সংবাদ

মতামত

একটি আইফোন কি জীবনের চেয়েও বড়

অপ্রতিমের মৃত্যু শুধুই একটি ফোনের গল্প নয়। মানুষ, বাজার, মর্যাদা, বৈষম্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে এক ভয়ংকর প্রশ্ন। অপ্রতিমের বাবা শোকে পাথর হয়ে প্রশ্ন করেছেন—“সামান্য একটা আইফোনের জন্য ছেলেকে এভাবে হত্যা করা হলো?” এই প্রশ্নটির ভেতরে আটকে আছে পুরো ঘটনার ভয়াবহতা।তবে একটি ফোন; বিনিময়ে একটি শিশুর জীবন— এই প্রশ্নটি আরও গভীর। একটি আইফোন কি সত্যিই জীবনের চেয়ে বড় হয়ে গেছে, নাকি গভীর সামাজিক অসুখের দৃশ্যমান প্রতীক, যেখানে মানুষের মূল্য ক্রমশ তার মানবিকতার বদলে তার সম্পদ, ভোগক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা ও দৃশ্যমান সাফল্য দিয়ে মাপা হচ্ছে?অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়। এটি সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়। একটি ফোনের দাম আর একটি জীবনের মূল্য এক জিনিস নয়। একটি আইফোনের বাজারমূল্য যতই হোক, তার সঙ্গে একটি মানুষের জীবনের কোনো অর্থনৈতিক তুলনা সম্ভব নয়। মানুষের জীবনকে টাকার অঙ্কে মাপা যায় না।প্রশ্নটি আজ সামনে আসার কারণ হচ্ছে, অর্থনীতি আমাদের অদ্ভুত এক বাস্তবতা শিখিয়েছে। বাজারে কিছু জিনিসের দাম আছে ঠিকই, তবে সব কিছুর মূল্য কিন্তু নেই। একটি ফোনের দাম নির্ধারিত হয় তার উৎপাদন খরচ, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উন্নয়ন, সরবরাহব্যবস্থা, ব্র্যান্ড, বিপণন, মুনাফা, কর ও বাজারের চাহিদাসহ বহু বিষয়ের মাধ্যমে। কিন্তু একটি শিশুর জীবনের কোনো ‘বাজারদর’ নেই। তার মূল্য অর্থনৈতিকভাবে বিচারও করা সম্ভব নয়। যা অন্তর্নিহিত মানবিক মূল্য। সভ্যতার মূল শিক্ষাও এখানেই। বাজারের মূল্য আর মানুষের মূল্য এক নয়। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন বাজারের মূল্যবোধ মানুষের নৈতিক মূল্যবোধকে গ্রাস করতে থাকে।আইফোন একটি প্রযুক্তিপণ্য। কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক প্রতীকও। বিখ্যাত মার্কিন অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী থর্সটেইন ভেবলেনের ‘প্রদর্শনমূলক ভোগ’-এর ধারণাটি এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। মানুষ অনেক সময় কোনো বস্তু শুধু ব্যবহারিক প্রয়োজনের জন্য কেনে না; সেই বস্তুটি তার সামাজিক অবস্থান, রুচি, সামর্থ্য বা মর্যাদার সংকেতও বহন করে।যেমন একটি দামি গাড়ি শুধু যাতায়াতের যন্ত্র নয়। একইভাবে দামি ঘড়ি শুধু সময় দেখায় না, ব্র্যান্ডের পোশাকও শুধু শরীর ঢাকে না। তাই একটি আইফোন শুধু ফোন নয়, এর পেছনে পড়ে থাকে বড় একটা সামাজিক গল্প। এসব বস্তু কখনো কখনো সামাজিক ভাষায় বলে—‘আমি কে।’ অর্থাৎ পণ্যটি তখন ব্যবহারিক বস্তু থেকে ‘মর্যাদার প্রতীক’-এ পরিণত হয়।এখানে অপ্রতিমের ঘটনাটি আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। যে সমাজে বস্তু সামাজিক মর্যাদার সংকেত হয়ে ওঠে, সেই সমাজে সেই বস্তু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও কি কখনো অস্বাভাবিকভাবে তীব্র হয়ে উঠতে পারে? এক কথায় উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, পারে।তবে আইফোনকে সরাসরি অপ্রতিম হত্যার কারণ বলা যাবে না। কারণ একটি দামি ফোন দেখা আর সেটি পাওয়ার জন্য হত্যাকাণ্ড ঘটানোর মাঝখানে অপরাধপ্রবণতা, সুযোগ, সিদ্ধান্ত, সামাজিক পরিবেশ, আইন প্রয়োগসহ বহু স্তর রয়েছে। যার মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই শহরে কেউ এমন একটি ফোন ব্যবহার করে যার দাম একজন নিম্নআয়ের মানুষের বহু মাসের আয়ের সমান। আবার অন্য কেউ সেই ফোনটিকে দেখে নিজের অক্ষমতার প্রতীক হিসেবে। এখানেই তৈরি হতে পারে “আপেক্ষিক বঞ্চনা”। নিজের জীবনকে কেউ কেবল নিজের অবস্থার সঙ্গে নয়, অন্যের অবস্থার সঙ্গেও তুলনা করতে শুরু করে।আমার নেই, তার আছে; সে পারছে, আমি পারছি না; সে সম্মান পাচ্ছে, আমি পাচ্ছি না; তার জীবন সফল, আমার জীবন ব্যর্থ —এসব তুলনা সবসময় যে অপরাধ তৈরি করে তা নয়। তবে তীব্র সামাজিক বৈষম্য, সীমিত সুযোগ, ভঙ্গুর সামাজিক সুরক্ষা, অপরাধী সংস্কৃতি, মাদক, সহিংসতার অভিজ্ঞতা আর দুর্বল সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যখন এই বঞ্চনাবোধ যুক্ত হয়, তখন ঝুঁকি বাড়তে পারে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শিশু ও কিশোর সহিংসতা বিষয়ক বিশ্লেষণেও দারিদ্র্য, আয়বৈষম্য, বেকারত্ব, মাদক, সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ, দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ও দুর্বল আইন প্রয়োগকে বিভিন্ন স্তরের ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।অর্থাৎ অপ্রতিমের হত্যাকে শুধু ‘লোভী অপরাধীর কাজ’ বললে আমরা হয়তো অপরাধীকে ধরতে পারব, কিন্তু অপরাধের সামাজিক পরিবেশটি বুঝতে পারব না।আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রভাবশালী তাত্ত্বিক এমিল ডুর্খেইমের “অ্যানোমিয়া” ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। সহজ বাংলায়—সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যখন মানুষের আকাঙ্ক্ষা, আচরণ ও বাস্তবতার সঙ্গে তাল হারিয়ে ফেলে, তখন এক ধরনের নৈতিক-সামাজিক শূন্যতা তৈরি হয়।  যেমনটি আমরা কোনো তরুণদের বলি—সফল হও; কিন্তু কখনও বলি না, সফলতার অর্থ আসলে কী? আবার বলে বসি, বড় হও; অথচ, বড় হওয়ার মাপকাঠি কী, সেটাই ব্যাখ্যা করি না। ঠিক একইভাবে আমরা বলি, দামি ফোন রাখো, ভালো গাড়ি চালাও, ভালো বাড়িতে থাকো। বলি না, ভালো মানুষ হও।সাফল্যের এই দৃশ্যমান প্রতীকগুলো নৈতিক সাফল্যের জায়গা দখল করতে পারে। ফলে অপ্রতিমের ঘটনা আমাদের সেই প্রশ্নই করে— আমরা সন্তানদের শুধুই সাফল্যের ভাষা শেখাচ্ছি, অথচ জীবনের মূল্য শেখাচ্ছি না? প্রশ্ন আসে, সন্তানদের শিক্ষা কি শুধুই চাকরির জন্য?এখানেই হাজির হয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রশ্ন। আমাদের শিক্ষার বড় অংশ এখনও পরীক্ষার ফল, জিপিএ, ভর্তি পরীক্ষা, চাকরি, আয়—এসবের চারপাশে ঘোরে। বলছি না এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়।  কিন্তু একটি শিশুকে কি আমরা কখনও শেখাই—কেন অন্য মানুষের জীবনকেও সম্মান করতে হবে? রাগ হলে কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়? প্রত্যাখ্যান কীভাবে সামলাতে হয়? লোভ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়? অন্যের সম্পদ দেখে হীনম্মন্যতা বা ঈর্ষা হলে কীভাবে তা মোকাবিলা করতে হয়? ডিজিটাল জগতে প্রলোভন ও অপরাধ থেকে কীভাবে নিজেকে দূরে রাখতে হয়? সহিংসতা কখনও সমস্যার সমাধান নয়—এই শিক্ষা কি আমরা দিচ্ছি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও কিশোর সহিংসতা প্রতিরোধে জীবনদক্ষতা, রাগ নিয়ন্ত্রণ, দ্বন্দ্ব সমাধান, সামাজিক দক্ষতা ও স্কুলভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ শিক্ষা শুধু কীভাবে উপার্জন করব, তা শেখালেই হবে না। শিক্ষাকে শেখাতে হবে—কীভাবে মানুষ হব।সরলীকরণের প্রশ্ন হচ্ছে, প্রযুক্তি কি অপরাধ তৈরি করে? এখানে প্রযুক্তিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোও ভুল। মূলত, আইফোন কোনো হত্যাকারী তৈরি করে না।  স্মার্টফোন নিজেও অপরাধী নয়।প্রযুক্তি মানুষের সক্ষমতা বাড়ায়। সেই সক্ষমতা ভালো কাজেও ব্যবহার করা যায়, অপরাধেও।আজ অপ্রতিমের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজই তদন্তকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে এবং সেই সূত্রে ফোন উদ্ধার হয়েছে।  অর্থাৎ প্রযুক্তি একই সঙ্গে ঝুঁকি ও প্রতিরোধের হাতিয়ার।  সমস্যা তাই প্রযুক্তিতে নয়; প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটি কী ধরনের?এখানে আইফোনের আরেকটি ভয়ংকর দিক হচ্ছে, এটি ‘মূল্যবান বস্তু’ থেকে ‘লক্ষ্যবস্তু’ হয়ে যেতে পারে। একটি দামি ও সহজে বহনযোগ্য পণ্য অপরাধের বাজারে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করতে পারে। এখানে অর্থনীতির খুব সরল একটি সূত্র কাজ করে। বেশি দাম, সহজে বহনযোগ্য, সহজেই বেচাকেনা- সেখান থেকে অপরাধের লক্ষ্য। তবে এখানে শুধু শুধু পণ্যের দাম দায়ী নয়।  প্রশ্নটি হচ্ছে—অপরাধী কি মনে করছে সে সহজে পার পেয়ে যাবে?আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? চুরি করা ফোনের বাজার আছে কি? চুরি করা পণ্য শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? অপরাধীর ঝুঁকি কতটা? অপরাধের সম্ভাব্য লাভ ও শাস্তির সম্ভাব্য ক্ষতির মধ্যে কোনটি বেশি? এগুলো নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অপরাধতত্ত্বের প্রশ্ন।এখানে রাষ্ট্রতত্ত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ দার্শনিক টমাস হবসের সামাজিক চুক্তির ধারণায় রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক যুক্তি হলো—মানুষ যেন পরস্পরের বিরুদ্ধে অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতায় না যায়। আধুনিক রাষ্ট্রের শক্তি এখানেই যে, ব্যক্তিগত প্রতিশোধের বদলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।একজন মানুষের ফোন চুরি হয়েছে—সে নিজে বিচার করবে না। একজন মানুষ প্রতারিত হয়েছে—সে নিজে শাস্তি দেবে না। একজন মানুষ অপমানিত হয়েছে—সে খুনি হয়ে উঠবে না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বলবে—অপরাধ হয়েছে। তদন্ত হবে। প্রমাণ সংগ্রহ হবে। বিচার হবে।এই ব্যবস্থা দুর্বল হলে মানুষের কাছে অপরাধের সম্ভাব্য লাভ ও শাস্তির ভয়—দুটির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সহিংসতার সামাজিক ঝুঁকির মধ্যে দুর্বল শাসনব্যবস্থা, দুর্বল আইন প্রয়োগ, দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ও অপর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।তাই অপ্রতিমের হত্যার পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ‘খুনি ধরেছি’ বলায় শেষ নয়। রাষ্ট্রকে এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে খুন করার আগে অপরাধী জানবে—ধরা পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। বিচার এড়ানোর সুযোগ ক্ষীণ।বিবর্তনতত্ত্ব আমাদের আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য শেখায়। মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা নতুন নয়। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ খাদ্য, আশ্রয়, সঙ্গী, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা—সবকিছুর জন্য প্রতিযোগিতা করেছে। সামাজিক মর্যাদার সংকেতও মানবসমাজে নতুন নয়। অর্থাৎ মর্যাদার প্রতিযোগিতা বা সামাজিক অবস্থানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানবসমাজের একেবারে নতুন আবিষ্কার নয়।কিন্তু আধুনিক ভোক্তা অর্থনীতি এই প্রতিযোগিতাকে অভূতপূর্ব মাত্রায় দৃশ্যমান করেছে।সামাজিকমাধ্যম আবার সেই দৃশ্যমানতাকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। আগে আপনি জানতেন আপনার প্রতিবেশীর বাড়ি কত বড়। এখন আপনি একই দিনে শত মানুষের গাড়ি, ফোন, বাড়ি, ভ্রমণ, পোশাক, জীবনযাপন দেখতে পারেন। ফলে তুলনার ক্ষেত্রটি স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক হয়ে গেছে। মানুষের পুরোনো মর্যাদা-প্রতিযোগিতা পেয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির অসীম প্রদর্শনক্ষেত্র। বিপদ এখানেই।  অপ্রতিম আমাদের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি রেখে গেছে। অপ্রতিমের হত্যার বিচার অবশ্যই হতে হবে। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত হতে হবে। যারা দায়ী, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের নিজেদেরও বিচার করতে হবে। আমরা সন্তানকে কী শেখাচ্ছি? দামি ফোন রাখলে তুমি সফল, নাকি মানুষকে সম্মান করলে তুমি সফল? আমরা শিক্ষাকে কী বানাচ্ছি? শুধু উপার্জনের যন্ত্র নাকি মানুষ হওয়ার প্রশিক্ষণ? আমরা অর্থনীতিকে কী শেখাচ্ছি? আরও বেশি ভোগ নাকি ন্যায্য সুযোগ ও মর্যাদা? আমরা প্রযুক্তিকে কী বানাচ্ছি? মানুষের সময় ও মনোযোগ দখলের যন্ত্র, নাকি— জ্ঞান, নিরাপত্তা ও মানবিক সংযোগের মাধ্যম?আমরা রাষ্ট্রকে কী হিসেবে চাই? ঘটনার পর খুনি ধরুক নাকি অপরাধের আগে এমন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করুক, যেখানে অপরাধ করার ঝুঁকি বেশি এবং মানুষের জীবন নিরাপদ?অপ্রতিমের মৃত্যুর সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা হয়তো এটাই—আইফোনের দাম আছে। মানুষের জীবনের দাম নেই—কারণ মানুষের জীবনের মূল্য আছে।দাম আর মূল্য এক জিনিস নয়। বাজার কোনো পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে পারে। রাষ্ট্র কোনো অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করতে পারে। অর্থনীতি আয়-ব্যয়ের হিসাব করতে পারে। প্রযুক্তি মানুষের সময় মাপতে পারে। কিন্তু মানুষের মর্যাদার হিসাব কোনো বাজার, কোনো অ্যালগরিদম, কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো রাষ্ট্র কিংবা কোনো ফোন দিয়ে করা যায় না। ১৩ বছরের অপ্রতিমের জীবন আমাদের সেই মৌলিক সত্যটিই আবার মনে করিয়ে দিল। একটি ফোন হারিয়ে গেলে নতুন ফোন কেনা যায়। টাকা হারালে আবার উপার্জন করা যায়। ক্ষমতা হারালে আবার ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করা যায়। কিন্তু—একটি শিশুর জীবন একবার চলে গেলে তাকে কোনো প্রযুক্তি, কোনো অর্থনীতি, কোনো রাষ্ট্র, কোনো বিচারই ফিরিয়ে দিতে পারে না।তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত আইফোনকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আমাদের নিয়ে। আমরা কি এমন একটি সমাজ বানাতে চাই, যেখানে মানুষ জিনিসের জন্য বাঁচবে—নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে জিনিস মানুষের জন্য থাকবে? অপ্রতিমের রক্তাক্ত শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে সভ্যতার কাছে প্রশ্নটি এখন একেবারেই সরল—একটি আইফোন কি জীবনের চেয়েও বড়? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে সেই ‘না’ শুধু কথায় নয়—আমাদের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগ, আইন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেও প্রমাণ করতে হবে।লেখক: কবি ও সাংবাদিক

একটি আইফোন কি জীবনের চেয়েও বড়