বউ
নির্মলেন্দু গুণ
কে কবে বলেছে হবে না? হবে, বউ থেকে হবে|
একদিন আমিও বলেছি, ওসবে হবে না| বাজে কথা|
আজ বলি, হবে, বউ থেকে হবে| বউ থেকে হয়|
মানুষের পুনর্জন্ম, প্রেমের কবিতা, কী সে নয়?
গোলাপ শেফালি জুঁই, ভোরের আকাশে প্রজাপতি,
ভালোবাসা, ভাগ্য, ভাড়া বাড়ি ইতিপূর্বে এভাবে মিশে নি|
ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, দুইজন্ম এবার মিশেছে| দেখা যাক|
হতচ্ছাড়া ব্যর্থ প্রেম, গাঁজা, মদ, ˆনঃসঙ্গ আমার
ভালবেসে হে তরুণ তোমাকে দিলাম, তুমি নাও|
যদি কোনোদিন বড় কবি হও, আমার সাফল্য কতদূর
একদিন তুমি তা বুঝিবে| একদিন তুমিও বুঝিবে|
আমি কতো ভালোবাসা দু’পায়ে মাড়িয়ে, অবশেষে
কল্পনার মেঘলোক ছেড়ে পৌঁছেছি বাস্তব মেঘে|
আজরাত বৃষ্টি হবে মানুষের চিরকাম্য দাবির ভিতরে|
তার শয্যাপাশে আমার হয়েছে স্থান, মুখোমুখি,
অনায়াসে আমি তা বলি না— বলে যারা জানে দূর থেকে|
আমি খুব কাছে থেকে জানি, বিনিময়ে আমাকে হয়েছে দিতে
জীবনের নানা মূল্যে কেনা বিশ্বখানি তার হাতে তুলে|
অনায়াসে আমিও পারি নি| ক্রমে ক্রমে বিভিন্ন কিস্তিতে
আমি তা দিয়েছি, ফুলে ফুলে ভালবেসে যেভাবে প্রেমিক|
প্রথমে আত্মার দ্যুতি, তারপর তাকে ঘিরে মুগ্ধ আনাগোনা|
স্বর্গের সাজানো বাগানে পদস্পর্শে জ্বলে গেছি দূরে,
তারপর পেয়েছি বিশ্রাম| আজরাতে সম্পর্কের ভিতরে এসেছি|
সবাই মিলবে এসে মৌনমিহি শিল্পে অতঃপর,
তোমার প্রদত্ত দানে পূর্ণ হবে পৃথিবী আমার|
অনুর্বর বর্ষাকথা
জাহিদ হায়দার
বৃষ্টি যখন তুলনামূলক,
শ্রেণির প্রকাশ প্রশ্নমাফিক
হেতুতে নয় ব্যক্তিগত|
পারস্পরিক বিভাজনে
ক্ষয়িষ্ণু যোগ্য প্রকাশ|
আমার যাপন তৃষ্ণাকাতর,
সময়ক্ষত|
বর্ষা নতুন, পুরনো আষাঢ়;
বাঁচার গল্প বজ্রপাতে——
সংঘাতে অন্য ধারার|
তোমার রৌদ্রে শিল্পরূপক
জাফরিকাটা মেঘসামাজিক|
অনুর্বর বর্ষাকথা,
সঙ্গদৃশ্য পচনপ্রধান|
আমার শস্যে ব্যথার সূচক,
সংগ্রাহক কেবল জাহিদ|
ক্রমাগত ধারাকসম
কৃপায় কহে,
অনুগ্রহে বৃষ্টিঋণ
জন্যে তোমার
আপাতত ক্ষতিপূরণ|
ধনুমেঘে শৈশব
আবদুর রাজ্জাক
অমর এক বরষা বিকেল| ধনুমেঘ| করতলে বয়ে যাওয়া নদী,
মেঘের ভিতরের নিদ্রিত জল, আর সেই জলের প্রাণময় হাসি
যেন— আমার মেঘালিত শৈশব| ওই নিভৃতি
আমার মেঘমুদ্রিত বালিকা যাকে শৈশবে মেঘের মতো দেখেছি,
এবং এখনো প্রায়শ তাকে দেখে থাকি|
শৈশবের সব ভালোবাসা সঞ্চিত রয়েছে ধনুমেঘে, তার ঈষৎ
বাঁকাহাসি—— তার এই হাসির কোনো দোষ দেয়া যায় না|
আমাদের মুদ্রাদোষ—— আমরা দোষ দেখি না কখনো,
সকল দোষ মহান প্রভুকেই দিয়ে থাকি, দোষারোপ করে থাকি|
ভিতরের কেউ কেউ কিছু না-ভেবেই বলে বসে:
‘যা তুমি শুনেছো: সত্য শুনেছো|’
পাহাড়ের পাদদেশে সন্ধ্যা নামে নিত্যদিনের মতো, আর
পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে থাকা শৈশবী ইচ্ছেগুলো ভেঙে ভেঙে
পড়ে আর—— দিনে দিনে সেইসব জনশ্রুতিও
হয়ে ওঠে লোকালয়ে|
আমার কাছে শৈশবের কোনো কিছু পরিষ্কার নয়, শুধু অনুমেঘের
বণির্ত নির্মাণ যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে ওঠে| তখন—
শুধুই মনে হয় আমার শৈশব আমাকে কখনই ছেড়ে যেতে পারেনি|
বেলি কিংবা নগরাকে
খালেদ হামিদী
উপনিবেশের প্রবক্তাদের হাতে লুণ্ঠিত তবে?
কীভাবে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাওয়ার মধ্য পথে
নাম নিলে তুমি আরব্য জেসমিন?
বিশেষ্য কেন যুক্ত হয়নি তোমার গন্ধে প্রখ্যাত পারসিয়া
ভাবতে না পেরে এদিকে কোথাও মল্লিকাবনে দোলে
কার হিয়া কেউ জানার আগেই অঝোরে বৃষ্টি নামে|
অপু-দুর্গার সাহচর্যের আনন্দ থেকে ছুটে
কে তবে মুষলধারে বর্ষণ মাথায়, খুঁজতে আসে
হারানো বাগানে বেলির পাপড়ি গলির শহরে একা?
ফিলিপিনা-চুলে সাম্পাগুইতা,
কোন দেশে তবে পুষ্পা-বাংসা
তোয়াক্কাহীন সন্ধানীজন শ্রান্তিতে পড়ে নুয়ে|
নগরা তোমার স্মৃতির সুরভি
তবুও অটুট ভেজা রাত্রি বা
প্লাবিত দিবস যা-ই নিয়ে যাক ধুয়ে|
বরিষণ প্রতীক্ষায়
মাহফুজ আল-হোসেন
দাবদাহে দগ্ধ পৃথিবী
দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেন যে তাকিয়ে আছে
নিরাসক্ত নির্মম আকাশের দিকে;
আর স্রোতস্বিনীই-বা কেন ভুলে গেছে
পোড়া চোখে পরে নিতে
ভালবাসার সোহাগী কাজল|
স্বর্ণকেশী আউশের শিরায় শিরায়
কেন বলো জমে আছে তৃষ্ণার নীল শ্লোক?
বাউরি বাতাসের উত্তরীয় পরেও
কেনইবা আজ নির্বাক নিথর মেঘদূত?
যক্ষপ্রিয়াও সাতপাঁচ না জানি কী ভেবে
তার কানে এখনও পাঠায়নি সন্দেশ|
অথচ কদমের মাতাল গন্ধে মূর্চ্ছা যাচ্ছে
প্রতীক্ষার প্রতিটি ক্ষণ;
আর নীলাম্বরীর দিঘল বুক চিরে
জানি না কবে হবে অবিরাম স্বস্তি-বরিষণ|
সবকিছু পাল্টাতে থাকে
চয়ন শায়েরী
চিরকালিক আবেদন বলে কিছু নেই
না প্রেম না সংসার
কি বর্ষা কি কবিতা
সবকিছু পাল্টাতে থাকে
পারিপার্শ্বিক রাষ্ট্রিক চাপে
উষ্ণায়ন উপেক্ষায় পাল্টায় ঋতুকন্যাদের সময়—
কেমনে পাল্টে যায় বর্ষার মতন
প্রেমিকের হৃদয়;
উষ্ণায়নে আধমরা আবহাওয়ার
মন সারাক্ষণ উচাটন
প্রতিপক্ষ জল আর বায়ু—
জলবায়ু জানে পরিবর্তনের মানে
হৃদয় কি জানে
ঢলক আর অশ্রুঢলে পার্থক্য কত?
আষাঢ়ের কোনো-এক ঢলকের রাতে
দুঃখ সব ডানা ঝাপটায়
বিকেলের ঘরমুখো অবিরল কাকের ডানায়;
পথ খুঁজে ফেরে মন—
সারাক্ষণ
ঘরের ভিতরে মেকি ঘর বানিয়ে
মনের আকুতি হৃদয়ের ঘিঞ্জি গলিপথে
পথ হারায়—
আষাঢ়ের রাতে বৃষ্টিঝাঁপ জানালায়;
ঢলকের সহোদরা হৃদয়ের অশ্রুঢল
সংসারের জলবায়ু উপেক্ষা করে
চোখের তারায় তারায় সে-সংবাদ জানায়;
তুমুল বৃষ্টির রাতে নক্ষত্রের মুখ ঢেকে যায়
মানুষেরা পাল্টায়
মানুষী পাল্টে যায়—
অলঙ্ঘ্য অলীক বেদনায়|
আষাঢ়ে জৈষ্ঠ্যৈর কবিতা
মুজিব ইরম
ও আমার
দেশি ও বৈদেশি আম
মনে রেখো মধুমাসী বেদনা আমার...
ধলাদিয়া সড়কের পাশে
আমগুলো ভিজে ওঠে রোদে...
খিরসাপাতি আমের ভিড়ে
লখনা আমের রূপ চোখে লেগে থাকে
মনে গেঁথে থাকে...
এই আম পাকা দিনে
আমের আড়তে
কানসাট সাপাহার বাজারে বাজারে
আমগুলো কেনো এতো ডাকে...
বানেশ্বর আমের বাজারে
হাটেঘাটে
বাগানে বাগানে
কাঁচাপাকা আমগুলো কেনো এতো ডাকে...
মেঘমল্লার
শেলী নাজ
নির্মম মধুর এই মিথ্যাচার, মোহঋতু এলে
ভুলি বিল্বপত্রভরা ভুল, শুষ্ক নদীর ক্রন্দন
অজস্র মড়ক, অঙ্গে যুগপৎ ক্ষত ও চন্দন
উথলে উঠছে দেখ, যেন এক সুদীর্ঘ সাহারা
আত্মঅগ্নি জ্বেলে বালিদের মন পোড়ানোর শেষে
শুষে নিচ্ছে মরুকান্না, সবুজাভ তামান্না ও তাথৈ
আমি ভারাক্রান্ত হই, নক্ষত্রে ও মরীচিকায়
তুমি চামড়ার নিচে রুয়ে দাও অগাধ সবুজ
ত্বক তুলে নাও চাবুকের তীব্র কষাঘাতে আর
তারপর তুমিই তো জাদুকর, অসুখনাশক
মস্ত কবিরাজ, আমি কবিতার জলভাঁজ খুলে
নিতে থাকি তারামাছ, দেহে সেসব মেঘমল্লার
তুমি কি শুনছ আজ, বৃষ্টিবিহারিনী রেণুদের
ফুলেফেঁপে ওঠা দীর্ঘ গর্ভ বিকাশের চিৎকার?
বৃষ্টি পড়ে
মাসুদার রহমান
মৃদু বৃষ্টি পড়ে, তোমার প্রেমের মতো মৃদু বৃষ্টির ভেতরে
ছাতাছাড়া হেঁটে গিয়ে
বুঝতে চেষ্টা করি, সামান্যও ভিজেছি কি আমি!
অস্পষ্ট সুখের মতো বাঁশি বাজে, নাকি তীব্র ব্যথার মতো
বাঁশি বাজে
শুধু এই প্রশ্নই বাজছে বাঁশিতে, উত্তর বাজে না কখনো
তোমার দাঁতের মতো উজ্জ্বল হোয়াইটওয়াশ করা
লেকপাড়ের বাড়ি
লেকের এপাড়ে বসে ওপারের বাড়িটিকে দেখি
লেকের জলের ভেতর বাড়িটির ছায়াকেও দেখি
ছায়াটিই ঢেউয়ে ভেঙে এপারে আমার কাছে আসে
মনে হয় বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টিতে ভিজি না কখনো
তোমার প্রেমের মতো দূরের দিগন্ত, সেখানে তোমার প্রেম
তাকে ছুঁতে পাবো না কখনো!
আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে
শাহেদ কায়েস
সকালের জানালায় ঝুলে আছে ভেজা আলোর পর্দা
দূরের আকাশ যেন কাঁচা নীলের ওপর ধূসর জলরং
মেঘেরা ধীরে-ধীরে ঘাসের গন্ধ মেখে নামছে...
বাতাসে কে যেন খুলে দিয়েছে পুরোনো স্মৃতির সিন্দুক!
পাতার ফাঁকে-ফাঁকে নিঃশব্দ হাওয়া মৃদু বাঁশি বাজায়
বিদ্যুৎ ক্ষণিকের সাদা সারস হয়ে উড়ে যায়
আজ আমি বৃষ্টির স্পর্শ নিতে আসিনি—
শুধু ভিজে যাওয়ার গোপন ইচ্ছাটুকু সঙ্গে এনেছি|
পঙ্খিরাজ নদীর মতো কোনো এক অদেখা স্রোত
আজ আমার ভেতরে জেগে উঠেছে
যেন পানামের নির্জন দুপুর...
মনের গভীরে দুলে ওঠে অচেনা এক শূন্যতা|
কদমফুলের ভেজা গন্ধে জেগে ওঠে বিস্মৃত ঋতুস্মৃতি
মেঘ, শুধু আর্দ্র এক ইশারা হয়ে থেকো
না হলে দিকচিহ্ন মুছে যাবে জলরেখায়
হারিয়ে যাবো অচেনা কোনো বর্ষার নীরব পংক্তিতে|
গগনের ভিটেতে আষাঢ়ের বৃষ্টিতে
রকিবুল হাসান
প্রবল ঝড় বৃষ্টিতে আঁধার কুঠিবাড়ির সুদূর-সীমানা
খানিকটা পথ এসে গগনের উঠোনে দাঁড়াই
যে গগন জীবনের পথে পথে খুঁজে গেলো মনের মানুষ
তার উঠোনে দাঁড়াই মনের মানুষ বুকে বেঁধে|
মানকচুর পাতায় দুজনে কী ভীষণ একাত্ম
শরীরের ভেজাগন্ধে তোমার চুলেরা যেন শিল্পীর তুলিতে
আঁকা রেখা
একটু দূরে দাঁড়িয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ|
শীতে ভীষণ কাঁপছি| একটি শরীর হয়ে দুজনে দাঁড়িয়ে...
গগন তখনো ফেরেননি—
আষাঢ়ে ঝড়ে কোথায় গেলে পাবো তারে
তার ভিটেতে তখন আমরা দু’জন ডুবি মনের মানুষ|
আবার যখন বৃষ্টি এলো
কুমার দীপ
টিনের চালে ঘুঙুর বাজিয়ে,
পেয়ারার পাতায় রিমঝিম ছন্দ তুলে
উচ্ছল কিশোরীর মতো নাচতে নাচতে—
আবার এখানে বৃষ্টি এলো|
কিন্তু কোথাও যখন নিরীহ শিশুর রক্ত ঝরছে,
নারীর শরীর ঘিরে উল্লাস করছে— একদল পুরুষ,
মানুষ খুবলে খাচ্ছে— আরেকটি মানুষকে,
তখন—
তোকে নিয়ে কী লিখবো, বৃষ্টি?
কোন উপমায় ডাকবো, তোর নাম?
জানি—
কবির কলমের প্রতীক্ষায় থাকিস তুই,
কিন্তু আমি কালিদাস নই, আষাঢ়স্য প্রথমদিবস
আমার হৃদয়ে জাগাতে পারে না বিরহ;
রবীন্দ্রনাথও নই; অনন্ত শুভবোধে
জেগে থাকার অপার ক্ষমতা কোথায়?
মানুষের সীমাহীন ক্লেদ, অনন্ত ক্রূরতা
আর রক্তের নদীতে ভাসতে ভাসতে
হারিয়ে ফেলেছি ˆবঠা, গন্তব্যের প্রেম!
টিনের চালে ঘুঙুর বাজিয়ে,
পেয়ারা পাতায় রিমঝিম ছন্দ তুলে
উচ্ছল কিশোরীর মতো নাচতে নাচতে—
আবার যখন বৃষ্টি এলো—
পুকুর-জলে হেসে উঠলো রক্তকমল
ঘরের গা-ঘেঁষে দুলে উঠলো— মাধবীলতা, হাস্নাহেনা
পথের ধারে স্নানরতা নয়নতারা, অলকানন্দা...
জানালো আনন্দ-আহ্বান
অথচ, আমার বুকের নদীতে প্রেম নয়—
থেকে থেকে জেগে উঠছে— অনন্ত ভাটিকার টান|
তুমি আসবে বলে
মুশাররাত
সেবার আমাদের অলিগলি বৃষ্টির পানিতে
টইটম্বুর হয়ে গেলো যখন
আমি তোমাকে কাগজের নৌকা বানিয়ে দিলাম দুটো
তুমি সাদা কাগজের নৌকোটা পানিতে ভিজিয়ে
নিশ্চিহ্ন করে দিলে নিতান্তই শিশুতোষ কৌতূহলে
নীল রঙেরটা ভাসিয়ে দিয়ে বললে
এ আমার দুঃখগুলো দূরে নিয়ে যাবে
সেই থেকে আজও বসে আছি আমি
তোমার সবটুকু দুঃখ মিলিয়ে যাবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে
সদ্য ফোঁটা জুঁইফুলের মতো সুখ নিয়ে তুমি আসলে
ধান দুবলায় সাজাবো বলে
কত বর্ষা পার হয়ে গেলো
টিনের চালের এস্রাজের মিশেলে
বৃষ্টির গান শোনাতে শোনাতে
আর আমি মাটির সানকীতে আজও ধরে রাখি
প্রতিটি বর্ষার ব্যাকুল সে জলধারা|
বরষার রূপ
চঞ্চল শাহরিয়ার
বরষার রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিল
ভিনদেশি পর্যটক| সবুজ আঁচলে ঢাকা স্বর্ণময়ী গ্রাম তাকে স্বাগত জানিয়ে দিয়েছিল জোছনার আলো| ক্ষণিকের অবসর| চন্দন রঙের কিশোরীরা নূপুরের সুরে দিয়েছিল কবিতার মনোরম শোভা|
নদী, তুমি কাকে মনে রাখো?
বর্ষা তুমি বিষাদবাড়ি
হোসেন শহীদ মজনু
এ কোন বৃষ্টির কালিতে লিখছি আজ তোমাকে চিঠি?
আকাশজুড়ে কান্নার ছায়া বলছে শুধু ‘ও আমার ইতি’|
মুড়ি মুখে বৃষ্টির দিনে জানালায় বেশ শব্দ তালে তালে,
স্মৃতি ফুঁড়ে পড়ছে মনে— অন্য ছোঁয়া আমার এই গালে|
নরম-ঝলমল ভিজছে দেখো, ভিজছে অনেক সবুজ,
চোখের কোণে জমছে ধুলো, বয়স যেন বড়ই অবুঝ!
তোমার ছাতা কার মাথাতে? এখন তবে কোনো ঠিকানায়,
বৃষ্টিঝরা শীতরাতেও ঘুমের চোখে কেন ভাবছি তোমায়!
বর্ষা মানেই মনপুরার সুর, এটাই আমার হারানো গান,
এভাবে এই একলা ঘরে বলো আর থাকব কতদিন|
বর্ষা তুমি বিষাদবাড়ি, তোমার সাথে আবারও আড়ি,
বর্ষা মানেই বৃষ্টি নয়, সে ছিল এক মেয়ে আনাড়ি|
জোনাকি পাড়ায় নিমন্ত্রণ
মেহনাজ মুস্তারিন
একমুঠো মেঘ জোনাকিপাড়ায় পৌঁছে দিয়েছি
তুমি যদি চাও বৃষ্টি হতে পারো অথবা
জোনাকির শরীর দিতে পারো ভিজিয়ে
হতে পারো বৃষ্টি
হতে পারো জোনাকির কাছের কেউ
দেখবে ভিন্ন রঙের বাতি জ্বলবে আর নিভবে
আলোর স্বচ্ছতায় ভেসে যাবে নীল সুতোর
তন্তু-আঁশ
তুমি অনুভব হতে পারো
তুলে আনতে পারো বৃষ্টির সুকণা
শরীরের সাথে শরীর ঋণাত্মক আয়ন কুড়াতে পারো
দেখবে একঝাঁক জোনাকি প্রজাপতির মতো
তোমাকে উড়ে উড়ে পুরো পাড়া দেখাবে
ওখানে তুমি বটের ছায়ায় কারুকাজ পাবে
অন্ধকার পথ আলো জ্বেলে পৌঁছে দেবে তোমায়
তুমি আর কখনোই ফিরতে চাইবে না
এই মিথেন জড়ানো হৃদয়ে
বৃষ্টি লিপি
মিলি রায়
মেঘেরা গর্ভবতী হলে স্নিগ্ধ সুন্দর
রূপকথা হয়ে উঠে গাছেরা|
শ্রাবণের অগ্নিস্রাবী বৃষ্টিতে
পুড়ে যাচ্ছে সমস্ত বিকেল,
পুড়তে পুড়তে উড়ে যায় আগুনের মেঘ
ছলকে উঠে বৃষ্টি শিখা,
পাললিক প্রেম কুয়াশা ঘন হয়
আমার দুঃখগুলোতে,
আলুথালু নিস্তেজ পড়ে আছে ঝিঙেলতা|
বিধূর লগন, মল্লার মন
বেজে উঠে সলাজ কঙ্কন,
অনুস্পর্শে ছুঁয়েছো হৃদয়
মাটির শরীরে, প্রতীক্ষার চুম্বন|
কাকে পাঠাবো এই
জলচূর্ণ মেঘের ভার?
সমস্ত শব্দই কেমন বৃষ্টিপ্রবণ!
হয়তো এমন বৃষ্টি আসা উচিত নয়
হয়তো এখন বদ্ধ ঘরে শাওন মাস,
কালের আড়ালে মেঘ বৃষ্টি হয়ে নামে
ধুয়ে যায় মাটি আকাশ,
ঘাসেদের চারা গজায়,
বৃষ্টি লিপির অক্ষরে
পৃথিবীর আদি মধ্যরাত,
অক্ষর পোড়া গন্ধে বিবর্ণ, বৃষ্টি এপিটাফ|
ও মেঘ ও আষাঢ়
রাজিয়া সুলতানা রিপা
ও আষাঢ়— প্রিয়তম মেঘ প্রাণহীন হয়ে আছি
কত দিবস বছর কেটে গেলো যেন
শূূন্যতার বেদনায় কাঁদিয়ে আমাকে!
খরার আগুনে শুধু অপেক্ষা তোমার|
ও আষাঢ়-বাদলের মেঘ তুমি দেখোনি এখনো
ব্যথিত মুখশ্রী!
একটুও বোঝো না তো হৃদয়-দহন!
অপেক্ষার প্রহর তো ফুরায় না জীবনে আমার!

বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬
বউ
নির্মলেন্দু গুণ
কে কবে বলেছে হবে না? হবে, বউ থেকে হবে|
একদিন আমিও বলেছি, ওসবে হবে না| বাজে কথা|
আজ বলি, হবে, বউ থেকে হবে| বউ থেকে হয়|
মানুষের পুনর্জন্ম, প্রেমের কবিতা, কী সে নয়?
গোলাপ শেফালি জুঁই, ভোরের আকাশে প্রজাপতি,
ভালোবাসা, ভাগ্য, ভাড়া বাড়ি ইতিপূর্বে এভাবে মিশে নি|
ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, দুইজন্ম এবার মিশেছে| দেখা যাক|
হতচ্ছাড়া ব্যর্থ প্রেম, গাঁজা, মদ, ˆনঃসঙ্গ আমার
ভালবেসে হে তরুণ তোমাকে দিলাম, তুমি নাও|
যদি কোনোদিন বড় কবি হও, আমার সাফল্য কতদূর
একদিন তুমি তা বুঝিবে| একদিন তুমিও বুঝিবে|
আমি কতো ভালোবাসা দু’পায়ে মাড়িয়ে, অবশেষে
কল্পনার মেঘলোক ছেড়ে পৌঁছেছি বাস্তব মেঘে|
আজরাত বৃষ্টি হবে মানুষের চিরকাম্য দাবির ভিতরে|
তার শয্যাপাশে আমার হয়েছে স্থান, মুখোমুখি,
অনায়াসে আমি তা বলি না— বলে যারা জানে দূর থেকে|
আমি খুব কাছে থেকে জানি, বিনিময়ে আমাকে হয়েছে দিতে
জীবনের নানা মূল্যে কেনা বিশ্বখানি তার হাতে তুলে|
অনায়াসে আমিও পারি নি| ক্রমে ক্রমে বিভিন্ন কিস্তিতে
আমি তা দিয়েছি, ফুলে ফুলে ভালবেসে যেভাবে প্রেমিক|
প্রথমে আত্মার দ্যুতি, তারপর তাকে ঘিরে মুগ্ধ আনাগোনা|
স্বর্গের সাজানো বাগানে পদস্পর্শে জ্বলে গেছি দূরে,
তারপর পেয়েছি বিশ্রাম| আজরাতে সম্পর্কের ভিতরে এসেছি|
সবাই মিলবে এসে মৌনমিহি শিল্পে অতঃপর,
তোমার প্রদত্ত দানে পূর্ণ হবে পৃথিবী আমার|
অনুর্বর বর্ষাকথা
জাহিদ হায়দার
বৃষ্টি যখন তুলনামূলক,
শ্রেণির প্রকাশ প্রশ্নমাফিক
হেতুতে নয় ব্যক্তিগত|
পারস্পরিক বিভাজনে
ক্ষয়িষ্ণু যোগ্য প্রকাশ|
আমার যাপন তৃষ্ণাকাতর,
সময়ক্ষত|
বর্ষা নতুন, পুরনো আষাঢ়;
বাঁচার গল্প বজ্রপাতে——
সংঘাতে অন্য ধারার|
তোমার রৌদ্রে শিল্পরূপক
জাফরিকাটা মেঘসামাজিক|
অনুর্বর বর্ষাকথা,
সঙ্গদৃশ্য পচনপ্রধান|
আমার শস্যে ব্যথার সূচক,
সংগ্রাহক কেবল জাহিদ|
ক্রমাগত ধারাকসম
কৃপায় কহে,
অনুগ্রহে বৃষ্টিঋণ
জন্যে তোমার
আপাতত ক্ষতিপূরণ|
ধনুমেঘে শৈশব
আবদুর রাজ্জাক
অমর এক বরষা বিকেল| ধনুমেঘ| করতলে বয়ে যাওয়া নদী,
মেঘের ভিতরের নিদ্রিত জল, আর সেই জলের প্রাণময় হাসি
যেন— আমার মেঘালিত শৈশব| ওই নিভৃতি
আমার মেঘমুদ্রিত বালিকা যাকে শৈশবে মেঘের মতো দেখেছি,
এবং এখনো প্রায়শ তাকে দেখে থাকি|
শৈশবের সব ভালোবাসা সঞ্চিত রয়েছে ধনুমেঘে, তার ঈষৎ
বাঁকাহাসি—— তার এই হাসির কোনো দোষ দেয়া যায় না|
আমাদের মুদ্রাদোষ—— আমরা দোষ দেখি না কখনো,
সকল দোষ মহান প্রভুকেই দিয়ে থাকি, দোষারোপ করে থাকি|
ভিতরের কেউ কেউ কিছু না-ভেবেই বলে বসে:
‘যা তুমি শুনেছো: সত্য শুনেছো|’
পাহাড়ের পাদদেশে সন্ধ্যা নামে নিত্যদিনের মতো, আর
পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে থাকা শৈশবী ইচ্ছেগুলো ভেঙে ভেঙে
পড়ে আর—— দিনে দিনে সেইসব জনশ্রুতিও
হয়ে ওঠে লোকালয়ে|
আমার কাছে শৈশবের কোনো কিছু পরিষ্কার নয়, শুধু অনুমেঘের
বণির্ত নির্মাণ যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে ওঠে| তখন—
শুধুই মনে হয় আমার শৈশব আমাকে কখনই ছেড়ে যেতে পারেনি|
বেলি কিংবা নগরাকে
খালেদ হামিদী
উপনিবেশের প্রবক্তাদের হাতে লুণ্ঠিত তবে?
কীভাবে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাওয়ার মধ্য পথে
নাম নিলে তুমি আরব্য জেসমিন?
বিশেষ্য কেন যুক্ত হয়নি তোমার গন্ধে প্রখ্যাত পারসিয়া
ভাবতে না পেরে এদিকে কোথাও মল্লিকাবনে দোলে
কার হিয়া কেউ জানার আগেই অঝোরে বৃষ্টি নামে|
অপু-দুর্গার সাহচর্যের আনন্দ থেকে ছুটে
কে তবে মুষলধারে বর্ষণ মাথায়, খুঁজতে আসে
হারানো বাগানে বেলির পাপড়ি গলির শহরে একা?
ফিলিপিনা-চুলে সাম্পাগুইতা,
কোন দেশে তবে পুষ্পা-বাংসা
তোয়াক্কাহীন সন্ধানীজন শ্রান্তিতে পড়ে নুয়ে|
নগরা তোমার স্মৃতির সুরভি
তবুও অটুট ভেজা রাত্রি বা
প্লাবিত দিবস যা-ই নিয়ে যাক ধুয়ে|
বরিষণ প্রতীক্ষায়
মাহফুজ আল-হোসেন
দাবদাহে দগ্ধ পৃথিবী
দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেন যে তাকিয়ে আছে
নিরাসক্ত নির্মম আকাশের দিকে;
আর স্রোতস্বিনীই-বা কেন ভুলে গেছে
পোড়া চোখে পরে নিতে
ভালবাসার সোহাগী কাজল|
স্বর্ণকেশী আউশের শিরায় শিরায়
কেন বলো জমে আছে তৃষ্ণার নীল শ্লোক?
বাউরি বাতাসের উত্তরীয় পরেও
কেনইবা আজ নির্বাক নিথর মেঘদূত?
যক্ষপ্রিয়াও সাতপাঁচ না জানি কী ভেবে
তার কানে এখনও পাঠায়নি সন্দেশ|
অথচ কদমের মাতাল গন্ধে মূর্চ্ছা যাচ্ছে
প্রতীক্ষার প্রতিটি ক্ষণ;
আর নীলাম্বরীর দিঘল বুক চিরে
জানি না কবে হবে অবিরাম স্বস্তি-বরিষণ|
সবকিছু পাল্টাতে থাকে
চয়ন শায়েরী
চিরকালিক আবেদন বলে কিছু নেই
না প্রেম না সংসার
কি বর্ষা কি কবিতা
সবকিছু পাল্টাতে থাকে
পারিপার্শ্বিক রাষ্ট্রিক চাপে
উষ্ণায়ন উপেক্ষায় পাল্টায় ঋতুকন্যাদের সময়—
কেমনে পাল্টে যায় বর্ষার মতন
প্রেমিকের হৃদয়;
উষ্ণায়নে আধমরা আবহাওয়ার
মন সারাক্ষণ উচাটন
প্রতিপক্ষ জল আর বায়ু—
জলবায়ু জানে পরিবর্তনের মানে
হৃদয় কি জানে
ঢলক আর অশ্রুঢলে পার্থক্য কত?
আষাঢ়ের কোনো-এক ঢলকের রাতে
দুঃখ সব ডানা ঝাপটায়
বিকেলের ঘরমুখো অবিরল কাকের ডানায়;
পথ খুঁজে ফেরে মন—
সারাক্ষণ
ঘরের ভিতরে মেকি ঘর বানিয়ে
মনের আকুতি হৃদয়ের ঘিঞ্জি গলিপথে
পথ হারায়—
আষাঢ়ের রাতে বৃষ্টিঝাঁপ জানালায়;
ঢলকের সহোদরা হৃদয়ের অশ্রুঢল
সংসারের জলবায়ু উপেক্ষা করে
চোখের তারায় তারায় সে-সংবাদ জানায়;
তুমুল বৃষ্টির রাতে নক্ষত্রের মুখ ঢেকে যায়
মানুষেরা পাল্টায়
মানুষী পাল্টে যায়—
অলঙ্ঘ্য অলীক বেদনায়|
আষাঢ়ে জৈষ্ঠ্যৈর কবিতা
মুজিব ইরম
ও আমার
দেশি ও বৈদেশি আম
মনে রেখো মধুমাসী বেদনা আমার...
ধলাদিয়া সড়কের পাশে
আমগুলো ভিজে ওঠে রোদে...
খিরসাপাতি আমের ভিড়ে
লখনা আমের রূপ চোখে লেগে থাকে
মনে গেঁথে থাকে...
এই আম পাকা দিনে
আমের আড়তে
কানসাট সাপাহার বাজারে বাজারে
আমগুলো কেনো এতো ডাকে...
বানেশ্বর আমের বাজারে
হাটেঘাটে
বাগানে বাগানে
কাঁচাপাকা আমগুলো কেনো এতো ডাকে...
মেঘমল্লার
শেলী নাজ
নির্মম মধুর এই মিথ্যাচার, মোহঋতু এলে
ভুলি বিল্বপত্রভরা ভুল, শুষ্ক নদীর ক্রন্দন
অজস্র মড়ক, অঙ্গে যুগপৎ ক্ষত ও চন্দন
উথলে উঠছে দেখ, যেন এক সুদীর্ঘ সাহারা
আত্মঅগ্নি জ্বেলে বালিদের মন পোড়ানোর শেষে
শুষে নিচ্ছে মরুকান্না, সবুজাভ তামান্না ও তাথৈ
আমি ভারাক্রান্ত হই, নক্ষত্রে ও মরীচিকায়
তুমি চামড়ার নিচে রুয়ে দাও অগাধ সবুজ
ত্বক তুলে নাও চাবুকের তীব্র কষাঘাতে আর
তারপর তুমিই তো জাদুকর, অসুখনাশক
মস্ত কবিরাজ, আমি কবিতার জলভাঁজ খুলে
নিতে থাকি তারামাছ, দেহে সেসব মেঘমল্লার
তুমি কি শুনছ আজ, বৃষ্টিবিহারিনী রেণুদের
ফুলেফেঁপে ওঠা দীর্ঘ গর্ভ বিকাশের চিৎকার?
বৃষ্টি পড়ে
মাসুদার রহমান
মৃদু বৃষ্টি পড়ে, তোমার প্রেমের মতো মৃদু বৃষ্টির ভেতরে
ছাতাছাড়া হেঁটে গিয়ে
বুঝতে চেষ্টা করি, সামান্যও ভিজেছি কি আমি!
অস্পষ্ট সুখের মতো বাঁশি বাজে, নাকি তীব্র ব্যথার মতো
বাঁশি বাজে
শুধু এই প্রশ্নই বাজছে বাঁশিতে, উত্তর বাজে না কখনো
তোমার দাঁতের মতো উজ্জ্বল হোয়াইটওয়াশ করা
লেকপাড়ের বাড়ি
লেকের এপাড়ে বসে ওপারের বাড়িটিকে দেখি
লেকের জলের ভেতর বাড়িটির ছায়াকেও দেখি
ছায়াটিই ঢেউয়ে ভেঙে এপারে আমার কাছে আসে
মনে হয় বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টিতে ভিজি না কখনো
তোমার প্রেমের মতো দূরের দিগন্ত, সেখানে তোমার প্রেম
তাকে ছুঁতে পাবো না কখনো!
আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে
শাহেদ কায়েস
সকালের জানালায় ঝুলে আছে ভেজা আলোর পর্দা
দূরের আকাশ যেন কাঁচা নীলের ওপর ধূসর জলরং
মেঘেরা ধীরে-ধীরে ঘাসের গন্ধ মেখে নামছে...
বাতাসে কে যেন খুলে দিয়েছে পুরোনো স্মৃতির সিন্দুক!
পাতার ফাঁকে-ফাঁকে নিঃশব্দ হাওয়া মৃদু বাঁশি বাজায়
বিদ্যুৎ ক্ষণিকের সাদা সারস হয়ে উড়ে যায়
আজ আমি বৃষ্টির স্পর্শ নিতে আসিনি—
শুধু ভিজে যাওয়ার গোপন ইচ্ছাটুকু সঙ্গে এনেছি|
পঙ্খিরাজ নদীর মতো কোনো এক অদেখা স্রোত
আজ আমার ভেতরে জেগে উঠেছে
যেন পানামের নির্জন দুপুর...
মনের গভীরে দুলে ওঠে অচেনা এক শূন্যতা|
কদমফুলের ভেজা গন্ধে জেগে ওঠে বিস্মৃত ঋতুস্মৃতি
মেঘ, শুধু আর্দ্র এক ইশারা হয়ে থেকো
না হলে দিকচিহ্ন মুছে যাবে জলরেখায়
হারিয়ে যাবো অচেনা কোনো বর্ষার নীরব পংক্তিতে|
গগনের ভিটেতে আষাঢ়ের বৃষ্টিতে
রকিবুল হাসান
প্রবল ঝড় বৃষ্টিতে আঁধার কুঠিবাড়ির সুদূর-সীমানা
খানিকটা পথ এসে গগনের উঠোনে দাঁড়াই
যে গগন জীবনের পথে পথে খুঁজে গেলো মনের মানুষ
তার উঠোনে দাঁড়াই মনের মানুষ বুকে বেঁধে|
মানকচুর পাতায় দুজনে কী ভীষণ একাত্ম
শরীরের ভেজাগন্ধে তোমার চুলেরা যেন শিল্পীর তুলিতে
আঁকা রেখা
একটু দূরে দাঁড়িয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ|
শীতে ভীষণ কাঁপছি| একটি শরীর হয়ে দুজনে দাঁড়িয়ে...
গগন তখনো ফেরেননি—
আষাঢ়ে ঝড়ে কোথায় গেলে পাবো তারে
তার ভিটেতে তখন আমরা দু’জন ডুবি মনের মানুষ|
আবার যখন বৃষ্টি এলো
কুমার দীপ
টিনের চালে ঘুঙুর বাজিয়ে,
পেয়ারার পাতায় রিমঝিম ছন্দ তুলে
উচ্ছল কিশোরীর মতো নাচতে নাচতে—
আবার এখানে বৃষ্টি এলো|
কিন্তু কোথাও যখন নিরীহ শিশুর রক্ত ঝরছে,
নারীর শরীর ঘিরে উল্লাস করছে— একদল পুরুষ,
মানুষ খুবলে খাচ্ছে— আরেকটি মানুষকে,
তখন—
তোকে নিয়ে কী লিখবো, বৃষ্টি?
কোন উপমায় ডাকবো, তোর নাম?
জানি—
কবির কলমের প্রতীক্ষায় থাকিস তুই,
কিন্তু আমি কালিদাস নই, আষাঢ়স্য প্রথমদিবস
আমার হৃদয়ে জাগাতে পারে না বিরহ;
রবীন্দ্রনাথও নই; অনন্ত শুভবোধে
জেগে থাকার অপার ক্ষমতা কোথায়?
মানুষের সীমাহীন ক্লেদ, অনন্ত ক্রূরতা
আর রক্তের নদীতে ভাসতে ভাসতে
হারিয়ে ফেলেছি ˆবঠা, গন্তব্যের প্রেম!
টিনের চালে ঘুঙুর বাজিয়ে,
পেয়ারা পাতায় রিমঝিম ছন্দ তুলে
উচ্ছল কিশোরীর মতো নাচতে নাচতে—
আবার যখন বৃষ্টি এলো—
পুকুর-জলে হেসে উঠলো রক্তকমল
ঘরের গা-ঘেঁষে দুলে উঠলো— মাধবীলতা, হাস্নাহেনা
পথের ধারে স্নানরতা নয়নতারা, অলকানন্দা...
জানালো আনন্দ-আহ্বান
অথচ, আমার বুকের নদীতে প্রেম নয়—
থেকে থেকে জেগে উঠছে— অনন্ত ভাটিকার টান|
তুমি আসবে বলে
মুশাররাত
সেবার আমাদের অলিগলি বৃষ্টির পানিতে
টইটম্বুর হয়ে গেলো যখন
আমি তোমাকে কাগজের নৌকা বানিয়ে দিলাম দুটো
তুমি সাদা কাগজের নৌকোটা পানিতে ভিজিয়ে
নিশ্চিহ্ন করে দিলে নিতান্তই শিশুতোষ কৌতূহলে
নীল রঙেরটা ভাসিয়ে দিয়ে বললে
এ আমার দুঃখগুলো দূরে নিয়ে যাবে
সেই থেকে আজও বসে আছি আমি
তোমার সবটুকু দুঃখ মিলিয়ে যাবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে
সদ্য ফোঁটা জুঁইফুলের মতো সুখ নিয়ে তুমি আসলে
ধান দুবলায় সাজাবো বলে
কত বর্ষা পার হয়ে গেলো
টিনের চালের এস্রাজের মিশেলে
বৃষ্টির গান শোনাতে শোনাতে
আর আমি মাটির সানকীতে আজও ধরে রাখি
প্রতিটি বর্ষার ব্যাকুল সে জলধারা|
বরষার রূপ
চঞ্চল শাহরিয়ার
বরষার রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিল
ভিনদেশি পর্যটক| সবুজ আঁচলে ঢাকা স্বর্ণময়ী গ্রাম তাকে স্বাগত জানিয়ে দিয়েছিল জোছনার আলো| ক্ষণিকের অবসর| চন্দন রঙের কিশোরীরা নূপুরের সুরে দিয়েছিল কবিতার মনোরম শোভা|
নদী, তুমি কাকে মনে রাখো?
বর্ষা তুমি বিষাদবাড়ি
হোসেন শহীদ মজনু
এ কোন বৃষ্টির কালিতে লিখছি আজ তোমাকে চিঠি?
আকাশজুড়ে কান্নার ছায়া বলছে শুধু ‘ও আমার ইতি’|
মুড়ি মুখে বৃষ্টির দিনে জানালায় বেশ শব্দ তালে তালে,
স্মৃতি ফুঁড়ে পড়ছে মনে— অন্য ছোঁয়া আমার এই গালে|
নরম-ঝলমল ভিজছে দেখো, ভিজছে অনেক সবুজ,
চোখের কোণে জমছে ধুলো, বয়স যেন বড়ই অবুঝ!
তোমার ছাতা কার মাথাতে? এখন তবে কোনো ঠিকানায়,
বৃষ্টিঝরা শীতরাতেও ঘুমের চোখে কেন ভাবছি তোমায়!
বর্ষা মানেই মনপুরার সুর, এটাই আমার হারানো গান,
এভাবে এই একলা ঘরে বলো আর থাকব কতদিন|
বর্ষা তুমি বিষাদবাড়ি, তোমার সাথে আবারও আড়ি,
বর্ষা মানেই বৃষ্টি নয়, সে ছিল এক মেয়ে আনাড়ি|
জোনাকি পাড়ায় নিমন্ত্রণ
মেহনাজ মুস্তারিন
একমুঠো মেঘ জোনাকিপাড়ায় পৌঁছে দিয়েছি
তুমি যদি চাও বৃষ্টি হতে পারো অথবা
জোনাকির শরীর দিতে পারো ভিজিয়ে
হতে পারো বৃষ্টি
হতে পারো জোনাকির কাছের কেউ
দেখবে ভিন্ন রঙের বাতি জ্বলবে আর নিভবে
আলোর স্বচ্ছতায় ভেসে যাবে নীল সুতোর
তন্তু-আঁশ
তুমি অনুভব হতে পারো
তুলে আনতে পারো বৃষ্টির সুকণা
শরীরের সাথে শরীর ঋণাত্মক আয়ন কুড়াতে পারো
দেখবে একঝাঁক জোনাকি প্রজাপতির মতো
তোমাকে উড়ে উড়ে পুরো পাড়া দেখাবে
ওখানে তুমি বটের ছায়ায় কারুকাজ পাবে
অন্ধকার পথ আলো জ্বেলে পৌঁছে দেবে তোমায়
তুমি আর কখনোই ফিরতে চাইবে না
এই মিথেন জড়ানো হৃদয়ে
বৃষ্টি লিপি
মিলি রায়
মেঘেরা গর্ভবতী হলে স্নিগ্ধ সুন্দর
রূপকথা হয়ে উঠে গাছেরা|
শ্রাবণের অগ্নিস্রাবী বৃষ্টিতে
পুড়ে যাচ্ছে সমস্ত বিকেল,
পুড়তে পুড়তে উড়ে যায় আগুনের মেঘ
ছলকে উঠে বৃষ্টি শিখা,
পাললিক প্রেম কুয়াশা ঘন হয়
আমার দুঃখগুলোতে,
আলুথালু নিস্তেজ পড়ে আছে ঝিঙেলতা|
বিধূর লগন, মল্লার মন
বেজে উঠে সলাজ কঙ্কন,
অনুস্পর্শে ছুঁয়েছো হৃদয়
মাটির শরীরে, প্রতীক্ষার চুম্বন|
কাকে পাঠাবো এই
জলচূর্ণ মেঘের ভার?
সমস্ত শব্দই কেমন বৃষ্টিপ্রবণ!
হয়তো এমন বৃষ্টি আসা উচিত নয়
হয়তো এখন বদ্ধ ঘরে শাওন মাস,
কালের আড়ালে মেঘ বৃষ্টি হয়ে নামে
ধুয়ে যায় মাটি আকাশ,
ঘাসেদের চারা গজায়,
বৃষ্টি লিপির অক্ষরে
পৃথিবীর আদি মধ্যরাত,
অক্ষর পোড়া গন্ধে বিবর্ণ, বৃষ্টি এপিটাফ|
ও মেঘ ও আষাঢ়
রাজিয়া সুলতানা রিপা
ও আষাঢ়— প্রিয়তম মেঘ প্রাণহীন হয়ে আছি
কত দিবস বছর কেটে গেলো যেন
শূূন্যতার বেদনায় কাঁদিয়ে আমাকে!
খরার আগুনে শুধু অপেক্ষা তোমার|
ও আষাঢ়-বাদলের মেঘ তুমি দেখোনি এখনো
ব্যথিত মুখশ্রী!
একটুও বোঝো না তো হৃদয়-দহন!
অপেক্ষার প্রহর তো ফুরায় না জীবনে আমার!

আপনার মতামত লিখুন