পুরো ঢাকা যখন শেকড়ের টানে খালি, ট্রেনের ছাদ, লঞ্চের ডেক আর বাসের জানালায় ঘরমুখো মানুষের উৎসবের ছোঁয়া- ঠিক তখন মিরপুরের একটি ব্যাচেলর মেসের ঘড়িতে কাঁটা যায় কোথায় যেন স্থির। ঈদের আগের রাত। পাঁচজনের মেস থেকে চারজন চলে গেছেন। একা রইলেন তন্ময়।
ফ্রিজে দুটো ডিম আর হাফ পেঁয়াজ। ফোনের চার্জ শেষ, চার্জারটা নিয়ে গেছে রুমমেট। অন্ধকার শুধু ঘরে নয়, মোবাইল স্ক্রিনেও। তন্ময়ের মতো হাজারো তরুণ রয়ে যায় ঢাকায়- চাকরির পরীক্ষা, জরুরি ডেডলাইন, আর্থিক অনটন, কিংবা শুধুই টিকিট জোটেনি বলে।
এদের ঈদ শুরু হয় মায়ের গলা শোনা ভিডিও কলে। আর শেষ হয় খালি রাস্তায় পায়চারি করে। এদের গল্প ভিন্ন। এদের ঈদ একা।
ঈদের আগের রাতে মেসের করিডোরটা অন্যরকম শব্দ করে। বন্ধুদের হাসি, দরজা ঠেলে ওঠার শব্দ, ‘সকালে রওনা দেব, ফোন দিয়ে দিস’- এসব যেন আগের দিনের। ঈদের দিনে সব নিস্তব্ধ।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ফাঁকা জায়গা আর শব্দহীনতার মধ্যে মানুষের অচেতন মনে ভয় আর উদ্বেগ বাসা বাঁধে। ব্যাচেলর মেস তার চরম অভিজ্ঞতা। পাশের ফ্ল্যাট থেকে ঈদের আগের রাতের আয়োজনের আওয়াজ আসে- নতুন জামা দেখানো, পরস্পরকে শুভেচ্ছা দেওয়া।
অথচ ওই একতলা উঁচু মেসটায় কেবল গিজগিজ করে পাখা, আর বাইরে থেকে ভেসে আসা সিটি করপোরেশনের মাইকের আওয়াজ- 'আবর্জনা ফেলবেন না’।
মেসের সোফায় পড়ে থাকা দিনের বাসি খবরের কাগজ, হোয়াটসঅ্যাপে ‘ঈদ মোবারক’ লিখতে গিয়ে কেমন যেন আটকে যাওয়া। কাকে লিখবে? সবাই তো পরিবার, আত্মীয় নিয়ে ব্যস্ত। তাদের মেসেজের জবাব আসবে ঈদের নামাজের পর, সেটাও ‘ফরওয়ার্ডেড’ বানালে।
ঈদের সকালে তন্ময় ঘড়ি দেখে। সাড়ে ৭টা। বাড়ির গল্পে তিনি শুনেছেন, এই সময়ে গ্রামের বাড়িতে জামা-জুতা পরে উঠে পড়েন বাবা। কিন্তু এখানে জানালা দিয়ে দেখা যায় বর্ষার মেঘ। পাশের ফ্ল্যাটে ‘এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন...গান।
ঈদের নামাজ পড়তে যান তন্ময়। ঈদগাহের সামনে দাঁড়িয়ে সবাই আলিঙ্গন করছে, ‘ঈদ মোবারক’ বলছে। তন্ময় হাত বাড়িয়ে দেন, কেউ ধরেন, কেউ না। উৎসবের আবহে তিনি যেন এক পরবাসী।
মেসে ফিরে পকেট থেকে বের করেন ফোন। মায়ের ভিডিও কল আসে। অন্যপ্রান্তে বাবা, ছোট বোন, খালা- সবাই জড়ো। হাতে সেমাইয়ের বাটি। ক্যামেরায় নিজেকে বাঁকা হাসি হাসতে হয়, ‘আমিও খাচ্ছি মা’। সত্যিটা হলো ফ্রিজে ঘরের উচ্ছিষ্ট কিছু ডিম আর পেঁয়াজ। রান্না করতে ইচ্ছে করছে না।
মোবাইল রেখে ফেরেন তন্ময়। একবার ভাবে, তার মতো আর কতজন আছে এই শহরে? যাদের এ মুহূর্তে বাসার ফ্রিজ নিশ্চুপ, আর মনের ভেতর উচ্ছ্বাস না বিষাদের দোলাচল?
ঈদের দিনে মরার মতো শুয়ে থাকেন। তবে অনেকে রাস্তায় নেমে পড়েন। তন্ময় উঠে মেসের বারান্দায় বসেন। পাশের একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে গরু জবাই হলো। মাংসের টুকরো কাটার শব্দ, ‘এই নাও, আত্মীয়ের জন্য রাখো’- এমন কথোপকথন ভেসে আসছে। কেউ কি ওপাশ থেকে ভাবে- ‘এখানে ব্যাচেলর মেস আছে, ঈদে কেউ নেই, তাদের জন্য কিছু পাঠিয়ে দিই’? না, কেউ ভাবে না।
এটা ঢাকার চরম বাস্তবতা। ‘আতিথেয়তা’ নামের সোনার হরিণ এখানে অনেকটা টাকার বিনিময়ে কেনা। এই দিনেও যাদের একা, তাদের দিকে তাকানোর সময় কারো নেই। কেউ ভাববে না, পাশের মেসটায় হয়তো একলা ছেলে বসে আছে, আমন্ত্রণ জানালে তার মুখে একটুখানি হাসি ফুটত।
একটু আগেই টিভি টকশোতে আলোচনা হচ্ছে- ‘কোরবানির প্রকৃত দর্শন’ নিয়ে। সেখানেই বলছে, তিন ভাগের নিয়ম। গরিব-দুঃখীর ভাগ। কিন্তু ব্যাচেলর মেসের এই ছেলেরা কি গরিব-দুঃখী তালিকায় পড়ে? নাকি তাদের ‘আমরা সবাই ব্যস্ত’- এই ঢাকাইয়া নীতির বাইরে রাখা হয়?
কিন্তু সব কি এত হতাশাজনক? না, ব্যতিক্রম আছে। ছোট ছোট গল্প দেখায়, মানুষ বাঁচার আশা দেয়। এবার কল্পনা করি মতিঝিলের এক মেসের কথা। পাঁচজনের মধ্যে তিনজন রয়ে গেছেন- চাকরির ইন্টারভিউ, টাকা সাশ্রয় আর পরীক্ষার প্রস্তুতির কারণে। তারা মিলে ঠিক করলেন, ‘এবার নিজেরাই ঈদ করবেন’।
ঈদের আগের রাতেই চাঁদা তোলা হয়। একজন বাজার করে আনেন ২ কেজি গরুর মাংস, আলু, পেঁয়াজ, মসলা। আরেকজন আনেন খেজুর আর সেমাই। সকালে নামাজ পড়ে তারা মিলে বসেন। রান্না করেন রায়হান- যার হাত একটু ভালো। বাকিরা কাটেন পেঁয়াজ, গুলান মসলা।
যথারীতি ভিডিও কলে মায়ের নির্দেশনা নেওয়া হয়- ‘পোলাওয়ের জ্বাল কেমন হয়েছে বাবা?’ মেসের ছোট্ট ডাইনিং টেবিলে তিন প্লেট। মাংসের ঝোল, পোলাও। প্লেট সামনে পেয়ে তিনজন স্তব্ধ। তারপর একসঙ্গে বলে ওঠেন- ‘ঈদ মোবারক!’
প্রকৃতপক্ষে, বাড়ি থেকে দূরে থাকা ব্যাচেলরদের ঈদ মানে এটাই। ছোট ছোট বন্ধন, নিজেদের তৈরি একটুখানি উৎসব। আর হ্যাঁ, রান্না শেষে একটি প্লেট মেসের নিচের দারোয়ানের জন্যও রাখা হয়। কারণ তারাও তো কারো সন্তান, কারো বাবা।

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬
পুরো ঢাকা যখন শেকড়ের টানে খালি, ট্রেনের ছাদ, লঞ্চের ডেক আর বাসের জানালায় ঘরমুখো মানুষের উৎসবের ছোঁয়া- ঠিক তখন মিরপুরের একটি ব্যাচেলর মেসের ঘড়িতে কাঁটা যায় কোথায় যেন স্থির। ঈদের আগের রাত। পাঁচজনের মেস থেকে চারজন চলে গেছেন। একা রইলেন তন্ময়।
ফ্রিজে দুটো ডিম আর হাফ পেঁয়াজ। ফোনের চার্জ শেষ, চার্জারটা নিয়ে গেছে রুমমেট। অন্ধকার শুধু ঘরে নয়, মোবাইল স্ক্রিনেও। তন্ময়ের মতো হাজারো তরুণ রয়ে যায় ঢাকায়- চাকরির পরীক্ষা, জরুরি ডেডলাইন, আর্থিক অনটন, কিংবা শুধুই টিকিট জোটেনি বলে।
এদের ঈদ শুরু হয় মায়ের গলা শোনা ভিডিও কলে। আর শেষ হয় খালি রাস্তায় পায়চারি করে। এদের গল্প ভিন্ন। এদের ঈদ একা।
ঈদের আগের রাতে মেসের করিডোরটা অন্যরকম শব্দ করে। বন্ধুদের হাসি, দরজা ঠেলে ওঠার শব্দ, ‘সকালে রওনা দেব, ফোন দিয়ে দিস’- এসব যেন আগের দিনের। ঈদের দিনে সব নিস্তব্ধ।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ফাঁকা জায়গা আর শব্দহীনতার মধ্যে মানুষের অচেতন মনে ভয় আর উদ্বেগ বাসা বাঁধে। ব্যাচেলর মেস তার চরম অভিজ্ঞতা। পাশের ফ্ল্যাট থেকে ঈদের আগের রাতের আয়োজনের আওয়াজ আসে- নতুন জামা দেখানো, পরস্পরকে শুভেচ্ছা দেওয়া।
অথচ ওই একতলা উঁচু মেসটায় কেবল গিজগিজ করে পাখা, আর বাইরে থেকে ভেসে আসা সিটি করপোরেশনের মাইকের আওয়াজ- 'আবর্জনা ফেলবেন না’।
মেসের সোফায় পড়ে থাকা দিনের বাসি খবরের কাগজ, হোয়াটসঅ্যাপে ‘ঈদ মোবারক’ লিখতে গিয়ে কেমন যেন আটকে যাওয়া। কাকে লিখবে? সবাই তো পরিবার, আত্মীয় নিয়ে ব্যস্ত। তাদের মেসেজের জবাব আসবে ঈদের নামাজের পর, সেটাও ‘ফরওয়ার্ডেড’ বানালে।
ঈদের সকালে তন্ময় ঘড়ি দেখে। সাড়ে ৭টা। বাড়ির গল্পে তিনি শুনেছেন, এই সময়ে গ্রামের বাড়িতে জামা-জুতা পরে উঠে পড়েন বাবা। কিন্তু এখানে জানালা দিয়ে দেখা যায় বর্ষার মেঘ। পাশের ফ্ল্যাটে ‘এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন...গান।
ঈদের নামাজ পড়তে যান তন্ময়। ঈদগাহের সামনে দাঁড়িয়ে সবাই আলিঙ্গন করছে, ‘ঈদ মোবারক’ বলছে। তন্ময় হাত বাড়িয়ে দেন, কেউ ধরেন, কেউ না। উৎসবের আবহে তিনি যেন এক পরবাসী।
মেসে ফিরে পকেট থেকে বের করেন ফোন। মায়ের ভিডিও কল আসে। অন্যপ্রান্তে বাবা, ছোট বোন, খালা- সবাই জড়ো। হাতে সেমাইয়ের বাটি। ক্যামেরায় নিজেকে বাঁকা হাসি হাসতে হয়, ‘আমিও খাচ্ছি মা’। সত্যিটা হলো ফ্রিজে ঘরের উচ্ছিষ্ট কিছু ডিম আর পেঁয়াজ। রান্না করতে ইচ্ছে করছে না।
মোবাইল রেখে ফেরেন তন্ময়। একবার ভাবে, তার মতো আর কতজন আছে এই শহরে? যাদের এ মুহূর্তে বাসার ফ্রিজ নিশ্চুপ, আর মনের ভেতর উচ্ছ্বাস না বিষাদের দোলাচল?
ঈদের দিনে মরার মতো শুয়ে থাকেন। তবে অনেকে রাস্তায় নেমে পড়েন। তন্ময় উঠে মেসের বারান্দায় বসেন। পাশের একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে গরু জবাই হলো। মাংসের টুকরো কাটার শব্দ, ‘এই নাও, আত্মীয়ের জন্য রাখো’- এমন কথোপকথন ভেসে আসছে। কেউ কি ওপাশ থেকে ভাবে- ‘এখানে ব্যাচেলর মেস আছে, ঈদে কেউ নেই, তাদের জন্য কিছু পাঠিয়ে দিই’? না, কেউ ভাবে না।
এটা ঢাকার চরম বাস্তবতা। ‘আতিথেয়তা’ নামের সোনার হরিণ এখানে অনেকটা টাকার বিনিময়ে কেনা। এই দিনেও যাদের একা, তাদের দিকে তাকানোর সময় কারো নেই। কেউ ভাববে না, পাশের মেসটায় হয়তো একলা ছেলে বসে আছে, আমন্ত্রণ জানালে তার মুখে একটুখানি হাসি ফুটত।
একটু আগেই টিভি টকশোতে আলোচনা হচ্ছে- ‘কোরবানির প্রকৃত দর্শন’ নিয়ে। সেখানেই বলছে, তিন ভাগের নিয়ম। গরিব-দুঃখীর ভাগ। কিন্তু ব্যাচেলর মেসের এই ছেলেরা কি গরিব-দুঃখী তালিকায় পড়ে? নাকি তাদের ‘আমরা সবাই ব্যস্ত’- এই ঢাকাইয়া নীতির বাইরে রাখা হয়?
কিন্তু সব কি এত হতাশাজনক? না, ব্যতিক্রম আছে। ছোট ছোট গল্প দেখায়, মানুষ বাঁচার আশা দেয়। এবার কল্পনা করি মতিঝিলের এক মেসের কথা। পাঁচজনের মধ্যে তিনজন রয়ে গেছেন- চাকরির ইন্টারভিউ, টাকা সাশ্রয় আর পরীক্ষার প্রস্তুতির কারণে। তারা মিলে ঠিক করলেন, ‘এবার নিজেরাই ঈদ করবেন’।
ঈদের আগের রাতেই চাঁদা তোলা হয়। একজন বাজার করে আনেন ২ কেজি গরুর মাংস, আলু, পেঁয়াজ, মসলা। আরেকজন আনেন খেজুর আর সেমাই। সকালে নামাজ পড়ে তারা মিলে বসেন। রান্না করেন রায়হান- যার হাত একটু ভালো। বাকিরা কাটেন পেঁয়াজ, গুলান মসলা।
যথারীতি ভিডিও কলে মায়ের নির্দেশনা নেওয়া হয়- ‘পোলাওয়ের জ্বাল কেমন হয়েছে বাবা?’ মেসের ছোট্ট ডাইনিং টেবিলে তিন প্লেট। মাংসের ঝোল, পোলাও। প্লেট সামনে পেয়ে তিনজন স্তব্ধ। তারপর একসঙ্গে বলে ওঠেন- ‘ঈদ মোবারক!’
প্রকৃতপক্ষে, বাড়ি থেকে দূরে থাকা ব্যাচেলরদের ঈদ মানে এটাই। ছোট ছোট বন্ধন, নিজেদের তৈরি একটুখানি উৎসব। আর হ্যাঁ, রান্না শেষে একটি প্লেট মেসের নিচের দারোয়ানের জন্যও রাখা হয়। কারণ তারাও তো কারো সন্তান, কারো বাবা।

আপনার মতামত লিখুন