দেশের অর্থনীতির নানা চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিক মন্দাভাবের মধ্যেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার যে উচ্চাভিলাষী জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তা অর্জন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না হয়তো। এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এডিবি ও বিশ্ব ব্যাংকসহ প্রধান উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোও বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বের অর্থনীতির দ্রুত উন্নতি নিয়ে আশাবাদী হতে পারছে না। তাই সরকারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ও এসব সংস্থার প্রাক্কলনের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়
সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত
জাতীয় বাজেট। এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৯
লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। সামষ্টিক অর্থনীতির নানা সূচকের অস্থিরতার মধ্যেই সরকার আগামী
বছরের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের এক বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে।
এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ
পরিস্থিতি বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা আইএমএফ আভাস দিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি হবে না। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা এবং কেন্দ্রীয়
ব্যাংকের সংকোচনমূলক নীতির কারণে সুদের হার চড়া থাকায় প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর থাকবে বলেই
সংস্থাটির আশঙ্কা।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক
(এডিবি) ২০২৭ সালের জন্য বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে
বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগে ধীরগতির প্রভাব
প্রবৃদ্ধিকে ধীর গতি করে দিবে।
এছাড়া বিশ্বব্যাংক
তাদের চলতি বছর জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘গ্লোবাল ইকোনোমিক প্রসপ্যাক্টস’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হবে বলে প্রাক্কলন করেছিল। একই
প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল
সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের ধারণা,
এ সময়ে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে আসবে, ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও ভোগব্যয় বাড়বে। একই
সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরলে ব্যবসায়িক আস্থা
বৃদ্ধি পাবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আসবে। রপ্তানিমুখী শিল্প ও উৎপাদন খাতের কার্যক্রম
সম্প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিবাচক প্রভাবও দৃশ্যমান
হতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদরা
ধারনা করছেন, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জিডিপি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ১
শতাংশ হয়তো হবে না, কিছুদিন পর বিশ্বব্যাংক তাদের প্রাক্কলন কমিয়ে দিবে। অর্থাৎ সেটি
৪ এর ঘরেই থাকবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান
সিপিডি মনে করছে, গত অর্থবছরের অনেক রাজস্ব ও প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় ২০২৬-২৭
অর্থবছরের জন্য বাস্তবসম্মত ও তথ্যনির্ভর জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা জরুরি।
অতিরিক্ত আশাবাদী লক্ষ্য নির্ধারণ না করে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য স্থির করা উচিত।
বাজেটে সরকারের
জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সংবাদকে বলেন, ‘এই অবস্থায় এই লক্ষ্যমাত্রাকে আমরা উচ্চাভিলাসীই
বলবো। এখন সরকার যদি মনে করে যে, আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক আছে, তাহলে সরকার তা বাস্তবায়ন
করে দেখাক। বাজেট বাস্তবায়ন খুব শক্তিশালী না হলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।’
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা
কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক
বাস্তবতায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য “অত্যন্ত আশাবাদী”। মূল্যস্ফীতি এখনও
৯ শতাংশের ওপরে, বিনিয়োগ দুর্বল, আর সংস্কারের গতি সীমিত। এই পরিস্থিতিতে এত দ্রুত
প্রবৃদ্ধি বাড়ানো কঠিন হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ
কিছুদিন ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ঋণের
সুদের হার এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে গেছে। সুদের হার চড়া থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ
বা ক্রেডিট ফ্লো বেশ কমে গেছে, যা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে
শিল্পোদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতি সরাসরি জিডিপির প্রবৃদ্ধিকে
সংকুচিত করছে। ফলে প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতার মধ্যে প্রায় ২ শতাংশের যে
বিশাল ফারাক রয়েছে, তা বাজেটের অন্যান্য খাতকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে ধারণা
করছেন অর্থনীতিবিদরা। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, সরকার বিনিয়োগ বাড়ানোর
কিছু নতুন উদ্যোগ নেওয়ায় এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
খসড়া বাজেট প্রস্তাব
বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রেও বাজেট
প্রণয়নকারীদের প্রাক্কলন ও বাজারের প্রকৃত চিত্রের মধ্যে বড় অমিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশের
মধ্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। কিন্তু দেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ডলারের বাড়তি মূল্যের কারণে আমদানি খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এটি
বাজারে সরবরাহ চেইনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘমেয়াদে উসকে
দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতি
৮ শতাংশের নিচে নামানো কঠিন হবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।
বাজেটের সবচেয়ে
বড় উচ্চভিলাসী লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সামগ্রিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যা দেশের শিল্পায়নের
মূল চালিকাশক্তি। পরিকল্পনা কমিশনের খসড়া রূপরেখায় দেখা গেছে, আগামী অর্থবছরে মোট বিনিয়োগের
লক্ষ্য ধরা হচ্ছে জিডিপির ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশ। এর মধ্যে বেসরকারি খাত থেকে ২৪ দশমিক
৯০ শতাংশ এবং সরকারি খাত থেকে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করছে সরকার।
তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান
ব্যুরোর (বিবিএস) চূড়ান্ত হিসাবে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে মোট বিনিয়োগের হার জিডিপির
মাত্র ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশে নেমে এসেছে। গত কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি বিনিয়োগ এক জায়গায়
স্থবির হয়ে আছে এবং নতুন কোনো বড় শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না। এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে
বিনিয়োগের হার এক লাফে ৩১ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাওয়া কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে নীতিপ্রণেতাদের
মধ্যেই মতভেদ রয়েছে।
বিনিয়োগের এই লক্ষ্যমাত্রাকে
সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের নি¤œমুখী হার। বাংলাদেশ ব্যাংকের
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার জিডিপির মাত্র ২১ দশমিক
৯৮ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার
ব্যয় মেটাতে নাভিশ্বাস উঠছে। এর ফলে তাদের সঞ্চয় করার ক্ষমতাই কমে যাচ্ছে। যেখানে দেশের
মানুষের সঞ্চয় কমে যাচ্ছে, সেখানে বিপুল পরিমাণ অভ্যন্তরীণ পুঁজি গঠন অসম্ভব। সঞ্চয়
ও বিনিয়োগের এই বিশাল ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বাজেটের খসড়ায়
নেই। ফলে বিদেশী বিনিয়োগের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে, যা বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে
বেশ কঠিন।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ
সংগঠনগুলোর নেতারাও এই লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, গ্যাস
ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন অর্ধেক কমে গেছে। এর ওপর যদি
ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত ঋণ না পাওয়া যায় এবং সুদের হার বেশি থাকে, তবে বেসরকারি খাতের
বিকাশ সম্পূর্ণ থমকে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর, কারণ বেসরকারি
খাত সচল না হলে প্রতি বছর শ্রমবাজারে আসা লাখ লাখ তরুণের জন্য নতুন চাকরি তৈরি করা
সম্ভব হবে না। ফলে বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য আরও তীব্র হওয়ার
আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে
অর্থনীতিবিদরা সর্তক বলছেন, শুধু কাগজের কলমে বড় লক্ষ্যমাত্রা ধরলেই সামষ্টিক অর্থনীতি
সচল হয় না। বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ না করলে রাজস্ব আদায়, কর্মসংস্থান ও বার্ষিক
উন্নয়ন কর্মসূচির পুরো পরিকল্পনাই বছরের মাঝামাঝি গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে। তাই আসন্ন
বাজেটে বড় অঙ্কের সংখ্যা দেখানোর চেয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা, ডলারের
বাজার স্বাভাবিক করা এবং বেসরকারি খাতের আস্থা ফেরানোর দিকেই সরকারের বেশি নজর দেওয়া
উচিত।

সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬
দেশের অর্থনীতির নানা চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিক মন্দাভাবের মধ্যেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার যে উচ্চাভিলাষী জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তা অর্জন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না হয়তো। এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এডিবি ও বিশ্ব ব্যাংকসহ প্রধান উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোও বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বের অর্থনীতির দ্রুত উন্নতি নিয়ে আশাবাদী হতে পারছে না। তাই সরকারের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ও এসব সংস্থার প্রাক্কলনের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়
সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত
জাতীয় বাজেট। এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৯
লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। সামষ্টিক অর্থনীতির নানা সূচকের অস্থিরতার মধ্যেই সরকার আগামী
বছরের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের এক বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে।
এই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ
পরিস্থিতি বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা আইএমএফ আভাস দিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি হবে না। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা এবং কেন্দ্রীয়
ব্যাংকের সংকোচনমূলক নীতির কারণে সুদের হার চড়া থাকায় প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর থাকবে বলেই
সংস্থাটির আশঙ্কা।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক
(এডিবি) ২০২৭ সালের জন্য বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে
বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগে ধীরগতির প্রভাব
প্রবৃদ্ধিকে ধীর গতি করে দিবে।
এছাড়া বিশ্বব্যাংক
তাদের চলতি বছর জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘গ্লোবাল ইকোনোমিক প্রসপ্যাক্টস’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হবে বলে প্রাক্কলন করেছিল। একই
প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল
সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকের ধারণা,
এ সময়ে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে আসবে, ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও ভোগব্যয় বাড়বে। একই
সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরলে ব্যবসায়িক আস্থা
বৃদ্ধি পাবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আসবে। রপ্তানিমুখী শিল্প ও উৎপাদন খাতের কার্যক্রম
সম্প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিবাচক প্রভাবও দৃশ্যমান
হতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদরা
ধারনা করছেন, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জিডিপি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ১
শতাংশ হয়তো হবে না, কিছুদিন পর বিশ্বব্যাংক তাদের প্রাক্কলন কমিয়ে দিবে। অর্থাৎ সেটি
৪ এর ঘরেই থাকবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান
সিপিডি মনে করছে, গত অর্থবছরের অনেক রাজস্ব ও প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় ২০২৬-২৭
অর্থবছরের জন্য বাস্তবসম্মত ও তথ্যনির্ভর জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা জরুরি।
অতিরিক্ত আশাবাদী লক্ষ্য নির্ধারণ না করে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য স্থির করা উচিত।
বাজেটে সরকারের
জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সংবাদকে বলেন, ‘এই অবস্থায় এই লক্ষ্যমাত্রাকে আমরা উচ্চাভিলাসীই
বলবো। এখন সরকার যদি মনে করে যে, আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক আছে, তাহলে সরকার তা বাস্তবায়ন
করে দেখাক। বাজেট বাস্তবায়ন খুব শক্তিশালী না হলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।’
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা
কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক
বাস্তবতায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য “অত্যন্ত আশাবাদী”। মূল্যস্ফীতি এখনও
৯ শতাংশের ওপরে, বিনিয়োগ দুর্বল, আর সংস্কারের গতি সীমিত। এই পরিস্থিতিতে এত দ্রুত
প্রবৃদ্ধি বাড়ানো কঠিন হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ
কিছুদিন ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এর ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ঋণের
সুদের হার এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে গেছে। সুদের হার চড়া থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ
বা ক্রেডিট ফ্লো বেশ কমে গেছে, যা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে
শিল্পোদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতি সরাসরি জিডিপির প্রবৃদ্ধিকে
সংকুচিত করছে। ফলে প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তবতার মধ্যে প্রায় ২ শতাংশের যে
বিশাল ফারাক রয়েছে, তা বাজেটের অন্যান্য খাতকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে ধারণা
করছেন অর্থনীতিবিদরা। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, সরকার বিনিয়োগ বাড়ানোর
কিছু নতুন উদ্যোগ নেওয়ায় এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
খসড়া বাজেট প্রস্তাব
বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রেও বাজেট
প্রণয়নকারীদের প্রাক্কলন ও বাজারের প্রকৃত চিত্রের মধ্যে বড় অমিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশের
মধ্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। কিন্তু দেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ডলারের বাড়তি মূল্যের কারণে আমদানি খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এটি
বাজারে সরবরাহ চেইনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘমেয়াদে উসকে
দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতি
৮ শতাংশের নিচে নামানো কঠিন হবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।
বাজেটের সবচেয়ে
বড় উচ্চভিলাসী লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সামগ্রিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যা দেশের শিল্পায়নের
মূল চালিকাশক্তি। পরিকল্পনা কমিশনের খসড়া রূপরেখায় দেখা গেছে, আগামী অর্থবছরে মোট বিনিয়োগের
লক্ষ্য ধরা হচ্ছে জিডিপির ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশ। এর মধ্যে বেসরকারি খাত থেকে ২৪ দশমিক
৯০ শতাংশ এবং সরকারি খাত থেকে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করছে সরকার।
তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান
ব্যুরোর (বিবিএস) চূড়ান্ত হিসাবে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে মোট বিনিয়োগের হার জিডিপির
মাত্র ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশে নেমে এসেছে। গত কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি বিনিয়োগ এক জায়গায়
স্থবির হয়ে আছে এবং নতুন কোনো বড় শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে না। এই পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে
বিনিয়োগের হার এক লাফে ৩১ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাওয়া কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে নীতিপ্রণেতাদের
মধ্যেই মতভেদ রয়েছে।
বিনিয়োগের এই লক্ষ্যমাত্রাকে
সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের নি¤œমুখী হার। বাংলাদেশ ব্যাংকের
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার জিডিপির মাত্র ২১ দশমিক
৯৮ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার
ব্যয় মেটাতে নাভিশ্বাস উঠছে। এর ফলে তাদের সঞ্চয় করার ক্ষমতাই কমে যাচ্ছে। যেখানে দেশের
মানুষের সঞ্চয় কমে যাচ্ছে, সেখানে বিপুল পরিমাণ অভ্যন্তরীণ পুঁজি গঠন অসম্ভব। সঞ্চয়
ও বিনিয়োগের এই বিশাল ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বাজেটের খসড়ায়
নেই। ফলে বিদেশী বিনিয়োগের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে, যা বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে
বেশ কঠিন।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ
সংগঠনগুলোর নেতারাও এই লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, গ্যাস
ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন অর্ধেক কমে গেছে। এর ওপর যদি
ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত ঋণ না পাওয়া যায় এবং সুদের হার বেশি থাকে, তবে বেসরকারি খাতের
বিকাশ সম্পূর্ণ থমকে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর, কারণ বেসরকারি
খাত সচল না হলে প্রতি বছর শ্রমবাজারে আসা লাখ লাখ তরুণের জন্য নতুন চাকরি তৈরি করা
সম্ভব হবে না। ফলে বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য আরও তীব্র হওয়ার
আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে
অর্থনীতিবিদরা সর্তক বলছেন, শুধু কাগজের কলমে বড় লক্ষ্যমাত্রা ধরলেই সামষ্টিক অর্থনীতি
সচল হয় না। বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ না করলে রাজস্ব আদায়, কর্মসংস্থান ও বার্ষিক
উন্নয়ন কর্মসূচির পুরো পরিকল্পনাই বছরের মাঝামাঝি গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে। তাই আসন্ন
বাজেটে বড় অঙ্কের সংখ্যা দেখানোর চেয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা, ডলারের
বাজার স্বাভাবিক করা এবং বেসরকারি খাতের আস্থা ফেরানোর দিকেই সরকারের বেশি নজর দেওয়া
উচিত।

আপনার মতামত লিখুন