সংবাদ

গল্প সংখ্যা

একটা মলিন ২০ টাকার নোট


খালেদ চৌধুরী
খালেদ চৌধুরী
প্রকাশ: ৬ জুন ২০২৬, ১২:২২ এএম

একটা মলিন ২০ টাকার নোট

সকালে ঘুম ভাঙার পর থুত্থুরে মনটাকে তাঁর একটা লাথি মারতে ইচ্ছা করে| রাত দুইটায় ঘুমিয়েছে— এই যে বৈকল্য, ঘাস ঘাস অনুভূতি; মাথার ভেতরে শব্দহীন ঝিঁঝিঁ, একটা আলস্য, একটা গরিবী হালত— তাকে হত্যা করতে হবে| হত্যা করে কী লাভ! সে তো অস্তিত্বেরই অংশ| তাকে কেবল বন্দী করা যায়| বন্দী বন্দী খেলায় গোটা পৃথিবীটাই বিরাট খাঁচা|স্বাধীনতার বিজ্ঞাপনে কেবল পাওয়া যায় আত্মপ্রবঞ্চনা| তাকে জপতে হয়| তার নাম কী— ক্ষমতা? কেউ কেউ রাজার বাড়ি খোঁজে? কেউ কেউ খাজার বাড়ি| গাজার স্বাধীনতা কত দূর? জনগণ নাক ডেকে ঘুমায়, বিড়ি ধরায়, ছাই ফেলে| এইসব ছাই মাখা সকাল-সন্ধ্যা, মধ্য রজনির ঘুম ভাঙা নিদানকাল আর সহ্য হয় না| ‘রাজায় কইছে চুদির ভাই আনন্দের সীমা নাই’| রাজা আর চুদির ভাইয়ের জমানায় দিবস-রজনি ঘিয়া হয়ে যায়, সাদা হয়ে যায়, ধূসর হয়ে যায়, রঙহীন ধানাইপানাই— গু যে হবে না, তার নিশ্চয়তা কী! তাঁর গতকাল একটা পার্সেল আসার কথা, ফোন দিয়েছিল| তার আগে মনে হলো মুঠোপ্রযুক্তির বন্দীখানা থেকে উড়াল দেয়া দরকার| আত্মার কয়েদালয়ে থেকে সময় বয়ে বয়ে উপযুক্ত অর্থ বা অন্য কিছুর বিনিময়ে নিজেকে বিকিকে দিতে হয়| এই বিক্রিবাট্টার হিসাব লেগে থাকে দমের প্রবাহে| দমের খেলায়— মুঠোপ্রযুক্তি বিরতি খাইরুলের জুম্মা পর্যন্ত চলবে|

নিমকহারামির একটা সীমা আছে| সে দিনরাত ডুবে থাকে নেটে, আবার পশ্চিমাদের সমালোচনা করে! ভাবনার কয়েক আস্তরজুড়ে পশ্চিমের ডলার, লাসভেগাস, আলোকবর্তিকার গুণগান, আমেরিকার ভিসা— সে-ই মনের অর্ধেকটায় আবার থুতনিতে এক থুকা দাড়ি ঝুলিয়ে খাইরুল রুম থেকে বের হয়| কী করবে? ঠিক বুঝতে পারে না| বেলা এগারটা হয়ে যায়, তাঁর নাস্তা খাওয়া হয়নি| বাহিরের খাবার আরেক বিপদ| রেস্টুরেন্টের খাবার সুস্বাদু হলেই বুঝতে হবে মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট (টেস্টিং সল্ট)| সেদিন খাইরুল রুটি খেতে খেতে দেখেছে রুটি বানানোর কারিগর পাছা চুলকাচ্ছে, তার পর আঙুলটা নাকের কাছে নিয়ে শুঁকছে, সম্ভবত মলের গন্ধ না-পেয়ে, পুনরায় কাজে নিবিষ্ট হয়| এই দৃশ্য দেখার পর খাইরুল রুটি খাবে নাকি খাবে না— একটা দ্বিধার মধ্যে ছিল| কী করবে? রুটিটা ফেলে দেবে—, রেস্টুরেন্ট পরিবর্তন করবে? এই রেস্টুরেন্টে খাবারের পর মেসিয়ারকে ৫/১০ টাকা দিতে হয় না| তাছাড়া পরোটাগুলো বড়| এর আগে খাবার দিতে দেরি করায় রেস্টুরেস্টটা বয়কট করেছে| বেশ কয়েক দিন আসেনি| পরে দেখল অন্য খাবারের দোকানগুলোতে আরও অনিয়ম| সে ওই দোকানগুলোতে খাবারও খেতে পারে না| এবার পাছা চুলকানোর যে দৃশ্য দেখল তার জন্য এখানে তো আর আসা যায় না| ভিডিও করতে পারলে রেস্টুরেন্ট মালিককে দেখানো যেত বা নেটে ছাড়া যেত| সে যদি রুটির কারিগরকে ২টা কৃমির ট্যাবলেট উপহার দেয়, তাঁর অপরাধ হবে?

এরকম ভাবনা উপভাবনায় মনে হলো ১২টা বেজে যায়| বাংলামটর ঢালে একটা মধ্যম মানের রেস্টুরেন্টে সে সিঙ্গারা অর্ডার দেয়| প্রথমে ২টা সিঙারা আসে| তার বিপরীত পাশে মাঝামাঝি বপুর এক ভোক্তা কাচের গ্লাসে রং চা পিনে, পান করে আরকি| একেবারে ক্লিন সেভ| মেসিয়াররা তাকে বেশ সমীহ করে, বোধ হয় নিয়মিত এই লোক এখানে আসে| খাইরুলকে মেসিয়াররা খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না|  ৩০ টাকার তিনটা সিঙ্গারা খেয়ে কতই আর বকশিশ দেবে| মোটা লোকটা চা পিনে বলল, বিল দাও—| ৮০ টাকা বিল হয়| ১০ টাকা মেসিয়ারকে আর ১০ টাকা গ্লাস বয়কে দিয়ে একটা জলহস্তির ছায়া এঁকে লোকটা চলে যায়| হায়রে টাকা, তোর জন্যই এত ভেলকি| জ্ঞান নাকি ক্ষমতা উৎপাদন করে| সেই উৎপাদিত জ্ঞান ক্ষমতাসীন হয়ে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে| আর কিছু বলাই নেই| ধরহীন মাথা লাফায়— কতক্ষণ? ৫/১০ মিনিট সময়টা আপাতত অনন্ত মনে হয়|

—খাইরুল, হোটেলে ঢোকার আগেই সিদ্ধান্ত নেয়| এক টাকাও বকশিশ দেবে না| সিঙ্গারা খাওয়ার সময় দেখল ময়দার অংশটা বেশ ঝুরঝুরে| ধরলেই ভেঙে যায়| মানে কী? এখানেও ক্যামিকেল| বেকিং সোডা| কিডনির অসুখের জন্য দায়ী| এটা স্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু ক্ষতিকর? খাইরুল ভাবে গুগল করতে হবে| ভাবতে থাকে সিঙ্গারাটা কী— খাবে নাকি খাবে না, খাবে, খাবে না, সে খায়| খাবার শেষে মেসিয়ার টিস্যু এগিয়ে দেয়| বিনয়ের অবতার সেজে স্যার বার কয়েক সম্বোধন করে জানতে চায় চা আনবে কিনা? এর মানে সে পাত্তা পাচ্ছে| এর মধ্যে সে টাকা দেওয়ার ডেস্কে চলে যায়| মেসিয়ার লেজ দূরত্বে তার পেছনে পেছনে যায়| ও ভাবছে ৫ টাকা গেল! নিকট দূরত্বে মেসিয়ারকে না দেখে ও-র স্বস্তি লাগে| ওকে একটা ফোন দিতে হবে| 

—আপনি তো ১১টায় আসার কথা| ১২.২০ বাজে কখন আসবেন? 

—আমাদের একটা গাড়ি লেট হইছে| ১টার দিকে আসবে| তারপর আমি আসব| 

খাইরুল রাগ দেখায় না| শুধু বলে, ‘আচ্ছা ঠিক আছে|’

হাতে এক ঘণ্টার মতো সময়, কী করা যায়| এর মধ্যে অফিসে কিছু বলেনি| ১১.৩০-এর মধ্যে অফিসে না গেলে সেকশন বস ফোন করে| সে একটা এসএমএস লেখে: বস, সালাম| গতকাল থেকে পাতলা পায়খানা| ভেবেছিলাম অফিসে আসবো| সকালেও ৩/৪বার কলেরা হসপিটালে যাচ্ছি| দোয়া করবেন| মিথ্যা বলা মহা পাপ কিন্তু বসের সাথে আর বউয়ের সাথে যুধিষ্ঠির সাজতে গেলে সুন্নতে খৎনার অবস্থা!

খাইরুল এর মধ্যে ঠিক করে পার্কে যাবে| হাতিরঝিল, সোনারগাঁ হোটেল, কাওরান বাজার সংলগ্ন ব্যস্ত সড়কের পাশে পান্থকুঞ্জে গাছ গাছালি থাকলেও পার্কটাকে ল্যাংটা ল্যাংটা লাগে| একটু নির্জনতা না-থাকলে মুহূর্তগুলো ওম পায় না| পার্কে যাবার কী দরকার? সে পার্কের উত্তর অংশে যায়| এলাকাটা নোংরা, দুর্গন্ধময়, শব্দদূষণে বসাই দায়! ছিন্নমূল মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে| ৩/৪ বছর বয়সী ২টা বাচ্চা ঘুমিয়ে আছে| পাশেই ড্যান্ডির পলিথিন| অনেকের কাছে যা নেশা তাদের কাছে কম টাকায় পেট ভরার রসদ| ২৫/৩০ টাকায় ভরপেটের প্রবঞ্চনা| এক কাপ রং চায়ের দামও ১০ টাকা| কলাও ১৫ টাকা| চা কলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেতন বাড়ে? খাইরুল আয় বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু ব্যক্তিগত প্রকল্প নিয়েছে| আউটসোর্সিংয়ের চেষ্টায় অনলাইনে কয়েকটা কোর্স করেছে| এখনো নগদ টাকা পকেটে আসেনি| চারদিকে টাকা চাই আর চাই| যেন মানব দেহে শুধু একটাই অঙ্গ| যৌনাঙ্গ| একটাই কর্ম শুধু টাকা কামাও| কী কারণে? উত্তরটা সবাই জানে| কিন্তু কেউ বলে না| এক জীবনে কত টাকা দরকার? 

—খাইরুল দেখতে পায়, অশ্বত্থ গাছ| ব্যস্ত সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে| সে দেখে, কদম গাছ আর অশ্বত্থ গাছ পাশাপাশি| কদম গাছ তো আছে— কানু হারামজাদা কোথায়? খাইরুলকেই কানুর চরিত্রে সেট করলে হয়তো গল্পটার মোড় অন্য দিকে চলে যাবে|

কদমগাছ আর অশ্বত্থ গাছের নিচে ৫/৬ জন বসে বসে জ্যাম দেখছে| হর্ন সংগীতে অভ্যস্থ নাগরিক জীবন ভোঁতা| এর মধ্যে কানু হারামজাদা কে? আর গৌতমই বা কে? ব্যস্ত সড়কের পাশে ২/৩ বছরের একটা শিশু দৌড়ঝাঁপ করছে| যেকোনো সময় ভর্তা হয়ে যেতে যাবে|

খাইরুল দেখতে পায় একজন মহিলা শুয়ে আছে| বাচ্চাকে মাই দিচ্ছে| দৃষ্টিটা মহিলার খোলা বুকের দিকে যেতেই সরিয়ে নেয়ার আগে মহিলার মাই ছাড়িয়ে নেয়ার পলে খয়েরি চুপসানো বোঁটায় দৃষ্টিটা ধাক্কা খায়, জৌলুসহীন শুকনো খয়েরি বোঁটায় অরুচি ঠেকে|

ব্যস্ত সড়ক| কে তাকায় কার দিকে| অশ্বত্থ গাছের পাতা যেন অসংখ্য চোখ— এরকম কোনো চোখ গাছের নিচেই হয়তো গৌতম বুদ্ধের ধ্যান ছিল| দান ছিল| জ্ঞান ছিল| খাইরুল লাফিয়ে একটা পাতা ছিঁড়ে| পাতাটার দিকে তাকিয়ে থাকে| সুচালো অগ্র ভাগ| কী মনে করে ও পাতার একটা ছবি তুলে| বসে থাকে| ভাবে কুরিয়ারম্যানকে একটা ফোন দেবে কিনা| সে ভাবনা-ভাবান্তরে পার্কের ভেতরে যায়| কয়েকজন কিশোর ক্রিকেট খেলছে| এই এক ক্রিকেট কত খেলাকে যে হত্যা করল! হায়রে উপনিবেশ, ভয়াল দাঁতাল থাবা এখনো থামে না| এদেশের বাচ্চারা ৩ জন একসঙ্গে হলেই একটা নতুন খেলা উদ্ভাবন করে| কোথায় গেল সেই উদ্ভাবন? দেশ ছেড়ে পালাতে পারলেই মুক্তি! দেশপ্রেম? হাস্যকর একটা বিষয়| এর মধ্যে কিশোরদের খেলা শেষ, তারা সবকিছু গুটিয়ে যার যার নীড়ে চলে যাচ্ছে| অবশিষ্ট খাইরুল একটা গাছের নিচে পড়ে থাকে| কোথা থেকে একটা ৫০/৫৫ বছরের লোক এসে তার দিকে তাকিয়ে থাকে| সে তাকানোকে একটা পাত্তা দেয় না| লোকটা বারবার চোখের ইশারায় কী যেন বলছে— সে কি দালাল? তার পিছে পিছে যেতে ইশারা দেয়| বছর কয়েক আগে তার এক কলিগের ছিনতাই হয় পান্থকুঞ্জের উত্তর পাশে| দুজন মানুষ আসে, কী কথা বলতেই একটা ঠাপ্পড় মেরে হাতব্যাগটা নিয়ে সন্তের মতো নীরবে চলে যায়|

—এর মধ্যে ফোন আসে| খাইরুল বলে নাসির ট্রেড সেন্টারের সামনে থেকে পার্সেলটা সংগ্রহ করবে|

সে দ্রুত সেখানে যায়| সদ্য কলেজ শেষ করা গ্রাম থেকে আসা যুবকের কাছ থেকে পার্সেলটা সংগ্রহ করে|

—খাইরুল ১০০০ টাকা আর ১০০ টাকার একটা নোট দেয়| ছেলেটা অনিচ্ছুক অভিব্যক্তিতে ২০ টাকার একটা মলিন নোট খাইরুলকে ফেরত দেয়| আচ্ছা ঠিক আছে| 

সে মলিন নোটটা পকেটে পুরে পেছনের দিকে না-তাকিয়ে সোজা হাঁটতে থাকে| একটা বারের জন্যও পেছনে তাকায় না| পকেটে মলিন নোটটা তখন কোনো এক অশ্বত্থ পাতা মহামতি বুদ্ধের সংযোগ ছাড়া কেবলি একটি পাতা| 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬


একটা মলিন ২০ টাকার নোট

প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬

featured Image

সকালে ঘুম ভাঙার পর থুত্থুরে মনটাকে তাঁর একটা লাথি মারতে ইচ্ছা করে| রাত দুইটায় ঘুমিয়েছে— এই যে বৈকল্য, ঘাস ঘাস অনুভূতি; মাথার ভেতরে শব্দহীন ঝিঁঝিঁ, একটা আলস্য, একটা গরিবী হালত— তাকে হত্যা করতে হবে| হত্যা করে কী লাভ! সে তো অস্তিত্বেরই অংশ| তাকে কেবল বন্দী করা যায়| বন্দী বন্দী খেলায় গোটা পৃথিবীটাই বিরাট খাঁচা|স্বাধীনতার বিজ্ঞাপনে কেবল পাওয়া যায় আত্মপ্রবঞ্চনা| তাকে জপতে হয়| তার নাম কী— ক্ষমতা? কেউ কেউ রাজার বাড়ি খোঁজে? কেউ কেউ খাজার বাড়ি| গাজার স্বাধীনতা কত দূর? জনগণ নাক ডেকে ঘুমায়, বিড়ি ধরায়, ছাই ফেলে| এইসব ছাই মাখা সকাল-সন্ধ্যা, মধ্য রজনির ঘুম ভাঙা নিদানকাল আর সহ্য হয় না| ‘রাজায় কইছে চুদির ভাই আনন্দের সীমা নাই’| রাজা আর চুদির ভাইয়ের জমানায় দিবস-রজনি ঘিয়া হয়ে যায়, সাদা হয়ে যায়, ধূসর হয়ে যায়, রঙহীন ধানাইপানাই— গু যে হবে না, তার নিশ্চয়তা কী! তাঁর গতকাল একটা পার্সেল আসার কথা, ফোন দিয়েছিল| তার আগে মনে হলো মুঠোপ্রযুক্তির বন্দীখানা থেকে উড়াল দেয়া দরকার| আত্মার কয়েদালয়ে থেকে সময় বয়ে বয়ে উপযুক্ত অর্থ বা অন্য কিছুর বিনিময়ে নিজেকে বিকিকে দিতে হয়| এই বিক্রিবাট্টার হিসাব লেগে থাকে দমের প্রবাহে| দমের খেলায়— মুঠোপ্রযুক্তি বিরতি খাইরুলের জুম্মা পর্যন্ত চলবে|




নিমকহারামির একটা সীমা আছে| সে দিনরাত ডুবে থাকে নেটে, আবার পশ্চিমাদের সমালোচনা করে! ভাবনার কয়েক আস্তরজুড়ে পশ্চিমের ডলার, লাসভেগাস, আলোকবর্তিকার গুণগান, আমেরিকার ভিসা— সে-ই মনের অর্ধেকটায় আবার থুতনিতে এক থুকা দাড়ি ঝুলিয়ে খাইরুল রুম থেকে বের হয়| কী করবে? ঠিক বুঝতে পারে না| বেলা এগারটা হয়ে যায়, তাঁর নাস্তা খাওয়া হয়নি| বাহিরের খাবার আরেক বিপদ| রেস্টুরেন্টের খাবার সুস্বাদু হলেই বুঝতে হবে মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট (টেস্টিং সল্ট)| সেদিন খাইরুল রুটি খেতে খেতে দেখেছে রুটি বানানোর কারিগর পাছা চুলকাচ্ছে, তার পর আঙুলটা নাকের কাছে নিয়ে শুঁকছে, সম্ভবত মলের গন্ধ না-পেয়ে, পুনরায় কাজে নিবিষ্ট হয়| এই দৃশ্য দেখার পর খাইরুল রুটি খাবে নাকি খাবে না— একটা দ্বিধার মধ্যে ছিল| কী করবে? রুটিটা ফেলে দেবে—, রেস্টুরেন্ট পরিবর্তন করবে? এই রেস্টুরেন্টে খাবারের পর মেসিয়ারকে ৫/১০ টাকা দিতে হয় না| তাছাড়া পরোটাগুলো বড়| এর আগে খাবার দিতে দেরি করায় রেস্টুরেস্টটা বয়কট করেছে| বেশ কয়েক দিন আসেনি| পরে দেখল অন্য খাবারের দোকানগুলোতে আরও অনিয়ম| সে ওই দোকানগুলোতে খাবারও খেতে পারে না| এবার পাছা চুলকানোর যে দৃশ্য দেখল তার জন্য এখানে তো আর আসা যায় না| ভিডিও করতে পারলে রেস্টুরেন্ট মালিককে দেখানো যেত বা নেটে ছাড়া যেত| সে যদি রুটির কারিগরকে ২টা কৃমির ট্যাবলেট উপহার দেয়, তাঁর অপরাধ হবে?




এরকম ভাবনা উপভাবনায় মনে হলো ১২টা বেজে যায়| বাংলামটর ঢালে একটা মধ্যম মানের রেস্টুরেন্টে সে সিঙ্গারা অর্ডার দেয়| প্রথমে ২টা সিঙারা আসে| তার বিপরীত পাশে মাঝামাঝি বপুর এক ভোক্তা কাচের গ্লাসে রং চা পিনে, পান করে আরকি| একেবারে ক্লিন সেভ| মেসিয়াররা তাকে বেশ সমীহ করে, বোধ হয় নিয়মিত এই লোক এখানে আসে| খাইরুলকে মেসিয়াররা খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না|  ৩০ টাকার তিনটা সিঙ্গারা খেয়ে কতই আর বকশিশ দেবে| মোটা লোকটা চা পিনে বলল, বিল দাও—| ৮০ টাকা বিল হয়| ১০ টাকা মেসিয়ারকে আর ১০ টাকা গ্লাস বয়কে দিয়ে একটা জলহস্তির ছায়া এঁকে লোকটা চলে যায়| হায়রে টাকা, তোর জন্যই এত ভেলকি| জ্ঞান নাকি ক্ষমতা উৎপাদন করে| সেই উৎপাদিত জ্ঞান ক্ষমতাসীন হয়ে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে| আর কিছু বলাই নেই| ধরহীন মাথা লাফায়— কতক্ষণ? ৫/১০ মিনিট সময়টা আপাতত অনন্ত মনে হয়|




—খাইরুল, হোটেলে ঢোকার আগেই সিদ্ধান্ত নেয়| এক টাকাও বকশিশ দেবে না| সিঙ্গারা খাওয়ার সময় দেখল ময়দার অংশটা বেশ ঝুরঝুরে| ধরলেই ভেঙে যায়| মানে কী? এখানেও ক্যামিকেল| বেকিং সোডা| কিডনির অসুখের জন্য দায়ী| এটা স্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু ক্ষতিকর? খাইরুল ভাবে গুগল করতে হবে| ভাবতে থাকে সিঙ্গারাটা কী— খাবে নাকি খাবে না, খাবে, খাবে না, সে খায়| খাবার শেষে মেসিয়ার টিস্যু এগিয়ে দেয়| বিনয়ের অবতার সেজে স্যার বার কয়েক সম্বোধন করে জানতে চায় চা আনবে কিনা? এর মানে সে পাত্তা পাচ্ছে| এর মধ্যে সে টাকা দেওয়ার ডেস্কে চলে যায়| মেসিয়ার লেজ দূরত্বে তার পেছনে পেছনে যায়| ও ভাবছে ৫ টাকা গেল! নিকট দূরত্বে মেসিয়ারকে না দেখে ও-র স্বস্তি লাগে| ওকে একটা ফোন দিতে হবে| 


—আপনি তো ১১টায় আসার কথা| ১২.২০ বাজে কখন আসবেন? 


—আমাদের একটা গাড়ি লেট হইছে| ১টার দিকে আসবে| তারপর আমি আসব| 




খাইরুল রাগ দেখায় না| শুধু বলে, ‘আচ্ছা ঠিক আছে|’




হাতে এক ঘণ্টার মতো সময়, কী করা যায়| এর মধ্যে অফিসে কিছু বলেনি| ১১.৩০-এর মধ্যে অফিসে না গেলে সেকশন বস ফোন করে| সে একটা এসএমএস লেখে: বস, সালাম| গতকাল থেকে পাতলা পায়খানা| ভেবেছিলাম অফিসে আসবো| সকালেও ৩/৪বার কলেরা হসপিটালে যাচ্ছি| দোয়া করবেন| মিথ্যা বলা মহা পাপ কিন্তু বসের সাথে আর বউয়ের সাথে যুধিষ্ঠির সাজতে গেলে সুন্নতে খৎনার অবস্থা!




খাইরুল এর মধ্যে ঠিক করে পার্কে যাবে| হাতিরঝিল, সোনারগাঁ হোটেল, কাওরান বাজার সংলগ্ন ব্যস্ত সড়কের পাশে পান্থকুঞ্জে গাছ গাছালি থাকলেও পার্কটাকে ল্যাংটা ল্যাংটা লাগে| একটু নির্জনতা না-থাকলে মুহূর্তগুলো ওম পায় না| পার্কে যাবার কী দরকার? সে পার্কের উত্তর অংশে যায়| এলাকাটা নোংরা, দুর্গন্ধময়, শব্দদূষণে বসাই দায়! ছিন্নমূল মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে| ৩/৪ বছর বয়সী ২টা বাচ্চা ঘুমিয়ে আছে| পাশেই ড্যান্ডির পলিথিন| অনেকের কাছে যা নেশা তাদের কাছে কম টাকায় পেট ভরার রসদ| ২৫/৩০ টাকায় ভরপেটের প্রবঞ্চনা| এক কাপ রং চায়ের দামও ১০ টাকা| কলাও ১৫ টাকা| চা কলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেতন বাড়ে? খাইরুল আয় বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু ব্যক্তিগত প্রকল্প নিয়েছে| আউটসোর্সিংয়ের চেষ্টায় অনলাইনে কয়েকটা কোর্স করেছে| এখনো নগদ টাকা পকেটে আসেনি| চারদিকে টাকা চাই আর চাই| যেন মানব দেহে শুধু একটাই অঙ্গ| যৌনাঙ্গ| একটাই কর্ম শুধু টাকা কামাও| কী কারণে? উত্তরটা সবাই জানে| কিন্তু কেউ বলে না| এক জীবনে কত টাকা দরকার? 




—খাইরুল দেখতে পায়, অশ্বত্থ গাছ| ব্যস্ত সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে| সে দেখে, কদম গাছ আর অশ্বত্থ গাছ পাশাপাশি| কদম গাছ তো আছে— কানু হারামজাদা কোথায়? খাইরুলকেই কানুর চরিত্রে সেট করলে হয়তো গল্পটার মোড় অন্য দিকে চলে যাবে|




কদমগাছ আর অশ্বত্থ গাছের নিচে ৫/৬ জন বসে বসে জ্যাম দেখছে| হর্ন সংগীতে অভ্যস্থ নাগরিক জীবন ভোঁতা| এর মধ্যে কানু হারামজাদা কে? আর গৌতমই বা কে? ব্যস্ত সড়কের পাশে ২/৩ বছরের একটা শিশু দৌড়ঝাঁপ করছে| যেকোনো সময় ভর্তা হয়ে যেতে যাবে|




খাইরুল দেখতে পায় একজন মহিলা শুয়ে আছে| বাচ্চাকে মাই দিচ্ছে| দৃষ্টিটা মহিলার খোলা বুকের দিকে যেতেই সরিয়ে নেয়ার আগে মহিলার মাই ছাড়িয়ে নেয়ার পলে খয়েরি চুপসানো বোঁটায় দৃষ্টিটা ধাক্কা খায়, জৌলুসহীন শুকনো খয়েরি বোঁটায় অরুচি ঠেকে|




ব্যস্ত সড়ক| কে তাকায় কার দিকে| অশ্বত্থ গাছের পাতা যেন অসংখ্য চোখ— এরকম কোনো চোখ গাছের নিচেই হয়তো গৌতম বুদ্ধের ধ্যান ছিল| দান ছিল| জ্ঞান ছিল| খাইরুল লাফিয়ে একটা পাতা ছিঁড়ে| পাতাটার দিকে তাকিয়ে থাকে| সুচালো অগ্র ভাগ| কী মনে করে ও পাতার একটা ছবি তুলে| বসে থাকে| ভাবে কুরিয়ারম্যানকে একটা ফোন দেবে কিনা| সে ভাবনা-ভাবান্তরে পার্কের ভেতরে যায়| কয়েকজন কিশোর ক্রিকেট খেলছে| এই এক ক্রিকেট কত খেলাকে যে হত্যা করল! হায়রে উপনিবেশ, ভয়াল দাঁতাল থাবা এখনো থামে না| এদেশের বাচ্চারা ৩ জন একসঙ্গে হলেই একটা নতুন খেলা উদ্ভাবন করে| কোথায় গেল সেই উদ্ভাবন? দেশ ছেড়ে পালাতে পারলেই মুক্তি! দেশপ্রেম? হাস্যকর একটা বিষয়| এর মধ্যে কিশোরদের খেলা শেষ, তারা সবকিছু গুটিয়ে যার যার নীড়ে চলে যাচ্ছে| অবশিষ্ট খাইরুল একটা গাছের নিচে পড়ে থাকে| কোথা থেকে একটা ৫০/৫৫ বছরের লোক এসে তার দিকে তাকিয়ে থাকে| সে তাকানোকে একটা পাত্তা দেয় না| লোকটা বারবার চোখের ইশারায় কী যেন বলছে— সে কি দালাল? তার পিছে পিছে যেতে ইশারা দেয়| বছর কয়েক আগে তার এক কলিগের ছিনতাই হয় পান্থকুঞ্জের উত্তর পাশে| দুজন মানুষ আসে, কী কথা বলতেই একটা ঠাপ্পড় মেরে হাতব্যাগটা নিয়ে সন্তের মতো নীরবে চলে যায়|




—এর মধ্যে ফোন আসে| খাইরুল বলে নাসির ট্রেড সেন্টারের সামনে থেকে পার্সেলটা সংগ্রহ করবে|


সে দ্রুত সেখানে যায়| সদ্য কলেজ শেষ করা গ্রাম থেকে আসা যুবকের কাছ থেকে পার্সেলটা সংগ্রহ করে|


—খাইরুল ১০০০ টাকা আর ১০০ টাকার একটা নোট দেয়| ছেলেটা অনিচ্ছুক অভিব্যক্তিতে ২০ টাকার একটা মলিন নোট খাইরুলকে ফেরত দেয়| আচ্ছা ঠিক আছে| 




সে মলিন নোটটা পকেটে পুরে পেছনের দিকে না-তাকিয়ে সোজা হাঁটতে থাকে| একটা বারের জন্যও পেছনে তাকায় না| পকেটে মলিন নোটটা তখন কোনো এক অশ্বত্থ পাতা মহামতি বুদ্ধের সংযোগ ছাড়া কেবলি একটি পাতা| 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত