সংবাদ

বিয়ে নিয়ে জালিয়াতি, আড়ালে পাচারের চোরাবালি


বাকী বিল্লাহ
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ: ৭ জুন ২০২৬, ১১:৩৪ পিএম

বিয়ে নিয়ে জালিয়াতি, আড়ালে পাচারের চোরাবালি

  • ফেসবুকে পরিচয়, ভিডিও কলের মাধ্যমে বিদেশী নাগরিককে বিয়ে
  • বিদেশ পাচার, নিষিদ্ধ পল্লীতে বিক্রি, তদন্তে নামছে বিভিন্ন সংস্থা
  • দূতাবাসের মাধ্যমে বিদেশী নাগরিকের সম্পর্কে তথ্য জানা দরকার: অপরাধ বিশেষজ্ঞ
  • সিআইডি একটি গ্যাং গ্রুপ শনাক্ত করেছে, গ্রেপ্তারের চেষ্টা
  • রাজধানীর সাভারে একটি গ্রুপ সক্রিয়: গোয়েন্দা সংস্থা
  • পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ২ জন সাক্ষী থাকলে ভিডিও কলে বিয়ে করা যায়: কাজি হাসান
  • চকবাজারের তরুণীর পাকিস্তান যাত্রার নেপথ্যে করুণ আখ্যান

সোশ্যাল মিডিয়ার মায়াবী আলো আর বাস্তবতার নির্মম অন্ধকারের মাঝে লুকিয়ে থাকে কতশত গল্প। চট্টগ্রামের চকবাজারের এক ভাড়া বাসায় যে গল্পের শুরু, তার শেষ সীমানা হয়তো হতে পারত পাকিস্তানের শিয়ালকোটের কোনো এক ক্ষুদ্র মুদি দোকানদার যুবকের ভাঙা সংসার। কিন্তু তার আগেই সেই রঙিন স্বপ্নের গায়ে লেগে গেল জালিয়াতি আর মানব পাচারের এক অশুভ ছায়া। পঁচিশ বছর বয়সী এক বাংলাদেশী তরুণী, যার এখন নিজের বলতে কোনো ঘর নেই, ঢাকার মালিবাগে এক বান্ধবীর বাসায় দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়।

গোয়েন্দা কার্যালয়ের এসি রুমে বসে যখন তিনি তার জীবনের এই করুণ অধ্যায় বয়ান করছিলেন, তখন ঘরের বাতাসও যেন ভারী হয়ে উঠছিল। এটি কেবল একজন তরুণীর গল্প নয়, বরং প্রতিদিন প্রেমের নামে, বিয়ের নামে বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া শত শত নারীর এক জীবন্ত দলিল।

চকবাজার থেকে শরিয়তপুরের কাজি অফিস: নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ডাবল ফিতে বিয়ে

সবকিছুর শুরু হয়েছিল ফেসবুকে। চট্টগ্রামের চকবাজারের বাসিন্দা ওই তরুণীর পরিচয় হয় পাকিস্তানের শিয়ালকোটের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সঙ্গে। চ্যাটিং, ভিডিও কল আর দূর প্রবাসের এক টুকরো সমবেদনাব্যস, তাতেই মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন তরুণী। বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন তারা। কিন্তু ঢাকা বা চট্টগ্রামে নয়, অভিনব কায়দায় তাদের বিয়ের ভেন্যু ঠিক করা হয় শরিয়তপুরের এক প্রত্যন্ত কাজি অফিসে।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, কোনো প্রকার আইনী যাচাই-বাছাই ছাড়াই ডাবল ফি বিনিময়ে একাই সব ব্যবস্থা করে দেন সেই কাজি। সম্প্রতি ওই তরুণী যখন পাসপোর্ট, এনআইডিসহ সমস্ত কাগজপত্র তৈরি করে পাকিস্তান যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই বিষয়টি নজরে আসে একটি গোয়েন্দা সংস্থার। তদন্তে নামতেই বেরিয়ে আসে একের পর এক জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্য।

বিষয়ে শরিয়তপুরের অভিযুক্ত কাজি আবুল হাসানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে বলেন, “আমি এই ধরনের বহু বিয়ে ভিডিও কলের মাধ্যমে পড়াচ্ছি, এগুলো তো অহরহ হচ্ছে। বিয়ে আল্লাহর হুকুম। ছেলে মেয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক হলেই ভোটার আইডি কার্ড (এনআইডি) পাসপোর্ট সাইজ ছবি, সাক্ষী থাকলে কোনো অসুবিধা নেই। মেয়ের দুইজন সাক্ষী আর বিদেশ থেকে ছেলে তার দুইজন সাক্ষী থাকলে ভিডিও কলে বা অনলাইনে বিয়ে পড়ানো যায়। আর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সরকারি হিসাবে বিয়ে পড়ানোর ফি প্রতি লাখে ১৪শ টাকা দিতে হয়। এরপর কেউ খুশি হয়ে মহব্বত বা দোয়ার জন্য আরও ৫০০ টাকা দিলে সেটা ভিন্ন কথা। আমি দীর্ঘদিন ধরে এই বিয়ের কাজ করছি, প্রতিদিন ভিডিও কলে বিয়ে এখন আগের চেয়ে অনেক বাড়ছে।

তবে ওই কাজি গোয়েন্দা সংস্থার কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে কোনো আইনী বিধির সদুত্তর দিতে পারেননি, কেবল ডাবল ফি নিয়ে এই জালিয়াতির কাবিন করার কথা স্বীকার করেছেন।

আমি নির্ভয়ে পাকিস্তান যাব, এছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই

মালিবাগে গোয়েন্দা সংস্থার সিনিয়র কর্মকর্তার মুখোমুখি হয়ে নিজের অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করেন ওই তরুণী। তার চোখে জল, কিন্তু কণ্ঠে এক অদ্ভুত মরিয়া ভাব। তিনি কর্মকর্তাদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “আমার কোনো থাকার জায়গা নেই। নিজস্ব কোনো অভিভাবকও নেই। কোনো মতে খেয়ে-পরে দিন কাটছে। তেমন লেখাপড়াও নেই। কোনো উপায় না পেয়ে এখন আমাকে পাকিস্তানী স্বামীর বাসায় যেতে হচ্ছে। স্বামীর সঙ্গে মোবাইল ফোন ভিডিও কলের মাধ্যমে আমার নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। আমি নির্ভয়ে পাকিস্তান যাব। এই ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই।

তার এই একটি বাক্যই যেন দেশের সামাজিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক নগ্ন রূপ ফুটিয়ে তোলে। ওই তরুণী আরও জানান, তার মতো আরও অনেকেই এখন বিদেশী নাগরিক বিয়ে করে স্বেচ্ছায় বিদেশ চলে যাচ্ছে। কিন্তু তারা জানেন না, এই স্বেচ্ছায় যাওয়ার আড়ালে ওত পেতে আছে কোন ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ।

ভিডিও কলের বিয়ে: আবেগের আড়ালে মানব পাচারের নতুন ফাঁদ

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিডিও কলে বিদেশী নাগরিক বিয়ে করার এই প্রবণতা ইদানীং আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। অনেক নারী জেনেশুনে বা না বুঝে দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ছেন। এটি আসলে বিয়ের মোড়কে এক ধরনের আধুনিক মানব পাচার। যেহেতু তাদের পাসপোর্ট-ভিসাসহ সব কাগজপত্র আইনীভাবে বৈধ দেখায়, তাই বিমানবন্দের তাদের আটকানো কঠিন হয়ে পড়ে।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম শাখার সাবেক একজন কর্মকর্তা এই চক্রের ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, “এই দালাল চক্র বিয়ে ছাড়াও বিদেশে ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে নারীদের পাচার করছে। দুবাই, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে নিয়ে তাদের ওপর অমানুষিক যৌন নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এই ধরনের একটি আন্তর্জাতিক গ্যাং গ্রুপকে সিআইডির অনুসন্ধানী টিম ইতোমধ্যে চিহ্নিত করেছে। চক্রের মূল হোতাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে, তবে সে গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে দেশে না ফিরে অন্য দেশে পালিয়ে গেছে। এই চক্রে কিছু অসাধু চাইনিজ নাগরিকও জড়িত রয়েছে।

এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচার উপায় কী? জানতে চাইলে পুলিশের একজন অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, “বিয়ে নিয়ে জালিয়াতি করে বিদেশে নারী নিয়ে বিক্রি করা সরাসরি মানব পাচারের শামিল। এই সব বিয়ের কাগজপত্র ওই সব দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের মাধ্যমে কঠোরভাবে যাচাই করা উচিত। বিয়ে করা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু বিয়ে করে নিয়ে গিয়ে মেয়েটিকে বিক্রি করে দেওয়া হবে নাএই নিশ্চয়তা দরকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকে বিষয়টি অবহিত করা এবং বিদেশী যুবকের ছবি স্থায়ী ঠিকানা শতভাগ যাচাই করার পর ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স দেওয়া।

আইনী জটিলতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একজন অপরাধ বিষয়ক আইনজীবী বলেন, “ভিডিও কলের মাধ্যমে বিয়ের সময় দুই পক্ষের সশরীরে উপস্থিতি এবং আইনসম্মত সাক্ষী থাকতে হবে। কাবিননামার দস্তখত প্রমাণ করতে হবে। বিদেশে থাকা ব্যক্তির পক্ষে বাংলাদেশে যিনি আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) গ্রহণ করবেন, তাকে দস্তখত দিতে হবে। বিয়ে সম্পন্ন হলে কাবিননামা ম্যারেজ সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে আইনজীবীর মাধ্যমে যাবতীয় কাজ শেষ করতে হবে। কারণ, এগুলোর সঙ্গে বড় বড় দালাল চক্র জড়িত। মেয়েরা মূলত লোভে পড়ে বা আবেগের বশবর্তী হয়ে এই ভুলগুলো করে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে এই চক্রের বিরুদ্ধে মামলা কঠোর আইনী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

ইমিগ্রেশনের কঠোর নজরদারি: দৈনিক ২০-২৫ জন নারীকেঅফলোড

দেশের বিমানবন্দরগুলোর ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা গেছে, তীব্র বেকারত্ব এবং কারো অধীনে না থেকে নিজে কিছু করার তাগিদ থেকে অনেকেই ইন্টারনেটে বা ফেসবুকে বিদেশী ছেলেদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। ইমিগ্রেশনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নারীরা যখন পাসপোর্ট, ভিসা আর কাবিননামা নিয়ে হাজির হন, তখন তাদের সরাসরি বাধা দেওয়া আইনীভাবে কঠিন।

তারপরও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দিয়ে নারীদের ইন্টারভিউ নেন, তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শারীরিক ভাষা পর্যবেক্ষণ করেন এবং তারা কি সত্যিই সংসার করতে যাচ্ছেন নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যেতা উদঘাটনের চেষ্টা করেন। অনেক দেশে নারীর সংখ্যা কম থাকায়, সেই সব দেশের পুরুষেরা বাংলাদেশের দরিদ্র মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের ফুসলিয়ে বিয়ের নাটক সাজায়। বিমানবন্দরে প্রতিদিন এমন অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন নারীকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পরঅফলোড’ (বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা) করে নিরুৎসাহিত করা হয়। কারণ, নির্দিষ্ট দেশে গিয়ে এয়ারপোর্টে নামার পরপরই এই নারীরা দালাল চক্রের হাতে বন্দি হন।

বিউটি পার্লারের লোভ থেকে তামিলনাড়ুর সেফ হোম

কেবল বিয়ে নয়, চাকরির প্রলোভনও কীভাবে জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিচ্ছে, তার নজিরও মিলেছে গোয়েন্দা দপ্তরে। গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ঢাকার এক নারীকে বিউটি পার্লারে আকর্ষণীয় বেতনে চাকরি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। কিছুদিন আগে ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে উদ্ধার করে। বর্তমানে ওই নারী তামিলনাড়ুর একটি সেফ হোমে আটক রয়েছেন। ভারতের পুলিশ তার পরিচয় ঠিকানা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

এই ঘটনার পর বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন এবং সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশজুড়ে তদন্ত আরও জোরদার করেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করেন, এটি কেবল আইনী প্রক্রিয়ায় বন্ধ করা সম্ভব নয়। সামাজিক পারিবারিকভাবে ব্যাপক সচেতনতা না বাড়ালে বিদেশী নাগরিককে বিয়ের নামে এই পৈশাচিক প্রতারণা পাচার চক্রের বিস্তার কোনোভাবেই রোধ করা যাবে না। চকবাজারের ওই তরুণী হয়তো আজ রক্ষা পেয়েছেন, কিন্তু সচেতন না হলে আগামীকালের কোনো এক নতুন চকবাজারের মেয়ে হয়তো হারিয়ে যাবে কোনো এক অন্ধকার সেফ হোমে, যেখান থেকে আর কখনোই ফেরা হবে না।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬


বিয়ে নিয়ে জালিয়াতি, আড়ালে পাচারের চোরাবালি

প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬

featured Image

  • ফেসবুকে পরিচয়, ভিডিও কলের মাধ্যমে বিদেশী নাগরিককে বিয়ে
  • বিদেশ পাচার, নিষিদ্ধ পল্লীতে বিক্রি, তদন্তে নামছে বিভিন্ন সংস্থা
  • দূতাবাসের মাধ্যমে বিদেশী নাগরিকের সম্পর্কে তথ্য জানা দরকার: অপরাধ বিশেষজ্ঞ
  • সিআইডি একটি গ্যাং গ্রুপ শনাক্ত করেছে, গ্রেপ্তারের চেষ্টা
  • রাজধানীর সাভারে একটি গ্রুপ সক্রিয়: গোয়েন্দা সংস্থা
  • পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ২ জন সাক্ষী থাকলে ভিডিও কলে বিয়ে করা যায়: কাজি হাসান
  • চকবাজারের তরুণীর পাকিস্তান যাত্রার নেপথ্যে করুণ আখ্যান

সোশ্যাল মিডিয়ার মায়াবী আলো আর বাস্তবতার নির্মম অন্ধকারের মাঝে লুকিয়ে থাকে কতশত গল্প। চট্টগ্রামের চকবাজারের এক ভাড়া বাসায় যে গল্পের শুরু, তার শেষ সীমানা হয়তো হতে পারত পাকিস্তানের শিয়ালকোটের কোনো এক ক্ষুদ্র মুদি দোকানদার যুবকের ভাঙা সংসার। কিন্তু তার আগেই সেই রঙিন স্বপ্নের গায়ে লেগে গেল জালিয়াতি আর মানব পাচারের এক অশুভ ছায়া। পঁচিশ বছর বয়সী এক বাংলাদেশী তরুণী, যার এখন নিজের বলতে কোনো ঘর নেই, ঢাকার মালিবাগে এক বান্ধবীর বাসায় দিন কাটছে অনিশ্চয়তায়।

গোয়েন্দা কার্যালয়ের এসি রুমে বসে যখন তিনি তার জীবনের এই করুণ অধ্যায় বয়ান করছিলেন, তখন ঘরের বাতাসও যেন ভারী হয়ে উঠছিল। এটি কেবল একজন তরুণীর গল্প নয়, বরং প্রতিদিন প্রেমের নামে, বিয়ের নামে বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া শত শত নারীর এক জীবন্ত দলিল।

চকবাজার থেকে শরিয়তপুরের কাজি অফিস: নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ডাবল ফিতে বিয়ে

সবকিছুর শুরু হয়েছিল ফেসবুকে। চট্টগ্রামের চকবাজারের বাসিন্দা ওই তরুণীর পরিচয় হয় পাকিস্তানের শিয়ালকোটের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সঙ্গে। চ্যাটিং, ভিডিও কল আর দূর প্রবাসের এক টুকরো সমবেদনাব্যস, তাতেই মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন তরুণী। বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন তারা। কিন্তু ঢাকা বা চট্টগ্রামে নয়, অভিনব কায়দায় তাদের বিয়ের ভেন্যু ঠিক করা হয় শরিয়তপুরের এক প্রত্যন্ত কাজি অফিসে।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, কোনো প্রকার আইনী যাচাই-বাছাই ছাড়াই ডাবল ফি বিনিময়ে একাই সব ব্যবস্থা করে দেন সেই কাজি। সম্প্রতি ওই তরুণী যখন পাসপোর্ট, এনআইডিসহ সমস্ত কাগজপত্র তৈরি করে পাকিস্তান যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই বিষয়টি নজরে আসে একটি গোয়েন্দা সংস্থার। তদন্তে নামতেই বেরিয়ে আসে একের পর এক জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্য।

বিষয়ে শরিয়তপুরের অভিযুক্ত কাজি আবুল হাসানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে বলেন, “আমি এই ধরনের বহু বিয়ে ভিডিও কলের মাধ্যমে পড়াচ্ছি, এগুলো তো অহরহ হচ্ছে। বিয়ে আল্লাহর হুকুম। ছেলে মেয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক হলেই ভোটার আইডি কার্ড (এনআইডি) পাসপোর্ট সাইজ ছবি, সাক্ষী থাকলে কোনো অসুবিধা নেই। মেয়ের দুইজন সাক্ষী আর বিদেশ থেকে ছেলে তার দুইজন সাক্ষী থাকলে ভিডিও কলে বা অনলাইনে বিয়ে পড়ানো যায়। আর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সরকারি হিসাবে বিয়ে পড়ানোর ফি প্রতি লাখে ১৪শ টাকা দিতে হয়। এরপর কেউ খুশি হয়ে মহব্বত বা দোয়ার জন্য আরও ৫০০ টাকা দিলে সেটা ভিন্ন কথা। আমি দীর্ঘদিন ধরে এই বিয়ের কাজ করছি, প্রতিদিন ভিডিও কলে বিয়ে এখন আগের চেয়ে অনেক বাড়ছে।

তবে ওই কাজি গোয়েন্দা সংস্থার কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে কোনো আইনী বিধির সদুত্তর দিতে পারেননি, কেবল ডাবল ফি নিয়ে এই জালিয়াতির কাবিন করার কথা স্বীকার করেছেন।

আমি নির্ভয়ে পাকিস্তান যাব, এছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই

মালিবাগে গোয়েন্দা সংস্থার সিনিয়র কর্মকর্তার মুখোমুখি হয়ে নিজের অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করেন ওই তরুণী। তার চোখে জল, কিন্তু কণ্ঠে এক অদ্ভুত মরিয়া ভাব। তিনি কর্মকর্তাদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “আমার কোনো থাকার জায়গা নেই। নিজস্ব কোনো অভিভাবকও নেই। কোনো মতে খেয়ে-পরে দিন কাটছে। তেমন লেখাপড়াও নেই। কোনো উপায় না পেয়ে এখন আমাকে পাকিস্তানী স্বামীর বাসায় যেতে হচ্ছে। স্বামীর সঙ্গে মোবাইল ফোন ভিডিও কলের মাধ্যমে আমার নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। আমি নির্ভয়ে পাকিস্তান যাব। এই ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই।

তার এই একটি বাক্যই যেন দেশের সামাজিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক নগ্ন রূপ ফুটিয়ে তোলে। ওই তরুণী আরও জানান, তার মতো আরও অনেকেই এখন বিদেশী নাগরিক বিয়ে করে স্বেচ্ছায় বিদেশ চলে যাচ্ছে। কিন্তু তারা জানেন না, এই স্বেচ্ছায় যাওয়ার আড়ালে ওত পেতে আছে কোন ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ।

ভিডিও কলের বিয়ে: আবেগের আড়ালে মানব পাচারের নতুন ফাঁদ

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিডিও কলে বিদেশী নাগরিক বিয়ে করার এই প্রবণতা ইদানীং আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। অনেক নারী জেনেশুনে বা না বুঝে দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ছেন। এটি আসলে বিয়ের মোড়কে এক ধরনের আধুনিক মানব পাচার। যেহেতু তাদের পাসপোর্ট-ভিসাসহ সব কাগজপত্র আইনীভাবে বৈধ দেখায়, তাই বিমানবন্দের তাদের আটকানো কঠিন হয়ে পড়ে।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম শাখার সাবেক একজন কর্মকর্তা এই চক্রের ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, “এই দালাল চক্র বিয়ে ছাড়াও বিদেশে ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে নারীদের পাচার করছে। দুবাই, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে নিয়ে তাদের ওপর অমানুষিক যৌন নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এই ধরনের একটি আন্তর্জাতিক গ্যাং গ্রুপকে সিআইডির অনুসন্ধানী টিম ইতোমধ্যে চিহ্নিত করেছে। চক্রের মূল হোতাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে, তবে সে গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে দেশে না ফিরে অন্য দেশে পালিয়ে গেছে। এই চক্রে কিছু অসাধু চাইনিজ নাগরিকও জড়িত রয়েছে।

এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচার উপায় কী? জানতে চাইলে পুলিশের একজন অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, “বিয়ে নিয়ে জালিয়াতি করে বিদেশে নারী নিয়ে বিক্রি করা সরাসরি মানব পাচারের শামিল। এই সব বিয়ের কাগজপত্র ওই সব দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের মাধ্যমে কঠোরভাবে যাচাই করা উচিত। বিয়ে করা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু বিয়ে করে নিয়ে গিয়ে মেয়েটিকে বিক্রি করে দেওয়া হবে নাএই নিশ্চয়তা দরকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকে বিষয়টি অবহিত করা এবং বিদেশী যুবকের ছবি স্থায়ী ঠিকানা শতভাগ যাচাই করার পর ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স দেওয়া।

আইনী জটিলতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একজন অপরাধ বিষয়ক আইনজীবী বলেন, “ভিডিও কলের মাধ্যমে বিয়ের সময় দুই পক্ষের সশরীরে উপস্থিতি এবং আইনসম্মত সাক্ষী থাকতে হবে। কাবিননামার দস্তখত প্রমাণ করতে হবে। বিদেশে থাকা ব্যক্তির পক্ষে বাংলাদেশে যিনি আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) গ্রহণ করবেন, তাকে দস্তখত দিতে হবে। বিয়ে সম্পন্ন হলে কাবিননামা ম্যারেজ সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে আইনজীবীর মাধ্যমে যাবতীয় কাজ শেষ করতে হবে। কারণ, এগুলোর সঙ্গে বড় বড় দালাল চক্র জড়িত। মেয়েরা মূলত লোভে পড়ে বা আবেগের বশবর্তী হয়ে এই ভুলগুলো করে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে এই চক্রের বিরুদ্ধে মামলা কঠোর আইনী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

ইমিগ্রেশনের কঠোর নজরদারি: দৈনিক ২০-২৫ জন নারীকেঅফলোড

দেশের বিমানবন্দরগুলোর ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা গেছে, তীব্র বেকারত্ব এবং কারো অধীনে না থেকে নিজে কিছু করার তাগিদ থেকে অনেকেই ইন্টারনেটে বা ফেসবুকে বিদেশী ছেলেদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। ইমিগ্রেশনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নারীরা যখন পাসপোর্ট, ভিসা আর কাবিননামা নিয়ে হাজির হন, তখন তাদের সরাসরি বাধা দেওয়া আইনীভাবে কঠিন।

তারপরও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দিয়ে নারীদের ইন্টারভিউ নেন, তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শারীরিক ভাষা পর্যবেক্ষণ করেন এবং তারা কি সত্যিই সংসার করতে যাচ্ছেন নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যেতা উদঘাটনের চেষ্টা করেন। অনেক দেশে নারীর সংখ্যা কম থাকায়, সেই সব দেশের পুরুষেরা বাংলাদেশের দরিদ্র মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের ফুসলিয়ে বিয়ের নাটক সাজায়। বিমানবন্দরে প্রতিদিন এমন অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন নারীকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পরঅফলোড’ (বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা) করে নিরুৎসাহিত করা হয়। কারণ, নির্দিষ্ট দেশে গিয়ে এয়ারপোর্টে নামার পরপরই এই নারীরা দালাল চক্রের হাতে বন্দি হন।

বিউটি পার্লারের লোভ থেকে তামিলনাড়ুর সেফ হোম

কেবল বিয়ে নয়, চাকরির প্রলোভনও কীভাবে জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিচ্ছে, তার নজিরও মিলেছে গোয়েন্দা দপ্তরে। গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ঢাকার এক নারীকে বিউটি পার্লারে আকর্ষণীয় বেতনে চাকরি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। কিছুদিন আগে ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে উদ্ধার করে। বর্তমানে ওই নারী তামিলনাড়ুর একটি সেফ হোমে আটক রয়েছেন। ভারতের পুলিশ তার পরিচয় ঠিকানা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

এই ঘটনার পর বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন এবং সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশজুড়ে তদন্ত আরও জোরদার করেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করেন, এটি কেবল আইনী প্রক্রিয়ায় বন্ধ করা সম্ভব নয়। সামাজিক পারিবারিকভাবে ব্যাপক সচেতনতা না বাড়ালে বিদেশী নাগরিককে বিয়ের নামে এই পৈশাচিক প্রতারণা পাচার চক্রের বিস্তার কোনোভাবেই রোধ করা যাবে না। চকবাজারের ওই তরুণী হয়তো আজ রক্ষা পেয়েছেন, কিন্তু সচেতন না হলে আগামীকালের কোনো এক নতুন চকবাজারের মেয়ে হয়তো হারিয়ে যাবে কোনো এক অন্ধকার সেফ হোমে, যেখান থেকে আর কখনোই ফেরা হবে না।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত