সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার কঠিন পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতিকে উত্তরণের চেষ্টা করছে এবং এ কাজে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের কথাও বলেছেন। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণতন্ত্র শুধু রাজনৈতিক অধিকার ও নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সমতা, সামাজিক ন্যায় এবং সুযোগের সমতাও জড়িত।
অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা। এর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুপেয় পানি ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক সেবায় সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভূমি, ঋণ, আর্থিক সম্পদ, কর্মসংস্থান ও তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগেও বৈষম্য কমাতে হবে। নাগরিকদের জীবনে প্রভাব ফেলে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকতে হবে। শুধু আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ যথেষ্ট নয়; দরিদ্র, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরও নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পেতে হবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের প্রয়োজন আরও বেশি। অঞ্চল, গ্রাম-শহর, নারী-পুরুষ এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক শ্রেণির মধ্যে এখনো বড় বৈষম্য রয়েছে। দারিদ্র্যরে হারও বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্পদ ও আয়ের বণ্টনে বৈষম্য প্রকট। মূল লেখায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ, বিপরীতে নিচের ৫০ শতাংশের হাতে মাত্র ৪ শতাংশ। উচ্চ ও নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে শিশু মৃত্যুর হারেও বড় পার্থক্য রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগেও একই ধরনের বৈষম্য দেখা যায়।
নারীর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় অনেক কম। ব্যবস্থাপনা পর্যায় ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ সীমিত। এর সঙ্গে রয়েছে কর্মক্ষেত্র ও ঘরে নানা ধরনের হয়রানি ও সহিংসতা। ফলে অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে নারী-পুরুষের সুযোগের বৈষম্য কমানো জরুরি।
তবে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন। ব্যাংক খাত, আমদানি-রপ্তানি এবং বড় প্রকল্পে গুটিকয়েক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাজারে প্রতিযোগিতা সীমিত হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়েন। রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ব্যবহার করে ঋণ নেওয়া, ঋণখেলাপি হওয়া কিংবা অর্থ পাচারের প্রবণতা থাকলে তা অর্থনীতিতে বৈষম্য আরও বাড়ায়। তাই ব্যাংক খাতের সংস্কার, সুশাসন এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির জন্য সামাজিক সহায়তা ও বিভিন্ন কার্ডভিত্তিক কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এসব কর্মসূচির পাশাপাশি মূল অর্থনৈতিক কাঠামোতেও সংস্কার প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত করা, পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা নিশ্চিত করা দরকার। সরকারি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়ানো যেতে পারে।
অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের জন্য একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানব্যবস্থা অপরিহার্য। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছতা ছাড়া বৈষম্য কমানোর নীতি কার্যকর করা কঠিন। দরিদ্র, নারী, প্রতিবন্ধী, প্রবীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনা করে নীতি প্রণয়ন করতে হবে। অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে মানুষের সক্ষমতা ও মর্যাদাকে।
রাজনৈতিক গণতন্ত্রের পাশাপাশি অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের সুফল যদি সমাজের একটি সীমিত অংশের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারে না। সরকারের সামনে তাই শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর নয়, সুযোগ ও সম্পদের বৈষম্য কমানোরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সুস্পষ্ট লক্ষ্য, কার্যকর সংস্কার, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ বাস্তব রূপ পেতে পারে।
[লেখক: সাবেক ব্যাংকার]

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার কঠিন পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতিকে উত্তরণের চেষ্টা করছে এবং এ কাজে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের কথাও বলেছেন। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণতন্ত্র শুধু রাজনৈতিক অধিকার ও নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সমতা, সামাজিক ন্যায় এবং সুযোগের সমতাও জড়িত।
অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা। এর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুপেয় পানি ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক সেবায় সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভূমি, ঋণ, আর্থিক সম্পদ, কর্মসংস্থান ও তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগেও বৈষম্য কমাতে হবে। নাগরিকদের জীবনে প্রভাব ফেলে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকতে হবে। শুধু আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ যথেষ্ট নয়; দরিদ্র, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরও নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পেতে হবে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের প্রয়োজন আরও বেশি। অঞ্চল, গ্রাম-শহর, নারী-পুরুষ এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক শ্রেণির মধ্যে এখনো বড় বৈষম্য রয়েছে। দারিদ্র্যরে হারও বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্পদ ও আয়ের বণ্টনে বৈষম্য প্রকট। মূল লেখায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ, বিপরীতে নিচের ৫০ শতাংশের হাতে মাত্র ৪ শতাংশ। উচ্চ ও নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে শিশু মৃত্যুর হারেও বড় পার্থক্য রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগেও একই ধরনের বৈষম্য দেখা যায়।
নারীর ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় অনেক কম। ব্যবস্থাপনা পর্যায় ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ সীমিত। এর সঙ্গে রয়েছে কর্মক্ষেত্র ও ঘরে নানা ধরনের হয়রানি ও সহিংসতা। ফলে অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে নারী-পুরুষের সুযোগের বৈষম্য কমানো জরুরি।
তবে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন। ব্যাংক খাত, আমদানি-রপ্তানি এবং বড় প্রকল্পে গুটিকয়েক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাজারে প্রতিযোগিতা সীমিত হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়েন। রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ব্যবহার করে ঋণ নেওয়া, ঋণখেলাপি হওয়া কিংবা অর্থ পাচারের প্রবণতা থাকলে তা অর্থনীতিতে বৈষম্য আরও বাড়ায়। তাই ব্যাংক খাতের সংস্কার, সুশাসন এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির জন্য সামাজিক সহায়তা ও বিভিন্ন কার্ডভিত্তিক কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এসব কর্মসূচির পাশাপাশি মূল অর্থনৈতিক কাঠামোতেও সংস্কার প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত করা, পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা নিশ্চিত করা দরকার। সরকারি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়ানো যেতে পারে।
অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের জন্য একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানব্যবস্থা অপরিহার্য। নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছতা ছাড়া বৈষম্য কমানোর নীতি কার্যকর করা কঠিন। দরিদ্র, নারী, প্রতিবন্ধী, প্রবীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনা করে নীতি প্রণয়ন করতে হবে। অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে মানুষের সক্ষমতা ও মর্যাদাকে।
রাজনৈতিক গণতন্ত্রের পাশাপাশি অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের সুফল যদি সমাজের একটি সীমিত অংশের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারে না। সরকারের সামনে তাই শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর নয়, সুযোগ ও সম্পদের বৈষম্য কমানোরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সুস্পষ্ট লক্ষ্য, কার্যকর সংস্কার, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ বাস্তব রূপ পেতে পারে।
[লেখক: সাবেক ব্যাংকার]

আপনার মতামত লিখুন