আত্মপরীক্ষা
গোলাম কিবরিয়া পিনু
আর একটু হেলে পড়লেই—
আমিও হেলেদুলে চলতে পারতাম!
চালতা গাছের নিচে গিয়ে
হাঁ করে চাকের মধুও মুখে তুলতে পারতাম!
যার তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে
রক্তে অর্জিত গৌরব ধুলোয় লুটিয়ে দিয়ে
লুণ্ঠনের সহযোগী হয়ে,
আত্মবিনাশী হয়ে উঠতে পারিনি!
আয়োডিনের অভাবে আরশোলাও বাঁচতে না পারে,
আমি আয়োডিনের অভাবেও বেঁচে থাকি
আত্মজৈবনিক আত্মপরীক্ষায়,
আত্মা বিক্রির রমরমা বাজারেও!
শিকড়
পুলক হাসান
বৃক্ষের শিকড় এত গভীরে প্রোথিত
উপড়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট নয় ঐ হাওয়ার গর্জন
এবং যথেষ্ট নয় ইতিহাস মুছে ফেলার জন্য
ঐ কালিমা লেপন!
যদিও নগ্ন ও বর্বর তৎপরতায়
থমকে দাঁড়ায় সময়!
তার মানে এই নয়
নদীর বাঁকফেরা সম্ভব নয়|
সম্ভব
যেহেতু বাস্তবতার বহুরূপ!
নইলে আঁধারের বুক চিরে কেন আসে আলোর প্রহর?
আর তুমিই-বা কেন হবে স্মৃতিকাতর?
দিনের কথা
দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
স্বাভাবিক দিন গোপনে চলে যায়
কেউ মনে রাখে না|
ঝোড়ো দিন মনে রাখে
বেশি রোদ্দুরের দিন
অতিবৃষ্টি বজ্রপাতের সময়|
জীবনে নেমে আসা সুখের দিন
জীবনে নেমে আসা ঝরনার আদলে
দুঃখেরও দিন|
মনে রাখে— লিখে রাখে— গেঁথে রাখে—
এই সব দিন ফটো ফ্রেমে ছবি হয়ে ওঠে
স্বাভাবিক দিনের কোনো গৌরব নেই|
ট্রেন
মতিন রায়হান
ট্রেন ছুটছে, ছুটছি আমিও
মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট
দেখতে দেখতে কাছের একটি গাছ বিন্দু হয়ে যাচ্ছে
আবার দূরের একটি বিন্দু ক্রমশ স্পষ্ট হতে হতে
ধরা দিচ্ছে একটি গাছ হয়ে
আবার মিলিয়ে যাচ্ছে দূর হাওয়ায়...
আমিও নিজেকে ক্ষণে ক্ষণে বিন্দুবৎ ভাবছি
কারণ এক বিন্দু থেকেই তো আজকের এই আমি
এবং আমরাও...
ট্রেন ছুটছে, ছুটছি আমিও
আমি ও ট্রেন ক্রমশ গন্তব্যমুখী
সমান্তরাল
জীবন ও মৃত্যু
মৃত্যু ও জীবন
কী অদ্ভুত মেটাফর পরস্পরের!
মা
যাকিয়া সুমি সেতু
মা মাগো, তোমাকে লিখছি আকাশ রঙের চিঠি— এই চিঠিটা আজ আর কোনো ডাকবাক্সে যাবে না, যাবে না কোনো নক্ষত্রবাড়ি আমি জানি তুমি এখন অন্য এক ঠিকানায় যেখানে চিঠির খাম নেই, ডাকটিকিট নেই, যেখানে বেদনারা কষ্টের পৃথিবী হয়ে গেছে তুমি চলে যাওয়ার পর আমি বড় হয়েছি, আমি বড় হয়েছি, কাশফুলের ধবধবে সাদায় তোমার লেখা “আলোর দর্শন” গ্রন্থের মতো| জানো তো মা, এই বড় হওয়া আনন্দের নয় এ বড় হওয়াটা ভারী, নিঃশব্দ, অনিচ্ছাকৃত|
অনেক ইচ্ছে করে, যদি একবার তোমার কোলে মাথা রাখতে পারতাম, এই আষাঢ়ের সব জল হয়তো থেমে যেত| মা, যদি কোনো দিন এই চিঠি কালিদাসের মেঘদূত নিয়ে যায় তোমার কাছে, তবে তুমি আমার জবাফুলের এই চিঠিটা পড়ো মা তুমি পড়ে দেখ মা, তুমি আছো পৃথিবীর সব জনপদে, তেরশত নদীর দেশ বাংলাদেশে জেনো তোমার সন্তান তোমাকেই খোঁজে প্রতিটি বৃষ্টিতে, নদীর শব্দে, প্রতিটি আষাঢ়ে যেখানে ফেলে গেছ পলিমাটি কোমলে তোমার বিরহী বেহাগ পূরবীর সুরে পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট, বঙ্গ, রাঢ়, হরিকেল ও চন্দ্রদ্বীপের সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায়|
আমি বিশ্বাস করি মাগো মহেঞ্জোদারো হরপ্পা, অশোকের তাম্র শাসনের শিলালিপির মতো তোমার মুখেরভাষা থেকেই জন্মেছে মাতৃভাষা চর্যাপদের সহজিয়াদের সব বৌদ্ধ অক্ষর, সওদাগরের মধুকর ডিঙার বহর থেকে তুমি ছড়িয়ে আছে মহাস্থানগড়ের দুর্গপ্রাচীরে, পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহারের স্তূপ ও প্রজ্ঞাপারমিতা ফলকে, ময়নামতির শালবন ও আনন্দ বিহারের ইটবাঁধানো কক্ষপথে| আমি তাইতো মা সারাদিন বটফলের বীজের মতো স্বপ্ন বুকে নিয়ে তোমাকে খুঁজি তুমিই তো বলেছিলে আমায় তুমি আছো অতীশ দীপঙ্কর, নালন্দা-ˆমত্রেয় ঐতিহ্যে তুমি বলেছিলে আমি যেন একবার হলেও যাই, দেবীকোট, কোটিবর্ষ, ভাসুবিহার| আমার এই চলার পথে সব নদীর জল ডেকে বলে তুমি রয়েছো ঢেউয়ে শান্ত অববাহিকায় পদ্মা, মেঘনা, তিস্তা, কর্ণফুলী, আফ্রা, যমুনায়
মা, মাগো তুমি চলে যাওয়ার পর থেকেই এ পৃথিবীটা ভিজে আছে হিমালয় বরফের মতো মেঘ না থাকলেও আমার চোখে বৃষ্টি নামে| আষাঢ় এলেই মনে হয়, এই বুঝি তুমি এসছো, ভেজা আঁচলে আমার কপাল ছুঁয়ে বলবে: “কাঁদিস না রে, এইতো আমি তোর পাশেই|” মা তোমার অনুপস্থিতিই আমাকে শক্ত করেছে, আবার ভেতরে ভেতরে ভেঙেও দিয়েছে, এই চিঠিটা পড়ো মা একটিবার আমি জানি এই চিঠিটা আর কোন ডাকবাক্সে যাবে না, তবু লিখলাম প্রাণের প্রণতি মিশিয়ে— ইতি তোমার কন্যা— যাকিয়া সুমি সেতু...
আদ্যন্ত জানা নেই
ওমর ফারুক জীবন
আমি আর তুমি,
আমাদের মাঝখানে একটা মৌসুমি বায়ু খেলা করে,
তুমি বারবার বিভ্রান্ত হও, আমি উদ্ভ্রান্ত!
তুমি ঋতু থেকে ঋতুতে আবর্তিত হও,
তুমি সাক্ষাৎ এক একটা মৌসুম ,
তোমার ভিতর ডেকে ওঠে অসংখ্য অসংখ্য পাখি,
অগুনতি নদীর কলস্বর,
বাগানের পর বাগান ফুলে ফলে ভরে ওঠে
আর তুমি মৌসুমি বায়ুর ভিতর সুঘ্রাণ ছড়াতে ছড়াতে
ডেকে আনো অন্য মৌসুম,
তোমার ভিতর রোদ ওঠে,
উড়ে আসে মেঘের পর মেঘ, মৌসুমি ঝড়!
রোদ বৃষ্টি শেষে আলোড়নের পর
আমার ছিন্নভিন্ন আত্মা মৌসুমি ঝড়ের কবলে পড়ে
সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেলে বিষুবরেখারও দূরে
আজীবন ডুবন্ত জাহাজ!
অথচ আমি আর তুমি অভিন্ন দুটি পথ
ভিন্ন ভিন্ন দিকে চলে গেছি, আদ্যন্ত জানা নেই
কোথায় শুরু কোথায় শেষ!
কার্যকারণ
ফারুখ সিদ্ধার্থ
হামেশা নির্মম পড়ে যায় প্রাণ
পথের পাশেই
উদ্ভ্রান্ত উড়াল পাখির বিধ্বস্ত করুণ ডানার
অজস্ত্র লোহিত পালক
পরিহাসে নাচে শাখামৃগ
কৌতুকে বাজায় তুমুল তালিয়া
হিউম্যানিজম আর ফ্যাসিজমের বিতর্কে
আমিও কি কম যাই?
আমি যে তাদের উত্তরসূরি—
শিকার-জীবনে যারা একদিন
মেতেছিল জীবনের আদিম আনন্দে...
ভুলের ভিড়ে
রেজাউল করিম
এখন চারদিকে ভুল মানুষে ভরপুর
সারাক্ষণ জোটবদ্ধ ভুলেরা শুধু ডাকে, যাই কোথায়?
শেষ পর্যন্ত ভুলের ভিড়ে অবস্থা এমন যেন তথৈবচ|
এখন মূর্খরা জ্ঞানীর রাজ্যে মস্ত মাতব্বর|
বাড়ছে দক্ষিণ থেকে উত্তরে
হিংসা বিদ্বেষ হানাহানি|
এখন পৃথিবী যেন কঠিন গদ্যময়,
কবিতার খেরোখাতা মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খায়|
এখন কিশোরীর আর্তনাদ শোনার কেউ নেই,
মা একাকী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে দমবন্ধ কক্ষে;
আহা, বৃদ্ধ বাবারা কী অসহায় দিনাতিপাত করে|
এখন রাস্তায় হু-হু বাড়ে নিরন্ন মানুষ
যাবো কোথায়, আমি তো ভুলের ভিড়ে নিরূপায়|
এখন চারদিকে ভুল মানুষেরা
কী দাপটে পগারপার হয়ে যায়|
এখন ভুলে ভুলে মহাভুলে আচ্ছন্ন যেন
এই সমাজ সংসার রাষ্ট্র জাতিসংঘ...
হরমুজ প্রণালীর চোখে
অমল কুমার বর্মন
লেলিহান পাঁজরে আগুন
রক্তাক্ত পিচ্ছিল জলরাশি
ঈগলের চোখে— মৃত উপত্যকার
রাশি রাশি শব
হরমুজ প্রণালীর রক্তমাখা ঠোঁটে
উন্নিদ্র পলাশ খুন হলে
টনটনে ক্লান্ত বুক অন্ধকার
সময়ের
ক্রোড়পত্রে উদাস
বিষাদের সফেদ চুয়িংগাম
কার ঠোঁটে কতটা মানায়
ভেবে জ্বলে নেভে
সন্ধ্যার জোনাকি
হরমুজ প্রণালীর চোখে অঝোর
শ্রাবণ...
এমন এলোমেলো হাওয়া
জারিফ আলম
কোনো কোনো দিন হারিয়ে যায়
পথ আর পথিকের উচ্চারিত দাবির কাছে|
বিদ্যমান অনেক কথার শর্ত সহজেই নাই হয়ে যায়
একটি দৃশ্যকাব্যের নির্ধারিত পাঠ শেষে;
এমন অনেক চুক্তির ভেতরে বন্দি হলো সবকিছু|
অনেক কিছুই আজকাল হেলাফেলা মনে হয়
এই বেঁচে থাকা ছন্নছাড়া ফড়িংয়ের গল্পের মতো|
এমন দিনকাল— মনের দাবি আঁকড়ে থাকে সবকিছু
কখনো যদি সামনে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার কথা বলতেই হয়—
ঠিক চেনা কোনো চিন্তার দুনিয়া থেকে বলেই দেবো না হয়;
কতোভাবেই না তোমাকে এঁকেছি অলৌকিক মহিমায়|
এমন এলোমেলো হাওয়া বয়ে যাবার দিনে
নিশাচর ইতিহাসেই বেঁচে থাকে প্রাগৈতিহাসিক কথামালা|
চোখে অনেক দিনের অনিদ্রা, বিস্ময়ের জাগরণ নিয়ে
আজন্ম মেখেছি মুগ্ধতার লেলিহান|
ফাইল ক্যাবিনেট
চঞ্চল নাঈম
অফিসের ফাইল ক্যাবিনেটগুলো
অসংখ্য সিদ্ধান্ত জমা রাখে
চাকরি পাওয়া
চাকরি হারানো
সহস্র ছুটির আবেদন
এমনকি অভিযোগপত্র—
যেন সব কাগজ ধাতব ড্রয়ারে ঘুমিয়ে থাকে
ভোরে অফিস খুললেই
তারা আবার নিভৃতে জেগে ওঠে
আর মানুষের ভাগ্য
ফাইল নম্বর হয়ে যায়
মলাটহীন পাণ্ডুলিপি
মুজাহীদুল ইসলাম নাজিম
সবুজ হারিয়ে সে এখন বিবাগী,
বৃন্তচ্যুত এক মলাটহীন পাণ্ডুলিপি|
যাকে আমরা ‘ঝরা’ বলে দাগিয়ে দিই,
সে আসলে নিঃশব্দের খোলস ছেড়ে—
হয়ে ওঠে শব্দের নিপুণ কারিগর|
তার তামাটে শরীরে এখন রোদের ঘ্রাণ,
আর পায়ের চাপে জেগে ওঠা
এক মচমচে দীর্ঘশ্বাস|
রঙের মায়া ঘুচিয়ে সে আজ—
একটি ধুলোমাখা শব্দকল্পদ্রুম|
কবিতায় প্রতিচ্ছবি
মাইশা ইয়াসমিন স্নেহা
কবিতায় যার প্রতিচ্ছবি, সে আমার দুর্দান্ত প্রেমিক
ভোরের রোদের মতো প্রেমের প্রচ্ছদ
বুকেতে জমিয়ে রাখে যত অভিমান
যেন পাথরের শীতলতা
দূরের আকাশে মিশে ভীষণ একাত্ম
নিজেকে হারিয়ে খুঁজে চলে আমাকেই
কী ভীষণ স্নিগ্ধতায় জীবন ভেলায়|
তার চোখের পাতায় কথা বলে আমার ছবিরা
তা তো শুধু বুঝে নিতে হয় অনুভবে,
আমার শূন্যতা তাকে দহনে জাগায়
বেদনার গল্প ভাসে তার চোখে-মুখে
ডায়েরির পাতায়-পাতায়
সে আমার প্রার্থনার মতো শুভ্র পবিত্র প্রমিক|
আমার সমুদ্র বুকে সে এখন গোপন নগর|

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬
আত্মপরীক্ষা
গোলাম কিবরিয়া পিনু
আর একটু হেলে পড়লেই—
আমিও হেলেদুলে চলতে পারতাম!
চালতা গাছের নিচে গিয়ে
হাঁ করে চাকের মধুও মুখে তুলতে পারতাম!
যার তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে
রক্তে অর্জিত গৌরব ধুলোয় লুটিয়ে দিয়ে
লুণ্ঠনের সহযোগী হয়ে,
আত্মবিনাশী হয়ে উঠতে পারিনি!
আয়োডিনের অভাবে আরশোলাও বাঁচতে না পারে,
আমি আয়োডিনের অভাবেও বেঁচে থাকি
আত্মজৈবনিক আত্মপরীক্ষায়,
আত্মা বিক্রির রমরমা বাজারেও!
শিকড়
পুলক হাসান
বৃক্ষের শিকড় এত গভীরে প্রোথিত
উপড়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট নয় ঐ হাওয়ার গর্জন
এবং যথেষ্ট নয় ইতিহাস মুছে ফেলার জন্য
ঐ কালিমা লেপন!
যদিও নগ্ন ও বর্বর তৎপরতায়
থমকে দাঁড়ায় সময়!
তার মানে এই নয়
নদীর বাঁকফেরা সম্ভব নয়|
সম্ভব
যেহেতু বাস্তবতার বহুরূপ!
নইলে আঁধারের বুক চিরে কেন আসে আলোর প্রহর?
আর তুমিই-বা কেন হবে স্মৃতিকাতর?
দিনের কথা
দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
স্বাভাবিক দিন গোপনে চলে যায়
কেউ মনে রাখে না|
ঝোড়ো দিন মনে রাখে
বেশি রোদ্দুরের দিন
অতিবৃষ্টি বজ্রপাতের সময়|
জীবনে নেমে আসা সুখের দিন
জীবনে নেমে আসা ঝরনার আদলে
দুঃখেরও দিন|
মনে রাখে— লিখে রাখে— গেঁথে রাখে—
এই সব দিন ফটো ফ্রেমে ছবি হয়ে ওঠে
স্বাভাবিক দিনের কোনো গৌরব নেই|
ট্রেন
মতিন রায়হান
ট্রেন ছুটছে, ছুটছি আমিও
মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট
দেখতে দেখতে কাছের একটি গাছ বিন্দু হয়ে যাচ্ছে
আবার দূরের একটি বিন্দু ক্রমশ স্পষ্ট হতে হতে
ধরা দিচ্ছে একটি গাছ হয়ে
আবার মিলিয়ে যাচ্ছে দূর হাওয়ায়...
আমিও নিজেকে ক্ষণে ক্ষণে বিন্দুবৎ ভাবছি
কারণ এক বিন্দু থেকেই তো আজকের এই আমি
এবং আমরাও...
ট্রেন ছুটছে, ছুটছি আমিও
আমি ও ট্রেন ক্রমশ গন্তব্যমুখী
সমান্তরাল
জীবন ও মৃত্যু
মৃত্যু ও জীবন
কী অদ্ভুত মেটাফর পরস্পরের!
মা
যাকিয়া সুমি সেতু
মা মাগো, তোমাকে লিখছি আকাশ রঙের চিঠি— এই চিঠিটা আজ আর কোনো ডাকবাক্সে যাবে না, যাবে না কোনো নক্ষত্রবাড়ি আমি জানি তুমি এখন অন্য এক ঠিকানায় যেখানে চিঠির খাম নেই, ডাকটিকিট নেই, যেখানে বেদনারা কষ্টের পৃথিবী হয়ে গেছে তুমি চলে যাওয়ার পর আমি বড় হয়েছি, আমি বড় হয়েছি, কাশফুলের ধবধবে সাদায় তোমার লেখা “আলোর দর্শন” গ্রন্থের মতো| জানো তো মা, এই বড় হওয়া আনন্দের নয় এ বড় হওয়াটা ভারী, নিঃশব্দ, অনিচ্ছাকৃত|
অনেক ইচ্ছে করে, যদি একবার তোমার কোলে মাথা রাখতে পারতাম, এই আষাঢ়ের সব জল হয়তো থেমে যেত| মা, যদি কোনো দিন এই চিঠি কালিদাসের মেঘদূত নিয়ে যায় তোমার কাছে, তবে তুমি আমার জবাফুলের এই চিঠিটা পড়ো মা তুমি পড়ে দেখ মা, তুমি আছো পৃথিবীর সব জনপদে, তেরশত নদীর দেশ বাংলাদেশে জেনো তোমার সন্তান তোমাকেই খোঁজে প্রতিটি বৃষ্টিতে, নদীর শব্দে, প্রতিটি আষাঢ়ে যেখানে ফেলে গেছ পলিমাটি কোমলে তোমার বিরহী বেহাগ পূরবীর সুরে পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট, বঙ্গ, রাঢ়, হরিকেল ও চন্দ্রদ্বীপের সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায়|
আমি বিশ্বাস করি মাগো মহেঞ্জোদারো হরপ্পা, অশোকের তাম্র শাসনের শিলালিপির মতো তোমার মুখেরভাষা থেকেই জন্মেছে মাতৃভাষা চর্যাপদের সহজিয়াদের সব বৌদ্ধ অক্ষর, সওদাগরের মধুকর ডিঙার বহর থেকে তুমি ছড়িয়ে আছে মহাস্থানগড়ের দুর্গপ্রাচীরে, পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহারের স্তূপ ও প্রজ্ঞাপারমিতা ফলকে, ময়নামতির শালবন ও আনন্দ বিহারের ইটবাঁধানো কক্ষপথে| আমি তাইতো মা সারাদিন বটফলের বীজের মতো স্বপ্ন বুকে নিয়ে তোমাকে খুঁজি তুমিই তো বলেছিলে আমায় তুমি আছো অতীশ দীপঙ্কর, নালন্দা-ˆমত্রেয় ঐতিহ্যে তুমি বলেছিলে আমি যেন একবার হলেও যাই, দেবীকোট, কোটিবর্ষ, ভাসুবিহার| আমার এই চলার পথে সব নদীর জল ডেকে বলে তুমি রয়েছো ঢেউয়ে শান্ত অববাহিকায় পদ্মা, মেঘনা, তিস্তা, কর্ণফুলী, আফ্রা, যমুনায়
মা, মাগো তুমি চলে যাওয়ার পর থেকেই এ পৃথিবীটা ভিজে আছে হিমালয় বরফের মতো মেঘ না থাকলেও আমার চোখে বৃষ্টি নামে| আষাঢ় এলেই মনে হয়, এই বুঝি তুমি এসছো, ভেজা আঁচলে আমার কপাল ছুঁয়ে বলবে: “কাঁদিস না রে, এইতো আমি তোর পাশেই|” মা তোমার অনুপস্থিতিই আমাকে শক্ত করেছে, আবার ভেতরে ভেতরে ভেঙেও দিয়েছে, এই চিঠিটা পড়ো মা একটিবার আমি জানি এই চিঠিটা আর কোন ডাকবাক্সে যাবে না, তবু লিখলাম প্রাণের প্রণতি মিশিয়ে— ইতি তোমার কন্যা— যাকিয়া সুমি সেতু...
আদ্যন্ত জানা নেই
ওমর ফারুক জীবন
আমি আর তুমি,
আমাদের মাঝখানে একটা মৌসুমি বায়ু খেলা করে,
তুমি বারবার বিভ্রান্ত হও, আমি উদ্ভ্রান্ত!
তুমি ঋতু থেকে ঋতুতে আবর্তিত হও,
তুমি সাক্ষাৎ এক একটা মৌসুম ,
তোমার ভিতর ডেকে ওঠে অসংখ্য অসংখ্য পাখি,
অগুনতি নদীর কলস্বর,
বাগানের পর বাগান ফুলে ফলে ভরে ওঠে
আর তুমি মৌসুমি বায়ুর ভিতর সুঘ্রাণ ছড়াতে ছড়াতে
ডেকে আনো অন্য মৌসুম,
তোমার ভিতর রোদ ওঠে,
উড়ে আসে মেঘের পর মেঘ, মৌসুমি ঝড়!
রোদ বৃষ্টি শেষে আলোড়নের পর
আমার ছিন্নভিন্ন আত্মা মৌসুমি ঝড়ের কবলে পড়ে
সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেলে বিষুবরেখারও দূরে
আজীবন ডুবন্ত জাহাজ!
অথচ আমি আর তুমি অভিন্ন দুটি পথ
ভিন্ন ভিন্ন দিকে চলে গেছি, আদ্যন্ত জানা নেই
কোথায় শুরু কোথায় শেষ!
কার্যকারণ
ফারুখ সিদ্ধার্থ
হামেশা নির্মম পড়ে যায় প্রাণ
পথের পাশেই
উদ্ভ্রান্ত উড়াল পাখির বিধ্বস্ত করুণ ডানার
অজস্ত্র লোহিত পালক
পরিহাসে নাচে শাখামৃগ
কৌতুকে বাজায় তুমুল তালিয়া
হিউম্যানিজম আর ফ্যাসিজমের বিতর্কে
আমিও কি কম যাই?
আমি যে তাদের উত্তরসূরি—
শিকার-জীবনে যারা একদিন
মেতেছিল জীবনের আদিম আনন্দে...
ভুলের ভিড়ে
রেজাউল করিম
এখন চারদিকে ভুল মানুষে ভরপুর
সারাক্ষণ জোটবদ্ধ ভুলেরা শুধু ডাকে, যাই কোথায়?
শেষ পর্যন্ত ভুলের ভিড়ে অবস্থা এমন যেন তথৈবচ|
এখন মূর্খরা জ্ঞানীর রাজ্যে মস্ত মাতব্বর|
বাড়ছে দক্ষিণ থেকে উত্তরে
হিংসা বিদ্বেষ হানাহানি|
এখন পৃথিবী যেন কঠিন গদ্যময়,
কবিতার খেরোখাতা মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খায়|
এখন কিশোরীর আর্তনাদ শোনার কেউ নেই,
মা একাকী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে দমবন্ধ কক্ষে;
আহা, বৃদ্ধ বাবারা কী অসহায় দিনাতিপাত করে|
এখন রাস্তায় হু-হু বাড়ে নিরন্ন মানুষ
যাবো কোথায়, আমি তো ভুলের ভিড়ে নিরূপায়|
এখন চারদিকে ভুল মানুষেরা
কী দাপটে পগারপার হয়ে যায়|
এখন ভুলে ভুলে মহাভুলে আচ্ছন্ন যেন
এই সমাজ সংসার রাষ্ট্র জাতিসংঘ...
হরমুজ প্রণালীর চোখে
অমল কুমার বর্মন
লেলিহান পাঁজরে আগুন
রক্তাক্ত পিচ্ছিল জলরাশি
ঈগলের চোখে— মৃত উপত্যকার
রাশি রাশি শব
হরমুজ প্রণালীর রক্তমাখা ঠোঁটে
উন্নিদ্র পলাশ খুন হলে
টনটনে ক্লান্ত বুক অন্ধকার
সময়ের
ক্রোড়পত্রে উদাস
বিষাদের সফেদ চুয়িংগাম
কার ঠোঁটে কতটা মানায়
ভেবে জ্বলে নেভে
সন্ধ্যার জোনাকি
হরমুজ প্রণালীর চোখে অঝোর
শ্রাবণ...
এমন এলোমেলো হাওয়া
জারিফ আলম
কোনো কোনো দিন হারিয়ে যায়
পথ আর পথিকের উচ্চারিত দাবির কাছে|
বিদ্যমান অনেক কথার শর্ত সহজেই নাই হয়ে যায়
একটি দৃশ্যকাব্যের নির্ধারিত পাঠ শেষে;
এমন অনেক চুক্তির ভেতরে বন্দি হলো সবকিছু|
অনেক কিছুই আজকাল হেলাফেলা মনে হয়
এই বেঁচে থাকা ছন্নছাড়া ফড়িংয়ের গল্পের মতো|
এমন দিনকাল— মনের দাবি আঁকড়ে থাকে সবকিছু
কখনো যদি সামনে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার কথা বলতেই হয়—
ঠিক চেনা কোনো চিন্তার দুনিয়া থেকে বলেই দেবো না হয়;
কতোভাবেই না তোমাকে এঁকেছি অলৌকিক মহিমায়|
এমন এলোমেলো হাওয়া বয়ে যাবার দিনে
নিশাচর ইতিহাসেই বেঁচে থাকে প্রাগৈতিহাসিক কথামালা|
চোখে অনেক দিনের অনিদ্রা, বিস্ময়ের জাগরণ নিয়ে
আজন্ম মেখেছি মুগ্ধতার লেলিহান|
ফাইল ক্যাবিনেট
চঞ্চল নাঈম
অফিসের ফাইল ক্যাবিনেটগুলো
অসংখ্য সিদ্ধান্ত জমা রাখে
চাকরি পাওয়া
চাকরি হারানো
সহস্র ছুটির আবেদন
এমনকি অভিযোগপত্র—
যেন সব কাগজ ধাতব ড্রয়ারে ঘুমিয়ে থাকে
ভোরে অফিস খুললেই
তারা আবার নিভৃতে জেগে ওঠে
আর মানুষের ভাগ্য
ফাইল নম্বর হয়ে যায়
মলাটহীন পাণ্ডুলিপি
মুজাহীদুল ইসলাম নাজিম
সবুজ হারিয়ে সে এখন বিবাগী,
বৃন্তচ্যুত এক মলাটহীন পাণ্ডুলিপি|
যাকে আমরা ‘ঝরা’ বলে দাগিয়ে দিই,
সে আসলে নিঃশব্দের খোলস ছেড়ে—
হয়ে ওঠে শব্দের নিপুণ কারিগর|
তার তামাটে শরীরে এখন রোদের ঘ্রাণ,
আর পায়ের চাপে জেগে ওঠা
এক মচমচে দীর্ঘশ্বাস|
রঙের মায়া ঘুচিয়ে সে আজ—
একটি ধুলোমাখা শব্দকল্পদ্রুম|
কবিতায় প্রতিচ্ছবি
মাইশা ইয়াসমিন স্নেহা
কবিতায় যার প্রতিচ্ছবি, সে আমার দুর্দান্ত প্রেমিক
ভোরের রোদের মতো প্রেমের প্রচ্ছদ
বুকেতে জমিয়ে রাখে যত অভিমান
যেন পাথরের শীতলতা
দূরের আকাশে মিশে ভীষণ একাত্ম
নিজেকে হারিয়ে খুঁজে চলে আমাকেই
কী ভীষণ স্নিগ্ধতায় জীবন ভেলায়|
তার চোখের পাতায় কথা বলে আমার ছবিরা
তা তো শুধু বুঝে নিতে হয় অনুভবে,
আমার শূন্যতা তাকে দহনে জাগায়
বেদনার গল্প ভাসে তার চোখে-মুখে
ডায়েরির পাতায়-পাতায়
সে আমার প্রার্থনার মতো শুভ্র পবিত্র প্রমিক|
আমার সমুদ্র বুকে সে এখন গোপন নগর|

আপনার মতামত লিখুন