আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আকারের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। তবে এর একটি বড় অংশই চলে যাবে ঋণের সুদ পরিশোধে। প্রস্তাবিত বাজেটে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ মেটাতেই বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিগত বছরগুলোর পুঞ্জীভূত ঋণ ও ডলারের বাড়তি দামের কারণেই এবার সুদ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো জনকল্যাণমূলক খাতে কাঙ্খিত বরাদ্দ বাড়ানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
খসড়া
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগামী
১১ জুন জাতীয় সংসদে
পেশ হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত
জাতীয় বাজেট। এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে
প্রায় ৯ লাখ ৩০
হাজার থেকে ৯ লাখ
৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই
বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের
লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে প্রায়
৬ লাখ ৯৫ হাজার
কোটি টাকা। এবারের বাজেটে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন তথা ফ্যামিলি কার্ড,
কৃষক কার্ড এবং সামাজিক নিরাপত্তা
খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে এই জনকল্যাণমূলক
বরাদ্দের পাশাপাশি অনুৎপাদনশীল খাতের বড় দায় হয়ে
দাঁড়িয়েছে ঋণের কিস্তি। অর্থাৎ
আগের করা দেনা মেটাতে
হিমশিম খেতে হবে সরকারকে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ
মনসুর সংবাদকে বলেন, ‘এই ঋণ তো
বর্তমান সরকারের না। তাই বর্তমান
সরকারকে বলার কিছু নাই।
এটা আমাদের আগের কর্মের ফল।
আর এটা এখন বাদ
দেওয়ার সুযোগ নাই। অর্থাৎ যে
ঋণ নিয়েছি তা পরিশোধ করতেই
হবে। তবে সরকার এখানে
দক্ষতা দেখাতে পারে যে, এই
ঋণ পরিশোধ কতটা দক্ষতার সাথে
করবে সেটা। বাংলাদেশের সব জায়গায় তো
দুর্নীতি হচ্ছে। এই দুর্নীতি কমাতে
পারলে সব কিছুই সহজ
হয়ে যাবে। আর নতুন ঋণ
নেওয়ার ক্ষেত্রে দেখতে হবে এই ঋণ
কতটা প্রয়োজন।’
অর্থ
মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য
বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে,
বিগত বছরগুলোতে নেওয়া দেশি-বিদেশি ঋণের
মেয়াদ বা গ্রেস পিরিয়ড
শেষ হয়ে আসায় আগামী
অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ এক
কঠিন ঋণের ফাঁদে পড়তে
যাচ্ছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান সংকটকালে এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা
হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রমবর্ধমান এই ঋণের বোঝা।
জানা
গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং অতীতে নেওয়া
বড় বড় মেগা প্রকল্পের
ঋণ পরিশোধের সময় শুরু হওয়া
এর প্রধান কারণ। বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো উৎপাদনশীল খাতে
ভূমিকা না রেখে শুধু
সুদের পেছনে এত বিপুল অর্থ
চলে যাওয়া সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড়
ধাক্কা। ফলে এটিই এখন
আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় অনুৎপাদনশীল খাত
হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
জানা
গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের
আসন্ন বাজেটে শুধু ঋণের সুদ
পরিশোধ করতেই সরকারের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে
প্রায় ১ লাখ ২৭
হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
শতকরা হিসাবে মোট বাজেটের প্রায়
১৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে
১৩ দশমিক ৭ শতাংশ টাকাই
খরচ হবে কেবল সুদের
পেছনে। অর্থাৎ সরকার যদি ১০০ টাকা
ব্যয় করে, তার মধ্যে
প্রায় ১৩ টাকা ৭০
পয়সা চলে যাবে অতীতে
নেওয়া দেশি-বিদেশি ঋণের
সুদ গুণতে।
খসড়া
বাজেটের তথ্য অনুযায়ী, এই
বিশাল অঙ্কের সুদের সিংহভাগই যাবে অভ্যন্তরীণ বা
দেশীয় ঋণের পেছনে। এর
পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৮
হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে,
বিদেশি ঋণের সুদ মেটাতে
বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে আরও প্রায় ১৯
হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং অতীতে নেওয়া
বড় বড় মেগা প্রকল্পের
ঋণ পরিশোধের সময় শুরু হওয়া
এর প্রধান কারণ।
বাজেট
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো উৎপাদনশীল খাতে
ভূমিকা না রেখে শুধু
সুদের পেছনে এত বিপুল অর্থ
চলে যাওয়া সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড়
ধাক্কা। ফলে এটিই এখন
আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় অনুৎপাদনশীল খাত
হিসেবে মাথা চাড়া দিয়ে
উঠেছে।
আহসান
এইচ মনসুর বলেন, ‘ঋণ নেওয়া তো
দোষের কিছু নয়। কিন্তু
ঋণের টাকা আমি কোন
কাজে ব্যয় করছি সেটাই
আসল কথা। অর্থাৎ আমি
ঋণের টাকা যদি এমন
একটা খাতে ব্যয় করি
যেটাতে নতুন করে টাকা
আসবে না, তাহলে সেটা
দেশের জন্য খারাপ। আবার
যদি ঋণ নিয়ে এমন
কাজে সেটা ব্যয় হয়
যেটাতে হয় দেশের মানুষের
কল্যাণ হবে বা সেই
প্রকল্প থেকে অর্থ আসবে
তাহলে সেটা ভালো।’
বাংলাদেশ
ব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে দেখা
যায়, গত দুই বছরে
ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ৩০
শতাংশেরও বেশি অবমূল্যায়ন হয়েছে।
এর ফলে বিদেশি ঋণের
পরিমাণ ডলারে একই থাকলেও, দেশীয়
মুদ্রায় তা পরিশোধ করতে
সরকারকে অনেক বেশি টাকা
বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে।
কেন্দ্রীয়
ব্যাংকের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ‘একদিকে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের
শ্লথ গতি, অন্যদিকে বৈদেশিক
মুদ্রার রিজার্ভের ওপর এই বিশাল
ঋণ পরিশোধের চাপ দেশের সামগ্রিক
লেনদেনের ভারসাম্যকে আরও দুর্বল করে
দিতে পারে।’
রাজস্ব
আয়ের সিংহভাগ সুদের পেছনে চলে গেলেও দেশের
উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে
সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বড় রাখছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নতুন
অর্থবছরের জন্য এডিপির মোট
আকার ধরা হয়েছে প্রায়
৩ লাখ কোটি টাকা।
তবে এই উন্নয়ন বাজেট
বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও পরনির্ভরশীলতা কাটছে না। খসড়া রূপরেখা
অনুযায়ী, ৩ লাখ কোটি
টাকার মধ্যে ১ লাখ ৯০
হাজার কোটি টাকা সরকারের
নিজস্ব তহবিল থেকে সংস্থান করা
হলেও, বাকি ১ লাখ
১০ হাজার কোটি টাকা আসবে
বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান
থেকে।
অর্থনীতিবিদরা
বলছেন, উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ৩৭ শতাংশই বিদেশি
ঋণের ওপর নির্ভরশীল হওয়া
অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পরিকল্পনা কমিশনের সাময়িক মূল্যায়ন অনুযায়ী, অতীতে বিদেশি অর্থায়নে যেসব প্রকল্প নেওয়া
হয়েছে, সেগুলোর ধীরগতির কারণে প্রতি বছরই বিশাল অঙ্কের
অর্থ পাইপলাইনে আটকে থাকে। অথচ
প্রকল্প শেষ না হলেও
ঋণের সুদের ঘড়ি সচল হয়ে
যায়। ফলে নতুন করে
আবার ১ লাখ ১০
হাজার কোটি টাকার বিদেশি
ঋণ নেওয়ার এই লক্ষ্যমাত্রা দেশের
ঋণের বোঝাকে আরও দীর্ঘমেয়াদি করবে।
বেসরকারি
গবেষণা সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনুৎপাদনশীল
খাত ও ঋণের সুদ
মেটাতেই যদি বাজেটের সিংহভাগ
অর্থ চলে যায়, তবে
শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের
মতো সামাজিক খাতগুলো মারাত্মকভাবে বরাদ্দ বঞ্চিত হয়। করের টাকা
দিয়ে যেখানে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করার কথা,
সেখানে সেই টাকা চলে
যাচ্ছে বিগত দিনের ঋণের
দায় মেটাতে। এর ফলে সরকার
যে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের কথা বলছে, তা
বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনৈতিক
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, পুরনো
ঋণ শোধ করার জন্য
নতুন করে আবার ঋণ
নেওয়ার এই প্রবণতা দেশকে
একটি দুষ্টচক্র বা ঋণের ফাঁদের
দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই
পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য
মেগা প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরও সাশ্রয়ী হওয়া
এবং কম সুদের দীর্ঘমেয়াদি
ঋণ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া
উচিত। এছাড়া রাজস্ব আয় আশানুরূপ না
বাড়লে আগামী বছরগুলোতে শুধু সুদের পেছনেই
বাজেটের অর্ধেক টাকা চলে যাবে,
যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আকারের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। তবে এর একটি বড় অংশই চলে যাবে ঋণের সুদ পরিশোধে। প্রস্তাবিত বাজেটে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ মেটাতেই বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিগত বছরগুলোর পুঞ্জীভূত ঋণ ও ডলারের বাড়তি দামের কারণেই এবার সুদ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো জনকল্যাণমূলক খাতে কাঙ্খিত বরাদ্দ বাড়ানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
খসড়া
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগামী
১১ জুন জাতীয় সংসদে
পেশ হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত
জাতীয় বাজেট। এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে
প্রায় ৯ লাখ ৩০
হাজার থেকে ৯ লাখ
৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই
বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের
লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে প্রায়
৬ লাখ ৯৫ হাজার
কোটি টাকা। এবারের বাজেটে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন তথা ফ্যামিলি কার্ড,
কৃষক কার্ড এবং সামাজিক নিরাপত্তা
খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে এই জনকল্যাণমূলক
বরাদ্দের পাশাপাশি অনুৎপাদনশীল খাতের বড় দায় হয়ে
দাঁড়িয়েছে ঋণের কিস্তি। অর্থাৎ
আগের করা দেনা মেটাতে
হিমশিম খেতে হবে সরকারকে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ
মনসুর সংবাদকে বলেন, ‘এই ঋণ তো
বর্তমান সরকারের না। তাই বর্তমান
সরকারকে বলার কিছু নাই।
এটা আমাদের আগের কর্মের ফল।
আর এটা এখন বাদ
দেওয়ার সুযোগ নাই। অর্থাৎ যে
ঋণ নিয়েছি তা পরিশোধ করতেই
হবে। তবে সরকার এখানে
দক্ষতা দেখাতে পারে যে, এই
ঋণ পরিশোধ কতটা দক্ষতার সাথে
করবে সেটা। বাংলাদেশের সব জায়গায় তো
দুর্নীতি হচ্ছে। এই দুর্নীতি কমাতে
পারলে সব কিছুই সহজ
হয়ে যাবে। আর নতুন ঋণ
নেওয়ার ক্ষেত্রে দেখতে হবে এই ঋণ
কতটা প্রয়োজন।’
অর্থ
মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য
বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে,
বিগত বছরগুলোতে নেওয়া দেশি-বিদেশি ঋণের
মেয়াদ বা গ্রেস পিরিয়ড
শেষ হয়ে আসায় আগামী
অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ এক
কঠিন ঋণের ফাঁদে পড়তে
যাচ্ছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান সংকটকালে এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা
হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রমবর্ধমান এই ঋণের বোঝা।
জানা
গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং অতীতে নেওয়া
বড় বড় মেগা প্রকল্পের
ঋণ পরিশোধের সময় শুরু হওয়া
এর প্রধান কারণ। বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো উৎপাদনশীল খাতে
ভূমিকা না রেখে শুধু
সুদের পেছনে এত বিপুল অর্থ
চলে যাওয়া সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড়
ধাক্কা। ফলে এটিই এখন
আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় অনুৎপাদনশীল খাত
হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
জানা
গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের
আসন্ন বাজেটে শুধু ঋণের সুদ
পরিশোধ করতেই সরকারের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে
প্রায় ১ লাখ ২৭
হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
শতকরা হিসাবে মোট বাজেটের প্রায়
১৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে
১৩ দশমিক ৭ শতাংশ টাকাই
খরচ হবে কেবল সুদের
পেছনে। অর্থাৎ সরকার যদি ১০০ টাকা
ব্যয় করে, তার মধ্যে
প্রায় ১৩ টাকা ৭০
পয়সা চলে যাবে অতীতে
নেওয়া দেশি-বিদেশি ঋণের
সুদ গুণতে।
খসড়া
বাজেটের তথ্য অনুযায়ী, এই
বিশাল অঙ্কের সুদের সিংহভাগই যাবে অভ্যন্তরীণ বা
দেশীয় ঋণের পেছনে। এর
পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৮
হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে,
বিদেশি ঋণের সুদ মেটাতে
বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে আরও প্রায় ১৯
হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং অতীতে নেওয়া
বড় বড় মেগা প্রকল্পের
ঋণ পরিশোধের সময় শুরু হওয়া
এর প্রধান কারণ।
বাজেট
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো উৎপাদনশীল খাতে
ভূমিকা না রেখে শুধু
সুদের পেছনে এত বিপুল অর্থ
চলে যাওয়া সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড়
ধাক্কা। ফলে এটিই এখন
আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় অনুৎপাদনশীল খাত
হিসেবে মাথা চাড়া দিয়ে
উঠেছে।
আহসান
এইচ মনসুর বলেন, ‘ঋণ নেওয়া তো
দোষের কিছু নয়। কিন্তু
ঋণের টাকা আমি কোন
কাজে ব্যয় করছি সেটাই
আসল কথা। অর্থাৎ আমি
ঋণের টাকা যদি এমন
একটা খাতে ব্যয় করি
যেটাতে নতুন করে টাকা
আসবে না, তাহলে সেটা
দেশের জন্য খারাপ। আবার
যদি ঋণ নিয়ে এমন
কাজে সেটা ব্যয় হয়
যেটাতে হয় দেশের মানুষের
কল্যাণ হবে বা সেই
প্রকল্প থেকে অর্থ আসবে
তাহলে সেটা ভালো।’
বাংলাদেশ
ব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে দেখা
যায়, গত দুই বছরে
ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ৩০
শতাংশেরও বেশি অবমূল্যায়ন হয়েছে।
এর ফলে বিদেশি ঋণের
পরিমাণ ডলারে একই থাকলেও, দেশীয়
মুদ্রায় তা পরিশোধ করতে
সরকারকে অনেক বেশি টাকা
বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে।
কেন্দ্রীয়
ব্যাংকের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ‘একদিকে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের
শ্লথ গতি, অন্যদিকে বৈদেশিক
মুদ্রার রিজার্ভের ওপর এই বিশাল
ঋণ পরিশোধের চাপ দেশের সামগ্রিক
লেনদেনের ভারসাম্যকে আরও দুর্বল করে
দিতে পারে।’
রাজস্ব
আয়ের সিংহভাগ সুদের পেছনে চলে গেলেও দেশের
উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে
সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বড় রাখছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নতুন
অর্থবছরের জন্য এডিপির মোট
আকার ধরা হয়েছে প্রায়
৩ লাখ কোটি টাকা।
তবে এই উন্নয়ন বাজেট
বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও পরনির্ভরশীলতা কাটছে না। খসড়া রূপরেখা
অনুযায়ী, ৩ লাখ কোটি
টাকার মধ্যে ১ লাখ ৯০
হাজার কোটি টাকা সরকারের
নিজস্ব তহবিল থেকে সংস্থান করা
হলেও, বাকি ১ লাখ
১০ হাজার কোটি টাকা আসবে
বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান
থেকে।
অর্থনীতিবিদরা
বলছেন, উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ৩৭ শতাংশই বিদেশি
ঋণের ওপর নির্ভরশীল হওয়া
অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পরিকল্পনা কমিশনের সাময়িক মূল্যায়ন অনুযায়ী, অতীতে বিদেশি অর্থায়নে যেসব প্রকল্প নেওয়া
হয়েছে, সেগুলোর ধীরগতির কারণে প্রতি বছরই বিশাল অঙ্কের
অর্থ পাইপলাইনে আটকে থাকে। অথচ
প্রকল্প শেষ না হলেও
ঋণের সুদের ঘড়ি সচল হয়ে
যায়। ফলে নতুন করে
আবার ১ লাখ ১০
হাজার কোটি টাকার বিদেশি
ঋণ নেওয়ার এই লক্ষ্যমাত্রা দেশের
ঋণের বোঝাকে আরও দীর্ঘমেয়াদি করবে।
বেসরকারি
গবেষণা সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনুৎপাদনশীল
খাত ও ঋণের সুদ
মেটাতেই যদি বাজেটের সিংহভাগ
অর্থ চলে যায়, তবে
শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের
মতো সামাজিক খাতগুলো মারাত্মকভাবে বরাদ্দ বঞ্চিত হয়। করের টাকা
দিয়ে যেখানে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করার কথা,
সেখানে সেই টাকা চলে
যাচ্ছে বিগত দিনের ঋণের
দায় মেটাতে। এর ফলে সরকার
যে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের কথা বলছে, তা
বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনৈতিক
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, পুরনো
ঋণ শোধ করার জন্য
নতুন করে আবার ঋণ
নেওয়ার এই প্রবণতা দেশকে
একটি দুষ্টচক্র বা ঋণের ফাঁদের
দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই
পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য
মেগা প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরও সাশ্রয়ী হওয়া
এবং কম সুদের দীর্ঘমেয়াদি
ঋণ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া
উচিত। এছাড়া রাজস্ব আয় আশানুরূপ না
বাড়লে আগামী বছরগুলোতে শুধু সুদের পেছনেই
বাজেটের অর্ধেক টাকা চলে যাবে,
যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন