রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ভোট। সংখ্যার হিসাবে ফলাফল অনেকটাই অনুমেয়— সংসদে প্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন বিবেচনায় বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এগিয়ে, বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের পক্ষে ভোট রয়েছে একশ'ও নয়।
এই দুই শিবিরের বাইরে আরও ১২ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। ফলে কে রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন, তার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে অন্য প্রশ্ন— ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই ভোট বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে কী বার্তা দেবে?
১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক বৈধ প্রার্থী নিয়ে আর ভোট হয়নি। তিন দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতাসীন বা সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থীই কার্যত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এবার সেই ধারায় ব্যতিক্রম ঘটছে।
নির্বাচন কমিশনও জানিয়েছে, আগামীকাল জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট হবে। ভোট শেষে সেখানেই গণনা ও প্রাথমিক ফল ঘোষণা করা হবে।
এই নির্বাচন তাই শুধু বঙ্গভবনের জন্য একজন নতুন বাসিন্দা বেছে নেওয়ার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়। বরং এটি সংসদে বিরোধী মতের উপস্থিতি, দলীয় আনুগত্যের সীমা, সংসদ সদস্যের ভোটের স্বাধীনতা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষাও। কারণ এই অনুচ্ছেদটি বহাল থাকায় দলীয় আনুগত্য ও এমপির স্বাধীন ভোটের ক্ষেত্রে টানাপোড়েন তৈরি করেছে।
জয় প্রায় নিশ্চিত, তবু ভোটের গুরুত্ব কোথায়
সংসদের বর্তমান সংখ্যাতত্ত্ব মির্জা ফখরুলের পক্ষে অত্যন্ত শক্তিশালী। কারণ এই নির্বাচনে মোট ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে বিএনপি ও সমমনা জোটের ২৪৭ জন এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ৯০ জন। দুই প্রধান রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে স্বতন্ত্র এমপি রয়েছেন ১২ জন। এই হিসাবে মির্জা ফখরুলের জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের রাজনৈতিক মূল্য শুধু জয়-পরাজয়ে নির্ধারিত হবে না।
বরং ভোটের ফলাফল দুই রাজনৈতিক জোটের সাংগঠনিক শক্তি ও অভ্যন্তরীণ সংহতির একটি তাৎক্ষণিক চিত্র দেবে। কর্নেল অলি আহমদ তার জোটের ৯০ ভোটের সব কটি ধরে রাখতে পারেন কি না, কিংবা এর বাইরে কোনো ভোট আকর্ষণ করতে পারেন কি না—সেটি বিরোধী জোটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে বিএনপির প্রার্থী দলীয় ২৪৭ ভোটের বাইরে কত ভোট পান, সেটিও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ অতিরিক্ত ভোট পেলে সেটিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হতে পারে। আর ভোট যদি দুই শিবিরের নির্ধারিত হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বোঝা যাবে সংসদে রাজনৈতিক মেরুকরণ কতটা দৃঢ়। অর্থাৎ, আগামীকালের নির্বাচনে সংখ্যা ফল নির্ধারণ করবে, কিন্তু ভোটের বিন্যাস রাজনীতির ভাষা নির্ধারণ করবে।
অলি আহমদের প্রার্থিতা শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়
অলি আহমদের প্রার্থিতার রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। তিনি বিএনপির সাবেক নেতা, জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী। একসময় বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে পরিচিত এই রাজনীতিক এবার বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের জন্য তাঁর প্রার্থিতা তাই কেবল একটি প্রতীকী বিরোধী প্রার্থী দাঁড় করানো নয়; বরং সংসদে নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি দৃশ্যমান করারও সুযোগ। অলির জন্যও আগামীকালের নির্বাচন রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাস্তব প্রতিযোগিতার চেয়ে অন্য অর্থে গুরুত্বপূর্ণ। তার জোটের ৯০ ভোট অটুট রাখা এবং সম্ভব হলে এর বাইরে ভোট পাওয়া— এটাই হবে রাজনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি।
৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা—কেন গুরুত্বপূর্ণ?
১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদ সদস্যদের ভোটে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান কার্যকর হয়। সেই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
তবে সেই নির্বাচনে পঞ্চম সংসদের ৩৩০ সদস্যের মধ্যে ৬৬ জন ভোট দেননি। এরপর তিন দশকের বেশি সময় ধরে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন।
ফলে এরপর আর রাষ্ট্রপতি পদে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি। একক প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-ই সংসদীয় ব্যবস্থায় এই নির্বাচন পরিচালনার মূল আইন হিসেবে রয়েছে। ফলে তিন দশকের বেশি সময় পর আবার সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ব্যালট পড়া নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিজেই একটি মূল্যবান রাজনৈতিক সংস্কৃতি। একক প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করার চেয়ে একাধিক প্রার্থীর মধ্যে ভোট হওয়া জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান—সংসদকে অন্তত একটি দৃশ্যমান নির্বাচনি প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসে। তবে এখানেই মূল প্রশ্ন- প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেই কি ভোটের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়?
৭০ অনুচ্ছেদেই বড় প্রশ্ন
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের জায়গাটি হলো—এই ভোট কি সংসদে কোনো বিল বা প্রস্তাবের ওপর দলীয় অবস্থানের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সমতুল্য, নাকি এটি সংসদ সদস্যের সাংবিধানিক নির্বাচনি দায়িত্বের একটি স্বতন্ত্র প্রয়োগ?
এখানেই আইনি ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
একদিকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ হারানোর প্রশ্ন উঠতে পারে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন পরিচালিত একটি পৃথক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হওয়ায় ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে দেওয়া ভোটকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করার বিধানও নেই।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ৭০ অনুচ্ছেদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বড় বাধা মনে করছেন না। বিপরীতে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে অলি আহমদের প্রার্থিতা যাচাইয়ের পর বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটের ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদ একটি অন্তরায়। এখানে একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক প্রশ্ন সামনে আসে— সংসদ সদস্য কি শুধু দলের প্রতিনিধি, নাকি সংবিধানের অধীন স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনকারী জনপ্রতিনিধিও?
প্রকাশ্য ভোটে প্রশ্ন আরও গভীর
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গোপন ব্যালটে নয়, প্রকাশ্য পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে। ব্যালটে ভোটদাতার পরিচিতির তথ্য থাকবে এবং ভোটারকে নির্ধারিত পদ্ধতিতে প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিতে হবে। ফলে কোন সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা শনাক্ত করা সম্ভব। এখানেই ৭০ অনুচ্ছেদের বিতর্ক আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। গোপন ব্যালট হলে একজন সংসদ সদস্য দলীয় নির্দেশনার বাইরে ভোট দিলেও তাঁর ভোটের পছন্দ নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন। কিন্তু প্রকাশ্য ভোটে দলীয় অবস্থান ও ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে তার দৃশ্যমান রাজনৈতিক মূল্য রয়েছে। ফলে প্রশ্নটি কেবল আইনের নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও।
দলীয় শৃঙ্খলা গণতান্ত্রিক দলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সেই শৃঙ্খলা যদি জনপ্রতিনিধির প্রতিটি সাংবিধানিক সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত বিবেচনার জায়গা সংকুচিত করে দেয়, তাহলে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের প্রকৃতি নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
৭০ অনুচ্ছেদ কি সংস্কারের দাবি রাখে?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিকে কেবল এই নির্বাচনের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা কমে যাবে। কারণ বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে এই অনুচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে এই অনুচ্ছেদ প্রয়োজন এমন যুক্তি যেমন আছে, তেমনি এর কঠোর প্রয়োগ সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও ভোটাধিকারকে সীমিত করে— এমন সমালোচনাও রয়েছে।
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই পুরোনো বিতর্ককে নতুন বাস্তবতায় সামনে এনেছে। একটি গণতান্ত্রিক সংসদে দলীয় সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে সংসদ সদস্যের সাংবিধানিক দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ৭০ অনুচ্ছেদকে ঘিরে ভবিষ্যতে যদি সংস্কারের আলোচনা হয়, তা যেন কোনো নির্দিষ্ট দল বা নির্বাচনের স্বার্থে না হয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বৃহত্তর উদ্দেশ্যে হয়— এটাই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।
ভোটের ফল নয়, ভোটের চরিত্রই আসল
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল মির্জা ফখরুল ও অলি আহমদের ভোটের লড়াই নয়। এটি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্যও একটি আয়না— যেখানে দেখা যাবে, ৩৫ বছর পর ফিরে আসা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভেতরে আমরা কতটা স্বাধীন ভোটের সংস্কৃতি এবং কতটা দলীয় নিয়ন্ত্রণ দেখতে পাই। আর সেই আয়নার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হয়তো থেকেই যাবে— গণতন্ত্রের স্বার্থে ৭০ অনুচ্ছেদের সীমা কোথায়? সংসদ সদস্যরা কি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারছেন? দলীয় সিদ্ধান্ত কি তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ রাখছে?
প্রকাশ্য ভোট কি ভোটের স্বচ্ছতা বাড়াচ্ছে, নাকি ব্যক্তিগত পছন্দ প্রকাশের কারণে দলীয় চাপের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে? ৭০ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে? আর ভবিষ্যতে সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও কার্যকর করতে এই বিধানের কোনো সংস্কার প্রয়োজন হবে কি না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আগামীকালকের ভোটে সরাসরি পাওয়া যাবে না। কিন্তু ভোটের আচরণ, ফলের বিন্যাস এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এসব প্রশ্নের দিকে নতুন করে তাকানোর সুযোগ তৈরি করবে। কারণ দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফিরেছে— এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক রাজনৈতিক ঘটনা। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে গণতান্ত্রিক সাফল্যে পরিণত করতে হলে শুধু একাধিক প্রার্থী থাকা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্বাধীন ভোট, কার্যকর সংসদ এবং দলীয় আনুগত্যের সঙ্গে জনপ্রতিনিধির সাংবিধানিক স্বাধীনতার একটি ভারসাম্য।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আগামীকাল বৃহস্পতিবার ভোট। সংখ্যার হিসাবে ফলাফল অনেকটাই অনুমেয়— সংসদে প্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন বিবেচনায় বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এগিয়ে, বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের পক্ষে ভোট রয়েছে একশ'ও নয়।
এই দুই শিবিরের বাইরে আরও ১২ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। ফলে কে রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন, তার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে অন্য প্রশ্ন— ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই ভোট বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে কী বার্তা দেবে?
১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক বৈধ প্রার্থী নিয়ে আর ভোট হয়নি। তিন দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতাসীন বা সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থীই কার্যত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এবার সেই ধারায় ব্যতিক্রম ঘটছে।
নির্বাচন কমিশনও জানিয়েছে, আগামীকাল জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট হবে। ভোট শেষে সেখানেই গণনা ও প্রাথমিক ফল ঘোষণা করা হবে।
এই নির্বাচন তাই শুধু বঙ্গভবনের জন্য একজন নতুন বাসিন্দা বেছে নেওয়ার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়। বরং এটি সংসদে বিরোধী মতের উপস্থিতি, দলীয় আনুগত্যের সীমা, সংসদ সদস্যের ভোটের স্বাধীনতা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষাও। কারণ এই অনুচ্ছেদটি বহাল থাকায় দলীয় আনুগত্য ও এমপির স্বাধীন ভোটের ক্ষেত্রে টানাপোড়েন তৈরি করেছে।
জয় প্রায় নিশ্চিত, তবু ভোটের গুরুত্ব কোথায়
সংসদের বর্তমান সংখ্যাতত্ত্ব মির্জা ফখরুলের পক্ষে অত্যন্ত শক্তিশালী। কারণ এই নির্বাচনে মোট ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে বিএনপি ও সমমনা জোটের ২৪৭ জন এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ৯০ জন। দুই প্রধান রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে স্বতন্ত্র এমপি রয়েছেন ১২ জন। এই হিসাবে মির্জা ফখরুলের জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের রাজনৈতিক মূল্য শুধু জয়-পরাজয়ে নির্ধারিত হবে না।
বরং ভোটের ফলাফল দুই রাজনৈতিক জোটের সাংগঠনিক শক্তি ও অভ্যন্তরীণ সংহতির একটি তাৎক্ষণিক চিত্র দেবে। কর্নেল অলি আহমদ তার জোটের ৯০ ভোটের সব কটি ধরে রাখতে পারেন কি না, কিংবা এর বাইরে কোনো ভোট আকর্ষণ করতে পারেন কি না—সেটি বিরোধী জোটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে বিএনপির প্রার্থী দলীয় ২৪৭ ভোটের বাইরে কত ভোট পান, সেটিও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ অতিরিক্ত ভোট পেলে সেটিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হতে পারে। আর ভোট যদি দুই শিবিরের নির্ধারিত হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বোঝা যাবে সংসদে রাজনৈতিক মেরুকরণ কতটা দৃঢ়। অর্থাৎ, আগামীকালের নির্বাচনে সংখ্যা ফল নির্ধারণ করবে, কিন্তু ভোটের বিন্যাস রাজনীতির ভাষা নির্ধারণ করবে।
অলি আহমদের প্রার্থিতা শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়
অলি আহমদের প্রার্থিতার রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। তিনি বিএনপির সাবেক নেতা, জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী। একসময় বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে পরিচিত এই রাজনীতিক এবার বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের জন্য তাঁর প্রার্থিতা তাই কেবল একটি প্রতীকী বিরোধী প্রার্থী দাঁড় করানো নয়; বরং সংসদে নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি দৃশ্যমান করারও সুযোগ। অলির জন্যও আগামীকালের নির্বাচন রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাস্তব প্রতিযোগিতার চেয়ে অন্য অর্থে গুরুত্বপূর্ণ। তার জোটের ৯০ ভোট অটুট রাখা এবং সম্ভব হলে এর বাইরে ভোট পাওয়া— এটাই হবে রাজনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি।
৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা—কেন গুরুত্বপূর্ণ?
১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদ সদস্যদের ভোটে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান কার্যকর হয়। সেই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
তবে সেই নির্বাচনে পঞ্চম সংসদের ৩৩০ সদস্যের মধ্যে ৬৬ জন ভোট দেননি। এরপর তিন দশকের বেশি সময় ধরে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন।
ফলে এরপর আর রাষ্ট্রপতি পদে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি। একক প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-ই সংসদীয় ব্যবস্থায় এই নির্বাচন পরিচালনার মূল আইন হিসেবে রয়েছে। ফলে তিন দশকের বেশি সময় পর আবার সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ব্যালট পড়া নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিজেই একটি মূল্যবান রাজনৈতিক সংস্কৃতি। একক প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করার চেয়ে একাধিক প্রার্থীর মধ্যে ভোট হওয়া জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান—সংসদকে অন্তত একটি দৃশ্যমান নির্বাচনি প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসে। তবে এখানেই মূল প্রশ্ন- প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেই কি ভোটের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়?
৭০ অনুচ্ছেদেই বড় প্রশ্ন
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের জায়গাটি হলো—এই ভোট কি সংসদে কোনো বিল বা প্রস্তাবের ওপর দলীয় অবস্থানের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সমতুল্য, নাকি এটি সংসদ সদস্যের সাংবিধানিক নির্বাচনি দায়িত্বের একটি স্বতন্ত্র প্রয়োগ?
এখানেই আইনি ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
একদিকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ হারানোর প্রশ্ন উঠতে পারে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন পরিচালিত একটি পৃথক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হওয়ায় ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে দেওয়া ভোটকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করার বিধানও নেই।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ৭০ অনুচ্ছেদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বড় বাধা মনে করছেন না। বিপরীতে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে অলি আহমদের প্রার্থিতা যাচাইয়ের পর বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটের ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদ একটি অন্তরায়। এখানে একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক প্রশ্ন সামনে আসে— সংসদ সদস্য কি শুধু দলের প্রতিনিধি, নাকি সংবিধানের অধীন স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনকারী জনপ্রতিনিধিও?
প্রকাশ্য ভোটে প্রশ্ন আরও গভীর
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গোপন ব্যালটে নয়, প্রকাশ্য পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে। ব্যালটে ভোটদাতার পরিচিতির তথ্য থাকবে এবং ভোটারকে নির্ধারিত পদ্ধতিতে প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিতে হবে। ফলে কোন সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা শনাক্ত করা সম্ভব। এখানেই ৭০ অনুচ্ছেদের বিতর্ক আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। গোপন ব্যালট হলে একজন সংসদ সদস্য দলীয় নির্দেশনার বাইরে ভোট দিলেও তাঁর ভোটের পছন্দ নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন। কিন্তু প্রকাশ্য ভোটে দলীয় অবস্থান ও ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে তার দৃশ্যমান রাজনৈতিক মূল্য রয়েছে। ফলে প্রশ্নটি কেবল আইনের নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও।
দলীয় শৃঙ্খলা গণতান্ত্রিক দলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সেই শৃঙ্খলা যদি জনপ্রতিনিধির প্রতিটি সাংবিধানিক সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত বিবেচনার জায়গা সংকুচিত করে দেয়, তাহলে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের প্রকৃতি নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
৭০ অনুচ্ছেদ কি সংস্কারের দাবি রাখে?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিকে কেবল এই নির্বাচনের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা কমে যাবে। কারণ বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে এই অনুচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে এই অনুচ্ছেদ প্রয়োজন এমন যুক্তি যেমন আছে, তেমনি এর কঠোর প্রয়োগ সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও ভোটাধিকারকে সীমিত করে— এমন সমালোচনাও রয়েছে।
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই পুরোনো বিতর্ককে নতুন বাস্তবতায় সামনে এনেছে। একটি গণতান্ত্রিক সংসদে দলীয় সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে সংসদ সদস্যের সাংবিধানিক দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ৭০ অনুচ্ছেদকে ঘিরে ভবিষ্যতে যদি সংস্কারের আলোচনা হয়, তা যেন কোনো নির্দিষ্ট দল বা নির্বাচনের স্বার্থে না হয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বৃহত্তর উদ্দেশ্যে হয়— এটাই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।
ভোটের ফল নয়, ভোটের চরিত্রই আসল
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল মির্জা ফখরুল ও অলি আহমদের ভোটের লড়াই নয়। এটি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্যও একটি আয়না— যেখানে দেখা যাবে, ৩৫ বছর পর ফিরে আসা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভেতরে আমরা কতটা স্বাধীন ভোটের সংস্কৃতি এবং কতটা দলীয় নিয়ন্ত্রণ দেখতে পাই। আর সেই আয়নার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হয়তো থেকেই যাবে— গণতন্ত্রের স্বার্থে ৭০ অনুচ্ছেদের সীমা কোথায়? সংসদ সদস্যরা কি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারছেন? দলীয় সিদ্ধান্ত কি তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ রাখছে?
প্রকাশ্য ভোট কি ভোটের স্বচ্ছতা বাড়াচ্ছে, নাকি ব্যক্তিগত পছন্দ প্রকাশের কারণে দলীয় চাপের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে? ৭০ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে? আর ভবিষ্যতে সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও কার্যকর করতে এই বিধানের কোনো সংস্কার প্রয়োজন হবে কি না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আগামীকালকের ভোটে সরাসরি পাওয়া যাবে না। কিন্তু ভোটের আচরণ, ফলের বিন্যাস এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এসব প্রশ্নের দিকে নতুন করে তাকানোর সুযোগ তৈরি করবে। কারণ দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফিরেছে— এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক রাজনৈতিক ঘটনা। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে গণতান্ত্রিক সাফল্যে পরিণত করতে হলে শুধু একাধিক প্রার্থী থাকা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্বাধীন ভোট, কার্যকর সংসদ এবং দলীয় আনুগত্যের সঙ্গে জনপ্রতিনিধির সাংবিধানিক স্বাধীনতার একটি ভারসাম্য।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

আপনার মতামত লিখুন