সরু আর ঘিঞ্জি গলি। এখানে কোরবানি দেওয়া এক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু পুরান ঢাকাবাসীর আত্মীয়তা আর সামাজিক বন্ধন সব বাধা ডিঙিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। হোসনি দালান, বংশাল, নাজির বাজার, লালবাগ- ঈদের দিন ভোর থেকেই অন্য রূপ নেয়। নবাবি আমলের জৌলুস আজ হয়তো নেই, কিন্তু ঐতিহ্যের সুরটি এখনো বেজে ওঠে প্রতিটি গলিতে।
ইতিহাস বলে, পুরান ঢাকায় কোরবানি কেবল ধর্মীয় আচার নয়, ছিল জনগণের প্রতি ‘সামাজিক প্রতিশ্রুতির বহিঃপ্রকাশ। নবাব পরিবারসহ বনেদি বাড়িগুলোতে কোরবানি শুরু হতো এক মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে। ঈদের আগের সপ্তাহেই গলিতে গলিতে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো।
নবাব পরিবারের বিশেষ কোরবানির আয়োজন ছিল রাজকীয়। নামাজ শেষে নবাবেরা মিশে যেতেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে- বুকে বুকে আলিঙ্গন। এটি ছিল নবাবদের “সমাজের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার নৈতিক দায়িত্ববোধের প্রকাশ”।
একসময় কোরবানি মানেই সবার আগে ছাগল বা বকরি হতো। সে সময় থেকেই ‘বকরি ঈদ’ নামটি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পরে ধীরে ধীরে গরু কোরবানির সংখ্যা বাড়তে থাকে।
একসময় কোরবানির হাট বসত গুটিকয়। এর মধ্যে ‘গনি মিয়ার হাট’ ছিল প্রসিদ্ধ। এই হাটে আসতে ক্রেতাদের প্রলুব্ধ করতে ঢুলিরা ঢোল বাজিয়ে গাইতেন, ‘ধার করো, কর্জ করো, গনি মিয়ার হাট ধরো।’
মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিম থেকে আসা নাদুসনুদুস সাদা গরু ছিল পুরান ঢাকার বনেদি পরিবারের পছন্দ। তখন ঢাকাবাসী বলতেন, মিরকাদিমের গরু ছাড়া কোরবানি সম্পূর্ণ হয় না। সেকালে স্বাভাবিক আকারের গরুর দাম ছিল মাত্র ৩০ থেকে ৪০ টাকা।
পুরান ঢাকার রীতি ছিল, কোরবানির মাংস বণ্টনের সময় প্রথম অগ্রাধিকার পাবে ছেলেমেয়েদের শ্বশুরবাড়ি। গরুর পেছনের রানটি একটি বড় ডালার ওপর হাতের নকশা করা চাদর দিয়ে ঢেকে পাঠিয়ে দেওয়া হতো পরমাত্মীয়ের বাড়ি। সেই সূত্রেই বেয়াই বাড়ি থেকেও আসত আরেকটি রান।
রেফ্রিজারেটর না থাকায় পুরান ঢাকার গৃহিণীরা মাংস সংরক্ষণ করতেন অভিনব উপায়ে। রান ও সিনা আস্ত করে রাতভর ঝুলিয়ে রক্ত ঝরিয়ে নেওয়া হতো। তারপর চর্বি গলিয়ে তাতে মাংস ডুবিয়ে রাখা হতো। এ পদ্ধতিতে মাংস থাকত কয়েক মাস পর্যন্ত।
কোরবানির মাংস দিয়ে পুরান ঢাকার বনেদি পরিবারগুলো বানাতেন হরেক রকম খাবার। বটি কাবাব, কলিজি ভুনা, গুরদা ভুনা, নেহারি, কোফতা, চাপ, শিক কাবাব। বিশেষ করে গরুর কুঁজের মাংসের কাবাবের স্বাদ ছিল আলাদা।
ঈদের তৃতীয় দিন রাতে বাবুর্চিগিরি করতেন পরিবারের কর্তারাই। কেউ মাংস সেঁকতেন কাঁচা, কারওটা পুড়ে যেত। এই নিয়ে হাসি-তামাশা, ঠাট্টা-কৌতুকও কম হতো না। গরম গরম পরোটার সঙ্গে শিক কাবাব খেয়ে দিন শেষ হতো।
আজও ঈদ-পরবর্তী আড্ডার আয়োজন করে পুরান ঢাকার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। সেখানে ঢাকাইয়া চুটকি, স্মৃতিকথা, নাচ-গান পরিবেশিত হয়। নবাবি আমলের জৌলুস আজ আর চোখে পড়ে না। কিন্তু গলির অলিতে এখনো টিকে আছে সেই চিরায়ত ঐতিহ্য- যে উৎসবে মেশে ত্যাগ, ভাগাভাগি আর আত্মীয়তার এক অনন্য বন্ধন।

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬
সরু আর ঘিঞ্জি গলি। এখানে কোরবানি দেওয়া এক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু পুরান ঢাকাবাসীর আত্মীয়তা আর সামাজিক বন্ধন সব বাধা ডিঙিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। হোসনি দালান, বংশাল, নাজির বাজার, লালবাগ- ঈদের দিন ভোর থেকেই অন্য রূপ নেয়। নবাবি আমলের জৌলুস আজ হয়তো নেই, কিন্তু ঐতিহ্যের সুরটি এখনো বেজে ওঠে প্রতিটি গলিতে।
ইতিহাস বলে, পুরান ঢাকায় কোরবানি কেবল ধর্মীয় আচার নয়, ছিল জনগণের প্রতি ‘সামাজিক প্রতিশ্রুতির বহিঃপ্রকাশ। নবাব পরিবারসহ বনেদি বাড়িগুলোতে কোরবানি শুরু হতো এক মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে। ঈদের আগের সপ্তাহেই গলিতে গলিতে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো।
নবাব পরিবারের বিশেষ কোরবানির আয়োজন ছিল রাজকীয়। নামাজ শেষে নবাবেরা মিশে যেতেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে- বুকে বুকে আলিঙ্গন। এটি ছিল নবাবদের “সমাজের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার নৈতিক দায়িত্ববোধের প্রকাশ”।
একসময় কোরবানি মানেই সবার আগে ছাগল বা বকরি হতো। সে সময় থেকেই ‘বকরি ঈদ’ নামটি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পরে ধীরে ধীরে গরু কোরবানির সংখ্যা বাড়তে থাকে।
একসময় কোরবানির হাট বসত গুটিকয়। এর মধ্যে ‘গনি মিয়ার হাট’ ছিল প্রসিদ্ধ। এই হাটে আসতে ক্রেতাদের প্রলুব্ধ করতে ঢুলিরা ঢোল বাজিয়ে গাইতেন, ‘ধার করো, কর্জ করো, গনি মিয়ার হাট ধরো।’
মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিম থেকে আসা নাদুসনুদুস সাদা গরু ছিল পুরান ঢাকার বনেদি পরিবারের পছন্দ। তখন ঢাকাবাসী বলতেন, মিরকাদিমের গরু ছাড়া কোরবানি সম্পূর্ণ হয় না। সেকালে স্বাভাবিক আকারের গরুর দাম ছিল মাত্র ৩০ থেকে ৪০ টাকা।
পুরান ঢাকার রীতি ছিল, কোরবানির মাংস বণ্টনের সময় প্রথম অগ্রাধিকার পাবে ছেলেমেয়েদের শ্বশুরবাড়ি। গরুর পেছনের রানটি একটি বড় ডালার ওপর হাতের নকশা করা চাদর দিয়ে ঢেকে পাঠিয়ে দেওয়া হতো পরমাত্মীয়ের বাড়ি। সেই সূত্রেই বেয়াই বাড়ি থেকেও আসত আরেকটি রান।
রেফ্রিজারেটর না থাকায় পুরান ঢাকার গৃহিণীরা মাংস সংরক্ষণ করতেন অভিনব উপায়ে। রান ও সিনা আস্ত করে রাতভর ঝুলিয়ে রক্ত ঝরিয়ে নেওয়া হতো। তারপর চর্বি গলিয়ে তাতে মাংস ডুবিয়ে রাখা হতো। এ পদ্ধতিতে মাংস থাকত কয়েক মাস পর্যন্ত।
কোরবানির মাংস দিয়ে পুরান ঢাকার বনেদি পরিবারগুলো বানাতেন হরেক রকম খাবার। বটি কাবাব, কলিজি ভুনা, গুরদা ভুনা, নেহারি, কোফতা, চাপ, শিক কাবাব। বিশেষ করে গরুর কুঁজের মাংসের কাবাবের স্বাদ ছিল আলাদা।
ঈদের তৃতীয় দিন রাতে বাবুর্চিগিরি করতেন পরিবারের কর্তারাই। কেউ মাংস সেঁকতেন কাঁচা, কারওটা পুড়ে যেত। এই নিয়ে হাসি-তামাশা, ঠাট্টা-কৌতুকও কম হতো না। গরম গরম পরোটার সঙ্গে শিক কাবাব খেয়ে দিন শেষ হতো।
আজও ঈদ-পরবর্তী আড্ডার আয়োজন করে পুরান ঢাকার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। সেখানে ঢাকাইয়া চুটকি, স্মৃতিকথা, নাচ-গান পরিবেশিত হয়। নবাবি আমলের জৌলুস আজ আর চোখে পড়ে না। কিন্তু গলির অলিতে এখনো টিকে আছে সেই চিরায়ত ঐতিহ্য- যে উৎসবে মেশে ত্যাগ, ভাগাভাগি আর আত্মীয়তার এক অনন্য বন্ধন।

আপনার মতামত লিখুন