় হয় না, তেমন একজন অকৃত্রিম বাঙালি আমাদের ছিলেন, তেমন একজন অহংকার আমাদের ছিলেন, তেমন একজন আলোর প্রদর্শক বাঙালি জাতির ইতিহাস, রাজনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, আন্দোলন-সংগ্রামকে দীর্ঘ চুরাশিটি বছর ধরে শাণিত করেছেন, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি সচরাচর ঘটে না! আর তাই তাঁর শূন্যতায় শোকাকুল সমগ্র বাঙালি জাতি, বাংলার আকাশ-বাতাস-অরণ্য-সমুদ্র-নদী|
কোনো কোনো দিনে আকাশজুড়ে প্রচণ্ড মেঘ করে এলে দিনের আলো তার উজ্জ্বলতা হারায়| ধারণ করে অনেকটা সান্ধ্যমূর্তি| সূর্যের অস্তিত্ব বলতে কোথাও কিছু থাকে বলে মনে হয় না| কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য যে, সেই মেঘলাদিন কিন্তু কখনো রাত্রিতে রূপান্তরিত হয় না| কোথাও না কোথাও থেকে দিনের সূর্যের আলোকরশ্মি এই পৃথিবীতে এসে একটু হলেও দিনের সম্মান বাঁচিয়ে রাখে| তাই আকাশে যতই মেঘ ঘনিয়ে আসুক না কেন, তা কখনো দিনকে রাত্রিতে রূপান্তরিত করতে পারে না| ঠিক এমনিভাবে এমন কিছু কিছু সত্যিকারের জ্ঞানী ও দেশপ্রেমিক মানুষ থাকেনই, যারা জাতীয় জীবনে চরমতম অন্ধকার ঘনিয়ে আসার মুহূর্তেও কোথাও না কোথাও বসে তাঁদের জ্ঞান ও প্রেমের আলো দিয়ে অন্ধকারকে আলোকিত করতে সদা তৎপর থাকেন| বাঙালি জাতির জীবনে তেমন একটি জ্ঞানাগার ছিলেন আনিসুজ্জামান| তেমন একজন সংবেদনশীল দেশপ্রেমিক-ঐতিহ্যপ্রেমিক নাগরিকের নাম আনিসুজ্জামান| আজ তাঁর দৈহিক অনুপস্থিতিতেও তার লেখালেখি ও জীবনাদর্শ আমাদের যথার্থ জ্ঞানান্বেষায় উদ্বুদ্ধ করে|
আনিসুজ্জামান শুধু একজন ব্যক্তিমাত্র তো ননই, নন একক কোনো উচ্চমাত্র অভিধার কেউ| একটি দুটি বা ততোধিক বিশেষণে সম্বোধিত করেও তাঁকে সত্যিকারের মূল্যায়ন করা যায় না| হ্যাঁ, প্রতিটি জাতিতে বিরল কিছু মানুষ তাঁদের স্বতন্ত্র মনুষ্যত্ব নিয়ে উপস্থিত থাকেন, যারা এমনভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে যান যে, তাঁদেরকে আর বিশেষ কিছুতে আটকে রাখা যায় না| তাঁদের মনের অজান্তেই হয়ে ওঠেন সর্বত্রের| তখন তাঁদেরকে ভাবা যায় অন্ত্যজের, সাধারণের, পেশাজীবীর, খেলোয়াড়ের, ভিক্ষুকের, ছাত্র-শিক্ষকের, সৃষ্টিশীলের, বুদ্ধিজীবীর, রাজনীতিবিদের কিংবা সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার কিংবা আরো অনেক কিছুর|
আনিসুজ্জামান নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া একজন মানুষ| একজন মানুষ যতটুকু উঠতে চায়, কিংবা উঠতে পারে, সে জায়গাটুকু তো সসীমই| কিন্তু মানুষ যখন তার লক্ষ্যকে ছাড়িয়ে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে ওঠে, তখন আর তাকে সসীমে আটকে রাখা যায় না| তিনি নিজেই তখন হয়ে ওঠেন অসীমের| সেই অসীমের যে সুখ তাকে সুখী করতে প্রস্তুত; তারও কয়েক গুণ বেশি দুঃখ ও অপ্রাপ্তি তাকে নিভৃতে ব্যথিত ও ভারাক্রান্ত করে রাখে| তখন তার দিকে তাকিয়ে থাকে পত্রহীন শাখা, চেতনাহীন শিক্ষা, অন্নহীন মানুষ, পথহারা পথিক, দিশাহীন জাতি এবং আরো কত কিছু| তখন মনের অজান্তে তার মধ্যে এই কর্তব্যবোধ জেগে ওঠে যে, এদের প্রত্যেকের মুখে হাসি না ফুটিয়ে তিনি সুখনিদ্রায় রাত্রি কাটাতে পারেন না| প্রতিটি জাতির মধ্যে এমন কিছু আলোকালয় ব্যক্তিত্ব থাকেন; যারা কেউ চাপিয়ে না দিলেও এই কর্তব্যবোধ অনুভব করেন এবং সুদূরে দৃষ্টি দিয়ে এটা দেখতে পান যে, ঐ অনালোকিত স্থানগুলোতে শেষ আলো ফেলবার ভরসা শুধু তাদের জন্যই অবশিষ্ট আছে| সেখানে নেতা, রাজনীতিক, শাসক, বুদ্ধিজীবী, বিপ্লবী কিংবা অন্য নির্ভরতার মুখগুলো যখন তাদের দায়িত্ব ফেলে চলে গেছেন, তখন একমাত্র সত্যিকারের দেশপ্রেমিক আলোকিত মানুষটিকে ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না| তখন তাঁর বুকে চেপে বসা অনিশ্চয়তা আর দুর্লঙ্ঘ্য পথের অসহযোগিতা তাঁকে ব্যথিত করে, তাঁকে ভারাক্রান্ত করে| কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর আলোতেই উৎস রচনা করে বিজয়ের হাসি|
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যে স্তরে দাঁড়িয়ে মানুষ গড়ার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন, তা একদিনে তৈরি হয়নি| সেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়, যখন তার বয়স মাত্র ১৫ বছর, তখনই তিনি তার স্বতন্ত্র আবির্ভাব জানান দিয়েছিলেন| তার পর থেকে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ ঘোষণাকালে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বাঙালির যে কোনো আন্দোলন সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা এ স্বাক্ষর রেখেছে| দেশে সামরিক স্বৈরশাসকের আমলে, মৌলবাদ, জঙ্গীবাদের উত্থানের কালে তাঁর প্রত্যয়দীপ্ত অনমনীয় ভূমিকা জাতিকে অন্ধকার ডিঙিয়ে আলোর দিকে টানতে উৎসাহিত করেছে|
সত্যি বলতে কি আজকের দিনের কোনো কোনো তারুণ্যের মধ্যে, বিপ্লবীদের মধ্যে যে সাহসের অভাব পরিলক্ষিত হয়; যে দৈন্য ও আলস্য ভর করেছে; তখন অশীতিপর আনিসুজ্জামানের ভূমিকা যেন তাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের স্তরে এসে ঠেকেছিল| দেশব্যাপী যখন মৌলবাদ-জঙ্গীবাদের ভয়াল বিস্তার মানুষের বেঁচে থাকাকে অনিশ্চিত করে তুলেছিল; ৬৪ জেলায় একত্রে বোমা হামলা করে প্রকম্পিত করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাকে; উদীচী-রমনার মতো যত্রতত্র বোমা হামলা করে হত্যা করা হয়েছিল অগণিত মানুষকে; তখন আনিসুজ্জামানের মতো মানুষকে দেখা গেছে অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে সে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে কী করে জাতিকে রক্ষা করা যায়, স্বাধীনতার মর্মার্থ খুঁজে পাওয়া যায়, সেদিকে আমাদের নির্দেশনা দিতে|
আমাদের অসামান্য অভিভাবক আনিসুজ্জামান শুধুমাত্র সময়ান্তরে আমাদের কাছে এক মহীরুহ হয়ে ওঠেননি; আশৈশব তাঁর বেড়ে ওঠার ইতিহাস, পারিবারিক আবহ এক্ষেত্রে যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি তাঁর লেখাপড়া ও জানার প্রতি আগ্রহ তাঁকে লক্ষ্য অর্জনে অনেক বেশি অগ্রসর করে দিয়েছে| তিনি শুধু দেশ-বিদেশে লেখাপড়া শেখা একজন সাধারণ মেধাবী শিক্ষকমাত্র হয়ে থাকতে চাননি| নিরন্তর সৃষ্টিশীলতা ও শিক্ষার মধ্যে তিনি নিজেকে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন| এ প্রমাণ আমরা তাঁর লেখালেখিতে যেমন লক্ষ্য করি, তেমনি তা স্পষ্ট হয় তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থের বিষয়গুলোর দিকে লক্ষ্য করলে| বাংলা ইংরেজি মিলিয়ে তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের গ্রন্থগুলো সম্পাদনা করেছেন— আনিসুজ্জামানের মেধাজাত সেইসব বিষয়ের ওপর আলো ফেলার মতো মানুষ বিরল| বরং বিস্মিত হতে হয় তিনি সত্যি সত্যি কী বিচিত্র বিষয়কে ধারণ করে বড় হয়েছেন! কী বর্ণাঢ্য তার জীবন! জ্ঞানের জন্য, নিজেকে রাঙিয়ে তুলতে তিনি কী অমানুষিক পরিশ্রমই না করে গেছেন!
তাঁর কিছু একক ও যৌথ সম্পাদিত বইয়ের কথা বলি— যা আমাদের চিরকালের সম্পদ হয়ে আছে : রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর-রচনা সংগ্রহ, অজিত গুহ স্মারকগ্রন্থ, নারীর কথা, মধুদা, আবু হেনা মোস্তফা কামাল রচনাবলী, মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, স্বরূপের সন্ধানে, পুরোনো বাংলা গদ্য, আমার একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর, বিপুলা পৃথিবী, কাল নিরবধি, Factory correspondence and other Bengali Documents in the India office Library and Records; Creativity, Identity and Reality; Cultural Pluralism; Identity, Religion and Recent history; SAARC : A People's Perspective প্রভৃতি|
আনিসুজ্জামান সাহিত্য ও সংস্কৃতিসাধক ব্যক্তিত্বদের গভীর মনোনিবেশের সঙ্গে অধ্যয়নের মাধ্যমে নিজেকে এমন স্থিতধী করে গড়ে তুলতে পেরেছেন| অসংখ্য গুণী সংস্কৃতিবান ব্যক্তিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখার মাধ্যমে তাঁদের মূল্যায়নের প্রমাণ বিভিন্ন গ্রন্থে রেখেছেন| শুধু ব্যক্তিত্ব নয়; ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে বিষয়ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠেছে| যেমন কিছু কিছু বিষয় আছে, যা ব্যক্তিকে ছাপিয়ে ইতিহাসে স্থান করে নেয়| ব্যক্তি সেখানে স্বভূমিকায় তার স্থানে অধিষ্ঠিত থাকেন| যেমন আমাদের বায়ান্নার ভাষা সংগ্রাম, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী ও ছিয়ানব্বইয়ের অসহযোগ আন্দোলনের কথা উল্লেখ করা যায়| এছাড়া আছে পৃথিবীব্যাপী কিংবা আমাদের বিভিন্ন নিজস্ব সাংস্কৃতিক আন্দোলন| এ জাতীয় বিষয় যেমন তাঁর নিবিড় পর্যবেক্ষণে বিশ্লেষিত হয়েছে; তেমনি নতুন নতুন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোকে পর্যবেক্ষণ করেছেন গণমানুষের পক্ষ হয়ে; তাদের অবস্থানে দাঁড়িয়ে|
লেখক ও অভিভাবক আনিসুজ্জামানের যে বিষয়টি সবার সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে সামনে উঠে এসেছে; তা হলো— তাঁর বক্তৃতা, লেখা, আড্ডা-অন্তরঙ্গতা| আজ তাই সমাজের সুস্থ বোধসম্পন্ন মানুষের কাছে কখনো কখনো হয়ে পড়েছিলেন একক নির্ভরতা| আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভিভাবকত্ব খুঁজতে গেলে তাঁর বিকল্প মেলাই দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে|
একইভাবে তিনি তাঁর লেখনিকে চালনা করেছিলেন সম্পূর্ণ নিজস্ব ভঙ্গিমা ও যুক্তিনিষ্ঠতায়| অতিকথন ও বাহুল্যহীনতা তাঁর লেখার অন্যতম বিশিষ্টতা| খুব স্বল্প পরিসর ও অল্প কথায় তিনি ব্যাপক বিষয়কে ধারণ করতে পারঙ্গম| তাঁর জীবন ও বিচরণ এতটাই ঘটনাবহুল ও সামগ্রিক যে, যে কোনো বিষয় লিখতে গেলেই তিনি সেখান থেকে রসদ নিতে পারতেন, সেই অভিজ্ঞতার আলোকে অব্যর্থ যুক্তিতে লেখার পরিণতি টানতেন| তাঁর রচনার আর একটি বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে: বিষয়ভিত্তিক রচনাগুলোতে তিনি তাঁর জীবন কিংবা ইতিহাস থেকে এমন একটি উদারহণ খুঁজে বের করেন যেন ঐ লেখাটি সম্পূর্ণ করতে এই উদাহরণটির কোনো বিকল্প নেই| এবং তেমন একটি উদাহরণের মাধ্যমে তিনি খুব অল্প কথায় একটি বিস্ময়কর রচনা দাঁড় করান| এক্ষেত্রে তাঁকে একটি জীবন্ত এনসাইক্লোপেডিয়া বললে অত্যুক্তি হয় না|
আনিসুজ্জামান জীবনে কখনো নিজেকে ফাঁকি দেননি; একটি মুহূর্তও অপব্যয়িত হতে দেননি; একটি ক্ষণও জ্ঞানের আলোহীন পথ হাঁটেননি| ৮৪ বছরের জীবনে যে বিশাল সৃষ্টিসম্ভার, উপদেশ-নির্দেশনা ও সত্য প্রকাশের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন; তাকে অতিক্রম করা যে কারোমাত্র কাজ নয়|

আপনার মতামত লিখুন