আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট। দেশের অর্থনীতির বর্তমান নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও মূল্যস্ফীতির চাপ মাথায় রেখে বাজেটে সাধারণ মানুষের স্বস্তিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বাজেটের বড় একটি অংশ বরাদ্দ থাকছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আওতা বাড়ানোর জন্য। মূলত সংকটের সময়েও মানুষের পাশে দাঁড়াতে ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করতেই এবারের বাজেটে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গরা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল ব্যয় নির্বাহের জন্য মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। করের জাল বাড়িয়ে এবং নতুন করদাতা তৈরির মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে অর্থনৈতিক এই টানাপোড়েনের মধ্যেও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমন এবং নির্বাচনী ইশতেহারের শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে এবার নজিরবিহীন বরাদ্দ ও নতুন কর্মসূচির চমক রাখা হচ্ছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং অর্থ বিভাগের বাজেট শাখা সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে আসন্ন বাজেটে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে যাচ্ছে ৪টি মেগা ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি। এই বিশেষ প্রকল্পগুলো হলো ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, দেশব্যাপী নিবিড়ভাবে খাল খনন এবং ব্যাপকভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কর্মসূচিগুলোর মূল লক্ষ্য হলো সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা করে প্রান্তিক মানুষের হাতে নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া।
এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সংবাদকে বলেন, ‘সরকার সামাজিক সুরক্ষা খাতে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদি সেগুলো নেওয়া ঠিকই আছে। তবে এখানে যেটা করতে হবে, এসব সুবিধা করা পাচ্ছে সেটা ভালোভাবে মনিটর করতে হবে। আমরা এর আগেও দেখেছি, যারা পাওয়ার কথা তারা পায় না। আবার যারা পাওয়ার কথা নয় তারা পাচ্ছে। এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ বাস্তবায়নে বেশি নজর দেওয়া উচিত সরকারকে।’
বর্তমানে যেসব সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু আছে সেগুলো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশে প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০টা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু আছে। সরকারের উচিত হবে, এই কর্মসূচিগুলো থেকে বাজেট টেনে নতুন কর্মসূচি যেমন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদিতে বরাদ্দ দেওয়া। আর খুব বেশি কর্মসূচি থেকে লাভ হয় না। পাঁচ, ছয়টা কর্মসূচি থাকলেই যথেষ্ট। ১৫০ থেকে ১৬০টা কর্মসূচি কমিয়ে আনতে হবে।’
সবচেয়ে বড় এবং ব্যয়বহুল কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আগামী অর্থবছরে দেশের নারীপ্রধান ৪১ লাখ পরিবারকে এই ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। কার্ডধারী প্রতিটি পরিবার প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা পাবে। সরকারি কোষাগার থেকে এই অর্থ সরাসরি সুবিধাভোগীর মোবাইল ব্যাংকিং বা ওয়ালেট অ্যাকাউন্টে ‘জিটুপি’ বা গভর্নমেন্ট টু পারসন পদ্ধতিতে জমা হবে। শুধু এই একটি খাতেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার ১২ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেছে।
কৃষি ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় বড় চমক হিসেবে আসছে নতুন ‘কৃষক কার্ড’। এই কার্ডের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের একটি সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। এই কার্ডধারীরা সরকারি সার, বীজ ও কীটনাশক ক্রয়ে সরাসরি ভর্তুকি পাবেন। একই সাথে মাত্র ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ ও জামানতবিহীন মেয়াদি ঋণ সুবিধা পাবেন। এটা গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের গতি আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাকি দুটি কর্মসূচি তথা দেশব্যাপী খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ প্রকল্পকে মূলত গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে দেখছে সরকার। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান উইং সূত্রে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং বর্ষায় জলাবদ্ধতা দূর করতে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে খাল খনন কর্মসূচি চালু হবে। এতে ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ বা ‘কাজের বিনিময়ে টাকা’র আদলে লাখ লাখ বেকার যুবকের সাময়িক কর্মসংস্থান হবে। ঠিক একইভাবে বনায়ন ও পরিবেশ সুরক্ষায় সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় দরিদ্র মানুষকে লভ্যাংশের অংশীদার করে বৃক্ষরোপণ প্রকল্প সাজানো হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট উইংয়ের খসড়া তথ্যানুযায়ী, এই নতুন ৪টি কার্ড ও কর্মসূচির বাইরেও সরকারের নিয়মিত অন্যান্য ভাতাও বড় পরিসরে বাড়ানো হচ্ছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা এবং অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতাসহ মোট ১৮টি প্রধান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের উপকারভোগীর সংখ্যা ২ কোটি ৬০ লাখ থেকে একলাফে বাড়িয়ে ৩ কোটি ৬৩ লাখে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ওএমএস এবং টিসিবির খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির বরাদ্দও আসন্ন বাজেটে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ছে। এই সামগ্রিক কল্যাণমূলক কার্যক্রমের জন্য নতুন বাজেটে শুধু সরাসরি ভাতার অংশেই বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৩৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। সব খাত ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনসহ সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মোট বরাদ্দ এবার ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে যা মোট বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশের কাছাকাছি।
তবে এই নজিরবিহীন বরাদ্দ ও বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে সঠিক ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও প্রকৃত লক্ষ্য নির্ধারণ নিয়ে বড় ধরনের সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির সাম্প্রতিক এক গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের মূল্যায়নে দেখা গেছে, এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রধান অন্তরায় হলো প্রকৃত উপকারভোগী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের স্বচ্ছতার অভাব ও রাজনৈতিক প্রভাব। সিপিডির প্রাথমিক জরিপ অনুযায়ী, সরকারের বর্তমান সামাজিক সুবিধার তালিকায় এখনও প্রায় ১৮ শতাংশ এমন মানুষ রয়ে গেছেন যারা প্রকৃতপক্ষে এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একদিকে যোগ্য ব্যক্তিরা বাদ পড়ছেন, অন্যদিকে অযোগ্য মানুষের এই বড় অংশটি তালিকায় থেকে যাওয়া সরকারের লক্ষ্য নির্ধারণের দক্ষতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। নতুন ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণে যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহার না করে, তবে এই বিশাল বরাদ্দের বড় অংশ অপচয় হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এছাড়া কর ফাঁকি রোধ করে যদি কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ করা না যায়, তবে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে এই ধরনের বিশাল অনুৎপাদনশীল ব্যয় সংস্থান করা সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বাজেটে ভালো কিছু থাকবে বলে আশ^াস দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বাজেটে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছে নি¤œ আয়ের মানুষ। তাই আমরা বাজেটে প্রথমেই দরিদ্র, নি¤œ আয়ের জনগোষ্ঠী এবং গৃহিণীদের অগ্রাধিকার দিয়েছি। বর্তমান সরকারের জন্য স্বল্প সময়ে বাজেট প্রণয়ন একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিগত দুটি সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার কাজ করছে।’
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় সরাসরি উপকারভোগীদের অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করা হবে এবং এ প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ থাকবে না। কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ চালুর মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কামার, কুমার, তাঁতি, ক্ষুদ্র কারুশিল্পী, থিয়েটারকর্মী ও সাংস্কৃতিককর্মীদের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত করতে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, ঋণ প্রদান, ডিজাইন সহায়তা, ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণে সহযোগিতা দেওয়া হবে।’

রোববার, ০৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট। দেশের অর্থনীতির বর্তমান নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও মূল্যস্ফীতির চাপ মাথায় রেখে বাজেটে সাধারণ মানুষের স্বস্তিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বাজেটের বড় একটি অংশ বরাদ্দ থাকছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আওতা বাড়ানোর জন্য। মূলত সংকটের সময়েও মানুষের পাশে দাঁড়াতে ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করতেই এবারের বাজেটে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গরা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল ব্যয় নির্বাহের জন্য মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। করের জাল বাড়িয়ে এবং নতুন করদাতা তৈরির মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে অর্থনৈতিক এই টানাপোড়েনের মধ্যেও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমন এবং নির্বাচনী ইশতেহারের শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে এবার নজিরবিহীন বরাদ্দ ও নতুন কর্মসূচির চমক রাখা হচ্ছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং অর্থ বিভাগের বাজেট শাখা সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে আসন্ন বাজেটে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে যাচ্ছে ৪টি মেগা ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি। এই বিশেষ প্রকল্পগুলো হলো ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, দেশব্যাপী নিবিড়ভাবে খাল খনন এবং ব্যাপকভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কর্মসূচিগুলোর মূল লক্ষ্য হলো সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা করে প্রান্তিক মানুষের হাতে নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া।
এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সংবাদকে বলেন, ‘সরকার সামাজিক সুরক্ষা খাতে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদি সেগুলো নেওয়া ঠিকই আছে। তবে এখানে যেটা করতে হবে, এসব সুবিধা করা পাচ্ছে সেটা ভালোভাবে মনিটর করতে হবে। আমরা এর আগেও দেখেছি, যারা পাওয়ার কথা তারা পায় না। আবার যারা পাওয়ার কথা নয় তারা পাচ্ছে। এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ বাস্তবায়নে বেশি নজর দেওয়া উচিত সরকারকে।’
বর্তমানে যেসব সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু আছে সেগুলো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশে প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০টা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু আছে। সরকারের উচিত হবে, এই কর্মসূচিগুলো থেকে বাজেট টেনে নতুন কর্মসূচি যেমন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ইত্যাদিতে বরাদ্দ দেওয়া। আর খুব বেশি কর্মসূচি থেকে লাভ হয় না। পাঁচ, ছয়টা কর্মসূচি থাকলেই যথেষ্ট। ১৫০ থেকে ১৬০টা কর্মসূচি কমিয়ে আনতে হবে।’
সবচেয়ে বড় এবং ব্যয়বহুল কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আগামী অর্থবছরে দেশের নারীপ্রধান ৪১ লাখ পরিবারকে এই ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। কার্ডধারী প্রতিটি পরিবার প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা পাবে। সরকারি কোষাগার থেকে এই অর্থ সরাসরি সুবিধাভোগীর মোবাইল ব্যাংকিং বা ওয়ালেট অ্যাকাউন্টে ‘জিটুপি’ বা গভর্নমেন্ট টু পারসন পদ্ধতিতে জমা হবে। শুধু এই একটি খাতেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার ১২ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেছে।
কৃষি ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় বড় চমক হিসেবে আসছে নতুন ‘কৃষক কার্ড’। এই কার্ডের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের একটি সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। এই কার্ডধারীরা সরকারি সার, বীজ ও কীটনাশক ক্রয়ে সরাসরি ভর্তুকি পাবেন। একই সাথে মাত্র ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ ও জামানতবিহীন মেয়াদি ঋণ সুবিধা পাবেন। এটা গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধরনের গতি আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাকি দুটি কর্মসূচি তথা দেশব্যাপী খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ প্রকল্পকে মূলত গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে দেখছে সরকার। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান উইং সূত্রে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং বর্ষায় জলাবদ্ধতা দূর করতে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে খাল খনন কর্মসূচি চালু হবে। এতে ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ বা ‘কাজের বিনিময়ে টাকা’র আদলে লাখ লাখ বেকার যুবকের সাময়িক কর্মসংস্থান হবে। ঠিক একইভাবে বনায়ন ও পরিবেশ সুরক্ষায় সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় দরিদ্র মানুষকে লভ্যাংশের অংশীদার করে বৃক্ষরোপণ প্রকল্প সাজানো হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট উইংয়ের খসড়া তথ্যানুযায়ী, এই নতুন ৪টি কার্ড ও কর্মসূচির বাইরেও সরকারের নিয়মিত অন্যান্য ভাতাও বড় পরিসরে বাড়ানো হচ্ছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা এবং অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতাসহ মোট ১৮টি প্রধান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের উপকারভোগীর সংখ্যা ২ কোটি ৬০ লাখ থেকে একলাফে বাড়িয়ে ৩ কোটি ৬৩ লাখে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ওএমএস এবং টিসিবির খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির বরাদ্দও আসন্ন বাজেটে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ছে। এই সামগ্রিক কল্যাণমূলক কার্যক্রমের জন্য নতুন বাজেটে শুধু সরাসরি ভাতার অংশেই বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৩৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। সব খাত ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনসহ সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মোট বরাদ্দ এবার ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে যা মোট বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশের কাছাকাছি।
তবে এই নজিরবিহীন বরাদ্দ ও বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে সঠিক ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও প্রকৃত লক্ষ্য নির্ধারণ নিয়ে বড় ধরনের সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির সাম্প্রতিক এক গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের মূল্যায়নে দেখা গেছে, এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রধান অন্তরায় হলো প্রকৃত উপকারভোগী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের স্বচ্ছতার অভাব ও রাজনৈতিক প্রভাব। সিপিডির প্রাথমিক জরিপ অনুযায়ী, সরকারের বর্তমান সামাজিক সুবিধার তালিকায় এখনও প্রায় ১৮ শতাংশ এমন মানুষ রয়ে গেছেন যারা প্রকৃতপক্ষে এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একদিকে যোগ্য ব্যক্তিরা বাদ পড়ছেন, অন্যদিকে অযোগ্য মানুষের এই বড় অংশটি তালিকায় থেকে যাওয়া সরকারের লক্ষ্য নির্ধারণের দক্ষতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। নতুন ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণে যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে ডিজিটাল ডাটাবেজ ব্যবহার না করে, তবে এই বিশাল বরাদ্দের বড় অংশ অপচয় হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এছাড়া কর ফাঁকি রোধ করে যদি কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ করা না যায়, তবে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে এই ধরনের বিশাল অনুৎপাদনশীল ব্যয় সংস্থান করা সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বাজেটে ভালো কিছু থাকবে বলে আশ^াস দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বাজেটে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছে নি¤œ আয়ের মানুষ। তাই আমরা বাজেটে প্রথমেই দরিদ্র, নি¤œ আয়ের জনগোষ্ঠী এবং গৃহিণীদের অগ্রাধিকার দিয়েছি। বর্তমান সরকারের জন্য স্বল্প সময়ে বাজেট প্রণয়ন একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিগত দুটি সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার কাজ করছে।’
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় সরাসরি উপকারভোগীদের অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করা হবে এবং এ প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ থাকবে না। কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ চালুর মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কামার, কুমার, তাঁতি, ক্ষুদ্র কারুশিল্পী, থিয়েটারকর্মী ও সাংস্কৃতিককর্মীদের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত করতে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, ঋণ প্রদান, ডিজাইন সহায়তা, ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণে সহযোগিতা দেওয়া হবে।’

আপনার মতামত লিখুন