সংবাদ

মতামত

শব্দের রাজনীতি, রাজনীতির শব্দ

গণতন্ত্র বলতে আমরা সাধারণত নির্বাচন, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা কিংবা ভোটাধিকারের কথা বুঝি। এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয় অহরহ। কিন্তু গণতন্ত্রের এমন একটি উপাদান আছে, যা নিয়ে কথা কম হয়, অথচ এটিই গণতন্ত্রকে অন্য সব শাসনব্যবস্থা থেকে আলাদা করে দেয়—সেটি হলো গঠনমূলক সমালোচনা। ব্যক্তি আক্রমণ, অশ্রাব্য গালাগালি বা কটূক্তি গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য নয়; বরং এগুলো স্বৈরাচারী মানসিকতার প্রাথমিক লক্ষণ। যে রাজনীতি যুক্তি দিয়ে না জিতে গলাবাজি দিয়ে জিততে চায়, সে রাজনীতি গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলে।শব্দের শক্তি নিয়ে আমরা প্রায়ই উদাসীন থাকি। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, একটি শব্দ যেমন সংলাপের দরজা খুলে দিতে পারে, তেমনি একটি ভুল শব্দ গোটা জাতিকে যুদ্ধ ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মিত্রশক্তি জাপানের কাছে আত্মসমর্পণের শর্ত দিয়ে পটসডাম ঘোষণা জারি করেছিল। জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কানতারো সুজুকি এর জবাবে “মোকুসাতসু” শব্দটি ব্যবহার করেন। এই একটি শব্দের অস্পষ্ট অনুবাদ—নীরব থাকা বোঝানো হলেও তা “উপেক্ষা করা” অর্থে প্রচারিত হয়- বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয় বলে অনেকে মনে করেন। এর পরিণতিতে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নেমে আসে মানব ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ধ্বংসযজ্ঞ। একটি শব্দের অসতর্ক ব্যবহার কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, এর চেয়ে বড় দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।আমাদের নিজের ইতিহাসেও এমন উদাহরণ আছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার একটি মন্তব্য আন্দোলনকে নতুন গতি দিয়েছিল, যার পরিণতিতে তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। প্রতিবেশী ভারতেও সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, বেকার যুবসমাজ নিয়ে দেশটির প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের জের ধরে পদত্যাগ করতে হয়েছে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, রাজনীতিতে শব্দচয়ন কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়—এটি জনজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি আক্রমণ আর গালিগালাজ যেন একরকম স্বাভাবিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। প্রজন্মের ভেদাভেদ নেই বললেই চলে—পুরনো ধারার নেতা থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরাও কমবেশি এই সংস্কৃতির শরিক। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, রাজনীতিতে মিথ্যা প্রচার আর ব্যক্তি আক্রমণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বরং নতুন মোড়কে তা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেও অশোভন স্লোগান আর কটূ ভাষার ব্যবহার এখন যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই প্রবণতা শুধু ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ নেই, জাতীয় রাজনীতির মঞ্চেও তার প্রতিফলন স্পষ্ট। এমনকি যারা নিজেদের জেন-জি প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন, রাজনীতিতে নতুনত্ব ও শালীনতার প্রতিশ্রুতি দেন, তাদের অনেকের আচরণেও পুরনো সেই অসহিষ্ণুতারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এনসিপির জুলাই পদযাত্রার সময় দলটির এক নেতা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে প্রতিপক্ষ দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য ও রূঢ় ভাষা ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে, যার জেরে একাধিক স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এমনই এক সংঘর্ষে দলটির এক কর্মী চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারান। রাজনৈতিক বিতর্কে জেতার আগ্রহে উচ্চারিত কয়েকটি শব্দের মূল্য একজন তরুণকে সারাজীবনের জন্য চোখের আলো থেকে বঞ্চিত করেছে—এই মূল্য কি আদৌ পরিশোধযোগ্য? শুধু এই একটি ঘটনা নয়, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের নেতাদের মধ্যেও একে অপরের বিরুদ্ধে লাগামহীন ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। এটি কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির লক্ষণ হতে পারে না। গণতান্ত্রিক রাজনীতি মানে ধৈর্য, সহনশীলতা এবং যুক্তিনির্ভর গঠনমূলক সমালোচনা—প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রতিযোগিতা নয়।এখানেই আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরও সতর্ক হতে হবে। প্রতিটি শব্দ উচ্চারণের আগে ভাবতে হবে, এই একটি বাক্য কতজনের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিহাস বারবার শিখিয়েছে, নেতার মুখের একটি অসতর্ক বাক্য শুধু ব্যক্তি সম্মানহানির প্রশ্ন নয়, তা রূপ নিতে পারে সহিংসতায়, এমনকি প্রাণহানিতেও। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে একটি বক্তব্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে লাখো মানুষের কাছে, তাই দায়িত্বও বেড়েছে বহুগুণ।সমালোচনা গণতন্ত্রের প্রাণ, কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে যুক্তিনির্ভর, শালীন ও গঠনমূলক। প্রতিপক্ষকে ভুল প্রমাণ করার অধিকার সবার আছে, কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের নামে ব্যক্তিগত অবমাননা বা মিথ্যাচার গণতন্ত্রকেই দুর্বল করে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিকার অর্থে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করতে চায়, তাহলে সবার আগে দরকার শব্দচর্চায় শালীনতা ফিরিয়ে আনা। নইলে ইতিহাস আবারও প্রমাণ করবে—একটি ভুল শব্দই যথেষ্ট, একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ করে দেওয়ার জন্য।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়]

শব্দের রাজনীতি, রাজনীতির শব্দ