সংবাদ

রিয়া সরেনের মৃত্যু যে প্রশ্নগুলো রেখে গেল


মিথুশিলাক মুরমু
মিথুশিলাক মুরমু
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৪ এএম

রিয়া সরেনের মৃত্যু যে প্রশ্নগুলো রেখে গেল
রিয়া সরেনের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন

বাংলাদেশের মানচিত্রে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ একটি সুপরিচিত শিল্পাঞ্চল। কলকারখানার ধোঁয়া, যন্ত্রের গর্জন আর হাজার হাজার শ্রমিকের ব্যস্ততা এই অঞ্চলের চেনা অবয়ব। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হতদরিদ্র মানুষ দুমুঠো ভাতের আশায় এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এই শিল্পনগরীতে ছুটে আসেন। তাদেরই একজন ছিলেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার কুশদহ ইউনিয়নের বাঘদাবডা গ্রামের সাঁওতাল পরিবারের তরুণী রিয়া সরেন। তার বয়স ১৯ বছর বলে উল্লেখ করা হলেও কোনো কোনো তথ্যে বয়স ১৪ বছর বলা হয়েছে। বিধবা মায়ের একমাত্র ভরসা রিয়া প্রায় সাত-আট মাস আগে রূপগঞ্জের মুরাপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালি এলাকায় এসে একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। সেখানে স্থানীয় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এসিআই সল্ট লিমিটেডে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু গত ৭ সেপ্টেম্বর সকালে সেই ভাড়া বাসা থেকেই উদ্ধার করা হয় তার নিথর দেহ।

রিয়ার আকস্মিক ও সন্দেহজনক মৃত্যু আমাদের সামনে কিছু কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এটি কি আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে রয়েছে হত্যাকাণ্ড? পরবাসে কাজ করতে আসা প্রান্তিক আদিবাসী নারীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

রিয়া সরেনের মৃত্যুর ঘটনাটি প্রথম থেকেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঘটনার দিন সকালে তার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের পর রূপগঞ্জ থানা পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটিকে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করে। পুলিশের বক্তব্য ছিল, আলামত দেখে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলেই মনে হয়েছে। তবে রিয়ার পরিবার, স্বজন ও স্থানীয় আদিবাসী অধিকারকর্মীদের দাবি ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সময় রিয়ার মা রিবিকা মুরমু দিনাজপুরের গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। রিয়া বাসায় একা ছিলেন।

লাশ উদ্ধারের পর রিয়ার শরীর ও ঘটনাস্থলের কিছু আলামতে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে স্বজনদের দাবি। তাদের অভিযোগ, মৃত্যুর আগে রিয়ার কর্মস্থল বা আবাসন এলাকায় এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকতে পারে, যা তাকে চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আবার তাকে শ্বাসরোধ করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলেও তারা সন্দেহ করছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনার কয়েক দিন পর রিয়ার পরিবার রূপগঞ্জ থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি বলে গণমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগে তারা হত্যা মামলা নিতে পারছে না। এই অবস্থান ও মামলার বিষয়ে অনিশ্চয়তা নিহতের পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস তৈরি করেছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফল পাওয়ার আগেই ঘটনাটিকে হত্যা বা আত্মহত্যা হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা উচিত নয়।

রিয়া সরেনের মৃত্যুর ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কাজ করতে আসা আদিবাসী, বিশেষ করে সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, মালপাহাড়িয়া, কোল, কোডা, রাজোয়াড়, তুরী ও পাহান নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে জীবিকার তাগিদে আসা এসব মানুষ ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে অনেক ক্ষেত্রে প্রান্তিক। নতুন পরিবেশে তাদের কয়েকটি বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।

প্রথমত, ভৌগোলিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতি ছেড়ে একজন আদিবাসী নারী রূপগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলে এলে তাকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে অপরিচিতি এবং পরিচিত সামাজিক সহায়তার অভাব তাকে অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্র ও আবাসনে হয়রানির ঝুঁকি। প্রান্তিক নারী শ্রমিকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কর্মক্ষেত্র, আবাসন কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে কেউ হয়রানি বা নির্যাতন করতে পারে। সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক হওয়ার কারণে অনেকে এসব ঘটনার প্রতিবাদ বা অভিযোগ জানাতেও সংকোচ বোধ করেন। ফলে কোনো কোনো ঘটনা আড়ালেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তৃতীয়ত, আইনি সহায়তার সীমাবদ্ধতা। কোনো আদিবাসী নারী অন্যায়ের শিকার হলে ভাষাগত সমস্যা, আইনি জ্ঞানের অভাব, আর্থিক সংকট এবং থানা-পুলিশের কাছে যাওয়ার ভয় তার অভিযোগ জানানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। রিয়া সরেনের পরিবারের ক্ষেত্রেও দূর দিনাজপুর থেকে এসে নারায়ণগঞ্জে আইনি লড়াই চালানো কঠিন। তাই দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য সহজলভ্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

রিয়া সরেনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং সাঁওতালসহ দেশের সব প্রান্তিক শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, প্রশাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। রিয়া সরেনের মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপের বাইরে থেকে তদন্ত করতে হবে। ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য এবং রিয়ার কর্মস্থল ও আবাসনসংক্রান্ত তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করতে হবে।

পরিবারের অভিযোগের আইনগত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। রিয়ার পরিবার যদি হত্যার অভিযোগ করে থাকে, তবে প্রচলিত আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজন হলে দরিদ্র পরিবারটিকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দিতে হবে। কোনো পরিবারের আর্থিক অক্ষমতা যেন ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা না হয়।

শিল্পাঞ্চলে আদিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। রূপগঞ্জসহ দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কতজন আদিবাসী শ্রমিক কাজ করছেন, তাদের কর্মস্থল ও আবাসনের অবস্থা কী—এসব তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের আবাসন এলাকায় নিরাপত্তা, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

মানবাধিকার ও আদিবাসী সংগঠনগুলোর নজরদারি বাড়াতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও সংশ্লিষ্ট আদিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো ঘটনাটির ওপর নজর রাখতে পারে। রিয়ার সহকর্মী, প্রতিবেশী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার প্রকৃত তথ্য সামনে আনার ক্ষেত্রেও নাগরিক সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কর্মক্ষেত্রে কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। এসিআই সল্ট লিমিটেডসহ সব কারখানায় নারী ও প্রান্তিক শ্রমিকদের জন্য কার্যকর অভিযোগ সেল থাকা প্রয়োজন। সেখানে শ্রমিকরা যাতে নিরাপদে হয়রানি, নির্যাতন বা বৈষম্যের অভিযোগ জানাতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের প্রতিকারও হতে হবে স্বচ্ছ ও দ্রুত।

সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় তাদের পূর্বপুরুষেরা সংগ্রাম করেছেন। অথচ আজও তাদেরই একজন তরুণীকে জীবিকার সন্ধানে নিজ এলাকা ছেড়ে এসে এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে—এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।

রিয়া সরেনের মৃত্যু হত্যা হয়ে থাকলে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আর যদি এটি আত্মহত্যা হয়ে থাকে, তাহলে কী কারণে একজন তরুণী এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন, তার ওপর কোনো চাপ বা প্ররোচনা ছিল কি না—সেসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ আত্মহত্যার ঘটনাও অনেক সময় বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।

আমরা উন্নত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। সেই বাংলাদেশে প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনও সমান মূল্যবান হতে হবে। রূপগঞ্জের মঙ্গলখালির সেই অন্ধকার ঘরের রহস্য উদঘাটন করে রিয়া সরেনের পরিবারকে ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। কোনো শ্রমিকের জীবন যেন তার দারিদ্র‍্য, জাতিগত পরিচয় বা ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে কম মূল্যবান হয়ে না পড়ে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: কলামিস্ট]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


রিয়া সরেনের মৃত্যু যে প্রশ্নগুলো রেখে গেল

প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের মানচিত্রে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ একটি সুপরিচিত শিল্পাঞ্চল। কলকারখানার ধোঁয়া, যন্ত্রের গর্জন আর হাজার হাজার শ্রমিকের ব্যস্ততা এই অঞ্চলের চেনা অবয়ব। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হতদরিদ্র মানুষ দুমুঠো ভাতের আশায় এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এই শিল্পনগরীতে ছুটে আসেন। তাদেরই একজন ছিলেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার কুশদহ ইউনিয়নের বাঘদাবডা গ্রামের সাঁওতাল পরিবারের তরুণী রিয়া সরেন। তার বয়স ১৯ বছর বলে উল্লেখ করা হলেও কোনো কোনো তথ্যে বয়স ১৪ বছর বলা হয়েছে। বিধবা মায়ের একমাত্র ভরসা রিয়া প্রায় সাত-আট মাস আগে রূপগঞ্জের মুরাপাড়া ইউনিয়নের মঙ্গলখালি এলাকায় এসে একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। সেখানে স্থানীয় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এসিআই সল্ট লিমিটেডে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু গত ৭ সেপ্টেম্বর সকালে সেই ভাড়া বাসা থেকেই উদ্ধার করা হয় তার নিথর দেহ।

রিয়ার আকস্মিক ও সন্দেহজনক মৃত্যু আমাদের সামনে কিছু কঠিন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এটি কি আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে রয়েছে হত্যাকাণ্ড? পরবাসে কাজ করতে আসা প্রান্তিক আদিবাসী নারীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

রিয়া সরেনের মৃত্যুর ঘটনাটি প্রথম থেকেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঘটনার দিন সকালে তার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের পর রূপগঞ্জ থানা পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটিকে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করে। পুলিশের বক্তব্য ছিল, আলামত দেখে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলেই মনে হয়েছে। তবে রিয়ার পরিবার, স্বজন ও স্থানীয় আদিবাসী অধিকারকর্মীদের দাবি ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সময় রিয়ার মা রিবিকা মুরমু দিনাজপুরের গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। রিয়া বাসায় একা ছিলেন।

লাশ উদ্ধারের পর রিয়ার শরীর ও ঘটনাস্থলের কিছু আলামতে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে স্বজনদের দাবি। তাদের অভিযোগ, মৃত্যুর আগে রিয়ার কর্মস্থল বা আবাসন এলাকায় এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকতে পারে, যা তাকে চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আবার তাকে শ্বাসরোধ করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলেও তারা সন্দেহ করছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনার কয়েক দিন পর রিয়ার পরিবার রূপগঞ্জ থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি বলে গণমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগে তারা হত্যা মামলা নিতে পারছে না। এই অবস্থান ও মামলার বিষয়ে অনিশ্চয়তা নিহতের পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস তৈরি করেছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফল পাওয়ার আগেই ঘটনাটিকে হত্যা বা আত্মহত্যা হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা উচিত নয়।

রিয়া সরেনের মৃত্যুর ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কাজ করতে আসা আদিবাসী, বিশেষ করে সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, মালপাহাড়িয়া, কোল, কোডা, রাজোয়াড়, তুরী ও পাহান নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে জীবিকার তাগিদে আসা এসব মানুষ ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে অনেক ক্ষেত্রে প্রান্তিক। নতুন পরিবেশে তাদের কয়েকটি বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।

প্রথমত, ভৌগোলিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতি ছেড়ে একজন আদিবাসী নারী রূপগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলে এলে তাকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে অপরিচিতি এবং পরিচিত সামাজিক সহায়তার অভাব তাকে অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্র ও আবাসনে হয়রানির ঝুঁকি। প্রান্তিক নারী শ্রমিকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কর্মক্ষেত্র, আবাসন কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে কেউ হয়রানি বা নির্যাতন করতে পারে। সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক হওয়ার কারণে অনেকে এসব ঘটনার প্রতিবাদ বা অভিযোগ জানাতেও সংকোচ বোধ করেন। ফলে কোনো কোনো ঘটনা আড়ালেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তৃতীয়ত, আইনি সহায়তার সীমাবদ্ধতা। কোনো আদিবাসী নারী অন্যায়ের শিকার হলে ভাষাগত সমস্যা, আইনি জ্ঞানের অভাব, আর্থিক সংকট এবং থানা-পুলিশের কাছে যাওয়ার ভয় তার অভিযোগ জানানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। রিয়া সরেনের পরিবারের ক্ষেত্রেও দূর দিনাজপুর থেকে এসে নারায়ণগঞ্জে আইনি লড়াই চালানো কঠিন। তাই দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য সহজলভ্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

রিয়া সরেনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং সাঁওতালসহ দেশের সব প্রান্তিক শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, প্রশাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। রিয়া সরেনের মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপের বাইরে থেকে তদন্ত করতে হবে। ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য এবং রিয়ার কর্মস্থল ও আবাসনসংক্রান্ত তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করতে হবে।

পরিবারের অভিযোগের আইনগত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। রিয়ার পরিবার যদি হত্যার অভিযোগ করে থাকে, তবে প্রচলিত আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজন হলে দরিদ্র পরিবারটিকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দিতে হবে। কোনো পরিবারের আর্থিক অক্ষমতা যেন ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বাধা না হয়।

শিল্পাঞ্চলে আদিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। রূপগঞ্জসহ দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কতজন আদিবাসী শ্রমিক কাজ করছেন, তাদের কর্মস্থল ও আবাসনের অবস্থা কী—এসব তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের আবাসন এলাকায় নিরাপত্তা, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

মানবাধিকার ও আদিবাসী সংগঠনগুলোর নজরদারি বাড়াতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও সংশ্লিষ্ট আদিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো ঘটনাটির ওপর নজর রাখতে পারে। রিয়ার সহকর্মী, প্রতিবেশী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার প্রকৃত তথ্য সামনে আনার ক্ষেত্রেও নাগরিক সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কর্মক্ষেত্রে কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। এসিআই সল্ট লিমিটেডসহ সব কারখানায় নারী ও প্রান্তিক শ্রমিকদের জন্য কার্যকর অভিযোগ সেল থাকা প্রয়োজন। সেখানে শ্রমিকরা যাতে নিরাপদে হয়রানি, নির্যাতন বা বৈষম্যের অভিযোগ জানাতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের প্রতিকারও হতে হবে স্বচ্ছ ও দ্রুত।

সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় তাদের পূর্বপুরুষেরা সংগ্রাম করেছেন। অথচ আজও তাদেরই একজন তরুণীকে জীবিকার সন্ধানে নিজ এলাকা ছেড়ে এসে এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে—এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।

রিয়া সরেনের মৃত্যু হত্যা হয়ে থাকলে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আর যদি এটি আত্মহত্যা হয়ে থাকে, তাহলে কী কারণে একজন তরুণী এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন, তার ওপর কোনো চাপ বা প্ররোচনা ছিল কি না—সেসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ আত্মহত্যার ঘটনাও অনেক সময় বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।

আমরা উন্নত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। সেই বাংলাদেশে প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনও সমান মূল্যবান হতে হবে। রূপগঞ্জের মঙ্গলখালির সেই অন্ধকার ঘরের রহস্য উদঘাটন করে রিয়া সরেনের পরিবারকে ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। কোনো শ্রমিকের জীবন যেন তার দারিদ্র‍্য, জাতিগত পরিচয় বা ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে কম মূল্যবান হয়ে না পড়ে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: কলামিস্ট]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত