সংবাদ

কোরবানির মাংস: ‘মাটির হাড়ি’ থেকে ‘ওভেন’


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬, ১০:৫৮ এএম

কোরবানির মাংস: ‘মাটির হাড়ি’ থেকে ‘ওভেন’
ছবি: সংগৃহীত

কোরবানি মানে শুধু পশু জবাই নয়, প্রাণপ্রিয় আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে মাংস রান্না করে খাওয়ারও এক উৎসব। কিন্তু এই রান্নার উপকরণ ও পদ্ধতি বদলে গেছে সময়ের স্রোতে। একসময় গ্রামের বাড়িতে কাঠের আগুনে মাটির হাঁড়িতে যে মাংস ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে জ্বলত, আজ তা রূপ নিয়েছে ওভেন, মাইক্রোওয়েভ আর প্রেশার কুকারের দ্রুত ও আধুনিক সংস্করণে।

এক সময় কোরবানির ঈদ মানেই গ্রামের বাড়িতে জমায়েত। মাঠে বা আঙিনায় বসত কাঠের উনুন। তার ওপর মাটির হাঁড়ি। গরুর মাংসের টুকরোগুলো কষানো হত ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। তেজপাতা, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ত পাড়া জুড়ে। শিশুরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত, কখন মাংস সেদ্ধ হবে, কখন তারা খেতে পাবে।

কাঠের আগুনে রান্নার একটি নিজস্ব মেজাজ থাকে। তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যায়, আবার জ্বলে ওঠে। রান্না করতে হয় ততক্ষণ, যতক্ষণ মাংস নিজেই ‘অভিজ্ঞ রাঁধুনির হাত চিনে নেয়’। গ্রামের সেই মাটির হাঁড়িতে রান্না করা মাংসের স্বাদ ছিল শিকড়ের টানের মতো- অমলিন, চিরায়ত।

গ্রামের মানুষ এখনো কিছু কিছু জায়গায় কাঠের আগুনে রান্নার রীতি ধরে রেখেছেন। তবে তা সংখ্যায় কমছে। পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে ষাটোর্ধ্ব রোমেনা বেগম বলেন, 'মাটির হাঁড়ির সেই স্বাদ আর হয় না। আগে গোটা রাত জ্বালাতে হতো, সকালে ওঠার আগেই ঘরের চারপাশ ম ম করত। আজকাল আর সেই ধৈর্য ক'জনের আছে?'

শহরের ফ্ল্যাটের রান্নাঘর আর গ্রামের খোলা আঙিনার মতো নয়। এখানে সময় সোনার চেয়ে দামি। তাই কোরবানির মাংস বানাতে ইন্ডাকশন, ওভেন, প্রেশার কুকার বা এয়ার ফ্রায়ারই এখন ভরসা। কাঠের উনুনের সেই আনন্দযাত্রা যেন কেড়ে নিয়েছে সময়ের বাঁধন। তরুণ প্রজন্ম এখন মাংস বানায় নিমেষে- প্রেশার কুকারে ২০ মিনিটে সেদ্ধ, তারপর ওভেনে গ্রিল করে ‘পুলড মিট’ বা ‘বারবিকিউ চিকেন’ স্টাইলে সাজিয়ে ফেলে।

নতুন প্রজন্মের রাঁধুনি মার্জিয়া হোসেন বলেন, 'আমাদের ভাগ্নে-ভাগ্নিরা গ্রিলড মাংস পছন্দ করে। রেজালা বা মাংসের ঝোল কম খায়। তাই এবার ওভেনে গরুর মাংসের বারবিকিউ বানানোর পরিকল্পনা করছি।'

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাসির মাংসের রেজালা, চট্টগ্রামের মেজবানি মাংস আর রাজশাহীর অম্বলের মাংসের জায়গা দখল করে নিয়েছে এখন আন্তর্জাতিক রেসিপি। মাংসের বিরিয়ানি, ঠান্ডা মাংস, বারবিকিউ, ফ্রাইড মিট ইত্যাদি এখন বেশ জনপ্রিয়।

বিবর্তনের ধারায় বাংলার রেসিপি যেন ‘গ্রেভিটিরি ড্রিফট’ এর উদাহরণ, যেখানে প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে স্বাদের চাহিদা। আগে ‘ঝাল মাংস’ ছিল প্রিয়, এখন ‘মিষ্টি মাংস’ রেজালার চাহিদা তুঙ্গে। তরুণ প্রজন্ম এখন হালকা, কম মসলা ও স্বাস্থ্যসম্মত রান্না পছন্দ করে। আঞ্চলিক থেকে আন্তর্জাতিক রেসিপির অভিযোজন এই বদলের অনন্য দৃষ্টান্ত।

রেসিপি যত বদলাক, মাংস ভাগাভাগির সংস্কৃতি কিন্তু থমকে যায়নি। কোরবানির মাংসের প্রথম থালা পাঠানো হয় পাশের বাড়িতে, গ্রামের প্রতিবেশীর জন্য রাখা হয় গোশতের সর্বোত্তম অংশ। শহুরে ফ্ল্যাটে হয়তো গ্যারেজে কোরবানি, কিন্তু মাংস পাঠানোর সংস্কৃতি গ্রাম-শহর নির্বিশেষে একই থাকে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬


কোরবানির মাংস: ‘মাটির হাড়ি’ থেকে ‘ওভেন’

প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬

featured Image

কোরবানি মানে শুধু পশু জবাই নয়, প্রাণপ্রিয় আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে মাংস রান্না করে খাওয়ারও এক উৎসব। কিন্তু এই রান্নার উপকরণ ও পদ্ধতি বদলে গেছে সময়ের স্রোতে। একসময় গ্রামের বাড়িতে কাঠের আগুনে মাটির হাঁড়িতে যে মাংস ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে জ্বলত, আজ তা রূপ নিয়েছে ওভেন, মাইক্রোওয়েভ আর প্রেশার কুকারের দ্রুত ও আধুনিক সংস্করণে।

এক সময় কোরবানির ঈদ মানেই গ্রামের বাড়িতে জমায়েত। মাঠে বা আঙিনায় বসত কাঠের উনুন। তার ওপর মাটির হাঁড়ি। গরুর মাংসের টুকরোগুলো কষানো হত ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। তেজপাতা, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ত পাড়া জুড়ে। শিশুরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত, কখন মাংস সেদ্ধ হবে, কখন তারা খেতে পাবে।

কাঠের আগুনে রান্নার একটি নিজস্ব মেজাজ থাকে। তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যায়, আবার জ্বলে ওঠে। রান্না করতে হয় ততক্ষণ, যতক্ষণ মাংস নিজেই ‘অভিজ্ঞ রাঁধুনির হাত চিনে নেয়’। গ্রামের সেই মাটির হাঁড়িতে রান্না করা মাংসের স্বাদ ছিল শিকড়ের টানের মতো- অমলিন, চিরায়ত।

গ্রামের মানুষ এখনো কিছু কিছু জায়গায় কাঠের আগুনে রান্নার রীতি ধরে রেখেছেন। তবে তা সংখ্যায় কমছে। পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে ষাটোর্ধ্ব রোমেনা বেগম বলেন, 'মাটির হাঁড়ির সেই স্বাদ আর হয় না। আগে গোটা রাত জ্বালাতে হতো, সকালে ওঠার আগেই ঘরের চারপাশ ম ম করত। আজকাল আর সেই ধৈর্য ক'জনের আছে?'

শহরের ফ্ল্যাটের রান্নাঘর আর গ্রামের খোলা আঙিনার মতো নয়। এখানে সময় সোনার চেয়ে দামি। তাই কোরবানির মাংস বানাতে ইন্ডাকশন, ওভেন, প্রেশার কুকার বা এয়ার ফ্রায়ারই এখন ভরসা। কাঠের উনুনের সেই আনন্দযাত্রা যেন কেড়ে নিয়েছে সময়ের বাঁধন। তরুণ প্রজন্ম এখন মাংস বানায় নিমেষে- প্রেশার কুকারে ২০ মিনিটে সেদ্ধ, তারপর ওভেনে গ্রিল করে ‘পুলড মিট’ বা ‘বারবিকিউ চিকেন’ স্টাইলে সাজিয়ে ফেলে।

নতুন প্রজন্মের রাঁধুনি মার্জিয়া হোসেন বলেন, 'আমাদের ভাগ্নে-ভাগ্নিরা গ্রিলড মাংস পছন্দ করে। রেজালা বা মাংসের ঝোল কম খায়। তাই এবার ওভেনে গরুর মাংসের বারবিকিউ বানানোর পরিকল্পনা করছি।'

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাসির মাংসের রেজালা, চট্টগ্রামের মেজবানি মাংস আর রাজশাহীর অম্বলের মাংসের জায়গা দখল করে নিয়েছে এখন আন্তর্জাতিক রেসিপি। মাংসের বিরিয়ানি, ঠান্ডা মাংস, বারবিকিউ, ফ্রাইড মিট ইত্যাদি এখন বেশ জনপ্রিয়।

বিবর্তনের ধারায় বাংলার রেসিপি যেন ‘গ্রেভিটিরি ড্রিফট’ এর উদাহরণ, যেখানে প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে স্বাদের চাহিদা। আগে ‘ঝাল মাংস’ ছিল প্রিয়, এখন ‘মিষ্টি মাংস’ রেজালার চাহিদা তুঙ্গে। তরুণ প্রজন্ম এখন হালকা, কম মসলা ও স্বাস্থ্যসম্মত রান্না পছন্দ করে। আঞ্চলিক থেকে আন্তর্জাতিক রেসিপির অভিযোজন এই বদলের অনন্য দৃষ্টান্ত।

রেসিপি যত বদলাক, মাংস ভাগাভাগির সংস্কৃতি কিন্তু থমকে যায়নি। কোরবানির মাংসের প্রথম থালা পাঠানো হয় পাশের বাড়িতে, গ্রামের প্রতিবেশীর জন্য রাখা হয় গোশতের সর্বোত্তম অংশ। শহুরে ফ্ল্যাটে হয়তো গ্যারেজে কোরবানি, কিন্তু মাংস পাঠানোর সংস্কৃতি গ্রাম-শহর নির্বিশেষে একই থাকে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত