বাংলাদেশে নগরায়ণ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। বড় শহরগুলোর পাশাপাশি দেশের ছোট শহর ও পৌর এলাকাগুলোও ক্রমেই জনবসতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই পরিবর্তন কতটা পরিকল্পিত?
একটি শহর গড়ে ওঠার পর সেখানে সমস্যা সৃষ্টি হলে সমাধানের চেষ্টা করার চেয়ে শুরুতেই সঠিক পরিকল্পনা করা অনেক বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী। অথচ আমাদের অনেক ছোট পৌরসভায় এখনো ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা, ভূমির ব্যবহার, পরিবেশ, জলাবদ্ধতা, যানবাহন, বাণিজ্যিক এলাকা, উন্মুক্ত স্থান ও নাগরিক নিরাপত্তাকে সমন্বয় করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয় না।
পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ পৌরসভা এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে।
করতোয়া নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত দেবীগঞ্জ পৌরসভা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নির্মল পরিবেশের জন্য বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, গাছপালায় ঘেরা সবুজ এলাকা, করতোয়া নদী, ময়নামতির চর এবং তুলনামূলক কম যানজটÑসব মিলিয়ে এখানে একটি স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য পৌর পরিবেশ গড়ে তোলার অনন্য সুযোগ রয়েছে।
দেবীগঞ্জ পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত কর্মকাণ্ড যেমন বেড়েছে, তেমনি মানুষের বসতি ও অভ্যন্তরীণ সড়ক ব্যবস্থাও সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু এই সম্প্রসারণের সঙ্গে যদি ভূমি ব্যবহার ও পানি নিষ্কাশনের সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা, যানজট, অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং পরিবেশগত নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে বর্ষাকালে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখা দেয়ার বিষয়টি ভাবনার কারণ। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তা নির্মিত হলেও রাস্তার দুই পাশে পর্যাপ্ত ও পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। ফলে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হতে না পেরে নাগরিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। প্রশ্ন হলোÑসমস্যা আরও প্রকট হওয়ার পর আমরা সমাধানের উদ্যোগ নেব, নাকি এখনই ভবিষ্যৎ বিবেচনায় পরিকল্পনা করবো?
আমার বিশ্বাস, এখনই সময় একটি সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের। শুধু দেবীগঞ্জের জন্য নয়, দেশের প্রতিটি ছোট ও মাঝারি পৌরসভার ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা অপরিহার্য।
কী হতে পারে সেই পরিকল্পনা?
প্রথমত, পৌর এলাকার ভূমি ব্যবহার নির্ধারণ করতে হবে। কোথায় আবাসিক এলাকা, কোথায় বাণিজ্যিক এলাকা, কোথায় সরকারি প্রতিষ্ঠান, কোথায় উন্মুক্ত স্থান, কোথায় সবুজ এলাকা- এসব সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। দেবীগঞ্জের ক্ষেত্রে বাজার ও নির্ধারিত কয়েকটি এলাকাকে বাণিজ্যিক অঞ্চল হিসেবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যেতে পারে। আবাসিক এলাকার ভেতরে যত্রতত্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে একদিকে পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ে, অন্যদিকে যানজট ও নাগরিক দুর্ভোগও সৃষ্টি হয়।
দ্বিতীয়ত, পৌরসভার বর্তমান খোলা মাঠগুলো সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। একটি শহরের সৌন্দর্য শুধু দালানকোঠায় নয়; তার উন্মুক্ত স্থান, গাছপালা ও সবুজ পরিবেশেও নিহিত। আজ যে মাঠটি অব্যবহৃত মনে হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই হতে পারে শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ, নাগরিকদের হাঁটার স্থান কিংবা একটি উন্মুক্ত বিনোদনকেন্দ্র।
তৃতীয়ত, ময়নামতির চরসহ প্রাকৃতিক সবুজ অঞ্চল এবং করতোয়া নদীর তীরকে ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। নদীকে দখল বা দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে এর তীরে পরিকল্পিত হাঁটার পথ, বৃক্ষশোভিত উন্মুক্ত স্থান ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এতে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটনেরও সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।
চতুর্থত, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু বিচ্ছিন্নভাবে ড্রেন নির্মাণ করলেই হবে না। পুরো পৌর এলাকার জন্য একটি সমন্বিত পানি নিষ্কাশন ও বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোথা থেকে পানি আসবে, কোন পথে যাবে, কোথায় জমা হবে এবং কীভাবে দ্রুত নিষ্কাশিত হবেÑএসব বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।
পঞ্চমত, ছোট শহরকে বড় শহরের অনুকরণে গড়ে তোলার পরিবর্তে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করা উচিত। দেবীগঞ্জে ভারী শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
ষষ্ঠত, ভবিষ্যতের যানজট বিবেচনায় নিয়ে এখন থেকেই রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশার চলাচল ও পার্কিংয়ের জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা করতে হবে। শহর বড় হয়ে যাওয়ার পর যানজট নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন; কিন্তু ছোট অবস্থায় সঠিক পরিকল্পনা করলে তা অনেক সহজ।
সপ্তমত, বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। ভবনের উচ্চতা, রাস্তার প্রশস্ততা, অগ্নিনিরাপত্তা, পার্কিং, আলো-বাতাস এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা না করে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেয়া হলে ভবিষ্যতে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। নাগরিক নিরাপত্তাও আধুনিক পৌর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও জনসমাগমস্থলে পর্যাপ্ত সড়কবাতি এবং সিসিটিভি স্থাপন করা হলে নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি রাতের শহরও আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে।
উন্নয়ন বনাম পরিবেশÑএই দ্বন্দ্ব কেন?
অনেক সময় মনে করা হয়, পরিবেশ সংরক্ষণ করলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। বাস্তবে বিষয়টি উল্টো। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পাশাপাশি চলতে পারে। একটি পৌরসভায় আজ রাস্তা তৈরি করা হলো, কাল রাস্তার জন্য ড্রেন ভাঙতে হলো, পরদিন নতুন ভবনের জন্য রাস্তা প্রশস্ত করতে হলোÑএ ধরনের বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে অর্থের অপচয় এবং নাগরিক ভোগান্তি দু’টোই বাড়ায়। অন্যদিকে, আগে থেকে একটি মাস্টার প্ল্যান থাকলে একই পরিকল্পনার আওতায় সড়ক, ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা এবং সবুজ স্থানÑসবকিছু সমন্বিতভাবে উন্নয়ন করা সম্ভব।
এখনই সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়
দেবীগঞ্জ এখনো এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যখন পরিকল্পিতভাবে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার সুযোগ রয়েছে। শহরটি অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে যাওয়ার আগেই যদি ভূমি ব্যবহার, পরিবেশ, সড়ক, ড্রেনেজ, বাণিজ্যিক এলাকা ও উন্মুক্ত স্থান নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ নাগরিকরা এর সুফল পাবেন।
দেবীগঞ্জ শুধু একটি উদাহরণ। দেশের অসংখ্য ছোট পৌরসভা একই ধরনের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই ছোট শহরগুলোর উন্নয়নকে শুধু স্থানীয় বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি দেশের সামগ্রিক নগরায়ণ নীতির অংশ হওয়া উচিত।
আমরা এমন শহর চাই না, যেখানে উন্নয়নের নামে একের পর এক ভবন উঠবে, কিন্তু হারিয়ে যাবে মাঠ, গাছ, জলাশয় ও নদীর তীর। আমরা এমন শহর চাই, যেখানে উন্নয়ন হবে- কিন্তু পরিকল্পিতভাবে; ভবন হবে- কিন্তু পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে; রাস্তা হবেÑকিন্তু জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না করে; বাণিজ্য বাড়বে- কিন্তু আবাসিক এলাকার স্বাভাবিক জীবন নষ্ট না করে। দেবীগঞ্জের মতো ছোট শহরগুলোকে এখনই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া গেলে ভবিষ্যতে এগুলোই হতে পারে বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন, সবুজ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৌর নগরীর মডেল।
প্রশ্নটি তাই শুধু দেবীগঞ্জকে নিয়ে নয়- আমরা কি আমাদের ছোট শহরগুলোর ভবিষ্যৎও আজ থেকেই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে চাই?
[লেখক: প্রকৌশলী; সাধারণ সম্পাদক, দেবীগঞ্জ উপজেলা কল্যাণ সমিতি, ঢাকা]

বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশে নগরায়ণ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। বড় শহরগুলোর পাশাপাশি দেশের ছোট শহর ও পৌর এলাকাগুলোও ক্রমেই জনবসতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই পরিবর্তন কতটা পরিকল্পিত?
একটি শহর গড়ে ওঠার পর সেখানে সমস্যা সৃষ্টি হলে সমাধানের চেষ্টা করার চেয়ে শুরুতেই সঠিক পরিকল্পনা করা অনেক বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী। অথচ আমাদের অনেক ছোট পৌরসভায় এখনো ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা, ভূমির ব্যবহার, পরিবেশ, জলাবদ্ধতা, যানবাহন, বাণিজ্যিক এলাকা, উন্মুক্ত স্থান ও নাগরিক নিরাপত্তাকে সমন্বয় করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয় না।
পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ পৌরসভা এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে।
করতোয়া নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত দেবীগঞ্জ পৌরসভা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নির্মল পরিবেশের জন্য বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, গাছপালায় ঘেরা সবুজ এলাকা, করতোয়া নদী, ময়নামতির চর এবং তুলনামূলক কম যানজটÑসব মিলিয়ে এখানে একটি স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য পৌর পরিবেশ গড়ে তোলার অনন্য সুযোগ রয়েছে।
দেবীগঞ্জ পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত কর্মকাণ্ড যেমন বেড়েছে, তেমনি মানুষের বসতি ও অভ্যন্তরীণ সড়ক ব্যবস্থাও সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু এই সম্প্রসারণের সঙ্গে যদি ভূমি ব্যবহার ও পানি নিষ্কাশনের সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা, যানজট, অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং পরিবেশগত নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে বর্ষাকালে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখা দেয়ার বিষয়টি ভাবনার কারণ। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তা নির্মিত হলেও রাস্তার দুই পাশে পর্যাপ্ত ও পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। ফলে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হতে না পেরে নাগরিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। প্রশ্ন হলোÑসমস্যা আরও প্রকট হওয়ার পর আমরা সমাধানের উদ্যোগ নেব, নাকি এখনই ভবিষ্যৎ বিবেচনায় পরিকল্পনা করবো?
আমার বিশ্বাস, এখনই সময় একটি সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের। শুধু দেবীগঞ্জের জন্য নয়, দেশের প্রতিটি ছোট ও মাঝারি পৌরসভার ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা অপরিহার্য।
কী হতে পারে সেই পরিকল্পনা?
প্রথমত, পৌর এলাকার ভূমি ব্যবহার নির্ধারণ করতে হবে। কোথায় আবাসিক এলাকা, কোথায় বাণিজ্যিক এলাকা, কোথায় সরকারি প্রতিষ্ঠান, কোথায় উন্মুক্ত স্থান, কোথায় সবুজ এলাকা- এসব সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। দেবীগঞ্জের ক্ষেত্রে বাজার ও নির্ধারিত কয়েকটি এলাকাকে বাণিজ্যিক অঞ্চল হিসেবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যেতে পারে। আবাসিক এলাকার ভেতরে যত্রতত্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে একদিকে পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ে, অন্যদিকে যানজট ও নাগরিক দুর্ভোগও সৃষ্টি হয়।
দ্বিতীয়ত, পৌরসভার বর্তমান খোলা মাঠগুলো সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। একটি শহরের সৌন্দর্য শুধু দালানকোঠায় নয়; তার উন্মুক্ত স্থান, গাছপালা ও সবুজ পরিবেশেও নিহিত। আজ যে মাঠটি অব্যবহৃত মনে হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই হতে পারে শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ, নাগরিকদের হাঁটার স্থান কিংবা একটি উন্মুক্ত বিনোদনকেন্দ্র।
তৃতীয়ত, ময়নামতির চরসহ প্রাকৃতিক সবুজ অঞ্চল এবং করতোয়া নদীর তীরকে ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। নদীকে দখল বা দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে এর তীরে পরিকল্পিত হাঁটার পথ, বৃক্ষশোভিত উন্মুক্ত স্থান ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এতে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটনেরও সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।
চতুর্থত, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু বিচ্ছিন্নভাবে ড্রেন নির্মাণ করলেই হবে না। পুরো পৌর এলাকার জন্য একটি সমন্বিত পানি নিষ্কাশন ও বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোথা থেকে পানি আসবে, কোন পথে যাবে, কোথায় জমা হবে এবং কীভাবে দ্রুত নিষ্কাশিত হবেÑএসব বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।
পঞ্চমত, ছোট শহরকে বড় শহরের অনুকরণে গড়ে তোলার পরিবর্তে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করা উচিত। দেবীগঞ্জে ভারী শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
ষষ্ঠত, ভবিষ্যতের যানজট বিবেচনায় নিয়ে এখন থেকেই রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশার চলাচল ও পার্কিংয়ের জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা করতে হবে। শহর বড় হয়ে যাওয়ার পর যানজট নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন; কিন্তু ছোট অবস্থায় সঠিক পরিকল্পনা করলে তা অনেক সহজ।
সপ্তমত, বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। ভবনের উচ্চতা, রাস্তার প্রশস্ততা, অগ্নিনিরাপত্তা, পার্কিং, আলো-বাতাস এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা না করে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেয়া হলে ভবিষ্যতে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। নাগরিক নিরাপত্তাও আধুনিক পৌর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও জনসমাগমস্থলে পর্যাপ্ত সড়কবাতি এবং সিসিটিভি স্থাপন করা হলে নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি রাতের শহরও আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে।
উন্নয়ন বনাম পরিবেশÑএই দ্বন্দ্ব কেন?
অনেক সময় মনে করা হয়, পরিবেশ সংরক্ষণ করলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। বাস্তবে বিষয়টি উল্টো। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পাশাপাশি চলতে পারে। একটি পৌরসভায় আজ রাস্তা তৈরি করা হলো, কাল রাস্তার জন্য ড্রেন ভাঙতে হলো, পরদিন নতুন ভবনের জন্য রাস্তা প্রশস্ত করতে হলোÑএ ধরনের বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে অর্থের অপচয় এবং নাগরিক ভোগান্তি দু’টোই বাড়ায়। অন্যদিকে, আগে থেকে একটি মাস্টার প্ল্যান থাকলে একই পরিকল্পনার আওতায় সড়ক, ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা এবং সবুজ স্থানÑসবকিছু সমন্বিতভাবে উন্নয়ন করা সম্ভব।
এখনই সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়
দেবীগঞ্জ এখনো এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যখন পরিকল্পিতভাবে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার সুযোগ রয়েছে। শহরটি অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে যাওয়ার আগেই যদি ভূমি ব্যবহার, পরিবেশ, সড়ক, ড্রেনেজ, বাণিজ্যিক এলাকা ও উন্মুক্ত স্থান নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ নাগরিকরা এর সুফল পাবেন।
দেবীগঞ্জ শুধু একটি উদাহরণ। দেশের অসংখ্য ছোট পৌরসভা একই ধরনের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই ছোট শহরগুলোর উন্নয়নকে শুধু স্থানীয় বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি দেশের সামগ্রিক নগরায়ণ নীতির অংশ হওয়া উচিত।
আমরা এমন শহর চাই না, যেখানে উন্নয়নের নামে একের পর এক ভবন উঠবে, কিন্তু হারিয়ে যাবে মাঠ, গাছ, জলাশয় ও নদীর তীর। আমরা এমন শহর চাই, যেখানে উন্নয়ন হবে- কিন্তু পরিকল্পিতভাবে; ভবন হবে- কিন্তু পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে; রাস্তা হবেÑকিন্তু জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না করে; বাণিজ্য বাড়বে- কিন্তু আবাসিক এলাকার স্বাভাবিক জীবন নষ্ট না করে। দেবীগঞ্জের মতো ছোট শহরগুলোকে এখনই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া গেলে ভবিষ্যতে এগুলোই হতে পারে বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন, সবুজ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৌর নগরীর মডেল।
প্রশ্নটি তাই শুধু দেবীগঞ্জকে নিয়ে নয়- আমরা কি আমাদের ছোট শহরগুলোর ভবিষ্যৎও আজ থেকেই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে চাই?
[লেখক: প্রকৌশলী; সাধারণ সম্পাদক, দেবীগঞ্জ উপজেলা কল্যাণ সমিতি, ঢাকা]

আপনার মতামত লিখুন