মফস্বলের শীতের সকাল| গাছের পাতার ওপরে যেন কেউ মুঠো মুঠো আবিরের মতো ছড়িয়ে দিয়েছে সোনারোদ| আর্তনাদের মতো শব্দ করে খুলে যায় মূল ফটকের দরজা| বহুদিন বোধ হয় কব্জায় তেল দেয়া হয়নি| রোয়েনা কপালের ওপর থেকে চুল সরিয়ে নেয়| সারারাত রেল ভ্রমণের ক্লান্তি তার চোখে| তবুও নির্ঘুম চোখে একবার তিনতলা বাড়ির মন ভরে দেখে নেয়| এবাড়িতে শেষবার যখন এসেছিল তখন বয়স ছিল ষোলো| পেয়ারা গাছে উঠে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতো| তার চাচাতো ভাই ডাকতো শেওড়া গাছের পেত্নী| সে কথা মনে পড়তেই ফিক করে হেসে ফেলল রোয়েনা|
সে পেয়ারা গাছের ওপরে থেকেই পাল্টা জবাব দিতো ‘হয়নি| বলো পেয়ারা গাছের পেত্নী|’
এখন গাছে চড়তে গেলে নির্ঘাত কোমর ভাঙবে| দশ বছর বাদে গাছটাকে দেখা যাচ্ছে না| পেয়ারা গাছ আর নেই| তবে করমচা গাছটা ঠিকঠাক চিনে ফেলল| দাদি করমচার একটা জেলি বানাতেন| হাস্নাহেনা গাছটার কাছে গিয়ে মন বিষণ্ন হয়ে গেল| সৌরভ ছড়ানো গাছটা কেমন নিষ্প্রাণ| এমনই হয়; এমনই হবার কথা| এই বাড়িতে এখন তেমন কেউ থাকেন না| এই বাড়িটা তার প্রাণ হারিয়েছে|
দোতলার বারান্দা থেকে রুবিনা চাচী চেঁচিয়ে ডাকলেন, “বাবু তুমি কখন এলে?”
একথা বলেই তিনি সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন| রুবিনা চাচী একমাত্র মানুষ যিনি এখনো তাকে বাবু বলে ডাকে| কেন ডাকে সে এক বিরাট রহস্য| তার বাবা-মা কখনোই তাকে বাবু বলে ডাকেনি| ব্যতিক্রম রুবিনা চাচী|
চাচী সিঁড়ি দিয়ে নেমে হাপাচ্ছেন| “একটা খবর দিয়ে আসতে হয় না?”
“যা বাবা| তুমিই তো বলো নিজের বাড়িতে আসতে হলে বুঝি খবর দিতে হয়|”
রুবিনা চাচী হেসে ফেললেন| “এখন ওপরে চলো| তোমাকে নাস্তা খেতে দেই|”
“এক কাপ কড়া লিকারের চা দেবে| নাস্তা খাবো| তারপরে ঘড়ি ধরে তিন ঘন্টা ঘুমাবো|”
“আমি গিজার অন করছি| পানি গরম হলেই প্রথমে গোসল করবে| তারপরে নাস্তা| অবেলায় লম্বা ঘুম দিলে রাত্রে ঘুমাতে পারবে না| গোসল করলেই তোমার ক্লান্তি কেটে যাবে|”
কথাগুলো অধিকারের সুরেই বললেন রুবিনা| রোয়েনা ভাবল শেষ কবে কে তাকে এমন অধিকারের সুরে কথা বলেছে? মনে পড়ল না|
সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই দোতলার বারান্দায় চোখ গেল| একটা দোলনা ঝুলতো এখানে| ইংরেজিতে বলে হ্যামক|এমন দোলনা| তখন ও বারান্দার কাজ শেষ হয়নি| গ্রিল দেয়া হয়েছে; তবে প্লাস্টারবিহীন ইট দেখা যেত পাঁচিলে| অবচেতনেই রোয়েনা তার চিবুকে হাত দিলো| কতবার দোলনা চড়তে গিয়ে পা ফস্কে সামনের পাঁচিলে চিবুক কেটে গেছে| দাগটা রয়ে গেছে এখনও|
বারান্দা দিয়ে নিচে তাকালে ভেতর আঙিনার উঠোন দেখা যায়| ঠিক এই জায়গাতেই ছোট ফুপার চল্লিশার আয়োজন হয়েছিল| অদ্ভুত দুর্ঘটনায় মারা গেলেন|পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকরির সুবাদে গিয়েছিলেন সমতলের মানুষ| গাড়ি দুর্ঘটনায় খাদে পরল| রহমত ফুপা গাড়ি থেকে লাফ দিলেন|পাথরে মাথা ঠুকে মৃত্যু হলো|গাড়ির বাকি যাত্রীরা রইলেন অক্ষত| দাদা খুব মন খারাপ করেছিলেন| ফুপু নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন বলে দাদা কোনোদিনই রহমত ফুপাকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেননি| অথচ রহমত ফুপার মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছিলেন দাদা| এর পরে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেলেন| জাঁদরেল মানুষটি কেমন মিইয়ে গেলেন| এবাড়ির কোনায় কোনায় আছে চেনা দুঃখ চেনা সুখ|
দুপুরের খাবারের পরে আর চোখ খোলা রাখতে পারলো না রোয়েনা| চাচির ঘরে মৃদু শব্দে ফ্যান ঘুরছে| কিছুক্ষণ ফ্যানের পাখার নড়াচড়া দেখে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল|
ঘুম ভাঙার পরে অবাক হয়ে গেল রোয়েনা| কতক্ষণ ঘুমিয়েছে সে? পরদিন ভোরে উঠেছে?
“চাচী| সকাল হয়ে গেল তুমি আমাকে রাতে ডাকোনি?”
রুবিনা হেসে ফেললেন, “দূর বোকা| এখন সন্ধ্যে নামছে| বাইরে যা দেখছ তা ভোরের আলো নয়|”
রোয়েনা হাত মুখ ধুয়ে টেবিলে বসল| লেবু চা নিয়ে এলো রুবিনা|
“একটা মজার জিনিস খেয়াল করেছ তোমার আর আমার নাম একরকম| র দিয়ে শুরু আর ন দিয়ে শেষ| মা-মেয়ের নাম হলে মানাতো|”
রোয়েনা হেসে ফেলল| “তাহলে নেহালকে এখুনি ফোন করে বলে দিচ্ছি| তুমি আমাকে বেশি ভালোবাসো|”
রুবিনা একটু গম্ভীর হয়ে বললেন| “তোমার নাইমের সাথে কথা হয়|”
“নাহ| হয় না| কেন বলতো?”
“তুমি শুনেছ বোধ হয় নাইম ও আসছে পরশুদিন|”
“ওর খবর কী বলতো?”
“এতো করে বললাম দেখেশুনে বিয়ে করতে| শুনেছ বোধ হয় ওর বৌ ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছে|”
“এমন ও তো হতে পারে নাইম ভাইয়ার দোষ| শুধু শুধু মেয়েটাকে দোষারোপ করে লাভ আছে?”
“সমস্যা তো দুজনেরই ছিল| মেয়েটা জেদি| আর নাইম কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর| যাই হোক বহু বছর পরে সেও বাড়িতে আসছে|”
“ভালোই তো হলো| নেহালকেও ডাকো| বেশ একটা উৎসব এর মতো পরিবেশ হবে|”
রুবিনা অবাক হয়ে তাকালেন| এই বাড়ির মানুষগুলো অদ্ভুত| কোন ধাতুতে গড়া কে জানে? বাড়ির পরিবেশ যাই হোক একে অন্তত উৎসব বলা যায় না| তিনি যথাসম্ভব বিরক্তি চেপে বললেন, “নেহাল ও কাল সকালেই আসবে| তোমাদের সবাইকে একসাথে পাওয়াই তো মুশকিল|”
এই বাড়ির মানুষ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে ভয় পায়| এই মুহূর্তে রুবিনার মনে হচ্ছে রোয়েনা ও এই পরিবারের বাকি সদস্যদের মতো এস্কেপিস্ট|
পরদিন বিকেলবেলা ছাদে হাঁটতে গেল রোয়েনার| এই বাড়ির রোদের রং কি কমলা? ছাদে দাঁড়িয়ে ভাবছিল| গন্ধরাজের সৌরভে মঁ মঁ করছে চারদিক| রোয়েনা বুক ভরে ফুলের গন্ধ নিলো| এমন একটা গাছ সে লাগিয়েছিল বটে| তবে তার হাতে বেশিদিন বাঁচেনি| ভোরবেলায় ছাদে দাঁড়িয়ে পুরোনো কথা ভাবছিল| ছাদের সিঁড়িতে অন্য কারো পায়ের শব্দ পাওয়া গেল| রুবিনা চাচী হয়তো চা নিয়ে এসেছেন|
রোয়েনা নাইম কে দেখে সত্যি অবাক হয়ে গেল| সে জানতো নাইম আজকে আসবে| তবুও অবাক হয়ে গেল| মাথার চুল কমে এসেছে| স্বাস্থ্য কেমন ভেঙে গেছে| দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে কেমন আড়ষ্টতা| এমন বয়স্ক হয়ে গেছে এই কয়েক বছরে?
ছোটবেলায় ভাইয়া দেখতে এমন ছিল না| হাসি-খুশি ছিল| বন্ধুবান্ধবের অভাব ছিল না| তাকে দেখে কেমন পরাজিত মনে হচ্ছে| রোয়েনা হাসিমুখে এগিয়ে গেলো|
“কেমন আছো?”
“আছি ভালোই| তুমি ভালো?”
“অনেক বছর পরে তোমাকে দেখলাম ভাইয়া|”
“হ্যাঁ, বছর পাঁচেক তো হবেই|”
“তা হবে|”
“তুমি অনেকদিন পরে বাড়ি আসলে তাই না?”
“হ্যাঁ| আর ঢাকায় তো সবার সাথে দেখায় হয়ে যায়| কষ্ট করে আর জার্নি করে আস্তে ইচ্ছে করে না ভাইয়া|”
“আমি অবশ্য ভাবতাম তোমার এই বাড়ির ওপরে তেমন টান নেই|”
“কেন ভেবেছো?”
“না মানে এমনি আর কি| ভেবেছি তোমার হয়তো এখানে টান নেই| হয়তো তুমি এখানে বিলং করো না|”
রোয়েনা হেসে ফেলল, “কারণ তুমি আমাকে চেনো না| আমার সম্পর্কে তোমার একটা মন গড়া ধারণা আছে যেটা একেবারেই ভুল| আমি নিচে যাচ্ছি| নাস্তা করতে যাবো| তুমিও এস|”
“না| তুমি যাও| আমি কিছুক্ষণ ছাদে একা থাকবো|”
নিচতলায় নামতেই রুবিনা চাচির মুখ ভার হয়ে আছে লক্ষ্য করল রোয়েনা|
“নাইমের সাথে দেখা হয়েছে?”
“হ্যাঁ| ভাইয়া না আগামীকাল আসবে শুনেছিলাম|”
“আমিও তো তেমনটাই জানতাম| এখন এসো আমি টেবিলে নাস্তা দিচ্ছি খেতে বস|”
“একসাথেই বসি সবাই?”
“ঠিক আছে|”
খাবার টেবিলে বসে যেন পুরোনো দিনের আমেজ ফিরে পেলো রোয়েনা| ফুলকো লুচি ভাজছেন চাচী| ডুবোতেলে টুপটুপে লুচি ফুলেফেঁপে উঠছে| এবাড়ির মেয়েরা চুলার পাশে দাঁড়িয়ে পরিশ্রম করে; ছেলেরা হাত গুটিয়ে বসে থাকে| রোয়েনা তাই চাচীকে সাহায্য করতে উঠে গেল| তার কাছে যদিও কেউ রান্নাঘরের কাজের সাহায্যের আশা করে বসে নেই তবুও তার মনে হলো অনিয়মের চাকা ভাঙতে গেলে নিজে থেকেই উদ্যোগ নিতে হয়| রোয়েনা চাচির পাশে গিয়ে হাত লাগালো| সাদা রঙের বাটিতে বেড়ে দেয়া হলো ঘি দেয়া পাঁচমিশালি সবজি| সুজির হালুয়া থেকেও ঘি-এর সুঘ্রাণ ভেসে আসছে| রোয়েনা কয়েকটা ডিম ভাজি করল| নাইম ভাইয়া পোচ ডিম পছন্দ করত| কুসুম না ভেঙে অতি সাবধানে ডিম পোচ করল রোয়েনা| নেহাল গতরাতের ট্রেনেই ফিরেছে|
রোয়েনা সবার প্লেটে খাবার বেড়ে দিয়ে চাচিকেও জোর করে টেবিলে বসালো|
“চাচী কতদিন পরে পেট ভরে খেলাম|”
“আরেকটু নাও তো| তুমি তো ছেলে মানুষ এখনো খেতে পারো| আমাদের রোয়েনার তো ডায়েট কন্ট্রোল আছে| তোমার তো তেমন কিছু নেই|”
“আমার কোলেস্টেরল বেড়েছে চাচী| গরুর মাংস খাওয়া নিষেধ| আরো অনেক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ডাক্তার|”
“একদিন খেলে কিছুই হবে না বাবা|”
রোয়েনা কোনো কথা না বলে গোগ্রাসে খাচ্ছে|
দ্রুত খাওয়া শেষ করে রোয়েনা বলল, “চাচী খাবার খুব ভালো হয়েছে| আমার কাছে মুক্তোর মালা থাকলে আমি তোমার গলায় পরিয়ে দিতাম| আফসোস মুক্তার মালা নেই| তবে ঢাকা ফিরেই আমি তোমাকে একটা মুক্তার মালা উপহার দেব| আমি সবার জন্য চা বানাচ্ছি|”
রোয়েনার বেশিক্ষন খাবার টেবিলে বসে থাকতে ভালো লাগছিলো না| কারণ কিছুক্ষণ পরেই অস্বস্তিকর আলোচনা শুরু হবে| এই সকালের নাস্তার বাহারি আয়োজন আর কড়া লিকারের চা সবই যেন সেই আলোচনা থেকে মনোযোগ সরাতেই করা হয়েছে|
“নেহালের পড়াশোনা শেষ করে প্ল্যান কী?”
“তেমন কোনো প্ল্যান নেই ভাইয়া| আমি ঠিক করেছি চাকরি শুরু করব| যেখানে ইন্টার্নশিপ করেছিলাম সেই ব্যাংক থেকেই একটা অফার আছে|”
“বাহ| চমৎকার| তবে আমি অবশ্য স্বাধীন মানুষ| অন্যের চাকরি করাটা ঠিক পোষায় না|”
“আমাদের পরিবারের ব্যবসা করে কেউ তেমন উন্নতি করতে পারেনি| একমাত্র দাদাকেই দেখেছি সফল ব্যবসায়ী| এজন্যেই ঠিক করেছি চাকরি করব|”
রোয়েনা এসে বসতেই নাইম বলল, “আমার এক বন্ধু আসবে আজকে বাড়িতে| তার নাম শাওন| এখানে রিয়েল এস্টেটের পুরোনো ব্যবসা আছে| ভাবছিলাম ওকে বাড়িটা একবার দেখাবো|”
“কেন?”
“দেখো এখন তো আমাদের পরিবার বড় হয়েছে| কোনো বিল্ডারকে দিয়ে বাড়িটা যদি ভেঙে একটা এপার্টমেন্ট বিল্ডিং হতো তাহলে সবাই আলাদা ভাবে থাকতে পারত|”
“বিল্ডারের কাছে বাড়ি দিয়ে দিলে জমির মালিকানা আমাদের হাতে থাকবে না ভাইয়া|”
“তুমি একটা ইমোশনের কথা বলেছ| দাদার আমল থেকে এই বাড়ির আমাদের| তবে বাস্তবতা ভিন্ন|”
নেহাল বলল, “ইমোশনের কথা না ভাইয়া| দাদা এই বাড়ির ফাউন্ডেশন করেছিলেন পাঁচ তলা| যাতে আমরা চাইলে এখানে একেকটা ফ্লোর নিজেরা করে নিয়ে থাকতে পারি| এই বাড়িতে তিনতলা অব্দি তো তোলাই আছে|”
নাইম কিছুক্ষন চুপ থেকে বলল, “শাওন আসুক| তারপরে আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেই|”
রোয়েনা ভাবলো একবার বলে এবাড়ির সব সিদ্ধান্ত তোমাকে কেন্দ্র করে হয়েছে| গ্রামের বাগানবাড়িতে বিক্রি হয়েছে তোমাকে বিদেশে পাঠাবার খরচ জোগার করতে| পড়াশোনা শেষ করে তোমার চাকরি করতে ইচ্ছে করেনি| তারপরে বাগান বিক্রি করে তোমার ব্যবসা করার অর্থ জোগাড় হয়েছে| এখন তোমার হাত থেকে বাড়িটাও রক্ষা পাবে না|
বিকেলবেলায় নাঈমের বন্ধু শাওন এলো| রোয়েনার শাওনকে দেখে মনে হলো তার চেহারা শেয়ালের মত| ধূর্ত মনে হবার কারণ আছে| রোয়েনার মনে হচ্ছে শাওন তাদেরকে ঠকাবে| শাওন পুরো বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখল| ডাইনিং টেবিলে বসে সবার সাথে কথা বলল| রোয়েনা পুরো সময় তাকে লক্ষ্য করল| শাওনের কথা বলার ভঙ্গি অদ্ভুত| আঞ্চলিক আর প্রমিত ভাষা মিলিয়ে জগাখিচুড়ি ভাষায় কথা বলে| যখন খেই হারিয়ে আঞ্চলিক ভঙ্গিতে কথা বলে মনে হয় কথার ট্রেন রেললাইন থেকে ছিটকে পরে| দাদা বেঁচে থাকলে এমন ধান্দাবাজ লোক কোনোদিন ভিতরবাড়িতে আসার সাহস পেত না| সময়ের সাথে কতকিছু বদলে যায়| নয়তো যেই নাইম ভাইয়া ছিল তার ছেলেবেলার খেলার সাথী তাকে রোয়েনার বাইরের মানুষ কেন মনে হবে?
শাওন চলে যাবার পরে নাঈম বেশ কয়েক ঘণ্টার জন্য উধাও হয়ে গেল|দোতলার একটা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো| টেনশনে পড়লে তার প্রিয় বন্ধু সিগারেট| একের পর এক সিগারেট ধরাচ্ছে| এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুম দিলো|
রাতের খাবার টেবিলে সবাই খুব হাসি খুশি| রোয়েনা আর নেহালের ধারণা বড় ভাইয়া বাড়ি বিল্ডারকে দেবে না| একসাথে বসে হাসিমুখে রাতের খাবার খাচ্ছে সবাই|
“খুব ঘুমিয়েছি আজকে| এমনিতে দুপুরে ঘুমাই না আমি|”
“তুমি বোধ হয় টায়ার্ড ছিলে ভাইয়া”, নেহাল বলল|
“হ্যাঁ| তা ছিলাম| আসলে বড় সমস্যা হচ্ছে আমি ঠিকমত ঘুমাই না| বহুদিন পর মন ভরে ঘুমালাম|”
“মন ভরে ঘুমিয়েছ| এবার পেট ভরে খাও|”, একথা বলে নাইমের প্লেটে খাবার তুলে দিলো রোয়েনা|
“আসলে শাওন আমাদের চমৎকার একটা প্রস্তাব দিয়েছে| সে এই বাড়ি ভেঙে একটা এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স তুলতে চায়| আমাদের সবার একটা করে ফ্লাট হবে| আর ফ্ল্যাটগুলোর স্কয়ার ফিট ভালো হবে| আমরা আরামে থাকতে পারব| সে বলেছে এই জমির বদলে সে আমাদের পঁয়ত্রিশ ভাগ ফ্ল্যাট দেবে| বাকিটা ও নেবে| নীচতলায় গ্যারেজ হবে| বাড়ির সিকিউরিটি গার্ডের থাকার ঘর হবে|”
নেহাল বলল, “ভাইয়া তুমি কি ঠিক ঠাক ভেবে দেখেছো? কারণ এই জমির মালিকানা আমাদের থাকবে না| তাছাড়া পঁয়ত্রিশ শতাংশ কেমন হিসাব?”
“তাহলে তুমি একজন বিল্ডার নিয়ে এস নেহাল|”
রোয়েনা বলল, “না| সেই কথা হচ্ছে না| তবে আমি শুনেছি ফ্ল্যাটের সংখ্যা অনুযায়ী অর্ধেক রাখেন মালিক আর বাকি অর্ধেক বিল্ডার| এই খানে একটা খটকা আছে|”
নাইম বলল, “তোমাদের কি ধারণা আমার শাওনকে এই বাড়ি ভেঙে এপার্টমেন্ট করতে দিয়ে খুব লাভ হচ্ছে? লাভ আমার একার হচ্ছে না আমাদের সবার হচ্ছে|”
যেই কথা নাইম কাউকে বলতে পারলো না তা হচ্ছে তার স্ত্রী কানাডার আইন অনুযায়ী অর্ধেক সম্পত্তি দাবি করেছে| বাড়ির অর্ধেক মালিকানা তাকে দিয়ে দিতে হলে বাড়ি বিক্রি করতে হবে| নাইম কানাডার বাড়ি রক্ষা করতে মরিয়া হয়েই ˆপতৃক সম্পত্তি বিল্ডারকে লিখে দিতে চাচ্ছে| বিনিময়ে বিল্ডার এক কোটি টাকা বায়নার সময় দেবেন| সেই টাকার খবর নাইম তার চাচাতো ভাইবোন আর ফুপুকে দিতে চাচ্ছে না| এই টাকা হাতে পেলে তার কানাডার বাড়ি রক্ষা পাবে|
রোয়েনা বলল, “ভাইয়া যেহেতু আমরা একমত হতে পারছি না আমার মনে হয় এই মুহূর্তে তুমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যেও না| এর চেয়ে বরং বাড়িটা আমরা রাখি| যার যেমন দরকার একটা করে ফ্ল্যাট করে নিক| ফাউন্ডেশন তো আছেই|”
“বোকার মত কথা| ইমোশন দিয়ে বিজনেস ডিসিশন নেয়াটা বোকামি|”
“এটা বিজনেস না বরং পরিবারের কথা আসছে|”
“এই বাড়ি নিয়ে তোমার এতো মাথা ব্যথা কবে থেকে? তুমি তো গত দশ বছরে আসোনি এখানে|”
“আমার বাবার মৃত্যুর পরে আমার দাদাবাড়ি এখন আমার বাবার বাড়ি| তুমি একটা কথা বলতো সেই বাড়ি আমি অন্যের হাতে কীভাবে ছেড়ে দেই?”
নাইম এবারে উত্তেজিত হয়ে বলল , “এই জন্যেই তোমাদের দিয়ে কিছু হবে না| সেকেলে চিন্তা ভাবনা নিয়ে পরে আছো| আমার কী? আমি তো সবার ভালোর কথা ভেবেই বলেছিলাম|”
“এই বাড়িটা বিক্রি হচ্ছে না নাইম ভাইয়া”, দৃঢ়ভাবে কথাটা বলল রোয়েনা| এরপরে যোগ করল, “এই বাড়ির কোনায় কোনায় আমাদের স্মৃতি আছে| তার চেয়েও বড় কথা আমার যে বোনটি অকালে মারা গেছে তার মৃত্যু এই বাড়িতে হয়েছে| আমি এই বাড়ি বিক্রি করতে দেব না| প্রয়োজনে তুমি তোমার অংশ আমার কাছে বিক্রি করে দাও| আমি টাকা দিয়ে দিচ্ছি|”
নাইমকে কেমন জবুথবু দেখায়| নিজের স্বার্থপরতার কথা মনে হয়ে শিউরে ওঠে সে| আসলেই তো সোহানাকে কী করে ভুলে গেল সে? সোহানা তার খুব নেওটা ছিল| পুরোনো বাড়ির ঝুল বারান্দায়, ছাদে কত জায়গায় আছে সোহানার স্মৃতি| জন্ম থেকেই হার্টের একটা ত্রুটি ছিল সোহানার| চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে করতেই সে এই বাড়িতেই মারা গিয়েছিল| ইট-পাথরের ফাঁকে জড়িয়ে আছে দীর্ঘশ্বাস| ছাদের রেলিং এ ছুঁয়ে যায় বৃষ্টি| কড়ি বর্গার ফাঁকে জমে থাকে স্মৃতি| চেনা দুঃখ চেনা সুখ দিয়ে লেখা এক জীবন্ত দিনলিপি যেন নিষ্প্রাণ এই বাড়ি|
***

বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬
মফস্বলের শীতের সকাল| গাছের পাতার ওপরে যেন কেউ মুঠো মুঠো আবিরের মতো ছড়িয়ে দিয়েছে সোনারোদ| আর্তনাদের মতো শব্দ করে খুলে যায় মূল ফটকের দরজা| বহুদিন বোধ হয় কব্জায় তেল দেয়া হয়নি| রোয়েনা কপালের ওপর থেকে চুল সরিয়ে নেয়| সারারাত রেল ভ্রমণের ক্লান্তি তার চোখে| তবুও নির্ঘুম চোখে একবার তিনতলা বাড়ির মন ভরে দেখে নেয়| এবাড়িতে শেষবার যখন এসেছিল তখন বয়স ছিল ষোলো| পেয়ারা গাছে উঠে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতো| তার চাচাতো ভাই ডাকতো শেওড়া গাছের পেত্নী| সে কথা মনে পড়তেই ফিক করে হেসে ফেলল রোয়েনা|
সে পেয়ারা গাছের ওপরে থেকেই পাল্টা জবাব দিতো ‘হয়নি| বলো পেয়ারা গাছের পেত্নী|’
এখন গাছে চড়তে গেলে নির্ঘাত কোমর ভাঙবে| দশ বছর বাদে গাছটাকে দেখা যাচ্ছে না| পেয়ারা গাছ আর নেই| তবে করমচা গাছটা ঠিকঠাক চিনে ফেলল| দাদি করমচার একটা জেলি বানাতেন| হাস্নাহেনা গাছটার কাছে গিয়ে মন বিষণ্ন হয়ে গেল| সৌরভ ছড়ানো গাছটা কেমন নিষ্প্রাণ| এমনই হয়; এমনই হবার কথা| এই বাড়িতে এখন তেমন কেউ থাকেন না| এই বাড়িটা তার প্রাণ হারিয়েছে|
দোতলার বারান্দা থেকে রুবিনা চাচী চেঁচিয়ে ডাকলেন, “বাবু তুমি কখন এলে?”
একথা বলেই তিনি সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন| রুবিনা চাচী একমাত্র মানুষ যিনি এখনো তাকে বাবু বলে ডাকে| কেন ডাকে সে এক বিরাট রহস্য| তার বাবা-মা কখনোই তাকে বাবু বলে ডাকেনি| ব্যতিক্রম রুবিনা চাচী|
চাচী সিঁড়ি দিয়ে নেমে হাপাচ্ছেন| “একটা খবর দিয়ে আসতে হয় না?”
“যা বাবা| তুমিই তো বলো নিজের বাড়িতে আসতে হলে বুঝি খবর দিতে হয়|”
রুবিনা চাচী হেসে ফেললেন| “এখন ওপরে চলো| তোমাকে নাস্তা খেতে দেই|”
“এক কাপ কড়া লিকারের চা দেবে| নাস্তা খাবো| তারপরে ঘড়ি ধরে তিন ঘন্টা ঘুমাবো|”
“আমি গিজার অন করছি| পানি গরম হলেই প্রথমে গোসল করবে| তারপরে নাস্তা| অবেলায় লম্বা ঘুম দিলে রাত্রে ঘুমাতে পারবে না| গোসল করলেই তোমার ক্লান্তি কেটে যাবে|”
কথাগুলো অধিকারের সুরেই বললেন রুবিনা| রোয়েনা ভাবল শেষ কবে কে তাকে এমন অধিকারের সুরে কথা বলেছে? মনে পড়ল না|
সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই দোতলার বারান্দায় চোখ গেল| একটা দোলনা ঝুলতো এখানে| ইংরেজিতে বলে হ্যামক|এমন দোলনা| তখন ও বারান্দার কাজ শেষ হয়নি| গ্রিল দেয়া হয়েছে; তবে প্লাস্টারবিহীন ইট দেখা যেত পাঁচিলে| অবচেতনেই রোয়েনা তার চিবুকে হাত দিলো| কতবার দোলনা চড়তে গিয়ে পা ফস্কে সামনের পাঁচিলে চিবুক কেটে গেছে| দাগটা রয়ে গেছে এখনও|
বারান্দা দিয়ে নিচে তাকালে ভেতর আঙিনার উঠোন দেখা যায়| ঠিক এই জায়গাতেই ছোট ফুপার চল্লিশার আয়োজন হয়েছিল| অদ্ভুত দুর্ঘটনায় মারা গেলেন|পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকরির সুবাদে গিয়েছিলেন সমতলের মানুষ| গাড়ি দুর্ঘটনায় খাদে পরল| রহমত ফুপা গাড়ি থেকে লাফ দিলেন|পাথরে মাথা ঠুকে মৃত্যু হলো|গাড়ির বাকি যাত্রীরা রইলেন অক্ষত| দাদা খুব মন খারাপ করেছিলেন| ফুপু নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন বলে দাদা কোনোদিনই রহমত ফুপাকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেননি| অথচ রহমত ফুপার মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছিলেন দাদা| এর পরে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেলেন| জাঁদরেল মানুষটি কেমন মিইয়ে গেলেন| এবাড়ির কোনায় কোনায় আছে চেনা দুঃখ চেনা সুখ|
দুপুরের খাবারের পরে আর চোখ খোলা রাখতে পারলো না রোয়েনা| চাচির ঘরে মৃদু শব্দে ফ্যান ঘুরছে| কিছুক্ষণ ফ্যানের পাখার নড়াচড়া দেখে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল|
ঘুম ভাঙার পরে অবাক হয়ে গেল রোয়েনা| কতক্ষণ ঘুমিয়েছে সে? পরদিন ভোরে উঠেছে?
“চাচী| সকাল হয়ে গেল তুমি আমাকে রাতে ডাকোনি?”
রুবিনা হেসে ফেললেন, “দূর বোকা| এখন সন্ধ্যে নামছে| বাইরে যা দেখছ তা ভোরের আলো নয়|”
রোয়েনা হাত মুখ ধুয়ে টেবিলে বসল| লেবু চা নিয়ে এলো রুবিনা|
“একটা মজার জিনিস খেয়াল করেছ তোমার আর আমার নাম একরকম| র দিয়ে শুরু আর ন দিয়ে শেষ| মা-মেয়ের নাম হলে মানাতো|”
রোয়েনা হেসে ফেলল| “তাহলে নেহালকে এখুনি ফোন করে বলে দিচ্ছি| তুমি আমাকে বেশি ভালোবাসো|”
রুবিনা একটু গম্ভীর হয়ে বললেন| “তোমার নাইমের সাথে কথা হয়|”
“নাহ| হয় না| কেন বলতো?”
“তুমি শুনেছ বোধ হয় নাইম ও আসছে পরশুদিন|”
“ওর খবর কী বলতো?”
“এতো করে বললাম দেখেশুনে বিয়ে করতে| শুনেছ বোধ হয় ওর বৌ ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছে|”
“এমন ও তো হতে পারে নাইম ভাইয়ার দোষ| শুধু শুধু মেয়েটাকে দোষারোপ করে লাভ আছে?”
“সমস্যা তো দুজনেরই ছিল| মেয়েটা জেদি| আর নাইম কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর| যাই হোক বহু বছর পরে সেও বাড়িতে আসছে|”
“ভালোই তো হলো| নেহালকেও ডাকো| বেশ একটা উৎসব এর মতো পরিবেশ হবে|”
রুবিনা অবাক হয়ে তাকালেন| এই বাড়ির মানুষগুলো অদ্ভুত| কোন ধাতুতে গড়া কে জানে? বাড়ির পরিবেশ যাই হোক একে অন্তত উৎসব বলা যায় না| তিনি যথাসম্ভব বিরক্তি চেপে বললেন, “নেহাল ও কাল সকালেই আসবে| তোমাদের সবাইকে একসাথে পাওয়াই তো মুশকিল|”
এই বাড়ির মানুষ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে ভয় পায়| এই মুহূর্তে রুবিনার মনে হচ্ছে রোয়েনা ও এই পরিবারের বাকি সদস্যদের মতো এস্কেপিস্ট|
পরদিন বিকেলবেলা ছাদে হাঁটতে গেল রোয়েনার| এই বাড়ির রোদের রং কি কমলা? ছাদে দাঁড়িয়ে ভাবছিল| গন্ধরাজের সৌরভে মঁ মঁ করছে চারদিক| রোয়েনা বুক ভরে ফুলের গন্ধ নিলো| এমন একটা গাছ সে লাগিয়েছিল বটে| তবে তার হাতে বেশিদিন বাঁচেনি| ভোরবেলায় ছাদে দাঁড়িয়ে পুরোনো কথা ভাবছিল| ছাদের সিঁড়িতে অন্য কারো পায়ের শব্দ পাওয়া গেল| রুবিনা চাচী হয়তো চা নিয়ে এসেছেন|
রোয়েনা নাইম কে দেখে সত্যি অবাক হয়ে গেল| সে জানতো নাইম আজকে আসবে| তবুও অবাক হয়ে গেল| মাথার চুল কমে এসেছে| স্বাস্থ্য কেমন ভেঙে গেছে| দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে কেমন আড়ষ্টতা| এমন বয়স্ক হয়ে গেছে এই কয়েক বছরে?
ছোটবেলায় ভাইয়া দেখতে এমন ছিল না| হাসি-খুশি ছিল| বন্ধুবান্ধবের অভাব ছিল না| তাকে দেখে কেমন পরাজিত মনে হচ্ছে| রোয়েনা হাসিমুখে এগিয়ে গেলো|
“কেমন আছো?”
“আছি ভালোই| তুমি ভালো?”
“অনেক বছর পরে তোমাকে দেখলাম ভাইয়া|”
“হ্যাঁ, বছর পাঁচেক তো হবেই|”
“তা হবে|”
“তুমি অনেকদিন পরে বাড়ি আসলে তাই না?”
“হ্যাঁ| আর ঢাকায় তো সবার সাথে দেখায় হয়ে যায়| কষ্ট করে আর জার্নি করে আস্তে ইচ্ছে করে না ভাইয়া|”
“আমি অবশ্য ভাবতাম তোমার এই বাড়ির ওপরে তেমন টান নেই|”
“কেন ভেবেছো?”
“না মানে এমনি আর কি| ভেবেছি তোমার হয়তো এখানে টান নেই| হয়তো তুমি এখানে বিলং করো না|”
রোয়েনা হেসে ফেলল, “কারণ তুমি আমাকে চেনো না| আমার সম্পর্কে তোমার একটা মন গড়া ধারণা আছে যেটা একেবারেই ভুল| আমি নিচে যাচ্ছি| নাস্তা করতে যাবো| তুমিও এস|”
“না| তুমি যাও| আমি কিছুক্ষণ ছাদে একা থাকবো|”
নিচতলায় নামতেই রুবিনা চাচির মুখ ভার হয়ে আছে লক্ষ্য করল রোয়েনা|
“নাইমের সাথে দেখা হয়েছে?”
“হ্যাঁ| ভাইয়া না আগামীকাল আসবে শুনেছিলাম|”
“আমিও তো তেমনটাই জানতাম| এখন এসো আমি টেবিলে নাস্তা দিচ্ছি খেতে বস|”
“একসাথেই বসি সবাই?”
“ঠিক আছে|”
খাবার টেবিলে বসে যেন পুরোনো দিনের আমেজ ফিরে পেলো রোয়েনা| ফুলকো লুচি ভাজছেন চাচী| ডুবোতেলে টুপটুপে লুচি ফুলেফেঁপে উঠছে| এবাড়ির মেয়েরা চুলার পাশে দাঁড়িয়ে পরিশ্রম করে; ছেলেরা হাত গুটিয়ে বসে থাকে| রোয়েনা তাই চাচীকে সাহায্য করতে উঠে গেল| তার কাছে যদিও কেউ রান্নাঘরের কাজের সাহায্যের আশা করে বসে নেই তবুও তার মনে হলো অনিয়মের চাকা ভাঙতে গেলে নিজে থেকেই উদ্যোগ নিতে হয়| রোয়েনা চাচির পাশে গিয়ে হাত লাগালো| সাদা রঙের বাটিতে বেড়ে দেয়া হলো ঘি দেয়া পাঁচমিশালি সবজি| সুজির হালুয়া থেকেও ঘি-এর সুঘ্রাণ ভেসে আসছে| রোয়েনা কয়েকটা ডিম ভাজি করল| নাইম ভাইয়া পোচ ডিম পছন্দ করত| কুসুম না ভেঙে অতি সাবধানে ডিম পোচ করল রোয়েনা| নেহাল গতরাতের ট্রেনেই ফিরেছে|
রোয়েনা সবার প্লেটে খাবার বেড়ে দিয়ে চাচিকেও জোর করে টেবিলে বসালো|
“চাচী কতদিন পরে পেট ভরে খেলাম|”
“আরেকটু নাও তো| তুমি তো ছেলে মানুষ এখনো খেতে পারো| আমাদের রোয়েনার তো ডায়েট কন্ট্রোল আছে| তোমার তো তেমন কিছু নেই|”
“আমার কোলেস্টেরল বেড়েছে চাচী| গরুর মাংস খাওয়া নিষেধ| আরো অনেক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ডাক্তার|”
“একদিন খেলে কিছুই হবে না বাবা|”
রোয়েনা কোনো কথা না বলে গোগ্রাসে খাচ্ছে|
দ্রুত খাওয়া শেষ করে রোয়েনা বলল, “চাচী খাবার খুব ভালো হয়েছে| আমার কাছে মুক্তোর মালা থাকলে আমি তোমার গলায় পরিয়ে দিতাম| আফসোস মুক্তার মালা নেই| তবে ঢাকা ফিরেই আমি তোমাকে একটা মুক্তার মালা উপহার দেব| আমি সবার জন্য চা বানাচ্ছি|”
রোয়েনার বেশিক্ষন খাবার টেবিলে বসে থাকতে ভালো লাগছিলো না| কারণ কিছুক্ষণ পরেই অস্বস্তিকর আলোচনা শুরু হবে| এই সকালের নাস্তার বাহারি আয়োজন আর কড়া লিকারের চা সবই যেন সেই আলোচনা থেকে মনোযোগ সরাতেই করা হয়েছে|
“নেহালের পড়াশোনা শেষ করে প্ল্যান কী?”
“তেমন কোনো প্ল্যান নেই ভাইয়া| আমি ঠিক করেছি চাকরি শুরু করব| যেখানে ইন্টার্নশিপ করেছিলাম সেই ব্যাংক থেকেই একটা অফার আছে|”
“বাহ| চমৎকার| তবে আমি অবশ্য স্বাধীন মানুষ| অন্যের চাকরি করাটা ঠিক পোষায় না|”
“আমাদের পরিবারের ব্যবসা করে কেউ তেমন উন্নতি করতে পারেনি| একমাত্র দাদাকেই দেখেছি সফল ব্যবসায়ী| এজন্যেই ঠিক করেছি চাকরি করব|”
রোয়েনা এসে বসতেই নাইম বলল, “আমার এক বন্ধু আসবে আজকে বাড়িতে| তার নাম শাওন| এখানে রিয়েল এস্টেটের পুরোনো ব্যবসা আছে| ভাবছিলাম ওকে বাড়িটা একবার দেখাবো|”
“কেন?”
“দেখো এখন তো আমাদের পরিবার বড় হয়েছে| কোনো বিল্ডারকে দিয়ে বাড়িটা যদি ভেঙে একটা এপার্টমেন্ট বিল্ডিং হতো তাহলে সবাই আলাদা ভাবে থাকতে পারত|”
“বিল্ডারের কাছে বাড়ি দিয়ে দিলে জমির মালিকানা আমাদের হাতে থাকবে না ভাইয়া|”
“তুমি একটা ইমোশনের কথা বলেছ| দাদার আমল থেকে এই বাড়ির আমাদের| তবে বাস্তবতা ভিন্ন|”
নেহাল বলল, “ইমোশনের কথা না ভাইয়া| দাদা এই বাড়ির ফাউন্ডেশন করেছিলেন পাঁচ তলা| যাতে আমরা চাইলে এখানে একেকটা ফ্লোর নিজেরা করে নিয়ে থাকতে পারি| এই বাড়িতে তিনতলা অব্দি তো তোলাই আছে|”
নাইম কিছুক্ষন চুপ থেকে বলল, “শাওন আসুক| তারপরে আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেই|”
রোয়েনা ভাবলো একবার বলে এবাড়ির সব সিদ্ধান্ত তোমাকে কেন্দ্র করে হয়েছে| গ্রামের বাগানবাড়িতে বিক্রি হয়েছে তোমাকে বিদেশে পাঠাবার খরচ জোগার করতে| পড়াশোনা শেষ করে তোমার চাকরি করতে ইচ্ছে করেনি| তারপরে বাগান বিক্রি করে তোমার ব্যবসা করার অর্থ জোগাড় হয়েছে| এখন তোমার হাত থেকে বাড়িটাও রক্ষা পাবে না|
বিকেলবেলায় নাঈমের বন্ধু শাওন এলো| রোয়েনার শাওনকে দেখে মনে হলো তার চেহারা শেয়ালের মত| ধূর্ত মনে হবার কারণ আছে| রোয়েনার মনে হচ্ছে শাওন তাদেরকে ঠকাবে| শাওন পুরো বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখল| ডাইনিং টেবিলে বসে সবার সাথে কথা বলল| রোয়েনা পুরো সময় তাকে লক্ষ্য করল| শাওনের কথা বলার ভঙ্গি অদ্ভুত| আঞ্চলিক আর প্রমিত ভাষা মিলিয়ে জগাখিচুড়ি ভাষায় কথা বলে| যখন খেই হারিয়ে আঞ্চলিক ভঙ্গিতে কথা বলে মনে হয় কথার ট্রেন রেললাইন থেকে ছিটকে পরে| দাদা বেঁচে থাকলে এমন ধান্দাবাজ লোক কোনোদিন ভিতরবাড়িতে আসার সাহস পেত না| সময়ের সাথে কতকিছু বদলে যায়| নয়তো যেই নাইম ভাইয়া ছিল তার ছেলেবেলার খেলার সাথী তাকে রোয়েনার বাইরের মানুষ কেন মনে হবে?
শাওন চলে যাবার পরে নাঈম বেশ কয়েক ঘণ্টার জন্য উধাও হয়ে গেল|দোতলার একটা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো| টেনশনে পড়লে তার প্রিয় বন্ধু সিগারেট| একের পর এক সিগারেট ধরাচ্ছে| এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুম দিলো|
রাতের খাবার টেবিলে সবাই খুব হাসি খুশি| রোয়েনা আর নেহালের ধারণা বড় ভাইয়া বাড়ি বিল্ডারকে দেবে না| একসাথে বসে হাসিমুখে রাতের খাবার খাচ্ছে সবাই|
“খুব ঘুমিয়েছি আজকে| এমনিতে দুপুরে ঘুমাই না আমি|”
“তুমি বোধ হয় টায়ার্ড ছিলে ভাইয়া”, নেহাল বলল|
“হ্যাঁ| তা ছিলাম| আসলে বড় সমস্যা হচ্ছে আমি ঠিকমত ঘুমাই না| বহুদিন পর মন ভরে ঘুমালাম|”
“মন ভরে ঘুমিয়েছ| এবার পেট ভরে খাও|”, একথা বলে নাইমের প্লেটে খাবার তুলে দিলো রোয়েনা|
“আসলে শাওন আমাদের চমৎকার একটা প্রস্তাব দিয়েছে| সে এই বাড়ি ভেঙে একটা এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স তুলতে চায়| আমাদের সবার একটা করে ফ্লাট হবে| আর ফ্ল্যাটগুলোর স্কয়ার ফিট ভালো হবে| আমরা আরামে থাকতে পারব| সে বলেছে এই জমির বদলে সে আমাদের পঁয়ত্রিশ ভাগ ফ্ল্যাট দেবে| বাকিটা ও নেবে| নীচতলায় গ্যারেজ হবে| বাড়ির সিকিউরিটি গার্ডের থাকার ঘর হবে|”
নেহাল বলল, “ভাইয়া তুমি কি ঠিক ঠাক ভেবে দেখেছো? কারণ এই জমির মালিকানা আমাদের থাকবে না| তাছাড়া পঁয়ত্রিশ শতাংশ কেমন হিসাব?”
“তাহলে তুমি একজন বিল্ডার নিয়ে এস নেহাল|”
রোয়েনা বলল, “না| সেই কথা হচ্ছে না| তবে আমি শুনেছি ফ্ল্যাটের সংখ্যা অনুযায়ী অর্ধেক রাখেন মালিক আর বাকি অর্ধেক বিল্ডার| এই খানে একটা খটকা আছে|”
নাইম বলল, “তোমাদের কি ধারণা আমার শাওনকে এই বাড়ি ভেঙে এপার্টমেন্ট করতে দিয়ে খুব লাভ হচ্ছে? লাভ আমার একার হচ্ছে না আমাদের সবার হচ্ছে|”
যেই কথা নাইম কাউকে বলতে পারলো না তা হচ্ছে তার স্ত্রী কানাডার আইন অনুযায়ী অর্ধেক সম্পত্তি দাবি করেছে| বাড়ির অর্ধেক মালিকানা তাকে দিয়ে দিতে হলে বাড়ি বিক্রি করতে হবে| নাইম কানাডার বাড়ি রক্ষা করতে মরিয়া হয়েই ˆপতৃক সম্পত্তি বিল্ডারকে লিখে দিতে চাচ্ছে| বিনিময়ে বিল্ডার এক কোটি টাকা বায়নার সময় দেবেন| সেই টাকার খবর নাইম তার চাচাতো ভাইবোন আর ফুপুকে দিতে চাচ্ছে না| এই টাকা হাতে পেলে তার কানাডার বাড়ি রক্ষা পাবে|
রোয়েনা বলল, “ভাইয়া যেহেতু আমরা একমত হতে পারছি না আমার মনে হয় এই মুহূর্তে তুমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যেও না| এর চেয়ে বরং বাড়িটা আমরা রাখি| যার যেমন দরকার একটা করে ফ্ল্যাট করে নিক| ফাউন্ডেশন তো আছেই|”
“বোকার মত কথা| ইমোশন দিয়ে বিজনেস ডিসিশন নেয়াটা বোকামি|”
“এটা বিজনেস না বরং পরিবারের কথা আসছে|”
“এই বাড়ি নিয়ে তোমার এতো মাথা ব্যথা কবে থেকে? তুমি তো গত দশ বছরে আসোনি এখানে|”
“আমার বাবার মৃত্যুর পরে আমার দাদাবাড়ি এখন আমার বাবার বাড়ি| তুমি একটা কথা বলতো সেই বাড়ি আমি অন্যের হাতে কীভাবে ছেড়ে দেই?”
নাইম এবারে উত্তেজিত হয়ে বলল , “এই জন্যেই তোমাদের দিয়ে কিছু হবে না| সেকেলে চিন্তা ভাবনা নিয়ে পরে আছো| আমার কী? আমি তো সবার ভালোর কথা ভেবেই বলেছিলাম|”
“এই বাড়িটা বিক্রি হচ্ছে না নাইম ভাইয়া”, দৃঢ়ভাবে কথাটা বলল রোয়েনা| এরপরে যোগ করল, “এই বাড়ির কোনায় কোনায় আমাদের স্মৃতি আছে| তার চেয়েও বড় কথা আমার যে বোনটি অকালে মারা গেছে তার মৃত্যু এই বাড়িতে হয়েছে| আমি এই বাড়ি বিক্রি করতে দেব না| প্রয়োজনে তুমি তোমার অংশ আমার কাছে বিক্রি করে দাও| আমি টাকা দিয়ে দিচ্ছি|”
নাইমকে কেমন জবুথবু দেখায়| নিজের স্বার্থপরতার কথা মনে হয়ে শিউরে ওঠে সে| আসলেই তো সোহানাকে কী করে ভুলে গেল সে? সোহানা তার খুব নেওটা ছিল| পুরোনো বাড়ির ঝুল বারান্দায়, ছাদে কত জায়গায় আছে সোহানার স্মৃতি| জন্ম থেকেই হার্টের একটা ত্রুটি ছিল সোহানার| চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে করতেই সে এই বাড়িতেই মারা গিয়েছিল| ইট-পাথরের ফাঁকে জড়িয়ে আছে দীর্ঘশ্বাস| ছাদের রেলিং এ ছুঁয়ে যায় বৃষ্টি| কড়ি বর্গার ফাঁকে জমে থাকে স্মৃতি| চেনা দুঃখ চেনা সুখ দিয়ে লেখা এক জীবন্ত দিনলিপি যেন নিষ্প্রাণ এই বাড়ি|
***

আপনার মতামত লিখুন