আমরা প্রতিদিন যে প্যাকেটজাত দুধ পান করি, বোতলজাত ফলের জুস কিনি, বিস্কুট খাই, সস ব্যবহার করি কিংবা হিমায়িত মাছ, মাংস ও সবজি রান্না করি—এসব খাদ্য আমাদের কাছে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। আধুনিক খাদ্যশিল্প এখন শুধু খাদ্য তৈরি বা সংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, অটোমেশন, তথ্যপ্রযুক্তি, প্যাকেজিং, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে এটি একটি অত্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে খাদ্য প্রকৌশল বা ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং।
বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় দেশের অধিকাংশ প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ছোট পরিসরে এবং তুলনামূলকভাবে শ্রমনির্ভর পদ্ধতিতে উৎপাদিত হতো। বর্তমানে চাল, আটা-ময়দা, ভোজ্য তেল, দুধ, বিস্কুট, নুডলস, পানীয়, ফলের জুস, সস, মসলা, হিমায়িত খাদ্য, মাছ-মাংসসহ অসংখ্য পণ্য আধুনিক কারখানায় বৃহৎ পরিসরে উৎপাদিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ভোক্তার প্রত্যাশাও পরিবর্তিত হয়েছে। এখন নিরাপদ খাদ্য, দীর্ঘ শেলফ লাইফ, উন্নত স্বাদ, পুষ্টিগুণ, সুবিধাজনক প্যাকেজিং এবং সাশ্রয়ী মূল্য—সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হচ্ছে। এসব লক্ষ্য অর্জনে খাদ্য প্রকৌশলের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
খাদ্যবিজ্ঞান ও খাদ্য প্রকৌশল পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হলেও এক নয়। খাদ্যবিজ্ঞান মূলত খাদ্যের রাসায়নিক গঠন, পুষ্টিগুণ, অণুজীব, স্বাদ, রং, গঠন এবং সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করে। অন্যদিকে খাদ্য প্রকৌশল সেই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে শিল্পপর্যায়ে বাস্তবায়ন করে। পরীক্ষাগারে এক লিটার দুধ বা এক কেজি সস তৈরি করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু প্রতিদিন কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ লিটার একই মানের পণ্য উৎপাদন করতে হলে ট্যাংক, পাম্প, পাইপলাইন, মিক্সার, হিট এক্সচেঞ্জার, হোমোজেনাইজার, রেফ্রিজারেশন, ফিলিং ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। কোন যন্ত্রের ক্ষমতা কত হবে, কীভাবে তাপমাত্রা, চাপ ও তরল প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং কীভাবে নিরাপত্তা বজায় রেখে উৎপাদন বাড়ানো যাবে- এসবই খাদ্য প্রকৌশলের বিষয়।
বাংলাদেশে এর পরিচিত উদাহরণ দেখা যায় চাল প্রক্রিয়াজাতকরণে। আধুনিক রাইস মিলে ধান পরিষ্কার, পাথর ও অন্যান্য অপদ্রব্য অপসারণ, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, শুকানো, খোসা ছাড়ানো, পালিশ, ভাঙা চাল আলাদা করা, রং অনুযায়ী বাছাই এবং প্যাকেজিং- প্রতিটি পর্যায়ে প্রকৌশল প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। অপটিক্যাল কালার সোর্টার দ্রুত বিপুল পরিমাণ চাল পরীক্ষা করে ত্রুটিপূর্ণ দানা আলাদা করতে পারে। সঠিকভাবে শুকানো ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চালের ভাঙন এবং সংরক্ষণকালীন ক্ষতিও কমানো যায়। একইভাবে আধুনিক আটা-ময়দা কারখানায় গম পরিষ্কার, কন্ডিশনিং, রোলার মিলিং, সিভিং ও প্যাকেজিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে প্রকৌশল নিয়ন্ত্রণ ব্যবহৃত হচ্ছে।
দুগ্ধশিল্প খাদ্য প্রকৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কাঁচা দুধ দ্রুত নষ্ট হতে পারে এবং এতে রোগসৃষ্টিকারী অণুজীব থাকতে পারে। তাই পাস্তুরাইজেশন, হোমোজেনাইজেশন, ইউএইচটি প্রক্রিয়াকরণ, দ্রুত শীতলীকরণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত প্যাকেজিং ব্যবহার করা হয়। আধুনিক হিট এক্সচেঞ্জারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিতভাবে দুধ গরম ও ঠান্ডা করা সম্ভব। আবার ক্লিন-ইন-প্লেস বা সিআইপি প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্যাংক ও পাইপলাইন না খুলেই পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা যায়। এতে বৃহৎ পরিসরে নিরাপদ ও ধারাবাহিক মানের দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন সহজ হয়।
ফলের জুস, কোমল পানীয় এবং অন্যান্য পানীয় উৎপাদনেও খাদ্য প্রকৌশল অপরিহার্য। পানি পরিশোধন, উপাদান মেশানো, দ্রবীভূত করা, অম্লতা ও দ্রবণীয় কঠিন পদার্থ নিয়ন্ত্রণ, হোমোজেনাইজেশন, পাস্তুরাইজেশন এবং বোতলজাতকরণের প্রতিটি ধাপ নির্ভুলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তাপমাত্রা, সময়, চাপ কিংবা প্রবাহের গতিতে পরিবর্তন হলে পণ্যের স্বাদ, রং ও স্থায়িত্ব প্রভাবিত হতে পারে। তাই আধুনিক পানীয় কারখানায় সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।
বিস্কুট, কেক, রুটি ও অন্যান্য বেকারি পণ্যেও প্রকৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডো মিক্সিং থেকে শিটিং, কাটিং, বেকিং, কুলিং এবং প্যাকেজিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের সঙ্গে তাপ ও ভর স্থানান্তরের সম্পর্ক রয়েছে। ওভেনের তাপমাত্রা, বেকিংয়ের সময় এবং খাদ্য থেকে পানি বের হওয়ার হার পণ্যের রং, স্বাদ, আর্দ্রতা, খাস্তা ভাব ও শেলফ লাইফ নির্ধারণ করে। একইভাবে সস, আচার, জ্যাম ও জেলির ক্ষেত্রে পিএইচ, দ্রবণীয় কঠিন পদার্থ, সান্দ্রতা, তাপপ্রয়োগ ও প্যাকেজিংয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। ভোজ্য তেল শিল্পেও ডিগামিং, নিউট্রালাইজেশন, ব্লিচিং, ডিওডোরাইজেশন ও ফিল্ট্রেশনের মতো প্রকৌশল প্রক্রিয়া ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশের জন্য খাদ্য প্রকৌশলের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো ফল ও সবজির অপচয় কমানো। দেশে আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, পেয়ারা, টমেটোসহ বিভিন্ন মৌসুমি কৃষিপণ্য প্রচুর উৎপাদিত হয়। কিন্তু উপযুক্ত সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে এর একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়। কোল্ড স্টোরেজ, নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার পরিবহন, শুকানো, পাল্পিং, ক্যানিং, হিমায়ন এবং অ্যাসেপটিক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এসব পণ্যের মূল্য সংযোজন করা সম্ভব। একটি আমকে শুধু তাজা ফল হিসেবে বিক্রি না করে পাল্প, পিউরি, জুস, নেকটার কিংবা শুকনো আমে রূপান্তর করা গেলে সারা বছর বাজারজাত করা সম্ভব এবং কৃষকও বেশি মূল্য পেতে পারেন।
হিমায়িত খাদ্যশিল্পেও বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। মাছ, চিংড়ি, মাংস ও সবজির ক্ষেত্রে দ্রুত হিমায়িতকরণ এবং আইকিউএফ বা ইন্ডিভিজুয়াল কুইক ফ্রিজিং প্রযুক্তি পণ্যের গুণগত মান ধরে রাখতে সাহায্য করে। তবে শুধু কারখানায় হিমায়িত করলেই যথেষ্ট নয়। উৎপাদন থেকে পরিবহন, গুদাম, বিপণন এবং খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় রাখতে হয়। এই ধারাবাহিক ব্যবস্থাই কোল্ড চেইন। বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো এবং মাছ, চিংড়ি, ফল ও সবজি রপ্তানি বাড়ানোর জন্য শক্তিশালী কোল্ড চেইন অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্যাকেজিংও আধুনিক খাদ্য প্রকৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্যাকেট শুধু খাদ্য বহনের মাধ্যম নয়; এটি খাদ্যকে অক্সিজেন, আর্দ্রতা, আলো এবং বাহ্যিক দূষণ থেকে রক্ষা করে। খাদ্যের ধরন অনুযায়ী কাচ, ধাতু, কাগজ, প্লাস্টিক বা বহুস্তরবিশিষ্ট প্যাকেজিং নির্বাচন করতে হয়। উন্নত বিশ্বে পরিবর্তিত বায়ুমণ্ডল প্যাকেজিং, অ্যাকটিভ প্যাকেজিং এবং স্মার্ট প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে দীর্ঘ শেলফ লাইফের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিংয়ের গুরুত্ব বাড়বে।
খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রকৌশলের ভূমিকা বিশাল। আধুনিক কারখানায় মেটাল ডিটেক্টর, এক্স-রে ইন্সপেকশন, তাপমাত্রা সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদনের মধ্যেই বিভিন্ন সমস্যা শনাক্ত করা যায়। নিরাপদ পানি, বাষ্প, রেফ্রিজারেশন, স্যানিটেশন এবং বর্জ্য পানি শোধনের জন্যও সঠিক প্রকৌশল ব্যবস্থা প্রয়োজন। শুধু ভালো রেসিপি দিয়ে নিরাপদ খাদ্য তৈরি করা যায় না; পুরো কারখানাকে এমনভাবে নকশা ও পরিচালনা করতে হয়, যাতে কাঁচামাল গ্রহণ থেকে প্রস্তুত পণ্য প্যাকেজিং পর্যন্ত দূষণের ঝুঁকি সর্বনিম্ন থাকে।
বিশ্বের খাদ্যশিল্প এখন অটোমেশন, রোবোটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন যুগে প্রবেশ করছে। পিএলসি ও স্কাডার মতো স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে কারখানার তাপমাত্রা, চাপ, প্রবাহ, মিশ্রণের অনুপাত এবং উৎপাদনের গতি কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন ভিশনের সাহায্যে ত্রুটিপূর্ণ ফল বা খাদ্য শনাক্ত করা, গুণগত মান অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস করা এবং যন্ত্র নষ্ট হওয়ার আগেই সম্ভাব্য সমস্যা অনুমান করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশের খাদ্য কারখানাগুলোতেও আগামী দিনে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়বে।
একই সঙ্গে খাদ্য প্রকৌশলকে টেকসই উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। খাদ্য কারখানায় পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, বাষ্প ও রেফ্রিজারেশনের জন্য বিপুল শক্তি ব্যবহৃত হয়। আধুনিক হিট এক্সচেঞ্জার, বর্জ্য তাপ পুনরুদ্ধার, উচ্চ দক্ষতার মোটর, পানি পুনর্ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় ও পরিবেশগত প্রভাব কমানো সম্ভব। খাদ্যশিল্পের বর্জ্যও সম্পদে পরিণত হতে পারে। চালের কুঁড়া থেকে তেল, ফলের খোসা থেকে পেকটিন ও খাদ্য-ফাইবার, মাছের চামড়া থেকে কোলাজেন এবং জৈব বর্জ্য থেকে পশুখাদ্য, সার বা জৈব জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছোট ও মাঝারি খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে খাদ্য প্রকৌশল প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া। দেশের বহু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আচার, মসলা, বেকারি পণ্য, ফলের জুস, দুগ্ধজাত খাদ্য, শুকনো ফল এবং বিভিন্ন স্থানীয় খাবার উৎপাদন করছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই উপযুক্ত প্রসেস ডিজাইন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসম্মত কারখানা নকশা, শেলফ লাইফ নির্ধারণ এবং আধুনিক প্যাকেজিং প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা এবং বড় খাদ্যশিল্পের সহযোগিতায় সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এসব উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছানো গেলে গ্রাম ও জেলা পর্যায়েই কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন, কর্মসংস্থান ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়বে।
বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প এখন এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো আর যথেষ্ট নয়। নগরায়ণ, মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং নিরাপদ ও সুবিধাজনক খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্যশিল্পের ওপর নতুন দায়িত্ব তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টিগুণ, মানের ধারাবাহিকতা, ট্রেসেবিলিটি, শেলফ লাইফ, উৎপাদন দক্ষতা, জ্বালানি ও পানির সাশ্রয় এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতা—সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। কাঁচামাল কোথা থেকে এসেছে, কোন ব্যাচে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে এবং কীভাবে ভোক্তার কাছে পৌঁছেছে—প্রয়োজনে এসব তথ্য দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থাও আধুনিক খাদ্যশিল্পের অপরিহার্য অংশ।
একটি কারখানায় শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করলেই আধুনিক খাদ্যশিল্প তৈরি হয় না। সঠিক কারখানা নকশা, কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্যের প্রবাহ, পরিচ্ছন্ন ও অপরিচ্ছন্ন এলাকার পৃথকীকরণ, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, পানি ও বাষ্প ব্যবস্থাপনা, কার্যকর পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্তকরণ এবং উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ সমান গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য প্রকৌশল এসব বিষয়কে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে একই পরিমাণ কাঁচামাল ও শক্তি ব্যবহার করে বেশি উৎপাদন, কম অপচয় এবং উন্নত মান নিশ্চিত করা সম্ভব।
এজন্য গবেষণা ও উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব কৃষিপণ্য ও খাদ্যাভ্যাসকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বিপুল সুযোগ রয়েছে। আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, কলা, আলু, টমেটো, ধান, ডাল, মাছ, দুধ এবং বিভিন্ন দেশীয় মসলা থেকে আরও বেশি মূল্য সংযোজিত খাদ্য তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু শুধু নতুন রেসিপি তৈরি করলেই হবে না; উপযুক্ত প্রক্রিয়াকরণ, তাপপ্রয়োগ, শুকানো, হিমায়ন, ঘনীভবন, প্যাকেজিং এবং শেলফ লাইফ নিয়েও গবেষণা করতে হবে। বাংলাদেশের জলবায়ু, কাঁচামাল ও বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা গেলে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশীয় খাদ্যশিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং খাদ্যশিল্পের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতাও অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্পের বাস্তব সমস্যা সমাধানে ব্যবহার করা উচিত। অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়কে কাঁচামাল, বাস্তব সমস্যা, পাইলট ট্রায়াল ও শিল্পপর্যায়ের গবেষণার সুযোগ দিতে পারে। নতুন প্রজন্মের খাদ্য প্রকৌশলীদের খাদ্যবিজ্ঞানের পাশাপাশি প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং, তাপ ও ভর স্থানান্তর, রেফ্রিজারেশন, অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই উৎপাদনে দক্ষ করে তুলতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে আধুনিক কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো কৃষিপণ্যকে শুধু কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি না করে মূল্য সংযোজিত খাদ্যে রূপান্তর করা। একটি আম যেমন তাজা ফল হিসেবে বিক্রি করা যায়, তেমনি তা থেকে পাল্প, জুস, নেকটার, পিউরি বা শুকনো আম তৈরি করা যায়। একইভাবে দুধ থেকে দই, পনির ও দুধের গুঁড়া; মাছ থেকে প্রস্তুত খাদ্য ও মূল্যবান উপাদান; চালের কুঁড়া থেকে তেল এবং ফলের খোসা থেকে খাদ্য-ফাইবার বা পেকটিন উৎপাদন করা সম্ভব। খাদ্য প্রকৌশলের মাধ্যমে এই মূল্য সংযোজন যত বাড়বে, কৃষি ও খাদ্যশিল্পের অর্থনৈতিক সম্পর্ক তত শক্তিশালী হবে।
এর সুফল সরাসরি কৃষকের কাছেও পৌঁছাতে পারে। উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি ছোট ও মাঝারি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, কোল্ড স্টোরেজ, শুকানোর ব্যবস্থা, পাল্পিং ইউনিট কিংবা হিমায়িতকরণ সুবিধা গড়ে তোলা গেলে মৌসুমে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে। এতে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, কৃষক তুলনামূলক ভালো মূল্য পাবেন এবং গ্রামীণ এলাকায় নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ খাদ্য প্রকৌশলের সুফল শুধু বড় কারখানায় সীমাবদ্ধ নয়; সঠিক পরিকল্পনা করা গেলে এটি কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার কাছেও পৌঁছাতে পারে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামনে আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাজারের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বাজার সম্প্রসারণ সম্ভব। তবে এর জন্য আন্তর্জাতিক মানের খাদ্য নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্য কোল্ড চেইন, উন্নত প্যাকেজিং, দীর্ঘ শেলফ লাইফ, ট্রেসেবিলিটি এবং প্রতিটি ব্যাচে একই গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ খাদ্য প্রকৌশলী ও আধুনিক প্রযুক্তি এখানে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
তাই খাদ্য প্রকৌশলকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শিক্ষাবিষয় কিংবা খাদ্য কারখানার একটি কারিগরি বিভাগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি কৃষি, শিল্প, জনস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং পরিবেশকে সংযুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ভিত্তি। সঠিক প্রযুক্তি নির্বাচন, দক্ষ জনবল তৈরি, গবেষণায় বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের কার্যকর সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, মূল্য সংযোজন বাড়বে, কৃষক লাভবান হবেন, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। আগামী চ্যালেঞ্জ হলো এই খাদ্যকে আরও নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়া। কৃষকের মাঠে উৎপাদিত একটি ফল, শস্য কিংবা মাছকে সর্বোচ্চ মূল্য দিয়ে ভোক্তার টেবিলে পৌঁছানোর পুরো যাত্রায় বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের সমন্বয় প্রয়োজন। আজ যদি আমরা খাদ্য প্রকৌশলে যথাযথ বিনিয়োগ করি, দক্ষ জনবল তৈরি করি, গবেষণাকে শিল্পের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করি এবং দেশের নিজস্ব কাঁচামালের জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করি, তাহলে বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যেতে পারে। আগামী দিনের নিরাপদ, আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক এবং টেকসই খাদ্যশিল্প গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে খাদ্য প্রকৌশল।
[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ আগস্ট ২০২৬
আমরা প্রতিদিন যে প্যাকেটজাত দুধ পান করি, বোতলজাত ফলের জুস কিনি, বিস্কুট খাই, সস ব্যবহার করি কিংবা হিমায়িত মাছ, মাংস ও সবজি রান্না করি—এসব খাদ্য আমাদের কাছে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। আধুনিক খাদ্যশিল্প এখন শুধু খাদ্য তৈরি বা সংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, অটোমেশন, তথ্যপ্রযুক্তি, প্যাকেজিং, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে এটি একটি অত্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে খাদ্য প্রকৌশল বা ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং।
বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় দেশের অধিকাংশ প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ছোট পরিসরে এবং তুলনামূলকভাবে শ্রমনির্ভর পদ্ধতিতে উৎপাদিত হতো। বর্তমানে চাল, আটা-ময়দা, ভোজ্য তেল, দুধ, বিস্কুট, নুডলস, পানীয়, ফলের জুস, সস, মসলা, হিমায়িত খাদ্য, মাছ-মাংসসহ অসংখ্য পণ্য আধুনিক কারখানায় বৃহৎ পরিসরে উৎপাদিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ভোক্তার প্রত্যাশাও পরিবর্তিত হয়েছে। এখন নিরাপদ খাদ্য, দীর্ঘ শেলফ লাইফ, উন্নত স্বাদ, পুষ্টিগুণ, সুবিধাজনক প্যাকেজিং এবং সাশ্রয়ী মূল্য—সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হচ্ছে। এসব লক্ষ্য অর্জনে খাদ্য প্রকৌশলের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
খাদ্যবিজ্ঞান ও খাদ্য প্রকৌশল পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হলেও এক নয়। খাদ্যবিজ্ঞান মূলত খাদ্যের রাসায়নিক গঠন, পুষ্টিগুণ, অণুজীব, স্বাদ, রং, গঠন এবং সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করে। অন্যদিকে খাদ্য প্রকৌশল সেই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে শিল্পপর্যায়ে বাস্তবায়ন করে। পরীক্ষাগারে এক লিটার দুধ বা এক কেজি সস তৈরি করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু প্রতিদিন কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ লিটার একই মানের পণ্য উৎপাদন করতে হলে ট্যাংক, পাম্প, পাইপলাইন, মিক্সার, হিট এক্সচেঞ্জার, হোমোজেনাইজার, রেফ্রিজারেশন, ফিলিং ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। কোন যন্ত্রের ক্ষমতা কত হবে, কীভাবে তাপমাত্রা, চাপ ও তরল প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং কীভাবে নিরাপত্তা বজায় রেখে উৎপাদন বাড়ানো যাবে- এসবই খাদ্য প্রকৌশলের বিষয়।
বাংলাদেশে এর পরিচিত উদাহরণ দেখা যায় চাল প্রক্রিয়াজাতকরণে। আধুনিক রাইস মিলে ধান পরিষ্কার, পাথর ও অন্যান্য অপদ্রব্য অপসারণ, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, শুকানো, খোসা ছাড়ানো, পালিশ, ভাঙা চাল আলাদা করা, রং অনুযায়ী বাছাই এবং প্যাকেজিং- প্রতিটি পর্যায়ে প্রকৌশল প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। অপটিক্যাল কালার সোর্টার দ্রুত বিপুল পরিমাণ চাল পরীক্ষা করে ত্রুটিপূর্ণ দানা আলাদা করতে পারে। সঠিকভাবে শুকানো ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চালের ভাঙন এবং সংরক্ষণকালীন ক্ষতিও কমানো যায়। একইভাবে আধুনিক আটা-ময়দা কারখানায় গম পরিষ্কার, কন্ডিশনিং, রোলার মিলিং, সিভিং ও প্যাকেজিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে প্রকৌশল নিয়ন্ত্রণ ব্যবহৃত হচ্ছে।
দুগ্ধশিল্প খাদ্য প্রকৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কাঁচা দুধ দ্রুত নষ্ট হতে পারে এবং এতে রোগসৃষ্টিকারী অণুজীব থাকতে পারে। তাই পাস্তুরাইজেশন, হোমোজেনাইজেশন, ইউএইচটি প্রক্রিয়াকরণ, দ্রুত শীতলীকরণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত প্যাকেজিং ব্যবহার করা হয়। আধুনিক হিট এক্সচেঞ্জারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিতভাবে দুধ গরম ও ঠান্ডা করা সম্ভব। আবার ক্লিন-ইন-প্লেস বা সিআইপি প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্যাংক ও পাইপলাইন না খুলেই পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা যায়। এতে বৃহৎ পরিসরে নিরাপদ ও ধারাবাহিক মানের দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন সহজ হয়।
ফলের জুস, কোমল পানীয় এবং অন্যান্য পানীয় উৎপাদনেও খাদ্য প্রকৌশল অপরিহার্য। পানি পরিশোধন, উপাদান মেশানো, দ্রবীভূত করা, অম্লতা ও দ্রবণীয় কঠিন পদার্থ নিয়ন্ত্রণ, হোমোজেনাইজেশন, পাস্তুরাইজেশন এবং বোতলজাতকরণের প্রতিটি ধাপ নির্ভুলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তাপমাত্রা, সময়, চাপ কিংবা প্রবাহের গতিতে পরিবর্তন হলে পণ্যের স্বাদ, রং ও স্থায়িত্ব প্রভাবিত হতে পারে। তাই আধুনিক পানীয় কারখানায় সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।
বিস্কুট, কেক, রুটি ও অন্যান্য বেকারি পণ্যেও প্রকৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডো মিক্সিং থেকে শিটিং, কাটিং, বেকিং, কুলিং এবং প্যাকেজিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের সঙ্গে তাপ ও ভর স্থানান্তরের সম্পর্ক রয়েছে। ওভেনের তাপমাত্রা, বেকিংয়ের সময় এবং খাদ্য থেকে পানি বের হওয়ার হার পণ্যের রং, স্বাদ, আর্দ্রতা, খাস্তা ভাব ও শেলফ লাইফ নির্ধারণ করে। একইভাবে সস, আচার, জ্যাম ও জেলির ক্ষেত্রে পিএইচ, দ্রবণীয় কঠিন পদার্থ, সান্দ্রতা, তাপপ্রয়োগ ও প্যাকেজিংয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। ভোজ্য তেল শিল্পেও ডিগামিং, নিউট্রালাইজেশন, ব্লিচিং, ডিওডোরাইজেশন ও ফিল্ট্রেশনের মতো প্রকৌশল প্রক্রিয়া ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশের জন্য খাদ্য প্রকৌশলের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো ফল ও সবজির অপচয় কমানো। দেশে আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, পেয়ারা, টমেটোসহ বিভিন্ন মৌসুমি কৃষিপণ্য প্রচুর উৎপাদিত হয়। কিন্তু উপযুক্ত সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে এর একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়। কোল্ড স্টোরেজ, নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার পরিবহন, শুকানো, পাল্পিং, ক্যানিং, হিমায়ন এবং অ্যাসেপটিক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এসব পণ্যের মূল্য সংযোজন করা সম্ভব। একটি আমকে শুধু তাজা ফল হিসেবে বিক্রি না করে পাল্প, পিউরি, জুস, নেকটার কিংবা শুকনো আমে রূপান্তর করা গেলে সারা বছর বাজারজাত করা সম্ভব এবং কৃষকও বেশি মূল্য পেতে পারেন।
হিমায়িত খাদ্যশিল্পেও বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। মাছ, চিংড়ি, মাংস ও সবজির ক্ষেত্রে দ্রুত হিমায়িতকরণ এবং আইকিউএফ বা ইন্ডিভিজুয়াল কুইক ফ্রিজিং প্রযুক্তি পণ্যের গুণগত মান ধরে রাখতে সাহায্য করে। তবে শুধু কারখানায় হিমায়িত করলেই যথেষ্ট নয়। উৎপাদন থেকে পরিবহন, গুদাম, বিপণন এবং খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় রাখতে হয়। এই ধারাবাহিক ব্যবস্থাই কোল্ড চেইন। বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো এবং মাছ, চিংড়ি, ফল ও সবজি রপ্তানি বাড়ানোর জন্য শক্তিশালী কোল্ড চেইন অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্যাকেজিংও আধুনিক খাদ্য প্রকৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্যাকেট শুধু খাদ্য বহনের মাধ্যম নয়; এটি খাদ্যকে অক্সিজেন, আর্দ্রতা, আলো এবং বাহ্যিক দূষণ থেকে রক্ষা করে। খাদ্যের ধরন অনুযায়ী কাচ, ধাতু, কাগজ, প্লাস্টিক বা বহুস্তরবিশিষ্ট প্যাকেজিং নির্বাচন করতে হয়। উন্নত বিশ্বে পরিবর্তিত বায়ুমণ্ডল প্যাকেজিং, অ্যাকটিভ প্যাকেজিং এবং স্মার্ট প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে দীর্ঘ শেলফ লাইফের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিংয়ের গুরুত্ব বাড়বে।
খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রকৌশলের ভূমিকা বিশাল। আধুনিক কারখানায় মেটাল ডিটেক্টর, এক্স-রে ইন্সপেকশন, তাপমাত্রা সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদনের মধ্যেই বিভিন্ন সমস্যা শনাক্ত করা যায়। নিরাপদ পানি, বাষ্প, রেফ্রিজারেশন, স্যানিটেশন এবং বর্জ্য পানি শোধনের জন্যও সঠিক প্রকৌশল ব্যবস্থা প্রয়োজন। শুধু ভালো রেসিপি দিয়ে নিরাপদ খাদ্য তৈরি করা যায় না; পুরো কারখানাকে এমনভাবে নকশা ও পরিচালনা করতে হয়, যাতে কাঁচামাল গ্রহণ থেকে প্রস্তুত পণ্য প্যাকেজিং পর্যন্ত দূষণের ঝুঁকি সর্বনিম্ন থাকে।
বিশ্বের খাদ্যশিল্প এখন অটোমেশন, রোবোটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন যুগে প্রবেশ করছে। পিএলসি ও স্কাডার মতো স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে কারখানার তাপমাত্রা, চাপ, প্রবাহ, মিশ্রণের অনুপাত এবং উৎপাদনের গতি কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন ভিশনের সাহায্যে ত্রুটিপূর্ণ ফল বা খাদ্য শনাক্ত করা, গুণগত মান অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস করা এবং যন্ত্র নষ্ট হওয়ার আগেই সম্ভাব্য সমস্যা অনুমান করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশের খাদ্য কারখানাগুলোতেও আগামী দিনে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়বে।
একই সঙ্গে খাদ্য প্রকৌশলকে টেকসই উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। খাদ্য কারখানায় পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, বাষ্প ও রেফ্রিজারেশনের জন্য বিপুল শক্তি ব্যবহৃত হয়। আধুনিক হিট এক্সচেঞ্জার, বর্জ্য তাপ পুনরুদ্ধার, উচ্চ দক্ষতার মোটর, পানি পুনর্ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় ও পরিবেশগত প্রভাব কমানো সম্ভব। খাদ্যশিল্পের বর্জ্যও সম্পদে পরিণত হতে পারে। চালের কুঁড়া থেকে তেল, ফলের খোসা থেকে পেকটিন ও খাদ্য-ফাইবার, মাছের চামড়া থেকে কোলাজেন এবং জৈব বর্জ্য থেকে পশুখাদ্য, সার বা জৈব জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছোট ও মাঝারি খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে খাদ্য প্রকৌশল প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া। দেশের বহু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আচার, মসলা, বেকারি পণ্য, ফলের জুস, দুগ্ধজাত খাদ্য, শুকনো ফল এবং বিভিন্ন স্থানীয় খাবার উৎপাদন করছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই উপযুক্ত প্রসেস ডিজাইন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসম্মত কারখানা নকশা, শেলফ লাইফ নির্ধারণ এবং আধুনিক প্যাকেজিং প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা এবং বড় খাদ্যশিল্পের সহযোগিতায় সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এসব উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছানো গেলে গ্রাম ও জেলা পর্যায়েই কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন, কর্মসংস্থান ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়বে।
বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প এখন এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো আর যথেষ্ট নয়। নগরায়ণ, মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং নিরাপদ ও সুবিধাজনক খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্যশিল্পের ওপর নতুন দায়িত্ব তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টিগুণ, মানের ধারাবাহিকতা, ট্রেসেবিলিটি, শেলফ লাইফ, উৎপাদন দক্ষতা, জ্বালানি ও পানির সাশ্রয় এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতা—সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। কাঁচামাল কোথা থেকে এসেছে, কোন ব্যাচে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে এবং কীভাবে ভোক্তার কাছে পৌঁছেছে—প্রয়োজনে এসব তথ্য দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থাও আধুনিক খাদ্যশিল্পের অপরিহার্য অংশ।
একটি কারখানায় শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করলেই আধুনিক খাদ্যশিল্প তৈরি হয় না। সঠিক কারখানা নকশা, কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্যের প্রবাহ, পরিচ্ছন্ন ও অপরিচ্ছন্ন এলাকার পৃথকীকরণ, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, পানি ও বাষ্প ব্যবস্থাপনা, কার্যকর পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্তকরণ এবং উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ সমান গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য প্রকৌশল এসব বিষয়কে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে একই পরিমাণ কাঁচামাল ও শক্তি ব্যবহার করে বেশি উৎপাদন, কম অপচয় এবং উন্নত মান নিশ্চিত করা সম্ভব।
এজন্য গবেষণা ও উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব কৃষিপণ্য ও খাদ্যাভ্যাসকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বিপুল সুযোগ রয়েছে। আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, কলা, আলু, টমেটো, ধান, ডাল, মাছ, দুধ এবং বিভিন্ন দেশীয় মসলা থেকে আরও বেশি মূল্য সংযোজিত খাদ্য তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু শুধু নতুন রেসিপি তৈরি করলেই হবে না; উপযুক্ত প্রক্রিয়াকরণ, তাপপ্রয়োগ, শুকানো, হিমায়ন, ঘনীভবন, প্যাকেজিং এবং শেলফ লাইফ নিয়েও গবেষণা করতে হবে। বাংলাদেশের জলবায়ু, কাঁচামাল ও বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা গেলে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশীয় খাদ্যশিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং খাদ্যশিল্পের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতাও অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্পের বাস্তব সমস্যা সমাধানে ব্যবহার করা উচিত। অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়কে কাঁচামাল, বাস্তব সমস্যা, পাইলট ট্রায়াল ও শিল্পপর্যায়ের গবেষণার সুযোগ দিতে পারে। নতুন প্রজন্মের খাদ্য প্রকৌশলীদের খাদ্যবিজ্ঞানের পাশাপাশি প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং, তাপ ও ভর স্থানান্তর, রেফ্রিজারেশন, অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই উৎপাদনে দক্ষ করে তুলতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে আধুনিক কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো কৃষিপণ্যকে শুধু কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি না করে মূল্য সংযোজিত খাদ্যে রূপান্তর করা। একটি আম যেমন তাজা ফল হিসেবে বিক্রি করা যায়, তেমনি তা থেকে পাল্প, জুস, নেকটার, পিউরি বা শুকনো আম তৈরি করা যায়। একইভাবে দুধ থেকে দই, পনির ও দুধের গুঁড়া; মাছ থেকে প্রস্তুত খাদ্য ও মূল্যবান উপাদান; চালের কুঁড়া থেকে তেল এবং ফলের খোসা থেকে খাদ্য-ফাইবার বা পেকটিন উৎপাদন করা সম্ভব। খাদ্য প্রকৌশলের মাধ্যমে এই মূল্য সংযোজন যত বাড়বে, কৃষি ও খাদ্যশিল্পের অর্থনৈতিক সম্পর্ক তত শক্তিশালী হবে।
এর সুফল সরাসরি কৃষকের কাছেও পৌঁছাতে পারে। উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি ছোট ও মাঝারি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, কোল্ড স্টোরেজ, শুকানোর ব্যবস্থা, পাল্পিং ইউনিট কিংবা হিমায়িতকরণ সুবিধা গড়ে তোলা গেলে মৌসুমে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে। এতে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, কৃষক তুলনামূলক ভালো মূল্য পাবেন এবং গ্রামীণ এলাকায় নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ খাদ্য প্রকৌশলের সুফল শুধু বড় কারখানায় সীমাবদ্ধ নয়; সঠিক পরিকল্পনা করা গেলে এটি কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার কাছেও পৌঁছাতে পারে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামনে আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাজারের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বাজার সম্প্রসারণ সম্ভব। তবে এর জন্য আন্তর্জাতিক মানের খাদ্য নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্য কোল্ড চেইন, উন্নত প্যাকেজিং, দীর্ঘ শেলফ লাইফ, ট্রেসেবিলিটি এবং প্রতিটি ব্যাচে একই গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ খাদ্য প্রকৌশলী ও আধুনিক প্রযুক্তি এখানে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
তাই খাদ্য প্রকৌশলকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শিক্ষাবিষয় কিংবা খাদ্য কারখানার একটি কারিগরি বিভাগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি কৃষি, শিল্প, জনস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং পরিবেশকে সংযুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ভিত্তি। সঠিক প্রযুক্তি নির্বাচন, দক্ষ জনবল তৈরি, গবেষণায় বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের কার্যকর সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, মূল্য সংযোজন বাড়বে, কৃষক লাভবান হবেন, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। আগামী চ্যালেঞ্জ হলো এই খাদ্যকে আরও নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়া। কৃষকের মাঠে উৎপাদিত একটি ফল, শস্য কিংবা মাছকে সর্বোচ্চ মূল্য দিয়ে ভোক্তার টেবিলে পৌঁছানোর পুরো যাত্রায় বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের সমন্বয় প্রয়োজন। আজ যদি আমরা খাদ্য প্রকৌশলে যথাযথ বিনিয়োগ করি, দক্ষ জনবল তৈরি করি, গবেষণাকে শিল্পের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করি এবং দেশের নিজস্ব কাঁচামালের জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করি, তাহলে বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যেতে পারে। আগামী দিনের নিরাপদ, আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক এবং টেকসই খাদ্যশিল্প গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে খাদ্য প্রকৌশল।
[লেখক: খাদ্য বিজ্ঞানী; ইনোভেশন ম্যানেজার, সালুটিভিয়া, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য]

আপনার মতামত লিখুন