সংবাদ

বোমার শব্দে চাপা ইরান-গাজা-সিরিয়ায় ঈদ


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬, ১০:১৪ এএম

বোমার শব্দে চাপা ইরান-গাজা-সিরিয়ায় ঈদ
ছবি: সংগৃহীত

ঈদের ফজরের আজান যেখানে বোমার শব্দে চাপা পড়ে যায়, সেখানে 'ঈদ মোবারক' বলার আগে মুখ ফুটে ওঠে 'বাঁচতে দাও'। যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পবিত্র ঈদুল আজহা মানে শুধু আনন্দ নয়, বেঁচে থাকারও এক কঠিন লড়াই। গাজার ধ্বংসস্তূপ, ইয়েমেনের অবরুদ্ধ শহর, ইরানের নিষেধাজ্ঞা-পীড়িত বাজার আর লেবাননের সীমান্তের ফাঁকা বাড়িগুলোতে ভেসে আসে এক বিষণ্ণ সুর।

মাত্র কয়েক বছর আগেও গাজার আবু মোহাম্মদ সাঈদাম তার সন্তানদের নিয়ে ঈদের আগের দিন পশুর হাটে যেতেন। বাচ্চারা পছন্দের ছাগলের নামকরণ করত, হেসে-খেলেই কাটতো দিন। আজ সেই সবুজ মাঠ নেই, নেই পশুর হাট। ইসরায়েলি অবরোধ আর টানা যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে গেছে খামার, পশুখাদ্যের গুদাম, এমনকি কসাইখানাও।

এক সময় গাজায় প্রতিবছর ৪০ হাজার ছাগল ও ২০ হাজার গরু ঢুকত ঈদের বাজারে। আজ একটি ছাগলের দাম চার হাজার ডলার! সংঘাতে বিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডে খাবার পানির চেয়েও দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে লাল মাংস।

তবে অনেকটা না পেলেও স্বস্তির খবর আছে- যুদ্ধবিরতি থাকায় এবার কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গাজায় কোরবানির মাংস পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যুদ্ধক্ষেত্রেও মুসলমানরা কোরবানি দিত। ইতিহাসবেত্তারা বলেন, যুদ্ধপরিস্থিতিতে কোরবানি আত্মত্যাগের শিক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখে ।

আরব উপদ্বীপের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ ইয়েমেনে সংঘাত ও অবরোধ দীর্ঘদিনের। এ বছর ইয়েমেনে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শুরু করেছে বড় উদ্যোগ। সাড়ে ৪১ টন কোরবানির মাংস বিতরণ করা হবে ৪১ হাজার গরিব পরিবারের মধ্যে। দেশটির মন্ত্রীরা বলছেন, অবরোধ ও যুদ্ধের মধ্যেও এই উদ্যোগ দুর্ভোগ কিছুটা লাঘব করবে। এটি যেন অন্ধকারে এক টুকরো আলো।

ইরানের পরিস্থিতিও করুণ। যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে সেখানে মুদ্রাস্ফীতি প্রকোপে দেশের অর্থনীতি প্রায় স্থবির। একটি কেজি গরুর মাংসের দাম এতটাই বেড়েছে যে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে । সরকার অবশ্য ভর্তুকি দিয়ে মাংস বিক্রির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে- প্রতি কেজি সাড়ে ৭ মিলিয়ান রিয়াল (প্রায় ৪ ডলার ৩০ সেন্ট) দাম নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাজারের তুলনায় এটি কম হলেও, এক মাসের ন্যূনতম মজুরি যেখানে ১০০ ডলারেরও কম, সেখানে বেশির ভাগ মানুষ সেটাও কিনতে পারে না। মুরগির দাম বেড়েছে ১৯১ শতাংশ, ভাত ১৭৩ শতাংশ । মানুষের প্লেটে এখন শুধু ডাল আর ডিম।

লেবাননের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে ঈদ মানে ফিরে আসার উৎসব। কিন্তু এবার সেই গ্রামগুলো জনশূন্য। ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংস হওয়া আরকুব অঞ্চলের বাসিন্দারা ঘরে ফিরতে পারছেন না। স্কুলগুলো এখন শরণার্থী শিবির। নাসরিন আবদুল আল তিনবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তিনি বলছেন, ‘পরিবারগুলো আর জড়ো হয় না, শিশুরা আর ঈদের আমেজ চিনতেই পারে না’।

৮৩ বছর বয়সী রাসমিয়া জোগবি এখনো নিজের বাড়িতে টিকিয়ে রেখেছেন ঈদের কুকিজ বানানোর প্রথা। কিন্তু বাড়ির উঠোন ফাঁকা। সন্তান-সন্ততি আজ শুধু ফোনের ওপাশে ।

মানুষ কেন এমন বিপর্যয়ের মাঝেও ধর্মীয় আচার আঁকড়ে ধরে? মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সংকটের সময় মানুষ উৎসবের আচার-আচরণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনের প্রতীক খোঁজে। এটি মানসিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ যুদ্ধের ভয়ে নয়, বরং এক টুকরো কোরবানির মাংস আর ঈদের নামাজের সেজদার মাধ্যমেই খুঁজে নিচ্ছেন বাঁচার আশা ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬


বোমার শব্দে চাপা ইরান-গাজা-সিরিয়ায় ঈদ

প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬

featured Image

ঈদের ফজরের আজান যেখানে বোমার শব্দে চাপা পড়ে যায়, সেখানে 'ঈদ মোবারক' বলার আগে মুখ ফুটে ওঠে 'বাঁচতে দাও'। যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পবিত্র ঈদুল আজহা মানে শুধু আনন্দ নয়, বেঁচে থাকারও এক কঠিন লড়াই। গাজার ধ্বংসস্তূপ, ইয়েমেনের অবরুদ্ধ শহর, ইরানের নিষেধাজ্ঞা-পীড়িত বাজার আর লেবাননের সীমান্তের ফাঁকা বাড়িগুলোতে ভেসে আসে এক বিষণ্ণ সুর।

মাত্র কয়েক বছর আগেও গাজার আবু মোহাম্মদ সাঈদাম তার সন্তানদের নিয়ে ঈদের আগের দিন পশুর হাটে যেতেন। বাচ্চারা পছন্দের ছাগলের নামকরণ করত, হেসে-খেলেই কাটতো দিন। আজ সেই সবুজ মাঠ নেই, নেই পশুর হাট। ইসরায়েলি অবরোধ আর টানা যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে গেছে খামার, পশুখাদ্যের গুদাম, এমনকি কসাইখানাও।

এক সময় গাজায় প্রতিবছর ৪০ হাজার ছাগল ও ২০ হাজার গরু ঢুকত ঈদের বাজারে। আজ একটি ছাগলের দাম চার হাজার ডলার! সংঘাতে বিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডে খাবার পানির চেয়েও দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে লাল মাংস।

তবে অনেকটা না পেলেও স্বস্তির খবর আছে- যুদ্ধবিরতি থাকায় এবার কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গাজায় কোরবানির মাংস পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে যুদ্ধক্ষেত্রেও মুসলমানরা কোরবানি দিত। ইতিহাসবেত্তারা বলেন, যুদ্ধপরিস্থিতিতে কোরবানি আত্মত্যাগের শিক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখে ।

আরব উপদ্বীপের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ ইয়েমেনে সংঘাত ও অবরোধ দীর্ঘদিনের। এ বছর ইয়েমেনে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শুরু করেছে বড় উদ্যোগ। সাড়ে ৪১ টন কোরবানির মাংস বিতরণ করা হবে ৪১ হাজার গরিব পরিবারের মধ্যে। দেশটির মন্ত্রীরা বলছেন, অবরোধ ও যুদ্ধের মধ্যেও এই উদ্যোগ দুর্ভোগ কিছুটা লাঘব করবে। এটি যেন অন্ধকারে এক টুকরো আলো।

ইরানের পরিস্থিতিও করুণ। যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে সেখানে মুদ্রাস্ফীতি প্রকোপে দেশের অর্থনীতি প্রায় স্থবির। একটি কেজি গরুর মাংসের দাম এতটাই বেড়েছে যে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে । সরকার অবশ্য ভর্তুকি দিয়ে মাংস বিক্রির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে- প্রতি কেজি সাড়ে ৭ মিলিয়ান রিয়াল (প্রায় ৪ ডলার ৩০ সেন্ট) দাম নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাজারের তুলনায় এটি কম হলেও, এক মাসের ন্যূনতম মজুরি যেখানে ১০০ ডলারেরও কম, সেখানে বেশির ভাগ মানুষ সেটাও কিনতে পারে না। মুরগির দাম বেড়েছে ১৯১ শতাংশ, ভাত ১৭৩ শতাংশ । মানুষের প্লেটে এখন শুধু ডাল আর ডিম।

লেবাননের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে ঈদ মানে ফিরে আসার উৎসব। কিন্তু এবার সেই গ্রামগুলো জনশূন্য। ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংস হওয়া আরকুব অঞ্চলের বাসিন্দারা ঘরে ফিরতে পারছেন না। স্কুলগুলো এখন শরণার্থী শিবির। নাসরিন আবদুল আল তিনবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তিনি বলছেন, ‘পরিবারগুলো আর জড়ো হয় না, শিশুরা আর ঈদের আমেজ চিনতেই পারে না’।

৮৩ বছর বয়সী রাসমিয়া জোগবি এখনো নিজের বাড়িতে টিকিয়ে রেখেছেন ঈদের কুকিজ বানানোর প্রথা। কিন্তু বাড়ির উঠোন ফাঁকা। সন্তান-সন্ততি আজ শুধু ফোনের ওপাশে ।

মানুষ কেন এমন বিপর্যয়ের মাঝেও ধর্মীয় আচার আঁকড়ে ধরে? মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সংকটের সময় মানুষ উৎসবের আচার-আচরণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনের প্রতীক খোঁজে। এটি মানসিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ যুদ্ধের ভয়ে নয়, বরং এক টুকরো কোরবানির মাংস আর ঈদের নামাজের সেজদার মাধ্যমেই খুঁজে নিচ্ছেন বাঁচার আশা ।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত