ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা এক কালজয়ী নাম— তোফায়েল আহমেদ। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান এই রূপকার, স্বাধীন বাংলাদেশে হয়ে উঠেছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রভাবশালী ও দাপুটে নেতা। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে নৌকা প্রতীক নিয়ে ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অনন্য কীর্তিও তাঁর। কিন্তু বর্ণাঢ্য এই রাজনৈতিক জীবনের শেষ এক দশকেরও বেশি সময় কেটেছে চরম একাকীত্ব আর অবহেলায়। বিরাশি বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিক, শেষ জীবনে নিজ দলের রাজনীতিতেই হয়ে পড়েছিলেন কোণঠাসা। শরীরের একাংশ প্যারালাইজড হওয়ায় শেষ কয়েক বছর কাটাতে হয়েছে হুইলচেয়ারে। শারীরিক এই অক্ষমতার চেয়েও, দলীয় রাজনীতিতে প্রভাব হারানো এবং অবহেলার শিকার হওয়াটা তাঁর মনে গভীর হতাশার জন্ম দিয়েছিল। অথচ ইতিহাস বলে অন্য কথা। ডাকসুর ভিপি ও সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে ১৯৬৯ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি, এই তোফায়েল আহমেদই রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে দুই দফায় সামলেছেন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনসহ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রথম সারিতে ছিলেন তিনি। তবে রাজনীতির পাশা উল্টে যায় ২০০৭ সালের ১/১১-এর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার ফর্মুলার মাঝে, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আব্দুর রাজ্জাক ও আমির হোসেন আমুর সাথে তোফায়েল আহমেদও দলে সংস্কারের প্রস্তাব তোলেন। আর এই 'সংস্কারপন্থী' তকমাই পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। যা তাঁকে দলীয় নীতিনির্ধারণী ফোরাম থেকে ক্রমশ দূরে ঠেলে দেয়। দলীয় কোন্দল আর অবহেলায় চরম হতাশ হলেও, তোফায়েল আহমেদ কখনো তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি লালন করেছেন মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। অবশেষে এক চরম ক্রান্তিকালে চিরবিদায় নিলেন এই ঐতিহাসিক নেতা; যখন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে তাঁর নিজের দল আওয়ামী লীগও পার করছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকট।