সংবাদ

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যানে’ কৃষিতে যেসব পদক্ষেপ, সংসদকে জানালেন প্রধানমন্ত্রী


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১০:৩৮ পিএম

‘আই হ্যাভ আ প্ল্যানে’ কৃষিতে যেসব পদক্ষেপ, সংসদকে জানালেন প্রধানমন্ত্রী
ছ‌বি: সংগৃ‌হিত

  • তিস্তায় হবে আরেকটি ব্যারেজ
  • মহাসড়কের উন্নয়নে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড
  • নিরাপদ রেল  যাত্রায় ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন

কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও মেহনতি কৃষকের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘আই হ্যাভ এ প্লান’ কর্মসূচির আওতায় কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে জাতীয় সংসদকে তা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

‘আই হ্যাভ আ প্লান’ প্রসঙ্গে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান কৃষি-বান্ধব সরকারের মূল লক্ষ্যে হলো একটি আত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু, প্রযুক্তি নির্ভর ও কৃষক-কেন্দ্রিক আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। যেখানে উৎপাদন ও বিপণন হবে সম্পূর্ণ তথ্য চালিত। প্রান্তিক কৃষক হবেন ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তা এবং কৃষিখাত হবে জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি।

বুধবার (১৭ জুন) ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান এ কথা বলেন।

এ দিন বিকেলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়। এর আগে সকালে সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী মৌলভীবাজারে যান। সেখানে তিনি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, বৃক্ষ রোপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেন।

এদিন সংসদে (টেবিলে উপস্থাপিত) প্রশ্নোত্তরে হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকানো, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কর-জিডিপি, সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নত করা, নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, বিভাগীয় শহরে ভূ-উপরিস্থ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা ও হজের খরচ কমানো নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সরকারপ্রধান।

কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন

সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মো. সেলিম রেজার লিখিত প্রশ্নটি ছিল, “আমাদের কৃষি নির্ভর এই বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও মেহনতি কৃষকের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের জনগণ কর্তৃক সাদরে গৃহীত আপনার বহুল জনপ্রিয় স্লোগান ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ কর্মসূচির আওতায় কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং উক্ত পদক্ষেপসমূহ বাস্তবায়িত হলে কৃষিতে অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধনে আমরা আশান্বিত হতে পারি কিনা?”

জবাবে কৃষিক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরো বলেন, “কৃষির উন্নয়ন ও কৃষকদের ইউনিক পরিচয় নিশ্চিতকরণে ন্যায্য মূল্যে কৃষি উপকরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, স্বল্প মূল্যে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রদানের লক্ষ্যে ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে দেশের ৮টি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকে এ কার্যক্রম সম্পাদন করা হচ্ছে। অদ্যাবধি ২০ হাজার ৮৩২টি কৃষক কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্যখাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করেছে। এ লক্ষ্যে সরকার চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করেছে এবং এর ফলে সারাদেশের প্রায় ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ জন কৃষক উপকৃত হবে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সরকার দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন/পুনঃখননের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে, জলাবদ্ধতা নিরসন হবে, সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষিত হবে। ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি এবং এমওপি সার অত্যন্ত সুলভ মূল্যে সরাসরি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, বিএডিসির মাধ্যমে উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “উচ্চ ফলনশীল ও প্রতিকূলতা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি স্মার্ট কৃষি ও প্রিসিশন এগ্রিকালচার-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ও গম সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং দেশব্যাপী ‘কৃষকবাজার’ স্থাপন করা হচ্ছে। কৃষিখাতে সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অফ থিংস  এবং ড্রোনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করছে।”

তিস্তায় আরেকটি ব্যারেজ

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেন, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীতে পানি সংরক্ষণের জন্য আরও একটি ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্য প্রকল্পটির কারিগরি ও আর্থিক দিক নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তিস্তা নদীকেন্দ্রিক টেকসই ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি সমীক্ষা কার্যক্রম ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। এই সমীক্ষা প্রতিবেদনে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে নদীর ১১০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ, ১১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং, ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং বাঁধের ওপর রাস্তা নির্মাণ, ৬৭টি গ্রোয়েন/স্পার নির্মাণ ও মেরামত এবং ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন কাজ প্রস্তাব করা হয়েছে।”

হামের প্রাদুর্ভাব

জামালপুর-৩ আসনের এমপি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব রোধে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বাস্তবায়ন করে আসছে। হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ, বিস্তার ও টিকাদান কার্যক্রমের ওপর বিভিন্ন নীতিগত ও পরিচালনাগত বিষয়ের প্রভাব নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করা হয়।

তারেক রহমান বলেন, ইপিআই কর্মসূচির আওতায় টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং প্রচলিত সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করে সম্পাদিত হয়ে থাকে। টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তনের ফলে টিকাদান কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। পর্যালোচনায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সরকার ইতিমধ্যে টিকা সরবরাহব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ, টিকা মজুত ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ, রোগ নজরদারি কার্যক্রম সম্প্রসারণ, দ্রুত প্রাদুর্ভাব শনাক্তকরণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় আরও সুদৃঢ় করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া দেশে হামের টিকাদানের আওতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার আওতায় আনতে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড ও ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন

কুমিল্লা-১০ আসনের এমপি মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জাতীয় মহাসড়কগুলোতে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড এবং সড়কের ওপর চাপ কমানোর জন্য মাল্টিমোডাল পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা; সব শ্রেণির মহাসড়কে ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং স্মার্ট মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা; সব ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; ঢাকার ওপর চাপ কমাতে রিং রোড এবং রেডিয়াল নেটওয়ার্ক তৈরি এবং যানজটপূর্ণ ইন্টারসেকশনগুলোতে প্রয়োজনীয় স্ট্রাকচার নির্মাণ করে নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা।

সরকারপ্রধান বলেন, নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, রেলপথে যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনা, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ নিশ্চিত করতে প্রধান প্রধান রুটসমূহে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, রেলওয়ে সেবাকে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলা ও প্রধান শহরগুলোর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে। ক্রমান্বয়ে আন্তনগর ট্রেন ও কমিউটার ট্রেনের সংখ্যা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে যথাক্রমে ৩টি ও ১০টি, ১৫টি ও ১৬টি এবং ১০৩টি ও ৮৫টি করে বৃদ্ধির জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।

হজের খরচ কমানো

গাজীপুর-৪ আসনের এমপি সালাহ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, আগামীতে হজের খরচ কমানোর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। হজ পালনের ব্যয় কমাতে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

তারেক রহমান বলেন, ২০২৫ সালে হজের সর্বনিম্ন প্যাকেজ ছিল ৪ লাখ ৭৮ হাজার ২৪২ টাকা। ২০২৬ সালে হজের খরচ ১১ হাজার ৭৫ টাকা কমানো হয়েছে, যার সুফল হজযাত্রীরা পেয়েছেন। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও সৌদি সরকারের ঘোষিত ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের জন্য ২০২৭ সালের প্যাকেজ মূল্য কমানো বা যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।

পাবনা মানসিক হাসপাতাল

দিনাজপুর-১ আসনের এমপি মনজুরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখিত ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। সরকার বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা দিতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, পাবনা মানসিক হাসপাতালকে আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর করে একটি পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬


‘আই হ্যাভ আ প্ল্যানে’ কৃষিতে যেসব পদক্ষেপ, সংসদকে জানালেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬

featured Image

  • তিস্তায় হবে আরেকটি ব্যারেজ
  • মহাসড়কের উন্নয়নে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড
  • নিরাপদ রেল  যাত্রায় ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন

কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও মেহনতি কৃষকের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘আই হ্যাভ এ প্লান’ কর্মসূচির আওতায় কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে জাতীয় সংসদকে তা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

‘আই হ্যাভ আ প্লান’ প্রসঙ্গে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান কৃষি-বান্ধব সরকারের মূল লক্ষ্যে হলো একটি আত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু, প্রযুক্তি নির্ভর ও কৃষক-কেন্দ্রিক আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। যেখানে উৎপাদন ও বিপণন হবে সম্পূর্ণ তথ্য চালিত। প্রান্তিক কৃষক হবেন ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তা এবং কৃষিখাত হবে জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি।

বুধবার (১৭ জুন) ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান এ কথা বলেন।

এ দিন বিকেলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়। এর আগে সকালে সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী মৌলভীবাজারে যান। সেখানে তিনি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, বৃক্ষ রোপনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেন।

এদিন সংসদে (টেবিলে উপস্থাপিত) প্রশ্নোত্তরে হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকানো, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কর-জিডিপি, সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নত করা, নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, বিভাগীয় শহরে ভূ-উপরিস্থ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা ও হজের খরচ কমানো নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সরকারপ্রধান।

কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন

সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মো. সেলিম রেজার লিখিত প্রশ্নটি ছিল, “আমাদের কৃষি নির্ভর এই বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও মেহনতি কৃষকের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের জনগণ কর্তৃক সাদরে গৃহীত আপনার বহুল জনপ্রিয় স্লোগান ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ কর্মসূচির আওতায় কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং উক্ত পদক্ষেপসমূহ বাস্তবায়িত হলে কৃষিতে অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধনে আমরা আশান্বিত হতে পারি কিনা?”

জবাবে কৃষিক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরো বলেন, “কৃষির উন্নয়ন ও কৃষকদের ইউনিক পরিচয় নিশ্চিতকরণে ন্যায্য মূল্যে কৃষি উপকরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, স্বল্প মূল্যে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রদানের লক্ষ্যে ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে দেশের ৮টি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকে এ কার্যক্রম সম্পাদন করা হচ্ছে। অদ্যাবধি ২০ হাজার ৮৩২টি কৃষক কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্যখাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করেছে। এ লক্ষ্যে সরকার চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করেছে এবং এর ফলে সারাদেশের প্রায় ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ জন কৃষক উপকৃত হবে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সরকার দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন/পুনঃখননের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে, জলাবদ্ধতা নিরসন হবে, সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষিত হবে। ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি এবং এমওপি সার অত্যন্ত সুলভ মূল্যে সরাসরি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, বিএডিসির মাধ্যমে উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “উচ্চ ফলনশীল ও প্রতিকূলতা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি স্মার্ট কৃষি ও প্রিসিশন এগ্রিকালচার-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ও গম সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং দেশব্যাপী ‘কৃষকবাজার’ স্থাপন করা হচ্ছে। কৃষিখাতে সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অফ থিংস  এবং ড্রোনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করছে।”

তিস্তায় আরেকটি ব্যারেজ

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেন, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীতে পানি সংরক্ষণের জন্য আরও একটি ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্য প্রকল্পটির কারিগরি ও আর্থিক দিক নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তিস্তা নদীকেন্দ্রিক টেকসই ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি সমীক্ষা কার্যক্রম ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। এই সমীক্ষা প্রতিবেদনে তিস্তা মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে নদীর ১১০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ, ১১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং, ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং বাঁধের ওপর রাস্তা নির্মাণ, ৬৭টি গ্রোয়েন/স্পার নির্মাণ ও মেরামত এবং ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন কাজ প্রস্তাব করা হয়েছে।”

হামের প্রাদুর্ভাব

জামালপুর-৩ আসনের এমপি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব রোধে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বাস্তবায়ন করে আসছে। হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ, বিস্তার ও টিকাদান কার্যক্রমের ওপর বিভিন্ন নীতিগত ও পরিচালনাগত বিষয়ের প্রভাব নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করা হয়।

তারেক রহমান বলেন, ইপিআই কর্মসূচির আওতায় টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং প্রচলিত সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করে সম্পাদিত হয়ে থাকে। টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তনের ফলে টিকাদান কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। পর্যালোচনায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সরকার ইতিমধ্যে টিকা সরবরাহব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ, টিকা মজুত ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ, রোগ নজরদারি কার্যক্রম সম্প্রসারণ, দ্রুত প্রাদুর্ভাব শনাক্তকরণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় আরও সুদৃঢ় করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া দেশে হামের টিকাদানের আওতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার আওতায় আনতে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড ও ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন

কুমিল্লা-১০ আসনের এমপি মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জাতীয় মহাসড়কগুলোতে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড এবং সড়কের ওপর চাপ কমানোর জন্য মাল্টিমোডাল পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা; সব শ্রেণির মহাসড়কে ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং স্মার্ট মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা; সব ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; ঢাকার ওপর চাপ কমাতে রিং রোড এবং রেডিয়াল নেটওয়ার্ক তৈরি এবং যানজটপূর্ণ ইন্টারসেকশনগুলোতে প্রয়োজনীয় স্ট্রাকচার নির্মাণ করে নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা।

সরকারপ্রধান বলেন, নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, রেলপথে যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনা, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ নিশ্চিত করতে প্রধান প্রধান রুটসমূহে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, রেলওয়ে সেবাকে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলা ও প্রধান শহরগুলোর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে। ক্রমান্বয়ে আন্তনগর ট্রেন ও কমিউটার ট্রেনের সংখ্যা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে যথাক্রমে ৩টি ও ১০টি, ১৫টি ও ১৬টি এবং ১০৩টি ও ৮৫টি করে বৃদ্ধির জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।

হজের খরচ কমানো

গাজীপুর-৪ আসনের এমপি সালাহ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, আগামীতে হজের খরচ কমানোর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। হজ পালনের ব্যয় কমাতে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

তারেক রহমান বলেন, ২০২৫ সালে হজের সর্বনিম্ন প্যাকেজ ছিল ৪ লাখ ৭৮ হাজার ২৪২ টাকা। ২০২৬ সালে হজের খরচ ১১ হাজার ৭৫ টাকা কমানো হয়েছে, যার সুফল হজযাত্রীরা পেয়েছেন। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও সৌদি সরকারের ঘোষিত ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের জন্য ২০২৭ সালের প্যাকেজ মূল্য কমানো বা যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।

পাবনা মানসিক হাসপাতাল

দিনাজপুর-১ আসনের এমপি মনজুরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখিত ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। সরকার বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা দিতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, পাবনা মানসিক হাসপাতালকে আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তর করে একটি পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত