সংবাদ

ঈদে গ্রামে মহামিলন, শহরে ঘরবন্দি আনন্দ


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬, ১০:২৯ এএম

ঈদে গ্রামে মহামিলন, শহরে ঘরবন্দি আনন্দ
গ্রামের ঈদ। ছবি: সংগৃহীত

ঈদ এলেই বাংলাদেশের চিরায়ত চিত্রটি ধরা পড়ে দুটি ক্যানভাসে- একটি গ্রাম, অন্যটি শহর। একদিকে খোলা মাঠ, পাড়ার সবাই মিলে কোরবানি, ভোর থেকে চলে আত্মীয়ের আগমন। অন্যদিকে ফ্ল্যাটের সীমাবদ্ধ গ্যারেজ, ব্যস্ত সময়সূচি, আর মাইক্রোবাস ভাড়া করে পশু আনার বিড়ম্বনা। ঈদের নাম এক, কিন্তু তার আয়োজন, অনুভূতি ও সামাজিক বন্ধন- দুই জায়গায় সম্পূর্ণ ভিন্ন।

গ্রামের ইতিহাসে কোরবানি মানে সারা বছর ধরে লালন-পালন করা পশুকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নামে উৎসর্গ করা। এই সময়টা যেন এক আচারে পরিণত হয়। গোয়াল ঘর থেকে পশু বের করার সময় শিশু-কিশোরদের চোখেমুখে থাকে মায়া, আবার উৎসবের আমেজও। গ্রামের শিশুদের বড় আনন্দ- গরুর পিঠে চড়ে বেড়ানো। এটা তাদের জন্য ঈদের এক অনন্য প্রাপ্তি।

পাড়ার ২০-৩০টি পরিবার মিলে একটি বা দুটি গরু কোরবানি দেয়। ভাগাভাগির এই রেওয়াজ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। মাংস কাটার সময় চলে আড্ডা, গল্প, হাসি। কেউ বলেন ‘এবার গরুটা বড়ই চর্বি’, কেউ বা ব্যস্ত থাকেন বণ্টনের তালিকা মেলাতে।

দূরের আত্মীয়রা আসেন বাড়ি। ভাবি-জামাই, জ্যাঠা-চাচা, সবাই মিলে বন্ধন মিলে যায়। ঈদের দিন কেবল নামাজ আর কোরবানিই নয়, এটি সম্পর্কের পুরনো বন্ধন আঁটোসাঁটো করারও এক সুযোগ। গ্রামের চুলায় ‘পোড়া মাংস’ বা ‘দই-মাংসের স্বাদ তো শহুরে রান্নাঘরে পাওয়া মুশকিল।

শহরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ঈদ এলেই মানুষ ছুটে যান পশুর হাটে। কেউ আবার অনলাইনে ছবি দেখেই বেছে নেন গরু। শহরের শিশুরা গরুর পিঠে চড়ে না; তারা বাবার মোবাইল দেখে চিনে নেয় ‘গাড়ির মতো দামি এই জন্তুটি’।

ফ্ল্যাটের গ্যারেজ বা ফাঁকা জায়গায় কোরবানি দিতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পেশাদার কসাই ডেকে আনা হয়। মাংস ভাগাভাগিও সীমিত- প্রতিবেশীদের সঙ্গে হয়তো এক গরমিল, তাও শুধু একেবারে পাশের ফ্ল্যাট পর্যন্ত। অনেক ফ্ল্যাটেই আবার নিজেরাই কোরবানি দিয়ে ফ্রিজ ভর্তি করে রাখেন অন্য মাসের জন্য।

শহরের সময়সূচি যেমন ব্যস্ত, তেমনি আত্মীয়-আগমনও সীমিত। নানা ব্যস্ততায় অনেকে প্রিয়জনের বাড়ি যেতে পারেন না। তাই অনেকে ভিডিও কলেই ঈদের শুভেচ্ছা জানান। সম্পর্কের বন্ধন যেন ডিজিটাল জগতে আবদ্ধ হয়ে সঙ্কুচিত হয়েছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, নগরায়নের ধারায় মানুষের সামাজিক আচরণে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। গ্রামের উন্মুক্ত আয়োজন মানবমস্তিষ্কে ‘অক্সিটোসিন’ হরমোন নিঃসরণ বাড়ায়, যা বন্ধন ও আস্থা তৈরি করে। শহরের সীমাবদ্ধ পরিসর ও সময়ের চাপ সেই হরমোনের স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করে।

বিবর্তনের ইতিহাস বলে, মানুষ আদিম সমাজে দল বেঁধে শিকার করত, মাংস ভাগ করত। গ্রামের কোরবানির আয়োজন সেই আদিম বন্ধনের কাছাকাছি। শহর সেটাকে ভেঙে দিয়েছে ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক’ উৎসবে পরিণত করে। তবু আশার কথা, ত্যাগ আর ভাগের মূলবাণী এখনো দু’জায়গাতেই সমানভাবে টিকে আছে।

ভিন্নতা থাকলেও একটি সত্য অম্লান- শহরবাসী গ্রামের বাড়ির জন্য ঈদেই প্রাণ টানে। ঈদের ছুটিতে গ্রামমুখী মানুষের ঢলই প্রমাণ করে, শরীর শহরে থাকলেও মনটা আজও গ্রামের মাঠে দোল খায়।

গ্রামের খোলা আকাশ, পাড়ার সবাই মিলে আয়োজন, চুলার পোড়া মাংসের গন্ধ- এসব যেন চিরায়ত এক স্মৃতি বটে। শহর হয়তো সেই পুরো আমেজ দিতে পারে না, কিন্তু কোরবানির শিক্ষাকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে। সীমাবদ্ধতার মাঝেও মানুষ খুঁজে নেয় ভাগাভাগির আনন্দ, প্রতিবেশীকে একটু মাংস পাঠানো, এক গ্লাস শরবত দিয়ে আপ্যায়ন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬


ঈদে গ্রামে মহামিলন, শহরে ঘরবন্দি আনন্দ

প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬

featured Image

ঈদ এলেই বাংলাদেশের চিরায়ত চিত্রটি ধরা পড়ে দুটি ক্যানভাসে- একটি গ্রাম, অন্যটি শহর। একদিকে খোলা মাঠ, পাড়ার সবাই মিলে কোরবানি, ভোর থেকে চলে আত্মীয়ের আগমন। অন্যদিকে ফ্ল্যাটের সীমাবদ্ধ গ্যারেজ, ব্যস্ত সময়সূচি, আর মাইক্রোবাস ভাড়া করে পশু আনার বিড়ম্বনা। ঈদের নাম এক, কিন্তু তার আয়োজন, অনুভূতি ও সামাজিক বন্ধন- দুই জায়গায় সম্পূর্ণ ভিন্ন।

গ্রামের ইতিহাসে কোরবানি মানে সারা বছর ধরে লালন-পালন করা পশুকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নামে উৎসর্গ করা। এই সময়টা যেন এক আচারে পরিণত হয়। গোয়াল ঘর থেকে পশু বের করার সময় শিশু-কিশোরদের চোখেমুখে থাকে মায়া, আবার উৎসবের আমেজও। গ্রামের শিশুদের বড় আনন্দ- গরুর পিঠে চড়ে বেড়ানো। এটা তাদের জন্য ঈদের এক অনন্য প্রাপ্তি।

পাড়ার ২০-৩০টি পরিবার মিলে একটি বা দুটি গরু কোরবানি দেয়। ভাগাভাগির এই রেওয়াজ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। মাংস কাটার সময় চলে আড্ডা, গল্প, হাসি। কেউ বলেন ‘এবার গরুটা বড়ই চর্বি’, কেউ বা ব্যস্ত থাকেন বণ্টনের তালিকা মেলাতে।

দূরের আত্মীয়রা আসেন বাড়ি। ভাবি-জামাই, জ্যাঠা-চাচা, সবাই মিলে বন্ধন মিলে যায়। ঈদের দিন কেবল নামাজ আর কোরবানিই নয়, এটি সম্পর্কের পুরনো বন্ধন আঁটোসাঁটো করারও এক সুযোগ। গ্রামের চুলায় ‘পোড়া মাংস’ বা ‘দই-মাংসের স্বাদ তো শহুরে রান্নাঘরে পাওয়া মুশকিল।

শহরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ঈদ এলেই মানুষ ছুটে যান পশুর হাটে। কেউ আবার অনলাইনে ছবি দেখেই বেছে নেন গরু। শহরের শিশুরা গরুর পিঠে চড়ে না; তারা বাবার মোবাইল দেখে চিনে নেয় ‘গাড়ির মতো দামি এই জন্তুটি’।

ফ্ল্যাটের গ্যারেজ বা ফাঁকা জায়গায় কোরবানি দিতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পেশাদার কসাই ডেকে আনা হয়। মাংস ভাগাভাগিও সীমিত- প্রতিবেশীদের সঙ্গে হয়তো এক গরমিল, তাও শুধু একেবারে পাশের ফ্ল্যাট পর্যন্ত। অনেক ফ্ল্যাটেই আবার নিজেরাই কোরবানি দিয়ে ফ্রিজ ভর্তি করে রাখেন অন্য মাসের জন্য।

শহরের সময়সূচি যেমন ব্যস্ত, তেমনি আত্মীয়-আগমনও সীমিত। নানা ব্যস্ততায় অনেকে প্রিয়জনের বাড়ি যেতে পারেন না। তাই অনেকে ভিডিও কলেই ঈদের শুভেচ্ছা জানান। সম্পর্কের বন্ধন যেন ডিজিটাল জগতে আবদ্ধ হয়ে সঙ্কুচিত হয়েছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, নগরায়নের ধারায় মানুষের সামাজিক আচরণে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। গ্রামের উন্মুক্ত আয়োজন মানবমস্তিষ্কে ‘অক্সিটোসিন’ হরমোন নিঃসরণ বাড়ায়, যা বন্ধন ও আস্থা তৈরি করে। শহরের সীমাবদ্ধ পরিসর ও সময়ের চাপ সেই হরমোনের স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করে।

বিবর্তনের ইতিহাস বলে, মানুষ আদিম সমাজে দল বেঁধে শিকার করত, মাংস ভাগ করত। গ্রামের কোরবানির আয়োজন সেই আদিম বন্ধনের কাছাকাছি। শহর সেটাকে ভেঙে দিয়েছে ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক’ উৎসবে পরিণত করে। তবু আশার কথা, ত্যাগ আর ভাগের মূলবাণী এখনো দু’জায়গাতেই সমানভাবে টিকে আছে।

ভিন্নতা থাকলেও একটি সত্য অম্লান- শহরবাসী গ্রামের বাড়ির জন্য ঈদেই প্রাণ টানে। ঈদের ছুটিতে গ্রামমুখী মানুষের ঢলই প্রমাণ করে, শরীর শহরে থাকলেও মনটা আজও গ্রামের মাঠে দোল খায়।

গ্রামের খোলা আকাশ, পাড়ার সবাই মিলে আয়োজন, চুলার পোড়া মাংসের গন্ধ- এসব যেন চিরায়ত এক স্মৃতি বটে। শহর হয়তো সেই পুরো আমেজ দিতে পারে না, কিন্তু কোরবানির শিক্ষাকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে। সীমাবদ্ধতার মাঝেও মানুষ খুঁজে নেয় ভাগাভাগির আনন্দ, প্রতিবেশীকে একটু মাংস পাঠানো, এক গ্লাস শরবত দিয়ে আপ্যায়ন।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত