সংবাদ

ধারাবাহিক উপন্যাস ০৪

গোমতীকন্যা


মহিবুল আলম
মহিবুল আলম
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ১০:৪২ এএম

গোমতীকন্যা
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

(পূর্ব প্রকাশের পর) 

ছয়

গোমতী নদী থেকে ছোট কোসা বা ডিঙি নৌকাগুলো বর্ষায় বুইদ্দার খালে ঢুকলেও বড় বজরা, বালার বা মলার নৌকাগুলো ঢুকতে পারে না| নাইওরি পানশি নৌকাগুলো আলাদা| ওগুলো এখন কালেভদ্রে গ্রামে আসে| ছই দেওয়া কেড়াই নৌকা আঁধারিয়া গ্রামে যে দুই-তিনটা আছে, সেগুলো ভূঁইয়াদের| আর ইঞ্জিনচালিত বড় নৌকাগুলো গ্রামে একেবারেই ঢোকে না| যেসব ছোট নৌকায় ইঞ্জিন থাকে, তা খালে ঢোকার মুহূর্তেই ইঞ্জিন বন্ধ করে ফেলা হয়| ইঞ্জিন বন্ধ করার পর লগি বা বৈঠা ঠেলে বাড়ি ফিরে|

পুলিশের ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি বেশ বড়| ঠিক বজরা বলা যায় না| তবে চওড়া ছই আছে| গোমতী নদী থেকে এই নৌকা নিয়ে বুইদ্দার খালের ভেতর ঢোকার কোনো উপায় নেই| তবুও এখন যেহেতু বর্ষার মওসুম, চারিদিকে জল থৈথৈ, তাই ওরা নৌকাটি কোনোমতে বুইদ্দার খাল দিয়ে দক্ষিণ পাড়ার মুখে এনে থামিয়েছে| ছালেক মেম্বরের বড় ডিঙিটাও পুলিশের নৌকার পেছনে পেছনে এসেছে|

দক্ষিণ পাড়ার মুখ থেকে একটা বাড়ির পর মনসুর পাগলার বাড়ি| ওরা গোপাট ধরে সেদিকেই হাঁটতে শুরু করল| পথটা পুরোপুরি শুকনো নয়| স্থানে স্থানে কাদাজল জমে আছে| ওদেরকে হাঁটতে হচ্ছে খানিকটা লাফিয়ে-লাফিয়ে| যদিও গত দুদিন ধরে বৃষ্টি নেই| সবার সামনে হাঁটছে পুলিশের উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদ| তার দুপাশে দুজন সিপাহি| ছালেক মেম্ব কখনও জুনায়েদ আহমেদের সমানতালে হাঁটার চেষ্টা করছে, কখনও পেছনে পড়ে যাচ্ছে| ছালেক মেম্বরের সঙ্গে আসা লোকগুলো পেছনে সারি করে হাঁটছে|

অন্য কেউ হলে ছালেক মেম্ব পুলিশ উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদের সঙ্গে একাই আসত| তার সাথের মানুষগুলো নৌকায় রেখে আসত| কিন্তু মনসুর পাগলাকে নিয়ে বিশ্বাস নেই| কখন কার ওপর সে চড়াও হয়| সে পুলিশ আর সাধারণ মানুষের পার্থক্য বোঝে না| ক্ষেপে গেলে যার-তার দিকে তেড়ে যায়| গায়ে হাতির মতো শক্তি| এছাড়া কোড়ের পাড়ে কথা শুনেনি বলে মনসুর পাগলার ওপর তার আক্রোশও আছে বেশ| সে কোনোমতেই তাকে ছাড় দিবে না|

ওরা মনসুর পাগলার বাড়ির উঠোনে পা দিয়ে দেখল, মরাবাড়িতে যেমন ভিড় জমে সেখানটায় তেমনটা নেই| কান্নারও কোনো রোল নেই| লাশটা উঠোনের একপাশে একা ফেলে রাখা| কিছু বউঝিয়ারি ঘরের পিছদোর থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে| কিছু বালবয়সী ছেলেমেয়ে উঠোনের পশ্চিমে একটা ভেরেণ্ডা গাছের কাছে দাঁড়িয়ে কৌতূহলের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে| সেখানে কোনো ব্যাটাছেলে নেই| একজন বৃদ্ধকে দেখা গিয়েছিল| সে- দূর থেকে পুলিশ দেখে সটকে গেছে|

উঠোনে পা দিয়ে ছালেক মেম্বরই আগে হাঁক দিল, ‘কই, মনসুইরা কই? পাগলা বাইর |’

ঘরের ভেতর থেকে মমিনা বের হয়ে এল| উঠোনে পুলিশ ছালেক মেম্বরের লোকজন দেখে থতমত খেয়ে গেল| জিজ্ঞেস করল, ‘কী চান আপনেরা?’

ছালেক মে¤^ বলল, ‘কইলাম তো, মনসুর পাগলারে চাই|’

হেয় তো বাড়িত নাই|’

কই পালাইছে?’

পালায় নাই| ভুঁইয়াগো বাড়িত গেছে|’

কখন আইব?’

কইয়া যায় নাই|’

ছালেক মে¤^ রাগে ঘড়ঘড় করতে করতে বলল, ‘বউয়ের লাশ ফালাইয়া ভুঁইয়াগো বাড়িত গেছে| কেমন ব্যাটামানুষ!’— বলেই সে জিজ্ঞেস করল, ‘দারোগা সাব আইছেন| ঘরে চেয়ার আছে তো?’

মমিনা বলল, ‘আছে|’

চেয়ার বাইর কইরা দাও| কয়ডা চেয়ার আছে?’

দেখতে হইব|’

আইচ্ছা, দেখো| এর আগে কও, মনসুর পাগলার মা কই?’

মমিনা বলল, ‘আছে ওইখানে| ওই তো|’

ছালেক মে¤^ কমলা খাতুনের দিকে তাকিয়ে একটু আদব-লেহাজ দেখিয়ে বলল, ‘চাচি, মনসুর পাগলারে কোড়ের পাড় না করছিলাম তার বউয়ের লাশে হাত না দিতে| পুলিশের কেস হইব| হেয় আমার কথা না শুইনা লাশ নৌকায় তুইলা লইয়া আইছে| তার বউ পানিত ডুইবা মরছে| অপমিত্যু| পুলিশ আইছে|’

কমলা খাতুন কিছু বলল না| শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল|

ছালেক মে¤^ নিজ থেকেই বলল, ‘এইখানে আমারে দোষ দিয়েন না, চাচি| মনসুর পাগলা আমার কথা শুনলেই হইত| তারে পুলিশ থাইকা বাঁচাইতে পারতাম|’

কমলা খাতুন এবারও কিছু বলল না|

ছালেক মে¤^ নিজে নিজে মাথা ঝাঁকিয়ে কমলা খাতুন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মমিনার দিকে তাকাল| জিজ্ঞেস করল, ‘চেয়ারের কী ব্যবস্থা?’

মমিনা বলল, ‘, একটা বাইর কইরা দিছি তো|’

ছালেক মে¤^ বলল, ‘তা দেখলাম তো| আর চেয়ার নাই?’

মমিনা বলল, ‘আছে আরেকটা|’

ছালেক মেম্ব বলল, ‘হেইডাও বাইর কইরা দাও|’

মমিনা বলল, ‘আইচ্ছা|’

চেয়ার দুটোর একটা হাতাওয়ালা একটা হাতাছাড়া| হাতাওয়ালা চেয়ারটায় বসেছে পুলিশের উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদ| হাতাছাড়া চেয়ারটায় ছালেক মেম্ব| জুনায়েদের আহমেদের পেছনে পুলিশের সেপাহি দুজন| ছালেক মেম্বরের পেছনে তার সঙ্গে আসা সাঙ্গপাঙ্গরা| মনসুর পাগলার বাড়িতে দুটোর বেশি চেয়ার থাকলে যে এখানে আনা হতো, তা নয়| আর আনা হলেও কেউ যে বসত, তা- নয়| সিপাহি দুজন তাদের অফিসারের সামনে বসত না| ছালেক মেম্বরের সাঙ্গপাঙ্গগুলো তো না-|

ওরা বসেছে উঠোনের উত্তরে একটা আমগাছের ছায়ায়| সেতারা বেগমের লাশটা একইভাবে উঠোনের দক্ষিণে ঘরের দাওয়ার কাছে পড়ে আছে| পুলিশ উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদ সুস্থির হয়ে বসে থাকলেও ছালেক মেম্ব বেশ অস্বস্তির মধ্যে আছে| পুলিশ না নিয়ে এলে অবশ্য সে এমন অস্বস্তিতে পড়ত না| এখান থেকে চলে গিয়ে পরে আবার আসত| কিন্তু পুলিশ সঙ্গে নিয়ে এসেই তার যত অস্বস্তি| সে আসার আগে ভেবেছিল, মনসুর পাগলা তার বউয়ের লাশ নিয়ে বাড়িতে গেছে, নিশ্চয়ই সে বাড়িতে থাকবে| কিন্তু...?

ছালেক মেম্ব ভাবল, মনসুর পাগলা কি আসলেই ভুঁইয়া বাড়িতে গেছে? অন্য কোথাও তো যেতে পারে? পাগলা মানুষ, তার কোনো ঠিক-ঠিকানা আছে? বউয়ের লাশ উঠোনে পড়ে আছে, তাতে কী? ফেলে চলে গেছে| কখন ফিরবে নাকি আদৌ ফিরবে না, কে জানে?

ছালেক মেম্বর মনে মনে এখন নিজের চুল নিজে ছিঁড়ছে| মনসুর পাগলাকে কোড়ের পাড় থেকে সেতারা বেগমের লাশ নিয়ে যেতে দেওয়া ঠিক হয়নি| তার সাঙ্গপাঙ্গ বাদেও সেখানে আরও লোকজন ছিল| সে বাধা দিলেই পারত| মনসুর পাগলা একা কী করতে পারত?

অস্বস্তির মধ্যে ছালেক মেম্বরের তৃষ্ণা পেল| অন্তত এক গ্লাস লেবুর শরবত হলে ভালো হতো| দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত সে দুপুরের খাবার খায়নি| পুলিশের উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদ সিপাহি দুজন নিশ্চয়ই এখনও কিছু খায়নি| নিজ বাড়িতে হলে সে অবশ্যই মুরগি জবাই করে রান্না করে তাদেরকে আপ্যায়ন করত| এখন এখান থেকে চলে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই|

ছালেক মেম্বর এদিক-ওদিক তাকাল| তার সঙ্গে আসা একজনকে হাত ইশারায় ডাকল| কাছে আসতেই ফিসফিস করে বলল, ‘নয়ন, একটু শরবতের ব্যবস্থা করা যায় কি না, দেখ না| তেষ্টায় আমার গলা শুকাইয়া আসতাছে| দারোগা সাবও খালিমুখে বইসা আছে| তুই মনসুর পাগলার ঘরে যা| দেখ গিয়া গুড় বা চিনি আছে কি নাই| লে¤^ুর ব্যবস্থা করতে বল|’

নয়ন বলল, ‘আইচ্ছা, ভাইজান|’ বলেই সে মনসুর পাগলার ঘরের দিকে ছুটল| ঠিক তখনই সবার দৃষ্টি গেল পুবে গোপাট পেরিয়ে বুইদ্দার খালের দিকে| খালে একটা আমগাছের তলায় একটা নৌকা ভিড়ছে| নৌকায় মনসুর পাগলা ভুঁইয়া বাড়ির আনিস|

নৌকায় মনসুর পাগলাকে দেখে ছালেক মেম্বরের চোখ বড় হয়ে গেল| পাশের আনিসকে দেখে যদিও সে মনে মনে কিছুটা চুপসে গেল, কিন্তু সে পরক্ষণ তা গা করল না| সে জোর গলায় পুলিশের উপপরির্দশক জুনায়েদ আহমেদকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, ‘দারোগা সাব, দারোগা সাব, পাগলা আইছে, পাগলা আইছে!’

জুনায়েদ আহমেদ জিজ্ঞেস করল, ‘পাগলা?’

ছালেক মেম্বর বলল, ‘জি, ওই লাশটার জামাই| যারে খুঁজতে আইছেন|’

, আচ্ছা| নৌকায় তো দুজন আছে| কোন জন?’

সাদা শার্ট যে পইরা আছে হেয় না| লগে যে পাঞ্জাবি পইরা আছে, হেইডা| হের নামই মনসুর পাগলা|’

মনসুর পাগলা? সে কি পাগল?’

ছালেক মে¤^ একটু চুপ হয়ে গিয়ে পরক্ষণ জোর দিয়ে বলল, ‘না না, দারোগা সাব| একটুখানি ঘাড় ত্যাড়া তো, এই লাইগা সবাই তারে পাগলা ডাকে|’

জুনায়েদ আহমেদ বলল, ‘, তাই|’ বলেই সে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের পুলিশের সদস্য দুজনকে বলল, ‘এই তোমরা দুজন যাও তো| তাড়াতাড়ি যাও| ওই যে পাঞ্জাবি পরে আছে যে লোকটা, তাকে ধরে নিয়ে আস| সে যেন ভাগতে না পারে|’

পুলিশের সদস্য দুজন নৌকার দিকে যেতে যেতে বলল, ‘জি, স্যার| জি, স্যার|’

মনসুর পাগলা ততক্ষণে লাফিয়ে নেমে নৌকাটা বাঁধতে গেল| আনিসও নৌকা থেকে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে| ঠিক তখন পুলিশের সিপাহি দুজনকে দৌড়ে আসতে দেখে আনিস থতমত খেয়ে গেল| মনসুর পাগলাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নৌকার রশিটা ধরে হা করে তাকিয়ে রইল|

আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘পুলিশ?’

মনসুর পাগলা প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও পরক্ষণ সামলে নিয়ে আনিসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মে¤^ হালায় এই কামডা করছে| ছালেক মেম্বর| হেয় পুলিশ আনছে| আমারে কোড়ের পাড় হুমকি দিছিল|’

আনিস কিছু বলল না|

পুলিশের সদস্য দুজন মনসুর পাগলার দুই বাহুতে দুদিক দিয়ে ধরতে এল|

মনসুর পাগলা ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমারে ধরন লাগব না| আমি পুলিশ ডরাই না| আগে নৌকাডা বান্ধতে দেন| নাইলে নৌকাডা ভাইসা যাইব গা|’

পুলিশের সদস্য দুজন মনসুর পাগলাকে নৌকাটা বাঁধার সুযোগ দিল|

মনসুর পাগলা নৌকাটা শক্ত করে আমগাছটার গোড়ায় বাঁধল|

নৌকা বাঁধার পর পুলিশের সদস্য দুজনের একজন বলল, ‘এইদিকে আস| আমাদের সাথে চলো| স্যার ডাকছে|’

মনসুর পাগলা পুলিশের সিপাহি দুজনকে পাত্তা না দিয়ে সিতারা বেগমের লাশের দিকে হাঁটা ধরল|

পুলিশের সদস্য দুজন ত্বরিত মনসুর পাগলার পথ আগলে দুদিক দিয়ে দুই হাত ধরে বলল, ‘বললাম না, স্যার ডাকছে| কথা না শুনলে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাব|’

এবার ছালেক মেম্বরের সঙ্গে আসা সাঙ্গপাঙ্গগুলো দৌড়ে এল|

মনসুর পাগলা তাদের দিকে তাকিয়ে ত্যাড়া গলায় বলল, ‘আমি তগো মেম্বররে দেইখা ছাড়মু| হালার মেম্বর!’

আনিস নৌকা থেকে নেমে একটু এগিয়ে এসে বলল, ‘পাগলা, আমার সাথে আস|’

মনসুর পাগলা আনিসের দিকে তাকিয়ে নরম হয়ে এল| মুখে কিছু বলল না| সে আনিসকে অনুসরণ করল|

ওরা পুলিশের উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদের সামনে এসে দাঁড়াল| আনিস সামনে| মনসুর পাগলা ঠিক তার পেছনে| সিপাহি দুজন মনসুর পাগলার দুপাশে| ছালেক মেম্বরের সাঙ্গপাঙ্গরা পেছনে|

আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার? আপনি এখানে যে?

জুনায়েদ আহমেদ জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কে?’

আনিস কিছু বলার আগেই ছালেক মেম্বর বলল, ‘দারোগা সাব, তাইনে আমাগো গেরামের ভুঁইয়া বাড়ির| মান্যিগন্যি| অনুতপুর হাইস্কুলের মাস্টারি করেন| পত্রিকায় লেখেন|’

জুনায়েদ আহমেদ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘, আচ্ছা|’ বলেই সে আনিসের দিকে সরাসরি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘আসলে কি, আপনি তো জানেন, কেউ পানিতে ডুবে মরলে অপমৃত্যু| আইনের ব্যাপারস্যাপার আছে|’

আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, তা জানি|’

জুনায়েদ আহমেদ বলল, ‘আমরা এখানে এসেছি লাশ থানায় নিয়ে যেতে| আন-ন্যাচারেল ডেথ কেস| পুলিশি তদন্ত হবে| সুরতহাল রিপোর্ট ˆতরি করা হবে| এটি হত্যাকাণ্ড নাকি দুর্ঘটনা, তা নিশ্চিত করতে পুলিশি তদন্ত ময়না তদন্ত করা হবে|’

আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে মনসুরকে কেন ধরা হচ্ছে?’

জুনায়েদ আহমেদ জবাব দেওয়ার আগেই ছালেক মেম্বর বলে উঠল, ‘ভুঁইয়া সাব, মনসুর পাগলারে ধরা হইতাছে এই জন্যি, সেতারা বেগম তো পানিত ডুইবা মরে নাই|’

আনিস বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে সে কীভাবে মারা গেল?’

মনসুর পাগলা তারে পানিত চুবাইয়া মারছে|’

কী যা-তা কথা!’

যা-তা না, ভুঁইয়া সাব| আমি সইত্যই কইতাছি|’

আপনি কীভাবে সত্য বলছেন?’

এই ধরেন, মনসুর পাগলার নৌকা ডুবছে ভাটিতে| মোল্লাকান্দির পুনোয়ারার বটগাছের কাছে| লাশ পাওয়া গেছে আমাগো গেরামের কোড়ের পাড়ে| হেইডা কেমনে হইল?’

আনিস একটু চুপ হয়ে কী ভেবে বলল, ‘আপনি আসলে কী বলতে চাচ্ছেন, বুঝতে পারছি না|’

ছালেক মেম্বর বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল, ‘আরে ভুঁইয়া সাব, সহজ কথাটা বোঝেন না কেন? লাশের কি মাছের মতন কাখনা গজাইছিল যে গাঙে হেয় উজাইয়া আইব? সেতারা বেগমের লাশ এক-দেড় মাইল উজাইয়া আইল ক্যামনে?

আনিস এবার সত্যি ধন্ধে পড়ে গেল|

মনসুর পাগলা লাফিয়ে উঠে বলল, ‘আনিস, হেয় ঝামেলা লাগাইতে চাইতাছে| তুমি ছালেক মেম্বররে চিনো না? হেয় আস্ত একটা গম চোর| হালায় মানুষের মধ্যে ঝামেলা লাগাইয়া ট্যাকা খায়| আমারে লইয়া ঝামেলা লাগাইতে আইছে|’ বলেই মনসুর পাগলা আনিস থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ছালেক মেম্বরের দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল, ‘হেই মেম্বর, আমারে লইয়া ঝামেলা লাগাইলে কিন্তুক তোমারে ছাড়মু না| দেইখা লইমু...!’

ছালেক মেম্বর একটু নড়েচড়ে বসে পুলিশের উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখতাছেন, দারোগা সাব, দেখতাছেন, হেয় আপনের সামনেই কেমুন হুমকি দেয়? হেরে ধইরা লইয়া যান| থানায় নিয়া কয়েকটা ডলা দিলেই আসল কথা বার হইব| আমি হাছা কইছি| হেয়ই নিজে বউরে মারছে|’

 

সাত

মনসুর পাগলার বাড়ির পুবদিকের গোপাট ধরে একটা বাড়ি পেরোলেই দক্ষিণপাড়ার মুখে বুইদ্দার খালে পুলিশের নৌকাটা| আনিস নৌকার কাছাকাছি এসে দাঁড়াল| আঁধারিয়া গ্রামের দক্ষিণপাড়ার প্রথম বাড়িটি আবদেল আলীর| আবদেল আলী গ্রামে মাটি কাটার কাজ করত| গেল বছর পশ্চিম পাড়ায় তারা মিয়ার বাড়িতে মাটি কাটতে গিয়ে খাদেই হঠাৎ করেই মারা যায়| সুদিনে উত্তরের জোয়ারের জল চলে গেলে এখানকার অনেক বাড়িতেই মাটি ফেলে উঁচু করা হয়| আজকাল গোমতীর বানের পাশাপাশি উত্তরের জোয়ারের জল বেশিই বাড়ছে| বর্ষার মওসুমে জোয়ারের জল গোমতীর বন্যার মতোই হু হু করে ডাকে| আবার শুকনো মওসুম তাড়াতাড়ি চলে আসে|

অবশ্য আবদেল আলীর শ্বাসকষ্ট ছিল বেশ| বয়সও হয়েছিল| আনিসের বাবা সুন্দর ভুঁইয়ার প্রায় সমবয়সী ছিল| তার একটাই মাত্র ছেলে, মোহন| ছোটবেলায় মোহন আনিসের সঙ্গে মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েছে| এরপর আর লেখাপড়া এগিয়ে নিয়ে যায়নি| বাপের সঙ্গে মাটি কাটার কামলা দিত| বর্ষার মওসুমে মাছ ধরা ছিল তাদের বাড়তি আয়| বড় হয়ে অবশ্য মোহন হোমনায় একটা ইটের ভাটায় কাজ নেয়| বাড়িতে মাসে একদিন আসে| বাড়িতে আবদেল আলীর বৃদ্ধ বউটা বাড়িতে একা পড়ে আছে|

আবদেল আলীর ইশাটা খাল থেকে বেশ উঁচুতে| মাটি কাটার কামলা ছিল বলে আবেদেল আলী নিজেই নিজের বাড়ি মাটি ফেলে উঁচু করত| বাড়ি থেকে নিচে গোপাটা বা বুইদ্দার খালে নামতে হলে গাছের শেকড় ধরে-ধরে নামতে হয়| আনিস আর নিচে নামল না| একটা খড়ের মাড়ার পাশে দাঁড়িয়ে গেল|

আনিস অবশ্য সেখানে একা দাঁড়িয়ে নেই| তার পাশে পাড়ার কিছু ন্যাংটো ছেলেমেয়ে| মনসুর পাগলার মা কমলা খাতুন না এলেও মমিনা সেখান পর্যন্ত এগিয়ে এসেছে| খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে পুলিশের নৌকায় সেতারা বেগমের লাশটা ওঠানো দেখছে| পাড়ার আর কিছু বউঝিয়ারি এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে পুলিশের নৌকার দিকে উঁকিঝুঁকি মারছে| পাড়ার ব্যাটাছেলেরা যারা বাড়িতে ছিল, তারা একজনও এখানে নেই| সব উধাও| একে তো মনসুর পাগলার ওপর ভরসা নেই, কখন কী অঘটন ঘটিয়ে বসে| পরে পুলিশ আবার না গণহারে তাদেরকে ধরে নিয়ে যায়| তার ওপর এই ভাটি অঞ্চলের মানুষদের পুলিশের ভয় একটু বেশিই| কিছু একটা হলে ওদের দ্বীপের মতো গ্রামগুলো থেকে তো পালানোর উপায় নেই| এছাড়া এই ভাটি গ্রামগুলোতে বেশ ডাকাতি হয়| কয়েকদিন পরপরই পুলিশ ডাকাত সন্দেহে একে-ওকে গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে যায়| এদিকে ছালেক মে¤^ আজকাল কাউকে না কাউকে শত্রু বানিয়ে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়| এসব শত্রু বানানোর পেছনে তার উদ্দেশ্য একটাই, পুলিশের ফাঁদে ফেলে আশেপাশের গ্রামের লোকজনের কাছ থেকে কীভাবে টাকা খাওয়া যায়|

মমিনা খানিকটা দূর থেকেই আনিসকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ আনিস ভাই, আমার ভাইজানের লাইগা কেউ কি পুলিশগো সামনে দাঁড়াইব না? হেরে বিনা দোষেই লইয়া যাইবো গা? আর লাশ নিয়া এমুন টানাটানি?’

আনিস মমিনার দিকে তাকাল ঠিকই, কিন্তু কিছু বলল না| দৃষ্টি সরিয়ে আবার পুলিশের নৌকার দিকে তাকাল|

এরই মধ্যে সেতারা বেগমের লাশ পুলিশের নৌকায় তোলা হয়েছে| মনসুর পাগলাকেও তোলা হয়েছে হাত দুটো পিছমোড়া দিয়ে বেঁধে| বেশি বাড়াবাড়ি করছিল বলেই তাকে পিছমোড়া দিয়ে বাঁধা হয়েছে| সে যে নৌকায় সহজে উঠতে চেয়েছে, তা নয়| তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে বলে সে তিড়িংবিড়িং করে দু-দুবার পুলিশের সিপাহি দুজনকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে| পিছমোড়া বাঁধা অবস্থাতেই সে ছালেক মেম্বরকে শাসিয়েছে, ‘লওয়ের পুত মে¤^, আমারে চিনো নাই| তোমারে আমি দেইখা ছাড়মু নে| আমারে পুলিশ দিয়া ধইরা লইয়া যাইতাছ? দাঁড়াও, বাড়িত আইসা লই| কয়দিন আটকাইয়া রাখবা, হ্যাঁ?’

মনসুর পাগলা ধ্বস্তাধস্তি করে পুলিশের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে ব্যর্থ হয়ে সে আনিসের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলেছে, ‘আনিস, তুমি কও না, আমি কিচ্ছু করি নাই| আমার বউ মস্তানের ঔরসে যাওয়নের সময় নৌকাডা উল্টাইয়া পানিত ডুইবা মরছে| আমার কোনো দোষ নাই|’

পুলিশের উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদ ছালেক মেম্বরের সঙ্গে কী কথা যেন বলছে| আনিস খড়ের মাড়ার কাছে দাঁড়িয়ে ঠিক শুনতে পেল না| সে যে মনসুর পাগলার হয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলেনি, তা নয়| তার যে অবস্থান, সে অবস্থান থেকে সে কথা বলতে পারে, কিন্তু অন্যজনের মতো তর্ক করতে পারে না| পুলিশ উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদ বা ছালেক মেম্বর যে যুক্তি দেখিয়েছে, তা একেবারে খণ্ডন করা যায় না, সেটাও নয়| কিন্তু ব্যাপারটা যেহেতু আইনের পর্যায়ে চলে গেছে, তা কোর্ট পর্যন্ত গড়াবে, এটা নিশ্চিত|

পুলিশের উপ-পরিদর্শক কয়েক মুহূর্ত কী সব কথা বলে নৌকায় উঠে গেল| ছালেক মেম্বরও হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে কী একটা ইঙ্গিত করে নিজের নৌকায় উঠল| মনসুর পাগলা পুলিশের নৌকা থেকে তখনও আনিসকে ডাকছে| সেতারা বেগমের লাশটা নৌকায় লম্বা করে রাখা|

আনিস পুলিশের উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদ, ছালেক মেম্বর, ছালেক মেম্বরের সঙ্গে আসা লোকজন, নৌকা পিছমোড়া মনসুর পাগলা, নৌকায় সেতারা বেগমের লাশ, এমনকি তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ন্যাংটো ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে নিজে বেশ অসহায়বোধ করল| মমিনা খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে, এতেও সে অস্বস্তিতে পড়ে গেল| সে ভাবল, তার তো আসলেই মনসুর পাগলার জন্য কিছু করা দরকার| কিন্তু সে কী করবে বুঝতে পারল না|

আনিস আরও ভাবল, সে কি মনসুর পাগলাকে সাহায্য করার জন্য একটা নৌকা নিয়ে পুলিশের নৌকার পিছু পিছু থানায় যাবে? থানা তো এখান থেকে বেশ দূরে| নৌকায় যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে| ইঞ্জিনচালিত নৌকা হলে না হয় বিকেল-বিকেল গিয়ে পৌঁছবে| কিন্তু সে থানায় গিয়ে মনসুর পাগলার কী সাহায্য করতে পারবে? বরং এটা ভালো হয়, সে আগামীকাল তার মাকে কুমিল্লায় ডাক্তার দেখিয়ে ফেরার পথে একবার থানা হয়ে আসবে| আর নয়তো পরশুদিন কুমিল্লায় নিয়ে যদি মনসুর পাগলাকে কোর্টে তোলা হয়, সে তার জন্য একটা উকিল ধরবে| প্রয়োজনে তার জামিনের ব্যবস্থা করবে|

আবদেল আলীর বউ সফুরা বিবি কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আনিস তা খেয়াল করেনি| সফুরা বিবি যখন বলে উঠল, ‘হায় হায়, মনসুইরা হইল একটা পাগল মানুষ| হেরে ক্যান পুলিশ ধইরা লইয়া যাইতাছে? হায় হায়!’

আনিস চমকে উঠে সফুরা বিবির দিকে তাকাল| বয়সের ভারে নুইয়ে পড়ে কোমর বেঁকে যাওয়ায় সফুরা বিবিকে দেখা যাচ্ছে উটপাখির মতো| ব্লাউজবিহীন অরক্ষিত বুক দুটো মনে হচ্ছে মৃতপ্রায় একটা পেঁপে গাছের দুটো ঝুলে থেকে পেঁপের আকার| বুক দুটো চিমসানো, মন্দ বাতাসে তিরতির করে কাঁপছে| ধনুকের মতো বাঁকা শরীরটায় মাথাটা এখনও বেশ টান টান| চোখ দুটোর মধ্যেও যেন খরার টান|

সফুরা বিবি আবার বলল, ‘পাগলার বউ মরছে পানিত ডুইবা| হের দোষ কী? তুমি কিছু করো না ক্যান হের লাইগা, ভুঁইয়ার পুত?’

আনিস চুপ|

সফুরা বিবি নিজে নিজে মাথা নেড়ে বলল, ‘তোমরা না গেরামে এক লগে চলো? তোমার তো পাগলার লাইগা কিছু করা দরকার| তারে খালি খালি পুলিশ ধইরা লইয়া যাইতাছে| , ভুঁইয়ার পুত, তুমি কিছু কইতাছ না ক্যান? হে না তোমার জানের দোস্ত?’

আনিস এবারও চুপ| তার যে মুহূর্তে মনসুর পাগলার জন্য কিছু করার নেই, এটা সে সফুরা বিবিকে কীভাবে বোঝাবে? ওদিকে মমিনাও একটু আগে তাকে একই কথা জিজ্ঞেস করেছে|

সফুরা বিবি কী ভেবে অসন্তোষে সেখান থেকে চলে যেতে যেতে বলল, ‘ভুঁইয়ার পুত, তুমি তোমার বাপের লাহানই হইছ| দোস্ত ডাইকা ঘরে ঢোকো| বাইরের থাইকা কিচ্ছুই করো না|’

আনিস সফুরা বিবির কথাটা মানে বুঝল| আর তা বুঝেই সে চমকে উঠল| সে সরাসরি দৃষ্টিতে সফুরা বিবির দিকে তাকিয়ে রইল| এমন একজন অশিক্ষিত বৃদ্ধা এমন কঠিন কথাটা বলল কীভাবে?

সফুরা বেগম কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে মমিনার কাছে দাঁড়াল| মমিনা সফুরা বেগমের কানের কাছে মুখ নামিয়ে কী যেন বলল|

সফুরা বেগম একটু তেজি গলায় বলে উঠল, ‘হইছে, হইছে, আমারে কইতে হইব না| ওই বাড়ির সব ব্যাটাগোরেই আমি চিনি|’

মমিনা বলল, ‘আস্তে, বুজি, আস্তে|’

আনিস খড়ের মাড়ার কাছ থেকে সরে যাবে বলে সমীচীন ভাবল| ঠিক তখনই পুলিশের নৌকার ইঞ্জিন ভটভট শব্দ তুলল| শব্দটা তার কানে এসে বাজল ঠিক তীরের সরু ফলার মতো| সে ভাবল, আসলে তীর তো কানে এসে বাজে না, বিঁধে| তীরটা সত্যি সত্যি তার কানে বিঁধল| সে দেখল, নৌকাটা খালের জলে ঢেউ তুলে গোমতীর দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে| পেছনে পেছনে ছালেক মেম্বরের বড় ডিঙিটাও ছুটল|

আনিস এবার অমোঘ দৃষ্টিতে মনসুর পাগলাকে ছাপিয়ে সেতারা বেগমের লম্বালম্বি করে রাখা লাশটা দেখার চেষ্টা করল| লাশের চাটাইয়ের দৃষ্টিটা তার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল|

আনিস একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল| কেমন আহা শব্দ তোলা দীর্ঘশ্বাস যেন! ক্রমশ...

 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬


গোমতীকন্যা

প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬

featured Image

(পূর্ব প্রকাশের পর) 

ছয়

গোমতী নদী থেকে ছোট কোসা বা ডিঙি নৌকাগুলো বর্ষায় বুইদ্দার খালে ঢুকলেও বড় বজরা, বালার বা মলার নৌকাগুলো ঢুকতে পারে না| নাইওরি পানশি নৌকাগুলো আলাদা| ওগুলো এখন কালেভদ্রে গ্রামে আসে| ছই দেওয়া কেড়াই নৌকা আঁধারিয়া গ্রামে যে দুই-তিনটা আছে, সেগুলো ভূঁইয়াদের| আর ইঞ্জিনচালিত বড় নৌকাগুলো গ্রামে একেবারেই ঢোকে না| যেসব ছোট নৌকায় ইঞ্জিন থাকে, তা খালে ঢোকার মুহূর্তেই ইঞ্জিন বন্ধ করে ফেলা হয়| ইঞ্জিন বন্ধ করার পর লগি বা বৈঠা ঠেলে বাড়ি ফিরে|

পুলিশের ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি বেশ বড়| ঠিক বজরা বলা যায় না| তবে চওড়া ছই আছে| গোমতী নদী থেকে এই নৌকা নিয়ে বুইদ্দার খালের ভেতর ঢোকার কোনো উপায় নেই| তবুও এখন যেহেতু বর্ষার মওসুম, চারিদিকে জল থৈথৈ, তাই ওরা নৌকাটি কোনোমতে বুইদ্দার খাল দিয়ে দক্ষিণ পাড়ার মুখে এনে থামিয়েছে| ছালেক মেম্বরের বড় ডিঙিটাও পুলিশের নৌকার পেছনে পেছনে এসেছে|

দক্ষিণ পাড়ার মুখ থেকে একটা বাড়ির পর মনসুর পাগলার বাড়ি| ওরা গোপাট ধরে সেদিকেই হাঁটতে শুরু করল| পথটা পুরোপুরি শুকনো নয়| স্থানে স্থানে কাদাজল জমে আছে| ওদেরকে হাঁটতে হচ্ছে খানিকটা লাফিয়ে-লাফিয়ে| যদিও গত দুদিন ধরে বৃষ্টি নেই| সবার সামনে হাঁটছে পুলিশের উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদ| তার দুপাশে দুজন সিপাহি| ছালেক মেম্ব কখনও জুনায়েদ আহমেদের সমানতালে হাঁটার চেষ্টা করছে, কখনও পেছনে পড়ে যাচ্ছে| ছালেক মেম্বরের সঙ্গে আসা লোকগুলো পেছনে সারি করে হাঁটছে|

অন্য কেউ হলে ছালেক মেম্ব পুলিশ উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদের সঙ্গে একাই আসত| তার সাথের মানুষগুলো নৌকায় রেখে আসত| কিন্তু মনসুর পাগলাকে নিয়ে বিশ্বাস নেই| কখন কার ওপর সে চড়াও হয়| সে পুলিশ আর সাধারণ মানুষের পার্থক্য বোঝে না| ক্ষেপে গেলে যার-তার দিকে তেড়ে যায়| গায়ে হাতির মতো শক্তি| এছাড়া কোড়ের পাড়ে কথা শুনেনি বলে মনসুর পাগলার ওপর তার আক্রোশও আছে বেশ| সে কোনোমতেই তাকে ছাড় দিবে না|

ওরা মনসুর পাগলার বাড়ির উঠোনে পা দিয়ে দেখল, মরাবাড়িতে যেমন ভিড় জমে সেখানটায় তেমনটা নেই| কান্নারও কোনো রোল নেই| লাশটা উঠোনের একপাশে একা ফেলে রাখা| কিছু বউঝিয়ারি ঘরের পিছদোর থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে| কিছু বালবয়সী ছেলেমেয়ে উঠোনের পশ্চিমে একটা ভেরেণ্ডা গাছের কাছে দাঁড়িয়ে কৌতূহলের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে| সেখানে কোনো ব্যাটাছেলে নেই| একজন বৃদ্ধকে দেখা গিয়েছিল| সে- দূর থেকে পুলিশ দেখে সটকে গেছে|

উঠোনে পা দিয়ে ছালেক মেম্বরই আগে হাঁক দিল, ‘কই, মনসুইরা কই? পাগলা বাইর |’

ঘরের ভেতর থেকে মমিনা বের হয়ে এল| উঠোনে পুলিশ ছালেক মেম্বরের লোকজন দেখে থতমত খেয়ে গেল| জিজ্ঞেস করল, ‘কী চান আপনেরা?’

ছালেক মে¤^ বলল, ‘কইলাম তো, মনসুর পাগলারে চাই|’

হেয় তো বাড়িত নাই|’

কই পালাইছে?’

পালায় নাই| ভুঁইয়াগো বাড়িত গেছে|’

কখন আইব?’

কইয়া যায় নাই|’

ছালেক মে¤^ রাগে ঘড়ঘড় করতে করতে বলল, ‘বউয়ের লাশ ফালাইয়া ভুঁইয়াগো বাড়িত গেছে| কেমন ব্যাটামানুষ!’— বলেই সে জিজ্ঞেস করল, ‘দারোগা সাব আইছেন| ঘরে চেয়ার আছে তো?’

মমিনা বলল, ‘আছে|’

চেয়ার বাইর কইরা দাও| কয়ডা চেয়ার আছে?’

দেখতে হইব|’

আইচ্ছা, দেখো| এর আগে কও, মনসুর পাগলার মা কই?’

মমিনা বলল, ‘আছে ওইখানে| ওই তো|’

ছালেক মে¤^ কমলা খাতুনের দিকে তাকিয়ে একটু আদব-লেহাজ দেখিয়ে বলল, ‘চাচি, মনসুর পাগলারে কোড়ের পাড় না করছিলাম তার বউয়ের লাশে হাত না দিতে| পুলিশের কেস হইব| হেয় আমার কথা না শুইনা লাশ নৌকায় তুইলা লইয়া আইছে| তার বউ পানিত ডুইবা মরছে| অপমিত্যু| পুলিশ আইছে|’

কমলা খাতুন কিছু বলল না| শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল|

ছালেক মে¤^ নিজ থেকেই বলল, ‘এইখানে আমারে দোষ দিয়েন না, চাচি| মনসুর পাগলা আমার কথা শুনলেই হইত| তারে পুলিশ থাইকা বাঁচাইতে পারতাম|’

কমলা খাতুন এবারও কিছু বলল না|

ছালেক মে¤^ নিজে নিজে মাথা ঝাঁকিয়ে কমলা খাতুন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মমিনার দিকে তাকাল| জিজ্ঞেস করল, ‘চেয়ারের কী ব্যবস্থা?’

মমিনা বলল, ‘, একটা বাইর কইরা দিছি তো|’

ছালেক মে¤^ বলল, ‘তা দেখলাম তো| আর চেয়ার নাই?’

মমিনা বলল, ‘আছে আরেকটা|’

ছালেক মেম্ব বলল, ‘হেইডাও বাইর কইরা দাও|’

মমিনা বলল, ‘আইচ্ছা|’

চেয়ার দুটোর একটা হাতাওয়ালা একটা হাতাছাড়া| হাতাওয়ালা চেয়ারটায় বসেছে পুলিশের উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদ| হাতাছাড়া চেয়ারটায় ছালেক মেম্ব| জুনায়েদের আহমেদের পেছনে পুলিশের সেপাহি দুজন| ছালেক মেম্বরের পেছনে তার সঙ্গে আসা সাঙ্গপাঙ্গরা| মনসুর পাগলার বাড়িতে দুটোর বেশি চেয়ার থাকলে যে এখানে আনা হতো, তা নয়| আর আনা হলেও কেউ যে বসত, তা- নয়| সিপাহি দুজন তাদের অফিসারের সামনে বসত না| ছালেক মেম্বরের সাঙ্গপাঙ্গগুলো তো না-|

ওরা বসেছে উঠোনের উত্তরে একটা আমগাছের ছায়ায়| সেতারা বেগমের লাশটা একইভাবে উঠোনের দক্ষিণে ঘরের দাওয়ার কাছে পড়ে আছে| পুলিশ উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদ সুস্থির হয়ে বসে থাকলেও ছালেক মেম্ব বেশ অস্বস্তির মধ্যে আছে| পুলিশ না নিয়ে এলে অবশ্য সে এমন অস্বস্তিতে পড়ত না| এখান থেকে চলে গিয়ে পরে আবার আসত| কিন্তু পুলিশ সঙ্গে নিয়ে এসেই তার যত অস্বস্তি| সে আসার আগে ভেবেছিল, মনসুর পাগলা তার বউয়ের লাশ নিয়ে বাড়িতে গেছে, নিশ্চয়ই সে বাড়িতে থাকবে| কিন্তু...?

ছালেক মেম্ব ভাবল, মনসুর পাগলা কি আসলেই ভুঁইয়া বাড়িতে গেছে? অন্য কোথাও তো যেতে পারে? পাগলা মানুষ, তার কোনো ঠিক-ঠিকানা আছে? বউয়ের লাশ উঠোনে পড়ে আছে, তাতে কী? ফেলে চলে গেছে| কখন ফিরবে নাকি আদৌ ফিরবে না, কে জানে?

ছালেক মেম্বর মনে মনে এখন নিজের চুল নিজে ছিঁড়ছে| মনসুর পাগলাকে কোড়ের পাড় থেকে সেতারা বেগমের লাশ নিয়ে যেতে দেওয়া ঠিক হয়নি| তার সাঙ্গপাঙ্গ বাদেও সেখানে আরও লোকজন ছিল| সে বাধা দিলেই পারত| মনসুর পাগলা একা কী করতে পারত?

অস্বস্তির মধ্যে ছালেক মেম্বরের তৃষ্ণা পেল| অন্তত এক গ্লাস লেবুর শরবত হলে ভালো হতো| দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত সে দুপুরের খাবার খায়নি| পুলিশের উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদ সিপাহি দুজন নিশ্চয়ই এখনও কিছু খায়নি| নিজ বাড়িতে হলে সে অবশ্যই মুরগি জবাই করে রান্না করে তাদেরকে আপ্যায়ন করত| এখন এখান থেকে চলে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই|

ছালেক মেম্বর এদিক-ওদিক তাকাল| তার সঙ্গে আসা একজনকে হাত ইশারায় ডাকল| কাছে আসতেই ফিসফিস করে বলল, ‘নয়ন, একটু শরবতের ব্যবস্থা করা যায় কি না, দেখ না| তেষ্টায় আমার গলা শুকাইয়া আসতাছে| দারোগা সাবও খালিমুখে বইসা আছে| তুই মনসুর পাগলার ঘরে যা| দেখ গিয়া গুড় বা চিনি আছে কি নাই| লে¤^ুর ব্যবস্থা করতে বল|’

নয়ন বলল, ‘আইচ্ছা, ভাইজান|’ বলেই সে মনসুর পাগলার ঘরের দিকে ছুটল| ঠিক তখনই সবার দৃষ্টি গেল পুবে গোপাট পেরিয়ে বুইদ্দার খালের দিকে| খালে একটা আমগাছের তলায় একটা নৌকা ভিড়ছে| নৌকায় মনসুর পাগলা ভুঁইয়া বাড়ির আনিস|

নৌকায় মনসুর পাগলাকে দেখে ছালেক মেম্বরের চোখ বড় হয়ে গেল| পাশের আনিসকে দেখে যদিও সে মনে মনে কিছুটা চুপসে গেল, কিন্তু সে পরক্ষণ তা গা করল না| সে জোর গলায় পুলিশের উপপরির্দশক জুনায়েদ আহমেদকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল, ‘দারোগা সাব, দারোগা সাব, পাগলা আইছে, পাগলা আইছে!’

জুনায়েদ আহমেদ জিজ্ঞেস করল, ‘পাগলা?’

ছালেক মেম্বর বলল, ‘জি, ওই লাশটার জামাই| যারে খুঁজতে আইছেন|’

, আচ্ছা| নৌকায় তো দুজন আছে| কোন জন?’

সাদা শার্ট যে পইরা আছে হেয় না| লগে যে পাঞ্জাবি পইরা আছে, হেইডা| হের নামই মনসুর পাগলা|’

মনসুর পাগলা? সে কি পাগল?’

ছালেক মে¤^ একটু চুপ হয়ে গিয়ে পরক্ষণ জোর দিয়ে বলল, ‘না না, দারোগা সাব| একটুখানি ঘাড় ত্যাড়া তো, এই লাইগা সবাই তারে পাগলা ডাকে|’

জুনায়েদ আহমেদ বলল, ‘, তাই|’ বলেই সে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের পুলিশের সদস্য দুজনকে বলল, ‘এই তোমরা দুজন যাও তো| তাড়াতাড়ি যাও| ওই যে পাঞ্জাবি পরে আছে যে লোকটা, তাকে ধরে নিয়ে আস| সে যেন ভাগতে না পারে|’

পুলিশের সদস্য দুজন নৌকার দিকে যেতে যেতে বলল, ‘জি, স্যার| জি, স্যার|’

মনসুর পাগলা ততক্ষণে লাফিয়ে নেমে নৌকাটা বাঁধতে গেল| আনিসও নৌকা থেকে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে| ঠিক তখন পুলিশের সিপাহি দুজনকে দৌড়ে আসতে দেখে আনিস থতমত খেয়ে গেল| মনসুর পাগলাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নৌকার রশিটা ধরে হা করে তাকিয়ে রইল|

আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘পুলিশ?’

মনসুর পাগলা প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও পরক্ষণ সামলে নিয়ে আনিসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মে¤^ হালায় এই কামডা করছে| ছালেক মেম্বর| হেয় পুলিশ আনছে| আমারে কোড়ের পাড় হুমকি দিছিল|’

আনিস কিছু বলল না|

পুলিশের সদস্য দুজন মনসুর পাগলার দুই বাহুতে দুদিক দিয়ে ধরতে এল|

মনসুর পাগলা ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমারে ধরন লাগব না| আমি পুলিশ ডরাই না| আগে নৌকাডা বান্ধতে দেন| নাইলে নৌকাডা ভাইসা যাইব গা|’

পুলিশের সদস্য দুজন মনসুর পাগলাকে নৌকাটা বাঁধার সুযোগ দিল|

মনসুর পাগলা নৌকাটা শক্ত করে আমগাছটার গোড়ায় বাঁধল|

নৌকা বাঁধার পর পুলিশের সদস্য দুজনের একজন বলল, ‘এইদিকে আস| আমাদের সাথে চলো| স্যার ডাকছে|’

মনসুর পাগলা পুলিশের সিপাহি দুজনকে পাত্তা না দিয়ে সিতারা বেগমের লাশের দিকে হাঁটা ধরল|

পুলিশের সদস্য দুজন ত্বরিত মনসুর পাগলার পথ আগলে দুদিক দিয়ে দুই হাত ধরে বলল, ‘বললাম না, স্যার ডাকছে| কথা না শুনলে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাব|’

এবার ছালেক মেম্বরের সঙ্গে আসা সাঙ্গপাঙ্গগুলো দৌড়ে এল|

মনসুর পাগলা তাদের দিকে তাকিয়ে ত্যাড়া গলায় বলল, ‘আমি তগো মেম্বররে দেইখা ছাড়মু| হালার মেম্বর!’

আনিস নৌকা থেকে নেমে একটু এগিয়ে এসে বলল, ‘পাগলা, আমার সাথে আস|’

মনসুর পাগলা আনিসের দিকে তাকিয়ে নরম হয়ে এল| মুখে কিছু বলল না| সে আনিসকে অনুসরণ করল|

ওরা পুলিশের উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদের সামনে এসে দাঁড়াল| আনিস সামনে| মনসুর পাগলা ঠিক তার পেছনে| সিপাহি দুজন মনসুর পাগলার দুপাশে| ছালেক মেম্বরের সাঙ্গপাঙ্গরা পেছনে|

আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার? আপনি এখানে যে?

জুনায়েদ আহমেদ জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কে?’

আনিস কিছু বলার আগেই ছালেক মেম্বর বলল, ‘দারোগা সাব, তাইনে আমাগো গেরামের ভুঁইয়া বাড়ির| মান্যিগন্যি| অনুতপুর হাইস্কুলের মাস্টারি করেন| পত্রিকায় লেখেন|’

জুনায়েদ আহমেদ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘, আচ্ছা|’ বলেই সে আনিসের দিকে সরাসরি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘আসলে কি, আপনি তো জানেন, কেউ পানিতে ডুবে মরলে অপমৃত্যু| আইনের ব্যাপারস্যাপার আছে|’

আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, তা জানি|’

জুনায়েদ আহমেদ বলল, ‘আমরা এখানে এসেছি লাশ থানায় নিয়ে যেতে| আন-ন্যাচারেল ডেথ কেস| পুলিশি তদন্ত হবে| সুরতহাল রিপোর্ট ˆতরি করা হবে| এটি হত্যাকাণ্ড নাকি দুর্ঘটনা, তা নিশ্চিত করতে পুলিশি তদন্ত ময়না তদন্ত করা হবে|’

আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে মনসুরকে কেন ধরা হচ্ছে?’

জুনায়েদ আহমেদ জবাব দেওয়ার আগেই ছালেক মেম্বর বলে উঠল, ‘ভুঁইয়া সাব, মনসুর পাগলারে ধরা হইতাছে এই জন্যি, সেতারা বেগম তো পানিত ডুইবা মরে নাই|’

আনিস বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে সে কীভাবে মারা গেল?’

মনসুর পাগলা তারে পানিত চুবাইয়া মারছে|’

কী যা-তা কথা!’

যা-তা না, ভুঁইয়া সাব| আমি সইত্যই কইতাছি|’

আপনি কীভাবে সত্য বলছেন?’

এই ধরেন, মনসুর পাগলার নৌকা ডুবছে ভাটিতে| মোল্লাকান্দির পুনোয়ারার বটগাছের কাছে| লাশ পাওয়া গেছে আমাগো গেরামের কোড়ের পাড়ে| হেইডা কেমনে হইল?’

আনিস একটু চুপ হয়ে কী ভেবে বলল, ‘আপনি আসলে কী বলতে চাচ্ছেন, বুঝতে পারছি না|’

ছালেক মেম্বর বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল, ‘আরে ভুঁইয়া সাব, সহজ কথাটা বোঝেন না কেন? লাশের কি মাছের মতন কাখনা গজাইছিল যে গাঙে হেয় উজাইয়া আইব? সেতারা বেগমের লাশ এক-দেড় মাইল উজাইয়া আইল ক্যামনে?

আনিস এবার সত্যি ধন্ধে পড়ে গেল|

মনসুর পাগলা লাফিয়ে উঠে বলল, ‘আনিস, হেয় ঝামেলা লাগাইতে চাইতাছে| তুমি ছালেক মেম্বররে চিনো না? হেয় আস্ত একটা গম চোর| হালায় মানুষের মধ্যে ঝামেলা লাগাইয়া ট্যাকা খায়| আমারে লইয়া ঝামেলা লাগাইতে আইছে|’ বলেই মনসুর পাগলা আনিস থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ছালেক মেম্বরের দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল, ‘হেই মেম্বর, আমারে লইয়া ঝামেলা লাগাইলে কিন্তুক তোমারে ছাড়মু না| দেইখা লইমু...!’

ছালেক মেম্বর একটু নড়েচড়ে বসে পুলিশের উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখতাছেন, দারোগা সাব, দেখতাছেন, হেয় আপনের সামনেই কেমুন হুমকি দেয়? হেরে ধইরা লইয়া যান| থানায় নিয়া কয়েকটা ডলা দিলেই আসল কথা বার হইব| আমি হাছা কইছি| হেয়ই নিজে বউরে মারছে|’

 

সাত

মনসুর পাগলার বাড়ির পুবদিকের গোপাট ধরে একটা বাড়ি পেরোলেই দক্ষিণপাড়ার মুখে বুইদ্দার খালে পুলিশের নৌকাটা| আনিস নৌকার কাছাকাছি এসে দাঁড়াল| আঁধারিয়া গ্রামের দক্ষিণপাড়ার প্রথম বাড়িটি আবদেল আলীর| আবদেল আলী গ্রামে মাটি কাটার কাজ করত| গেল বছর পশ্চিম পাড়ায় তারা মিয়ার বাড়িতে মাটি কাটতে গিয়ে খাদেই হঠাৎ করেই মারা যায়| সুদিনে উত্তরের জোয়ারের জল চলে গেলে এখানকার অনেক বাড়িতেই মাটি ফেলে উঁচু করা হয়| আজকাল গোমতীর বানের পাশাপাশি উত্তরের জোয়ারের জল বেশিই বাড়ছে| বর্ষার মওসুমে জোয়ারের জল গোমতীর বন্যার মতোই হু হু করে ডাকে| আবার শুকনো মওসুম তাড়াতাড়ি চলে আসে|

অবশ্য আবদেল আলীর শ্বাসকষ্ট ছিল বেশ| বয়সও হয়েছিল| আনিসের বাবা সুন্দর ভুঁইয়ার প্রায় সমবয়সী ছিল| তার একটাই মাত্র ছেলে, মোহন| ছোটবেলায় মোহন আনিসের সঙ্গে মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েছে| এরপর আর লেখাপড়া এগিয়ে নিয়ে যায়নি| বাপের সঙ্গে মাটি কাটার কামলা দিত| বর্ষার মওসুমে মাছ ধরা ছিল তাদের বাড়তি আয়| বড় হয়ে অবশ্য মোহন হোমনায় একটা ইটের ভাটায় কাজ নেয়| বাড়িতে মাসে একদিন আসে| বাড়িতে আবদেল আলীর বৃদ্ধ বউটা বাড়িতে একা পড়ে আছে|

আবদেল আলীর ইশাটা খাল থেকে বেশ উঁচুতে| মাটি কাটার কামলা ছিল বলে আবেদেল আলী নিজেই নিজের বাড়ি মাটি ফেলে উঁচু করত| বাড়ি থেকে নিচে গোপাটা বা বুইদ্দার খালে নামতে হলে গাছের শেকড় ধরে-ধরে নামতে হয়| আনিস আর নিচে নামল না| একটা খড়ের মাড়ার পাশে দাঁড়িয়ে গেল|

আনিস অবশ্য সেখানে একা দাঁড়িয়ে নেই| তার পাশে পাড়ার কিছু ন্যাংটো ছেলেমেয়ে| মনসুর পাগলার মা কমলা খাতুন না এলেও মমিনা সেখান পর্যন্ত এগিয়ে এসেছে| খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে পুলিশের নৌকায় সেতারা বেগমের লাশটা ওঠানো দেখছে| পাড়ার আর কিছু বউঝিয়ারি এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে পুলিশের নৌকার দিকে উঁকিঝুঁকি মারছে| পাড়ার ব্যাটাছেলেরা যারা বাড়িতে ছিল, তারা একজনও এখানে নেই| সব উধাও| একে তো মনসুর পাগলার ওপর ভরসা নেই, কখন কী অঘটন ঘটিয়ে বসে| পরে পুলিশ আবার না গণহারে তাদেরকে ধরে নিয়ে যায়| তার ওপর এই ভাটি অঞ্চলের মানুষদের পুলিশের ভয় একটু বেশিই| কিছু একটা হলে ওদের দ্বীপের মতো গ্রামগুলো থেকে তো পালানোর উপায় নেই| এছাড়া এই ভাটি গ্রামগুলোতে বেশ ডাকাতি হয়| কয়েকদিন পরপরই পুলিশ ডাকাত সন্দেহে একে-ওকে গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে যায়| এদিকে ছালেক মে¤^ আজকাল কাউকে না কাউকে শত্রু বানিয়ে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়| এসব শত্রু বানানোর পেছনে তার উদ্দেশ্য একটাই, পুলিশের ফাঁদে ফেলে আশেপাশের গ্রামের লোকজনের কাছ থেকে কীভাবে টাকা খাওয়া যায়|

মমিনা খানিকটা দূর থেকেই আনিসকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ আনিস ভাই, আমার ভাইজানের লাইগা কেউ কি পুলিশগো সামনে দাঁড়াইব না? হেরে বিনা দোষেই লইয়া যাইবো গা? আর লাশ নিয়া এমুন টানাটানি?’

আনিস মমিনার দিকে তাকাল ঠিকই, কিন্তু কিছু বলল না| দৃষ্টি সরিয়ে আবার পুলিশের নৌকার দিকে তাকাল|

এরই মধ্যে সেতারা বেগমের লাশ পুলিশের নৌকায় তোলা হয়েছে| মনসুর পাগলাকেও তোলা হয়েছে হাত দুটো পিছমোড়া দিয়ে বেঁধে| বেশি বাড়াবাড়ি করছিল বলেই তাকে পিছমোড়া দিয়ে বাঁধা হয়েছে| সে যে নৌকায় সহজে উঠতে চেয়েছে, তা নয়| তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে বলে সে তিড়িংবিড়িং করে দু-দুবার পুলিশের সিপাহি দুজনকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে| পিছমোড়া বাঁধা অবস্থাতেই সে ছালেক মেম্বরকে শাসিয়েছে, ‘লওয়ের পুত মে¤^, আমারে চিনো নাই| তোমারে আমি দেইখা ছাড়মু নে| আমারে পুলিশ দিয়া ধইরা লইয়া যাইতাছ? দাঁড়াও, বাড়িত আইসা লই| কয়দিন আটকাইয়া রাখবা, হ্যাঁ?’

মনসুর পাগলা ধ্বস্তাধস্তি করে পুলিশের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে ব্যর্থ হয়ে সে আনিসের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলেছে, ‘আনিস, তুমি কও না, আমি কিচ্ছু করি নাই| আমার বউ মস্তানের ঔরসে যাওয়নের সময় নৌকাডা উল্টাইয়া পানিত ডুইবা মরছে| আমার কোনো দোষ নাই|’

পুলিশের উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদ ছালেক মেম্বরের সঙ্গে কী কথা যেন বলছে| আনিস খড়ের মাড়ার কাছে দাঁড়িয়ে ঠিক শুনতে পেল না| সে যে মনসুর পাগলার হয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলেনি, তা নয়| তার যে অবস্থান, সে অবস্থান থেকে সে কথা বলতে পারে, কিন্তু অন্যজনের মতো তর্ক করতে পারে না| পুলিশ উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদ বা ছালেক মেম্বর যে যুক্তি দেখিয়েছে, তা একেবারে খণ্ডন করা যায় না, সেটাও নয়| কিন্তু ব্যাপারটা যেহেতু আইনের পর্যায়ে চলে গেছে, তা কোর্ট পর্যন্ত গড়াবে, এটা নিশ্চিত|

পুলিশের উপ-পরিদর্শক কয়েক মুহূর্ত কী সব কথা বলে নৌকায় উঠে গেল| ছালেক মেম্বরও হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে কী একটা ইঙ্গিত করে নিজের নৌকায় উঠল| মনসুর পাগলা পুলিশের নৌকা থেকে তখনও আনিসকে ডাকছে| সেতারা বেগমের লাশটা নৌকায় লম্বা করে রাখা|

আনিস পুলিশের উপ-পরিদর্শক জুনায়েদ আহমেদ, ছালেক মেম্বর, ছালেক মেম্বরের সঙ্গে আসা লোকজন, নৌকা পিছমোড়া মনসুর পাগলা, নৌকায় সেতারা বেগমের লাশ, এমনকি তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ন্যাংটো ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে নিজে বেশ অসহায়বোধ করল| মমিনা খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে, এতেও সে অস্বস্তিতে পড়ে গেল| সে ভাবল, তার তো আসলেই মনসুর পাগলার জন্য কিছু করা দরকার| কিন্তু সে কী করবে বুঝতে পারল না|

আনিস আরও ভাবল, সে কি মনসুর পাগলাকে সাহায্য করার জন্য একটা নৌকা নিয়ে পুলিশের নৌকার পিছু পিছু থানায় যাবে? থানা তো এখান থেকে বেশ দূরে| নৌকায় যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে| ইঞ্জিনচালিত নৌকা হলে না হয় বিকেল-বিকেল গিয়ে পৌঁছবে| কিন্তু সে থানায় গিয়ে মনসুর পাগলার কী সাহায্য করতে পারবে? বরং এটা ভালো হয়, সে আগামীকাল তার মাকে কুমিল্লায় ডাক্তার দেখিয়ে ফেরার পথে একবার থানা হয়ে আসবে| আর নয়তো পরশুদিন কুমিল্লায় নিয়ে যদি মনসুর পাগলাকে কোর্টে তোলা হয়, সে তার জন্য একটা উকিল ধরবে| প্রয়োজনে তার জামিনের ব্যবস্থা করবে|

আবদেল আলীর বউ সফুরা বিবি কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আনিস তা খেয়াল করেনি| সফুরা বিবি যখন বলে উঠল, ‘হায় হায়, মনসুইরা হইল একটা পাগল মানুষ| হেরে ক্যান পুলিশ ধইরা লইয়া যাইতাছে? হায় হায়!’

আনিস চমকে উঠে সফুরা বিবির দিকে তাকাল| বয়সের ভারে নুইয়ে পড়ে কোমর বেঁকে যাওয়ায় সফুরা বিবিকে দেখা যাচ্ছে উটপাখির মতো| ব্লাউজবিহীন অরক্ষিত বুক দুটো মনে হচ্ছে মৃতপ্রায় একটা পেঁপে গাছের দুটো ঝুলে থেকে পেঁপের আকার| বুক দুটো চিমসানো, মন্দ বাতাসে তিরতির করে কাঁপছে| ধনুকের মতো বাঁকা শরীরটায় মাথাটা এখনও বেশ টান টান| চোখ দুটোর মধ্যেও যেন খরার টান|

সফুরা বিবি আবার বলল, ‘পাগলার বউ মরছে পানিত ডুইবা| হের দোষ কী? তুমি কিছু করো না ক্যান হের লাইগা, ভুঁইয়ার পুত?’

আনিস চুপ|

সফুরা বিবি নিজে নিজে মাথা নেড়ে বলল, ‘তোমরা না গেরামে এক লগে চলো? তোমার তো পাগলার লাইগা কিছু করা দরকার| তারে খালি খালি পুলিশ ধইরা লইয়া যাইতাছে| , ভুঁইয়ার পুত, তুমি কিছু কইতাছ না ক্যান? হে না তোমার জানের দোস্ত?’

আনিস এবারও চুপ| তার যে মুহূর্তে মনসুর পাগলার জন্য কিছু করার নেই, এটা সে সফুরা বিবিকে কীভাবে বোঝাবে? ওদিকে মমিনাও একটু আগে তাকে একই কথা জিজ্ঞেস করেছে|

সফুরা বিবি কী ভেবে অসন্তোষে সেখান থেকে চলে যেতে যেতে বলল, ‘ভুঁইয়ার পুত, তুমি তোমার বাপের লাহানই হইছ| দোস্ত ডাইকা ঘরে ঢোকো| বাইরের থাইকা কিচ্ছুই করো না|’

আনিস সফুরা বিবির কথাটা মানে বুঝল| আর তা বুঝেই সে চমকে উঠল| সে সরাসরি দৃষ্টিতে সফুরা বিবির দিকে তাকিয়ে রইল| এমন একজন অশিক্ষিত বৃদ্ধা এমন কঠিন কথাটা বলল কীভাবে?

সফুরা বেগম কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে মমিনার কাছে দাঁড়াল| মমিনা সফুরা বেগমের কানের কাছে মুখ নামিয়ে কী যেন বলল|

সফুরা বেগম একটু তেজি গলায় বলে উঠল, ‘হইছে, হইছে, আমারে কইতে হইব না| ওই বাড়ির সব ব্যাটাগোরেই আমি চিনি|’

মমিনা বলল, ‘আস্তে, বুজি, আস্তে|’

আনিস খড়ের মাড়ার কাছ থেকে সরে যাবে বলে সমীচীন ভাবল| ঠিক তখনই পুলিশের নৌকার ইঞ্জিন ভটভট শব্দ তুলল| শব্দটা তার কানে এসে বাজল ঠিক তীরের সরু ফলার মতো| সে ভাবল, আসলে তীর তো কানে এসে বাজে না, বিঁধে| তীরটা সত্যি সত্যি তার কানে বিঁধল| সে দেখল, নৌকাটা খালের জলে ঢেউ তুলে গোমতীর দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে| পেছনে পেছনে ছালেক মেম্বরের বড় ডিঙিটাও ছুটল|

আনিস এবার অমোঘ দৃষ্টিতে মনসুর পাগলাকে ছাপিয়ে সেতারা বেগমের লম্বালম্বি করে রাখা লাশটা দেখার চেষ্টা করল| লাশের চাটাইয়ের দৃষ্টিটা তার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল|

আনিস একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল| কেমন আহা শব্দ তোলা দীর্ঘশ্বাস যেন! ক্রমশ...

 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত