চারদিকে সাতটি রাস্তার মিলনমেলা, যানবাহনের তীব্র হর্ন আর পুরান ঢাকার চিরচেনা কোলাহল। এই ব্যস্ততার ঠিক মাঝখানে, সদরঘাটের কোল ঘেঁষে লক্ষ্মীবাজারে দাঁড়িয়ে আছে এক জীর্ণ অথচ গর্বিত চত্বর। নাম তার ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’। ওপর থেকে দেখলে একে কেবলই একটি সাধারণ পার্ক বা নগরের ফুসফুস মনে হতে পারে। কিন্তু এই পার্কের প্রতিটি ইঞ্চি মাটির নিচে, প্রতিটি প্রাচীন গাছের শিকড়ে চাপা পড়ে আছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক ভয়াবহ, নির্মম আর রক্তভেজা দাস্তান। আন্টাঘর ময়দান থেকে ভিক্টোরিয়া পার্ক, আর সেখান থেকে আজকের বাহাদুর শাহ পার্ক হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে এক অবিশ্বাস্য ও ট্রাজিক ইতিহাস।
আড্ডাখানা থেকে যেভাবে হলো জল্লাদখানা
উনিশ শতকের শুরুর দিকের কথা। এই জায়গাটি তখন ছিল মূলত ঢাকায় বসবাসরত আর্মেনীয়দের সম্পত্তি। সেখানে তারা তৈরি করেছিলেন একটি বিলিয়ার্ড ক্লাব, যাকে স্থানীয় মানুষ ডাকত ‘আন্টাঘর’ নামে। ঢাকার নবাব খাজা আব্দুল গণি ও নবাব আহসান উল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতায় ইংরেজ সাহেবরা বিকেল হলেই এখানে জড়ো হতেন। চলত টেনিস আর ব্যাডমিন্টন খেলার আড্ডা।
কিন্তু ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলো এক নিমেষে সব বদলে দিল। আজাদী আন্দোলনের অংশ হিসেবে লালবাগের কেল্লায় অবস্থানরত দেশীয় সিপাহীরা যখন বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন, তখন ইংরেজরা আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে তাদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করে। শুরু হয় এক অসম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।
সেই যুদ্ধে পরাজিত ও বন্দি ১১ জন বীর সিপাহীকে এই আন্টাঘর ময়দানে নিয়ে আসা হয়। কোনো বিচার ছাড়াই, প্রকাশ্য দিবালোকে এই ময়দানের গাছের ডালে ফাঁসি দেওয়া হয় সেই অকুতোভয় বিপ্লবীদের। এখানেই শেষ নয়, সাধারণ মানুষের মনে ইংরেজদের প্রতি ভয় ও ত্রাস সৃষ্টি করতে দিনের পর দিন তাদের সেই রক্তাক্ত ও প্রাণহীন দেহগুলো গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।
সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে ঢাকাবাসী আতঙ্কে এই পথ দিয়ে হাঁটা ছেড়ে দিয়েছিলেন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল নানা ভৌতিক ও করুণ কাহিনী। পরবর্তীতে ১৮৫৮ সালে রানি ভিক্টোরিয়া যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ভারতের শাসনভার নিজের হাতে নেন, তখন এই ময়দানেই রানির সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়েছিল। আর সেই উপলক্ষেই আন্টাঘর ময়দানের নাম বদলে রাখা হয় ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’।
মুঘল সম্রাটের নামে শহীদদের অমর স্মারক
সময় বয়ে গেছে, কিন্তু বাঙালির বুকের ভেতরের সেই বিদ্রোহের আগুন কখনও নিভে যায়নি। বরং তা রূপ নিয়েছিল দেশপ্রেমের মশালে। ১৯৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের শতবার্ষিকী উপলক্ষে সেই বীর শহীদদের স্মৃতিকে চিরকাল অম্লান রাখতে পার্কটির নতুন নামকরণ করা হয় 'বাহাদুর শাহ পার্ক'। মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের নামানুসারে এই নামকরণ করা হয়, কারণ ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহীরা তাকেই স্বাধীন ভারতের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
পার্কের ভেতরে প্রবেশ করলেই আজও সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় চারটি পিলারের ওপর নির্মিত সেই অনন্য স্মৃতিসৌধকে। এটি কেবল কংক্রিটের কাঠামো নয়, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই অকুতোভয় সিপাহীদের আত্মত্যাগের অমর মহাকাব্য। এর ঠিক পাশেই ইতিহাসের আরেক স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঢাকার নবাব পরিবারের অকালপ্রয়াত সন্তান খাজা হাফিজুল্লাহর স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ বা ওবেলিস্ক।
কোলাহলপূর্ণ নগরে এক টুকরো শান্তির নীড়
বর্তমানে ডিম্বাকৃতির এই ঐতিহাসিক পার্কটি শুধু ইতিহাসের ধূসর পাতা নয়, বরং আধুনিক পুরান ঢাকাবাসীর বেঁচে থাকার অক্সিজেনের উৎস। প্রতিদিন সকাল-বিকেল এখানে ভিড় জমান সব বয়সী মানুষ। কেউ আসেন বুক ভরে বিশুদ্ধ বাতাস নিতে, কেউবা আসেন শরীর চর্চা করতে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা নামী সব স্কুল, কলেজ আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীর আড্ডা ও পদচারণায় মুখরিত থাকে এই চত্বর।
ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকেই মানুষ আজও ছুটে আসে এই ঐতিহ্যের টানে। ব্রিটিশদের সেই অমানুষিক অত্যাচার আর সিপাহীদের বুকের তাজা রক্ত; সবই আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দি হলেও বাহাদুর শাহ পার্ক আমাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, শেকল ভাঙার গান কখনও স্তব্ধ হয় না। ইট-পাথরের এই ধূসর নগরে পার্কটি আজও দাঁড়িয়ে আছে বাঙালির আজন্ম গৌরব আর ব্রিটিশ শাসনের নিষ্ঠুরতম স্মৃতি বুকে আগলে।

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬
চারদিকে সাতটি রাস্তার মিলনমেলা, যানবাহনের তীব্র হর্ন আর পুরান ঢাকার চিরচেনা কোলাহল। এই ব্যস্ততার ঠিক মাঝখানে, সদরঘাটের কোল ঘেঁষে লক্ষ্মীবাজারে দাঁড়িয়ে আছে এক জীর্ণ অথচ গর্বিত চত্বর। নাম তার ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’। ওপর থেকে দেখলে একে কেবলই একটি সাধারণ পার্ক বা নগরের ফুসফুস মনে হতে পারে। কিন্তু এই পার্কের প্রতিটি ইঞ্চি মাটির নিচে, প্রতিটি প্রাচীন গাছের শিকড়ে চাপা পড়ে আছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক ভয়াবহ, নির্মম আর রক্তভেজা দাস্তান। আন্টাঘর ময়দান থেকে ভিক্টোরিয়া পার্ক, আর সেখান থেকে আজকের বাহাদুর শাহ পার্ক হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে এক অবিশ্বাস্য ও ট্রাজিক ইতিহাস।
আড্ডাখানা থেকে যেভাবে হলো জল্লাদখানা
উনিশ শতকের শুরুর দিকের কথা। এই জায়গাটি তখন ছিল মূলত ঢাকায় বসবাসরত আর্মেনীয়দের সম্পত্তি। সেখানে তারা তৈরি করেছিলেন একটি বিলিয়ার্ড ক্লাব, যাকে স্থানীয় মানুষ ডাকত ‘আন্টাঘর’ নামে। ঢাকার নবাব খাজা আব্দুল গণি ও নবাব আহসান উল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতায় ইংরেজ সাহেবরা বিকেল হলেই এখানে জড়ো হতেন। চলত টেনিস আর ব্যাডমিন্টন খেলার আড্ডা।
কিন্তু ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলো এক নিমেষে সব বদলে দিল। আজাদী আন্দোলনের অংশ হিসেবে লালবাগের কেল্লায় অবস্থানরত দেশীয় সিপাহীরা যখন বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন, তখন ইংরেজরা আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে তাদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করে। শুরু হয় এক অসম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।
সেই যুদ্ধে পরাজিত ও বন্দি ১১ জন বীর সিপাহীকে এই আন্টাঘর ময়দানে নিয়ে আসা হয়। কোনো বিচার ছাড়াই, প্রকাশ্য দিবালোকে এই ময়দানের গাছের ডালে ফাঁসি দেওয়া হয় সেই অকুতোভয় বিপ্লবীদের। এখানেই শেষ নয়, সাধারণ মানুষের মনে ইংরেজদের প্রতি ভয় ও ত্রাস সৃষ্টি করতে দিনের পর দিন তাদের সেই রক্তাক্ত ও প্রাণহীন দেহগুলো গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।
সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে ঢাকাবাসী আতঙ্কে এই পথ দিয়ে হাঁটা ছেড়ে দিয়েছিলেন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল নানা ভৌতিক ও করুণ কাহিনী। পরবর্তীতে ১৮৫৮ সালে রানি ভিক্টোরিয়া যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ভারতের শাসনভার নিজের হাতে নেন, তখন এই ময়দানেই রানির সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়েছিল। আর সেই উপলক্ষেই আন্টাঘর ময়দানের নাম বদলে রাখা হয় ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’।
মুঘল সম্রাটের নামে শহীদদের অমর স্মারক
সময় বয়ে গেছে, কিন্তু বাঙালির বুকের ভেতরের সেই বিদ্রোহের আগুন কখনও নিভে যায়নি। বরং তা রূপ নিয়েছিল দেশপ্রেমের মশালে। ১৯৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের শতবার্ষিকী উপলক্ষে সেই বীর শহীদদের স্মৃতিকে চিরকাল অম্লান রাখতে পার্কটির নতুন নামকরণ করা হয় 'বাহাদুর শাহ পার্ক'। মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের নামানুসারে এই নামকরণ করা হয়, কারণ ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহীরা তাকেই স্বাধীন ভারতের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
পার্কের ভেতরে প্রবেশ করলেই আজও সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় চারটি পিলারের ওপর নির্মিত সেই অনন্য স্মৃতিসৌধকে। এটি কেবল কংক্রিটের কাঠামো নয়, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই অকুতোভয় সিপাহীদের আত্মত্যাগের অমর মহাকাব্য। এর ঠিক পাশেই ইতিহাসের আরেক স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঢাকার নবাব পরিবারের অকালপ্রয়াত সন্তান খাজা হাফিজুল্লাহর স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ বা ওবেলিস্ক।
কোলাহলপূর্ণ নগরে এক টুকরো শান্তির নীড়
বর্তমানে ডিম্বাকৃতির এই ঐতিহাসিক পার্কটি শুধু ইতিহাসের ধূসর পাতা নয়, বরং আধুনিক পুরান ঢাকাবাসীর বেঁচে থাকার অক্সিজেনের উৎস। প্রতিদিন সকাল-বিকেল এখানে ভিড় জমান সব বয়সী মানুষ। কেউ আসেন বুক ভরে বিশুদ্ধ বাতাস নিতে, কেউবা আসেন শরীর চর্চা করতে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা নামী সব স্কুল, কলেজ আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীর আড্ডা ও পদচারণায় মুখরিত থাকে এই চত্বর।
ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকেই মানুষ আজও ছুটে আসে এই ঐতিহ্যের টানে। ব্রিটিশদের সেই অমানুষিক অত্যাচার আর সিপাহীদের বুকের তাজা রক্ত; সবই আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দি হলেও বাহাদুর শাহ পার্ক আমাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, শেকল ভাঙার গান কখনও স্তব্ধ হয় না। ইট-পাথরের এই ধূসর নগরে পার্কটি আজও দাঁড়িয়ে আছে বাঙালির আজন্ম গৌরব আর ব্রিটিশ শাসনের নিষ্ঠুরতম স্মৃতি বুকে আগলে।

আপনার মতামত লিখুন