৫ আগস্ট ২০২৬-এ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন এবং পরদিন থেকেই সাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। জাদুঘরে ২০২৪-এর আন্দোলনের ছবি, নথি, শহীদদের জিনিসপত্রের সঙ্গে বেশ কিছু ভাস্কর্যও রাখা হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম বলেছে, জাদুঘরের ভাস্কর্য অপসারণ করতে হবে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেছেন, মানুষের ভাস্কর্যের মুখাবয়ব মুছে দিলেই হবে, ইসলামে কেবল চেহারা নিয়েই আপত্তি। এমন নরম ব্যাখ্যা তিনি আগে দেননি।
ঢাকার ধোলাইরপাড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে এই একই মানুষ বলেছিলেন, সরকার পরিকল্পনা থেকে না সরলে আরেকটি শাপলা চত্বর হবে। কুষ্টিয়ায় নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক মিলে ভেঙে ফেলেছিল। সুপ্রিম কোর্টের থেমিস, বিমানবন্দরের বাউল, জিপিওর ভাস্কর্যও তাদের বক্তব্যের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার সরাতে বাধ্য হয়েছে। অথচ একই গোষ্ঠী এখন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন সুরে কথা বলছে। তখন ভাষা ছিল চূড়ান্ত, এখন ভাষা হয়েছে আলোচনার।
ভাস্কর্য নিয়ে ধর্মীয় নির্দেশনা নিয়েও তারা হাজির। একপক্ষ বলেন, কুরআনে মূর্তি নিষেধ, হাদিসে প্রাণীর ছবি নিষেধ। দেওবন্দের মতে পেইন্টিং, ডিজিটাল নির্বিশেষে সব ছবিই হারাম। অন্যপক্ষ বলেন, মূর্তি মানে পূজার উদ্দেশ্যে বানানো অবয়ব। তাই বোধ হয় নবীজীর পর মুসলিম শাসকরা তাদের অধিকৃত ভূখণ্ডে ভাস্কর্য ভেঙেছেন এমন নজির নেই। মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় প্রতীক হিন্দু পুরাণের পাখি গরুড়। তাদের সংস্কৃতিতে রামায়ণ-মহাভারতের প্রভাবও আছে। কুয়েত, কাতার, দুবাই, তুর্কমেনিস্তানে রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্বের ভাস্কর্য আছে। ইরানে আছে রুমির আবক্ষ মূর্তি, ইরানের শিরাজে আছে শেখ সাদীর মর্মর মূর্তি। প্রয়োজনের দোহাই দিয়ে পাসপোর্ট-ভিসার ছবি, পোস্টার, ফেসবুকের ছবিও চলছে। ফকিহদের কথা, ‘দারুরা’ হলে হারামও হাল হয়। তাই আলেমরা অবস্থা বুঝে ফতোয়া দেন, ব্যাখ্যা করেন।
এই ব্যাখ্যা বদলের পেছনে একটি বড় কারণ হলো ‘উদ্দেশ্য’। ইসলামী ফিকহে কোনো কাজের হুকুম নির্ধারণে নিয়তকে গুরুত্ব দেয়া হয়। ভাস্কর্য যদি উপাসনার জন্য হয়, তবে তা এক রকম। আর যদি স্মৃতি, শিক্ষা বা শিল্পের জন্য হয়, তবে আলেমদের একটি অংশ তাকে ভিন্নভাবে দেখেন। আল-আজহারের গ্র্যান্ড মুফতি থেকে ইউরোপিয়ান ফতোয়া কাউন্সিলের অনেকেই এই যুক্তি দিয়েছেন। ফলে একই বস্তু, কিন্তু ব্যবহার ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলে ফতোয়ার ভাষাও পাল্টায়। এটা নতুন কিছু নয়। ধর্মীয় আলোচনায় সময় ও প্রয়োজন সবসময়ই ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করেছে।
কিন্তু আসল প্রশ্ন এটা না। আসল প্রশ্ন হলো প্রয়োগের। ২০২৪ এর আন্দোলনের সময় রাজপথে, চত্বরে, পৌরসভায় যত ভাস্কর্য ছিল সব ভাঙা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ, বেগম রোকেয়া, জাতীয় চার নেতা, বীরশ্রেষ্ঠÑ কাউকে রেহাই দেয়া হয়নি। সেই সময় হেফাজত, খেলাফত, অন্যরাও নীরব ছিল না। রাজু ভাস্কর্য টিকে গিয়েছিল কারণ সেটা ছিল জড়ো হওয়ার জায়গা। এখন জুলাই জাদুঘরে নতুন ভাস্কর্য বসেছে। সেখানকার ভাস্কর্য নিয়ে আগের মতো কঠোর অবস্থান দেখা যাচ্ছে না। কেউ বলছে মুখ মুছে দাও, কেউ বলছে আলোচনা হোক। ভাস্কর্য এক, কিন্তু প্রেক্ষাপট বদলেছে। কে বানিয়েছে, কখন বানিয়েছে, কার নামে বানিয়েছেÑ এই হিসাবটাই এখন মুখ্য হয়ে গেছে।
এখানেই আলেম সমাজের দ্বিধা প্রকট হয়। যখন রাষ্ট্রের কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাদের অবস্থান মেলে, তখন ব্যাখ্যা নরম হয়। আবার যখন মেলে না, তখন ভাষা কঠোর হয়। এটাকে কেউ বলবেন রাজনৈতিক বাস্তবতা, কেউ বলবেন প্রয়োগের কৌশল। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই দুই রকম সুর শুনে বিভ্রান্ত হয়। তারা জানতে চায়, মানদণ্ডটা কী? পাথরের অবয়ব, নাকি অবয়বের পেছনের নাম? প্রশ্নটা ধর্মের চেয়ে এখন নীতির হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেষ পর্যন্ত থেকে যায় মানুষের অবস্থানের হিসাব। একই মানুষ, একই বিষয়, কিন্তু সময় ও প্রেক্ষাপট বদলালে ভাষাও বদলায়। কখনও বজ্রনিনাদ, কখনও আলোচনার প্রস্তাব। কখনও ভাঙো, কখনও মুখ মুছে দাও। ধর্ম এখানে মানদণ্ড না, মানদণ্ড হয়ে যায় সুবিধা। আর সুবিধার রাজনীতি দিয়ে নীতি দাঁড়ায় না। মামুনুল হকের বক্তব্যের এই দুই রকম সুরই প্রমাণ করে, প্রশ্নটা ভাস্কর্যের না। প্রশ্নটা হলো, আমরা কাকে কী বলার অনুমতি দিচ্ছি।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬
৫ আগস্ট ২০২৬-এ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন এবং পরদিন থেকেই সাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। জাদুঘরে ২০২৪-এর আন্দোলনের ছবি, নথি, শহীদদের জিনিসপত্রের সঙ্গে বেশ কিছু ভাস্কর্যও রাখা হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম বলেছে, জাদুঘরের ভাস্কর্য অপসারণ করতে হবে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেছেন, মানুষের ভাস্কর্যের মুখাবয়ব মুছে দিলেই হবে, ইসলামে কেবল চেহারা নিয়েই আপত্তি। এমন নরম ব্যাখ্যা তিনি আগে দেননি।
ঢাকার ধোলাইরপাড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে এই একই মানুষ বলেছিলেন, সরকার পরিকল্পনা থেকে না সরলে আরেকটি শাপলা চত্বর হবে। কুষ্টিয়ায় নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক মিলে ভেঙে ফেলেছিল। সুপ্রিম কোর্টের থেমিস, বিমানবন্দরের বাউল, জিপিওর ভাস্কর্যও তাদের বক্তব্যের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার সরাতে বাধ্য হয়েছে। অথচ একই গোষ্ঠী এখন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন সুরে কথা বলছে। তখন ভাষা ছিল চূড়ান্ত, এখন ভাষা হয়েছে আলোচনার।
ভাস্কর্য নিয়ে ধর্মীয় নির্দেশনা নিয়েও তারা হাজির। একপক্ষ বলেন, কুরআনে মূর্তি নিষেধ, হাদিসে প্রাণীর ছবি নিষেধ। দেওবন্দের মতে পেইন্টিং, ডিজিটাল নির্বিশেষে সব ছবিই হারাম। অন্যপক্ষ বলেন, মূর্তি মানে পূজার উদ্দেশ্যে বানানো অবয়ব। তাই বোধ হয় নবীজীর পর মুসলিম শাসকরা তাদের অধিকৃত ভূখণ্ডে ভাস্কর্য ভেঙেছেন এমন নজির নেই। মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় প্রতীক হিন্দু পুরাণের পাখি গরুড়। তাদের সংস্কৃতিতে রামায়ণ-মহাভারতের প্রভাবও আছে। কুয়েত, কাতার, দুবাই, তুর্কমেনিস্তানে রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্বের ভাস্কর্য আছে। ইরানে আছে রুমির আবক্ষ মূর্তি, ইরানের শিরাজে আছে শেখ সাদীর মর্মর মূর্তি। প্রয়োজনের দোহাই দিয়ে পাসপোর্ট-ভিসার ছবি, পোস্টার, ফেসবুকের ছবিও চলছে। ফকিহদের কথা, ‘দারুরা’ হলে হারামও হাল হয়। তাই আলেমরা অবস্থা বুঝে ফতোয়া দেন, ব্যাখ্যা করেন।
এই ব্যাখ্যা বদলের পেছনে একটি বড় কারণ হলো ‘উদ্দেশ্য’। ইসলামী ফিকহে কোনো কাজের হুকুম নির্ধারণে নিয়তকে গুরুত্ব দেয়া হয়। ভাস্কর্য যদি উপাসনার জন্য হয়, তবে তা এক রকম। আর যদি স্মৃতি, শিক্ষা বা শিল্পের জন্য হয়, তবে আলেমদের একটি অংশ তাকে ভিন্নভাবে দেখেন। আল-আজহারের গ্র্যান্ড মুফতি থেকে ইউরোপিয়ান ফতোয়া কাউন্সিলের অনেকেই এই যুক্তি দিয়েছেন। ফলে একই বস্তু, কিন্তু ব্যবহার ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলে ফতোয়ার ভাষাও পাল্টায়। এটা নতুন কিছু নয়। ধর্মীয় আলোচনায় সময় ও প্রয়োজন সবসময়ই ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করেছে।
কিন্তু আসল প্রশ্ন এটা না। আসল প্রশ্ন হলো প্রয়োগের। ২০২৪ এর আন্দোলনের সময় রাজপথে, চত্বরে, পৌরসভায় যত ভাস্কর্য ছিল সব ভাঙা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ, বেগম রোকেয়া, জাতীয় চার নেতা, বীরশ্রেষ্ঠÑ কাউকে রেহাই দেয়া হয়নি। সেই সময় হেফাজত, খেলাফত, অন্যরাও নীরব ছিল না। রাজু ভাস্কর্য টিকে গিয়েছিল কারণ সেটা ছিল জড়ো হওয়ার জায়গা। এখন জুলাই জাদুঘরে নতুন ভাস্কর্য বসেছে। সেখানকার ভাস্কর্য নিয়ে আগের মতো কঠোর অবস্থান দেখা যাচ্ছে না। কেউ বলছে মুখ মুছে দাও, কেউ বলছে আলোচনা হোক। ভাস্কর্য এক, কিন্তু প্রেক্ষাপট বদলেছে। কে বানিয়েছে, কখন বানিয়েছে, কার নামে বানিয়েছেÑ এই হিসাবটাই এখন মুখ্য হয়ে গেছে।
এখানেই আলেম সমাজের দ্বিধা প্রকট হয়। যখন রাষ্ট্রের কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাদের অবস্থান মেলে, তখন ব্যাখ্যা নরম হয়। আবার যখন মেলে না, তখন ভাষা কঠোর হয়। এটাকে কেউ বলবেন রাজনৈতিক বাস্তবতা, কেউ বলবেন প্রয়োগের কৌশল। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই দুই রকম সুর শুনে বিভ্রান্ত হয়। তারা জানতে চায়, মানদণ্ডটা কী? পাথরের অবয়ব, নাকি অবয়বের পেছনের নাম? প্রশ্নটা ধর্মের চেয়ে এখন নীতির হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেষ পর্যন্ত থেকে যায় মানুষের অবস্থানের হিসাব। একই মানুষ, একই বিষয়, কিন্তু সময় ও প্রেক্ষাপট বদলালে ভাষাও বদলায়। কখনও বজ্রনিনাদ, কখনও আলোচনার প্রস্তাব। কখনও ভাঙো, কখনও মুখ মুছে দাও। ধর্ম এখানে মানদণ্ড না, মানদণ্ড হয়ে যায় সুবিধা। আর সুবিধার রাজনীতি দিয়ে নীতি দাঁড়ায় না। মামুনুল হকের বক্তব্যের এই দুই রকম সুরই প্রমাণ করে, প্রশ্নটা ভাস্কর্যের না। প্রশ্নটা হলো, আমরা কাকে কী বলার অনুমতি দিচ্ছি।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন