সংবাদ

৭৬ বছরে সংবাদ / প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা ২০২৬

স্মৃতিতে আহমদুল কবির


মতিউর রহমান
মতিউর রহমান
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১০:৪৬ এএম

স্মৃতিতে আহমদুল কবির
আহমদুল কবির

প্রগতির পতাকাবাহী একজন : আমরা তখন খুব ছোট| আমাদের বাসা ছিল ২৪০ নম্বর বংশালে| বাসা থেকে বের হলেই দৈনিক ‘সংবাদ’ অফিস| সংবাদ অফিস সেই ১৯৫০ সাল থেকে দীর্ঘদিন, প্রায় চল্লিশ বছর ধরেই ছিল ২৬৩ নম্ব বংশালে| অফিসের গেটের পাশের দেয়ালে সাঁটানো থাকত আট পৃষ্ঠার ‘সংবাদ’| 

আমরা বংশালের বাসা ছেড়ে চলে যাই ১৯৭৪ সালে| আশির দশকের শুরুতে আবার আমাদের ওই বাসাতেই সাপ্তাহিক ‘একতা’র অফিস করি| সেই অফিস চলে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত— এভাবেই চল্লিশ বছর ধরে আমাদের যাওয়া-আসা ছিল দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সামনে দিয়ে|

আমি ১৯৫৩ সালে নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হই তৃতীয় শ্রেণিতে| সেই বয়স থেকে দেয়ালে সাঁটানো সংবাদ দেখতে দেখতে আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি| খুব সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই দেয়ালে সাঁটানো সংবাদ কাগজ পড়তে চলে যেতাম| সেই দিনগুলোতে শুধু খেলার খবর পড়তাম| পেছনের পৃষ্ঠার বাঁ দিকে থাকত খেলার খবর| খেলার খবর পড়তে পড়তে ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য খবর, সমাজ ও রাজনীতির খবর পড়তে আগ্রহী হয়ে উঠি, পড়তে শুরু করি| ধীরে ধীরে নতুন এক জগত, নতুন চিন্তায় প্রভাবিত হতে থাকি| পরে জেনেছিলাম, ১৯৫৪ সালে সংবাদ-এ আহমদুল কবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জহুর হোসেন চৌধুরী সম্পাদক হন|

মনে পড়ে, ১৯৫৮ সালের নভেম্বর কি ডিসেম্বরে, তৎকালীন তরুণ বামপন্থী নেতা আনোয়ার জাহিদকে খুঁজতে সংবাদ অফিসে প্রথম যাই| এর আগেই তৎকালীন বামপন্থী যুব সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের ইমাদুল্লাহ স্মৃতি পাঠাগারের সদস্য হয়েছিলাম| সেই বছরের অক্টোবরে পাকিস্তানজুড়ে সামরিক শাসন জারি হলে ওই পাঠাগারটিও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়| আমার কাছে পাঠাগারের ‘তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প’ বইটি ছিল, একদিন সেটা ফেরত দিতে গিয়েছিলাম| সেই প্রথম সংবাদ অফিস দর্শন| সেই সংবাদ অফিসের একতলায় সাব এডিটর-রিপোর্টারদের ঘর, ভেতরের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় যাওয়া, সেখানে সম্পাদকীয় বিভাগের অফিস এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল|

সেই সময়ই দেশ সম্পর্কে, রাজনীতি নিয়ে আমাদের ভাবনা শুরু| ১৯৬১ সালে ম্যাট্রিক পাস করার পর ঢাকা কলেজ থেকেই ছাত্ররাজনীতিতে আমাদের হাতেখড়ি| ১৯৬২ সালের সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তুমুল এক অভিঘাত চলছিল সারা দেশে| সারা দেশ, আমরা সবাই, নতুন এক চেতনায় জেগে উঠেছিলাম| সংবাদ-এ প্রতিদিন সেই উত্তাল দিনগুলোর খবর, ছবি সবই ছিল আমাদের জন্য বিরাট অনুপ্রেরণার| এভাবেই সংবাদ হয়ে উঠেছিল আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী|

সেই বাষট্টির আন্দোলনের কিছু সময় পর থেকে রাজবন্দীরা জেল থেকে ছাড়া পেতে শুরু করেন| শহীদ ভাই, শহীদুল্লা কায়সার; রণেশদা, রণেশ দাশগুপ্ত; সন্তোষদা, সন্তোষ গুপ্তসহ অনেকে ছাড়া পান| তাঁরা একে একে আবার সংবাদ-এর কাজে যোগ দেন| আমাদের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় হয়, পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয়| ‘সংবাদ’-এর অফিসে যাতায়াত বেড়ে যায়| বলা যায়, বাসা থেকে যাওয়া-আসার পথে ‘সংবাদ’-এ ঢুকে পড়া আর কি! আমাদের নানা কাজের এক সহায়ক আস্তানায় পরিণত হয় সংবাদ অফিস| সেই ১৯৬৪ সালে আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয় ‘সংবাদ’-এ| রণেশদার উৎসাহে একসঙ্গে তিনটি কবিতা ছাপা হয়েছিল| সেই রোববারের সকালের আনন্দের স্পর্শ এখনো বুকের মধ্যে জাগ্রত রয়েছে| প্রথম গদ্য ছাপা হয় ১৯৬৯ সালে| এ রকমই চলে ’৬৬, ’৬৭, ’৬৯, ’৭০ এবং মহান ’৭১ পর্যন্ত| ‘সংবাদ অফিসকে’ অনেক সময় মনে হয়েছে বেআইনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য যোগাযোগকেন্দ্র| সত্যি তা-ই ছিল!

আসলে ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আহমদুল কবিরের কথা আমরা শুনতে থাকি; তাঁর সম্পর্কে জানতে পারি| সংবাদ-এর সঙ্গে তাঁর যুক্ততার কথা বুঝতে পারি| তখনো তাঁকে আমরা চিনি রাজনীতিবিদ হিসেবে— ন্যাপের নেতা, কৃষক সমিতির কোষাধ্যক্ষ, প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, একজন প্রগতিকামী অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি হিসেবে| স্বাধীন বাংলাদেশেও দুবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তিনি|

মনে পড়ে, ১৯৬৫ সালের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে যে কার্যক্রম চলেছিল, সেটি আহমদুল কবিরের তোপখানার অফিসকে কেন্দ্র করেই হয়েছিল| কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ, খোকা রায় প্রমুখের কাছ থেকে পাকিস্তানের শুরুতে তাঁদের চরম কষ্টের দিনগুলোয় আহমদুল কবিরের সাহায্য-সহযোগিতার কথা শুনেছি| সে জন্য সবসময় তাঁর সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় ছিল| কলকাতায় যতবার দেখা হয়েছে, রণেশদা সবসময় কবির ভাইয়ের অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টি, দাঙ্গা প্রতিরোধে তাঁর কথা গভীর ভালোবাসা নিয়ে বলতেন| পঁচাত্তরের পর রণেশদা কলকাতায় থেকে গেলে কবির ভাই একাধিকবার তাঁর কাছে গেছেন ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে|

ষাটের দশকে আমরা যখন ছাত্র ইউনিয়ন করি, তখন তাঁর সাহায্য আমরা পেয়েছি| একবার তাঁর মতিঝিলের অফিসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক হয়েছিল| ১৯৬৬ সালে যখন মস্কো-পিকিং দ্বন্দ্বের প্রভাবে পড়ে ছাত্র ইউনিয়ন ভেঙে যায়, তখন তিনি আবার দুই অংশের মধ্যে ঐক্য তৈরিতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন| তাঁর বাসায় রাতের পর রাত ˆবঠক হয়েছে দুই গ্রুপের নেতাদের মধ্যে| তিনি জেগে বসে থাকতেন|

ন্যাপের ˆবঠক হয়েছে তাঁর বাসায়| তাঁর অফিস হয়ে উঠেছিল ন্যাপের আরেক কেন্দ্র| পাকিস্তানের ন্যাপের বড় নেতা খান আবদুল ওয়ালি খান, মাহমুদুল হক উসমানি প্রমুখ ঢাকায় এলে তাঁর বাসায় থেকেছেন, তাঁর বাসা হয়েছে তাঁদের কর্মস্থল|

মনে পড়ে, ১৯৬৯ সালে ডেমরার ঘূর্ণিঝড়ের পর একবার সারা দিন তাঁর সঙ্গে নৌকায় ঘুরেছিলাম সারা এলাকা| তখন থেকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হলেও ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে| আশির দশকে তাঁর সঙ্গে প্রচুর সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছে— কখনো দেশের চলমান রাজনীতি, যৌবনে কলকাতার অতীতের নানা ঘটনা বা সংবাদপত্র নিয়ে| অফিসে দুপুরে খেয়েছি একসঙ্গে— গ্রাম থেকে আনা সরিষার খাঁটি তেল কিংবা ঘি দিয়ে ভাত, নিরামিষ আর মাছ| বিকেল-সন্ধ্যায় আনন্দঘন সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছে তাঁর সঙ্গে| ১৯৯৩ সালে কয়েকজন মিলে কলকাতা হয়ে চেন্নাইয়ে সেমিনার উপলক্ষে গেলে একসঙ্গে আলোচনা সভা, নানা অনুষ্ঠান, গল্প-গুজবে মজার মজার অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়|

এখানে সামান্য কথা বলে নিই, কবির ভাই ছিলেন এক সুপুরুষ| ১৯৬৯ সালে ঢাকায় বুলগেরীয় চলচ্চিত্র উৎসব হয়েছিল| ওই উৎসবে একটা ছবি ছিল ‘দ্য ডাইভারসন’, মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ছবির পুরস্কার পেয়েছিল| বহুদিন আমরা বলতাম, ওই নায়ক তো একদম কবির ভাইয়ের মতো দেখতে|

১৯৮৮ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতি সোমবার সংবাদ-এ উপসম্পাদকীয় লিখেছি| প্রতি শনিবার লেখা নিয়ে বজলুর রহমানের সামনে হাজির হয়েছি— তাঁর সামনে বসে লেখার পরীক্ষা দিয়েছি প্রতি সপ্তাহে| বজলুর রহমান ও আহমদুল কবিরের উৎসাহে সে সময় সংবাদ-এ অনেক রিপোর্ট করেছি, অনেকের সাক্ষাৎকারও নিয়েছি| পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী জ্যোতি বসু, কেন্দ্রীয় সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী ইন্দ্রজিৎ গুপ্তসহ অনেকের সাক্ষাৎকার ‘সংবাদ’-এ প্রকাশিত হয়েছে| তাঁদের সে সহযোগিতা সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে আমার জন্য ভীষণ সহায়ক হয়েছিল|

‘সাপ্তাহিক একতা’য় সাংবাদিকের দায়িত্ব পালন করলেও ওই সব লেখালেখি আমার জন্য, আমার সাংবাদিক জীবনের জন্য বড় অর্জন, যা সামনে এগিয়ে চলার পাথেয় হয়ে রয়েছে| সে সময় তো আহমদুল কবির শুধু প্রকাশক নন, সংবাদ-এর সম্পাদকও|

‘সংবাদ’ সব সময়— সেই শশবে দেখা আমার সংবাদ, কৈশোর পেরিয়ে যুবা বয়সের উত্তাল তরঙ্গমালার দিনগুলোতে সংবাদ, আজ প্রৌঢ়ত্বের পর্যায়েও নতুন নতুন উপলব্ধি অর্জনে— নতুন নতুন দিক উন্মোচনে আমাদের সঙ্গে আছে| ‘সংবাদ’-এর হাত ধরেই আমরা সামনে এগিয়ে চলেছি পাঁচ দশক ধরে| বাংলাদেশকে একটা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে আলোর পথের দিশারীর ভূমিকা পালন করেছে সংবাদ|

আহমদুল কবিরের নেতৃত্বে সত্তর আর আশির দশকে ‘সংবাদ’-এর জোরালো সাহসী ভূমিকার কথা আমাদের মনে রাখতে হবে| তবে এ প্রশ্নও কেউ কেউ করতে পারেন, সম্পাদক হিসেবে, প্রকাশক হিসেবে তিনি কতটুকু সফল হয়েছিলেন? তিনি সফল ছিলেন| তিনি ব্যর্থও হয়ে থাকতে পারেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে| তবে তাঁর নেতৃত্বে দৈনিক ‘সংবাদ’ সব সময়ই ছিল আমাদের স্বপ্নের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পতাকা হয়ে| আমাদের সেই ˆশশব থেকে আজ বৃদ্ধ বয়সের কাছাকাছি এসে এ কথা বলতে পারি, দৈনিক ‘সংবাদ’ থেকে আমাদের জীবন, আমাদের স্বপ্ন, আমাদের জীবনসংগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করতে পারি না|

আহমদুল কবির রাজনীতিবিদ হিসেবে সফল হয়েছিলেন নাকি ব্যর্থ হয়েছিলেন, সেটা ইতিহাস বিচার করবে| তবে আমরা বলব, তিনি সফল হয়েছেন| তিনি আজীবন অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র আর প্রগতির পতাকাকে বহন করেছেন| এই পতাকাকে তিনি কোনো দিন ফেলে দেননি হাত থেকে; যেমনটা আমরা দেখেছি তাঁর সময়ের অনেক রাজনৈতিক সহযোগী বা নেতাদের ক্ষেত্রে| আমরা বলব, এখানেই আহমদুল কবির সফল— একজন সম্পাদক হিসেবে, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবেও|

আহমদুল কবিরের স্মৃতি স্থায়ী হোক| তাঁর প্রিয় সংবাদ সামনে এগিয়ে চলুক| বজলুর রহমান, আলতামাশ কবির প্রমুখের নেতৃত্ব ‘সংবাদ’-এর অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্র আর প্রগতির পতাকাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলুক| তাঁদের পাশে থাকুন আমাদের শ্রদ্ধেয় লায়লা রহমান কবির|

[লেখাটি ২৫ নভেম্বর ২০০৪ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে আহমদুল কবিরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় পঠিত|] প্রকাশকাল: ৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৫, সংবাদ|

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬


স্মৃতিতে আহমদুল কবির

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬

featured Image

প্রগতির পতাকাবাহী একজন : আমরা তখন খুব ছোট| আমাদের বাসা ছিল ২৪০ নম্বর বংশালে| বাসা থেকে বের হলেই দৈনিক ‘সংবাদ’ অফিস| সংবাদ অফিস সেই ১৯৫০ সাল থেকে দীর্ঘদিন, প্রায় চল্লিশ বছর ধরেই ছিল ২৬৩ নম্ব বংশালে| অফিসের গেটের পাশের দেয়ালে সাঁটানো থাকত আট পৃষ্ঠার ‘সংবাদ’| 

আমরা বংশালের বাসা ছেড়ে চলে যাই ১৯৭৪ সালে| আশির দশকের শুরুতে আবার আমাদের ওই বাসাতেই সাপ্তাহিক ‘একতা’র অফিস করি| সেই অফিস চলে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত— এভাবেই চল্লিশ বছর ধরে আমাদের যাওয়া-আসা ছিল দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সামনে দিয়ে|

আমি ১৯৫৩ সালে নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হই তৃতীয় শ্রেণিতে| সেই বয়স থেকে দেয়ালে সাঁটানো সংবাদ দেখতে দেখতে আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি| খুব সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই দেয়ালে সাঁটানো সংবাদ কাগজ পড়তে চলে যেতাম| সেই দিনগুলোতে শুধু খেলার খবর পড়তাম| পেছনের পৃষ্ঠার বাঁ দিকে থাকত খেলার খবর| খেলার খবর পড়তে পড়তে ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য খবর, সমাজ ও রাজনীতির খবর পড়তে আগ্রহী হয়ে উঠি, পড়তে শুরু করি| ধীরে ধীরে নতুন এক জগত, নতুন চিন্তায় প্রভাবিত হতে থাকি| পরে জেনেছিলাম, ১৯৫৪ সালে সংবাদ-এ আহমদুল কবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জহুর হোসেন চৌধুরী সম্পাদক হন|

মনে পড়ে, ১৯৫৮ সালের নভেম্বর কি ডিসেম্বরে, তৎকালীন তরুণ বামপন্থী নেতা আনোয়ার জাহিদকে খুঁজতে সংবাদ অফিসে প্রথম যাই| এর আগেই তৎকালীন বামপন্থী যুব সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের ইমাদুল্লাহ স্মৃতি পাঠাগারের সদস্য হয়েছিলাম| সেই বছরের অক্টোবরে পাকিস্তানজুড়ে সামরিক শাসন জারি হলে ওই পাঠাগারটিও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়| আমার কাছে পাঠাগারের ‘তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প’ বইটি ছিল, একদিন সেটা ফেরত দিতে গিয়েছিলাম| সেই প্রথম সংবাদ অফিস দর্শন| সেই সংবাদ অফিসের একতলায় সাব এডিটর-রিপোর্টারদের ঘর, ভেতরের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় যাওয়া, সেখানে সম্পাদকীয় বিভাগের অফিস এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল|

সেই সময়ই দেশ সম্পর্কে, রাজনীতি নিয়ে আমাদের ভাবনা শুরু| ১৯৬১ সালে ম্যাট্রিক পাস করার পর ঢাকা কলেজ থেকেই ছাত্ররাজনীতিতে আমাদের হাতেখড়ি| ১৯৬২ সালের সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তুমুল এক অভিঘাত চলছিল সারা দেশে| সারা দেশ, আমরা সবাই, নতুন এক চেতনায় জেগে উঠেছিলাম| সংবাদ-এ প্রতিদিন সেই উত্তাল দিনগুলোর খবর, ছবি সবই ছিল আমাদের জন্য বিরাট অনুপ্রেরণার| এভাবেই সংবাদ হয়ে উঠেছিল আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী|

সেই বাষট্টির আন্দোলনের কিছু সময় পর থেকে রাজবন্দীরা জেল থেকে ছাড়া পেতে শুরু করেন| শহীদ ভাই, শহীদুল্লা কায়সার; রণেশদা, রণেশ দাশগুপ্ত; সন্তোষদা, সন্তোষ গুপ্তসহ অনেকে ছাড়া পান| তাঁরা একে একে আবার সংবাদ-এর কাজে যোগ দেন| আমাদের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় হয়, পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয়| ‘সংবাদ’-এর অফিসে যাতায়াত বেড়ে যায়| বলা যায়, বাসা থেকে যাওয়া-আসার পথে ‘সংবাদ’-এ ঢুকে পড়া আর কি! আমাদের নানা কাজের এক সহায়ক আস্তানায় পরিণত হয় সংবাদ অফিস| সেই ১৯৬৪ সালে আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয় ‘সংবাদ’-এ| রণেশদার উৎসাহে একসঙ্গে তিনটি কবিতা ছাপা হয়েছিল| সেই রোববারের সকালের আনন্দের স্পর্শ এখনো বুকের মধ্যে জাগ্রত রয়েছে| প্রথম গদ্য ছাপা হয় ১৯৬৯ সালে| এ রকমই চলে ’৬৬, ’৬৭, ’৬৯, ’৭০ এবং মহান ’৭১ পর্যন্ত| ‘সংবাদ অফিসকে’ অনেক সময় মনে হয়েছে বেআইনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য যোগাযোগকেন্দ্র| সত্যি তা-ই ছিল!

আসলে ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আহমদুল কবিরের কথা আমরা শুনতে থাকি; তাঁর সম্পর্কে জানতে পারি| সংবাদ-এর সঙ্গে তাঁর যুক্ততার কথা বুঝতে পারি| তখনো তাঁকে আমরা চিনি রাজনীতিবিদ হিসেবে— ন্যাপের নেতা, কৃষক সমিতির কোষাধ্যক্ষ, প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, একজন প্রগতিকামী অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি হিসেবে| স্বাধীন বাংলাদেশেও দুবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তিনি|

মনে পড়ে, ১৯৬৫ সালের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে যে কার্যক্রম চলেছিল, সেটি আহমদুল কবিরের তোপখানার অফিসকে কেন্দ্র করেই হয়েছিল| কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ, খোকা রায় প্রমুখের কাছ থেকে পাকিস্তানের শুরুতে তাঁদের চরম কষ্টের দিনগুলোয় আহমদুল কবিরের সাহায্য-সহযোগিতার কথা শুনেছি| সে জন্য সবসময় তাঁর সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় ছিল| কলকাতায় যতবার দেখা হয়েছে, রণেশদা সবসময় কবির ভাইয়ের অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টি, দাঙ্গা প্রতিরোধে তাঁর কথা গভীর ভালোবাসা নিয়ে বলতেন| পঁচাত্তরের পর রণেশদা কলকাতায় থেকে গেলে কবির ভাই একাধিকবার তাঁর কাছে গেছেন ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে|

ষাটের দশকে আমরা যখন ছাত্র ইউনিয়ন করি, তখন তাঁর সাহায্য আমরা পেয়েছি| একবার তাঁর মতিঝিলের অফিসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক হয়েছিল| ১৯৬৬ সালে যখন মস্কো-পিকিং দ্বন্দ্বের প্রভাবে পড়ে ছাত্র ইউনিয়ন ভেঙে যায়, তখন তিনি আবার দুই অংশের মধ্যে ঐক্য তৈরিতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন| তাঁর বাসায় রাতের পর রাত ˆবঠক হয়েছে দুই গ্রুপের নেতাদের মধ্যে| তিনি জেগে বসে থাকতেন|

ন্যাপের ˆবঠক হয়েছে তাঁর বাসায়| তাঁর অফিস হয়ে উঠেছিল ন্যাপের আরেক কেন্দ্র| পাকিস্তানের ন্যাপের বড় নেতা খান আবদুল ওয়ালি খান, মাহমুদুল হক উসমানি প্রমুখ ঢাকায় এলে তাঁর বাসায় থেকেছেন, তাঁর বাসা হয়েছে তাঁদের কর্মস্থল|

মনে পড়ে, ১৯৬৯ সালে ডেমরার ঘূর্ণিঝড়ের পর একবার সারা দিন তাঁর সঙ্গে নৌকায় ঘুরেছিলাম সারা এলাকা| তখন থেকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হলেও ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে| আশির দশকে তাঁর সঙ্গে প্রচুর সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছে— কখনো দেশের চলমান রাজনীতি, যৌবনে কলকাতার অতীতের নানা ঘটনা বা সংবাদপত্র নিয়ে| অফিসে দুপুরে খেয়েছি একসঙ্গে— গ্রাম থেকে আনা সরিষার খাঁটি তেল কিংবা ঘি দিয়ে ভাত, নিরামিষ আর মাছ| বিকেল-সন্ধ্যায় আনন্দঘন সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছে তাঁর সঙ্গে| ১৯৯৩ সালে কয়েকজন মিলে কলকাতা হয়ে চেন্নাইয়ে সেমিনার উপলক্ষে গেলে একসঙ্গে আলোচনা সভা, নানা অনুষ্ঠান, গল্প-গুজবে মজার মজার অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়|

এখানে সামান্য কথা বলে নিই, কবির ভাই ছিলেন এক সুপুরুষ| ১৯৬৯ সালে ঢাকায় বুলগেরীয় চলচ্চিত্র উৎসব হয়েছিল| ওই উৎসবে একটা ছবি ছিল ‘দ্য ডাইভারসন’, মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ছবির পুরস্কার পেয়েছিল| বহুদিন আমরা বলতাম, ওই নায়ক তো একদম কবির ভাইয়ের মতো দেখতে|

১৯৮৮ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতি সোমবার সংবাদ-এ উপসম্পাদকীয় লিখেছি| প্রতি শনিবার লেখা নিয়ে বজলুর রহমানের সামনে হাজির হয়েছি— তাঁর সামনে বসে লেখার পরীক্ষা দিয়েছি প্রতি সপ্তাহে| বজলুর রহমান ও আহমদুল কবিরের উৎসাহে সে সময় সংবাদ-এ অনেক রিপোর্ট করেছি, অনেকের সাক্ষাৎকারও নিয়েছি| পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী জ্যোতি বসু, কেন্দ্রীয় সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী ইন্দ্রজিৎ গুপ্তসহ অনেকের সাক্ষাৎকার ‘সংবাদ’-এ প্রকাশিত হয়েছে| তাঁদের সে সহযোগিতা সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে আমার জন্য ভীষণ সহায়ক হয়েছিল|

‘সাপ্তাহিক একতা’য় সাংবাদিকের দায়িত্ব পালন করলেও ওই সব লেখালেখি আমার জন্য, আমার সাংবাদিক জীবনের জন্য বড় অর্জন, যা সামনে এগিয়ে চলার পাথেয় হয়ে রয়েছে| সে সময় তো আহমদুল কবির শুধু প্রকাশক নন, সংবাদ-এর সম্পাদকও|

‘সংবাদ’ সব সময়— সেই শশবে দেখা আমার সংবাদ, কৈশোর পেরিয়ে যুবা বয়সের উত্তাল তরঙ্গমালার দিনগুলোতে সংবাদ, আজ প্রৌঢ়ত্বের পর্যায়েও নতুন নতুন উপলব্ধি অর্জনে— নতুন নতুন দিক উন্মোচনে আমাদের সঙ্গে আছে| ‘সংবাদ’-এর হাত ধরেই আমরা সামনে এগিয়ে চলেছি পাঁচ দশক ধরে| বাংলাদেশকে একটা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে আলোর পথের দিশারীর ভূমিকা পালন করেছে সংবাদ|

আহমদুল কবিরের নেতৃত্বে সত্তর আর আশির দশকে ‘সংবাদ’-এর জোরালো সাহসী ভূমিকার কথা আমাদের মনে রাখতে হবে| তবে এ প্রশ্নও কেউ কেউ করতে পারেন, সম্পাদক হিসেবে, প্রকাশক হিসেবে তিনি কতটুকু সফল হয়েছিলেন? তিনি সফল ছিলেন| তিনি ব্যর্থও হয়ে থাকতে পারেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে| তবে তাঁর নেতৃত্বে দৈনিক ‘সংবাদ’ সব সময়ই ছিল আমাদের স্বপ্নের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পতাকা হয়ে| আমাদের সেই ˆশশব থেকে আজ বৃদ্ধ বয়সের কাছাকাছি এসে এ কথা বলতে পারি, দৈনিক ‘সংবাদ’ থেকে আমাদের জীবন, আমাদের স্বপ্ন, আমাদের জীবনসংগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করতে পারি না|

আহমদুল কবির রাজনীতিবিদ হিসেবে সফল হয়েছিলেন নাকি ব্যর্থ হয়েছিলেন, সেটা ইতিহাস বিচার করবে| তবে আমরা বলব, তিনি সফল হয়েছেন| তিনি আজীবন অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র আর প্রগতির পতাকাকে বহন করেছেন| এই পতাকাকে তিনি কোনো দিন ফেলে দেননি হাত থেকে; যেমনটা আমরা দেখেছি তাঁর সময়ের অনেক রাজনৈতিক সহযোগী বা নেতাদের ক্ষেত্রে| আমরা বলব, এখানেই আহমদুল কবির সফল— একজন সম্পাদক হিসেবে, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবেও|

আহমদুল কবিরের স্মৃতি স্থায়ী হোক| তাঁর প্রিয় সংবাদ সামনে এগিয়ে চলুক| বজলুর রহমান, আলতামাশ কবির প্রমুখের নেতৃত্ব ‘সংবাদ’-এর অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্র আর প্রগতির পতাকাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলুক| তাঁদের পাশে থাকুন আমাদের শ্রদ্ধেয় লায়লা রহমান কবির|

[লেখাটি ২৫ নভেম্বর ২০০৪ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে আহমদুল কবিরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় পঠিত|] প্রকাশকাল: ৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৫, সংবাদ|


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত