মোমের আলোর মতো সকালের নরম নিরুত্তাপ সূর্য রশ্মি জানালার ফাঁক গলে আলতো করে লাইজুর মুখ ছুঁেয় তার বন্ধ দুই চোখের ঘন কালো পাপড়ির ওপর এসে পড়ল| তবু সে মুদে থাকা চোখ দুটো খুললো না| সামান্য নড়লো না পর্যন্ত| যেন সে এক নিদ্রিতা রাজকুমারী, কোনো এক জাদুকরী অভিশাপে গভীর ঘুমে নিমজ্জিত, রাজার কুমার এসে ওষ্ঠ চুম্বন না করা পর্যন্ত তার এই কালঘুম ভাঙবে না| এবার সেই জল ধোয়া আলো তার ঠোঁটে আগের দিনের লেগে থাকা মলিন খয়েরি লিপস্টিক পর্যন্ত বিস্তৃত হলো, কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে নগরের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে নিঃশব্দে এসে বসলো হাজারিবাগের এক কামরার বদ্ধ একটি ঘরের নড়বড়ে চৌকির পায়ের কাছের সরু চিলতেটিতে| প্রায় সারা রাত অর্ধ ঘুম ও জাগরণে দুলতে থাকা এনামুল তার তন্দ্রাচ্ছন্ন লাল চোখ দুটো খুলে সূর্যের আলো দেখে একটু চঞ্চল হয়ে উঠে বসলো, ঘাড় ঘুরিয়ে বিছানায় তার পাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা তিন বছুরে ঘুমন্ত মিথিলার দিকে তাকিয়ে তার হৃদয় পিতৃস্নেহে খানিকটা আর্দ্র হয়ে উঠলেও দুঃশ্চিন্তার একটা গাঢ় ভাঁজ তার কপালে স্থায়ী হয়ে লেপ্টে রইল| হাত বাড়িয়ে পাশে রাখা মোবাইল ফোনটা তুলে নিয়ে আবারো লাইজুর নাম্বারে কল করে কানের ওপর যন্ত্রটা জোরে চেপে ধরলো এনামুল| ওপাশে রিং বেজে বেজে ফোনটা থেমে গেল| হারামজাদি ফোনটা সাইলেন্ট করে রেখেছে বোধহয়, ভাবল সে|
সূর্যের বিচরণশীল আলো এবার গিয়ে সুড়সুড়ি দিল গোড়ানের মেয়ে বিলকিসের শ্যামল পায়ের গোড়ালীতে, নয় মাসের বিশাল পেট নিয়ে হাঁসফাঁস করে কাৎ হয়ে ঠোঁটের ওপর ঠোঁট চেপে বিছানার চাদর খামচে ধরে বহু কষ্টে ভারি শরীরটাকে টেনে হামাগুড়ি দেবার মতো করে উঠে বসলো বিলকিস| পাশেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ফারুকের চোখে পূর্ব দিক থেকে আসা তির্যক রোদের ছটা পড়ছে দেখে ধীর পায়ে উঠে গিয়ে জানালার পর্দাটা দুই হাতে টেনে দিল সে| নাইট ডিউটি করে শেষরাতে বাড়ি ফিরে আসা পরিশ্রান্ত স্বামীর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে চায় না বিলকিস| মাত্র দু’বছর হলো বিয়ে হয়েছে তার| রাজপুত্রের মতো সুন্দর চেহারার স্বামী তার| সাদা শার্ট কালো প্যান্ট আর গলায় বো লাগিয়ে যখন দাঁড়ায় তখন কে বলবে সে চাইনিজ রেস্তোরাঁর ওয়েটার! মনে হয় যেন সেই মালিক| টাকাপয়সা একটু কম, কিন্তু এমনিতে তার স্বামীর আদর সোহাগের কমতি নেই| শুধু রাগ উঠলে কেন জানি বেডার হুঁশ থাকে না| বিলকিস তাই কখনোই এমন কিছু করে না যাতে স্বামী রেগে যায় বরং চেষ্টা করে তাকে আরামে আদরে ভুলিয়ে রাখতে| পর্দাটা টেনে দিয়ে খাটে এসে আবার বসতেই জরায়ুর ভেতর তরল জলে ভাসতে থাকা অপরিণত শিশুটি এক পাশ থেকে অন্য পাশে গড়িয়ে যায়| বিলকিস কিছুক্ষণ তার স্ফীত পেটের ওপর আলতো করে নিজের ডান হাতটা বুলায়, যেন আশ্বস্ত করে অনাগত শিশুটিকে, বলে, শান্ত হও| ভয় পেয়ো না| কিন্তু শিশুটি থামে না| সে এবার হাল্কা করে ডাইভ দেয়ার ভঙ্গীতে নিচের দিকে ঢুশ দেয়| বিলকিসের কোমর থেকে তলপেট পর্যন্ত তীব্র একটা ব্যথা বল্লমের খোঁচার মতো চিলিক দিয়ে ওঠে|
সূর্যের বয়স আরেকটু বাড়লে আলো যখন ঝলমলে কিশোরীর মতো এক্কা দোক্কা খেলে, মগবাজারের মানসী আবাসিক হোটেলের ক্লিনার সবুজ তখন এক হাতে ঝাড়ু আর অন্য হাতে একটা প্লাস্টিকের বালতি আর বেলচা নিয়ে রুমগুলো ঝাড়পোঁছ করতে আসে| ছোট্ট সাধারণ ঘিঞ্জি একটা রংহীন সস্তা হোটেল, একতলা দোতলা মিলিয়ে ৮টা মাত্র রুম| রুমে বোর্ডার থাকলে তাদের ডিসটার্ব করার নিয়ম নেই| ফাঁকা ঘরগুলোতেই তার পরিষ্কারের কাজ| ১ থেকে ৫ নম্বর পরিষ্কার করে ৬ নম্বর রুমের সামনে এসে সবুজ দেখে দরজা ভেড়ানোই আছে কিন্তু তাতে তালা লাগানো নেই, দরজার নিচে সকাল বেলার চঞ্চল রোদ হুটোপুটি খাচ্ছে| সবুজ আস্তে করে দরজার কপাটে ধাক্কা দেয়, মনে হচ্ছে কেউ একজন বিছানায় বাঁকা হয়ে অদ্ভুত ভঙ্গীতে শুয়ে আছে, সম্ভবত একজন নারী, তার শাড়ির কমলা আঁচল মেঝেতে লুটাচ্ছে, তার চুরি পরা একটা হাত সোজা হয়ে খাটের বাইরে অস্বাভাবিকভাবে ঝুলছে| সবুজ দ্রুত একটুখানি পিছিয়ে এসে মুখের কাছে হাত তুলে গলা খাকারি দিল, তাতেও কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে বাইরে এসে দরজায় খট খট শব্দ করে কয়েকটা টোকা দিল সে| এবারো নীরবতা| কেমন ঘুমরে বাবা? মদ খায়া বেহুঁশ ˆহয়া আছে নাকি? এর সঙ্গে কি কোনো পুরুষ মানুষ নাই? হোটেলের অতিথিকে জাগানোর চেষ্টা বাদ দিয়ে সবুজ অন্য দুটো ঘর পরিষ্কার করতে গেলেও মনটা কেমন খুঁতখুঁত করে তার, অস্থির লাগে, মনে হয় কিছু একটা অসুবিধা আছে| ৬ নম্বর রুমের বিষয়টা কী, ম্যানেজার সাহেবরে জানানোর জন্য হাতের কাজ শেষ না করেই তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে যায় ক্লিনার সবুজ|
রোদের তেজ আগের চেয়ে বেড়েছে| চিলতে আলো আর ক্ষীণাঙ্গী নেই, পুরো ঘরময় দু’হাত মেলে সম্প্রসারিত হয়েছে| এনামুল বাইরে থেকে প্রাতঃকৃত্য সেরে এসে দেখে মিথিলা ঘুম ভেঙে ডান হাতের আঙ্গুল দুটি মুখে পুরে শান্ত ভঙ্গিতে চুপচাপ বসে আছে| বাবাকে দেখে| চোখ পিটপিট করে তাকায় সে| একটুও কাঁদে না| মা কোথায় তাও জানতে চায় না| এনামুল মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করে, বলে, ‘ক্ষিদা লাগছে?’
মিথিলা কিছু না বললেও তাক থেকে একটা কৌটা নামিয়ে মেয়ের হাতে দুটো বিস্কুট দেয় সে| নিজেও একটা খায়| তাকে খুবই উৎকণ্ঠিত ও আনমনা দেখায়| আবার মোবাইল ফোনটা তুলে হাতে নেয় এনামুল| এবারো ওই পাশে রিং হতে থাকে, এনামুল কানে ফোন চেপে আশা নিয়ে অপেক্ষা করলে ফোনটা এবার কেউ ধরে,
‘হ্যালো লাইজু, কই তুই? অহনো বাইত আইলি না যে! চিন্তায় ফালায়া দিছোছ আমাগো, ফোনও দি ধরোছ না, হইছে কি তোর?’
এনামুল এক নিঃশ্বাসে বলে|
‘এই ফোন যার উনি আপনের কি হয়?’ একটা অচেনা পুরুষ কণ্ঠস্বর কঠিন গলায় জানতে চায়| এনামুলের বুকটা হঠাৎ ধ্বক করে ওঠে| পুলিশের হাতে ধরা পড়ছে? মাগিরে কতদিন কইছি, সাবধানে চলিস| কথা তো শুনে না|
‘কী লাগে আপনের? সম্পর্ক কী?’
‘জ্বি, মানে, আমার ওয়াইফ!... লাইজু কই?’
‘উনি তো মারা গেছেন| আমি মগবাজার মানসি হোটেলের ম্যানেজার বলছি, আপনে তাড়াতাড়ি আসেন| আমরা পুলিশে খবর দিছি|’
এনামুল ফোনটা রেখে ধীরেসুস্থে পরনের গেঞ্জি খুলে দড়িতে ঝোলানো একটা শার্ট আর লুঙ্গি বদলে একটা কালো প্যান্ট পরে, দেয়ালে ঝুলন্ত পারদ ওঠা অস্পষ্ট আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেক সময় নিয়ে মাথায় সিঁথি কেটে চুল আচড়ায়| গালের খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলোর ওপর হাত বুলায় কিছুক্ষণ| দাড়ি না কাটলে কি তাকে চোরের মতো দেখাবে? মুখে দাড়ি বাড়লেই লাইজু হাসতে হাসতে বলতো, ‘যাও শেভ কইরা আসো! কেমন চুরের মতো চেহারা হইছে!’
চুরির দায়েই হক সাহেবের গ্যারেজ থেকে গত মাসে চাকরিটা গেল এনামুলের, যদিও সে আসলে চুরি করে নাই| মিথিলা চৌকির উপরে বিস্কুটের গুঁড়া ফেলে একাকার করে ফেলেছে| এনামুল তাকে কোলে নিয়ে পাশের বাড়িতে লাইজুর খালার কাছে রেখে বেরিয়ে পড়ে| তার ইচ্ছা করে মাটিতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে নয়তো যেদিকে দু’চোখ যায় সেদিকে পালিয়ে যেতে, অনির্দিষ্ট কোনো গন্তব্যে যেখানে কেউ তাকে চিনবে না| অবশ্য এই ঢাকা শহরেইবা কয়জন চেনে তাকে? সেটা বিষয় না, বিষয় হচ্ছে সে আসলে পালিয়ে যেতে পারবে না| ফোন ট্র্যাক করে ঠিক তাকে ধরে ফেলা হবে| মোবাইলের সিমটা এক্ষুণি খুলে ফেলে দিবে কিনা ভাবতে ভাবতেই সামনে একটা মানুষে ঠাসা বাস এসে দাঁড়ালে ঠেলাঠেলি করে বাসে উঠে পড়ে এনামুল|
রোদ বাড়ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিলকিসের ব্যথা| কিছুক্ষণের জন্য একটু থামে তারপর আবার চিনচিন করে ব্যথা বাড়তে থাকে| বাড়তে বাড়তে একেবারে চরমে ওঠে; তারপর আবার হুট করে থেমে যায়| আবার ওঠে| এরই মধ্যে দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে এক পশলা পানি কোনো সংকেত না দিয়ে ঝপ করে নেমে এলে বিলকিস আর অপেক্ষা করে না| ওপাশ ফিরে হাল্কা করে নাক ডাকতে থাকা ফারুকের পিঠে হাত দিয়ে আস্তে করে ধাক্কা দেয় ‘শুনছেন, এই যে, একটু উঠবেন... এই...’
ফারুক একটা স্বপ্ন দেখছিল, দেখছিল তার পরনে একটা পুরনো তেনা তেনা কাপড়ের শার্ট| সে যেখানে হাত দিচ্ছে সেখানেই ফ্যাঁশ করে শার্টটা ছিঁড়ে যাচ্ছে, পরনের প্যান্টটিরও একই দশা| ফ্যাড় ফ্যাড় করে ছিঁড়ে ফ্যাতা ফ্যাতা হয়ে যাচ্ছে সব কাপড়| আব্রু রক্ষাই কঠিন| ফারুকের মনে হলো ইজ্জত বাঁচাতে হলে কোনো ঝোপ বা দেয়ালের আড়ালে তাকে এক্ষুণি লুকিয়ে পড়তে হবে| স্বপ্নের মধ্যেই ফারুক ঘামতে শুরু করলো| কোনো দিকে না তাকিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে থাকলো সে| পেছন থেকে অনেকে যেন সুর করে তাকে ডাকছে, বলছে, ফিরে এসো| এদের মধ্যে বিলকিসও আছে| বিলকিস শুধু ডাকছে না দৌড়ে এসে পেছন দিয়ে তাকে ধরে ফেলেছে, হাল্কা করে পিঠে ধাক্কাও দিচ্ছে| ফারুক বুঝতে পারে এতক্ষণ একটা অদ্ভুত স্বপ্নের ঘোরে ছিল সে, স্বপ্নটা ভেঙে যাওয়ায় তার স্বস্তি লাগে| ঘুম ভাঙা জড়ানো গলায় ফারুক পাশ ফিরে জানতে চায়,
‘কী হইছে?’
‘মনে হয় পানি ভাঙছে, খুব বেদনা করতেছে, হাসপাতালে যাওয়া লাগব|’
ফারুক এবার ধরমড় করে উঠে বসে| ‘হ্যাঁ? সময় হয়ে গেছে নাকি? তাইলে তো দেরি করা যাবে না| তাড়াতাড়ি রেডি হও| আমি পাশের বাড়ির ভাবিরে ডাকতেছি|’
খুঁজে পেতে একটা সিএনজি নিয়ে এলো ফারুক| যত্ন করে ব্যথায় কাতর স্ত্রীকে সিটে বসিয়ে তাকে একহাতে জড়িয়ে ধরে আদদ্বীন মেডিক্যালের দিকে রওনা দিল ওরা|
সূর্যের আলো যখন একদম খাড়া হয়ে মাথার ওপর পড়ছে, মানুষের ছায়াগুলো তাদের শরীরের চেয়ে ছোট হয়ে গেছে তখন মগবাজারের মানসি আবাসিক হোটেলের সামনে পৌছে এনামুল দেখে রাস্তার ওপর একটা নীল রঙের পুলিশের জিপ গাড়ি থেমে আছে আর কিছু উৎসুক জনতা হোটেলের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে ঘোট পাকাচ্ছে, যদিও পুলিশের ইউনিফর্ম পরা শক্ত চেহারার একজন লোক কাউকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না| এনামুল নিজেও গিয়ে জনতার জটলার মধ্যে ঢুকে পড়ে, তাদের মতোই উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে ভেতরে কী হচ্ছে| পুলিশকে বলে হোটেলের ভেতরে ঢুকবে নাকি এই জনসমাগমে মিশে থাকবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না এনামুল, তখনই তার পকেটে ফোন বাজলো, ধরে দেখলো লাইজুর ফোন, স্ক্রীনে লাইজুর নাম, তার হাস্যোজ্জ্বল মুখের ছবি, এতক্ষণে লাইজু ফোন করেছে, মানে লাইজু বেঁচে আছে কয়েক মুহূর্ত এমন একটা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গেল এনামুল| ভিড় থেকে একটু সরে এসে ফোনটা ধরলো সে, একটা উত্তেজিত, রাগত কণ্ঠস্বর ধমকে উঠলো, ‘কি মিয়া, আপনে কই? পুলিশ আইসা গেছে আপনের খবর নাই, আসেন সোজা দোতলায় ৬ ন¤^র রুমের সামনে চইলা আসেন|’
এনামুল ক্ষীণ গলায় প্রবেশদ্বারের পুলিশ ও তার উপস্থিতির কথা জানালে লোকটা তাকে অপেক্ষা করতে বলে নিজেই নেমে এসে খুঁজে পেতে এনামুলকে ওপরে নিয়ে যায়|
‘ক্লিয়ার মার্ডার কেস! দুই হাতে গলা টিপে মারছে| মাথার পিছনে আঘাতের চিহ্ন আছে| ধস্তাধস্তিরও আলামত পাওয়া গেছে!’
লাইজুর প্রাণহীন ফ্যাকাশে মুখের ওপর থেকে সাদা চাদরটা সরিয়ে বলে পুলিশ|
‘আপনে সত্যিই এর স্বামী তো, নাকি অন্য সম্পর্ক? বউ কই যায়, কী করে, খবর রাখেন না?’
প্রশ্নকর্তার গলায় বিদ্রুপ আর তাচ্ছিল্য| এনামুল শুকনো ঠোঁট দুটি খুলে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলতে চায় কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না|
‘খদ্দের নিয়া ঢুকছিলো বুঝছেন! স্বামী স্ত্রীর পরিচয় দিয়া! কাম শেষে বেটা খুন কইরা পালাইছে| খেলা খতম পয়সা হজম! হা হা হা! বউ যে এই সব করে জানতেন কিছু আপনে?’
তাদের বিয়ের পর লাইজু রাতের কাজ ছেড়ে দিছিল, এনামুল জানে|
‘শইল্যের খিদায় তো না পেটের খিদায় রাইতের কাম করছি| কিন্তুক আর না| এইবার এক্কেরে মন দিয়া গারমেন্টের চাকরি আর সংসার|’ লাইজু বলেছিল|
তখন কে জানতো আগুন লেগে গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাবে? কে বুঝছিল এনামুলের গ্যারেজের চাকরিটা থাকবে না? কে জানতো চার মাসের বাড়ি ভাড়া বাদ পড়বে, মিথিলার হঠাৎ নিউমোনিয়া হবে, ঘরে এক দানা চাল থাকবে না, কারো কাছে হাত পেতে এক টাকা ধারও আনা যাবে না| এনামুল যেদিন আর কিছু না পেয়ে নিজেদের মোবাইল ফোন দুটো বেচতে চেয়েছিল সেদিন লাইজু উদাস কণ্ঠে বলেছিল, ‘থাক, এইডি বেইচ্যা আর কয় টেকা পাইবা?... পুরান কামেই নামি! একটা দুইটা ক্ষেপ মারলে শইল তো আর ক্ষয় ˆহয়া যাইত না!’
‘এই ডেড বডি পোস্টমর্টেমে যাবে, আর আপনি থানায় চলেন, জিজ্ঞাসাবাদ আছে|’
পুলিশের একজন অযথাই চিৎকার করে বলে| এনামুল দেখে তার চোখের সামনে লাইজুর অক্ষয় শরীরটা কাপড়ে পেঁচানো একটা নিঃসাড় নিথর নেতানো লাশ হয়ে যায়| কয়েকজন ধরাধরি করে সেটিকে ভ্যানে তোলে|
সূর্যের আলো ততক্ষণে খানিকটা ম্লান হয়ে পশ্চিম দিকে হেলে যায়| হাসপাতালের করিডোরে নানারকম নারী পুরুষ হাঁটাচলা করে| নার্স এসে ফারুকের কোলে এক পশলা নরম আলো তুলে দেয়ার মতো কাপড়ের পুটলির ভেতর একটা বাচ্চা ধরিয়ে দিয়ে যায়| নবজাতকের গায়ের মোলায়েম ঘ্রাণ, ছোট ছোট নরম হাত পা, চকচকে কালো চুল, আধখোলা চোখ, ভেজা ভেজা গোলাপী ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে কেমন একটা মায়া, একটা প্রশান্তি একটা সরল হতবাক আনন্দে ফারুকের কাছে সব কিছু খুব সুন্দর মনে হয়| মনে হয় মনের যত কালিমা, ক্লেদ, মালিন্য, জটিলতা সব যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর হয়ে যাচ্ছে| তার দুই হাতের আবেষ্টনীর ভেতর ছোট্ট নরম দেহটা নড়াচড়া করে, হাত পা ছুড়ে কঁকিয়ে ওঠে, ঠোঁট বেঁকিয়ে চিৎকার করে কাঁদে, আবার একটু পর পর চোখ ঘুরিয়ে নতুন পৃথিবীটা দেখে| এই শিশুটির অস্তিত্বে সে নিজেও মিশে আছে ভেবে ফারুক এক অভূতপূর্ব অনুভবে আপ্লুত হয়| বিলকিসের আত্মীয়¯^জনরা খবর পেয়ে কলরব তুলে হাসপাতালে এসে গেছে| তাদের হাতে শিশুটিকে তুলে দিয়ে ফারুক চুপচাপ বাইরে বেরিয়ে আসে|
সে দেখে গোলাপি আলোমাখা বিকেলটা নিস্তেজ হয়ে একটা বিষণ্ন সন্ধ্যার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে| রাস্তায় রিকশার টুংটাং, গাড়ির হর্ন, মানুষের কোলাহলের ভেতর থেকে কেউ যেন তখন তাকে সতর্ক গলায় বলে, ‘পালিয়ে যাও| তোমাকে ওরা খুঁজছে|’
ফারুক বলে, কেনো? আমি তো কিছু করি নাই!
‘হা হা হা তুমি করো নাই, তাইলে কে করছে?’
‘আমার ভিতরে থাকা শয়তান করছে| হ্যাঁ, ওই দিন নির্ঘাত আমারে শয়তান ধরছিল| শয়তানের কুমন্ত্রণায় না পড়লে ওইদিন রাতে ঠিক আমি বাড়ি ফিরে আসতাম| ম্যানেজার সাহেব তো ছুটি দিয়েই দিয়েছিল| বনানী থেকে ফার্মগেটে এসে আরেকটা বাস ধরার জন্য ওভারব্রিজের নিচে অপেক্ষা করছিল ফারুক| রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের আলো আঁধারির মধ্যে তার ভয়াল সর্বনাশ যে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়েছিল তা কি সে জানতো? কিন্তু শিকারের সন্ধানে ওঁৎ পেতে থাকা লাইজু ঠিকই ফারুকের চোখে জ্বলতে থাকা বাসনার লকলকে আগুন দেখতে পেয়েছিল| অস্পষ্ট আলোতে ভুরু নাচিয়ে, ঠোঁট বেঁকিয়ে আঙ্গুলে কমলা রঙের শাড়ির আঁচল পেঁচাতে পেঁচাতে খরিদ্দারের সঙ্গে দরদাম ঠিক করেছিল লাইজু| নিয়ে গিয়েছিল তার পরিচিত হোটেলে, এক রাতের জন্য এক রুম| পেটে বাচ্চা আসায় বিলকিসের সঙ্গে মাস তিনেক ধরে কিছু হচ্ছিল না, ফারুকের শরীর ছিল ক্ষুধার্ত বাঘের মতো ভয়ানক হিংস্র, উদগ্রীব| তার শাণিত নখর ও দন্তের আঁচড়ে বিধ্বস্ত লাইজু এক পর্যায়ে বলে বসেছিল,
‘এমন করলে টাকা কিন্তু আরো বেশি দিতে হবে|’
কাজ শেষে ফারুক বাথরুম থেকে বেরিয়ে পকেট হাতড়ে যা ছিল বের করে ছুঁড়ে দিয়েছিল লাইজুর দিকে| লাইজু গুণে দেখে মাত্র চার শ’ আশি টাকা|
‘ফকিরের ভিক্ষা দিলি নাকি, এ্যাঁ? গোলামের পুত... ভিক্ষা নেই না আমি, টেকা বাইর কর, নাইলে তোর খবর আছে হালা...’
ফারুক পকেট হাতড়ায়| প্যান্টের ভেতরের দিকে একটা গোপন পকেট বানানো আছে ফারুকের, সেখানে বিলকিসের জন্য, বাচ্চার জন্য, হাসপাতালের খরচের জন্য কিছু টাকা আলাদা করে রাখা ছিল, সেটাতে হাত দিতে চাইছিল না ফারুক, বললো, ‘আর নাই!... বিশ্বাস করো..!’
‘টেকা না থাকলে তোর ঘড়ি আর মোবাইল দিয়া যাবি...’
চিৎকার করে একথা বলেই ক্ষান্ত দেয় না লাইজু, এক লহমায় ছুটে এসে এক হাতে ফারুকের শার্টের কলার ধরে অন্য একটা হাত কি ভেবে (হয়তো অণ্ডকোষ টিপে ধরার জন্য) তার প্যান্টের ভেতর ঢুকিয়ে দিলে লাইজুর বেশরম হাত গিয়ে ঠেকে ফারুকের গোপন পকেটে| টাকার সন্ধান পেয়ে পাগলের মতো ফারুককে খামচে ধরে লাইজু|
‘টেকা লুকায়া রাখছোছ হারামজাদা, মজা লুটতে পারবি আর টেকা দিতে পারবি না? তোর কলিজা থেইক্যা টাইন্যা টেকা বাইর করুম!’
হঠাৎ কেমন একটা ঘৃণা হয় তার নিজের ওপর, নিকৃষ্ট মনে হয় নিজেকে, খুব লজ্জা লাগে, অনুশোচনা হয় আবার একই সাথে অসহায় লাগে, ভয়ানব ক্ষোভ জাগে সমস্ত জগত সংসারের ওপর| সূর্যকে ঢেকে ফেলা আদিগন্তব্যাপী কালো মেঘের মতো ক্রোধে আচ্ছন্ন হয়ে যায় ফারুকের মন| প্রচণ্ড রকমের অন্ধ বর্বর ও নিষ্ঠুর রাগে শরীর হাত পা কাঁপতে থাকে তার| মনে হয় কেউ তার সর্বস্ব লুট করে নিতে চাইছে| যেভাবে হোক তাকে প্রতিহত করতেই হবে| সে এক ঝটকায় লাইজুর পাতলা দেহটিকে নিজের ওপর থেকে টেনে ছুঁড়ে মেঝের ওপর ফেলে দেয়|
‘বেশ্যা মাগি এই টাকায় হাত দিবি না, খবরদার!!’
পড়ে গিয়েও থামে না লাইজু, দুইটা টাকার জন্য অভাবে পড়ে যে শরীর সে বেচতে এসেছে, তার উপযুক্ত দাম না নিয়ে আজ সে ছাড়বে না| আজ কেউ তাকে ঠকাতে পারবে না| অকথ্য সব গালাগাল দিতে দিতে হাঁচড়ে পাঁচড়ে উঠে উন্মত্ত কুকুরির মতো লাইজু আবার মরিয়া হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফারুকের ওপর| এবারো তাকে ঠেলে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয় ফারুক| এবার লাইজুর মাথা গিয়ে লাগে খাটের এক কোনায়| কোঁৎ করে একটা শব্দ হয়| ফারুক দেখে হাত পা ছড়িয়ে মরার মতো পড়ে গেছে মেয়েটা| মরে গেল নাকি ভেবে একটু ভড়কে যায় ফারুক| খুনের দায়ে ফেঁসে গেলে তো মুশকিল! কাছে গিয়ে নিচু হয়ে দুই হাতে মেয়েটাকে তুলে বিছানার ওপর শুইয়ে দেয় সে| তারপর নিঃশ্বাস ফেলছে কিনা পরীক্ষা করে দেখার জন্য নাকের সামনে হাত দেয়| হ্যাঁ, হাল্কা করে শ্বাস নিচ্ছে মাগিটা| যাক মরে নাই, অজ্ঞান হয়ে গেছে| ফারুক আর একটুও দেরি করতে চায় না, দ্রুত মেয়েটার কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতেই প্রেতিনির মতো দুই হাতে ফারুকের পিঠ আঁকড়ে ধরে লাইজু| খনখনে গলায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
‘যাইতে দিমু না| আগে টেকা দিবি পরে যাবি!’
এবার আর হিতাহিত জ্ঞান থাকে না ফারুকের| দুই হাতের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে চেপে ধরে বেশ্যা ডাইনিটার গলা| তারপর চাপতেই থাকে| চাপতেই থাকে, যতক্ষণ না সে নিস্তেজ হয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়ে|

শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
মোমের আলোর মতো সকালের নরম নিরুত্তাপ সূর্য রশ্মি জানালার ফাঁক গলে আলতো করে লাইজুর মুখ ছুঁেয় তার বন্ধ দুই চোখের ঘন কালো পাপড়ির ওপর এসে পড়ল| তবু সে মুদে থাকা চোখ দুটো খুললো না| সামান্য নড়লো না পর্যন্ত| যেন সে এক নিদ্রিতা রাজকুমারী, কোনো এক জাদুকরী অভিশাপে গভীর ঘুমে নিমজ্জিত, রাজার কুমার এসে ওষ্ঠ চুম্বন না করা পর্যন্ত তার এই কালঘুম ভাঙবে না| এবার সেই জল ধোয়া আলো তার ঠোঁটে আগের দিনের লেগে থাকা মলিন খয়েরি লিপস্টিক পর্যন্ত বিস্তৃত হলো, কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে নগরের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে নিঃশব্দে এসে বসলো হাজারিবাগের এক কামরার বদ্ধ একটি ঘরের নড়বড়ে চৌকির পায়ের কাছের সরু চিলতেটিতে| প্রায় সারা রাত অর্ধ ঘুম ও জাগরণে দুলতে থাকা এনামুল তার তন্দ্রাচ্ছন্ন লাল চোখ দুটো খুলে সূর্যের আলো দেখে একটু চঞ্চল হয়ে উঠে বসলো, ঘাড় ঘুরিয়ে বিছানায় তার পাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা তিন বছুরে ঘুমন্ত মিথিলার দিকে তাকিয়ে তার হৃদয় পিতৃস্নেহে খানিকটা আর্দ্র হয়ে উঠলেও দুঃশ্চিন্তার একটা গাঢ় ভাঁজ তার কপালে স্থায়ী হয়ে লেপ্টে রইল| হাত বাড়িয়ে পাশে রাখা মোবাইল ফোনটা তুলে নিয়ে আবারো লাইজুর নাম্বারে কল করে কানের ওপর যন্ত্রটা জোরে চেপে ধরলো এনামুল| ওপাশে রিং বেজে বেজে ফোনটা থেমে গেল| হারামজাদি ফোনটা সাইলেন্ট করে রেখেছে বোধহয়, ভাবল সে|
সূর্যের বিচরণশীল আলো এবার গিয়ে সুড়সুড়ি দিল গোড়ানের মেয়ে বিলকিসের শ্যামল পায়ের গোড়ালীতে, নয় মাসের বিশাল পেট নিয়ে হাঁসফাঁস করে কাৎ হয়ে ঠোঁটের ওপর ঠোঁট চেপে বিছানার চাদর খামচে ধরে বহু কষ্টে ভারি শরীরটাকে টেনে হামাগুড়ি দেবার মতো করে উঠে বসলো বিলকিস| পাশেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ফারুকের চোখে পূর্ব দিক থেকে আসা তির্যক রোদের ছটা পড়ছে দেখে ধীর পায়ে উঠে গিয়ে জানালার পর্দাটা দুই হাতে টেনে দিল সে| নাইট ডিউটি করে শেষরাতে বাড়ি ফিরে আসা পরিশ্রান্ত স্বামীর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে চায় না বিলকিস| মাত্র দু’বছর হলো বিয়ে হয়েছে তার| রাজপুত্রের মতো সুন্দর চেহারার স্বামী তার| সাদা শার্ট কালো প্যান্ট আর গলায় বো লাগিয়ে যখন দাঁড়ায় তখন কে বলবে সে চাইনিজ রেস্তোরাঁর ওয়েটার! মনে হয় যেন সেই মালিক| টাকাপয়সা একটু কম, কিন্তু এমনিতে তার স্বামীর আদর সোহাগের কমতি নেই| শুধু রাগ উঠলে কেন জানি বেডার হুঁশ থাকে না| বিলকিস তাই কখনোই এমন কিছু করে না যাতে স্বামী রেগে যায় বরং চেষ্টা করে তাকে আরামে আদরে ভুলিয়ে রাখতে| পর্দাটা টেনে দিয়ে খাটে এসে আবার বসতেই জরায়ুর ভেতর তরল জলে ভাসতে থাকা অপরিণত শিশুটি এক পাশ থেকে অন্য পাশে গড়িয়ে যায়| বিলকিস কিছুক্ষণ তার স্ফীত পেটের ওপর আলতো করে নিজের ডান হাতটা বুলায়, যেন আশ্বস্ত করে অনাগত শিশুটিকে, বলে, শান্ত হও| ভয় পেয়ো না| কিন্তু শিশুটি থামে না| সে এবার হাল্কা করে ডাইভ দেয়ার ভঙ্গীতে নিচের দিকে ঢুশ দেয়| বিলকিসের কোমর থেকে তলপেট পর্যন্ত তীব্র একটা ব্যথা বল্লমের খোঁচার মতো চিলিক দিয়ে ওঠে|
সূর্যের বয়স আরেকটু বাড়লে আলো যখন ঝলমলে কিশোরীর মতো এক্কা দোক্কা খেলে, মগবাজারের মানসী আবাসিক হোটেলের ক্লিনার সবুজ তখন এক হাতে ঝাড়ু আর অন্য হাতে একটা প্লাস্টিকের বালতি আর বেলচা নিয়ে রুমগুলো ঝাড়পোঁছ করতে আসে| ছোট্ট সাধারণ ঘিঞ্জি একটা রংহীন সস্তা হোটেল, একতলা দোতলা মিলিয়ে ৮টা মাত্র রুম| রুমে বোর্ডার থাকলে তাদের ডিসটার্ব করার নিয়ম নেই| ফাঁকা ঘরগুলোতেই তার পরিষ্কারের কাজ| ১ থেকে ৫ নম্বর পরিষ্কার করে ৬ নম্বর রুমের সামনে এসে সবুজ দেখে দরজা ভেড়ানোই আছে কিন্তু তাতে তালা লাগানো নেই, দরজার নিচে সকাল বেলার চঞ্চল রোদ হুটোপুটি খাচ্ছে| সবুজ আস্তে করে দরজার কপাটে ধাক্কা দেয়, মনে হচ্ছে কেউ একজন বিছানায় বাঁকা হয়ে অদ্ভুত ভঙ্গীতে শুয়ে আছে, সম্ভবত একজন নারী, তার শাড়ির কমলা আঁচল মেঝেতে লুটাচ্ছে, তার চুরি পরা একটা হাত সোজা হয়ে খাটের বাইরে অস্বাভাবিকভাবে ঝুলছে| সবুজ দ্রুত একটুখানি পিছিয়ে এসে মুখের কাছে হাত তুলে গলা খাকারি দিল, তাতেও কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে বাইরে এসে দরজায় খট খট শব্দ করে কয়েকটা টোকা দিল সে| এবারো নীরবতা| কেমন ঘুমরে বাবা? মদ খায়া বেহুঁশ ˆহয়া আছে নাকি? এর সঙ্গে কি কোনো পুরুষ মানুষ নাই? হোটেলের অতিথিকে জাগানোর চেষ্টা বাদ দিয়ে সবুজ অন্য দুটো ঘর পরিষ্কার করতে গেলেও মনটা কেমন খুঁতখুঁত করে তার, অস্থির লাগে, মনে হয় কিছু একটা অসুবিধা আছে| ৬ নম্বর রুমের বিষয়টা কী, ম্যানেজার সাহেবরে জানানোর জন্য হাতের কাজ শেষ না করেই তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে যায় ক্লিনার সবুজ|
রোদের তেজ আগের চেয়ে বেড়েছে| চিলতে আলো আর ক্ষীণাঙ্গী নেই, পুরো ঘরময় দু’হাত মেলে সম্প্রসারিত হয়েছে| এনামুল বাইরে থেকে প্রাতঃকৃত্য সেরে এসে দেখে মিথিলা ঘুম ভেঙে ডান হাতের আঙ্গুল দুটি মুখে পুরে শান্ত ভঙ্গিতে চুপচাপ বসে আছে| বাবাকে দেখে| চোখ পিটপিট করে তাকায় সে| একটুও কাঁদে না| মা কোথায় তাও জানতে চায় না| এনামুল মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করে, বলে, ‘ক্ষিদা লাগছে?’
মিথিলা কিছু না বললেও তাক থেকে একটা কৌটা নামিয়ে মেয়ের হাতে দুটো বিস্কুট দেয় সে| নিজেও একটা খায়| তাকে খুবই উৎকণ্ঠিত ও আনমনা দেখায়| আবার মোবাইল ফোনটা তুলে হাতে নেয় এনামুল| এবারো ওই পাশে রিং হতে থাকে, এনামুল কানে ফোন চেপে আশা নিয়ে অপেক্ষা করলে ফোনটা এবার কেউ ধরে,
‘হ্যালো লাইজু, কই তুই? অহনো বাইত আইলি না যে! চিন্তায় ফালায়া দিছোছ আমাগো, ফোনও দি ধরোছ না, হইছে কি তোর?’
এনামুল এক নিঃশ্বাসে বলে|
‘এই ফোন যার উনি আপনের কি হয়?’ একটা অচেনা পুরুষ কণ্ঠস্বর কঠিন গলায় জানতে চায়| এনামুলের বুকটা হঠাৎ ধ্বক করে ওঠে| পুলিশের হাতে ধরা পড়ছে? মাগিরে কতদিন কইছি, সাবধানে চলিস| কথা তো শুনে না|
‘কী লাগে আপনের? সম্পর্ক কী?’
‘জ্বি, মানে, আমার ওয়াইফ!... লাইজু কই?’
‘উনি তো মারা গেছেন| আমি মগবাজার মানসি হোটেলের ম্যানেজার বলছি, আপনে তাড়াতাড়ি আসেন| আমরা পুলিশে খবর দিছি|’
এনামুল ফোনটা রেখে ধীরেসুস্থে পরনের গেঞ্জি খুলে দড়িতে ঝোলানো একটা শার্ট আর লুঙ্গি বদলে একটা কালো প্যান্ট পরে, দেয়ালে ঝুলন্ত পারদ ওঠা অস্পষ্ট আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেক সময় নিয়ে মাথায় সিঁথি কেটে চুল আচড়ায়| গালের খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলোর ওপর হাত বুলায় কিছুক্ষণ| দাড়ি না কাটলে কি তাকে চোরের মতো দেখাবে? মুখে দাড়ি বাড়লেই লাইজু হাসতে হাসতে বলতো, ‘যাও শেভ কইরা আসো! কেমন চুরের মতো চেহারা হইছে!’
চুরির দায়েই হক সাহেবের গ্যারেজ থেকে গত মাসে চাকরিটা গেল এনামুলের, যদিও সে আসলে চুরি করে নাই| মিথিলা চৌকির উপরে বিস্কুটের গুঁড়া ফেলে একাকার করে ফেলেছে| এনামুল তাকে কোলে নিয়ে পাশের বাড়িতে লাইজুর খালার কাছে রেখে বেরিয়ে পড়ে| তার ইচ্ছা করে মাটিতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে নয়তো যেদিকে দু’চোখ যায় সেদিকে পালিয়ে যেতে, অনির্দিষ্ট কোনো গন্তব্যে যেখানে কেউ তাকে চিনবে না| অবশ্য এই ঢাকা শহরেইবা কয়জন চেনে তাকে? সেটা বিষয় না, বিষয় হচ্ছে সে আসলে পালিয়ে যেতে পারবে না| ফোন ট্র্যাক করে ঠিক তাকে ধরে ফেলা হবে| মোবাইলের সিমটা এক্ষুণি খুলে ফেলে দিবে কিনা ভাবতে ভাবতেই সামনে একটা মানুষে ঠাসা বাস এসে দাঁড়ালে ঠেলাঠেলি করে বাসে উঠে পড়ে এনামুল|
রোদ বাড়ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিলকিসের ব্যথা| কিছুক্ষণের জন্য একটু থামে তারপর আবার চিনচিন করে ব্যথা বাড়তে থাকে| বাড়তে বাড়তে একেবারে চরমে ওঠে; তারপর আবার হুট করে থেমে যায়| আবার ওঠে| এরই মধ্যে দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে এক পশলা পানি কোনো সংকেত না দিয়ে ঝপ করে নেমে এলে বিলকিস আর অপেক্ষা করে না| ওপাশ ফিরে হাল্কা করে নাক ডাকতে থাকা ফারুকের পিঠে হাত দিয়ে আস্তে করে ধাক্কা দেয় ‘শুনছেন, এই যে, একটু উঠবেন... এই...’
ফারুক একটা স্বপ্ন দেখছিল, দেখছিল তার পরনে একটা পুরনো তেনা তেনা কাপড়ের শার্ট| সে যেখানে হাত দিচ্ছে সেখানেই ফ্যাঁশ করে শার্টটা ছিঁড়ে যাচ্ছে, পরনের প্যান্টটিরও একই দশা| ফ্যাড় ফ্যাড় করে ছিঁড়ে ফ্যাতা ফ্যাতা হয়ে যাচ্ছে সব কাপড়| আব্রু রক্ষাই কঠিন| ফারুকের মনে হলো ইজ্জত বাঁচাতে হলে কোনো ঝোপ বা দেয়ালের আড়ালে তাকে এক্ষুণি লুকিয়ে পড়তে হবে| স্বপ্নের মধ্যেই ফারুক ঘামতে শুরু করলো| কোনো দিকে না তাকিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে থাকলো সে| পেছন থেকে অনেকে যেন সুর করে তাকে ডাকছে, বলছে, ফিরে এসো| এদের মধ্যে বিলকিসও আছে| বিলকিস শুধু ডাকছে না দৌড়ে এসে পেছন দিয়ে তাকে ধরে ফেলেছে, হাল্কা করে পিঠে ধাক্কাও দিচ্ছে| ফারুক বুঝতে পারে এতক্ষণ একটা অদ্ভুত স্বপ্নের ঘোরে ছিল সে, স্বপ্নটা ভেঙে যাওয়ায় তার স্বস্তি লাগে| ঘুম ভাঙা জড়ানো গলায় ফারুক পাশ ফিরে জানতে চায়,
‘কী হইছে?’
‘মনে হয় পানি ভাঙছে, খুব বেদনা করতেছে, হাসপাতালে যাওয়া লাগব|’
ফারুক এবার ধরমড় করে উঠে বসে| ‘হ্যাঁ? সময় হয়ে গেছে নাকি? তাইলে তো দেরি করা যাবে না| তাড়াতাড়ি রেডি হও| আমি পাশের বাড়ির ভাবিরে ডাকতেছি|’
খুঁজে পেতে একটা সিএনজি নিয়ে এলো ফারুক| যত্ন করে ব্যথায় কাতর স্ত্রীকে সিটে বসিয়ে তাকে একহাতে জড়িয়ে ধরে আদদ্বীন মেডিক্যালের দিকে রওনা দিল ওরা|
সূর্যের আলো যখন একদম খাড়া হয়ে মাথার ওপর পড়ছে, মানুষের ছায়াগুলো তাদের শরীরের চেয়ে ছোট হয়ে গেছে তখন মগবাজারের মানসি আবাসিক হোটেলের সামনে পৌছে এনামুল দেখে রাস্তার ওপর একটা নীল রঙের পুলিশের জিপ গাড়ি থেমে আছে আর কিছু উৎসুক জনতা হোটেলের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে ঘোট পাকাচ্ছে, যদিও পুলিশের ইউনিফর্ম পরা শক্ত চেহারার একজন লোক কাউকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না| এনামুল নিজেও গিয়ে জনতার জটলার মধ্যে ঢুকে পড়ে, তাদের মতোই উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে ভেতরে কী হচ্ছে| পুলিশকে বলে হোটেলের ভেতরে ঢুকবে নাকি এই জনসমাগমে মিশে থাকবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না এনামুল, তখনই তার পকেটে ফোন বাজলো, ধরে দেখলো লাইজুর ফোন, স্ক্রীনে লাইজুর নাম, তার হাস্যোজ্জ্বল মুখের ছবি, এতক্ষণে লাইজু ফোন করেছে, মানে লাইজু বেঁচে আছে কয়েক মুহূর্ত এমন একটা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গেল এনামুল| ভিড় থেকে একটু সরে এসে ফোনটা ধরলো সে, একটা উত্তেজিত, রাগত কণ্ঠস্বর ধমকে উঠলো, ‘কি মিয়া, আপনে কই? পুলিশ আইসা গেছে আপনের খবর নাই, আসেন সোজা দোতলায় ৬ ন¤^র রুমের সামনে চইলা আসেন|’
এনামুল ক্ষীণ গলায় প্রবেশদ্বারের পুলিশ ও তার উপস্থিতির কথা জানালে লোকটা তাকে অপেক্ষা করতে বলে নিজেই নেমে এসে খুঁজে পেতে এনামুলকে ওপরে নিয়ে যায়|
‘ক্লিয়ার মার্ডার কেস! দুই হাতে গলা টিপে মারছে| মাথার পিছনে আঘাতের চিহ্ন আছে| ধস্তাধস্তিরও আলামত পাওয়া গেছে!’
লাইজুর প্রাণহীন ফ্যাকাশে মুখের ওপর থেকে সাদা চাদরটা সরিয়ে বলে পুলিশ|
‘আপনে সত্যিই এর স্বামী তো, নাকি অন্য সম্পর্ক? বউ কই যায়, কী করে, খবর রাখেন না?’
প্রশ্নকর্তার গলায় বিদ্রুপ আর তাচ্ছিল্য| এনামুল শুকনো ঠোঁট দুটি খুলে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলতে চায় কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না|
‘খদ্দের নিয়া ঢুকছিলো বুঝছেন! স্বামী স্ত্রীর পরিচয় দিয়া! কাম শেষে বেটা খুন কইরা পালাইছে| খেলা খতম পয়সা হজম! হা হা হা! বউ যে এই সব করে জানতেন কিছু আপনে?’
তাদের বিয়ের পর লাইজু রাতের কাজ ছেড়ে দিছিল, এনামুল জানে|
‘শইল্যের খিদায় তো না পেটের খিদায় রাইতের কাম করছি| কিন্তুক আর না| এইবার এক্কেরে মন দিয়া গারমেন্টের চাকরি আর সংসার|’ লাইজু বলেছিল|
তখন কে জানতো আগুন লেগে গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাবে? কে বুঝছিল এনামুলের গ্যারেজের চাকরিটা থাকবে না? কে জানতো চার মাসের বাড়ি ভাড়া বাদ পড়বে, মিথিলার হঠাৎ নিউমোনিয়া হবে, ঘরে এক দানা চাল থাকবে না, কারো কাছে হাত পেতে এক টাকা ধারও আনা যাবে না| এনামুল যেদিন আর কিছু না পেয়ে নিজেদের মোবাইল ফোন দুটো বেচতে চেয়েছিল সেদিন লাইজু উদাস কণ্ঠে বলেছিল, ‘থাক, এইডি বেইচ্যা আর কয় টেকা পাইবা?... পুরান কামেই নামি! একটা দুইটা ক্ষেপ মারলে শইল তো আর ক্ষয় ˆহয়া যাইত না!’
‘এই ডেড বডি পোস্টমর্টেমে যাবে, আর আপনি থানায় চলেন, জিজ্ঞাসাবাদ আছে|’
পুলিশের একজন অযথাই চিৎকার করে বলে| এনামুল দেখে তার চোখের সামনে লাইজুর অক্ষয় শরীরটা কাপড়ে পেঁচানো একটা নিঃসাড় নিথর নেতানো লাশ হয়ে যায়| কয়েকজন ধরাধরি করে সেটিকে ভ্যানে তোলে|
সূর্যের আলো ততক্ষণে খানিকটা ম্লান হয়ে পশ্চিম দিকে হেলে যায়| হাসপাতালের করিডোরে নানারকম নারী পুরুষ হাঁটাচলা করে| নার্স এসে ফারুকের কোলে এক পশলা নরম আলো তুলে দেয়ার মতো কাপড়ের পুটলির ভেতর একটা বাচ্চা ধরিয়ে দিয়ে যায়| নবজাতকের গায়ের মোলায়েম ঘ্রাণ, ছোট ছোট নরম হাত পা, চকচকে কালো চুল, আধখোলা চোখ, ভেজা ভেজা গোলাপী ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে কেমন একটা মায়া, একটা প্রশান্তি একটা সরল হতবাক আনন্দে ফারুকের কাছে সব কিছু খুব সুন্দর মনে হয়| মনে হয় মনের যত কালিমা, ক্লেদ, মালিন্য, জটিলতা সব যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর হয়ে যাচ্ছে| তার দুই হাতের আবেষ্টনীর ভেতর ছোট্ট নরম দেহটা নড়াচড়া করে, হাত পা ছুড়ে কঁকিয়ে ওঠে, ঠোঁট বেঁকিয়ে চিৎকার করে কাঁদে, আবার একটু পর পর চোখ ঘুরিয়ে নতুন পৃথিবীটা দেখে| এই শিশুটির অস্তিত্বে সে নিজেও মিশে আছে ভেবে ফারুক এক অভূতপূর্ব অনুভবে আপ্লুত হয়| বিলকিসের আত্মীয়¯^জনরা খবর পেয়ে কলরব তুলে হাসপাতালে এসে গেছে| তাদের হাতে শিশুটিকে তুলে দিয়ে ফারুক চুপচাপ বাইরে বেরিয়ে আসে|
সে দেখে গোলাপি আলোমাখা বিকেলটা নিস্তেজ হয়ে একটা বিষণ্ন সন্ধ্যার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে| রাস্তায় রিকশার টুংটাং, গাড়ির হর্ন, মানুষের কোলাহলের ভেতর থেকে কেউ যেন তখন তাকে সতর্ক গলায় বলে, ‘পালিয়ে যাও| তোমাকে ওরা খুঁজছে|’
ফারুক বলে, কেনো? আমি তো কিছু করি নাই!
‘হা হা হা তুমি করো নাই, তাইলে কে করছে?’
‘আমার ভিতরে থাকা শয়তান করছে| হ্যাঁ, ওই দিন নির্ঘাত আমারে শয়তান ধরছিল| শয়তানের কুমন্ত্রণায় না পড়লে ওইদিন রাতে ঠিক আমি বাড়ি ফিরে আসতাম| ম্যানেজার সাহেব তো ছুটি দিয়েই দিয়েছিল| বনানী থেকে ফার্মগেটে এসে আরেকটা বাস ধরার জন্য ওভারব্রিজের নিচে অপেক্ষা করছিল ফারুক| রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের আলো আঁধারির মধ্যে তার ভয়াল সর্বনাশ যে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়েছিল তা কি সে জানতো? কিন্তু শিকারের সন্ধানে ওঁৎ পেতে থাকা লাইজু ঠিকই ফারুকের চোখে জ্বলতে থাকা বাসনার লকলকে আগুন দেখতে পেয়েছিল| অস্পষ্ট আলোতে ভুরু নাচিয়ে, ঠোঁট বেঁকিয়ে আঙ্গুলে কমলা রঙের শাড়ির আঁচল পেঁচাতে পেঁচাতে খরিদ্দারের সঙ্গে দরদাম ঠিক করেছিল লাইজু| নিয়ে গিয়েছিল তার পরিচিত হোটেলে, এক রাতের জন্য এক রুম| পেটে বাচ্চা আসায় বিলকিসের সঙ্গে মাস তিনেক ধরে কিছু হচ্ছিল না, ফারুকের শরীর ছিল ক্ষুধার্ত বাঘের মতো ভয়ানক হিংস্র, উদগ্রীব| তার শাণিত নখর ও দন্তের আঁচড়ে বিধ্বস্ত লাইজু এক পর্যায়ে বলে বসেছিল,
‘এমন করলে টাকা কিন্তু আরো বেশি দিতে হবে|’
কাজ শেষে ফারুক বাথরুম থেকে বেরিয়ে পকেট হাতড়ে যা ছিল বের করে ছুঁড়ে দিয়েছিল লাইজুর দিকে| লাইজু গুণে দেখে মাত্র চার শ’ আশি টাকা|
‘ফকিরের ভিক্ষা দিলি নাকি, এ্যাঁ? গোলামের পুত... ভিক্ষা নেই না আমি, টেকা বাইর কর, নাইলে তোর খবর আছে হালা...’
ফারুক পকেট হাতড়ায়| প্যান্টের ভেতরের দিকে একটা গোপন পকেট বানানো আছে ফারুকের, সেখানে বিলকিসের জন্য, বাচ্চার জন্য, হাসপাতালের খরচের জন্য কিছু টাকা আলাদা করে রাখা ছিল, সেটাতে হাত দিতে চাইছিল না ফারুক, বললো, ‘আর নাই!... বিশ্বাস করো..!’
‘টেকা না থাকলে তোর ঘড়ি আর মোবাইল দিয়া যাবি...’
চিৎকার করে একথা বলেই ক্ষান্ত দেয় না লাইজু, এক লহমায় ছুটে এসে এক হাতে ফারুকের শার্টের কলার ধরে অন্য একটা হাত কি ভেবে (হয়তো অণ্ডকোষ টিপে ধরার জন্য) তার প্যান্টের ভেতর ঢুকিয়ে দিলে লাইজুর বেশরম হাত গিয়ে ঠেকে ফারুকের গোপন পকেটে| টাকার সন্ধান পেয়ে পাগলের মতো ফারুককে খামচে ধরে লাইজু|
‘টেকা লুকায়া রাখছোছ হারামজাদা, মজা লুটতে পারবি আর টেকা দিতে পারবি না? তোর কলিজা থেইক্যা টাইন্যা টেকা বাইর করুম!’
হঠাৎ কেমন একটা ঘৃণা হয় তার নিজের ওপর, নিকৃষ্ট মনে হয় নিজেকে, খুব লজ্জা লাগে, অনুশোচনা হয় আবার একই সাথে অসহায় লাগে, ভয়ানব ক্ষোভ জাগে সমস্ত জগত সংসারের ওপর| সূর্যকে ঢেকে ফেলা আদিগন্তব্যাপী কালো মেঘের মতো ক্রোধে আচ্ছন্ন হয়ে যায় ফারুকের মন| প্রচণ্ড রকমের অন্ধ বর্বর ও নিষ্ঠুর রাগে শরীর হাত পা কাঁপতে থাকে তার| মনে হয় কেউ তার সর্বস্ব লুট করে নিতে চাইছে| যেভাবে হোক তাকে প্রতিহত করতেই হবে| সে এক ঝটকায় লাইজুর পাতলা দেহটিকে নিজের ওপর থেকে টেনে ছুঁড়ে মেঝের ওপর ফেলে দেয়|
‘বেশ্যা মাগি এই টাকায় হাত দিবি না, খবরদার!!’
পড়ে গিয়েও থামে না লাইজু, দুইটা টাকার জন্য অভাবে পড়ে যে শরীর সে বেচতে এসেছে, তার উপযুক্ত দাম না নিয়ে আজ সে ছাড়বে না| আজ কেউ তাকে ঠকাতে পারবে না| অকথ্য সব গালাগাল দিতে দিতে হাঁচড়ে পাঁচড়ে উঠে উন্মত্ত কুকুরির মতো লাইজু আবার মরিয়া হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফারুকের ওপর| এবারো তাকে ঠেলে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয় ফারুক| এবার লাইজুর মাথা গিয়ে লাগে খাটের এক কোনায়| কোঁৎ করে একটা শব্দ হয়| ফারুক দেখে হাত পা ছড়িয়ে মরার মতো পড়ে গেছে মেয়েটা| মরে গেল নাকি ভেবে একটু ভড়কে যায় ফারুক| খুনের দায়ে ফেঁসে গেলে তো মুশকিল! কাছে গিয়ে নিচু হয়ে দুই হাতে মেয়েটাকে তুলে বিছানার ওপর শুইয়ে দেয় সে| তারপর নিঃশ্বাস ফেলছে কিনা পরীক্ষা করে দেখার জন্য নাকের সামনে হাত দেয়| হ্যাঁ, হাল্কা করে শ্বাস নিচ্ছে মাগিটা| যাক মরে নাই, অজ্ঞান হয়ে গেছে| ফারুক আর একটুও দেরি করতে চায় না, দ্রুত মেয়েটার কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতেই প্রেতিনির মতো দুই হাতে ফারুকের পিঠ আঁকড়ে ধরে লাইজু| খনখনে গলায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
‘যাইতে দিমু না| আগে টেকা দিবি পরে যাবি!’
এবার আর হিতাহিত জ্ঞান থাকে না ফারুকের| দুই হাতের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে চেপে ধরে বেশ্যা ডাইনিটার গলা| তারপর চাপতেই থাকে| চাপতেই থাকে, যতক্ষণ না সে নিস্তেজ হয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়ে|

আপনার মতামত লিখুন