সংবাদ

গ্রন্থপাঠ

অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মজৈবনিক প্রবাহ


জোবায়ের মিলন
জোবায়ের মিলন
প্রকাশ: ৫ জুন ২০২৬, ১১:২০ পিএম

অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মজৈবনিক প্রবাহ

সম্প্রতি একটি গল্পের বই হাতে পেলাম| বইটির নাম ‘না জীবন, না মৃত্যু’| বইটি পড়লাম| পড়তে পড়তে একটা স্মৃতিময় টানেলে ঢুকে গেলাম; যেখানে অতীতের কোমল কড়ি প্রস্ফুটিত থরে থরে| যেখানে একটা অতীত আবহ তৈরি করে গল্পকার পলি শাহীনা পাঠককে ছুঁড়ে দিয়েছেন নাটাই থেকে সুতার বাঁধন কেটে| পাঠক স্বচ্ছ আকাশে ঘুড়ির মতো উড়ে উড়ে কিংবা দীর্ঘ দীঘির জলে সাঁতার কেটে কেটে যেন তার মগ্ন ভোরের কাছেই ফিরে আসে বিকালের ক্লান্তি মুছে নিতে| গল্পগুলো তখন এক একটা পরশ পালক| প্রশান্তির বিশ্রামালয়| নিজেকে খুঁজে পাওয়ার বিমল বন্ধন|

পলি শাহীনার এই গ্রন্থস্থ সবগুলো গল্প এমনই, যেখানে বাক্যের পেলবতায়, বলার ˆশলীতে, বর্ণনার বিচক্ষণতায় এই চলমান ব্যস্ত বাস্তবতা থেকে একটানে তিনি নিয়ে যান যাপন হাহাকারের অনেকদূর, জীবনের পুষ্পিতসুন্দরের কাছাকাছি বিশাল সমুদ্রের অতল গভীরে কিংবা স্নেহশীল পিতার পাঞ্জাবীর পকেটের নিরাবরণ নির্ভারে বা মাতৃগর্ভের সুনিবিড় ছায়াতলে|

তার গল্পগুলো নাতিশীতোষ্ণ এক রেখা ধরে এগোতে এগোতে বর্তমান আর ভবিষ্যতের টাইম-রকেটেও বিচরণ করে| যুগের আনন্দ, যুগের বিষাদ, যুগের বিরহ, উৎসবকে দেখায় শান্ত-নিবিড় সুসমতায়| উত্তেজনা নেই, হইচৈই নেই| অযাচিত অশোভন নাটক অথবা বীভৎসতা নেই| তিনি যেন সহ শ্রোতার সম্মুখে বসা অভিজাত, অভিজ্ঞ বক্তা| একটি গল্প থেকে আরেকটি গল্প হয়ে পরের গল্পটিতে যেতে পাঠকের মনে হয়, কোনো চাঁদ-কন্যার সামনে বসে একের পর এক কাহিনি শুনে যাচ্ছি ক্লান্তিহীন; যেখানে এসেছে শৈশব, এসেছে কৈশোর, তারুণ্য, মা, বটগাছ, চড়ুইবাতি, গোল্লাছুট; এসেছে মুক্তিযুদ্ধ, ২৪, নৈতিক-অনৈতিকতার পোড়ন-পীড়ন, বীরাঙ্গনা, প্রেম, দ্রোহ, প্রতিবাদ, স্বপ্ন, ভীষণ বেদনা বা পরম সুখের আধার|

প্রথম গল্প ‘মা মা গন্ধ’-এর বিচরণ বক্ষে স্কুবা ডাইভিং প্রশিক্ষণরত এক চরিত্রের দেখা মিলে, যে চরিত্র লেখক নিজেই অথবা কাল্পনিক অথবা ফেলে আসা আত্মোদ্বুদ্ধ জাবর| প্রত্যক্ষ করি, চরিত্রটি সাগরের ১১০ ফুট গভীর পর্যন্ত ইন্সট্রাক্টরের সঙ্গে সঠিক যোগাযোগ রাখে এরপর সে অদ্ভুতভাবে হারিয়ে যায় তার চিন্তালোকের পেছনে, পরিভ্রমণ করতে থাকে স্নেহময়ী মায়ের মতিগন্ধে| ইশকুল, কাঁচা আমের ঘ্রাণ, ঢেঁকি ছাঁটা চালে গড়া ভাতের সুভাস, চালতার আচার, কটকটি, বুনো লেবুর গন্ধ, সহপাঠী; তালবন, কচুশাক, তিল খেত, তিসি খেত, কলমিলতার শরীর ঘেঁষে যোজন পথ হাঁটা মায়ের আঙুল আবৃত্তে| অমূল্য বাঁধনের যোগকথন যেন আধুনিক উপকরণে সুউজ্জ্বল উপস্থাপন|

দ্বিতীয় গল্প স্বপনদুয়ার’ আমাদের ফিরিয়ে নেয় অথবা আমাদের দৃষ্টে তীব্র নখে আঁচড় কেটে দেখায় আদিম ও বর্বর, জানোয়ার-জুলুম দস্যুপ্রবণ পুরুষতান্ত্রিকতার বেসামাল বদভ্যাস থেকে রেহাই না পাওয়া এক সমাজব্যবস্থার আদ্যোপান্ত| আবার সেই পঁচন ধরা পাটাতন থেকে উঠে দাঁড়ানোর প্রেরণাও গল্পকার আপন বয়ানে এখানে বলেন, মায়ার অদম্য আদরই সত্য, ঘুরে দাঁড়ানোই শক্তি| এই শক্তিটা বৈশিষ্ট্য, এখানেই গল্পকারকে দেখি ভিন্ন, কোমল, নিরুত্তাপ কিন্তু তরঙ্গায়িত প্রতিবাদী|

চতুর্থ গল্প ‘যোগাযোগ’ স্মরণে স্থির হয়ে রইবে বহুদিন, এই মর্মে যে, প্রকাশমুখর স্যাটেলাইট বা টিকটকের অপুষ্পক সময়ে ‘প্রেম’ উহ্য রেখেও অপ্রতিরোধ্য প্রেমের গল্প যে এখনও হতে পারে তার অতল সাক্ষ্য লেখকের চলার পথের নৈত্যিক আগর খেয়ালে লিপিবদ্ধ| বিভূইয়ের পরিবেশ, প্রেক্ষাপট পারিবারিক কিন্তু মূল সুর নিপুন, হৃদয়গ্রাহী, বিচ্ছেদ অথচ যোগের তুমুল আকাঙ্ক্ষা|

পঞ্চম গল্পটির নাম ‘পাওয়ার’| পাঠে এক তরুণীর সাংসারিক আবহে চলনধারা হলেও, তার বিবাহবন্ধনে প্রস্তাবিত তরুণের অকাট্য  নাটকীয়তা শেষে বিয়েউত্তর পরিবারে সব ক্ষমতা নিজের হাতে প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতিতে তরুণী চরিত্রের মধ্যদিয়ে কথক যে ভাষ্যকার সেখানে পরাক্রমের লিপ্সা, ধ্বংসঘাতী, নিচ্ছিদ্র অশুভের চিত্র দৃশ্যায়ন রাষ্ট্রযন্ত্রের দুঃশাসন, নিপীড়ন, ভয়ানক রূপের এক চিত্রপ্রদর্শন| যা আমাদের সময়কে ফ্রেমে বাঁধাইয়ের সু-চিত্রায়ন|

‘না জীবন, না মৃত্যু’ গ্রন্থের ‘উড়ে যায় শৈশব, ক্ষত, রাজার বিচার, নিয়তি রেখা, অলীক সুখ, ছুটি, না জীবন না মৃত্যু, মাটির টান’সহ সতেরোটি গল্প সতেরোটি পটের প্রসব| গল্পগুলো প্রধাণত অভ্যন্তরীণ বিবিধ জটিলতার মধ্যে মনস্তাত্বিক ও আত্মজৈবনিক ঘরানায় প্রবাহিত, সুশীল, সুদক্ষ ভ্রমণ কিংবা এই গল্পগুলো পৌষের বৃক্ষতল থেকে বসন্তের আহ্বানে জেগে ওঠার সেতার সংগীত|

গল্পের গড়ন— সংলাপের পর সংলাপে ঠাসা নয়, আবার বর্ণনার চৌহদ্দি অতিমাত্রায় ভার নয়, সুবিন্যস্ত পর্বগুলো সুশৃঙ্খল সাজানো| ঘাত-প্রতিঘাতে, উজানে-ভাটিতে বহুরৈখিক দৃশ্যের চমৎকার অবতার| প্রতিটি গল্পে রবীন্দ্রনাথের কোনো না কোনো গান, কবিতা— চরিত্রের মুখ দিয়ে প্রক্ষেপণ যেন বাড়তি রূপের বিচ্ছুরণ| এখানে চরিত্ররা আত্মসংকটে জর্জরিত ও ভাঙাচোরা হলেও অন্তর্জালে মানবিক তৃষ্ণায় পরিপূর্ণ| বিশেষত নারীচরিত্ররা প্রগতিশীল, দুর্দান্ত শক্তিশালী, দারুণ লড়াকু| প্রত্যেকের মুখোচ্ছবি আলাদা আলাদা| তবু সবার মধ্যে আছে এক যৌথ মানবিক অভিজ্ঞান, অবিচল আশার অনুসন্ধান|

তবে গল্পের ধারণা কিছুটা সচরাচর আবেশে মিশ্রিত, আমি’তে সীমাবদ্ধ, স্মৃতিনির্ভরতা বেশি যা কিছু গল্পকে হঠাৎ প্রশ্নের মুখে ফেলে| নীরিক্ষা কম| অন্যথায় গল্পগুলো তৃপ্তিদায়ক, নির্মাণে যত্নশীল, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ, ছায়াশীতল| আমরা যে ‘পাঠের আরাম’ বলি তা অধিকাংশ গল্পে বিরাজমান| বিশেষত শান্তমেজাজি মেকিং পলিসি, বলতে বলতে গভীরের দিকে হাঁটা ও শেষে এসে প্রথমের সঙ্গে সংযোগ ও নিখুঁত সমাপ্তি ভিন্ন যতিচিহ্নে চিহ্নিত; এটাই হয়তো গল্পকার পলি শাহীনার বা এ গল্পগ্রন্থের নিজস্ব সাইন| ঘটনাম-চলমান কিংবা বিষয়ের সমকালীন ও নতুন নতুন ভাঙ্গা-গড়ায় নিশ্চয় আমরা তাকে পরের সৃজনে দেখব; সে আশা রেখে ‘না জীবন, না মৃত্যু’ গ্রন্থের বহু পাঠ প্রত্যাশা করছি|

না জীবন না মৃত্যু| পলি শাহীনা| প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত| প্রকাশক: বিদ্যাপ্রকাশ| মূল্য: ২৮৫ টাকা

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬


অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মজৈবনিক প্রবাহ

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬

featured Image

সম্প্রতি একটি গল্পের বই হাতে পেলাম| বইটির নাম ‘না জীবন, না মৃত্যু’| বইটি পড়লাম| পড়তে পড়তে একটা স্মৃতিময় টানেলে ঢুকে গেলাম; যেখানে অতীতের কোমল কড়ি প্রস্ফুটিত থরে থরে| যেখানে একটা অতীত আবহ তৈরি করে গল্পকার পলি শাহীনা পাঠককে ছুঁড়ে দিয়েছেন নাটাই থেকে সুতার বাঁধন কেটে| পাঠক স্বচ্ছ আকাশে ঘুড়ির মতো উড়ে উড়ে কিংবা দীর্ঘ দীঘির জলে সাঁতার কেটে কেটে যেন তার মগ্ন ভোরের কাছেই ফিরে আসে বিকালের ক্লান্তি মুছে নিতে| গল্পগুলো তখন এক একটা পরশ পালক| প্রশান্তির বিশ্রামালয়| নিজেকে খুঁজে পাওয়ার বিমল বন্ধন|

পলি শাহীনার এই গ্রন্থস্থ সবগুলো গল্প এমনই, যেখানে বাক্যের পেলবতায়, বলার ˆশলীতে, বর্ণনার বিচক্ষণতায় এই চলমান ব্যস্ত বাস্তবতা থেকে একটানে তিনি নিয়ে যান যাপন হাহাকারের অনেকদূর, জীবনের পুষ্পিতসুন্দরের কাছাকাছি বিশাল সমুদ্রের অতল গভীরে কিংবা স্নেহশীল পিতার পাঞ্জাবীর পকেটের নিরাবরণ নির্ভারে বা মাতৃগর্ভের সুনিবিড় ছায়াতলে|

তার গল্পগুলো নাতিশীতোষ্ণ এক রেখা ধরে এগোতে এগোতে বর্তমান আর ভবিষ্যতের টাইম-রকেটেও বিচরণ করে| যুগের আনন্দ, যুগের বিষাদ, যুগের বিরহ, উৎসবকে দেখায় শান্ত-নিবিড় সুসমতায়| উত্তেজনা নেই, হইচৈই নেই| অযাচিত অশোভন নাটক অথবা বীভৎসতা নেই| তিনি যেন সহ শ্রোতার সম্মুখে বসা অভিজাত, অভিজ্ঞ বক্তা| একটি গল্প থেকে আরেকটি গল্প হয়ে পরের গল্পটিতে যেতে পাঠকের মনে হয়, কোনো চাঁদ-কন্যার সামনে বসে একের পর এক কাহিনি শুনে যাচ্ছি ক্লান্তিহীন; যেখানে এসেছে শৈশব, এসেছে কৈশোর, তারুণ্য, মা, বটগাছ, চড়ুইবাতি, গোল্লাছুট; এসেছে মুক্তিযুদ্ধ, ২৪, নৈতিক-অনৈতিকতার পোড়ন-পীড়ন, বীরাঙ্গনা, প্রেম, দ্রোহ, প্রতিবাদ, স্বপ্ন, ভীষণ বেদনা বা পরম সুখের আধার|

প্রথম গল্প ‘মা মা গন্ধ’-এর বিচরণ বক্ষে স্কুবা ডাইভিং প্রশিক্ষণরত এক চরিত্রের দেখা মিলে, যে চরিত্র লেখক নিজেই অথবা কাল্পনিক অথবা ফেলে আসা আত্মোদ্বুদ্ধ জাবর| প্রত্যক্ষ করি, চরিত্রটি সাগরের ১১০ ফুট গভীর পর্যন্ত ইন্সট্রাক্টরের সঙ্গে সঠিক যোগাযোগ রাখে এরপর সে অদ্ভুতভাবে হারিয়ে যায় তার চিন্তালোকের পেছনে, পরিভ্রমণ করতে থাকে স্নেহময়ী মায়ের মতিগন্ধে| ইশকুল, কাঁচা আমের ঘ্রাণ, ঢেঁকি ছাঁটা চালে গড়া ভাতের সুভাস, চালতার আচার, কটকটি, বুনো লেবুর গন্ধ, সহপাঠী; তালবন, কচুশাক, তিল খেত, তিসি খেত, কলমিলতার শরীর ঘেঁষে যোজন পথ হাঁটা মায়ের আঙুল আবৃত্তে| অমূল্য বাঁধনের যোগকথন যেন আধুনিক উপকরণে সুউজ্জ্বল উপস্থাপন|

দ্বিতীয় গল্প স্বপনদুয়ার’ আমাদের ফিরিয়ে নেয় অথবা আমাদের দৃষ্টে তীব্র নখে আঁচড় কেটে দেখায় আদিম ও বর্বর, জানোয়ার-জুলুম দস্যুপ্রবণ পুরুষতান্ত্রিকতার বেসামাল বদভ্যাস থেকে রেহাই না পাওয়া এক সমাজব্যবস্থার আদ্যোপান্ত| আবার সেই পঁচন ধরা পাটাতন থেকে উঠে দাঁড়ানোর প্রেরণাও গল্পকার আপন বয়ানে এখানে বলেন, মায়ার অদম্য আদরই সত্য, ঘুরে দাঁড়ানোই শক্তি| এই শক্তিটা বৈশিষ্ট্য, এখানেই গল্পকারকে দেখি ভিন্ন, কোমল, নিরুত্তাপ কিন্তু তরঙ্গায়িত প্রতিবাদী|

চতুর্থ গল্প ‘যোগাযোগ’ স্মরণে স্থির হয়ে রইবে বহুদিন, এই মর্মে যে, প্রকাশমুখর স্যাটেলাইট বা টিকটকের অপুষ্পক সময়ে ‘প্রেম’ উহ্য রেখেও অপ্রতিরোধ্য প্রেমের গল্প যে এখনও হতে পারে তার অতল সাক্ষ্য লেখকের চলার পথের নৈত্যিক আগর খেয়ালে লিপিবদ্ধ| বিভূইয়ের পরিবেশ, প্রেক্ষাপট পারিবারিক কিন্তু মূল সুর নিপুন, হৃদয়গ্রাহী, বিচ্ছেদ অথচ যোগের তুমুল আকাঙ্ক্ষা|

পঞ্চম গল্পটির নাম ‘পাওয়ার’| পাঠে এক তরুণীর সাংসারিক আবহে চলনধারা হলেও, তার বিবাহবন্ধনে প্রস্তাবিত তরুণের অকাট্য  নাটকীয়তা শেষে বিয়েউত্তর পরিবারে সব ক্ষমতা নিজের হাতে প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতিতে তরুণী চরিত্রের মধ্যদিয়ে কথক যে ভাষ্যকার সেখানে পরাক্রমের লিপ্সা, ধ্বংসঘাতী, নিচ্ছিদ্র অশুভের চিত্র দৃশ্যায়ন রাষ্ট্রযন্ত্রের দুঃশাসন, নিপীড়ন, ভয়ানক রূপের এক চিত্রপ্রদর্শন| যা আমাদের সময়কে ফ্রেমে বাঁধাইয়ের সু-চিত্রায়ন|

‘না জীবন, না মৃত্যু’ গ্রন্থের ‘উড়ে যায় শৈশব, ক্ষত, রাজার বিচার, নিয়তি রেখা, অলীক সুখ, ছুটি, না জীবন না মৃত্যু, মাটির টান’সহ সতেরোটি গল্প সতেরোটি পটের প্রসব| গল্পগুলো প্রধাণত অভ্যন্তরীণ বিবিধ জটিলতার মধ্যে মনস্তাত্বিক ও আত্মজৈবনিক ঘরানায় প্রবাহিত, সুশীল, সুদক্ষ ভ্রমণ কিংবা এই গল্পগুলো পৌষের বৃক্ষতল থেকে বসন্তের আহ্বানে জেগে ওঠার সেতার সংগীত|

গল্পের গড়ন— সংলাপের পর সংলাপে ঠাসা নয়, আবার বর্ণনার চৌহদ্দি অতিমাত্রায় ভার নয়, সুবিন্যস্ত পর্বগুলো সুশৃঙ্খল সাজানো| ঘাত-প্রতিঘাতে, উজানে-ভাটিতে বহুরৈখিক দৃশ্যের চমৎকার অবতার| প্রতিটি গল্পে রবীন্দ্রনাথের কোনো না কোনো গান, কবিতা— চরিত্রের মুখ দিয়ে প্রক্ষেপণ যেন বাড়তি রূপের বিচ্ছুরণ| এখানে চরিত্ররা আত্মসংকটে জর্জরিত ও ভাঙাচোরা হলেও অন্তর্জালে মানবিক তৃষ্ণায় পরিপূর্ণ| বিশেষত নারীচরিত্ররা প্রগতিশীল, দুর্দান্ত শক্তিশালী, দারুণ লড়াকু| প্রত্যেকের মুখোচ্ছবি আলাদা আলাদা| তবু সবার মধ্যে আছে এক যৌথ মানবিক অভিজ্ঞান, অবিচল আশার অনুসন্ধান|

তবে গল্পের ধারণা কিছুটা সচরাচর আবেশে মিশ্রিত, আমি’তে সীমাবদ্ধ, স্মৃতিনির্ভরতা বেশি যা কিছু গল্পকে হঠাৎ প্রশ্নের মুখে ফেলে| নীরিক্ষা কম| অন্যথায় গল্পগুলো তৃপ্তিদায়ক, নির্মাণে যত্নশীল, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ, ছায়াশীতল| আমরা যে ‘পাঠের আরাম’ বলি তা অধিকাংশ গল্পে বিরাজমান| বিশেষত শান্তমেজাজি মেকিং পলিসি, বলতে বলতে গভীরের দিকে হাঁটা ও শেষে এসে প্রথমের সঙ্গে সংযোগ ও নিখুঁত সমাপ্তি ভিন্ন যতিচিহ্নে চিহ্নিত; এটাই হয়তো গল্পকার পলি শাহীনার বা এ গল্পগ্রন্থের নিজস্ব সাইন| ঘটনাম-চলমান কিংবা বিষয়ের সমকালীন ও নতুন নতুন ভাঙ্গা-গড়ায় নিশ্চয় আমরা তাকে পরের সৃজনে দেখব; সে আশা রেখে ‘না জীবন, না মৃত্যু’ গ্রন্থের বহু পাঠ প্রত্যাশা করছি|

না জীবন না মৃত্যু| পলি শাহীনা| প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত| প্রকাশক: বিদ্যাপ্রকাশ| মূল্য: ২৮৫ টাকা


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত