সংবাদ

৭৬ বছরে সংবাদ / প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা ২০২৬

সংবাদপত্র, সমাজ ও ‘সংবাদ’


মফিদুল হক
মফিদুল হক
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:২১ এএম

সংবাদপত্র, সমাজ ও ‘সংবাদ’
শিল্পী : মনিরুল ইসলাম

১৯৪৭ সালে ভাগ-বাটোয়ারা ও আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে ভারতে বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটে এবং পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগ করে বাটোয়ারার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় পাকিস্তান নামক এক অভিনব রাষ্ট্র| ভৌগোলিক বিচারে রাষ্ট্রের থাকতে হয় সুনির্দিষ্ট সীমানা-চিহ্নিত একটি ভূখণ্ড| পাকিস্তানেরও ছিল তেমন সীমানা-ঘেরা অঞ্চল, তবে তা’ একটি নয়, ছিল দুটি এবং পরস্পরের মধ্যে ব্যবধান হাজার মাইলেরও বেশি| এমন রাষ্ট্র বিশ্বে যে ছিল না, তা’ নয়| তবে সেসব ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র| নিজ ভূখণ্ড ও সীমানা পেরিয়ে দূরের ভূমি দখল করে যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল প্রভু দেশ, সেখানে কোনো রাখঢাক ছিল না| এমনকি এই কর্তৃত্বপরায়ণতার কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না| ফ্রান্স তাদের দখলকৃত আলজেরিয়াকে আলাদা দেশ হিসেবে গণ্য করেনি, আখ্যায়িত করেছিল ফ্রান্সের সাগর-পেরুনো অঞ্চল বা ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে| আফ্রিকা মহাদেশকে যখন ইউরোপীয় শক্তিসমূহ নিজেদের মধ্যে বাটোয়ারা করে নিল তখন বেলজিয়ান কঙ্গোকে রাজা লিওপোন্ড তাঁর খাস জমি হিসেবে ঘোষণা করলেন, সেখানে ঔপনিবেশিক বেলজিয়াম রাজ্যের কর্তৃত্ব নয়, বলবৎ হয়েছিল রাজা লিওপোন্ডের ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব| ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে যে পাকিস্তানের জন্ম দিয়েছিল বৃটিশ শাসকেরা সেটা স্থির হয়েছিল নেতাদের নিয়ে টেবিলে বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে| কখনো কোনো জনমত যাচাইয়ের চেষ্টা নেয়া হয়নি, মানুষের চাহিদা নিরূপণের প্রয়াস ছিল না সেখানে| এহেন রাষ্ট্র পাকিস্তান দ্রুতই পরিণত হলো ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে, নামত দেশ একটি, কার্যত পূর্বাঞ্চল পশ্চিমের ওভারসিজ টেরিটরি|

যাই হোক, দেশ ভাগের ফল হিসেবে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়ে যাত্রা শুরু করে, নিজ ভাগ্য বাংলার মানুষেরা নিজেরা পরিচালনা করবে এমনই ছিল প্রত্যাশা| প্রত্যাশা-ভঙ্গ হতে অবশ্য বিলম্ব হয়নি, তবে নিজ দেশ পাকিস্তান রক্ষার বাসনা ছিল প্রবল এবং জনমানসে সেটার ছিল প্রাধান্য| এমন এক যাত্রা শুরু থেকে যাত্রাভঙ্গ ঘটতে তেইশ বছরের অনন্য অভিযাত্রা প্রয়োজন হয়েছিল এবং জাতীয় এই পালাবদলে অনেকের অনেক অবদান অনেক ঘটনার উল্লেখ আমরা করতে পারি, সঙ্গতভাবেই যা করা হয়| তবে এখানে গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্রের ভূমিকা নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয় না, যা ইতিহাস-উপলব্ধির জন্য দরকারি| সংবাদপত্রের এই ভূমিকা আলোচনায় দুটি পত্রিকার অবদান বিশ্লেষণ দাবি করে, এর একটি ‘ইত্তেফাক’ এবং অপরটি ‘সংবাদ’| দুইয়ের ছিল দুই পথ, লক্ষ্য ছিল একই এবং উভয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা পালন করেছে| জাতি হিসেবে আমরা এইস্বীকৃতি না দিলেও পাকিস্তানি সামরিক শাসকেরা সেটা ভালোই বুঝেছিলেন এবং একাত্তরের গণহত্যাভিযানের সূচনায়, যথেচ্ছ হত্যা গোলাগুলি অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি সুনির্দিষ্টভাবে কতক আক্রমণ পরিচালনা করেছিল তারা যার কোনো সামরিক গুরুত্ব ছিল না, ছিল চেতনাগত তাৎপর্য| এই কারণে একাত্তরের পঁচিশে মার্চের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে দাউ দাউ পুড়ে গেল দুই প্রধান বাংলা ˆদনিক ‘সংবাদ’ ও ‘ইত্তেফাক’|

‘সংবাদ’ পত্রিকা হিসেবে যাত্রা শুরু করে ১৯৫১ সালে, পাকিস্তানের প্রতি প্রত্যাশার বিপুলতা নিয়ে| বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন পূর্ববাংলায় যে ভাবগত পরিবর্তন বয়ে এনেছিল তার রাজসাক্ষী হতে পারে ‘সংবাদ’, কেননা ভাষা আন্দোলন ‘সংবাদের’ নবজন্ম ঘটায়, বাঙালিত্বের চেতনা ও সাম্যের আদর্শের সম্মিলনে রূপান্তর ঘটে ‘সংবাদের’ এবং নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে ‘সংবাদ’| সাম্যবাদীরা যে জাতীয় অধিকারের প্রবক্তা হয়ে উঠতে পারে তার প্রকাশকারী হয়ে উঠলো ‘সংবাদ’, যদিও রাজনৈতিকভাবে এমনটা ঘটতে অনেক বিলম্ব ঘটেছিল এবং টালমাটাল দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঘটেছিল সেই মহামিলন| সেই অর্থে ‘সংবাদ’ পালন করেছে যুগস্রষ্টার ভূমিকা, সংবাদপত্রের নৈতিকতা ও আদর্শ অনুসরণ করে ও রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র না হয়ে| এর অনুষঙ্গ হিসেবে ‘সংবাদ’ জাতীয়তাবাদের গণ্ডি প্রসারিত করে আলিঙ্গন করে আন্তর্জাতিকতাবাদ| বিগত শতকের ষাটের দশকে দেশে দেশে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের যে বিকাশ তা পূর্ববাংলার জনচিত্তে গেঁথে দিতে ‘সংবাদ’-এর ভূমিকা ছিল প্রধান| মনে পড়ে ১৯৬১ সালে সদ্য-স্বাধীন কঙ্গোর জাতীয়তাবাদী নেতা প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুবুম্বা হত্যার পরপর ঢাকার তরুণ কবিসমাজের পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয় অনবদ্য সংকলন ‘আফ্রিকার হৃদয়ে সূর্যোদয়’| ষাটের দশকের সাহিত্যচর্চার গতিধারা অনুধাবনে এই ছোট্ট ঘটনার গুরুত্ব রয়েছে, তবে এমন আকুতির প্রকাশ সম্ভব হয়েছিল ‘সংবাদ’-এর নেপথ্য ভূমিকার জন্য| ‘সংবাদ’-এর মাধ্যমেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে নবীন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে| ‘সংবাদ’-এর মাধ্যমেই আলজেরিয়ার মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে পরিচিতি নিবিড় হয় তরুণ সমাজের| জামিলা বুপাশার নাম এখন বিস্মৃত হলেও মুক্তিসেনানী সেই নারী তখন হয়ে উঠেছিলেন জননন্দিত| ভিয়েতনাম যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন আমেরিকা-ইউরোপজুড়ে যে ঢেউ তুলেছিল তার স্পন্দন পূর্ববাংলায় বয়ে আনার ক্ষেত্রেও ‘সংবাদ’-এর ছিল অগ্রণী ভূমিকা, বিশেষভাবে এখানে স্মরণ করতে হয় বার্তাকক্ষের ভূমিকা ও অবদান| ওয়াশিংটনে প্রতিবাদী তরুণেরা অবরোধ করে পেন্টাগন, প্রতিবাদী নারী ˆসনিকের মেশিনগানের নলে গুঁজে দেয় গাঁদা ফুল| ঢাকার রাজপথে ছাত্রদের প্রতিবাদী মিছিলে শোভা পায় ব্যানার: মেশিনগানের সামনে গাই জুঁই ফুলের গান| আন্তর্জাতিকতার এই বোধের পাশাপাশি স্বদেশ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ নিবিড় করতেও ‘সংবাদ’ নানাভাবে অবদান রাখে|

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ‘সংবাদ’ সামাজিকভাবে যে-ভূমিকা পালন করেছিল তা জাতিকে পৌঁছে দিয়েছিল মুক্তির দ্বারপ্রান্তে| সহযোগী ছিল ‘ইত্তেফাক’, যে প্রসঙ্গ পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে, সংবাদপত্রের যে ভূমিকার ছিল নানা মাত্রা| এখানে উল্লেখ করা যায় ‘সংবাদ’-এর ‘খেলাঘর’ পাতা এবং ‘ইত্তেফাকে’র ‘কচি-কাঁচার আসর’-এর কথা| উভয়ের শিশু-কিশোর সংগঠন দেশব্যাপী অর্জন করেছিল বিস্তৃতি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম বিকাশে বিশাল অবদান রেখেছিল| কতভাবেই না কত নবীন-নবীনার অন্তর ছুঁয়ে গেছে পত্রিকায় সপ্তাহান্তে প্রকাশিত বিশেষ পাতা, কত সাহিত্য-অভিলাষীর ভীরু পদচারণা শুরু হয়েছিল এমন আয়োজন ঘিরে, সেসবের পরিমাপ করাও মুশকিল| খেলাঘরের পাতা সম্পাদনা করতেন ‘ভাইয়া’, যে-নামের অন্তরালে ছিলেন শিশু-সাহিত্যিক হাবীবুর রহমান| স্বাধীনতার পর দীর্ঘকাল এই দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন বজলুর রহমান| ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে স্মরণ করতে পারি ‘খেলাঘর’ পাতার প্রতি গড়ে ওঠা ভালোবাসা ও সমীহ| বিদ্যালয়ে তৃতীয় কি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র হিসেবে একবার চিঠি লিখেছিলাম ভাইয়ার কাছে, আমার নিজের বিশ্রি হাতের লেখায়| কাউকে না জানিয়ে তা ডাকযোগে পাঠিয়েছিলাম ২৬৩ বংশালের ঠিকানায়| সপ্তাহকাল পর দেখা গেল স্নেহবাণী বর্ষিত করে ‘ভাইয়া’ ব্লক করে হাতে লেখা চিঠি হুবহু ছেপে দিয়েছেন তাঁর পাতায়| পত্রিকা বাসায় এলে সেটা দেখে আমার লজ্জা ও ক্রোধের সীমা-পরিসীমা ছিল না| লজ্জা আমার খারাপ হাতের লেখার বার্তা এখন ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে সে কারণে| ক্রোধ ‘ভাইয়া’ কেন ব্যক্তিগত চিঠি এমনভাবে ফাঁস করে দিলেন| এখন অবশ্য ভেবে আনন্দ অনুভব করি, কেননা সেটাই যে আমার প্রথম প্রকাশিত লেখা| সংবাদের পাতায় তার যে-প্রকাশ ঘটেছিল সেটা গর্বের বিষয়ও বটে| পাশাপাশি ‘সংবাদ’-এর সঙ্গে পূর্ববাংলার জায়মান সাহিত্যব্রতীদের নিবিড় সম্পৃক্তি গড়ে ওঠে সাহিত্য পাতার সুবাদে| এর ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তনময়তার পূর্বাপর বিশ্লেষণ আমাদের চারপাশের জগৎ ও সমাজের রূপান্তরের ছবি মেলে ধরতে পারে| রণেশ দাশগুপ্তের সম্পাদনা স্পর্শে কত তরুণের রচনা যে মানসম্মত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যপাতায় সে-ও তো ইতিহাসের আকড়| স্বাধীনতার পর ‘সংবাদ’ কর্তৃপক্ষ সাপ্তাহিক চার পৃষ্ঠার সাহিত্যপাতা প্রকাশের দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিলে তা বাস্তবায়নে অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন আবুল হাসনাত| এই প্রয়াস অন্যদের করেছিল অনুপ্রাণিত ও অনুকরণযোগ্য| ‘সংবাদ’ এই পরম্পরা রক্ষা করে এখন সাহিত্যপাতা নবরূপ ধারণ করছে, সেটাও লক্ষণীয়|

‘সংবাদ’ ˆদনিক হিসেবে সাংবাদিকতার মাটিতে দাঁড়িয়ে যে ভূমিকা পালন করেছে, তার সঙ্গে এমন সব বিস্তার জড়িয়ে ছিল যা সংবাদ-কর্মীর দায়-দায়িত্বের বিশালতার পরিচয় দেয়| এর অনেক কিছুর সাথে হয়তো পেশার যুক্ততা নেই, তবে পেশার মর্যাদা, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও বৃহত্তর সামাজিক কর্তব্যপালনে নিষ্ঠার অনেক উদাহরণ এখানে মেলে| এক্ষেত্রে মনে করতে হবে ‘সংবাদ’-কর্মীদের কথা, এর পরিচালকমণ্ডলী ও কাণ্ডারীদের| আহমদুল কবির, খায়রুল কবির, জহুর হোসেন চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, সন্তোষ গুপ্ত. হাবীবুর রহমান, বজলুর রহমান, শহীদ সাবের, হাসান আলী, শুভ রহমান, মোজাম্মেল হোসেন, মুনীরুজ্জামান, আবু জাফর শামসুদ্দীন ও আরো কতজনকে আমাদের স্মরণ করতে হবে| এই নামের তালিকা দীর্ঘ, এখানে কেবল ‘সংবাদ’ দপ্তরের কর্মী নয়, মফস্বল সংবাদদাতা ও রিপোর্টারের নামও উল্লেখ করতে হয়| এমন নামের মধ্যে আছেন মোনাজাতউদ্দিন, ভ্রাম্যমাণ সংবাদদাতা হিসেবে তিনি গ্রামবাংলার মানুষের চালচিত্র যেভাবে সবার সামনে মেলে ধরেছিলেন তা’ হয়ে আছে অনন্য উদাহরণ|

‘সংবাদ’ ঘিরে উৎসারিত হয়েছে অনেক কর্মধারা, সাংস্কৃতিক আয়োজন, সাহিত্য উদ্যোগ| সেসবও ইতিহাসের অংশ, এখানে বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয় ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মোকাবিলায় শহীদুল্লা কায়সারের নেতৃত্বে সংবাদকর্মীদের ভূমিকা| সেই সাথে উল্লেখ করতে হয় সংবাদ, ইত্তেফাক ও পাকিস্তান অবজারভারে প্রকাশিত অভিন্ন সম্পাদকীয় ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখে দাঁড়াও’|  

‘সংবাদ’-এর দীর্ঘ অভিযাত্রার ইতিহাস সবার জন্য শিক্ষণীয়| সেই জন্মদাগ ও আদর্শ বহন করে নতুন দেশে নতুন পরিবেশে নতুন শতকে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে চলছে ‘সংবাদ’-এর অব্যাহত পথচলা| সংবাদের ৭৫ বর্ষ পূর্তি তাই আমাদের সবার জন্য আনন্দবহ ঘটনা, সেইসাথে আগামীর পথচলার পাথেয় মিলবে এই ইতিহাস থেকে| 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬


সংবাদপত্র, সমাজ ও ‘সংবাদ’

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬

featured Image

১৯৪৭ সালে ভাগ-বাটোয়ারা ও আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে ভারতে বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটে এবং পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগ করে বাটোয়ারার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় পাকিস্তান নামক এক অভিনব রাষ্ট্র| ভৌগোলিক বিচারে রাষ্ট্রের থাকতে হয় সুনির্দিষ্ট সীমানা-চিহ্নিত একটি ভূখণ্ড| পাকিস্তানেরও ছিল তেমন সীমানা-ঘেরা অঞ্চল, তবে তা’ একটি নয়, ছিল দুটি এবং পরস্পরের মধ্যে ব্যবধান হাজার মাইলেরও বেশি| এমন রাষ্ট্র বিশ্বে যে ছিল না, তা’ নয়| তবে সেসব ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র| নিজ ভূখণ্ড ও সীমানা পেরিয়ে দূরের ভূমি দখল করে যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল প্রভু দেশ, সেখানে কোনো রাখঢাক ছিল না| এমনকি এই কর্তৃত্বপরায়ণতার কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না| ফ্রান্স তাদের দখলকৃত আলজেরিয়াকে আলাদা দেশ হিসেবে গণ্য করেনি, আখ্যায়িত করেছিল ফ্রান্সের সাগর-পেরুনো অঞ্চল বা ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে| আফ্রিকা মহাদেশকে যখন ইউরোপীয় শক্তিসমূহ নিজেদের মধ্যে বাটোয়ারা করে নিল তখন বেলজিয়ান কঙ্গোকে রাজা লিওপোন্ড তাঁর খাস জমি হিসেবে ঘোষণা করলেন, সেখানে ঔপনিবেশিক বেলজিয়াম রাজ্যের কর্তৃত্ব নয়, বলবৎ হয়েছিল রাজা লিওপোন্ডের ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব| ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে যে পাকিস্তানের জন্ম দিয়েছিল বৃটিশ শাসকেরা সেটা স্থির হয়েছিল নেতাদের নিয়ে টেবিলে বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে| কখনো কোনো জনমত যাচাইয়ের চেষ্টা নেয়া হয়নি, মানুষের চাহিদা নিরূপণের প্রয়াস ছিল না সেখানে| এহেন রাষ্ট্র পাকিস্তান দ্রুতই পরিণত হলো ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে, নামত দেশ একটি, কার্যত পূর্বাঞ্চল পশ্চিমের ওভারসিজ টেরিটরি|

যাই হোক, দেশ ভাগের ফল হিসেবে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়ে যাত্রা শুরু করে, নিজ ভাগ্য বাংলার মানুষেরা নিজেরা পরিচালনা করবে এমনই ছিল প্রত্যাশা| প্রত্যাশা-ভঙ্গ হতে অবশ্য বিলম্ব হয়নি, তবে নিজ দেশ পাকিস্তান রক্ষার বাসনা ছিল প্রবল এবং জনমানসে সেটার ছিল প্রাধান্য| এমন এক যাত্রা শুরু থেকে যাত্রাভঙ্গ ঘটতে তেইশ বছরের অনন্য অভিযাত্রা প্রয়োজন হয়েছিল এবং জাতীয় এই পালাবদলে অনেকের অনেক অবদান অনেক ঘটনার উল্লেখ আমরা করতে পারি, সঙ্গতভাবেই যা করা হয়| তবে এখানে গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্রের ভূমিকা নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয় না, যা ইতিহাস-উপলব্ধির জন্য দরকারি| সংবাদপত্রের এই ভূমিকা আলোচনায় দুটি পত্রিকার অবদান বিশ্লেষণ দাবি করে, এর একটি ‘ইত্তেফাক’ এবং অপরটি ‘সংবাদ’| দুইয়ের ছিল দুই পথ, লক্ষ্য ছিল একই এবং উভয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা পালন করেছে| জাতি হিসেবে আমরা এইস্বীকৃতি না দিলেও পাকিস্তানি সামরিক শাসকেরা সেটা ভালোই বুঝেছিলেন এবং একাত্তরের গণহত্যাভিযানের সূচনায়, যথেচ্ছ হত্যা গোলাগুলি অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি সুনির্দিষ্টভাবে কতক আক্রমণ পরিচালনা করেছিল তারা যার কোনো সামরিক গুরুত্ব ছিল না, ছিল চেতনাগত তাৎপর্য| এই কারণে একাত্তরের পঁচিশে মার্চের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে দাউ দাউ পুড়ে গেল দুই প্রধান বাংলা ˆদনিক ‘সংবাদ’ ও ‘ইত্তেফাক’|

‘সংবাদ’ পত্রিকা হিসেবে যাত্রা শুরু করে ১৯৫১ সালে, পাকিস্তানের প্রতি প্রত্যাশার বিপুলতা নিয়ে| বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন পূর্ববাংলায় যে ভাবগত পরিবর্তন বয়ে এনেছিল তার রাজসাক্ষী হতে পারে ‘সংবাদ’, কেননা ভাষা আন্দোলন ‘সংবাদের’ নবজন্ম ঘটায়, বাঙালিত্বের চেতনা ও সাম্যের আদর্শের সম্মিলনে রূপান্তর ঘটে ‘সংবাদের’ এবং নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে ‘সংবাদ’| সাম্যবাদীরা যে জাতীয় অধিকারের প্রবক্তা হয়ে উঠতে পারে তার প্রকাশকারী হয়ে উঠলো ‘সংবাদ’, যদিও রাজনৈতিকভাবে এমনটা ঘটতে অনেক বিলম্ব ঘটেছিল এবং টালমাটাল দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঘটেছিল সেই মহামিলন| সেই অর্থে ‘সংবাদ’ পালন করেছে যুগস্রষ্টার ভূমিকা, সংবাদপত্রের নৈতিকতা ও আদর্শ অনুসরণ করে ও রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র না হয়ে| এর অনুষঙ্গ হিসেবে ‘সংবাদ’ জাতীয়তাবাদের গণ্ডি প্রসারিত করে আলিঙ্গন করে আন্তর্জাতিকতাবাদ| বিগত শতকের ষাটের দশকে দেশে দেশে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের যে বিকাশ তা পূর্ববাংলার জনচিত্তে গেঁথে দিতে ‘সংবাদ’-এর ভূমিকা ছিল প্রধান| মনে পড়ে ১৯৬১ সালে সদ্য-স্বাধীন কঙ্গোর জাতীয়তাবাদী নেতা প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুবুম্বা হত্যার পরপর ঢাকার তরুণ কবিসমাজের পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয় অনবদ্য সংকলন ‘আফ্রিকার হৃদয়ে সূর্যোদয়’| ষাটের দশকের সাহিত্যচর্চার গতিধারা অনুধাবনে এই ছোট্ট ঘটনার গুরুত্ব রয়েছে, তবে এমন আকুতির প্রকাশ সম্ভব হয়েছিল ‘সংবাদ’-এর নেপথ্য ভূমিকার জন্য| ‘সংবাদ’-এর মাধ্যমেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে নবীন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে| ‘সংবাদ’-এর মাধ্যমেই আলজেরিয়ার মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে পরিচিতি নিবিড় হয় তরুণ সমাজের| জামিলা বুপাশার নাম এখন বিস্মৃত হলেও মুক্তিসেনানী সেই নারী তখন হয়ে উঠেছিলেন জননন্দিত| ভিয়েতনাম যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন আমেরিকা-ইউরোপজুড়ে যে ঢেউ তুলেছিল তার স্পন্দন পূর্ববাংলায় বয়ে আনার ক্ষেত্রেও ‘সংবাদ’-এর ছিল অগ্রণী ভূমিকা, বিশেষভাবে এখানে স্মরণ করতে হয় বার্তাকক্ষের ভূমিকা ও অবদান| ওয়াশিংটনে প্রতিবাদী তরুণেরা অবরোধ করে পেন্টাগন, প্রতিবাদী নারী ˆসনিকের মেশিনগানের নলে গুঁজে দেয় গাঁদা ফুল| ঢাকার রাজপথে ছাত্রদের প্রতিবাদী মিছিলে শোভা পায় ব্যানার: মেশিনগানের সামনে গাই জুঁই ফুলের গান| আন্তর্জাতিকতার এই বোধের পাশাপাশি স্বদেশ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ নিবিড় করতেও ‘সংবাদ’ নানাভাবে অবদান রাখে|

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ‘সংবাদ’ সামাজিকভাবে যে-ভূমিকা পালন করেছিল তা জাতিকে পৌঁছে দিয়েছিল মুক্তির দ্বারপ্রান্তে| সহযোগী ছিল ‘ইত্তেফাক’, যে প্রসঙ্গ পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে, সংবাদপত্রের যে ভূমিকার ছিল নানা মাত্রা| এখানে উল্লেখ করা যায় ‘সংবাদ’-এর ‘খেলাঘর’ পাতা এবং ‘ইত্তেফাকে’র ‘কচি-কাঁচার আসর’-এর কথা| উভয়ের শিশু-কিশোর সংগঠন দেশব্যাপী অর্জন করেছিল বিস্তৃতি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম বিকাশে বিশাল অবদান রেখেছিল| কতভাবেই না কত নবীন-নবীনার অন্তর ছুঁয়ে গেছে পত্রিকায় সপ্তাহান্তে প্রকাশিত বিশেষ পাতা, কত সাহিত্য-অভিলাষীর ভীরু পদচারণা শুরু হয়েছিল এমন আয়োজন ঘিরে, সেসবের পরিমাপ করাও মুশকিল| খেলাঘরের পাতা সম্পাদনা করতেন ‘ভাইয়া’, যে-নামের অন্তরালে ছিলেন শিশু-সাহিত্যিক হাবীবুর রহমান| স্বাধীনতার পর দীর্ঘকাল এই দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন বজলুর রহমান| ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে স্মরণ করতে পারি ‘খেলাঘর’ পাতার প্রতি গড়ে ওঠা ভালোবাসা ও সমীহ| বিদ্যালয়ে তৃতীয় কি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র হিসেবে একবার চিঠি লিখেছিলাম ভাইয়ার কাছে, আমার নিজের বিশ্রি হাতের লেখায়| কাউকে না জানিয়ে তা ডাকযোগে পাঠিয়েছিলাম ২৬৩ বংশালের ঠিকানায়| সপ্তাহকাল পর দেখা গেল স্নেহবাণী বর্ষিত করে ‘ভাইয়া’ ব্লক করে হাতে লেখা চিঠি হুবহু ছেপে দিয়েছেন তাঁর পাতায়| পত্রিকা বাসায় এলে সেটা দেখে আমার লজ্জা ও ক্রোধের সীমা-পরিসীমা ছিল না| লজ্জা আমার খারাপ হাতের লেখার বার্তা এখন ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে সে কারণে| ক্রোধ ‘ভাইয়া’ কেন ব্যক্তিগত চিঠি এমনভাবে ফাঁস করে দিলেন| এখন অবশ্য ভেবে আনন্দ অনুভব করি, কেননা সেটাই যে আমার প্রথম প্রকাশিত লেখা| সংবাদের পাতায় তার যে-প্রকাশ ঘটেছিল সেটা গর্বের বিষয়ও বটে| পাশাপাশি ‘সংবাদ’-এর সঙ্গে পূর্ববাংলার জায়মান সাহিত্যব্রতীদের নিবিড় সম্পৃক্তি গড়ে ওঠে সাহিত্য পাতার সুবাদে| এর ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তনময়তার পূর্বাপর বিশ্লেষণ আমাদের চারপাশের জগৎ ও সমাজের রূপান্তরের ছবি মেলে ধরতে পারে| রণেশ দাশগুপ্তের সম্পাদনা স্পর্শে কত তরুণের রচনা যে মানসম্মত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যপাতায় সে-ও তো ইতিহাসের আকড়| স্বাধীনতার পর ‘সংবাদ’ কর্তৃপক্ষ সাপ্তাহিক চার পৃষ্ঠার সাহিত্যপাতা প্রকাশের দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিলে তা বাস্তবায়নে অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন আবুল হাসনাত| এই প্রয়াস অন্যদের করেছিল অনুপ্রাণিত ও অনুকরণযোগ্য| ‘সংবাদ’ এই পরম্পরা রক্ষা করে এখন সাহিত্যপাতা নবরূপ ধারণ করছে, সেটাও লক্ষণীয়|

‘সংবাদ’ ˆদনিক হিসেবে সাংবাদিকতার মাটিতে দাঁড়িয়ে যে ভূমিকা পালন করেছে, তার সঙ্গে এমন সব বিস্তার জড়িয়ে ছিল যা সংবাদ-কর্মীর দায়-দায়িত্বের বিশালতার পরিচয় দেয়| এর অনেক কিছুর সাথে হয়তো পেশার যুক্ততা নেই, তবে পেশার মর্যাদা, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও বৃহত্তর সামাজিক কর্তব্যপালনে নিষ্ঠার অনেক উদাহরণ এখানে মেলে| এক্ষেত্রে মনে করতে হবে ‘সংবাদ’-কর্মীদের কথা, এর পরিচালকমণ্ডলী ও কাণ্ডারীদের| আহমদুল কবির, খায়রুল কবির, জহুর হোসেন চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, সন্তোষ গুপ্ত. হাবীবুর রহমান, বজলুর রহমান, শহীদ সাবের, হাসান আলী, শুভ রহমান, মোজাম্মেল হোসেন, মুনীরুজ্জামান, আবু জাফর শামসুদ্দীন ও আরো কতজনকে আমাদের স্মরণ করতে হবে| এই নামের তালিকা দীর্ঘ, এখানে কেবল ‘সংবাদ’ দপ্তরের কর্মী নয়, মফস্বল সংবাদদাতা ও রিপোর্টারের নামও উল্লেখ করতে হয়| এমন নামের মধ্যে আছেন মোনাজাতউদ্দিন, ভ্রাম্যমাণ সংবাদদাতা হিসেবে তিনি গ্রামবাংলার মানুষের চালচিত্র যেভাবে সবার সামনে মেলে ধরেছিলেন তা’ হয়ে আছে অনন্য উদাহরণ|

‘সংবাদ’ ঘিরে উৎসারিত হয়েছে অনেক কর্মধারা, সাংস্কৃতিক আয়োজন, সাহিত্য উদ্যোগ| সেসবও ইতিহাসের অংশ, এখানে বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয় ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মোকাবিলায় শহীদুল্লা কায়সারের নেতৃত্বে সংবাদকর্মীদের ভূমিকা| সেই সাথে উল্লেখ করতে হয় সংবাদ, ইত্তেফাক ও পাকিস্তান অবজারভারে প্রকাশিত অভিন্ন সম্পাদকীয় ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখে দাঁড়াও’|  

‘সংবাদ’-এর দীর্ঘ অভিযাত্রার ইতিহাস সবার জন্য শিক্ষণীয়| সেই জন্মদাগ ও আদর্শ বহন করে নতুন দেশে নতুন পরিবেশে নতুন শতকে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে চলছে ‘সংবাদ’-এর অব্যাহত পথচলা| সংবাদের ৭৫ বর্ষ পূর্তি তাই আমাদের সবার জন্য আনন্দবহ ঘটনা, সেইসাথে আগামীর পথচলার পাথেয় মিলবে এই ইতিহাস থেকে| 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত