সংবাদ

গো-খাদ্য সংকটে গরু বেচে দিচ্ছেন হাওরের খামারিরা


প্রতিনিধি, সুনামগঞ্জ
প্রতিনিধি, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম

গো-খাদ্য সংকটে গরু বেচে দিচ্ছেন হাওরের খামারিরা
অতিবৃষ্টিতে পচে যাওয়া খড় সরাচ্ছেন এক কৃষক। ছবি : সংবাদ

অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বোরো ধান হারানোর পর এবার গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষক ও খামারিরা। পর্যাপ্ত খড় সংগ্রহ করতে না পারা এবং সংগৃহীত খড় পচে যাওয়ায় জেলাজুড়ে তীব্র গো-খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শেষ সম্বল গবাদিপশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ১২ উপজেলার কয়েক লাখ কৃষক। পশুর আহার জোগাতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে গরু-মহিষ বিক্রি করে দিচ্ছেন।

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি গবাদিপশু। বছরের প্রায় ছয় মাস এসব পশু পুরোপুরি ধানের খড়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে। কৃষকদের দাবি, গো-খাদ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ জোগান আসে বোরো ধান থেকে। কিন্তু এবার ধান তলিয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ কৃষক প্রয়োজনীয় খড় সংগ্রহ করতে পারেননি। যেসব জমি থেকে ধান কোনোমতে কেটে আনা হয়েছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেই খড় শুকাতে না পেরে পচে নষ্ট হয়ে গেছে।

সদর উপজেলার জানিগাঁও গ্রামের কৃষক সমছু মিয়া জানান, তার ৯টি গরুর জন্য প্রতি বছর যে পরিমাণ খড় লাগত, এবার তার অর্ধেকও সংগ্রহ করা যায়নি। একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন শান্তিগঞ্জের কৃষক রুহুল ইসলাম। খাদ্যের সংস্থান করতে না পেরে তিনি গরু বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবছেন।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দরিয়াবাজ গ্রামের কৃষক মঙ্গল মিয়া ও রেজুয়ান আহমদ বলেন, ‘দেখার হাওরের ফসল জলাবদ্ধতায় সবার আগে তলিয়ে গেছে। ধারদেনা করে চাষাবাদ করেও এক মুঠো ধান ঘরে তুলতে পারিনি। এখন গরু-বাছুর নিয়ে মহাবিপদে আছি। ধানের সাথে খড়ও পচে গেছে। খড় ছাড়া গরু বাঁচানো দায় হয়ে পড়েছে।’

শাল্লার উদগল হাওরের কৃষাণী ছায়ারানী আক্ষেপ করে বলেন, ‘২৭ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করেছিলাম। ধান তো গেলই, সাথে খড়ও হারাল। এখন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা অবস্থা।’

জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার গবাদিপশু রয়েছে। প্রতি বছর জেলায় প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন খড় উৎপাদন হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১২০ কোটি টাকা। এ বছর ১৯৩টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। কিন্তু অতিবৃষ্টির জলাবদ্ধতায় খড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ খড় সংগ্রহ করা না গেলেও কৃষকরা বিকল্প হিসেবে ভুসি, ধানের গুঁড়া ও খেসারির মতো খাদ্য ব্যবহার করতে পারেন।’ তবে প্রান্তিক কৃষকদের দাবি, বর্তমান বাজারদরে এসব বিকল্প খাদ্য কিনে গরু পালন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব।

এদিকে, হাওরাঞ্চলে বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান আন্দোলন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ ও গো-খাদ্য সংস্থানের দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। দ্রুত সরকারি সহায়তা না পেলে জেলার কয়েক লাখ খামারি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬


গো-খাদ্য সংকটে গরু বেচে দিচ্ছেন হাওরের খামারিরা

প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬

featured Image

অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বোরো ধান হারানোর পর এবার গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষক ও খামারিরা। পর্যাপ্ত খড় সংগ্রহ করতে না পারা এবং সংগৃহীত খড় পচে যাওয়ায় জেলাজুড়ে তীব্র গো-খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শেষ সম্বল গবাদিপশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ১২ উপজেলার কয়েক লাখ কৃষক। পশুর আহার জোগাতে না পেরে অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে গরু-মহিষ বিক্রি করে দিচ্ছেন।

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি গবাদিপশু। বছরের প্রায় ছয় মাস এসব পশু পুরোপুরি ধানের খড়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে। কৃষকদের দাবি, গো-খাদ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ জোগান আসে বোরো ধান থেকে। কিন্তু এবার ধান তলিয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ কৃষক প্রয়োজনীয় খড় সংগ্রহ করতে পারেননি। যেসব জমি থেকে ধান কোনোমতে কেটে আনা হয়েছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেই খড় শুকাতে না পেরে পচে নষ্ট হয়ে গেছে।

সদর উপজেলার জানিগাঁও গ্রামের কৃষক সমছু মিয়া জানান, তার ৯টি গরুর জন্য প্রতি বছর যে পরিমাণ খড় লাগত, এবার তার অর্ধেকও সংগ্রহ করা যায়নি। একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন শান্তিগঞ্জের কৃষক রুহুল ইসলাম। খাদ্যের সংস্থান করতে না পেরে তিনি গরু বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবছেন।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দরিয়াবাজ গ্রামের কৃষক মঙ্গল মিয়া ও রেজুয়ান আহমদ বলেন, ‘দেখার হাওরের ফসল জলাবদ্ধতায় সবার আগে তলিয়ে গেছে। ধারদেনা করে চাষাবাদ করেও এক মুঠো ধান ঘরে তুলতে পারিনি। এখন গরু-বাছুর নিয়ে মহাবিপদে আছি। ধানের সাথে খড়ও পচে গেছে। খড় ছাড়া গরু বাঁচানো দায় হয়ে পড়েছে।’

শাল্লার উদগল হাওরের কৃষাণী ছায়ারানী আক্ষেপ করে বলেন, ‘২৭ বিঘা জমিতে চাষাবাদ করেছিলাম। ধান তো গেলই, সাথে খড়ও হারাল। এখন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা অবস্থা।’

জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার গবাদিপশু রয়েছে। প্রতি বছর জেলায় প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন খড় উৎপাদন হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১২০ কোটি টাকা। এ বছর ১৯৩টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। কিন্তু অতিবৃষ্টির জলাবদ্ধতায় খড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ খড় সংগ্রহ করা না গেলেও কৃষকরা বিকল্প হিসেবে ভুসি, ধানের গুঁড়া ও খেসারির মতো খাদ্য ব্যবহার করতে পারেন।’ তবে প্রান্তিক কৃষকদের দাবি, বর্তমান বাজারদরে এসব বিকল্প খাদ্য কিনে গরু পালন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব।

এদিকে, হাওরাঞ্চলে বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান আন্দোলন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ ও গো-খাদ্য সংস্থানের দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। দ্রুত সরকারি সহায়তা না পেলে জেলার কয়েক লাখ খামারি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত