সংবাদ

একসঙ্গে ৫ শিশুর জন্ম, চিকিৎসকদের মুখে হাসি


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ১০:১১ পিএম

একসঙ্গে ৫ শিশুর জন্ম, চিকিৎসকদের মুখে হাসি
নবজাতকদের কোলে নিয়ে চিকিৎসকরা হাসিমুখে মা-বাবা ও স্বজনদের হাতে তুলে দেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) একসঙ্গে জন্ম নেওয়া স্বল্প ওজনের ৫ শিশুকে সফলভাবে সুস্থ করে বাড়ি পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত বিরল ও চ্যালেঞ্জিং একটি ঘটনা।

বৃহস্পতিবার (১৩ মে) বিএমইউর শহীদ ডা. মিল্টন হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী নবজাতকদের কোলে নিয়ে হাসিমুখে মা-বাবা ও স্বজনদের হাতে তুলে দেন।

এসময় উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার, নিওনাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মান্নান ও ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. তাবাছসুম পারভীন।  

উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী এ ঘটনাকে বিএমইউর বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসটেট্রিকস অ্যান্ড গাইনোকোলজি বিভাগ, ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগ এবং নিওনাটোলজি বিভাগের চিকিৎসাসেবা ও চিকিৎসক-নার্সদের দক্ষতার প্রশংসা করেন।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামাল, মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ, সার্জারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রাহীম সিদ্দিক, শিশু অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. আতিয়ার রহমান, মেডিকেল টেকনোলজি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এম আবু হেনা চৌধুরী, নার্সিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. মনির হোসেন খান, ডেন্টাল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্তসহ নিওনাটোলজি ও ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগের শিক্ষক, চিকিৎসক ও রেসিডেন্ট চিকিৎসকেরা।

নিওনাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মান্নান জানান, গত ৫ এপ্রিল ৩০ বছর বয়সী এক মায়ের গর্ভে ৩৩ সপ্তাহ বয়সে সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে পাঁচ শিশুর জন্ম হয়। এদের মধ্যে দুই কন্যা ও তিন পুত্র। একাধিক ভ্রূণজনিত (মাল্টিপল জেস্টেশন) কারণে গর্ভাবস্থাটি শুরু থেকেই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

জন্মের সময় শিশুদের ওজন ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ৪২০ গ্রাম, ১ হাজার ২৫০ গ্রাম, ১ হাজার ৪১০ গ্রাম, ৯৮৫ গ্রাম ও ১ হাজার ৬২৫ গ্রাম। এদের মধ্যে কয়েকজনের ওজন ছিল অত্যন্ত কম। জন্মের পরপরই দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, বুক দেবে যাওয়া ও গ্রান্টিংয়ের মতো শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা দেয়। অপরিণত অবস্থার কারণে শিশুদের এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়।

অধ্যাপক মান্নান আরও জানান, শিশুদের চিকিৎসায় শুরু থেকেই কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেগুলো হলো- জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যেই বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা, সিপ্যাপ সাপোর্ট দেওয়া, নিয়মিত হাত ধোয়ার মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধ নিশ্চিত করা, ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার চালু করা এবং দ্রুত সুস্থতার ভিত্তিতে পরিকল্পিত আর্লি ডিসচার্জের ওপর জোর দেওয়া।

পাঁচটি শিশুকেই জন্মের পরপর সিপ্যাপ সাপোর্ট দেওয়া হয়। নিবিড় পর্যবেক্ষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ধাপে ধাপে খাবার বৃদ্ধি এবং মায়ের বুকের দুধ নিশ্চিত করার মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের শ্বাসকষ্ট কমে আসে। 

চিকিৎসকদের মতে, জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা নবজাতকদের দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এনআইসিইউ সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের তত্ত্বাবধানে পরিবারকেও সংক্রমণ প্রতিরোধের বিষয়ে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নিয়মিত ও সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস অনুসরণ করায় সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম রাখা সম্ভব হয়েছে।

শিশুদের অবস্থা স্থিতিশীল হলে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার শুরু করা হয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মায়ের বুকের সঙ্গে ত্বকের সংস্পর্শে রাখার এই পদ্ধতি শিশুদের ওজন বৃদ্ধি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও মা-শিশুর বন্ধন উন্নত করতে সহায়তা করেছে।

জন্মের পাঁচ দিন পর, গত ৯ এপ্রিল পরিকল্পিত আর্লি ডিসচার্জের অংশ হিসেবে শিশুদের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে ফলো-আপ কেয়ার চলতে থাকে। ৩০ দিন বয়সে ফলো-আপে দেখা যায়, পাঁচ শিশুরই ওজন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। তখন তাদের ওজন দাঁড়ায় যথাক্রমে ১ হাজার ৭০০ গ্রাম, ১ হাজার ৫২০ গ্রাম, ১ হাজার ৬৪৫ গ্রাম, ১ হাজার ২১৫ গ্রাম এবং ১ হাজার ৮২৫ গ্রাম। সকলেই সুস্থ ছিল।

চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশের সীমিত সম্পদের মধ্যেও সময়মতো এনআইসিইউ কেয়ার, বুকের দুধ খাওয়ানো, সিপ্যাপ ব্যবস্থাপনা, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার নিশ্চিত করা গেলে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রিম্যাচিউর নবজাতকদের সফলভাবে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬


একসঙ্গে ৫ শিশুর জন্ম, চিকিৎসকদের মুখে হাসি

প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) একসঙ্গে জন্ম নেওয়া স্বল্প ওজনের ৫ শিশুকে সফলভাবে সুস্থ করে বাড়ি পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত বিরল ও চ্যালেঞ্জিং একটি ঘটনা।

বৃহস্পতিবার (১৩ মে) বিএমইউর শহীদ ডা. মিল্টন হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী নবজাতকদের কোলে নিয়ে হাসিমুখে মা-বাবা ও স্বজনদের হাতে তুলে দেন।

এসময় উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার, নিওনাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মান্নান ও ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. তাবাছসুম পারভীন।  

উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী এ ঘটনাকে বিএমইউর বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসটেট্রিকস অ্যান্ড গাইনোকোলজি বিভাগ, ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগ এবং নিওনাটোলজি বিভাগের চিকিৎসাসেবা ও চিকিৎসক-নার্সদের দক্ষতার প্রশংসা করেন।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামাল, মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ, সার্জারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রাহীম সিদ্দিক, শিশু অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. আতিয়ার রহমান, মেডিকেল টেকনোলজি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এম আবু হেনা চৌধুরী, নার্সিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. মনির হোসেন খান, ডেন্টাল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্তসহ নিওনাটোলজি ও ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগের শিক্ষক, চিকিৎসক ও রেসিডেন্ট চিকিৎসকেরা।

নিওনাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মান্নান জানান, গত ৫ এপ্রিল ৩০ বছর বয়সী এক মায়ের গর্ভে ৩৩ সপ্তাহ বয়সে সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে পাঁচ শিশুর জন্ম হয়। এদের মধ্যে দুই কন্যা ও তিন পুত্র। একাধিক ভ্রূণজনিত (মাল্টিপল জেস্টেশন) কারণে গর্ভাবস্থাটি শুরু থেকেই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

জন্মের সময় শিশুদের ওজন ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ৪২০ গ্রাম, ১ হাজার ২৫০ গ্রাম, ১ হাজার ৪১০ গ্রাম, ৯৮৫ গ্রাম ও ১ হাজার ৬২৫ গ্রাম। এদের মধ্যে কয়েকজনের ওজন ছিল অত্যন্ত কম। জন্মের পরপরই দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, বুক দেবে যাওয়া ও গ্রান্টিংয়ের মতো শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা দেয়। অপরিণত অবস্থার কারণে শিশুদের এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়।

অধ্যাপক মান্নান আরও জানান, শিশুদের চিকিৎসায় শুরু থেকেই কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেগুলো হলো- জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যেই বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা, সিপ্যাপ সাপোর্ট দেওয়া, নিয়মিত হাত ধোয়ার মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধ নিশ্চিত করা, ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার চালু করা এবং দ্রুত সুস্থতার ভিত্তিতে পরিকল্পিত আর্লি ডিসচার্জের ওপর জোর দেওয়া।

পাঁচটি শিশুকেই জন্মের পরপর সিপ্যাপ সাপোর্ট দেওয়া হয়। নিবিড় পর্যবেক্ষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ধাপে ধাপে খাবার বৃদ্ধি এবং মায়ের বুকের দুধ নিশ্চিত করার মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের শ্বাসকষ্ট কমে আসে। 

চিকিৎসকদের মতে, জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা নবজাতকদের দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এনআইসিইউ সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের তত্ত্বাবধানে পরিবারকেও সংক্রমণ প্রতিরোধের বিষয়ে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নিয়মিত ও সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস অনুসরণ করায় সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম রাখা সম্ভব হয়েছে।

শিশুদের অবস্থা স্থিতিশীল হলে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার শুরু করা হয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মায়ের বুকের সঙ্গে ত্বকের সংস্পর্শে রাখার এই পদ্ধতি শিশুদের ওজন বৃদ্ধি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও মা-শিশুর বন্ধন উন্নত করতে সহায়তা করেছে।

জন্মের পাঁচ দিন পর, গত ৯ এপ্রিল পরিকল্পিত আর্লি ডিসচার্জের অংশ হিসেবে শিশুদের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে ফলো-আপ কেয়ার চলতে থাকে। ৩০ দিন বয়সে ফলো-আপে দেখা যায়, পাঁচ শিশুরই ওজন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। তখন তাদের ওজন দাঁড়ায় যথাক্রমে ১ হাজার ৭০০ গ্রাম, ১ হাজার ৫২০ গ্রাম, ১ হাজার ৬৪৫ গ্রাম, ১ হাজার ২১৫ গ্রাম এবং ১ হাজার ৮২৫ গ্রাম। সকলেই সুস্থ ছিল।

চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশের সীমিত সম্পদের মধ্যেও সময়মতো এনআইসিইউ কেয়ার, বুকের দুধ খাওয়ানো, সিপ্যাপ ব্যবস্থাপনা, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার নিশ্চিত করা গেলে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রিম্যাচিউর নবজাতকদের সফলভাবে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত