পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় কোরবানি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি এক বিশাল সাংস্কৃতিক উৎসব। স্থানীয় ভাষায় একে ‘হারি রায়া হাজি’ বলা হয়। ২৮ কোটি মানুষের এই দেশে কোরবানির আমেজ শুরু হয় ঈদের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই।
দেশটির বিশেষত্ব হলো- এখানে গরুর চেয়ে ছাগল ও মহিষের কোরবানি বেশি হয়। কারণ ইন্দোনেশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল ঘন বন ও পাহাড়ি, যেখানে ছাগল পালন সহজ। তবে সম্প্রতি উট কোরবানিও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। পূর্ব জাভার খামারিরা উট পালনে ঝুঁকছেন, কারণ গরু-ছাগলের চেয়ে লাভ বেশি বলে মনে করছেন তারা।
ইন্দোনেশিয়ায় কোরবানি শুরু হয় ঈদের নামাজের মধ্য দিয়ে। সারাদেশের মুসলমানরা সকালে মসজিদে বা খোলা মাঠে জামাতে অংশ নেন। নামাজ শেষে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান- পশু জবাই। মনস্তাত্ত্বিকভাবে ইন্দোনেশিয়ানরা কোরবানিকে ‘সামাজিক সম্প্রীতির ব্রিজ’ হিসেবে দেখেন। জাভা দ্বীপে কোরবানির দিন গ্রামের সব বাসিন্দা একসঙ্গে নামাজ পড়েন, তারপর মাংস বণ্টন করেন সম্প্রদায়ের সব সদস্যের মধ্যে, ধর্ম নির্বিশেষে।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ইন্দোনেশিয়ার কোরবানি আয়োজন অত্যন্ত সংগঠিত। স্থানীয় মসজিদের কমিটি পশু কেনা থেকে শুরু করে জবাই ও বিতরণ পর্যন্ত সবকিছু তত্ত্বাবধান করে। তারা তালিকা তৈরি করে কারা মাংস পাবে- প্রায়ই সংরক্ষিত থাকে এতিম, বিধবা ও গরিব-দুস্থদের জন্য।
ইন্দোনেশিয়ায় বলির প্রচলন ইসলামের আগেও ছিল। বিবর্তনীয় নৃবিজ্ঞান বলে, ইন্দোনেশিয়ার আদিম উপজাতিরা বলিদান করত ফসলের জন্য। ইসলাম আসার পর সেই সংস্কৃতি কোরবানির রূপ নেয়। দ্বীপটিতে ইসলামের প্রসার ঘটে ১৩শ শতক থেকে। আরব ও গুজরাটি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে। তারা শুধু ব্যবসাই নয়, সঙ্গে করে এনেছিলেন কোরবানির ধারণাও।
স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে কোরবানি পেয়েছে নিজস্ব রূপ। জাভার প্রাচীন হিন্দু-বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ছাপ আজও কোরবানির আয়োজনে দেখা যায়- যেখানে পশু জবাইয়ের পর মাংস বাঁশের কাঠিতে সাজিয়ে আগুনে সেঁকা হয়। এই খাবারকে বলা হয় ‘সাতে’। এই রেসিপিটি এতটাই প্রাচীন যে ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসের পাতায় এর উল্লেখ মেলে।
ইন্দোনেশিয়ায় কোরবানির মাংস রান্নার পদ্ধতি আঞ্চলিক বৈচিত্র্যে ভরপুর। জাভায় জনপ্রিয় ‘রেন্দাং’- মাংস ধীরে আগুনে নারকেল ও মসলায় সেদ্ধ করে শুকানো হয়। সুমাত্রায় মাংসের ‘গুড়াই’ ও ‘পেম্পেক’- মাছ ও মাংসের মিশ্রণে তৈরি বিশেষ পদ। সুলাওয়েসিতে কোরবানির দিন মাংসের ‘কাতো’ ভাজা হয় মসলা মাখিয়ে।
মানুষের স্বাদের রুচি বদলায় বিবর্তনের ধারায়। প্রাচীনকালে ইন্দোনেশিয়ানরা কেবল সিদ্ধ বা পোড়া মাংস খেলেও সময়ের ব্যবধানে মসলার ব্যবহার বাড়ায় খাবার পায় বৈচিত্র্য। ‘সাতে’ রান্নার পদ্ধতি, যা আগুনে পোড়ানো, মানুষের আবিষ্কৃত আগুনের প্রাথমিক কৌশল। তা-ই আধুনিক যুগে পৌঁছে দারুচিনি, লবঙ্গ ও জায়ফলের সংস্পর্শে জটিল স্বাদের খাবারে পরিণত হয়েছে।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ইন্দোনেশিয়াতেও কোরবানি আয়োজন ডিজিটালাইজড হয়েছে। এখন অনলাইনে পশু কেনা যায়, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মাংস ভাগাভাগির হিসাব রাখা হয়। ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে ‘হারি রায়া হাজি’ শুভেচ্ছার বন্যা বইছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোরবানির বন্ধনকে আরও বিস্তৃত করেছে- যারা শারীরিকভাবে উপস্থিত হতে পারেন না, তারা অনলাইনে অংশ নেন।
তবু ইন্দোনেশিয়ার কোরবানির মূলে রয়েছে ‘ত্যাগ ও ভাগাভাগি’র চেতনা। বিবর্তন যাই বলুক, আধুনিক প্রযুক্তি যতই এগোয়, মাংস বিতরণের সময় মানুষের মুখে হাসি ফোটে একই রকম। আত্মীয়তার টানে দূর দূরান্ত থেকে পরিবারের সদস্যরা ছুটে আসেন গ্রামের বাড়ি।
ঈদের সকালে ইন্দোনেশিয়ার শিশুরা নতুন পোশাক পরে প্রতিবেশীদের বাড়ি যায় ‘মিন্টা মাফ’ (ক্ষমা চাওয়া) করার জন্য। এটা তাদের এক অনন্য রীতি। পরিবারের ছোট-বড় সবাই একে অপরের হাত ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করে। সামাজিকতার এই আয়োজন কোরবানির বন্ধনকে আরও গভীর করে।

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬
পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় কোরবানি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি এক বিশাল সাংস্কৃতিক উৎসব। স্থানীয় ভাষায় একে ‘হারি রায়া হাজি’ বলা হয়। ২৮ কোটি মানুষের এই দেশে কোরবানির আমেজ শুরু হয় ঈদের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই।
দেশটির বিশেষত্ব হলো- এখানে গরুর চেয়ে ছাগল ও মহিষের কোরবানি বেশি হয়। কারণ ইন্দোনেশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল ঘন বন ও পাহাড়ি, যেখানে ছাগল পালন সহজ। তবে সম্প্রতি উট কোরবানিও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। পূর্ব জাভার খামারিরা উট পালনে ঝুঁকছেন, কারণ গরু-ছাগলের চেয়ে লাভ বেশি বলে মনে করছেন তারা।
ইন্দোনেশিয়ায় কোরবানি শুরু হয় ঈদের নামাজের মধ্য দিয়ে। সারাদেশের মুসলমানরা সকালে মসজিদে বা খোলা মাঠে জামাতে অংশ নেন। নামাজ শেষে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান- পশু জবাই। মনস্তাত্ত্বিকভাবে ইন্দোনেশিয়ানরা কোরবানিকে ‘সামাজিক সম্প্রীতির ব্রিজ’ হিসেবে দেখেন। জাভা দ্বীপে কোরবানির দিন গ্রামের সব বাসিন্দা একসঙ্গে নামাজ পড়েন, তারপর মাংস বণ্টন করেন সম্প্রদায়ের সব সদস্যের মধ্যে, ধর্ম নির্বিশেষে।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ইন্দোনেশিয়ার কোরবানি আয়োজন অত্যন্ত সংগঠিত। স্থানীয় মসজিদের কমিটি পশু কেনা থেকে শুরু করে জবাই ও বিতরণ পর্যন্ত সবকিছু তত্ত্বাবধান করে। তারা তালিকা তৈরি করে কারা মাংস পাবে- প্রায়ই সংরক্ষিত থাকে এতিম, বিধবা ও গরিব-দুস্থদের জন্য।
ইন্দোনেশিয়ায় বলির প্রচলন ইসলামের আগেও ছিল। বিবর্তনীয় নৃবিজ্ঞান বলে, ইন্দোনেশিয়ার আদিম উপজাতিরা বলিদান করত ফসলের জন্য। ইসলাম আসার পর সেই সংস্কৃতি কোরবানির রূপ নেয়। দ্বীপটিতে ইসলামের প্রসার ঘটে ১৩শ শতক থেকে। আরব ও গুজরাটি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে। তারা শুধু ব্যবসাই নয়, সঙ্গে করে এনেছিলেন কোরবানির ধারণাও।
স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে কোরবানি পেয়েছে নিজস্ব রূপ। জাভার প্রাচীন হিন্দু-বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ছাপ আজও কোরবানির আয়োজনে দেখা যায়- যেখানে পশু জবাইয়ের পর মাংস বাঁশের কাঠিতে সাজিয়ে আগুনে সেঁকা হয়। এই খাবারকে বলা হয় ‘সাতে’। এই রেসিপিটি এতটাই প্রাচীন যে ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসের পাতায় এর উল্লেখ মেলে।
ইন্দোনেশিয়ায় কোরবানির মাংস রান্নার পদ্ধতি আঞ্চলিক বৈচিত্র্যে ভরপুর। জাভায় জনপ্রিয় ‘রেন্দাং’- মাংস ধীরে আগুনে নারকেল ও মসলায় সেদ্ধ করে শুকানো হয়। সুমাত্রায় মাংসের ‘গুড়াই’ ও ‘পেম্পেক’- মাছ ও মাংসের মিশ্রণে তৈরি বিশেষ পদ। সুলাওয়েসিতে কোরবানির দিন মাংসের ‘কাতো’ ভাজা হয় মসলা মাখিয়ে।
মানুষের স্বাদের রুচি বদলায় বিবর্তনের ধারায়। প্রাচীনকালে ইন্দোনেশিয়ানরা কেবল সিদ্ধ বা পোড়া মাংস খেলেও সময়ের ব্যবধানে মসলার ব্যবহার বাড়ায় খাবার পায় বৈচিত্র্য। ‘সাতে’ রান্নার পদ্ধতি, যা আগুনে পোড়ানো, মানুষের আবিষ্কৃত আগুনের প্রাথমিক কৌশল। তা-ই আধুনিক যুগে পৌঁছে দারুচিনি, লবঙ্গ ও জায়ফলের সংস্পর্শে জটিল স্বাদের খাবারে পরিণত হয়েছে।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ইন্দোনেশিয়াতেও কোরবানি আয়োজন ডিজিটালাইজড হয়েছে। এখন অনলাইনে পশু কেনা যায়, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মাংস ভাগাভাগির হিসাব রাখা হয়। ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে ‘হারি রায়া হাজি’ শুভেচ্ছার বন্যা বইছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোরবানির বন্ধনকে আরও বিস্তৃত করেছে- যারা শারীরিকভাবে উপস্থিত হতে পারেন না, তারা অনলাইনে অংশ নেন।
তবু ইন্দোনেশিয়ার কোরবানির মূলে রয়েছে ‘ত্যাগ ও ভাগাভাগি’র চেতনা। বিবর্তন যাই বলুক, আধুনিক প্রযুক্তি যতই এগোয়, মাংস বিতরণের সময় মানুষের মুখে হাসি ফোটে একই রকম। আত্মীয়তার টানে দূর দূরান্ত থেকে পরিবারের সদস্যরা ছুটে আসেন গ্রামের বাড়ি।
ঈদের সকালে ইন্দোনেশিয়ার শিশুরা নতুন পোশাক পরে প্রতিবেশীদের বাড়ি যায় ‘মিন্টা মাফ’ (ক্ষমা চাওয়া) করার জন্য। এটা তাদের এক অনন্য রীতি। পরিবারের ছোট-বড় সবাই একে অপরের হাত ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করে। সামাজিকতার এই আয়োজন কোরবানির বন্ধনকে আরও গভীর করে।

আপনার মতামত লিখুন