আমরা যেখানে হাঁটি, যেখানে গাড়ি চালাই, ঠিক সেখানেই পায়ের নিচে মাত্র কয়েক ফুট গভীরে লুকিয়ে আছে বাংলার কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস। বগুড়ার মহাস্থানগড়, নেত্রকোনার রোহিতাশ গড়, সোনারগাঁয়ের পানাম নগর। শুধু ইট-পাথরের ধ্বংসাবশেষ নয়; এগুলো বাংলার হারিয়ে যাওয়া গৌরবের অমূল্য সাক্ষী।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এখানে এমন কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে- প্রাচীন বাংলা কোনো অনুন্নত জনপদ ছিল না, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল এই ভূখণ্ড। রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গেও ছিল সুগভীর যোগাযোগ। অবহেলা আর সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া এই দুর্গগুলোর মাটির নিচে আজও চাপা পড়ে আছে বহু না বলা রাজকীয় রহস্য।
গোকুল মেধকে কেউ বলে বেহুলার বাসরঘর
২০০৮ থেকে ২০১২ সালে এখানে খনন চালিয়ে অসাধারণ সব নিদর্শন পাওয়া যায়। বহুতল ভবনের ধ্বংসাবশেষ, প্রাসাদচত্বর, সুপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। কিন্তু সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কার হলো- একটি বিশাল ইটের তৈরি 'মন্দির' ও 'স্তূপ'। বৌদ্ধ ও হিন্দু—উভয় ধর্মের প্রভাব লক্ষ করা গেছে এখানে। অর্থাৎ মহাস্থানগড় ছিল এক অনন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের স্থান।
সর্বশেষ খননে মহাস্থানগড়ের মাটির নিচে মিলেছে এক ঝুড়ি রূপোর মুদ্রা। মুদ্রাগুলোতে রয়েছে গুপ্তযুগের স্বাক্ষর। পাশাপাশি মিলেছে রোমান সাম্রাজ্যের অ্যাম্ফোরা (মদের জারের টুকরো) ও লাল রঙের মৃৎপাত্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রমাণ করে-প্রাচীন বাংলার ব্যবসায়ীরা রোমান বণিকদের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য করতেন। বাংলার মসলিন আর সোনার বিনিময়ে আসত রোমান মদ আর অলংকার। তবে কৌতুহল জাগে, এত উন্নত নগরী কীভাবে ধ্বংস হলো? উত্তরের মধ্যে রক্তাক্ত ইতিহাস জড়িত। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সঙ্গে বহিরাগত আক্রমণও বারবার বিধ্বস্ত করেছিল এ নগরী। শেষ পর্যন্ত সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায় মহাস্থানগড়।
বাংলার এই দুর্গ ও নগরী হারিয়ে যাওয়ার কয়েকটি কারণ জানিয়েছেন ইতিহাসবিদরা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা ভয়াবহ বন্যা, নদী ভাঙন ও ভূমিকম্প বহু নগরীকে ধ্বংস করেছে। করতোয়া নদী একবার গতিপথ বদলে ফেলায় মহাস্থানগড়ের জলযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়। বার বার বিদেশি আক্রমণ। তুর্কি, আফগান, মুঘল ও ইংরেজ- প্রত্যেকেই এসে লুণ্ঠন করেছে বাংলার সম্পদ। স্বাধীনতার পর বহু স্থানে ইট সংগ্রহ করতে গিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে প্রত্নস্থল। আজও অনেক দুর্গের মালিকানা নিয়ে জটিলতা। সরকারি উদ্যোগের অভাবে নিদর্শনগুলো ক্রমশ মাটির গভীরে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি মহাস্থানগড় ও পানাম নগর পুনরুদ্ধারে হাতে নিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। প্রায় ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের এসব দুর্গ এখন ইতিমধ্যে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অস্থায়ী তালিকায় স্থান পেয়েছে। পুরোদমে পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ শুরু হলে আগামী দিনে বাংলার হারিয়ে যাওয়া গৌরবের সাক্ষী হতে পারবে বিশ্ববাসী।আমাদের পায়ের নিচের মাটি কেবল কাদামাটি নয়, সেখানে চাপা পড়ে আছে বাংলার হাজার বছরের সভ্যতার গল্প। কোনোদিন ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে লেখা ছিল এই জনপদের নাম। আজ হারিয়ে যাওয়া সেই দুর্গ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-সময় যতই এগোয়, ইতিহাস যেন আমরা কখনো ভুলে না যাই। ভবিষ্যৎ গড়তে গেলে যেমন আধুনিকতার প্রয়োজন, তেমনি শেকড় জানাও জরুরি।

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬
আমরা যেখানে হাঁটি, যেখানে গাড়ি চালাই, ঠিক সেখানেই পায়ের নিচে মাত্র কয়েক ফুট গভীরে লুকিয়ে আছে বাংলার কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস। বগুড়ার মহাস্থানগড়, নেত্রকোনার রোহিতাশ গড়, সোনারগাঁয়ের পানাম নগর। শুধু ইট-পাথরের ধ্বংসাবশেষ নয়; এগুলো বাংলার হারিয়ে যাওয়া গৌরবের অমূল্য সাক্ষী।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এখানে এমন কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে- প্রাচীন বাংলা কোনো অনুন্নত জনপদ ছিল না, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল এই ভূখণ্ড। রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গেও ছিল সুগভীর যোগাযোগ। অবহেলা আর সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া এই দুর্গগুলোর মাটির নিচে আজও চাপা পড়ে আছে বহু না বলা রাজকীয় রহস্য।
গোকুল মেধকে কেউ বলে বেহুলার বাসরঘর
২০০৮ থেকে ২০১২ সালে এখানে খনন চালিয়ে অসাধারণ সব নিদর্শন পাওয়া যায়। বহুতল ভবনের ধ্বংসাবশেষ, প্রাসাদচত্বর, সুপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। কিন্তু সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কার হলো- একটি বিশাল ইটের তৈরি 'মন্দির' ও 'স্তূপ'। বৌদ্ধ ও হিন্দু—উভয় ধর্মের প্রভাব লক্ষ করা গেছে এখানে। অর্থাৎ মহাস্থানগড় ছিল এক অনন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের স্থান।
সর্বশেষ খননে মহাস্থানগড়ের মাটির নিচে মিলেছে এক ঝুড়ি রূপোর মুদ্রা। মুদ্রাগুলোতে রয়েছে গুপ্তযুগের স্বাক্ষর। পাশাপাশি মিলেছে রোমান সাম্রাজ্যের অ্যাম্ফোরা (মদের জারের টুকরো) ও লাল রঙের মৃৎপাত্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রমাণ করে-প্রাচীন বাংলার ব্যবসায়ীরা রোমান বণিকদের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য করতেন। বাংলার মসলিন আর সোনার বিনিময়ে আসত রোমান মদ আর অলংকার। তবে কৌতুহল জাগে, এত উন্নত নগরী কীভাবে ধ্বংস হলো? উত্তরের মধ্যে রক্তাক্ত ইতিহাস জড়িত। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সঙ্গে বহিরাগত আক্রমণও বারবার বিধ্বস্ত করেছিল এ নগরী। শেষ পর্যন্ত সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায় মহাস্থানগড়।
বাংলার এই দুর্গ ও নগরী হারিয়ে যাওয়ার কয়েকটি কারণ জানিয়েছেন ইতিহাসবিদরা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা ভয়াবহ বন্যা, নদী ভাঙন ও ভূমিকম্প বহু নগরীকে ধ্বংস করেছে। করতোয়া নদী একবার গতিপথ বদলে ফেলায় মহাস্থানগড়ের জলযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়। বার বার বিদেশি আক্রমণ। তুর্কি, আফগান, মুঘল ও ইংরেজ- প্রত্যেকেই এসে লুণ্ঠন করেছে বাংলার সম্পদ। স্বাধীনতার পর বহু স্থানে ইট সংগ্রহ করতে গিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে প্রত্নস্থল। আজও অনেক দুর্গের মালিকানা নিয়ে জটিলতা। সরকারি উদ্যোগের অভাবে নিদর্শনগুলো ক্রমশ মাটির গভীরে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি মহাস্থানগড় ও পানাম নগর পুনরুদ্ধারে হাতে নিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। প্রায় ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের এসব দুর্গ এখন ইতিমধ্যে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অস্থায়ী তালিকায় স্থান পেয়েছে। পুরোদমে পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ শুরু হলে আগামী দিনে বাংলার হারিয়ে যাওয়া গৌরবের সাক্ষী হতে পারবে বিশ্ববাসী।আমাদের পায়ের নিচের মাটি কেবল কাদামাটি নয়, সেখানে চাপা পড়ে আছে বাংলার হাজার বছরের সভ্যতার গল্প। কোনোদিন ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে লেখা ছিল এই জনপদের নাম। আজ হারিয়ে যাওয়া সেই দুর্গ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-সময় যতই এগোয়, ইতিহাস যেন আমরা কখনো ভুলে না যাই। ভবিষ্যৎ গড়তে গেলে যেমন আধুনিকতার প্রয়োজন, তেমনি শেকড় জানাও জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন