সংবাদ

৭৬ বছরে সংবাদ / প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা ২০২৬

‘সংবাদ’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা


গোলাম কিবরিয়া পিনু
গোলাম কিবরিয়া পিনু
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম

‘সংবাদ’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা
শিল্পী : মনিরুল ইসলাম

‘সংবাদ’ যে কতভাবে আমাদের জীবনের সাথে যুক্ত থেকেছে, বিচিত্রমুখী প্রভাবও ফেলেছে, তা বিবেচনা করলে, অনুভব করলে— বিস্ময়াভিভূত হই! একজীবনে দৈনিকটির সাথে দীর্ঘদিন সম্পর্ক— কতভাবে আর কত পরিধিতে আমাদের! আর কোনো দৈনিকের সাথে এত বিচিত্রমুখী ও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আমাদের অক্ষুণ্ন থাকেনি| শুধু কি সম্পর্ক? এমন সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়ায়— আমাদের মননশীলতা ও সৃজনশীলতা বিকাশে হাত ধরাধরি করে চলেছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে|

গাইবান্ধায় যখন ছিলাম, তখন মনে হয় একদিনও সংবাদ পড়া বাদ যায়নি! রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়ি, তখনও না| ঢাকায় এসে থিতু হয়েও পাঠক হিসেবে সংবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন হইনি| নব্বইয়ের দশকের পর থেকে সংবাদ সাধারণ পাঠক থেকে দূরবর্তী হতে থাকে, নতুন অনেক ˆদনিক আসে| একটা প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে হয়| আর এখন অনলাইনে দৈনিক পত্রিকা  ফ্রিতে পড়া যায়| এমন পরিস্থিতিতে অন্যান্য ˆদনিকের মতো সংবাদ আরও চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে|

‘খেলাঘর’ পাতায় লেখা শুরু হয়েছে আমার, তারপর ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে, শুধু কি তাই? লিখেছি ‘চিঠিপত্র’ বিভাগে, ও ‘চলচ্চিত্র’ পাতায়| বিভিন্ন সময়ে ‘সংবাদদাতা’ হয়েও আমার খবর ছাপা হয়েছে| ‘খেলাঘর’ পাতায় সংগঠনের খবর লিখে পাঠাতে পাঠাতে— অন্যান্য জাতীয় ও স্থানীয় ˆদনিক ও সাপ্তাহিকেও খবর ও ফিচার লেখা শুরু করি| সংবাদের ‘খেলাঘর’ পাতা থেকে এমন কাজের সূত্রপাত ও শিক্ষা গ্রহণ|

সংবাদের খেলাঘর পাতা ও খেলাঘর সংগঠন 

স্বাধীন দেশ, নতুন উদ্দীপনা— আমরা কিশোর থেকে তরুণ হয়ে উঠছি— সেই সময় একমাত্র সবচেয়ে বেশি নিকটতা নিয়ে ‘সংবাদ’ আমাদের কাছে উপস্থিত হয়| তখন ‘খেলাঘর’-এর সাথে যুক্ত হই, ‘খেলাঘর’-এর সাথে যুক্ত হওয়া মানেই— সংবাদের ‘খেলাঘর’ পাতার সাথেও ঘনিষ্ঠ হওয়ার অপরিহার্যতা ছিল| খেলাঘর-সংগঠনের সংবাদ, নির্দেশনা, ঘোষণা ও অন্যান্য বহু কিছুই ছাপা হতো তখন ‘খেলাঘর’ পাতায়| তাতে চোখ রাখার বিকল্প ছিল না একজন সক্রিয় খেলাঘরকর্মীর| আমি তখন হাইস্কুলের ছাত্র, কলেজের ছাত্র— তখন থেকেই সংবাদের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে, পড়ি তখন থেকেই ‘সংবাদ’| ‘খেলাঘর’ পাতায় লেখি, খবর পাঠাই| ‘খেলাঘর’ আমাদের লেখালেখির হয়ে ওঠে আঁতুড়ঘর| 

‘খেলাঘর’ পাতাকে কেন্দ্র করেই শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘরের গোড়াপত্তন হয়, সংবাদের এই পাতাকে কেন্দ্র করেই খেলাঘরের কার্যক্রম সুসংহত হয়| ‘খেলাঘর’ ও ‘সংবাদ’-কে অভিন্ন ভাবতাম, একই সত্তার দুই রূপ মনে হতো| বাস্তবেই ছিল তাই ও সত্য|

১৯৫১ সালের ১৭ মে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘সংবাদ’| এর পরের বছরেই খেলাঘরের জন্ম ১৯৫২ সালের ২ মে| এই দিন ˆদনিক সংবাদ-এর সাপ্তাহিক শিশু সাহিত্যপাতা ‘খেলাঘর’ আত্মপ্রকাশ করে| খেলাঘরকে ঘিরে একদল তরুণ ও উদীয়মান লিখিয়ে সমবেত হতে শুরু করে| কবি হাবিবুর রহমান ছিলেন খেলাঘরের ‘ভাইয়া’| সংবাদের বংশাল অফিসে খেলাঘর আসর গড়ে ওঠে| একে কেন্দ্র করে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে শাখা খেলাঘর আসর গড়ে উঠতে থাকে| ১৯৫৬ সালের ২২ জুলাই ˆদনিক সংবাদের অফিসে এক সভায় কেন্দ্রীয় খেলাঘর পরিচালনার জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়| সাংবাদিক ˆসয়দ নূরুদ্দিন ও তরুণ লেখক আল কামাল আব্দুল ওহাব নবগঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন| ১৯৫৭ সালে দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়| ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে মুহম্মদ সফিউল্লাহ সভাপতি ও আল কামাল আব্দুল ওহাব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন|  ১৯৫২-৬০ সময়কালে সাহিত্যচর্চা ছিল খেলাঘরের প্রধান কাজ| ১৯৬৪ সালে বজলুর রহমান খেলাঘরের ভাইয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর খেলাঘর সমাজভিত্তিক শিশু সংগঠনে রূপ নেয়| ১৯৭১ সালে খেলাঘর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে| মুক্ত স্বদেশে খেলাঘর স্লোগান তৈরি করে— ‘এসো গড়ি খেলাঘর, এসো গড়ি বাংলাদেশ’| 

সংবাদের পাঠক পারিবারিকভাবে ছিলাম কিন্তু সংবাদের ‘খেলাঘর’ পাতার মাধ্যমে অনেকের মতো আমারও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে কিশোরকালে—তরুণ বয়সে| বিনীতভাবেই বলি— ১৯৭২ সালে  গাইবান্ধা শহরে ‘শতদল খেলাঘর আসর’ প্রতিষ্ঠিত হয়, আমি এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হয়ে ১৯৭৭ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করি| খেলাঘর রংপুর জেলা কমিটির একজন সম্পাদক (১৯৭৪-৭৬) এবং খেলাঘরের জাতীয় পরিষদ সদস্য (১৯৭৮-৮২) হিসেবে দায়িত্ব পালনের বাইরেও গাইবান্ধা ও রংপুর এলাকায় খেলাঘরের নতুন শাখা সংগঠন ও কর্মকাণ্ড বাড়ানোর ক্ষেত্রেও নিবিড়ভাবে ভূমিকা রাখি| 

১৯৭২ সালের ৮ই অক্টোবরে রণেশ দাশগুপ্তকে গাইবান্ধায় শতদল খেলাঘর আসর থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়, আমি এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করি| রণেশ দাশগুপ্ত তখন সংবাদের সাথে বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন| অনুষ্ঠানে আলোচনা  হয়, এর পর শতদলের ভাইবোনেরা তাঁকে গান গেয়ে শোনান| তিনি বক্তব্য রাখেন| ছোট ভাই-বোনেরা তাঁকে গল্প শোনানোর আবদার করলে, তিনি ‘এক মিনিট’ শিরোনামের একটি গল্প শোনান| এই সংবাদটি ‘খেলাঘর’ পাতায় ২৮ অক্টোবর ছাপা হয়|

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে খেলাঘরের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়| এই সম্মেলনে— খেলাঘরের  সভাপতি পদে বজলুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক পদে জিয়াাউদ্দীন আহমদ নির্বাচিত হন| এই সম্মেলনের পর স্বাধীন দেশের মাটিতে নতুন উদ্দীপনায় খেলাঘরের কার্যক্রম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে ও জোরালো হয়| ১৯৭৩ সালে খেলাঘরের প্রথম সম্মেলনে গাইবান্ধা থেকে আমি এবং অপর দু’জন খেলাঘরকর্মী ও বন্ধু রন&জু ও মোস্তফা অংশ নিই| এই সম্মেলনে হাতেগোনা অল্প ক’টি শাখা-সংগঠন অংশগ্রহণ করে| উল্লিখিত সম্মেলনে খেলাঘরের পতাকা উত্তোলন করেন পান্না কায়সার এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী| তাদের দুজনই মুক্তিযুদ্ধে তাদের স্বামীকে হারিয়েছেন, বয়সও অল্প, এক বেদনাবিহ্বলতার মধ্যে তাদের বক্তৃতা সেদিন শুনেছিলাম! বজলুর রহমানের সভাপতিত্বে সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত| সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আগের দিন বংশালের সংবাদ অফিসে জিয়া ভাই (খেলাঘরের সাধারণ সম্পাদক) আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে ভাইয়া (বজলুর রহমান) ও অন্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন| সেই যে সংবাদ অফিসে যাওয়া শুরু, তারপরও বংশালের কার্যালয়ে কতবার গিয়েছি, বংশাল থেকে সংবাদের কার্যালয় পুরানা পল্টনে স্থানান্তরিত হওয়ার পরও কতবার গিয়েছি— প্রয়োজন, যোগাযোগ ও আড্ডা দিতে!

সেইসময়ে ব্লকযুগ ছিল, জিঙ্কব্লকে ছবি, অলংকরণ ও হেডিং ছাপা হতো| সংবাদের খেলাঘর বিভাগ থেকে কিছু জিঙ্কব্লক নিয়ে গাইবান্ধায় স্থানীয়ভাবে খেলাঘর থেকে একুশ ও অন্যান্য দিবসে সংকলনও আমরা বের করেছি, প্রেসে কালিমাখা হয়ে, রাত জেগে|

সংবাদের ‘খেলাঘর পাতা’ ও খেলাঘর সংগঠনটির হাত ধরাধরি করে চলেছে— আমাদের মতো মানুষদের ˆশশব-ˆকশোর ও তারুণ্যকে অলোকসামান্যতা দিয়ে উন্নত রুচিবোধ, নৈতিকতা, দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও যুক্তিবাদী হয়ে ওঠার প্রেষণা যুগিয়েছে, তারই সাযুজ্যে আমাদের দেশের মূলধারার চেতনাও সমৃদ্ধ হয়েছে|       


উপসম্পাদকীয় কলাম ও আদর্শনিষ্ট মানুষেরা

১৯৫১ সালের ১৭ মে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘সংবাদ’| প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সংবাদ-এ কর্মরত সংবাদকর্মীদের অধিকাংশই ছিলেন অগ্রসর চিন্তার মানুষ|  রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অন্তঃপ্রাণ  প্রগতিশীল  দর্শনের অধিকারী ছিলেন তারা| পাকিস্তান আমল থেকে সংবাদের সাথে যুক্ত থেকে মৃত্যৃর আগ পর্যন্ত সংবাদের এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ও সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন আহমদুল কবির, জহুর হোসেন চৌধুরী, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লাা কায়সার, আলী আকসাদ, বজলুর রহমান প্রমুখ|

’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর— বিশেষভাবে সংবাদের উপসম্পাদকীয় কলাম লিখে জহুর হোসেন চৌধুরী, আবু জাফর শামসুদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত, বজলুর রহমান প্রমুখ আমাদের শুধু অনুপ্রাণিত করেননি, জাতির পথচলার ক্ষেত্রে পথ দেখিয়েছেন| আমরা সংবাদের পাঠক হিসেবে তাঁদের লেখা পড়ে কিশোর ও তরুণবেলাকে শাণিত করেছি, তাঁদের কাছ থেকে পেয়েছি ভাবুকতা, সুচিন্তা, মননশীলতা ও সময়কে বাজিয়ে দেখার সাহস| এঁদের অনেকের সাথে আমাদের পরিচয়ও ঘটেছিল, যোগাযোগ হয়েছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে— তা মনে হলে এখনো গৌরববোধ হয়! যারা সংবাদের সাথে যুক্ত ছিলেন, তারা আমাদের কালে শুধু বিশিষ্টজনই ছিলেন না, ছিলেন আদর্শনিষ্ঠ ও পথপ্রদর্শক|

আমরা মনে করতে পারি— ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক, যুক্তিশীল, অগ্রসর চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে ‘সংবাদ’ই ছিল মূল দৈনিক, পাঠকনন্দিত ˆদনিক| তখন এত দৈনিক ছিল না, ছিল হাতেগোনা দৈনিক— ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা ও অন্যান্য ক’টি দৈনিক| তখন বের হয়নি— আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, প্রথম আলো, জনকণ্ঠ ও আরো কিছু ˆদনিক| ‘সংবাদ’ সেই সময়ে খবর, অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন, ফিচার, শিশু-কিশোর পাতা খেলাঘর, নারী, চলচ্চিত্র পাতা ও সাহিত্য সাময়িকী পাতা নিয়ে ছিল তুলনারহিত| অন্য কোনো দৈনিক ভিন্ন ভিন্ন পাতা নিয়ে ওতটা সমৃদ্ধ ছিল না| পাঠকও ছিল বিস্তর! সংবাদের পাঠকরাই পরবর্তী সময়ে নতুন দৈনিকগুলোর পাঠক হয়ে ওঠে! তবে সংবাদের উপসম্পাদকীয় কলাম সে সময়ে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, ইতিহাস বিকৃতিরোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঠিক বিশ্লেষণ, বঙ্গবন্ধুর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার প্রতি আপোসহীন থেকে যে ভূমিকা পালন করেছে, তা আর কোনো ˆদনিক সে-সময়ে ধারাবাহিক ও একনিষ্ঠভাবে তেমন ভূমিকা পালন করতে পারেনি! উল্লিখিত পর্বে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সংবাদের ভূমিকার তাৎপর্য ও মূল্যায়ন গবেষকদের জন্য একটি বিশেষ ক্ষেত্র হতে পারে!  


সংবাদের খবর ও আমাদের ট্রাজেডি

সংবাদ যখন বেশ পাঠকপ্রিয় ও প্রচার সংখ্যায় এগিয়ে, সেইসময়ে রণজিৎ রঞ্জন চাকী স্বাধীনতাত্তোরকাল থেকে সংবাদের গাইবান্ধাস্থ নিজস্ব সংবাদদাতা ছিলেন| ১৯৭৩-৭৪ এর দিকে তিনি ঢাকায় চাকরি নিয়ে বেশ ক’মাস ছিলেন, তার অনুরোধে ও ব্যবস্থাপনায় সেই সময়ে আমি সংবাদে সংবাদ প্রেরণ করতাম| তিনি ৭৪ ঢাকা থেকে ফিরে গিয়ে আবার গাইবান্ধায় থিতু হোন| তিনি ন্যাপ করতেন, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সময়ে তার বোনের বিয়ের অনুষ্টান থেকে গ্রেফতার হোন| বেশ ক’মাস জেলে থাকেন| তার জেলে থাকার সময়েও আমি সংবাদে খবর পাঠাই| আমার নামেও হুলিয়া থাকে ও কতবার যে আমাকে ধরার জন্য বাসায় ও অন্যান্যখানে পুলিশ হানা দেয়| এই সময়ে ক’টি সংবাদ ছাপার সাথে জড়িত থাকার কারণে অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি শুধু হইনি, সম্পর্ক ও পড়ালেখার ক্ষতিরও সম্মুখীন হতে হয়েছে| 

আমার বাবার নিজের চাচাতো ভাইকে, তার স্কুল শিক্ষক ভাইয়ের মেধাবী ছেলে প্রায় আমার সমবয়সী অর্থাৎ আপন ভাস্তে জমিজমার দ্বন্দ্বে খুন করে| আমি খবর পাঠাই সংবাদে, ‘ভাতিজার হাতে চাচা খুন’ তা সংবাদে ছাপা হয়, ৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪| এর পর সে জেল খেটে বের হয়ে সমাজে বেশ প্রতিষ্ঠিত কিন্তু সেদিনের সেই সংবাদ প্রকাশের পর থেকে আর কখনো দেখা হয়নি, যোগাযোগ হয়নি!  আরও একটি ঘটনা, খবর পেলাম যে, সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বাসায় এসএসসি পরীক্ষার সময় পার হওয়ার পর, কজন এসএসসি পরীক্ষার্থী সেই শিক্ষকের বাসায় আবারও বসে নকল করে খাতা ভরাচ্ছে| এই সংবাদ জানার পর তৎকালীন স্থানীয় সিপিবি নেতা গনেশ প্রসাদ ও আমি দুজন ঝড়ের বেগে সেই বাসায় ঢুকে নকল খাতা কেড়ে নিয়ে সোজা তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের হাতে তুলে দিই| এটা নিয়ে খবর ছাপা হয় শুধু নয়, বেশ হইচই পড়ে যায়| সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের চাকরিগত শাস্তি ও বদলি হয়| সেই শিক্ষক শুধু আমার স্কুল শিক্ষক ছিলেন না, আমার পিতার পরিচিত ও ঘনিষ্ঠজনও ছিলেন| 

আর একটি খবর ছাপা হয়— ১৯৭৭ সালের ২০ আগস্ট ‘সংবাদ’-এর প্রথম পৃষ্ঠায় ‘অধ্যাপক বটে’ শিরোনামে| এই সংবাদ প্রকাশের কারণে আমাকে ও বন্ধু লাকুকে ২২ আগস্ট সরকারি কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ডেকে নিয়ে সভা করলেন, বিভিন্ন মহল থেকেও চাপ আসল| কিন্তু ট্রাজেডি হলো— আমরা যারা বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম সেই সময়ে, তাদের ক’জনকে সেই শিক্ষক বায়োলজির ব্যবহারিক পরীক্ষায় পাস মার্কের চেয়ে কম নম্বর দিয়ে ফেল করে দিয়েছিল| সেই সময়ে ব্যবহারিক পরীক্ষায় কেউ অকৃতকার্য হলে, সে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে যায়| মার্কশীট পেয়ে সেদিন আমরা অবাক হয়েছিলাম! কলেজে হইচই হলো, আন্দোলন হলো! সেই শিক্ষক চুপিসারে বদলি নিয়ে অবশেষে কলেজ ত্যাগ করেছিলেন|

রণজিৎ রঞ্জন চাকীর পর ১৯৭৬ থেকে দীর্ঘদিন মফিজুল হক তারা সংবাদের গাইবান্ধার প্রতিনিধি ছিলেন| তিনি কী একনিষ্ঠভাবে বছরের পর বছর সার্বক্ষণিকভাবে সংবাদের জন্য কাজ করতেন| তখন সাংবাদিকতার মান ও সম্মান এতটাই উদ্দীপক ছিল যে, মফিজুল হক তারা মেডিক্যাল পড়া বাদ নিয়ে মফ¯^ল সাংবাদিকতাকে জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন! সাংবাদিকতার নতুন অর্থ-দ্যোতনা ˆতরি করে সংবাদের উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিথি হিসেবে মোনাজাতউদ্দিন ভিন্নধর্মী অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন রচনায় সংবাদের পাঠকপ্রিয়তা শুধু বাড়াননি, সাংবাদিকতায় নিজের সৃজনশীল শক্তিরও গভীর পরিচয় মেলে ধরেছেন| মোনাজাতউদ্দিন সেই সময়ে রংপুরে অবস্থান করলেও তিনি উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে খবরের জন্য ছুটতেন| তিনি পেশাগতভাবে গাইবান্ধায় ঘন ঘন আসতেন, আমরা তা কাছ থেকে দেখেছি, তার উজ্জ্বল চোখ যেন খববের অনুসন্ধানে নেশাতুর ছিল! মোনাতাজউদ্দিন সংবাদ সংগ্রহ করতে ১৯৯৫ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর গাইবান্ধার যমুনা নদীতে ড্রেজিং পয়েন্টের ছবি তুলতে গিয়ে পানিতে পড়ে যান এবং পানিতে ডুবে মারা যান| সেই সময়ে তার সাথে ছিলেন সংবাদের গাইবান্ধার প্রতিনিধি মফিজুল হক তারা| মোনাতাজউদ্দিনের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে  শ্রমনিষ্ঠ ও জীবনঘনিষ্ঠ  জনপদ-সাংবাদিকতার একটি পর্বের অবসান হয়| 

সংবাদের ‘চিঠিপত্র’ বিভাগ এক সময় ছিল বেশ নির্বাচিত ও গুরুত্ববহ| ‘চিঠিপত্র’ বিভাগে ছাপা বিষয়— তখন কীভাবে সংশ্লিষ্টজন ও পাঠককে নাড়া দিত, তা এই সময় এসে অনুভব করা যাবে না!  সেই সময়ে সংবাদের ‘চিঠিপত্র’ বিভাগে প্রকাশিত আমার লেখা চিঠির দু-একটি উদাহরণ:  ‘গাইবান্ধায় বসন্ত মহামারী’  ১৮মার্চ ১৯৭৩, সেই সময়ে আর একটি চিঠি ‘বসন্ত জীবনের পক্ষে দুর্বিষহ’| ‘গাইবান্ধা পার্ক : নামে আছে, কাজে নেই’, ২১ শে মে ১৯৭৬|

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে এমএ পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্ট বের হওয়ার আগেই ঢাকায় ১৯৮৩ সালের শেষে এসে এক প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে থিতু হলাম| তখন সংবাদে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে তৎকালীন সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আমাদের খেলাঘরের ভাইয়া বজলুর রহমানকে বলেছিলাম, তখন পত্রিকার আর্থিক অবস্থা ও তুলনামূলক বেতন ভালো না থাকায়, আমাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন আন্তরিকভাবেই, ভালোবেসেই| সে কথাও মনে পড়ছে আজ!

আবুল হাসনাত, ‘সংবাদ সাময়িকী’ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

আজ ‘সংবাদ সাময়িকী’র সম্পাদক আবুল হাসনাতের কথা বিশেষভাবে স্মরণে আসছে! ব্যক্তিগতভাবে লেখা ছাপানোর অনুমোদন আমি তার কাছ থেকে দীর্ঘদিন ও ধারাবাহিকভাবে পেয়েছি, তা ভাবলে তার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ থাকে না| তিনি  ‘সংবাদ সাময়িকী’ দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে সম্পাদনা করেন, তার সম্পাদিত ‘সংবাদ সাময়িকী’তে আমার লেখা ছাপা হয়েছে ধারাবাহিকভাবে প্রায় ২০ বছর| ‘সংবাদ সাময়িকী’র পর, ২০০৪ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি সাহিত্যপত্রিকা ‘কালি ও কলম’-এর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন, সেই  ‘কালি ও কলম’ পত্রিকায়ও প্রথম থেকেই নিয়মিতভাবে তিনি ধারাবাহিকভাবে আমার কবিতা ও প্রবন্ধ ছাপিয়েছেন, আমার সৌভাগ্য যে— তার মৃত্যুর আগে, তার সম্পাদিত ‘কালি ও কলম’-এর শেষ সংখ্যায়ও আমার একটি দীর্ঘ কবিতা ছাপিয়েছেন| আমার সাহিত্যজীবনে, আর কোনো সম্পাদকের কাছ থেকে এত দীর্ঘ সময় ও ধারাবাহিকভাবে এতটা অনুমোদন পাইনি! ‘সংবাদ সাময়িকী’ ও ‘কালি ও কলম’ পত্রিকায় ৪০ বছরের মধ্যে প্রায় ৩০-৩৫ বছর আমার লেখা ছাপিয়ে যে ভূমিকা তিনি পালন করেছেন, তা কখনো ভোলা যাবে না| তার হাত দিয়ে লেখা ছাপা হলে— মনে হতো, আমি ফুরিয়ে যায়নি, আমাকে আরও লিখতে হবে| 

শ্রদ্ধেয় আবুল হাসনাতকে নিয়ে অনেকের মতো আমারও কিছু স্মৃতি রয়েছে— যা অনুরণিত হবে বেঁচে থাকা পর্যন্ত| আমি কতবার ভেবেছি— তাকে আমি একটি বই উৎসর্গ করবো, কিন্তু পারিনি— পর মুহূর্তেই ভেবেছি— তিনি যদি ভাবেন,  তোষামোদ করছি| সে-কারণে তা করা সম্ভব হয়ে উঠেনি| আরও ভেবেছিলাম, তাকে নিয়ে লিখবো বা তার কোনো বই নিয়ে| এমন ভাবনা থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত, তার ‘নির্বাচিত কবিতা’ বইটি কিনে নোটও করেছিলাম, কিন্তু সেই ইচ্ছেও অবদমিত রেখেছিলাম| তবে, তার সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’  নামের সংকলনটি নিয়ে একটি দীর্ঘ লেখা, তাঁর মৃত্যুর ক’মাস আগে লিখেছিলাম, তা জাতীয় গন্থ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত ‘বই’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, তা তিনি দেখেছিলেন কিনা জানিনে! আমরা ক’জন তাঁর গুণগ্রাহী মাঝে মাঝে আলাপও করেছি, তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানানো উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, সে-পথে আমরা যেতে পারিনি!

আবুল হাসনাত এমন একজন সম্পাদক ছিলেন, যিনি লেখকদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখতেন, যেন ব্যক্তিগত সম্পর্ক এমন পর্যায় না দাঁড়ায়, যাতে করে লেখা নির্বাচনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হয়— এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতেন বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে| সেকারণে লেখা দিতে গিয়ে কেউ বসে আড্ডা বা অতিরিক্ত কথা বলবেন, সে-রকম সুযোগ পাওয়া দুষ্কর ছিল| কিন্তু লেখা তার নিজের পছন্দ হলে, তা ছাপিয়ে দিতেন| ব্যক্তিগত পরিচয়ের বিষয়টি ছিল লেখার ক্ষেত্রে গৌণ| তিনি যখন ‘সংবাদ সাময়িকী’ সম্পাদনা করতেন, তখন আমার কর্মস্থল পাশেই ছিল, তবুও গিয়ে সরাসরি হাতে লেখা দিতাম না, জিপিওতে গিয়ে লেখা পোস্ট করেছি| তার সাথে দেখা হলে সচরাচর বলতেন— ‘ভালো’, আর বলতেন ‘লেখা দিয়েন’| তার সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’ সংকলনে কবিতা নিয়েছিলেন, আমি তিনটি কবিতা দিয়েছিলাম, আমি ভেবেছিলাম, আমার একটি কবিতা ছাপবেন কিন্তু না, তিনটি কবিতা ছাপিয়ে দিয়েছিলেন| সংবাদে ভ্রমণ কাহিনি লিখতে চেয়েছিলাম, তিনি বলেছিলেন— লিখতে, তা লিখতে পারিনি| 

আরও মনে পড়ছে— ৮ জুলাই ২০০৩ সালে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর, আমি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলাম, তা ‘সংবাদ সাময়িকী’তে তিনি ছাপিয়েছিলেন| ২০১৯ সালে বাংলা একাডেমির একুশের অনুষ্ঠানে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভায় আবুল হাসনাত মূল প্রবন্ধ পড়লেন, তিনজন আলোচকের মধ্যে আমিও ছিলাম| একই মঞ্চে তাঁর সাথে সেদিন আলোচনা করতে পেয়ে গৌরববোধ হয়েছিল| বাংলাদেশের সমান বয়সী তাঁর সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, এ-দেশের মূল সংস্কৃতি চেতনার কণ্ঠলগ্ন হয়ে শুধু আবর্তিত হয়নি, সেই সংস্কৃতিরধারা শক্তিশালী করার লক্ষে একনিষ্ঠভাবে কবি-লেখকদের তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন| অনেক কবি-লেখকের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন, তা সংশ্লিষ্টজনেরা নিশ্চিত অনুভব করেন|

আমাদের স্পষ্ট মনে আছে সামরিক শাসক এরশাদ তার শাসনামলে নিজে কবি হিসেবে আর্বিভূত হোন, তখন তার কবিতা প্রায় সকল পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকীতে বিশেষভাবে বিশেষ ট্রিটমেন্ট দিয়ে ছাপা হতো| আমরা জেনেিেছ— সংবাদেও তার কবিতা ছাপানোর জন্য পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু আবুল হাসনাত তা ছাপেননি! সেই সময়ে মাঝে মাঝে এরশাদ বিভিন্ন ˆদনিকের অফিস পরিদর্শনে যেতেন, একদিন সংবাদে এরশাদ এলেন, ¯^াভাবিকভাবে দেশের  প্রধান ক্ষমতাধর শাসক এসেছেন, সবাই আগ্রহ নিয়ে নড়েচড়ে উঠে বসলেন,  অনেকে কুশল বিনিময় করলেন কিন্তু আবুল হাসনাতের মধ্যে কোনোরকম আগ্রহের ছাপ পরিলক্ষিত হয়নি সেদিন, অন্যান্য দিনের মতো চুপচুপ বসে একান্তচিত্তে তিনি কাজ করেছেন| এই হলো আবুল হাসনাত, যাকে সংবাদ ধারণ করেই সংবাদই মর্যাদা বেড়েছে| এমন অবস্থা দেখে এরশাদ নাকি বলেছিলেন, ও ভদ্রলোক কে? নিশ্চয় উত্তরে এসেছে— আবুল হাসনাত! এমন আবুল হাসনাত এখন খুঁজে পাওয়া যায়?

আবুল হাসনাতের পর দীর্ঘদিন ধরে কবি ওবায়েদ আকাশ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ‘সংবাদ সাময়িকী’টি উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ করে আসছেন| এখনো এই সংবাদ সাময়িকীটি সাহিত্যমোদীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে| এখনো দৈনিক সংবাদের সাময়িকী ব্রডশীটে চার পৃষ্ঠায় বের হচ্ছে, অন্যান্য ˆদনিকের সাহিত্য পাতা চার পৃষ্ঠায় বের হতো, তা সঙ্কুচিত হয়ে কোনো দৈনিকে দুই পৃষ্ঠা বা এক পৃষ্ঠায় গিয়ে ঠেকেছে| ‘সংবাদ’ সেক্ষেত্রে এখনো ব্যতিক্রম| সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী চার পৃষ্ঠায় পূর্ণপ্রাণ নিয়ে এখনো বেঁচে আছে| আবুল হাসনাতের পরবর্র্তী সময় থেকে ওবায়েদ আকাশের হাত দিয়েও এখনো আমার নিয়মিত লেখা এই সাময়িকীতে ছাপা হচ্ছে, যা আমার জন্য গৌরবের ও আনন্দের| এত কবিতা, এত লেখা দীর্ঘকাল ধরে ধারাবাহিকভাবে আর কোনো ˆদনিকের সাহিত্য পাতায় আমার ছাপা হয়নি!

১৯৯১-৯৪ সালের দিকে জাতীয় কবিতা পরিষদ ও উৎসবের আর প্রয়োজন নেই বলে কেউ কেউ তাদের বিবেচনাবোধ তুলে ধরলেন, পত্র-পত্রিকায়, এদের মধ্যে ক’জন কবিতা পরিষদের সাথে যুক্ত থাকা বিশিষ্ট কবিও ছিলেন, কিন্তু কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ আমি কবি সৈয়দ শামসুল হকের এমন একটি লেখার প্রতিবাদ করে ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলাম, আমার মতামতটি ১৯৯১ সালের ২০ জুন সংবাদ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়| পরবর্তীতেও আরও দু’একজন বিশিষ্ট কবিও এমন মতামত প্রকাশ করে নিবন্ধ লেখেন| এক্ষেত্রে আবুল হাসনাত কালের বিশেষ জিজ্ঞাসা ও প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে বিশেষ মতামত প্রকাশের দ্বার সাহসের সাথে সেদিন উন্মুক্ত করেছিলেন|

এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজিত জাতীয় কবিতা উৎসবের সবচেয়ে দীর্ঘ-অতলস্পর্শী প্রতিবেদন বহুবার রচনা করেছেন— কবি সাইয়িদ আতীকুল্লাহ| সাংবাদিকতা পেশায় তিনি সৃজনশীল সাহিত্যের প্রখরতা দিয়ে সফলতা ছুঁয়ে ছিলেন| তিনি ˆদনিক সংবাদের বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন| তার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রতিবেদনের একজন আগ্রহী পাঠক ছিলাম আমরা অনেকে| তার নামে প্রকাশিত বহু প্রতিবেদন এক ধরনের আকর্ষণে মনকে টানতো, বিশেষ ব্যঞ্জনায় অনুরণিত করতো| বিশেষ করে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রতিবেদন, সংসদ বিষয়ক প্রতিবেদন, ঋতু পরিবর্তনের প্রতিবেদন তিনি রচনা করেছেন— আপন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভাষায় ও শৈলীতে| এসব প্রতিবেদনের গভীরতায় কখনো কখনো শ্লেষ, প্রতীক ও রূপকের ব্যঞ্জনা আমরা লক্ষ করেছি| এরশাদের শাসনামলে বা প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আবহাওয়া বা ভিন্ন প্রসঙ্গের প্রতিবেদন রচনা করে তিনি রূপক তার প্রতীকী ব্যঞ্জনায় পাঠকের বোধকে ভিন্ন দিক-নির্দেশনায় নিয়ে যেতে পারতেন| এই ধরনের প্রতিবেদন, লেখার শক্তি সমকালীন সংবাদপত্রে প্রায় দুর্লভ| তার এই ধরনের প্রতিবেদন সাহিত্য-মূল্য বা ভিন্ন ধারার প্রতিবেদনের দৃষ্টান্ত হিসেবে সংরক্ষিত হতে পারে|

সংবাদের ‘সাহিত্য সাময়িকী’ বহু বছর নিয়মিতভাবে আমি সংরক্ষণ করেছিলাম| ঢাকায় ভাড়া বাসায় থাকার কারণে, মাঝে মাঝে বাসা পরিবর্তন ও স্থান সংকুলানের অভাবে, সেগুলোসহ অনেক সংরক্ষিত পত্র-পত্রিকা ও বই বিক্রি করতে বাধ্য হই| তা মনে হলে এখনো কষ্ট পাই, বেদনা-বিহ্বলতায় ন্যুব্জ হই| এতদিনের আগলে রাখা ‘সংবাদ সাময়িকী’ সংরক্ষণ করা যদি যেত, তাহলে শিল্প-সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকত আমারও কাছে|

সংবাদের ‘সংবাদ সাময়িকী’ আমাদের সাহিত্য-রুচি শুধু তৈরি করেনি, সাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ ও কৌতূহল ˆতরি করেছে, লেখক হয়ে ওঠার প্রেরণা ও প্রসিদ্ধিও দিয়েছে| এমন অভিনবত্ব নিয়ে এখনো ‘সংবাদ সাময়িকী’ আমাদের অবিচ্ছিন্ন এক পার্থিবতা!

উপসংহার

বলা চলে আমাদের জীবনব্যাপী লেপ্টে থাকা এই এক দৈনিক পত্রিকা ‘সংবাদ’, যার পথচলা দীর্ঘদিনের, যার পথচলা সড়কে আমরাও দীর্ঘদিন হেঁটে চলেছি! আমরা চাই, ‘সংবাদ’ তার ছন্দ ও মাত্রা নিয়ে আবারও তারুণ্যদীপ্ত হয়ে সমস্ত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নতুন বৈজয়ন্তী নিয়ে পথ চলুক, তেমন পদশব্দ ইন্দ্রিয়গোচর হলে— অন্যান্য অনেকের মতো আমিও অপার আনন্দ পাবো| [পুনর্মুদ্রণ]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬


‘সংবাদ’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬

featured Image

‘সংবাদ’ যে কতভাবে আমাদের জীবনের সাথে যুক্ত থেকেছে, বিচিত্রমুখী প্রভাবও ফেলেছে, তা বিবেচনা করলে, অনুভব করলে— বিস্ময়াভিভূত হই! একজীবনে দৈনিকটির সাথে দীর্ঘদিন সম্পর্ক— কতভাবে আর কত পরিধিতে আমাদের! আর কোনো দৈনিকের সাথে এত বিচিত্রমুখী ও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আমাদের অক্ষুণ্ন থাকেনি| শুধু কি সম্পর্ক? এমন সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়ায়— আমাদের মননশীলতা ও সৃজনশীলতা বিকাশে হাত ধরাধরি করে চলেছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে|

গাইবান্ধায় যখন ছিলাম, তখন মনে হয় একদিনও সংবাদ পড়া বাদ যায়নি! রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়ি, তখনও না| ঢাকায় এসে থিতু হয়েও পাঠক হিসেবে সংবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন হইনি| নব্বইয়ের দশকের পর থেকে সংবাদ সাধারণ পাঠক থেকে দূরবর্তী হতে থাকে, নতুন অনেক ˆদনিক আসে| একটা প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে হয়| আর এখন অনলাইনে দৈনিক পত্রিকা  ফ্রিতে পড়া যায়| এমন পরিস্থিতিতে অন্যান্য ˆদনিকের মতো সংবাদ আরও চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে|

‘খেলাঘর’ পাতায় লেখা শুরু হয়েছে আমার, তারপর ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে, শুধু কি তাই? লিখেছি ‘চিঠিপত্র’ বিভাগে, ও ‘চলচ্চিত্র’ পাতায়| বিভিন্ন সময়ে ‘সংবাদদাতা’ হয়েও আমার খবর ছাপা হয়েছে| ‘খেলাঘর’ পাতায় সংগঠনের খবর লিখে পাঠাতে পাঠাতে— অন্যান্য জাতীয় ও স্থানীয় ˆদনিক ও সাপ্তাহিকেও খবর ও ফিচার লেখা শুরু করি| সংবাদের ‘খেলাঘর’ পাতা থেকে এমন কাজের সূত্রপাত ও শিক্ষা গ্রহণ|

সংবাদের খেলাঘর পাতা ও খেলাঘর সংগঠন 

স্বাধীন দেশ, নতুন উদ্দীপনা— আমরা কিশোর থেকে তরুণ হয়ে উঠছি— সেই সময় একমাত্র সবচেয়ে বেশি নিকটতা নিয়ে ‘সংবাদ’ আমাদের কাছে উপস্থিত হয়| তখন ‘খেলাঘর’-এর সাথে যুক্ত হই, ‘খেলাঘর’-এর সাথে যুক্ত হওয়া মানেই— সংবাদের ‘খেলাঘর’ পাতার সাথেও ঘনিষ্ঠ হওয়ার অপরিহার্যতা ছিল| খেলাঘর-সংগঠনের সংবাদ, নির্দেশনা, ঘোষণা ও অন্যান্য বহু কিছুই ছাপা হতো তখন ‘খেলাঘর’ পাতায়| তাতে চোখ রাখার বিকল্প ছিল না একজন সক্রিয় খেলাঘরকর্মীর| আমি তখন হাইস্কুলের ছাত্র, কলেজের ছাত্র— তখন থেকেই সংবাদের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে, পড়ি তখন থেকেই ‘সংবাদ’| ‘খেলাঘর’ পাতায় লেখি, খবর পাঠাই| ‘খেলাঘর’ আমাদের লেখালেখির হয়ে ওঠে আঁতুড়ঘর| 

‘খেলাঘর’ পাতাকে কেন্দ্র করেই শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘরের গোড়াপত্তন হয়, সংবাদের এই পাতাকে কেন্দ্র করেই খেলাঘরের কার্যক্রম সুসংহত হয়| ‘খেলাঘর’ ও ‘সংবাদ’-কে অভিন্ন ভাবতাম, একই সত্তার দুই রূপ মনে হতো| বাস্তবেই ছিল তাই ও সত্য|

১৯৫১ সালের ১৭ মে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘সংবাদ’| এর পরের বছরেই খেলাঘরের জন্ম ১৯৫২ সালের ২ মে| এই দিন ˆদনিক সংবাদ-এর সাপ্তাহিক শিশু সাহিত্যপাতা ‘খেলাঘর’ আত্মপ্রকাশ করে| খেলাঘরকে ঘিরে একদল তরুণ ও উদীয়মান লিখিয়ে সমবেত হতে শুরু করে| কবি হাবিবুর রহমান ছিলেন খেলাঘরের ‘ভাইয়া’| সংবাদের বংশাল অফিসে খেলাঘর আসর গড়ে ওঠে| একে কেন্দ্র করে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে শাখা খেলাঘর আসর গড়ে উঠতে থাকে| ১৯৫৬ সালের ২২ জুলাই ˆদনিক সংবাদের অফিসে এক সভায় কেন্দ্রীয় খেলাঘর পরিচালনার জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়| সাংবাদিক ˆসয়দ নূরুদ্দিন ও তরুণ লেখক আল কামাল আব্দুল ওহাব নবগঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন| ১৯৫৭ সালে দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়| ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে মুহম্মদ সফিউল্লাহ সভাপতি ও আল কামাল আব্দুল ওহাব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন|  ১৯৫২-৬০ সময়কালে সাহিত্যচর্চা ছিল খেলাঘরের প্রধান কাজ| ১৯৬৪ সালে বজলুর রহমান খেলাঘরের ভাইয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর খেলাঘর সমাজভিত্তিক শিশু সংগঠনে রূপ নেয়| ১৯৭১ সালে খেলাঘর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে| মুক্ত স্বদেশে খেলাঘর স্লোগান তৈরি করে— ‘এসো গড়ি খেলাঘর, এসো গড়ি বাংলাদেশ’| 

সংবাদের পাঠক পারিবারিকভাবে ছিলাম কিন্তু সংবাদের ‘খেলাঘর’ পাতার মাধ্যমে অনেকের মতো আমারও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে কিশোরকালে—তরুণ বয়সে| বিনীতভাবেই বলি— ১৯৭২ সালে  গাইবান্ধা শহরে ‘শতদল খেলাঘর আসর’ প্রতিষ্ঠিত হয়, আমি এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হয়ে ১৯৭৭ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করি| খেলাঘর রংপুর জেলা কমিটির একজন সম্পাদক (১৯৭৪-৭৬) এবং খেলাঘরের জাতীয় পরিষদ সদস্য (১৯৭৮-৮২) হিসেবে দায়িত্ব পালনের বাইরেও গাইবান্ধা ও রংপুর এলাকায় খেলাঘরের নতুন শাখা সংগঠন ও কর্মকাণ্ড বাড়ানোর ক্ষেত্রেও নিবিড়ভাবে ভূমিকা রাখি| 

১৯৭২ সালের ৮ই অক্টোবরে রণেশ দাশগুপ্তকে গাইবান্ধায় শতদল খেলাঘর আসর থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়, আমি এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করি| রণেশ দাশগুপ্ত তখন সংবাদের সাথে বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন| অনুষ্ঠানে আলোচনা  হয়, এর পর শতদলের ভাইবোনেরা তাঁকে গান গেয়ে শোনান| তিনি বক্তব্য রাখেন| ছোট ভাই-বোনেরা তাঁকে গল্প শোনানোর আবদার করলে, তিনি ‘এক মিনিট’ শিরোনামের একটি গল্প শোনান| এই সংবাদটি ‘খেলাঘর’ পাতায় ২৮ অক্টোবর ছাপা হয়|

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে খেলাঘরের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়| এই সম্মেলনে— খেলাঘরের  সভাপতি পদে বজলুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক পদে জিয়াাউদ্দীন আহমদ নির্বাচিত হন| এই সম্মেলনের পর স্বাধীন দেশের মাটিতে নতুন উদ্দীপনায় খেলাঘরের কার্যক্রম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে ও জোরালো হয়| ১৯৭৩ সালে খেলাঘরের প্রথম সম্মেলনে গাইবান্ধা থেকে আমি এবং অপর দু’জন খেলাঘরকর্মী ও বন্ধু রন&জু ও মোস্তফা অংশ নিই| এই সম্মেলনে হাতেগোনা অল্প ক’টি শাখা-সংগঠন অংশগ্রহণ করে| উল্লিখিত সম্মেলনে খেলাঘরের পতাকা উত্তোলন করেন পান্না কায়সার এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী| তাদের দুজনই মুক্তিযুদ্ধে তাদের স্বামীকে হারিয়েছেন, বয়সও অল্প, এক বেদনাবিহ্বলতার মধ্যে তাদের বক্তৃতা সেদিন শুনেছিলাম! বজলুর রহমানের সভাপতিত্বে সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত| সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আগের দিন বংশালের সংবাদ অফিসে জিয়া ভাই (খেলাঘরের সাধারণ সম্পাদক) আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে ভাইয়া (বজলুর রহমান) ও অন্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন| সেই যে সংবাদ অফিসে যাওয়া শুরু, তারপরও বংশালের কার্যালয়ে কতবার গিয়েছি, বংশাল থেকে সংবাদের কার্যালয় পুরানা পল্টনে স্থানান্তরিত হওয়ার পরও কতবার গিয়েছি— প্রয়োজন, যোগাযোগ ও আড্ডা দিতে!

সেইসময়ে ব্লকযুগ ছিল, জিঙ্কব্লকে ছবি, অলংকরণ ও হেডিং ছাপা হতো| সংবাদের খেলাঘর বিভাগ থেকে কিছু জিঙ্কব্লক নিয়ে গাইবান্ধায় স্থানীয়ভাবে খেলাঘর থেকে একুশ ও অন্যান্য দিবসে সংকলনও আমরা বের করেছি, প্রেসে কালিমাখা হয়ে, রাত জেগে|

সংবাদের ‘খেলাঘর পাতা’ ও খেলাঘর সংগঠনটির হাত ধরাধরি করে চলেছে— আমাদের মতো মানুষদের ˆশশব-ˆকশোর ও তারুণ্যকে অলোকসামান্যতা দিয়ে উন্নত রুচিবোধ, নৈতিকতা, দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও যুক্তিবাদী হয়ে ওঠার প্রেষণা যুগিয়েছে, তারই সাযুজ্যে আমাদের দেশের মূলধারার চেতনাও সমৃদ্ধ হয়েছে|       


উপসম্পাদকীয় কলাম ও আদর্শনিষ্ট মানুষেরা

১৯৫১ সালের ১৭ মে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘সংবাদ’| প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সংবাদ-এ কর্মরত সংবাদকর্মীদের অধিকাংশই ছিলেন অগ্রসর চিন্তার মানুষ|  রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অন্তঃপ্রাণ  প্রগতিশীল  দর্শনের অধিকারী ছিলেন তারা| পাকিস্তান আমল থেকে সংবাদের সাথে যুক্ত থেকে মৃত্যৃর আগ পর্যন্ত সংবাদের এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ও সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন আহমদুল কবির, জহুর হোসেন চৌধুরী, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লাা কায়সার, আলী আকসাদ, বজলুর রহমান প্রমুখ|

’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর— বিশেষভাবে সংবাদের উপসম্পাদকীয় কলাম লিখে জহুর হোসেন চৌধুরী, আবু জাফর শামসুদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত, বজলুর রহমান প্রমুখ আমাদের শুধু অনুপ্রাণিত করেননি, জাতির পথচলার ক্ষেত্রে পথ দেখিয়েছেন| আমরা সংবাদের পাঠক হিসেবে তাঁদের লেখা পড়ে কিশোর ও তরুণবেলাকে শাণিত করেছি, তাঁদের কাছ থেকে পেয়েছি ভাবুকতা, সুচিন্তা, মননশীলতা ও সময়কে বাজিয়ে দেখার সাহস| এঁদের অনেকের সাথে আমাদের পরিচয়ও ঘটেছিল, যোগাযোগ হয়েছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে— তা মনে হলে এখনো গৌরববোধ হয়! যারা সংবাদের সাথে যুক্ত ছিলেন, তারা আমাদের কালে শুধু বিশিষ্টজনই ছিলেন না, ছিলেন আদর্শনিষ্ঠ ও পথপ্রদর্শক|

আমরা মনে করতে পারি— ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক, যুক্তিশীল, অগ্রসর চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে ‘সংবাদ’ই ছিল মূল দৈনিক, পাঠকনন্দিত ˆদনিক| তখন এত দৈনিক ছিল না, ছিল হাতেগোনা দৈনিক— ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা ও অন্যান্য ক’টি দৈনিক| তখন বের হয়নি— আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, প্রথম আলো, জনকণ্ঠ ও আরো কিছু ˆদনিক| ‘সংবাদ’ সেই সময়ে খবর, অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন, ফিচার, শিশু-কিশোর পাতা খেলাঘর, নারী, চলচ্চিত্র পাতা ও সাহিত্য সাময়িকী পাতা নিয়ে ছিল তুলনারহিত| অন্য কোনো দৈনিক ভিন্ন ভিন্ন পাতা নিয়ে ওতটা সমৃদ্ধ ছিল না| পাঠকও ছিল বিস্তর! সংবাদের পাঠকরাই পরবর্তী সময়ে নতুন দৈনিকগুলোর পাঠক হয়ে ওঠে! তবে সংবাদের উপসম্পাদকীয় কলাম সে সময়ে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, ইতিহাস বিকৃতিরোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঠিক বিশ্লেষণ, বঙ্গবন্ধুর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার প্রতি আপোসহীন থেকে যে ভূমিকা পালন করেছে, তা আর কোনো ˆদনিক সে-সময়ে ধারাবাহিক ও একনিষ্ঠভাবে তেমন ভূমিকা পালন করতে পারেনি! উল্লিখিত পর্বে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সংবাদের ভূমিকার তাৎপর্য ও মূল্যায়ন গবেষকদের জন্য একটি বিশেষ ক্ষেত্র হতে পারে!  


সংবাদের খবর ও আমাদের ট্রাজেডি

সংবাদ যখন বেশ পাঠকপ্রিয় ও প্রচার সংখ্যায় এগিয়ে, সেইসময়ে রণজিৎ রঞ্জন চাকী স্বাধীনতাত্তোরকাল থেকে সংবাদের গাইবান্ধাস্থ নিজস্ব সংবাদদাতা ছিলেন| ১৯৭৩-৭৪ এর দিকে তিনি ঢাকায় চাকরি নিয়ে বেশ ক’মাস ছিলেন, তার অনুরোধে ও ব্যবস্থাপনায় সেই সময়ে আমি সংবাদে সংবাদ প্রেরণ করতাম| তিনি ৭৪ ঢাকা থেকে ফিরে গিয়ে আবার গাইবান্ধায় থিতু হোন| তিনি ন্যাপ করতেন, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সময়ে তার বোনের বিয়ের অনুষ্টান থেকে গ্রেফতার হোন| বেশ ক’মাস জেলে থাকেন| তার জেলে থাকার সময়েও আমি সংবাদে খবর পাঠাই| আমার নামেও হুলিয়া থাকে ও কতবার যে আমাকে ধরার জন্য বাসায় ও অন্যান্যখানে পুলিশ হানা দেয়| এই সময়ে ক’টি সংবাদ ছাপার সাথে জড়িত থাকার কারণে অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি শুধু হইনি, সম্পর্ক ও পড়ালেখার ক্ষতিরও সম্মুখীন হতে হয়েছে| 

আমার বাবার নিজের চাচাতো ভাইকে, তার স্কুল শিক্ষক ভাইয়ের মেধাবী ছেলে প্রায় আমার সমবয়সী অর্থাৎ আপন ভাস্তে জমিজমার দ্বন্দ্বে খুন করে| আমি খবর পাঠাই সংবাদে, ‘ভাতিজার হাতে চাচা খুন’ তা সংবাদে ছাপা হয়, ৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪| এর পর সে জেল খেটে বের হয়ে সমাজে বেশ প্রতিষ্ঠিত কিন্তু সেদিনের সেই সংবাদ প্রকাশের পর থেকে আর কখনো দেখা হয়নি, যোগাযোগ হয়নি!  আরও একটি ঘটনা, খবর পেলাম যে, সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বাসায় এসএসসি পরীক্ষার সময় পার হওয়ার পর, কজন এসএসসি পরীক্ষার্থী সেই শিক্ষকের বাসায় আবারও বসে নকল করে খাতা ভরাচ্ছে| এই সংবাদ জানার পর তৎকালীন স্থানীয় সিপিবি নেতা গনেশ প্রসাদ ও আমি দুজন ঝড়ের বেগে সেই বাসায় ঢুকে নকল খাতা কেড়ে নিয়ে সোজা তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের হাতে তুলে দিই| এটা নিয়ে খবর ছাপা হয় শুধু নয়, বেশ হইচই পড়ে যায়| সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের চাকরিগত শাস্তি ও বদলি হয়| সেই শিক্ষক শুধু আমার স্কুল শিক্ষক ছিলেন না, আমার পিতার পরিচিত ও ঘনিষ্ঠজনও ছিলেন| 

আর একটি খবর ছাপা হয়— ১৯৭৭ সালের ২০ আগস্ট ‘সংবাদ’-এর প্রথম পৃষ্ঠায় ‘অধ্যাপক বটে’ শিরোনামে| এই সংবাদ প্রকাশের কারণে আমাকে ও বন্ধু লাকুকে ২২ আগস্ট সরকারি কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ডেকে নিয়ে সভা করলেন, বিভিন্ন মহল থেকেও চাপ আসল| কিন্তু ট্রাজেডি হলো— আমরা যারা বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম সেই সময়ে, তাদের ক’জনকে সেই শিক্ষক বায়োলজির ব্যবহারিক পরীক্ষায় পাস মার্কের চেয়ে কম নম্বর দিয়ে ফেল করে দিয়েছিল| সেই সময়ে ব্যবহারিক পরীক্ষায় কেউ অকৃতকার্য হলে, সে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে যায়| মার্কশীট পেয়ে সেদিন আমরা অবাক হয়েছিলাম! কলেজে হইচই হলো, আন্দোলন হলো! সেই শিক্ষক চুপিসারে বদলি নিয়ে অবশেষে কলেজ ত্যাগ করেছিলেন|

রণজিৎ রঞ্জন চাকীর পর ১৯৭৬ থেকে দীর্ঘদিন মফিজুল হক তারা সংবাদের গাইবান্ধার প্রতিনিধি ছিলেন| তিনি কী একনিষ্ঠভাবে বছরের পর বছর সার্বক্ষণিকভাবে সংবাদের জন্য কাজ করতেন| তখন সাংবাদিকতার মান ও সম্মান এতটাই উদ্দীপক ছিল যে, মফিজুল হক তারা মেডিক্যাল পড়া বাদ নিয়ে মফ¯^ল সাংবাদিকতাকে জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন! সাংবাদিকতার নতুন অর্থ-দ্যোতনা ˆতরি করে সংবাদের উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিথি হিসেবে মোনাজাতউদ্দিন ভিন্নধর্মী অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন রচনায় সংবাদের পাঠকপ্রিয়তা শুধু বাড়াননি, সাংবাদিকতায় নিজের সৃজনশীল শক্তিরও গভীর পরিচয় মেলে ধরেছেন| মোনাজাতউদ্দিন সেই সময়ে রংপুরে অবস্থান করলেও তিনি উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে খবরের জন্য ছুটতেন| তিনি পেশাগতভাবে গাইবান্ধায় ঘন ঘন আসতেন, আমরা তা কাছ থেকে দেখেছি, তার উজ্জ্বল চোখ যেন খববের অনুসন্ধানে নেশাতুর ছিল! মোনাতাজউদ্দিন সংবাদ সংগ্রহ করতে ১৯৯৫ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর গাইবান্ধার যমুনা নদীতে ড্রেজিং পয়েন্টের ছবি তুলতে গিয়ে পানিতে পড়ে যান এবং পানিতে ডুবে মারা যান| সেই সময়ে তার সাথে ছিলেন সংবাদের গাইবান্ধার প্রতিনিধি মফিজুল হক তারা| মোনাতাজউদ্দিনের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে  শ্রমনিষ্ঠ ও জীবনঘনিষ্ঠ  জনপদ-সাংবাদিকতার একটি পর্বের অবসান হয়| 

সংবাদের ‘চিঠিপত্র’ বিভাগ এক সময় ছিল বেশ নির্বাচিত ও গুরুত্ববহ| ‘চিঠিপত্র’ বিভাগে ছাপা বিষয়— তখন কীভাবে সংশ্লিষ্টজন ও পাঠককে নাড়া দিত, তা এই সময় এসে অনুভব করা যাবে না!  সেই সময়ে সংবাদের ‘চিঠিপত্র’ বিভাগে প্রকাশিত আমার লেখা চিঠির দু-একটি উদাহরণ:  ‘গাইবান্ধায় বসন্ত মহামারী’  ১৮মার্চ ১৯৭৩, সেই সময়ে আর একটি চিঠি ‘বসন্ত জীবনের পক্ষে দুর্বিষহ’| ‘গাইবান্ধা পার্ক : নামে আছে, কাজে নেই’, ২১ শে মে ১৯৭৬|

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে এমএ পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্ট বের হওয়ার আগেই ঢাকায় ১৯৮৩ সালের শেষে এসে এক প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে থিতু হলাম| তখন সংবাদে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে তৎকালীন সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আমাদের খেলাঘরের ভাইয়া বজলুর রহমানকে বলেছিলাম, তখন পত্রিকার আর্থিক অবস্থা ও তুলনামূলক বেতন ভালো না থাকায়, আমাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন আন্তরিকভাবেই, ভালোবেসেই| সে কথাও মনে পড়ছে আজ!

আবুল হাসনাত, ‘সংবাদ সাময়িকী’ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

আজ ‘সংবাদ সাময়িকী’র সম্পাদক আবুল হাসনাতের কথা বিশেষভাবে স্মরণে আসছে! ব্যক্তিগতভাবে লেখা ছাপানোর অনুমোদন আমি তার কাছ থেকে দীর্ঘদিন ও ধারাবাহিকভাবে পেয়েছি, তা ভাবলে তার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ থাকে না| তিনি  ‘সংবাদ সাময়িকী’ দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে সম্পাদনা করেন, তার সম্পাদিত ‘সংবাদ সাময়িকী’তে আমার লেখা ছাপা হয়েছে ধারাবাহিকভাবে প্রায় ২০ বছর| ‘সংবাদ সাময়িকী’র পর, ২০০৪ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি সাহিত্যপত্রিকা ‘কালি ও কলম’-এর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন, সেই  ‘কালি ও কলম’ পত্রিকায়ও প্রথম থেকেই নিয়মিতভাবে তিনি ধারাবাহিকভাবে আমার কবিতা ও প্রবন্ধ ছাপিয়েছেন, আমার সৌভাগ্য যে— তার মৃত্যুর আগে, তার সম্পাদিত ‘কালি ও কলম’-এর শেষ সংখ্যায়ও আমার একটি দীর্ঘ কবিতা ছাপিয়েছেন| আমার সাহিত্যজীবনে, আর কোনো সম্পাদকের কাছ থেকে এত দীর্ঘ সময় ও ধারাবাহিকভাবে এতটা অনুমোদন পাইনি! ‘সংবাদ সাময়িকী’ ও ‘কালি ও কলম’ পত্রিকায় ৪০ বছরের মধ্যে প্রায় ৩০-৩৫ বছর আমার লেখা ছাপিয়ে যে ভূমিকা তিনি পালন করেছেন, তা কখনো ভোলা যাবে না| তার হাত দিয়ে লেখা ছাপা হলে— মনে হতো, আমি ফুরিয়ে যায়নি, আমাকে আরও লিখতে হবে| 

শ্রদ্ধেয় আবুল হাসনাতকে নিয়ে অনেকের মতো আমারও কিছু স্মৃতি রয়েছে— যা অনুরণিত হবে বেঁচে থাকা পর্যন্ত| আমি কতবার ভেবেছি— তাকে আমি একটি বই উৎসর্গ করবো, কিন্তু পারিনি— পর মুহূর্তেই ভেবেছি— তিনি যদি ভাবেন,  তোষামোদ করছি| সে-কারণে তা করা সম্ভব হয়ে উঠেনি| আরও ভেবেছিলাম, তাকে নিয়ে লিখবো বা তার কোনো বই নিয়ে| এমন ভাবনা থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত, তার ‘নির্বাচিত কবিতা’ বইটি কিনে নোটও করেছিলাম, কিন্তু সেই ইচ্ছেও অবদমিত রেখেছিলাম| তবে, তার সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’  নামের সংকলনটি নিয়ে একটি দীর্ঘ লেখা, তাঁর মৃত্যুর ক’মাস আগে লিখেছিলাম, তা জাতীয় গন্থ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত ‘বই’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, তা তিনি দেখেছিলেন কিনা জানিনে! আমরা ক’জন তাঁর গুণগ্রাহী মাঝে মাঝে আলাপও করেছি, তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানানো উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, সে-পথে আমরা যেতে পারিনি!

আবুল হাসনাত এমন একজন সম্পাদক ছিলেন, যিনি লেখকদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখতেন, যেন ব্যক্তিগত সম্পর্ক এমন পর্যায় না দাঁড়ায়, যাতে করে লেখা নির্বাচনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হয়— এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতেন বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে| সেকারণে লেখা দিতে গিয়ে কেউ বসে আড্ডা বা অতিরিক্ত কথা বলবেন, সে-রকম সুযোগ পাওয়া দুষ্কর ছিল| কিন্তু লেখা তার নিজের পছন্দ হলে, তা ছাপিয়ে দিতেন| ব্যক্তিগত পরিচয়ের বিষয়টি ছিল লেখার ক্ষেত্রে গৌণ| তিনি যখন ‘সংবাদ সাময়িকী’ সম্পাদনা করতেন, তখন আমার কর্মস্থল পাশেই ছিল, তবুও গিয়ে সরাসরি হাতে লেখা দিতাম না, জিপিওতে গিয়ে লেখা পোস্ট করেছি| তার সাথে দেখা হলে সচরাচর বলতেন— ‘ভালো’, আর বলতেন ‘লেখা দিয়েন’| তার সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’ সংকলনে কবিতা নিয়েছিলেন, আমি তিনটি কবিতা দিয়েছিলাম, আমি ভেবেছিলাম, আমার একটি কবিতা ছাপবেন কিন্তু না, তিনটি কবিতা ছাপিয়ে দিয়েছিলেন| সংবাদে ভ্রমণ কাহিনি লিখতে চেয়েছিলাম, তিনি বলেছিলেন— লিখতে, তা লিখতে পারিনি| 

আরও মনে পড়ছে— ৮ জুলাই ২০০৩ সালে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর, আমি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলাম, তা ‘সংবাদ সাময়িকী’তে তিনি ছাপিয়েছিলেন| ২০১৯ সালে বাংলা একাডেমির একুশের অনুষ্ঠানে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভায় আবুল হাসনাত মূল প্রবন্ধ পড়লেন, তিনজন আলোচকের মধ্যে আমিও ছিলাম| একই মঞ্চে তাঁর সাথে সেদিন আলোচনা করতে পেয়ে গৌরববোধ হয়েছিল| বাংলাদেশের সমান বয়সী তাঁর সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, এ-দেশের মূল সংস্কৃতি চেতনার কণ্ঠলগ্ন হয়ে শুধু আবর্তিত হয়নি, সেই সংস্কৃতিরধারা শক্তিশালী করার লক্ষে একনিষ্ঠভাবে কবি-লেখকদের তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন| অনেক কবি-লেখকের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন, তা সংশ্লিষ্টজনেরা নিশ্চিত অনুভব করেন|

আমাদের স্পষ্ট মনে আছে সামরিক শাসক এরশাদ তার শাসনামলে নিজে কবি হিসেবে আর্বিভূত হোন, তখন তার কবিতা প্রায় সকল পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকীতে বিশেষভাবে বিশেষ ট্রিটমেন্ট দিয়ে ছাপা হতো| আমরা জেনেিেছ— সংবাদেও তার কবিতা ছাপানোর জন্য পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু আবুল হাসনাত তা ছাপেননি! সেই সময়ে মাঝে মাঝে এরশাদ বিভিন্ন ˆদনিকের অফিস পরিদর্শনে যেতেন, একদিন সংবাদে এরশাদ এলেন, ¯^াভাবিকভাবে দেশের  প্রধান ক্ষমতাধর শাসক এসেছেন, সবাই আগ্রহ নিয়ে নড়েচড়ে উঠে বসলেন,  অনেকে কুশল বিনিময় করলেন কিন্তু আবুল হাসনাতের মধ্যে কোনোরকম আগ্রহের ছাপ পরিলক্ষিত হয়নি সেদিন, অন্যান্য দিনের মতো চুপচুপ বসে একান্তচিত্তে তিনি কাজ করেছেন| এই হলো আবুল হাসনাত, যাকে সংবাদ ধারণ করেই সংবাদই মর্যাদা বেড়েছে| এমন অবস্থা দেখে এরশাদ নাকি বলেছিলেন, ও ভদ্রলোক কে? নিশ্চয় উত্তরে এসেছে— আবুল হাসনাত! এমন আবুল হাসনাত এখন খুঁজে পাওয়া যায়?

আবুল হাসনাতের পর দীর্ঘদিন ধরে কবি ওবায়েদ আকাশ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ‘সংবাদ সাময়িকী’টি উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ করে আসছেন| এখনো এই সংবাদ সাময়িকীটি সাহিত্যমোদীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে| এখনো দৈনিক সংবাদের সাময়িকী ব্রডশীটে চার পৃষ্ঠায় বের হচ্ছে, অন্যান্য ˆদনিকের সাহিত্য পাতা চার পৃষ্ঠায় বের হতো, তা সঙ্কুচিত হয়ে কোনো দৈনিকে দুই পৃষ্ঠা বা এক পৃষ্ঠায় গিয়ে ঠেকেছে| ‘সংবাদ’ সেক্ষেত্রে এখনো ব্যতিক্রম| সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী চার পৃষ্ঠায় পূর্ণপ্রাণ নিয়ে এখনো বেঁচে আছে| আবুল হাসনাতের পরবর্র্তী সময় থেকে ওবায়েদ আকাশের হাত দিয়েও এখনো আমার নিয়মিত লেখা এই সাময়িকীতে ছাপা হচ্ছে, যা আমার জন্য গৌরবের ও আনন্দের| এত কবিতা, এত লেখা দীর্ঘকাল ধরে ধারাবাহিকভাবে আর কোনো ˆদনিকের সাহিত্য পাতায় আমার ছাপা হয়নি!

১৯৯১-৯৪ সালের দিকে জাতীয় কবিতা পরিষদ ও উৎসবের আর প্রয়োজন নেই বলে কেউ কেউ তাদের বিবেচনাবোধ তুলে ধরলেন, পত্র-পত্রিকায়, এদের মধ্যে ক’জন কবিতা পরিষদের সাথে যুক্ত থাকা বিশিষ্ট কবিও ছিলেন, কিন্তু কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ আমি কবি সৈয়দ শামসুল হকের এমন একটি লেখার প্রতিবাদ করে ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলাম, আমার মতামতটি ১৯৯১ সালের ২০ জুন সংবাদ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়| পরবর্তীতেও আরও দু’একজন বিশিষ্ট কবিও এমন মতামত প্রকাশ করে নিবন্ধ লেখেন| এক্ষেত্রে আবুল হাসনাত কালের বিশেষ জিজ্ঞাসা ও প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে বিশেষ মতামত প্রকাশের দ্বার সাহসের সাথে সেদিন উন্মুক্ত করেছিলেন|

এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজিত জাতীয় কবিতা উৎসবের সবচেয়ে দীর্ঘ-অতলস্পর্শী প্রতিবেদন বহুবার রচনা করেছেন— কবি সাইয়িদ আতীকুল্লাহ| সাংবাদিকতা পেশায় তিনি সৃজনশীল সাহিত্যের প্রখরতা দিয়ে সফলতা ছুঁয়ে ছিলেন| তিনি ˆদনিক সংবাদের বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন| তার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রতিবেদনের একজন আগ্রহী পাঠক ছিলাম আমরা অনেকে| তার নামে প্রকাশিত বহু প্রতিবেদন এক ধরনের আকর্ষণে মনকে টানতো, বিশেষ ব্যঞ্জনায় অনুরণিত করতো| বিশেষ করে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রতিবেদন, সংসদ বিষয়ক প্রতিবেদন, ঋতু পরিবর্তনের প্রতিবেদন তিনি রচনা করেছেন— আপন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভাষায় ও শৈলীতে| এসব প্রতিবেদনের গভীরতায় কখনো কখনো শ্লেষ, প্রতীক ও রূপকের ব্যঞ্জনা আমরা লক্ষ করেছি| এরশাদের শাসনামলে বা প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আবহাওয়া বা ভিন্ন প্রসঙ্গের প্রতিবেদন রচনা করে তিনি রূপক তার প্রতীকী ব্যঞ্জনায় পাঠকের বোধকে ভিন্ন দিক-নির্দেশনায় নিয়ে যেতে পারতেন| এই ধরনের প্রতিবেদন, লেখার শক্তি সমকালীন সংবাদপত্রে প্রায় দুর্লভ| তার এই ধরনের প্রতিবেদন সাহিত্য-মূল্য বা ভিন্ন ধারার প্রতিবেদনের দৃষ্টান্ত হিসেবে সংরক্ষিত হতে পারে|

সংবাদের ‘সাহিত্য সাময়িকী’ বহু বছর নিয়মিতভাবে আমি সংরক্ষণ করেছিলাম| ঢাকায় ভাড়া বাসায় থাকার কারণে, মাঝে মাঝে বাসা পরিবর্তন ও স্থান সংকুলানের অভাবে, সেগুলোসহ অনেক সংরক্ষিত পত্র-পত্রিকা ও বই বিক্রি করতে বাধ্য হই| তা মনে হলে এখনো কষ্ট পাই, বেদনা-বিহ্বলতায় ন্যুব্জ হই| এতদিনের আগলে রাখা ‘সংবাদ সাময়িকী’ সংরক্ষণ করা যদি যেত, তাহলে শিল্প-সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকত আমারও কাছে|

সংবাদের ‘সংবাদ সাময়িকী’ আমাদের সাহিত্য-রুচি শুধু তৈরি করেনি, সাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ ও কৌতূহল ˆতরি করেছে, লেখক হয়ে ওঠার প্রেরণা ও প্রসিদ্ধিও দিয়েছে| এমন অভিনবত্ব নিয়ে এখনো ‘সংবাদ সাময়িকী’ আমাদের অবিচ্ছিন্ন এক পার্থিবতা!

উপসংহার

বলা চলে আমাদের জীবনব্যাপী লেপ্টে থাকা এই এক দৈনিক পত্রিকা ‘সংবাদ’, যার পথচলা দীর্ঘদিনের, যার পথচলা সড়কে আমরাও দীর্ঘদিন হেঁটে চলেছি! আমরা চাই, ‘সংবাদ’ তার ছন্দ ও মাত্রা নিয়ে আবারও তারুণ্যদীপ্ত হয়ে সমস্ত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নতুন বৈজয়ন্তী নিয়ে পথ চলুক, তেমন পদশব্দ ইন্দ্রিয়গোচর হলে— অন্যান্য অনেকের মতো আমিও অপার আনন্দ পাবো| [পুনর্মুদ্রণ]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত