ফ্ল্যাট এ/৭-এর ডাস্টবিন খুলে ভেতরে ময়লার পলিথিন খোঁজে মন্টু| মাস ছয়েক ধরে তেমন কিছুই পায় না| তবু রোজ প্রত্যাশা নিয়ে খোলে সে| গত মাসে কিছু আপেলের বিচি, কমলার খোসা বা শুকিয়ে যাওয়া আঙ্গুর থোকার কিছু ডালপালা ছিলো| সেগুলোও যথারীতি কালো পলিথিনে সুন্দর করে মোড়ানো| মন্টু বুভুক্ষুর মতো কালো পলিথিন হাতড়ে তন্ন তন্ন করে দেখেছে| কয়টা কমলার খোসা হতে পারে! কয়টা আপেলের বিচি বা আঙ্গুরের শুকানো ডাল! এমনকী সে দুধের খালি চিমসানো প্যাকেটও তালাশ করেছে| এক মাস ধরে কিচ্ছু থাকে না| একদম কিচ্ছু না| বিস্কুটের প্যাকেট, এমনকী খালি স্যালাইনের খোসাও খোঁজে মন্টু| কলিং বেল বাজাতে নিষেধ আছে| সেটা সরাসরি মন্টুকে বলেননি তিনি| ইন্টারকম থেকে ফোন করে গার্ডকে নির্দেশ দেয়া আছে| কারণ মন্টুকে তিনি সরাসরি কটু কিছু বলতে পারবেন না| এমনকী, মন্টুর মুখোমুখিও হতে চান না এই নিষেধ শোনাতে| মানুষ এতো বিনয়ী হয় কী করে! তাও কিনা মন্টুর মতো এক ময়লাওয়ালার কাছে! এসব কারণে তাঁর জন্য মন্টুর এতো দুঃশ্চিন্তা, মায়া, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা|
আজও প্রত্যাশার হাতে ডাস্টবিন খুলে ময়লা খোঁজে সে| স্তূপ স্তূপ ময়লার ছোটমোটো একটা পাহাড় চায় মন্টু এ ফ্ল্যাটের ডাস্টবিনের গর্তে| সম্ভবত আজকাল ভেতরেও নেয়া হয় না এটা| লাটিমি ওরিঅ্যান্টাল হাউজের ১২৪টা বাসার মধ্যে ফ্ল্যাট এ/৭-এর ডাস্টবিন সবচেয়ে তকতকে, পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি| আগে ছিল তিন তিনটা ময়লার ঝুড়ি| দুই ছেলে, ছেলে বউ, তিন তিনজন নাতি-নাতনির রমরমা সংসার! বাজার সওদা, হাট-বাজারে এদের লম্বা হাত! বোতল, ফল-জুসের ক্যান, খাবারের প্যাকেট রাখা হতো একটায়, আরেকটায় প্রতিদিনের রান্নার বর্জ্য ও অন্যটিতে গৃহ আবর্জনা| নয়জন মানুষের ভরপুর পরিবার! বছর খানেকের মধ্যে দাঁড়ালো একজনে!
একটা দীর্ঘ বিরতির পর এক বিকেলে তাঁর সাথে দেখা মন্টুর| মেয়ের বিয়ে, অসুস্থতা নানান ঝুট-ঝামেলায় মাস চারেক ছোট ভাইকে বদলি দিয়ে বাড়িতে ছিলো মন্টু| ফেরার পর ফ্ল্যাট এ/৭ স্যারের সাথে দেখা করতে যায় সে| লিফ&ট ম্যান রুহুলের কাছে শুনেছে স্যারের শরীরটা ভালো না| তাঁকে দেখে চমকে যায় মন্টু! চার মাসের ব্যাবধানে একটা মানুষ এতো বদলে যেতে পারে! হাসিখুশি মুখটা মলিনতায় ঠাসা, গায়ের ওজন যেন অর্ধেক হয়ে গেছে! মন্টু না বলে পারে না— স্যার, শইল্লের এরম অবস্থা কেন? তিনি ম্লান হাসেন| মন্টু, তুমি তো ছিলে না| তোমার দু ভাইয়াই বিদেশ চলে গেছে| কলিজার টুকরা তিন নাতি-নাতনিও! শরীর ভালো থাকে কী করে বলো! ভেতর থেকে ম্যাডাম আসেন— কবে এলে মন্টু? তোমার স্যার রিটায়ার্ড করেছে গত মাসে| সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকে, আজকাল কোথাও যেতে চায় না; বাজারেও না...! মন্টু ব্যস্ত গলায় বলে— কিছু লাগলে আমারে কইয়েন ম্যাডাম, আমি বাজার-সওদা...| তার মুখের কথা কেড়ে নেন পারভেজ সাহেব— কিচ্ছু লাগবে না মন্টু, কাদের জন্য বাজার করবো! কলিজার টুকরাগুলো সব চলে গেছে; ঘর এখন শ্মশান আমার...! বেদনাহত মনে ফিরে আসে মন্টু|
এর মধ্যে আরও মহা সর্বনাশ ঘটে! আচমকা হার্ট অ্যাটাকে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাঁর সাথে দেখাসাক্ষাৎ দুরূহ হয়ে ওঠে মন্টুর| রুহুলের কাছেই শোনে স্যারের একমাত্র মেয়েও আমেরিকা চলে যাচ্ছে| মন্টু ভাবে, মানুষটা বাঁচবে কী করে! গমগম করা একটা বাসা চোখের সামনে বিরানভূমি হয়ে গেল| মাসের পর মাস দেখা মেলে না তাঁর| ড্রাইভারকে দেখা যায় মাঝে মধ্যে উপরে যেতে| অন্য কারও যাওয়া নিষেধ| মন্টু কষ্টে তড়পায়| কখনও কখনও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কলিং বেলটা ২/১ বার টিপেই ফেলে| কেউ সাড়া দেয় না| ড্রাইভার একদিন বলে— মন্টু স্যারকে বিরক্ত করিস না| আজকাল আমিও ঢুকতে পারি না| দরকারি জিনিসগুলো বাইরে রেখে ফোনে বলে দেই| এরকমই নির্দেশ আছে|
মন্টু ডাস্টবিনে তেমন কিছু পায় না| তবু নিয়ম করে যায় রোজ, অহেতুক দাঁড়িয়ে থাকে দরোজার সামনে| বেল বাজায় নাা| মাঝেমধ্যে নিরুপায় কষ্টে আকুল গলায় ডাকে— স্যার, স্যারগো...! একদিন ভেতর থেকে তাঁর গলা শুনে আগ্রহী পায়ে দাঁড়ায়, যদি ডাকেন...! নাহ, কারও সাথে সম্ভবত ফোনে কথা বলছেন... কেন ফোন করো, কী জানতে চাও! ময়লা আবর্জনার মতো ফেলে সবাই চলে গেলে, এখন বাকি থাকলো ডাস্টবিনে পতিত হওয়া...! এরপর মন্টু আর দাঁড়ায় না, একলাপনা মানুষটারে খুন কইরা ফালতাছে... ফিরতে ফিরতে মন্টু কথাটা না ভেবে পারে না|
আজ ডাস্টবিন খুলে চোখ দুটো গোল্লা হয়ে যায় মন্টুর! কোন পলিথিন নাই, স্রেফ এই শুটকানো জিনিসটায় চোখ পড়ে| প্রথমে বিস্ময় ও পরে হীম কাঁটাওয়ালা একটা ভয় শিরদাঁড়া বেয়ে ব্রহ্মতালু অব্দি ওঠে| দেড় ফুট বাই এক ফুট উঁচু ডাস্টবিনের গর্তে এই শুকানো ও চিমসানো জিনিসটা চোখে পড়ারও কথা নয়| ফর্সা ধবধবে রঙ কালচে হয়ে গেলেও আভিজাত্য হারায়নি বলেই হয়তো বা নজরে গাঁথছে| মন্টু সাহস করে হাতের গ্লাভসে ধরে তুলতে চায় মরা টিকটিকি সাইজের জিনিসটা| তার আগেই পাশের ফ্ল্যাটের দরজা ধরাম শব্দে খুলে যায়| ওটা আর তোলা হয় না মন্টুর| মাথাটা লাটিমের মতো বন বন করে পেছনে ঘুরতে শুরু করে ওর...|
গাড়ির ডিক্কি থেকে একের পর এক বাজারের থলে নামতেই থাকে| থলের বাইরে উঁচিয়ে থাকা বোয়াল মাছের লেজ আর মসৃণ পিঠের খানিকটা দৃশ্যমান| দেখেই বোঝা যায় ১০/১২ কেজির কম হবে না| মোরগের রান-থান পলিথিনে জড়াজড়ি করে থাকলেও আন্দাজ করা যায় এক ডজন কি তার বেশিও এর মধ্যে ঘাপটি মেরে আছে| একটা জ্যান্ত শোল থলের গর্ত ছেড়ে বেজমেন্টের টাইলসে লাফাতে শুরু করে| ফুলকপি, টমেটো, আলু শিম, লাউসহ শীত সব্জীর ভারি থলেটা ড্রাইভারের হাতে সমর্পণ করেন তিনি| বাজারের বহর দেখা থেকে বিরতি টেনে মন্টু তাঁর উদ্দেশ্য আসসালামু আলাইকুম দিলে তিনি স্মিত মধুর হেসে সালামের প্রত্যুত্তর দেন— তো মন্টু মিঞা কাজ শেষ আপনার? তাঁর ‘আপনি’ সম্বোধনে বরাবরের মতো বিব্রত বোধ করলেও হাসি মুখে সে জানায়— জ্বী না স্যার, সাত তলার ময়লা নামামু, উফরে থাইকা দেখলাম আফনের গাড়ি ঢুকতাছে, ভাবলাম, যুদি কিছু করন লাগে ... ডাইবার সাবতো একলা এতোকিছু উডাইতে পারবো না...!
—না মন্টু লাগবে না| আমি ওকে সাহায্য করবো| হাসি মুখে মন্টুকে আশ্বস্ত করেন তিনি|
সদালাপী, নম্র-ভদ্র মানুষটাকে হাউজের সবচেয়ে বজ্জাত লোকটাও পছন্দ না করে পারে না| তাঁর বাজার করা এ হাউজের আলোচিত বিষয়ের একটি|
বারো-তেরো বছর ধরে এখানে ময়লা পরিষ্কার করে মন্টু| ১২৪টা ফ্ল্যাটের বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট হাউজের সবাইকে মোটামুটি চেনে মন্টু| ময়লার ডাস্টবিন থেকেই বোঝা যায় কোন পরিবারের কী হালচাল| ঘরে ঢুকতে হয় না| অবশ্য দু/একজন ছাড়া ঘরে ঢুকতেইবা দেয় কে ওকে! এর মধ্যে ফ্ল্যাট নং এ/৭-এর পরিবারটি ব্যতিক্রম| এ বাসায় কম-বেশি যাতায়াত আছে মন্টুর |
— তো পারভেজ সাহেব, আজ কী পুরা নিউমার্কেট কিনে আনলেন? নাকি কাউরান বাজার! এফ/৫-এর জয়নাল আবেদীন সাহেবের মস্করা গায়ে মাখেন না পারভেজ হোসেন| এই আর কী, বড় মেয়ে এসেছে খুলনা থেকে| জামাই, দুই নাত-নাতনি...! আর বাসায় তো মাশাল্লাহ তিন-তিনজন আছেনই| কত বায়না উনাদের! তৃপ্তির ভাঁপ ওড়ে পারভেজ সাহেবের প্রতি নিঃশ্বাসে| তাঁর মুখের কথা শুনলেও ভালো লাগে মন্টুর| বিদেশি অফিসে খুব বড় চাকরি করেন স্যার| মোটা বেতন পান| সবাই বলাবলি করে বলে বিষয়টা মন্টুও জানে|
চিমসানো গাল, বেঁটেখাটো, মন্টুকে বেশিরভাগ ফ্ল্যাটেই ময়লাওয়ালা ডাকে; অনেকে নামও জানে না| যেমন জানে না মন্টু মেট্রিক পাস| ছাত্র নেহায়েত মন্দ ছিল না| অভাব, দারিদ্র্য, খারাপ চেহারা সব মিলিয়ে এরচেয়ে আর কোনো কাজ জোটানো সম্ভব হয়নি| এ হাউজে কাজটা তবু পার্মানেন্ট| মাস শেষে বেতন| নিচে বেজমেন্টে থাকার ব্যাবস্থা আছে| রান্নাটা করে নিতে হয় নিজের| এখানে সবাইকে চেনে মন্টু| শুধু কী চেনা! সব বাসার অন্দর মহলের আচার আচরণও মোটামুটি বোঝা সারা ওর| ময়লার ড্রাম বারান্দায় রেখে প্রতিটা ফ্লোরে ফ্লোরে আবর্জনাগুলো সংগ্রহ করে ও| সি/২তে যাওয়ার আগে নাক-মুখে ভালো করে কাপড় প্যাঁচায় মন্টু| দুনিয়ার নোংরা এরা! ময়লার গন্ধে টেকা দায়| মাছের আঁশ, নোংরা ডায়পার, মাসিকের খোলা প্যাড, ৪/৫ দিনের পচাবাসি ভাত! কী নাই! ইচ্ছা করে ওদের বলতে, ময়লাগুলো পলিথিনে বা কাগজে মুড়িয়ে দিলে খুব কী কষ্ট? সাহসে কুলায় না| এ হাউজের মমতায় জড়িয়ে গেছে মন্টু| নিরুপায় মমতা! ই/৪ গিয়ে মুখের কাপড় খোলে| মন্টু এ ফ্ল্যাটের নাম দিয়েছে ‘অন লাইন কটেজ’| এদের ময়লার বীনে থাকে রাজ্যের ছেঁড়া শপিং প্যাকেট, পিজা, কেক, বিরিয়ানি তেহারি আর নানান কিছিমের খাবারের খালি বাকসো| কাঁচা শাকসবজি, রান্নার আবর্জনা ক্বচিৎ মেলে| সারাদিন ডেলিভারি ম্যানের কলিং বেল টেপাটেপি বোধহয় লেগেই থাকে| মন্টু তার স্বভাব ভাবনায় ময়লাওয়ালা পদবি টপকে মাঝে মধ্যে বুদ্ধিবাদী হয়ে ওঠে| ফ্ল্যাট জি/৬-এ যাবার আগে মুখ আবার ভালো করে প্যাঁচায় মন্টু| চিড়িয়াখানা খানা ফ্ল্যাটের বিড়াল, খরগোশ, পাখি, কচ্ছপের বিষ্ঠার গন্ধে ওর বেটে-খাটো অবয়বে বিবমিষার উদ্রেক হয়| মাঝে মাঝে ভাবে, কমিটিতে এ নিয়ে কিছু বলবে! কিন্তু সাহসের লাগাম টেনে আবার বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে| চাকরির বারোটা বাজানোর চেয়ে মুখে কাপড় ও লাগাম টানা ভালো|
এ/৭-এর পরিচ্ছন্ন ডাস্টবিনটা মন্টুর মুখ ব্যাদান করে রোজ| কিচ্ছু থাকে না এতে| সামনের ফ্ল্যাটের ময়লা নেয়ার পর নিরাপদ নির্জনতায় মন্টু আবার এ/৭-এর ডাস্টবিনের কাছে ফিরে যায়| ডাস্টবিনের তলায় কী পড়ে আছে ওটা! পায়ের চাপে বীনের ডালাটা খোলে নিচু হয়ে নিচে পড়ে থাকা টিকটিকি সদৃশ্য সরিসৃপটাকে ভালো করে নিরীক্ষণ করার জন্য মন্টু ওর চোখের সবটুকু জ্যোতি মনিতে জড়ো করে| জিনিসটা হাতে তুলে নেয়ার পর ওর চোখ ভয়ার্ত হয়ে ওঠে| ওর বেটে-খাটো শরীর অনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রণায় কাঁপতে শুরু করলে মেঝেয় বসে পড়ে| গভীর কষ্টের অস্ফুট আর্তনাদে মন্টু... ডাস্টবিনের গায়ে এলিয়ে পড়ে|

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুন ২০২৬
ফ্ল্যাট এ/৭-এর ডাস্টবিন খুলে ভেতরে ময়লার পলিথিন খোঁজে মন্টু| মাস ছয়েক ধরে তেমন কিছুই পায় না| তবু রোজ প্রত্যাশা নিয়ে খোলে সে| গত মাসে কিছু আপেলের বিচি, কমলার খোসা বা শুকিয়ে যাওয়া আঙ্গুর থোকার কিছু ডালপালা ছিলো| সেগুলোও যথারীতি কালো পলিথিনে সুন্দর করে মোড়ানো| মন্টু বুভুক্ষুর মতো কালো পলিথিন হাতড়ে তন্ন তন্ন করে দেখেছে| কয়টা কমলার খোসা হতে পারে! কয়টা আপেলের বিচি বা আঙ্গুরের শুকানো ডাল! এমনকী সে দুধের খালি চিমসানো প্যাকেটও তালাশ করেছে| এক মাস ধরে কিচ্ছু থাকে না| একদম কিচ্ছু না| বিস্কুটের প্যাকেট, এমনকী খালি স্যালাইনের খোসাও খোঁজে মন্টু| কলিং বেল বাজাতে নিষেধ আছে| সেটা সরাসরি মন্টুকে বলেননি তিনি| ইন্টারকম থেকে ফোন করে গার্ডকে নির্দেশ দেয়া আছে| কারণ মন্টুকে তিনি সরাসরি কটু কিছু বলতে পারবেন না| এমনকী, মন্টুর মুখোমুখিও হতে চান না এই নিষেধ শোনাতে| মানুষ এতো বিনয়ী হয় কী করে! তাও কিনা মন্টুর মতো এক ময়লাওয়ালার কাছে! এসব কারণে তাঁর জন্য মন্টুর এতো দুঃশ্চিন্তা, মায়া, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা|
আজও প্রত্যাশার হাতে ডাস্টবিন খুলে ময়লা খোঁজে সে| স্তূপ স্তূপ ময়লার ছোটমোটো একটা পাহাড় চায় মন্টু এ ফ্ল্যাটের ডাস্টবিনের গর্তে| সম্ভবত আজকাল ভেতরেও নেয়া হয় না এটা| লাটিমি ওরিঅ্যান্টাল হাউজের ১২৪টা বাসার মধ্যে ফ্ল্যাট এ/৭-এর ডাস্টবিন সবচেয়ে তকতকে, পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি| আগে ছিল তিন তিনটা ময়লার ঝুড়ি| দুই ছেলে, ছেলে বউ, তিন তিনজন নাতি-নাতনির রমরমা সংসার! বাজার সওদা, হাট-বাজারে এদের লম্বা হাত! বোতল, ফল-জুসের ক্যান, খাবারের প্যাকেট রাখা হতো একটায়, আরেকটায় প্রতিদিনের রান্নার বর্জ্য ও অন্যটিতে গৃহ আবর্জনা| নয়জন মানুষের ভরপুর পরিবার! বছর খানেকের মধ্যে দাঁড়ালো একজনে!
একটা দীর্ঘ বিরতির পর এক বিকেলে তাঁর সাথে দেখা মন্টুর| মেয়ের বিয়ে, অসুস্থতা নানান ঝুট-ঝামেলায় মাস চারেক ছোট ভাইকে বদলি দিয়ে বাড়িতে ছিলো মন্টু| ফেরার পর ফ্ল্যাট এ/৭ স্যারের সাথে দেখা করতে যায় সে| লিফ&ট ম্যান রুহুলের কাছে শুনেছে স্যারের শরীরটা ভালো না| তাঁকে দেখে চমকে যায় মন্টু! চার মাসের ব্যাবধানে একটা মানুষ এতো বদলে যেতে পারে! হাসিখুশি মুখটা মলিনতায় ঠাসা, গায়ের ওজন যেন অর্ধেক হয়ে গেছে! মন্টু না বলে পারে না— স্যার, শইল্লের এরম অবস্থা কেন? তিনি ম্লান হাসেন| মন্টু, তুমি তো ছিলে না| তোমার দু ভাইয়াই বিদেশ চলে গেছে| কলিজার টুকরা তিন নাতি-নাতনিও! শরীর ভালো থাকে কী করে বলো! ভেতর থেকে ম্যাডাম আসেন— কবে এলে মন্টু? তোমার স্যার রিটায়ার্ড করেছে গত মাসে| সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকে, আজকাল কোথাও যেতে চায় না; বাজারেও না...! মন্টু ব্যস্ত গলায় বলে— কিছু লাগলে আমারে কইয়েন ম্যাডাম, আমি বাজার-সওদা...| তার মুখের কথা কেড়ে নেন পারভেজ সাহেব— কিচ্ছু লাগবে না মন্টু, কাদের জন্য বাজার করবো! কলিজার টুকরাগুলো সব চলে গেছে; ঘর এখন শ্মশান আমার...! বেদনাহত মনে ফিরে আসে মন্টু|
এর মধ্যে আরও মহা সর্বনাশ ঘটে! আচমকা হার্ট অ্যাটাকে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাঁর সাথে দেখাসাক্ষাৎ দুরূহ হয়ে ওঠে মন্টুর| রুহুলের কাছেই শোনে স্যারের একমাত্র মেয়েও আমেরিকা চলে যাচ্ছে| মন্টু ভাবে, মানুষটা বাঁচবে কী করে! গমগম করা একটা বাসা চোখের সামনে বিরানভূমি হয়ে গেল| মাসের পর মাস দেখা মেলে না তাঁর| ড্রাইভারকে দেখা যায় মাঝে মধ্যে উপরে যেতে| অন্য কারও যাওয়া নিষেধ| মন্টু কষ্টে তড়পায়| কখনও কখনও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কলিং বেলটা ২/১ বার টিপেই ফেলে| কেউ সাড়া দেয় না| ড্রাইভার একদিন বলে— মন্টু স্যারকে বিরক্ত করিস না| আজকাল আমিও ঢুকতে পারি না| দরকারি জিনিসগুলো বাইরে রেখে ফোনে বলে দেই| এরকমই নির্দেশ আছে|
মন্টু ডাস্টবিনে তেমন কিছু পায় না| তবু নিয়ম করে যায় রোজ, অহেতুক দাঁড়িয়ে থাকে দরোজার সামনে| বেল বাজায় নাা| মাঝেমধ্যে নিরুপায় কষ্টে আকুল গলায় ডাকে— স্যার, স্যারগো...! একদিন ভেতর থেকে তাঁর গলা শুনে আগ্রহী পায়ে দাঁড়ায়, যদি ডাকেন...! নাহ, কারও সাথে সম্ভবত ফোনে কথা বলছেন... কেন ফোন করো, কী জানতে চাও! ময়লা আবর্জনার মতো ফেলে সবাই চলে গেলে, এখন বাকি থাকলো ডাস্টবিনে পতিত হওয়া...! এরপর মন্টু আর দাঁড়ায় না, একলাপনা মানুষটারে খুন কইরা ফালতাছে... ফিরতে ফিরতে মন্টু কথাটা না ভেবে পারে না|
আজ ডাস্টবিন খুলে চোখ দুটো গোল্লা হয়ে যায় মন্টুর! কোন পলিথিন নাই, স্রেফ এই শুটকানো জিনিসটায় চোখ পড়ে| প্রথমে বিস্ময় ও পরে হীম কাঁটাওয়ালা একটা ভয় শিরদাঁড়া বেয়ে ব্রহ্মতালু অব্দি ওঠে| দেড় ফুট বাই এক ফুট উঁচু ডাস্টবিনের গর্তে এই শুকানো ও চিমসানো জিনিসটা চোখে পড়ারও কথা নয়| ফর্সা ধবধবে রঙ কালচে হয়ে গেলেও আভিজাত্য হারায়নি বলেই হয়তো বা নজরে গাঁথছে| মন্টু সাহস করে হাতের গ্লাভসে ধরে তুলতে চায় মরা টিকটিকি সাইজের জিনিসটা| তার আগেই পাশের ফ্ল্যাটের দরজা ধরাম শব্দে খুলে যায়| ওটা আর তোলা হয় না মন্টুর| মাথাটা লাটিমের মতো বন বন করে পেছনে ঘুরতে শুরু করে ওর...|
গাড়ির ডিক্কি থেকে একের পর এক বাজারের থলে নামতেই থাকে| থলের বাইরে উঁচিয়ে থাকা বোয়াল মাছের লেজ আর মসৃণ পিঠের খানিকটা দৃশ্যমান| দেখেই বোঝা যায় ১০/১২ কেজির কম হবে না| মোরগের রান-থান পলিথিনে জড়াজড়ি করে থাকলেও আন্দাজ করা যায় এক ডজন কি তার বেশিও এর মধ্যে ঘাপটি মেরে আছে| একটা জ্যান্ত শোল থলের গর্ত ছেড়ে বেজমেন্টের টাইলসে লাফাতে শুরু করে| ফুলকপি, টমেটো, আলু শিম, লাউসহ শীত সব্জীর ভারি থলেটা ড্রাইভারের হাতে সমর্পণ করেন তিনি| বাজারের বহর দেখা থেকে বিরতি টেনে মন্টু তাঁর উদ্দেশ্য আসসালামু আলাইকুম দিলে তিনি স্মিত মধুর হেসে সালামের প্রত্যুত্তর দেন— তো মন্টু মিঞা কাজ শেষ আপনার? তাঁর ‘আপনি’ সম্বোধনে বরাবরের মতো বিব্রত বোধ করলেও হাসি মুখে সে জানায়— জ্বী না স্যার, সাত তলার ময়লা নামামু, উফরে থাইকা দেখলাম আফনের গাড়ি ঢুকতাছে, ভাবলাম, যুদি কিছু করন লাগে ... ডাইবার সাবতো একলা এতোকিছু উডাইতে পারবো না...!
—না মন্টু লাগবে না| আমি ওকে সাহায্য করবো| হাসি মুখে মন্টুকে আশ্বস্ত করেন তিনি|
সদালাপী, নম্র-ভদ্র মানুষটাকে হাউজের সবচেয়ে বজ্জাত লোকটাও পছন্দ না করে পারে না| তাঁর বাজার করা এ হাউজের আলোচিত বিষয়ের একটি|
বারো-তেরো বছর ধরে এখানে ময়লা পরিষ্কার করে মন্টু| ১২৪টা ফ্ল্যাটের বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট হাউজের সবাইকে মোটামুটি চেনে মন্টু| ময়লার ডাস্টবিন থেকেই বোঝা যায় কোন পরিবারের কী হালচাল| ঘরে ঢুকতে হয় না| অবশ্য দু/একজন ছাড়া ঘরে ঢুকতেইবা দেয় কে ওকে! এর মধ্যে ফ্ল্যাট নং এ/৭-এর পরিবারটি ব্যতিক্রম| এ বাসায় কম-বেশি যাতায়াত আছে মন্টুর |
— তো পারভেজ সাহেব, আজ কী পুরা নিউমার্কেট কিনে আনলেন? নাকি কাউরান বাজার! এফ/৫-এর জয়নাল আবেদীন সাহেবের মস্করা গায়ে মাখেন না পারভেজ হোসেন| এই আর কী, বড় মেয়ে এসেছে খুলনা থেকে| জামাই, দুই নাত-নাতনি...! আর বাসায় তো মাশাল্লাহ তিন-তিনজন আছেনই| কত বায়না উনাদের! তৃপ্তির ভাঁপ ওড়ে পারভেজ সাহেবের প্রতি নিঃশ্বাসে| তাঁর মুখের কথা শুনলেও ভালো লাগে মন্টুর| বিদেশি অফিসে খুব বড় চাকরি করেন স্যার| মোটা বেতন পান| সবাই বলাবলি করে বলে বিষয়টা মন্টুও জানে|
চিমসানো গাল, বেঁটেখাটো, মন্টুকে বেশিরভাগ ফ্ল্যাটেই ময়লাওয়ালা ডাকে; অনেকে নামও জানে না| যেমন জানে না মন্টু মেট্রিক পাস| ছাত্র নেহায়েত মন্দ ছিল না| অভাব, দারিদ্র্য, খারাপ চেহারা সব মিলিয়ে এরচেয়ে আর কোনো কাজ জোটানো সম্ভব হয়নি| এ হাউজে কাজটা তবু পার্মানেন্ট| মাস শেষে বেতন| নিচে বেজমেন্টে থাকার ব্যাবস্থা আছে| রান্নাটা করে নিতে হয় নিজের| এখানে সবাইকে চেনে মন্টু| শুধু কী চেনা! সব বাসার অন্দর মহলের আচার আচরণও মোটামুটি বোঝা সারা ওর| ময়লার ড্রাম বারান্দায় রেখে প্রতিটা ফ্লোরে ফ্লোরে আবর্জনাগুলো সংগ্রহ করে ও| সি/২তে যাওয়ার আগে নাক-মুখে ভালো করে কাপড় প্যাঁচায় মন্টু| দুনিয়ার নোংরা এরা! ময়লার গন্ধে টেকা দায়| মাছের আঁশ, নোংরা ডায়পার, মাসিকের খোলা প্যাড, ৪/৫ দিনের পচাবাসি ভাত! কী নাই! ইচ্ছা করে ওদের বলতে, ময়লাগুলো পলিথিনে বা কাগজে মুড়িয়ে দিলে খুব কী কষ্ট? সাহসে কুলায় না| এ হাউজের মমতায় জড়িয়ে গেছে মন্টু| নিরুপায় মমতা! ই/৪ গিয়ে মুখের কাপড় খোলে| মন্টু এ ফ্ল্যাটের নাম দিয়েছে ‘অন লাইন কটেজ’| এদের ময়লার বীনে থাকে রাজ্যের ছেঁড়া শপিং প্যাকেট, পিজা, কেক, বিরিয়ানি তেহারি আর নানান কিছিমের খাবারের খালি বাকসো| কাঁচা শাকসবজি, রান্নার আবর্জনা ক্বচিৎ মেলে| সারাদিন ডেলিভারি ম্যানের কলিং বেল টেপাটেপি বোধহয় লেগেই থাকে| মন্টু তার স্বভাব ভাবনায় ময়লাওয়ালা পদবি টপকে মাঝে মধ্যে বুদ্ধিবাদী হয়ে ওঠে| ফ্ল্যাট জি/৬-এ যাবার আগে মুখ আবার ভালো করে প্যাঁচায় মন্টু| চিড়িয়াখানা খানা ফ্ল্যাটের বিড়াল, খরগোশ, পাখি, কচ্ছপের বিষ্ঠার গন্ধে ওর বেটে-খাটো অবয়বে বিবমিষার উদ্রেক হয়| মাঝে মাঝে ভাবে, কমিটিতে এ নিয়ে কিছু বলবে! কিন্তু সাহসের লাগাম টেনে আবার বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে| চাকরির বারোটা বাজানোর চেয়ে মুখে কাপড় ও লাগাম টানা ভালো|
এ/৭-এর পরিচ্ছন্ন ডাস্টবিনটা মন্টুর মুখ ব্যাদান করে রোজ| কিচ্ছু থাকে না এতে| সামনের ফ্ল্যাটের ময়লা নেয়ার পর নিরাপদ নির্জনতায় মন্টু আবার এ/৭-এর ডাস্টবিনের কাছে ফিরে যায়| ডাস্টবিনের তলায় কী পড়ে আছে ওটা! পায়ের চাপে বীনের ডালাটা খোলে নিচু হয়ে নিচে পড়ে থাকা টিকটিকি সদৃশ্য সরিসৃপটাকে ভালো করে নিরীক্ষণ করার জন্য মন্টু ওর চোখের সবটুকু জ্যোতি মনিতে জড়ো করে| জিনিসটা হাতে তুলে নেয়ার পর ওর চোখ ভয়ার্ত হয়ে ওঠে| ওর বেটে-খাটো শরীর অনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রণায় কাঁপতে শুরু করলে মেঝেয় বসে পড়ে| গভীর কষ্টের অস্ফুট আর্তনাদে মন্টু... ডাস্টবিনের গায়ে এলিয়ে পড়ে|

আপনার মতামত লিখুন