সংবাদ

হাম না চিকেনপক্স? কীভাবে চিনবেন সহজেই


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম

হাম না চিকেনপক্স? কীভাবে চিনবেন সহজেই

ঋতু পরিবর্তনের সময় শিশুদের মধ্যে নানা ধরনের সংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ে। ভাইরাস ও জীবাণুঘটিত এসব রোগের প্রাথমিক উপসর্গগুলো প্রায় একই রকম- জ্বর, সর্দি-কাশি এবং ত্বকে ফুসকুড়ি। ফলে অভিভাবকরা প্রায়ই দ্বিধায় পড়েন যে শিশুটি আসলে হামে আক্রান্ত নাকি চিকেনপক্সে। তবে একটু সতর্কভাবে লক্ষ করলে এই দুই রোগের পার্থক্য বোঝা সম্ভব।

 

চলুন জেনে নিই কীভাবে চিনবেন-

হাম (Measles)

হাম 'রুবিওলা' ভাইরাসে হয়, যা অত্যন্ত সংক্রামক। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই আক্রান্ত হতে পারেন।

লক্ষণ:

·         ভাইরাস সংস্পর্শের ৭-১৪ দিন পর লক্ষণ দেখা দেয়

 

·         শুরুতে তীব্র শুকনো কাশি, সর্দি, চোখ লাল ও পানি পড়া

 

·         ১০৪° ফারেনহাইট পর্যন্ত উচ্চ জ্বর


কীভাবে চিনবেন:

 

জ্বর-কাশির ২-৩ দিন পর মুখের ভেতর গালের অংশে ছোট সাদা দাগ দেখা যায় (চিকিসাবৈজ্ঞানিক নাম: কোপলিক স্পট)

তার ৩-৫ দিন পর ত্বকে লালচে বা বাদামি ফুসকুড়ি ওঠে

ফুসকুড়ি প্রথমে মুখ, ঘাড় ও কানের পেছনে শুরু হয়, পরে সারা শরীরে ছড়ায়

৫-৬ দিন পর ফুসকুড়ি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে

 

জলবসন্ত বা চিকেনপক্স (Chickenpox)

ভেরিসেলা-জোস্টার ভাইরাসে হয়। বাতাসের মাধ্যমে কিংবা রোগীর ফুসকুড়ির তরল স্পর্শ করলেও ছড়ায়।

লক্ষণ:

সংস্পর্শের ১০-২১ দিন পর লক্ষণ দেখা দেয়

হালকা থেকে মাঝারি জ্বর, মাথাব্যথা, শীত শীত ভাব

কীভাবে চিনবেন:

১-২ দিনের মধ্যে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়

দ্রুত পানিভর্তি বা পুঁজভর্তি ফোস্কায় পরিণত হয়

প্রচণ্ড চুলকানি হয়

প্রথমে পেট ও পিঠে দেখা দেয়, পরে হাত-পায়ে ছড়ায়

 

বিশেষ বৈশিষ্ট্য: শরীরে একই সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের ফোস্কা দেখা যায়-কিছু নতুন, কিছু পানিভর্তি, কিছু শুকিয়ে খোসা হয়ে যাচ্ছে

একই রকম উপসর্গের আরও কিছু রোগ

শুধু জ্বর ও ফুসকুড়ি হলেই যে হাম বা চিকেনপক্স হবে, তা নয়। এই সময়ে আরও কিছু রোগ দেখা দিতে পারে-

 

রুবেলা (German measles)

তুলনামূলক হালকা সংক্রমণ জ্বর বা সর্দি-কাশি তেমন তীব্র হয় না। কানের পাশে, পেছনে ও গলার লসিকাগ্রন্থি ফুলে যায় ও ব্যথা করে

ফুসকুড়ি হালকা লাল দানার মতো, ৩ দিনের মধ্যে সেরে যায়

 

হ্যান্ড-ফুট-মাউথ ডিজিজ (HFMD)

সাধারণত ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের হয়। মুখের ভেতরে ঘা, হাতের তালু ও পায়ের পাতায় ফোস্কার মতো দানা

৭-১০ দিন স্থায়ী হয়

 

ডেঙ্গু

তীব্র জ্বর ও মাথাব্যথার ২-৩ দিন পর ত্বকে ছোট লাল দানা দেখা দেয়। দেখতে হামের মতোই হতে পারে চুলকানিও হতে পারে।

 

মেনিনগোকক্কেমিয়া (Neisseria meningitidis)

ব্যাকটেরিয়াজনিত মারাত্মক রোগ, সাধারণত ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের হয়

তীব্র জ্বর, পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি

ত্বকে লাল, বেগুনি বা বাদামি ছোপ দেখা দেয়

দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিসা না দিলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে

 

জটিলতা ও চিকিসা

হাম ও চিকেনপক্স সাধারণত ৭-১০ দিনে নিজেই সেরে যায়।

তবে সঠিক যত্ন না নিলে-

হামের জটিলতা: কান পাকা, ডায়রিয়া, অন্ধত্ব, নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস)—প্রতি ১০০০ জনে ১-৩ জনের মৃত্যু হতে পারে

 

করণীয়

নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই

পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও প্রচুর তরল খাবার (পানি, ডাবের পানি) দিতে হবে

চিকিসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল দেওয়া যেতে পারে

 

সতর্কতা: ভাইরাসজনিত অসুস্থতায় শিশুকে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন দেওয়া যাবে না (রেয়'স সিনড্রোমের ঝুঁকি)

হামের ক্ষেত্রে ভিটামিন এ সম্পূরক খাওয়ানো জরুরি

ফুসকুড়ি ওঠার ৪ দিন আগে থেকে ৪ দিন পর পর্যন্ত রোগী সংক্রমক-তাকে আলাদা ঘরে রাখতে হবে

 

কখন ডাক্তার দেখাবেন

নিচের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিসকের কাছে যেতে হবে-

 

·         শ্বাসকষ্ট

·         প্রচণ্ড জ্বর যা কমছে না

·         তীব্র মাথাব্যথা বা বিভ্রান্তি

·         খিঁচুনি

 

প্রতিরোধই সর্বোত্তম উপায়

হাম ও চিকেনপক্স—উভয় রোগই ভ্যাকসিনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য।

 

এমএমআর টিকা (হাম-মাম্পস-রুবেলা): দুই ডোজে ৯৭% পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়

হাম আক্রান্তের সংস্পর্শে এলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নিলে সংক্রমণ প্রতিরোধ সম্ভব

৬ মাসের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে ৬ দিনের মধ্যে ইমিউনোগ্লোবুলিন দিলে কাজ করে

 

মনে রাখবেন: শিশুদের সঠিক সময়ে টিকাদান নিশ্চিত করা এবং আক্রান্তদের আইসোলেশনেই এই রোগগুলো ছড়ানো বন্ধ করার একমাত্র উপায়।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


হাম না চিকেনপক্স? কীভাবে চিনবেন সহজেই

প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬

featured Image

ঋতু পরিবর্তনের সময় শিশুদের মধ্যে নানা ধরনের সংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ে। ভাইরাস ও জীবাণুঘটিত এসব রোগের প্রাথমিক উপসর্গগুলো প্রায় একই রকম- জ্বর, সর্দি-কাশি এবং ত্বকে ফুসকুড়ি। ফলে অভিভাবকরা প্রায়ই দ্বিধায় পড়েন যে শিশুটি আসলে হামে আক্রান্ত নাকি চিকেনপক্সে। তবে একটু সতর্কভাবে লক্ষ করলে এই দুই রোগের পার্থক্য বোঝা সম্ভব।

 

চলুন জেনে নিই কীভাবে চিনবেন-

হাম (Measles)

হাম 'রুবিওলা' ভাইরাসে হয়, যা অত্যন্ত সংক্রামক। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই আক্রান্ত হতে পারেন।

লক্ষণ:

·         ভাইরাস সংস্পর্শের ৭-১৪ দিন পর লক্ষণ দেখা দেয়

 

·         শুরুতে তীব্র শুকনো কাশি, সর্দি, চোখ লাল ও পানি পড়া

 

·         ১০৪° ফারেনহাইট পর্যন্ত উচ্চ জ্বর


কীভাবে চিনবেন:

 

জ্বর-কাশির ২-৩ দিন পর মুখের ভেতর গালের অংশে ছোট সাদা দাগ দেখা যায় (চিকিসাবৈজ্ঞানিক নাম: কোপলিক স্পট)

তার ৩-৫ দিন পর ত্বকে লালচে বা বাদামি ফুসকুড়ি ওঠে

ফুসকুড়ি প্রথমে মুখ, ঘাড় ও কানের পেছনে শুরু হয়, পরে সারা শরীরে ছড়ায়

৫-৬ দিন পর ফুসকুড়ি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে

 

জলবসন্ত বা চিকেনপক্স (Chickenpox)

ভেরিসেলা-জোস্টার ভাইরাসে হয়। বাতাসের মাধ্যমে কিংবা রোগীর ফুসকুড়ির তরল স্পর্শ করলেও ছড়ায়।

লক্ষণ:

সংস্পর্শের ১০-২১ দিন পর লক্ষণ দেখা দেয়

হালকা থেকে মাঝারি জ্বর, মাথাব্যথা, শীত শীত ভাব

কীভাবে চিনবেন:

১-২ দিনের মধ্যে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়

দ্রুত পানিভর্তি বা পুঁজভর্তি ফোস্কায় পরিণত হয়

প্রচণ্ড চুলকানি হয়

প্রথমে পেট ও পিঠে দেখা দেয়, পরে হাত-পায়ে ছড়ায়

 

বিশেষ বৈশিষ্ট্য: শরীরে একই সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের ফোস্কা দেখা যায়-কিছু নতুন, কিছু পানিভর্তি, কিছু শুকিয়ে খোসা হয়ে যাচ্ছে

একই রকম উপসর্গের আরও কিছু রোগ

শুধু জ্বর ও ফুসকুড়ি হলেই যে হাম বা চিকেনপক্স হবে, তা নয়। এই সময়ে আরও কিছু রোগ দেখা দিতে পারে-

 

রুবেলা (German measles)

তুলনামূলক হালকা সংক্রমণ জ্বর বা সর্দি-কাশি তেমন তীব্র হয় না। কানের পাশে, পেছনে ও গলার লসিকাগ্রন্থি ফুলে যায় ও ব্যথা করে

ফুসকুড়ি হালকা লাল দানার মতো, ৩ দিনের মধ্যে সেরে যায়

 

হ্যান্ড-ফুট-মাউথ ডিজিজ (HFMD)

সাধারণত ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের হয়। মুখের ভেতরে ঘা, হাতের তালু ও পায়ের পাতায় ফোস্কার মতো দানা

৭-১০ দিন স্থায়ী হয়

 

ডেঙ্গু

তীব্র জ্বর ও মাথাব্যথার ২-৩ দিন পর ত্বকে ছোট লাল দানা দেখা দেয়। দেখতে হামের মতোই হতে পারে চুলকানিও হতে পারে।

 

মেনিনগোকক্কেমিয়া (Neisseria meningitidis)

ব্যাকটেরিয়াজনিত মারাত্মক রোগ, সাধারণত ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের হয়

তীব্র জ্বর, পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি

ত্বকে লাল, বেগুনি বা বাদামি ছোপ দেখা দেয়

দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিসা না দিলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে

 

জটিলতা ও চিকিসা

হাম ও চিকেনপক্স সাধারণত ৭-১০ দিনে নিজেই সেরে যায়।

তবে সঠিক যত্ন না নিলে-

হামের জটিলতা: কান পাকা, ডায়রিয়া, অন্ধত্ব, নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস)—প্রতি ১০০০ জনে ১-৩ জনের মৃত্যু হতে পারে

 

করণীয়

নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই

পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও প্রচুর তরল খাবার (পানি, ডাবের পানি) দিতে হবে

চিকিসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল দেওয়া যেতে পারে

 

সতর্কতা: ভাইরাসজনিত অসুস্থতায় শিশুকে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন দেওয়া যাবে না (রেয়'স সিনড্রোমের ঝুঁকি)

হামের ক্ষেত্রে ভিটামিন এ সম্পূরক খাওয়ানো জরুরি

ফুসকুড়ি ওঠার ৪ দিন আগে থেকে ৪ দিন পর পর্যন্ত রোগী সংক্রমক-তাকে আলাদা ঘরে রাখতে হবে

 

কখন ডাক্তার দেখাবেন

নিচের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিসকের কাছে যেতে হবে-

 

·         শ্বাসকষ্ট

·         প্রচণ্ড জ্বর যা কমছে না

·         তীব্র মাথাব্যথা বা বিভ্রান্তি

·         খিঁচুনি

 

প্রতিরোধই সর্বোত্তম উপায়

হাম ও চিকেনপক্স—উভয় রোগই ভ্যাকসিনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য।

 

এমএমআর টিকা (হাম-মাম্পস-রুবেলা): দুই ডোজে ৯৭% পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়

হাম আক্রান্তের সংস্পর্শে এলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নিলে সংক্রমণ প্রতিরোধ সম্ভব

৬ মাসের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে ৬ দিনের মধ্যে ইমিউনোগ্লোবুলিন দিলে কাজ করে

 

মনে রাখবেন: শিশুদের সঠিক সময়ে টিকাদান নিশ্চিত করা এবং আক্রান্তদের আইসোলেশনেই এই রোগগুলো ছড়ানো বন্ধ করার একমাত্র উপায়।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত