কোনোর রকম পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই আকস্মিকভাবে বেড়ে গেছে রংপুরের আদালতে বিচারকাজে ব্যবহৃত সব কাগজপত্রের দাম। মামলা করার জন্য জরুরি প্রয়োজনের ওকালতনামা, জামিননামা, হাজিরা ও ফিরিস্তি ফরমসহ সব ধরনের ফরমের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বিচারপ্রার্থীরা। আইনের আশ্রয় নেওয়া থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। আর এ নিয়ে বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বিচারপ্রার্থীদের অভিযোগ, রংপুর আইনজীবী সমিতি তাদের কার্যকরী সভা ডেকে ওকালতনামা, জামিননামা, হাজিরার ফরম, ফিরিস্তি ফরমসহ সব ফরমের দাম বৃদ্ধি করেছে। ফলে একটি মামলা দায়ের করতে বা জামিন নিতে কমপক্ষে ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা শুধু কাগজ কিনতেই খরচ হচ্ছে।
আইনজীবী সমিতির নতুন দাম অনুযায়ী, ওকালতনামা: ৩৬০ টাকা থেকে ৯০ টাকা বেড়ে ৪৫০ টাকা হয়েছে। এর সঙ্গে ৩০ টাকার কোট ফি ধরে ব্যয় করতে হচ্ছে ৪৮০ টাকা। হাজিরার ফরম ১৫ টাকা বেড়ে ৫০ টাকা থেকে হয়েছে ৬৫ টাকা। জামিননামার ফরমের দাম বেড়েছে ১৫টাকা। ৮০ টাকা থেকে এখন হয়েছে ৯৫ টাকা। ফিরিস্তি ফরম ১৫ টাকা থেকে বেড়ে এখন ২০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। নকল ফরমের দাম ২০ টাকা বেড়েছে। ২৫ টাকার কিনতে হচ্ছে ৩৫ টাকায়। একইভাবে দরখাস্ত ফরমের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। আগের ৮ টাকার ফরম কিনতে হচ্ছে ১৫ টাকায়।
বিচারপ্রার্থীরা বলছেন, কাগজ কিনতেই দেড় হাজার টাকা লাগে। তারপর উকিল-মহুরিসহ অন্যান্য খরচ বাবদ আরও ৪-৫ হাজার টাকা লাগে। তাহলে যাদের টাকা নেই, তারা বিচার পাবে কীভাবে?
একজন বিচারপ্রার্থী বলেন, ‘একটি মামলায় যদি ১৫ জন আসামি থাকে, তাদের জামিননামার ফরম কিনতেই দেড় হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। এত টাকা আমাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। ওকালতনামা, হাজিরার ফরম আর জামিননামার দাম বৃদ্ধি আমাদের জন্য মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
আরেকজন অভিযোগ করেন, ‘ওকালতনামা বিক্রি করে যে আয় হয়, তা আইনজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। কিন্তু তাই বলে ৩-৪ টাকা খরচ করে ছাপিয়ে ৪৫০ টাকা দাম নির্ধারণ করতে হবে কেন?’
শুধু বিচারপ্রার্থীরা নন, মূল্যবৃদ্ধির এই সিদ্ধান্তে স্বাভাবিক আইনজীবীরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী পলাশকান্তি নাগ বলেন, ‘বিচার কাজে ব্যবহৃত কাগজপত্রের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিচারপ্রার্থীদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বাড়বে। নিম্ন আয়ের মানুষ অসহনীয় আর্থিক ব্যয়ের ভয়ে আইনের আশ্রয় নিতে চাইবেন না। গরিব ও অসহায় মানুষের আইনগত সেবার কথা চিন্তা করে এই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।’
আইনজীবী রোকেনুজ্জামান রোকন বলেন, ‘মামলা দায়ের বা বিচারের জন্য অতি প্রয়োজনীয় এসব কাগজপত্রের মূল্য বৃদ্ধির আগে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল, যা করা হয়নি। দাম বৃদ্ধির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।’
মানবাধিকার সংগঠন ও বিচারপ্রার্থীদের অভিযোগ, ওকালতনামা ছাড়া হাজিরার ফরম, জামিননামাসহ অন্যান্য কাগজপত্র কেন আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে কিনতে হবে?
বিচারপ্রার্থীদের প্রশ্ন, ‘ওকালতনামা তো আমরা যেকোনো স্টেশনারি দোকান থেকেও কিনতে পারি। কেন নির্দিষ্ট জায়গা থেকে বেশি দাম দিয়ে কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে?’
মামলার জরুরি কাগজপত্রের দাম বৃদ্ধি
তবে কেন আকস্মিকভাবে দাম বাড়ানো হলো, তার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি। ভেন্ডারদের কাছে পাঠানো নোটিশে দাম বৃদ্ধির বিষয়টি জানানো হলেও বিচারপ্রার্থী বা সাধারণ আইনজীবীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি।
একটি মামলা দায়ের বা জামিন নিতে গেলে বিচারপ্রার্থীকে ওকালতনামা, জামিননামা, হাজিরার ফরম, ফিরিস্তি ফরমসহ নানা কাগজ কিনতে হয়। আইনজীবী নিয়োগ করতেও ওকালতনামা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। মামলায় হাজিরা দিতেও হাজিরার ফরম লাগে। মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই খরচ এখন অনেক বেড়ে গেছে।
আইন প্রয়োগের প্রাথমিক ধাপেই বিচারপ্রার্থীরা জরুরি কাগজপত্রের দাম বৃদ্ধির কারণে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। গরিব ও অসহায় অনেকে আইনের আশ্রয় নেওয়া থেকে সরে আসছেন।যা সুবিচার লাভের মৌলিক অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন অনেকে।

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬
কোনোর রকম পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই আকস্মিকভাবে বেড়ে গেছে রংপুরের আদালতে বিচারকাজে ব্যবহৃত সব কাগজপত্রের দাম। মামলা করার জন্য জরুরি প্রয়োজনের ওকালতনামা, জামিননামা, হাজিরা ও ফিরিস্তি ফরমসহ সব ধরনের ফরমের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বিচারপ্রার্থীরা। আইনের আশ্রয় নেওয়া থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। আর এ নিয়ে বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বিচারপ্রার্থীদের অভিযোগ, রংপুর আইনজীবী সমিতি তাদের কার্যকরী সভা ডেকে ওকালতনামা, জামিননামা, হাজিরার ফরম, ফিরিস্তি ফরমসহ সব ফরমের দাম বৃদ্ধি করেছে। ফলে একটি মামলা দায়ের করতে বা জামিন নিতে কমপক্ষে ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা শুধু কাগজ কিনতেই খরচ হচ্ছে।
আইনজীবী সমিতির নতুন দাম অনুযায়ী, ওকালতনামা: ৩৬০ টাকা থেকে ৯০ টাকা বেড়ে ৪৫০ টাকা হয়েছে। এর সঙ্গে ৩০ টাকার কোট ফি ধরে ব্যয় করতে হচ্ছে ৪৮০ টাকা। হাজিরার ফরম ১৫ টাকা বেড়ে ৫০ টাকা থেকে হয়েছে ৬৫ টাকা। জামিননামার ফরমের দাম বেড়েছে ১৫টাকা। ৮০ টাকা থেকে এখন হয়েছে ৯৫ টাকা। ফিরিস্তি ফরম ১৫ টাকা থেকে বেড়ে এখন ২০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। নকল ফরমের দাম ২০ টাকা বেড়েছে। ২৫ টাকার কিনতে হচ্ছে ৩৫ টাকায়। একইভাবে দরখাস্ত ফরমের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। আগের ৮ টাকার ফরম কিনতে হচ্ছে ১৫ টাকায়।
বিচারপ্রার্থীরা বলছেন, কাগজ কিনতেই দেড় হাজার টাকা লাগে। তারপর উকিল-মহুরিসহ অন্যান্য খরচ বাবদ আরও ৪-৫ হাজার টাকা লাগে। তাহলে যাদের টাকা নেই, তারা বিচার পাবে কীভাবে?
একজন বিচারপ্রার্থী বলেন, ‘একটি মামলায় যদি ১৫ জন আসামি থাকে, তাদের জামিননামার ফরম কিনতেই দেড় হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। এত টাকা আমাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। ওকালতনামা, হাজিরার ফরম আর জামিননামার দাম বৃদ্ধি আমাদের জন্য মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
আরেকজন অভিযোগ করেন, ‘ওকালতনামা বিক্রি করে যে আয় হয়, তা আইনজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। কিন্তু তাই বলে ৩-৪ টাকা খরচ করে ছাপিয়ে ৪৫০ টাকা দাম নির্ধারণ করতে হবে কেন?’
শুধু বিচারপ্রার্থীরা নন, মূল্যবৃদ্ধির এই সিদ্ধান্তে স্বাভাবিক আইনজীবীরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী পলাশকান্তি নাগ বলেন, ‘বিচার কাজে ব্যবহৃত কাগজপত্রের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিচারপ্রার্থীদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বাড়বে। নিম্ন আয়ের মানুষ অসহনীয় আর্থিক ব্যয়ের ভয়ে আইনের আশ্রয় নিতে চাইবেন না। গরিব ও অসহায় মানুষের আইনগত সেবার কথা চিন্তা করে এই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।’
আইনজীবী রোকেনুজ্জামান রোকন বলেন, ‘মামলা দায়ের বা বিচারের জন্য অতি প্রয়োজনীয় এসব কাগজপত্রের মূল্য বৃদ্ধির আগে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল, যা করা হয়নি। দাম বৃদ্ধির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।’
মানবাধিকার সংগঠন ও বিচারপ্রার্থীদের অভিযোগ, ওকালতনামা ছাড়া হাজিরার ফরম, জামিননামাসহ অন্যান্য কাগজপত্র কেন আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে কিনতে হবে?
বিচারপ্রার্থীদের প্রশ্ন, ‘ওকালতনামা তো আমরা যেকোনো স্টেশনারি দোকান থেকেও কিনতে পারি। কেন নির্দিষ্ট জায়গা থেকে বেশি দাম দিয়ে কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে?’
মামলার জরুরি কাগজপত্রের দাম বৃদ্ধি
তবে কেন আকস্মিকভাবে দাম বাড়ানো হলো, তার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি। ভেন্ডারদের কাছে পাঠানো নোটিশে দাম বৃদ্ধির বিষয়টি জানানো হলেও বিচারপ্রার্থী বা সাধারণ আইনজীবীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি।
একটি মামলা দায়ের বা জামিন নিতে গেলে বিচারপ্রার্থীকে ওকালতনামা, জামিননামা, হাজিরার ফরম, ফিরিস্তি ফরমসহ নানা কাগজ কিনতে হয়। আইনজীবী নিয়োগ করতেও ওকালতনামা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। মামলায় হাজিরা দিতেও হাজিরার ফরম লাগে। মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই খরচ এখন অনেক বেড়ে গেছে।
আইন প্রয়োগের প্রাথমিক ধাপেই বিচারপ্রার্থীরা জরুরি কাগজপত্রের দাম বৃদ্ধির কারণে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। গরিব ও অসহায় অনেকে আইনের আশ্রয় নেওয়া থেকে সরে আসছেন।যা সুবিচার লাভের মৌলিক অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন অনেকে।

আপনার মতামত লিখুন