ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসতেই সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার সীমান্তে চোরাচালানীদের তৎপরতা বেড়েছে বহুগুণ। সীমান্ত ঘেঁষা বোগলা বাজার, নরসিংপুর ও বাংলাবাজার-এই তিনটি হাটেই এখন রাতের অন্ধকারে ভারত থেকে আসছে গরু-মহিষের বড় বড় চালান। আর এসব গরু রাখার জন্য খামারের আড়ালে গড়ে উঠেছে ‘রাত্রিযাপন কেন্দ্র’।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই চোরাচালান রুখতে বারবার অভিযান চালালেও থামছে না অবৈধ ব্যবসা। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্য ও সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে চালিয়ে যাচ্ছেন চোরাচালানীরা।
দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তঘেঁষা বোগলাবাজার এলাকায় গরুর খামারের আড়ালে কথিত ‘রাত্রিযাপন কেন্দ্র’ গড়ে উঠেছে। কাগজপত্রে খামার হিসেবে নিবন্ধিত এসব স্থাপনা বাস্তবে রাতভর গরু রাখার বিনিময়ে অর্থ আদায়ের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বোগলাবাজারের বিভিন্ন স্থানে খামারের নামে নির্মিত স্থাপনাগুলো দিনে প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকে। গবাদিপশু লালন-পালনের তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না। তবে রাত হলেই সেখানে ভারতীয় গরু এনে রাখা হয়। স্থানীয়দের দাবি, এসব গরুর একটি বড় অংশ সীমান্ত পেরিয়ে আসে এবং পরদিন ভোরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি গরুর জন্য ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ‘রাত্রিযাপন ফি’ নেওয়া হচ্ছে। এতে খামারগুলো কার্যত একটি অস্থায়ী বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, খামারগুলোর বাইরে কেবল দেখানোর জন্য ঘাস-খড় রাখা হয়। ভেতরে নিয়মিত কোনো খামার কার্যক্রম নেই। রাতে গরু এনে রাখা এবং সকালে সরিয়ে নেওয়াই মূল কাজ। এলাকাটিতে মোট ৮টি খামার রয়েছে, যার মধ্যে ৪টি নিবন্ধিত এবং ৪টি অনিবন্ধিত।
বোগলাবাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘রাতে খামারগুলোতে গরু ভর্তি হয়, আবার সকালে সেগুলো অন্যত্র চলে যায়। এতে স্থানীয় বাজারে গরুর দামে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।’
সুনামগঞ্জ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় এই বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। গত ৯ মে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও এ নিয়ে আলোচনা হয় এবং সংশ্লিষ্টদের কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে থামছে না চোরাচালানীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক ইজারাদার জানান, বর্ডার বন্ধ থাকায় কয়েক দিন গরু কম নামছে। এছাড়া প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে সতর্ক রয়েছে জড়িতরা।
সুনামগঞ্জ জেলার এই তিনটি গরুর হাট বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে ইজারা নিতে এলাকায় রীতিমতো প্রতিযোগিতা হয়।
২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ২ কোটি ৪০ লাখ টাকায় বোগলা বাজার গরুর হাট ইজারা পান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সুনামগঞ্জ জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক ও বোগলা এগ্রো ফার্মের মালিক ফয়সাল জামান। তার আত্মীয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিলেট বিভাগের অন্যতম সংগঠক আবু সালেহ নাসিম তাকে সহযোগিতা করেন।
এ নিয়ে উত্তেজনার সৃষ্টি হলে ইজারা বঞ্চিত পক্ষ এ বছরের ২৯ মার্চ ঈদের আগের রাতে ফয়সাল জামান ও আবু সালেহ নাসিমকে হামলা করে গুরুতর আহত করে। পরে এ ঘটনায় মামলা দায়ের হয়।
২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবির একটি অভিযানিক দল টাস্কফোর্সসহ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সুনামগঞ্জ শহর এলাকায় সুরমা নদী থেকে একটি স্টিল বডির গরুবোঝাই নৌকা আটক করে ব্যাটালিয়ন সদর দফতরে নিয়ে যায়। নৌকায় থাকা ৯০টি গরুর বাজারমূল্য ছিল আনুমানিক কোটি টাকা। এ ঘটনায় বিজিবি মামলা দায়ের করেছে।তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বিজিবি, পুলিশ ও প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যকে ম্যানেজ করেই এসব অপকর্ম চলে। এর সঙ্গে কতিপয় সাংবাদিক নামধারীও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে এক খামার মালিক বলেন, ‘আমি একা নই, আরও অনেকেই খামারে গরু রাখে। পাইকাররা কিনে এখানে রাখে, পরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যায়।’
আরেক খামার মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, তারা কোনো অবৈধ গরু রাখেন না। তিনি বলেন, ‘যারা গরু নিয়ে আসে, তারা নিজেদের গরু বলেই রাখে। রাতে রাখার জায়গা চাওয়ায় আমরা দিই।’
স্থানীয় বাসিন্দারা ও সচেতন মহল সীমান্তে চোরাচালান বন্ধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান চালালে চলবে না, খামারের আড়ালে গড়ে ওঠা ‘রাতযাপন কেন্দ্র’গুলো চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি উঠেছে।

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬
ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসতেই সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার সীমান্তে চোরাচালানীদের তৎপরতা বেড়েছে বহুগুণ। সীমান্ত ঘেঁষা বোগলা বাজার, নরসিংপুর ও বাংলাবাজার-এই তিনটি হাটেই এখন রাতের অন্ধকারে ভারত থেকে আসছে গরু-মহিষের বড় বড় চালান। আর এসব গরু রাখার জন্য খামারের আড়ালে গড়ে উঠেছে ‘রাত্রিযাপন কেন্দ্র’।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই চোরাচালান রুখতে বারবার অভিযান চালালেও থামছে না অবৈধ ব্যবসা। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্য ও সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে চালিয়ে যাচ্ছেন চোরাচালানীরা।
দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তঘেঁষা বোগলাবাজার এলাকায় গরুর খামারের আড়ালে কথিত ‘রাত্রিযাপন কেন্দ্র’ গড়ে উঠেছে। কাগজপত্রে খামার হিসেবে নিবন্ধিত এসব স্থাপনা বাস্তবে রাতভর গরু রাখার বিনিময়ে অর্থ আদায়ের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বোগলাবাজারের বিভিন্ন স্থানে খামারের নামে নির্মিত স্থাপনাগুলো দিনে প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকে। গবাদিপশু লালন-পালনের তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না। তবে রাত হলেই সেখানে ভারতীয় গরু এনে রাখা হয়। স্থানীয়দের দাবি, এসব গরুর একটি বড় অংশ সীমান্ত পেরিয়ে আসে এবং পরদিন ভোরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি গরুর জন্য ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ‘রাত্রিযাপন ফি’ নেওয়া হচ্ছে। এতে খামারগুলো কার্যত একটি অস্থায়ী বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, খামারগুলোর বাইরে কেবল দেখানোর জন্য ঘাস-খড় রাখা হয়। ভেতরে নিয়মিত কোনো খামার কার্যক্রম নেই। রাতে গরু এনে রাখা এবং সকালে সরিয়ে নেওয়াই মূল কাজ। এলাকাটিতে মোট ৮টি খামার রয়েছে, যার মধ্যে ৪টি নিবন্ধিত এবং ৪টি অনিবন্ধিত।
বোগলাবাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘রাতে খামারগুলোতে গরু ভর্তি হয়, আবার সকালে সেগুলো অন্যত্র চলে যায়। এতে স্থানীয় বাজারে গরুর দামে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।’
সুনামগঞ্জ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় এই বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। গত ৯ মে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও এ নিয়ে আলোচনা হয় এবং সংশ্লিষ্টদের কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে থামছে না চোরাচালানীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক ইজারাদার জানান, বর্ডার বন্ধ থাকায় কয়েক দিন গরু কম নামছে। এছাড়া প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে সতর্ক রয়েছে জড়িতরা।
সুনামগঞ্জ জেলার এই তিনটি গরুর হাট বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে ইজারা নিতে এলাকায় রীতিমতো প্রতিযোগিতা হয়।
২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ২ কোটি ৪০ লাখ টাকায় বোগলা বাজার গরুর হাট ইজারা পান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সুনামগঞ্জ জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক ও বোগলা এগ্রো ফার্মের মালিক ফয়সাল জামান। তার আত্মীয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিলেট বিভাগের অন্যতম সংগঠক আবু সালেহ নাসিম তাকে সহযোগিতা করেন।
এ নিয়ে উত্তেজনার সৃষ্টি হলে ইজারা বঞ্চিত পক্ষ এ বছরের ২৯ মার্চ ঈদের আগের রাতে ফয়সাল জামান ও আবু সালেহ নাসিমকে হামলা করে গুরুতর আহত করে। পরে এ ঘটনায় মামলা দায়ের হয়।
২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবির একটি অভিযানিক দল টাস্কফোর্সসহ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সুনামগঞ্জ শহর এলাকায় সুরমা নদী থেকে একটি স্টিল বডির গরুবোঝাই নৌকা আটক করে ব্যাটালিয়ন সদর দফতরে নিয়ে যায়। নৌকায় থাকা ৯০টি গরুর বাজারমূল্য ছিল আনুমানিক কোটি টাকা। এ ঘটনায় বিজিবি মামলা দায়ের করেছে।তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বিজিবি, পুলিশ ও প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যকে ম্যানেজ করেই এসব অপকর্ম চলে। এর সঙ্গে কতিপয় সাংবাদিক নামধারীও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে এক খামার মালিক বলেন, ‘আমি একা নই, আরও অনেকেই খামারে গরু রাখে। পাইকাররা কিনে এখানে রাখে, পরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যায়।’
আরেক খামার মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, তারা কোনো অবৈধ গরু রাখেন না। তিনি বলেন, ‘যারা গরু নিয়ে আসে, তারা নিজেদের গরু বলেই রাখে। রাতে রাখার জায়গা চাওয়ায় আমরা দিই।’
স্থানীয় বাসিন্দারা ও সচেতন মহল সীমান্তে চোরাচালান বন্ধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান চালালে চলবে না, খামারের আড়ালে গড়ে ওঠা ‘রাতযাপন কেন্দ্র’গুলো চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি উঠেছে।

আপনার মতামত লিখুন